শম্ভু রক্ষিত

হারানো কবিতাগুলো : রমিতের জানালায়

বাক্ বাংলা কবিতার প্রথম ব্লগজিন ... বাক্ বাংলা কবিতার মুক্ত অবস্থান ... বাজারের বাইরে প্রতিভা ও প্রভার সন্ধান তার ঘোষিত ব্রত ... পাঠ্য এবং অপাঠ্যর মধ্যবর্তীটি ছাড়া কোনো ভেদরেখাই মান্য নয় ... বাংলা কবিতার নবীনতম এই শতাব্দীর কবি যাঁরা ... কথা বলুন 8436419575 , লেখা পাঠান : anupam_gtl@yahoo.co.in

শম্ভু রক্ষিত

........শম্ভু রক্ষিত.......

 (কাব্যগ্রন্থ- ‘সময়ের কাছে কেন আমি বা কেন মানুষ’, ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না’, ‘রাজনীতি’, ‘পাঠক,অক্ষরগুলি’, ‘সঙ্গহীন যাত্রা’, ‘আমার বংশধররা’, ‘আমি কেরর না অসুর’...)

.......আমি আমার জন্যে নতজানু হইনা, আমি চাই উন্মোচন

আমি প্রকৃতির মধ্যে যেন নিরপরাধ এবং শান্তভাবে

বিচরন করতে  পারি.....

ক্ষতসত্রের দাগ দিয়ে ঘিরে রাখা সত্তরের দশক।কেউ বলবে গ্রাম দিয়ে শহরকে মুড়ে রাখার কথা আবার কেউ বুর্জোয়াবিকল্প সমাজ সচেতনারই অগ্নিভ উত্তরাধিকার বহনের কথা শোনাবে। আসলে সত্তরের দশক বেশ খানিকটা অমীমাংসিত , বেশ খানিক বিবিক্ত। অথচ দশকের বোধিবৃক্ষ্মমূলের কোথাও লুকিয়ে রাখা নেই শম্ভু রক্ষিতের মত মহাসময় নিয়ে মূলধারার বাইরে থেকে যাওয়া কবির জন্মছক। তাঁর একটা সাদাকালো পাহাড়ের গড় রয়েছে, রয়েছে গুটিয়ে থাকা ফুসফুস আর ঝুনঝুনি নাড়া বৃক্ষের উপবাসী চোখ, যা নিয়ে তিনি হেঁটে যান কবিতাপোড়া ছাইয়ের সাম্রাজ্য ধরে; তাঁর জীবন –জিজ্ঞাসা- কবিকৃতি সবই বোধহয় প্রকৃত অর্থে স্বরচিত,স্বতন্ত্র্য, যেখান থেকে তাঁর খেদ করার কিছু নেই আর যেখানে দাঁড়িয়ে দিশাহারা গ্যালাক্সির দিকে মুখোশমিছিলের দিকে শ্লেষ ছুঁড়ে দিয়ে তিনিই বলতে পারেন-“আমরা সকলেই পরীক্ষা দিতে বসেছি, খাতা জমা রেখে যেতে হবে।মহাকাল কাকে কত  নম্বর দেবে তার ওপরেই  নির্ভর করছে কবি ও কবিতার ভবিষ্যৎ। খাতা জমা দিয়ে চলে যাবো। চল্লিশ পঞ্চাশ বছর পর খাতাগুলো দেখা হবে, যদি কিছু সারবস্তু থাকে , পাশ করবেন- নাহলে গোল্লা!!”……শম্ভু রক্ষিত মানেই কাঁধে ভারী ঝোলা ব্যাগ, লিকলিকে চেহারার নিম্নবিত্ত নাবিকটি যাঁর ঠাঁই নেই প্রায় কোন কবিতা সংকলনেই, যিনি অপাংক্তেয় প্রায় প্রতিটি কবিতাবাসরে অথচ কবিতার দুর্যোগে নক্ষত্রসন্ধানী তিনি, উল্কার মত নৈঃশব্দের উৎস অবধি তাঁর জগৎ তাঁর ঐশ্বর্য। চাপরাশী বাংলা কবিতায় এর থেকে বেশি কিইবা আশা করতে পারে বিশুদ্ধপ্রীতি বাংলা কবিতা? সঠিক অর্থে বলতে গেলে শম্ভু রক্ষিত তাঁর প্রথম কাব্যগ্রন্থ ‘প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না(১৯৭১)’‘ থেকেই সাজিয়েছেন তাঁর নিজস্ব এক দূরত্বের ধারনা, এক অননুকরনীয় ভাষা, আত্মভেদী শব্দকোষ যা চিরমুক্ত প্রবাহ থেকে প্রবাহমানে , আরম্ভ থেকে সে চলেছে নতুন আরম্ভের দিকে, অহংকারের দিকে। তাঁর ভাষা নিরাকার, দর্শন থেকে শুরু করে মহীলতার পরাবাস্তববাদ –গভীরতায় ঠাসা তাঁর কবিতাগাথা তাঁর কোলাহল তাঁর লবণমুক্ত তন্ময়তা। বাংলা কবিতার স্রোতের বিপক্ষে তিরিশ দশক ধরে গড়ে  তোলা তাঁর ঘর-মাটি-আলো-জল যা তাকে সারস্বতের গুনগ্রাহীতা নয় বরং শিখিয়েছে বিশুদ্ধ কবির জনক হিসেবে নিজেকে অতিনিপুনভাবে প্রবী্ন করে তোলা। দারিদ্র্য,যন্ত্রনায় কাহিল হয়েও তিনি ‘ব্লুজ’ বা ‘মহাপৃথিবী’র মত সমান্তরাল পত্রিকার  সম্পাদনা করেছেন ; কলেজ স্ট্রীটে দেখা হলেই অবাক  লাগত মেদিনীপুরের বিরিঞ্চিবেড়িয়া থেকে মানুষটা হাতে করে মহাপৃথিবীর প্রূফ নিয়ে হাজির ,এত অদম্য কবিতাপ্রীতি বোধহয় সামান্য কবির ভেতর সুসজ্জিত মৌলিকতা না থাকলে সম্ভব নয়। কবি এখানে পরিচিতির বাইরে, প্রাসঙ্গিকের বাইরে , তবু তিনি সমস্ততায় তবু তিনি লিপিত নতুনের প্রতিদিনে। পার্থিব অল্পতার ভেতরেও শম্ভু রক্ষিতের মত কবিই হয়ত তাই বলতে পারেন-“রূপ ঐশ্বর্যের তৃণগুলি নিয়ে এসো ও বশীভূত হাড়/লৌকিক সৌন্দর্য আমাদের অনেক আছে”……………।।

প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না(২৭)

হৃদরোগের সন্ধান নিয়ে ঢুকে পড়ো। সরবরাহকারী নির্মাণযন্ত্র

পৃথিবীর মেঘময় আতঙ্ক শেষপর্যন্ত আধার হিসেবে।

ঊর্ধ্বময় সর্বনাশ ভেবে স্নায়ুতন্ত্রের কাজ। সুরক্ষিত জল

দহনক্রিয়া মাথার ধ্মনী ছিঁড়ে যাও, বোতল, বায়ুর কাঠিন্য অনুশীলন শরীর

অরণ্যসমগ্র, পাখিদের শ্রবণশক্তি, আঙুরসমস্যা শজ নয়

উজ্জ্বল মাথার পর্যবেক্ষণ ভেঙ্গে অবসাদ্গ্রস্ত উচ্চগ্রামের অংশে

প্রমানিত হি, অন্ধ দৈবজ্ঞ, সৌরশক্তি,প্রশান্তি যেন আওয়াজ বিক্রি

টিন-ভর্তি কুয়াশা নিয়ে মানুষ-জীবজন্তুর মাথা হয়ে হাতজোড় করি

বসো গৌরবসূর্য, অদ্ভুত ভূত-প্রেত বিশ্বাস সে-বিষয়ে সচেতন

পৃথিবীর মেঘ, শিষ,দৃষ্টিনির্ভর আস্বাদনের ফসল রহস্যের মিশ্রণ চেওনা

অতুল ঘনরাশি ও উরসুলা কিয়দংশের লাল রং লেগে আছে দুর্যোগমথিত

এলাকায়; তোমার কোনো অলৌকিক পরিক্রমা নেই। শুধু ফুলবাগিচার

ও জল বায়ু কুয়াশার অংশ লক্ষনীয়, সাড়া দাও । রূপকের মত বিবরণ, দৈববানী

সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন প্রমানিত হয়েযায়; শরীরের ভিতর বেশী, নিশ্চিত প্রমাণ এই

গবেষণা শক্তি, কেন-না, এখাএন এই উক্ত সত্যি স্বর্ণময় হয়-আবিস্কার

রং তুলি বিপদের হূঁশিয়ারী রূপকর্ম হয় ও যেন আদানপ্রদান

তোমার সহানুভূতিশীল হৃদয়টি আমার চাই...

যুত-যৌগ-তন্ত্র

আমার স্বরযন্ত্রের ঠিক নিচের থেকে গঠনকারী ক্ষীণ মূল শ্বাসনালী

আমার হৃদপিন্ডের মুখে নেমে এসে অণুস্তরে পৃথক দুই ক্লোমশাখায়

গঠনাকৃতি নিয়েছে

আমার নরম হাল্কা ক্লোমশাখা-দুটি ডাইনে বাঁয়ে এগিয়ে

তড়িৎধর্মী শাখা প্রশাখায় ভাগ হয়ে

আমার দুই ফুসফুসের দুই দিকে ঢুকে

আমার শরীরের নানাস্থানে ধর্মোদেশ দিয়ে বেড়াচ্ছে;

তারা আমার মূল শ্বাসনালীর মতো উত্তেজনাপূর্ণ-ফাঁপা রয়েছে

আমার স্থিতিস্থাপক তন্তু দিয়ে আমার সরু সরু নলগুলো তৈরী

তাদের আজ মাইক্রোস্কোপ যন্ত্রের সাহায্যে আমাকে দেখতে হচ্ছে

খুব কঠিন দেখালেও এরা হাড়ের তৈরী নয়

এগুলি কচকচে ধরনের একরকম উপাস্থি দিয়ে তৈরি

আর তারা এস-পি-ডি-এফ উপাস্থি দিয়ে গঠিত

তাদের নির্দিষ্ট আকার আছে

আর তারা কেলাসাকার বা বর্তুলাকার

আমার পাতলা মাংসপেশী কখনো চুপসে যাচ্ছে না

কেননা আমার শ্বাসনালীর প্রশাখা আমার ফুসফুসের থেকে

অনেক দূরেই রয়েছে

আমার ফুসফুসের বায়ুকোষ পর্যায়ক্রমে একবার করে

চুপসে গিয়ে বায়ুশূন্য হচ্ছে

আবার ফুলে উঠে দিব্যি ব্রম্ভ্যবিদ্যা শিখছে

আমার সুক্ষ্ম সুক্ষ্ম ব্রংকলগুলি যদি সংখ্যা গণনা করা যায়

তাহলে প্রত্যেক দিকে সংখ্যা হবে আড়াই কোটি

আর বায়ুকোষের যুক্ত ইনফণ্ডিবুলামের সংখ্যা গণনা করলে হবে

প্রায় চল্লিশ কোটির বেশী

আমার স্বরযন্ত্রের বাক্সের মধ্যেই দুই পাশ থেকে দুটি ঝিল্লির পর্দা

আড়াল টানা আছে

তার মাঝখানে একটু ফাঁক

বলা বাহুল্য আমার স্বরযন্ত্রের বাক্সটি বা আমার ভোকাল কার্ডের পর্দাগুলি

রৌপ্যবৃক্ষের আকারে সরুমোটা হয়ে অবস্থান করে

আমাকে চিহ্নিত করছে...

সেই ঘাসওয়ালা

সেই ঘাসওয়ালা

তার ভাষায়, ‘ঠিকমত কালো, পাতলা’

‘বুজুকুশাস’

জীবানু গজাবার উপায় খুঁজছিল

সেই ঘাসওয়ালা

তিনপায়ে দ্রুত ছুট লাগিয়ে

ভূঁই-এর প্রায় অর্ধেকটা খেয়ে ফেলেছিল

বিস্ময় ০০০ তার দেহ থেকে গজাচ্ছে

তিনটি অপ্রতিহত দ্গদগে লালচে মাথা

সংলাপঃ নিয়তির বচনের সঙ্গে জ্বলতে থাকছে

পদহীন শিশু

ভিখিরি ও মাছির তাড়া খেয়ে

কখনো ছুটে

ঘন ঘিঞ্চি বাড়ির ভেতর ঢুকে পড়ছে

কখনও আওড়াচ্ছে;

আলাউকম আবশো আমহারাঞ্চা আউকাল্লে

সেই ঘাসওয়ালা

আর হাতির শূঁড় যাদের গলায়

যাদের কাছে শিলমোহরের কোন গরু নেই

তাঁবুর আচ্ছাদন বিছিয়ে

তাদের জন্য ছায়ায় আশ্রয় তৈরী করছে

সেই ঘাসওয়ালা

সেই ঘাসওয়ালা

টুকরো টুকরো মেঘেদের ভর করে মরিয়া রহস্যে ফুলছে

ষাঁড়ের চামড়ায় তৈরী শাদা ঢাল নিয়ে

অনেক জলাশয়কে ঘিরে ধরছে

চিন্তন

আমি ভেবেছি আমাকে ঘরের দেওয়ালে বিভিন্নভাবে

স্থাপন করে বৈচিত্র্য সৃষ্টি করব।

আমি আজ নিরস্ত্র, অযুগ্ম, ত্বরমাণ।

আমি আমাকে আত্মসাৎ ও আক্রমন করি

দ্বিধাহীন ভাবে সমস্ত কিছু প্রকাশ করে দেখাই

আমি আমাকে থামিয়ে রাখি, অপরিবর্ত আকার তৈরি করি

আমি আমাকে দেবতার, পর্বতমালার

বা জড়পিন্ডের  ঋজুরেখা তৈরি করতে কখনো দেখিনি

ধ্রুব বিশ্লেষণ ও স্থির বিষয়বস্তুতে আমি ক্লান্ত।

আমি বস্তুতে আমাকে দেখছি না

আমার হাতের একটা ছোট পেরেক সেই আমাকে দেখে যাচ্ছে

আমার ভেতর  হালের কলাকৌশলের দেদার অনুপ্রবেশ ঘটেছে

অসংখ্য বিশ্বাস, সূর্যের যোজনা, অকৃত্রিম অস্তিত্ব, আলজিঘন কালচে পাথর

বড়বেশী অর্থবহ ছবি, মধুর বিহ্বল কারুকার্য সচেতন হয়ে আমরা মধ্যে আসছে

প্রয়োজনের চেয়েও বেশি বৈচিত্র্যসৃষ্টি করা উদাহরন

বৃত্তাকার গতিশীল পাহাড়

আমি চিন্তা ও নিষ্ঠার শুদ্ধ পার্থক্য দেখাই স্বচ্ছ পাথরে

উত্তর হতে দক্ষিনের অভিযোগো নিবদ্ধ করি

প্রতিরূপমূর্তি আমাকে দেখে ফেলে

ও মুখোমুখি কাষ্ঠখণ্ড

আমি লাল রঙ পরিমিতভাবে সূর্যকিরনের মত সারা দেশে ছড়িয়ে দিয়েছি

শঙ্কুর মত ধূসর ছাইরঙের কিছু গ্রাম,কিছু শহর দেখা যাচ্ছে

গড়িয়ে পড়ছে রঙিন ঘাসের ঘোড়া

আমি জীবন্ত আগ্নেয়গিরি-অনুসন্ধানযানের ওপর শুয়ে প্রতিধ্বনি খুঁজছি । 

   

পুনরাবৃত্তি

চারপাশের রিক্ত হৃদয় চিৎকার করে এসে দাঁড়াল গোচারনভূমির উপরে।

প্রত্যেকবার আমার পাশ বেয়ে প্রদর্শিতমুখ অভিশপ্তের উন্মুক্ত প্রার্থনার মত

বিবস্বানের নির্দেশে স্বতন্ত্রভূমি তৈরি করল ।

এক শ্বেত কুষ্ঠরোগিনী শতছিন্ন পোশাকের তলায় হাত ঢুকিয়ে আমার শরীরে

উচ্ছ্বাসের সংলাপ ঢালছিল। তার বৈশিষ্ট্য সমর্পিত, পরিপূর্ণ এবং তার

প্রশ্নকটি আমার কাঁধের ওপর হয়ে দিনের উষায় জঠরাগ্নি নামাচ্ছে।

পিতলের বাতিদানের চিহ্ন ধরে এসে গান গেয়ে ক্লোম জাগল।

মিশ্রিত ধ্বনি অবলীলাক্রমে এক একজন নৃত্যাঙ্গনা নোংরা আর উকুনভর্তি

নারীর মেঘবেশ্ম শাড়ির  ছোট ছোট ঘোড়াদের ওপর পশুর গলা বানিয়ে ফেলল।

সবই বেসুরো। অপরিণত । স্বচ্ছন্দ ।

তিনজন আবকার আমার ঘরের মেঝেয় বসে হিজিবিজি বানাচ্ছে।

সামান্য আগে জানলাম। আমি তখনো আমার হয়ে ওঠেনি। নির্দিষ্ট।

মৃতদের বিস্ময়কর শক্তি দেখে আমার ভীষন রোষ হলো। আমি রাসায়নিক

তন্তুর কাছে অনেকদিন কাউকে গলে যেতে দেখলাম না। কোন মানুষ

ছায়া হতে পরিবর্তন এল। অপিঙ্গল বাতাসকে আমি কি করে

সম্বোধন করব!আমার আপশোস থাকল।

সুখের ক্ষীণ শব্দের মধ্যে আমার চাবুক এবং

 চিরন্তন যেন জাহানের চিত্রের ঘাড় বেঁকিয়ে রূপান্তরিত। আধুনিক ।

অনেকেই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। সহগামিনীরা বেগবান জলোচ্ছ্বাসের মত

এগিয়ে এল। ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে নাচতে লাগল। আর প্রত্নতত্ত্ব ভূতত্ত্ব ও

আবহাওয়া বিজ্ঞানীদের শাসন করে আমার মুখের দিকে চেয়ে রইল।

আমার শূন্য যন্ত্রনা। আমার অজ্ঞেয় হৃদয়ে ধারনার আইনঘড়ি । প্রতিজ্ঞাবদ্ধ।

তাদের নিরুদ্দেশ যাত্রায় ষাঁড়ের ও মেষশিশুর অবসর।

সবই নির্ব্যাজ নিকুঞ্জের বাইরে এসে পড়ল। দেখল মাটির ওপর

বিচ্ছিন্নতার ভেতর আমি পরিপূর্ণতা জুড়ে রয়েছি। আমার অভিসন্তাপ মুখ

দেখা যায়নি। আমার উদ্ধ্বত মুখ, শুদ্ধ, উন্মুক্ত, অভ্যর্হিত ।

এফিডেবিট

আজ আমার বরাদ্দ একটা প্লেটে শক্ত রুটি আর অদ্ভুত পাঁউরুটি আর গরুর

ও শূকরের মাংস আর সালতি আর চা কফি আজ সি~বি~আই এর খবরদারির

মধ্যে আছি আজ কাঠের খটাং খটাং শব্দ-করা ডি এফ লিফটে চড়ে নতলার

ঘরে এসে আমি পৌঁছেচি আজ প্রেসিডেন্ট নেলসন ম্যান্ডেলাকে দেখা গেছে

মোজাম্বিকের আদি প্রেসিডেন্ট সামোরা ম্যাচেলের ঘরনী গ্রাকা ম্যাচেলের

সঙ্গে আজ কলকাতার অফিস পাড়ায় একটি বেসরকারী লকার কোম্পানীর

মালিকদের এক শরিক কোম্পানির ন-হাজার গ্রাহকের ভল্টের চাবি পকেটে

নিয়ে বিদেশে যাওয়ায় আমার এক আত্মীয় চূড়ান্ত সংকটে পড়েছে আজ

কলকাতার মুক্তারামবাবু স্ট্রীটের মল্লিকবাড়ি থেকে একটি শোভাযাত্রা বের হবে

তাতে পালকি ঘোড়ার গাড়ি পুরনো দিনের গাড়ি থাকবে শোভাযাত্রা শেষ

হবে আলমগীরের পৌত্র ওসমানের সমাধিস্থলে আজ প্রয়াগে একটি সতীদাহের

ব্যবস্থা করা হয়েছিল আজ মুম্বাইয়ের স্টেট ব্যাঙ্কের ডেপুট ম্যানেজিং

ডিরেক্টরকে সময় দিয়েছে এনফোর্সমেন্ট ডিরেক্টরেট ভারতীয় হকি কি আজ

আটলান্টা থেকে হীরে নিয়ে আসবে আজ মনসার গান আজ মুজরিম হাজির

আজ এ মাউথফুল অব স্কাই আজ পঞ্চায়েত সমিতির ভোট আজ মাওয়ের

মৃত্যুবার্ষিকী হংকঙে কিংবা বেজিঙে অর্ধশত বেদনা রাখার অঙ্গীকার আজ

কোনও কোনও অঞ্চলে দু এক পশলা বৃষ্টি অথবা ব্জ্রবিদ্যুৎ বা বন্যাসহবৃষ্টি

হবেই আজ থেকে পর্যটনকর শেয়ার বিক্রির নতুন নিয়ম রিজার্ভ ব্যাঙ্কের আজ

শিক্ষক অধ্যাপক সরকারী কর্মচারীদের বেতন আটকানোর প্রস্তাব আজ থেকে

বাংলাদেশী মোটর ব্যাটারি সংস্থা ভারতে বিক্রী করবে কলোনেল মোটর

পাটশিল্পে সংরক্ষন বজায় রাখার আজ আর্জি এন জ়ে এস সি কর্তার আজ

ভারতকে ১৩৫০ কোটি ডলার সরকারী ঋন দেবে আমার শ্বশুরকূলাজ

পানাগড়ের বাজারে ভীষন ক্রিয়াহীন কালিমূর্তির তাণ্ডব আজ শুটিং শুরু

হয়েছে সাধ আহ্লাদের আজ হ্রাদকানির সুবিশাল ভাক্লাভ হাভেলের ইন্ডিয়া

দর্শন আজ দেবোত্তর সম্পত্তি আইনের ৩৫ ধারা লঙ্ঘন করেছে স্বামী

নিশ্চলানন্দ সরস্বতী জলদাপাড়া অভয়ারণ্যে অ্যানফ্রাক্স রোগের মহামারী

ঠেকানো সম্ভব হয়েছে বলে বনমন্ত্রী আজ দাবি করেছে আজ থেকেই তো

বাংলার বঙ্গীয় হাঙামা শুরু হয় আমার মাতৃকুল আজ অভিবাদন সম্পর্কে

নতুন আইনকানুন ঘোষনা করে আমি কী কাজ করি আজ অবশ্য সি বি

আই বা পিতৃকূল জানতে পারেনি আজ আমি আমার উদ্ভট নাটকের চরিত্র

বিশেষ আজ আমার বরাদ্দ একটা প্লেটে শক্ত  রুটি আর অদ্ভুত পাঁউরুটি আর

মুক্তিবাদ

যারা আমাকে ডিগডিগে

আমার রুহকে যুদ্ধের হিরো

আমার ঈশ্বরকে অনিষ্টজনক

আমার কবিতাকে

চাকচিক্যময় আভিজাত্য বা বিক্ষিপ্ত প্রলাপ মনে করে

আহ ভাইরে

তারা বাণিজ্যের অযথার্থ ক্ষমতা দিয়ে

তাদের নাক মুখ কান দখল করে

এই শক্তিশালী প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্রের

অস্তিত্ব রক্ষা করুক

যারা বালি ফুঁড়ে

আমাকে বাল্যপাঠ শেখাচ্ছে

আহ ভাইরে

তারা মেকি সুন্দরের মিথ্যে সীমারেখা প্রত্যাখ্যান করে

অন্তত্ব একটা ছোটখাটো দেবদূতের সন্ধান করুক

অকেজো জ্যুকবক্সে স্থির ডিস্ক

জীবনের আর ভাঙা ইঁটের

অশুভ যুদ্ধপরা যন্ত্রনায় আন্তর্জাতিক কোরাস

আহ ভাইরে

কবরখানা আর টাউনশিপের সুড়ঙ্গের মধ্যে গুঞ্জন করা

আস্তাবলের ধূর্ত পিটপিটে মায়া

মধ্যে মধ্যে ফ্যাঁকড়া

আহ ভাইরে

কাঁধে অগ্নিবর্ণের ক্যামেরা

হাতে অ্যান্টি-এয়ারক্রাফট ট্রানজিস্টর

অন্য সম্রাটের দায় যাতে মেটে

মাংস ভেদ করে সচল ফ্রেস্কোর মত

এইসব রেডিয়ো-টিভি-অ্যাকটিভ যুবশক্তি

মুক্তিবাদ এবং জাঁকজমক খুঁড়ে নৈশস্তব্ধতা

আহ  ভাইরে

সাক্ষ্য

আমার অস্তিত্বের কেন একটা অজ্ঞাত উদ্দেশ্য আছে-আমি জানি না

আমার তুষারশুভ্র হাত আমাকে এগিয়ে দিয়ে

               নিজেকে ফুটকি রঙের সাহায্যে প্রকাশ করে

আমি থাকি তার যন্ত্রপাতির ও তার রত্নভরা শরীরের টূকরো টাকরার মাঝে

নির্দিষ্ট আমি, অদ্বিতীয় শান্ত, মানুষকে বোঝাই দর্শনীয়ভাবে উর্ধ্বে যেতে ও

নীলরঙের সন্ধ্যায় ছদ্মবেশে ঘুরি এক জাজ্জ্বল্যমান মূহূর্তকে প্রতিষ্ঠা

করার জন্যে আমার ঘৃষ্ট স্বরঃ আমি নগরের কোথা থেকে আসছি?

আমাকে কি ঈশ্বরের নিঃসঙ্গতার উপায়সমূহ উপহার দেওয়া যায়? আমার

শীতল স্থাপত্য কাঠামো সম্পর্কে কি কিছু করা উচিত? আমি মাথা নাড়ি

আমার মনঃসংযোগ অস্থিচূর্ণিত বামনমূর্তির

বেশে নয়। শিকারী পাখির বেশে।

আমি প্রতীক্ষা করি। আমি সর্বদাই আক্রমন থেকে আত্মরক্ষায় বিস্তৃত

সবুজ টুপির তলায় আমি মোহিনী দৃশ্য এনে বসাই

ভাঙা ভাঙা গোঙানি নিয়ে তাকিয়ে থাকি। আমি স্বীকার করি-

আমি হচ্ছি সেই ধরনের মানুষ যে শুধুমাত্র আবর্জনা দিয়ে যায় না

আমি নদীর উজানে গিয়ে নিজের প্রতিবিম্ব দেখে নিই।

আমি ঊষার অস্পষ্ট আলোতে নিজেকে বিশ্লেষন করি

আমি বিস্ময়কর সব আভরণ ছাড়িয়ে কাজে নামি

আমি সিদ্ধান্ত নিই যে আলো আমি সৃষ্টি করি তা হারিয়ে যায় আমি

হিমঘাসে বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছি, সকলের সামনে কেঁচোর মত গুটিয়ে যাচ্ছি

বস্তুত শতাব্দীর মৃত আত্মারা উপুড় হয়ে ঝুঁকে পড়ে

হাড়ে হাড়ে ঠাণ্ডা অনুভব। উঁহু, ও হো

আমি বৃক্ষের সোনালী গুঁড়ি দিয়ে নিজেকে রূপান্তরিত করি।আমি

বাস্তবিক ভয়ংকর। গলা আমার আচ্ছাদিত গন্ধক ও ক্লোরিনের ওড়নায়

তবু আগুন যত্ বেড়ে ওঠে আমিও লুকোতে থাকি

আমি ব্যাখ্যেয় হেসে পথচলতি লোকের সামনে দুহাত তুলে ধরি

শেষে তাদের মিলিয়ে দিই গিঁট বেঁধে

শেষতম কলস্বর আমায় ঠেলতে থাকে।আমার প্রাচীন এই কোলাহলে

সৃষ্টির  পরিসরের জড়তা কেটে গিয়ে

                    অনুপস্থিত লোকেদের ছায়া এসে পড়বে

আমি সেই রং পবিত্র গন্ধ যার ভেতর টলে যায়

আমি সেই ক্ষুদে সূর্য, আমার দুটো ডাকের মধ্যে একটা কথা লা হয়ে যায়

আমি আমার পান্ডুবর্ণ কানাঘুষার কার্পেট পাতা রাস্তায়

                    আমার ভবিষ্যৎটাকে ফাটতে দেখেছি…

সার্টিফিকেটের  পাঠ

আমার যে ভাই চায়না সার্টিনের একটা লম্বা আলখাল্লা পড়ত

এবং এক নির্দিষ্ট  জায়গায় আমাকে খুব জমকের সঙ্গে সম্বধর্না জানাত

সে আগুনে পুড়ে গিয়ে মারা গিয়েছে।

আর আমার যে বন্ধু  অস্ত্রোপচার বিদ্যায় ছিল অত্যন্ত কুশলী

এবং যে তরবারি ও তীরপূর্ণ তূনীর নিয়ে ঘোড়ায় চড়ে

সূর্যকে নিয়ে আসার  চেষ্টা করেছিল

সে হাজতে পচে শেষে আত্মহত্যা করেছে

আমি বস্তুতঃ এখনও মারা যাইনি

এবং আমার মতলবের কথা ঘুণাক্ষরেও কারও কাছে প্রকাশ করিনি

কারণ এটা প্রকাশ করার মত কথা নয়।

ওদের দ্গদগে লালচে হাত

(থেমে) ওদের আমি ফুলগুলো দিতে চাইনি

অবোধ শিশুগুলি খেলায় মেতেছে

(থেমে) দুঃখের বিষয় ওরা আদেশ মানে না।

ওরা নগ্ন হয়ে যথেচ্ছ যৌনক্রিয়াকলাপ প্রদর্শন করছে

(থেমে) বিপ্লব থেকে মানুষের  মনকে ওরা দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবার পক্ষে

ওদের সবচেয়ে কার্যকারী অস্ত্র

ওরা বাগানে মগ্ন গাছ  পুঁতে দিচ্ছে

(থেমে)  আমার বাগানের  গোলাপগাছগুলোর চোখে প্রবীণদের দৃষ্টি ।

প্রিয় ধ্বনির জন্য কান্না(৯৬)

ওখানে বাণিজ্য-জাহাজরা নোঙর ফেলে। দরিদ্র এক মানুষ ভগ্নস্তুপ দেখে

সর্বপ্রাচীন বাড়ি ধ্বংস হয়ে আসে। সুস্থ করে গাছের পাতা

অন্ধপ্রথাগুলি দাবি জানায়। মানুষজাতি পরিশ্রান্ত স্বপ্নচারী প্রাস্তর

বা জলরাশি অগ্নিময় হৃদয়ের পারে নেমে আসে। মেঘের শুকনো আনাগোনা

বিদ্যুতের সিরসিরানির সঙ্গে অন্তরীক্ষের শেষ খেলা দূরে সরে যায়

কৃষ্ণবর্ণ অরণ্যের অন্তরালে ঘ্রাণময় হ্রদে আমার হৃদয় স্বপ্নে মুগ্ধ হয়

জরা-মৃত্যুর পাশে ভিড় করা গাছের মধ্যে  উন্মুক্ত উদার সূর্যালোক এসে দাঁড়ায়

বৃক্ষের  প্রত্যঙ্গ নড়ে এবং মৃদু হয়ে ভাসে বিষন্নতা

আমার স্মৃতি নেই, আমি বিদ্বেষ কলহের অন্তঃসার বুকে নিয়ে বৃদ্ধ হয়ে আছি

আজ দেখি, অসংখ্য হিমাদ্রি-মৃত্যুভয়গুলি একদিন দুহাত দিয়ে বেঁধেছিল আমায়

আমায় ধরে থাকে অনন্ত সুচিরমৃত  শোভনপৃথিবী

আমার একাকীপাখি আমার  মধ্যে বিশ্রাম রাখে চিরকাল

মেঘে মাস্তুলে চিহ্নিত একটি সান্ধ্য আকাশ, জলে সূর্যাস্তের আভা

ত্রিশ কোটি অসহায় ছেলের কাছে বসে ক্ষমা চাই

হে জনচিহ্নহীন,দিশাহীন ছড়ানো-যৌগিক পরাজয়

স্বর্ণধরনীর মধ্যে সবুজের বৈষম্য হয়ে আসা দেখি

মধুর  জীবিত শীত নিয়ে যে-লোকটা গুঁড়ি মেরে আসছে

ও এখানে  দাঁড়িয়ে নেই

ওকে চিরমুক্ত  সৃজনব্রতে নামতে দাও

ভূগর্ভের পাথর খুঁড়ে-ও একবার তাপময় নির্জনতা গ্রাস করেছিল

-----------------
------------------

হারানো কবিতাগুলো : রমিতের জানালায়

বাক্ বাংলা কবিতার প্রথম ব্লগজিন ... বাক্ বাংলা কবিতার মুক্ত অবস্থান ... বাজারের বাইরে প্রতিভা ও প্রভার সন্ধান তার ঘোষিত ব্রত ... পাঠ্য এবং অপাঠ্যর মধ্যবর্তীটি ছাড়া কোনো ভেদরেখাই মান্য নয় ... বাংলা কবিতার নবীনতম এই শতাব্দীর কবি যাঁরা ... কথা বলুন 8436419575 , লেখা পাঠান : anupam_gtl@yahoo.co.in এবং konnagar : ghatal : paschim medinipur 721212, west bengal, India

64Th pOsT : তন্ময় দত্ত

........তন্ময় দত্ত.......

......যদি কেউ শিউরে বা দয়ায় ভিক্ষা দেয় শরীর পেতে

ভিক্ষা নেব, বোধ নেবনা । এমনি, যতদিন না আমার রক্ত

ফুরোয় কিম্বা তুমিই বিষিয়ে মরো আমার আবশ্যিক লালায়……

১৯৬৪। ১০ই জুন। IO W A সিটি থেকে কবি গদ্যকার সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের সেই চিঠি। লিখলেন হাংরী আন্দোলনের উদ্দেশ্যে যা গ্রহন-বর্জনের প্রশ্ন আপেক্ষিক কিন্তু এ চিঠির আপ্তকথাতেই থেকে গেল খসে পড়া এক কবির নির্বিকার সংরক্ষন ,‘আমার চেয়ে কমবয়েসীদের মধ্যে একমাত্র তন্ময় দও এসেছিল বাংলা  কবিতায় তলোয়ার হাতে, আমার চেয়ে অন্তত ছ বছরের  ছোটো, জীবনানন্দের পর এত শক্তিশালী কবি এদেশে আর কেউ আসেনি, প্রচণ্ড অভিমান করে চলে গেছে। সে জন্য এখনও আমি অপরের হয়ে অনুতাপ করি।` …কে এই তন্ময় দত্ত ! বাংলা কবিতা জানে না।জানাতেও পারে না। কারন বাংলা কবিতা নিয়ন্ত্রিত মানুষের, যেখানে ইম্প্রেশনিজমের নিয়মে কবি ও কবিতার মূল্যায়ন সেখানে তন্ময় দত্তের মত শিকড় সম্পৃক্ত বিশুদ্ধতা যে কেবল বিদীর্ন উদাসীনতার কিছু ছায়ামুখ হয়ে যাবে সেটাই স্বাভাবিক। 

আশ্চর্যভাবে তাঁর নিরুদ্দেশ যাত্রার না কোনো হদিশ করেছে বাংলা সাহিত্য জগত না গত ষাট বছরে এই শীর্ণ সন্ন্যাসীর অতিরিক্ত অন্ধকারে আলো খুঁজতে বেরিয়েছে বাঙালী পাঠককূল। তিনি চলে গেছেন পরিভাষাহীন,  সত্যিকারের কবিতার দিকে । স্বাভাবিক ভাবেই তার কবিতার বিরাট ভাণ্ডার বলে কিছু নেই । অথচ ক্ষনস্থায়িত্বও যে প্রথম শিল্প হতে পারে , নির্বস্তুক আকরিক হতে পারে তা হয়ত তাঁর সমসাময়িক কৃত্তিবাসীরাই বলতে পারবেন , বলতে পারবেন সমসাময়িক ষাটের কবিরাই ; অভিমান ক্ষুধা নিয়ে সরে যাওয়া নাকি অমূর্তের ভেতর আবহমানকে তুচ্ছ করে আনন্দ খুঁজতে যাওয়া ! — কাব্যচর্চার শ্রুতি প্রতিশ্রুতির মাঝে এমন হাজারো ছাই হয়ে পড়ে আছে তন্ময় দত্ত নামের এক বিদ্রুপ এক আবিস্কার । কবিতা তো অনেকদূর গড়িয়ে যাবে , উৎকৃষ্টতার দিকে চলে যাবেন কবিও, কিন্তু নিরস্ত্র হয়ে আমরা একবারও কি মুখোমুখি হব তন্ময় দত্তের মত মোমগুলির মল্লিকাগুলির ! হয়ত ঝরে যাওয়ার ভয় অথবা গলে যাওয়ার,বাংলা কবিতার প্রকৃত সন্তানদের ছায়ায় প্রতিনিয়তই অল্প হেসে ঢুকে পড়ছি আমরা ।  প্রতিনিয়ত এক অলীক সান্দ্রতায় এক অমূর্ত দ্বন্দ্বে ।

ভাই অনাময় দত্তের অকাল প্রয়ানে শোকাস্তব্ধ তন্ময় দত্ত ‘মৃত্যু, তুমি গর্বিত হয়ো না` শিরোনামে লিখেছিলেন-‘একদল লেখেন সুন্দরের আকর্ষণে আর একদল সত্যের সাধনায়। সব কবিরই প্রায় লেখার উৎস দুঃখ, কিন্তু যিনি দ্বিতীয় দলের কবি তিনি নিরতিশয় দুঃখী। জগতে কদাচিৎ কোনো কোনো মহৎ কবি জন্মায় যিনি এই দুই ধারার সমন্ব্য় করেন, যেমন কখনও কখনও রবীন্দ্রনাথ-শেষ দিকের জীবনানন্দ, কিন্তু দ্বিতীয় দলের কবিদের মধ্যে যিনি এই সমন্বয় করতে অসমর্থ , তাঁকে আমার ধারনা ছিন্নভিন্ন হয়ে নীরবতার সাধনায় সরে যেতে হয়।` দু মিনিট হাঁটতে হাঁটতে তিনিও যেন চলে গেছেন শিরস্ত্রানহীন আজকের শীতে। কৃষ্ণপথ থেকে বেছে নিয়েছেন ছায়াম্লান কামড়, ফিরতে চাননি লোকালয়ে, শুভেচ্ছার দাগে। তাঁর কবিতা শুভকামনার নয়, অনাবিষ্কৃত অমূর্তের নয়।পীড়নের দ্বৈধের সমান্তরাল একটা অ্যালিউশকে অন্বিত করেছেন স্মৃতি স্বপ্ন সম্পর্কের বুরজ়ে। কলকন্ঠের বিপুল পরিধির থেকে বেরিয়ে এসে টুপি খুলে রেখেছেন বাবলাকাঁটার নিচে। শব্দে কোথাও ক্রন্দন  নেই অথচ কান্নার একটা বাড়ি আছে একটা লতিয়ে ওঠা মধ্যাহ্নতন্দ্রা আর বাদবাকিটুকু যেন তাকেই সূত্রায়িত করে ডেকে নিয়েছে বিকলাঙ্গ পাখির দিকে প্রচ্ছন্ন ফুলমালার দিকে। প্রবীন কবির মত তন্ময় দত্তের জ্ঞানের স্থৈর্য দেখার সৌভাগ্য হয়নি বাংলা কবিতার অথচ তাঁর স্বকৃত বিচ্ছিন্নতার ভেতরই পাঠককে নিয়ে মাধবানন্দের মত তিনি চলে গেলেন চিরকালের ছাড়াছাড়িতে। কবির কোন বেহেস্ত হয় না,ধর্মপথ হয় না, অলিন্দ দিয়ে কবি আসে আর নানায় দফায় জলবায়ু পেরিয়ে আমাদের নিয়ে চলে তার অশ্রুত নির্যাসে। কবি একটি ঘটনা;ঠিক যেমন বৃষ্টি পড়া রোদ ওঠার মত।তার সাথে আড়ি হয়না।সমস্ত কাদায় গাল রেখে শুয়ে থাকে তন্ময় দত্ত, কান্নার হাটে সঙ্কুচিত ডোম যে তিনি, শেষ মালাকার; তিনি ফেরার দরজা খুললেও তাঁর কাছে পাওনা রয়েই যাবে কবিরঙের অনিবার্য একটা থাকা …

আন্তর্জালে প্রথমবার ... বাকের উপহার ... তন্ময় দত্ত ।


 নাব্যতা

আমি তোমাকে কী অত্যন্ত ভালোবাসতাম এই কথা আজ বলতেও

ইচ্ছা করে না। কেননা এও শুধু অধিকার ব্যর্থতার কষ্ট ,তুমি যে ছিলে

শুধু তাই অচেতন বিমুগ্ধ হয়ে বুঝতে চাই, তুমি নিঃশেষে হেরেছ,

কোন অন্যায় সপ্তরথীর মার, আমি কার মুণ্ড কাটব, অন্যান্যদের

সাথে বৃহত্তম জুয়ায় জিতে অপ্রতিভ ঘুরছি; অথচ এই হারা জেতায়

আমি কখনো যাইনি, কেননা চেয়েছিলাম শ্রমের কার্যকারক পুরস্কার,

ঝড় আসতে পারে জেনেও আমার নৌকায় নিরালা পাল বেঁধেছিলাম

ঝড় না এলে কোথায় যেতাম, কার স্রোতে আজ আর বুঝি না,যেন   

ঘটলেও পারত,ঘটে  গেল।

শূন্যহাতে বসে আছি। এই যে বসে থাকা এই যে কষ্ট এও এক নতুন

নৌকো বাওয়া, হয়তো বন্যাস্রোতে, তবু নৌকো বাওয়া, আর ইচ্ছে

যায় না, হৃদয় আর অচেনা জল ভাঙতে চাই না আমি দুঃখী,  আমার

বড়ো কষ্ট,আমায় ক্ষমা করো একথা কাউকে বলা যায় না কেননা

আমার ভাগ্য কিংবা স্বভাব প্রবাহিত  পাহাড়গুলি অচলা হৃদয়ে পেতে

চায়, ছিন্ন হাতে শৃঙ্খলায় বাঁধতে চায়, বাঁধা যায় না জেনেও ,যেহুতু

জুয়া কার্যকারণ মানে না, হয়তো বাঁধা যায়, এই আতঙ্ক ও আশা

আমায় বুকে হাঁটায়;মুক্তি নেই এই কথাও মুক্ত করে না;

হৃদয়ের সব দরজা খুলি কি সব বন্ধ করে রাখি কিছুতে বুঝে পাইনা

কিসে সুবিধা হয়,নৌকা চলে।

 

খেলা

বেড়ালকে কখনো কোনায় নিয়ে ফেলিসনা, মা বলতেন,

ওরা মরিয়া হয়ে যায়। আমি তোমায় কোনায় নিয়ে গিয়েছিলাম,হৃদয়

এখন আমার কন্ঠনালী কামড়ে ঝুলছো, রক্তাপ্লুত, জীবন্ত,

একটি গলগণ্ডের মতো; এখন তোমায় নিয়ে লোকালয়ে ফিরি

কী-করে, তুমি আর বেড়াল নও, আমি আর মানুষ নই, দুই জনে

একটি রক্তময় যুগ্মতা। বেড়াল, আদুরে বেড়াল,

যদিও কষ্ট হচ্ছে, আমি জানি তুমি রাগ করোনি, তুমিও ভয়ে

কাঁপছো, এত ভালোবাসারই বিকার, তাই আমারো আর একটূও

ক্ষোভ নেই, যদিও কষ্ট হচ্ছে, খুব কষ্ট হচ্ছে, আমি  জানি

আমার ভুল কিছু হয়নি, কেননা মায়েরা সব বোঝেন না, তোমায় যদি

কিনারা অবধি না ঠেলে নিয়ে যাই, আমি কেমন করে

বুঝবো তুমি কখন ঝাঁপাবে, এখন সেই মূর্হুতটা স্পষ্ট

দেখতে পাচ্ছি, যার এ পারে আমার মুখ ও বিজয়ী হাসি, আরপারে

আমার গলায় ঝুলছে বেড়াল,ক্ষিপ্ত গলগণ্ড, রক্ত, বেড়াল।

জানিনা আর কখনো খেলার সুযোগ আসবে কিনা, ভিক্ষার ঝুলির

মতো হয়তো এখন গলায় বেড়াল গেঁথে ঘুরতে হবে, আমি ও উদাসীন

বেড়াল, দৃশ্যটা একটু অদ্ভুত তাই অপ্রতিভ

হয়ে আছি, কিন্তু আমিতো জানি আমার গলায় বেঁধা প্রতিটি দাঁত

নিরভিমান,অন্যমনস্ক, তাই রাগ বা ভয় নেই। যদি

কখনো তোমার ভয় কেটে যায়, বোঝো আমি কিছু মনে করিনি, আবার

মাটিতে নেমে আসো, এবার আমরা খুব সহজ কিন্তু

নিবিড় কোনো বোঝার মধ্যে থাকবো, আর যদি নাই নামো

যদি তোমার উত্তেজনা না যায়, আমরা  এমনি ঘুরবো, প্রতি মেলায়

যাবো, যদি কেউ শিউরে বা দয়ায় ভিক্ষা দেয় শরীর পেতে

ভিক্ষা নেব, বোধ নেবনা। এমনি, যতদিন না আমার রক্ত

ফুরোয় কিম্বা তুমিই বিষিয়ে মরো আমার আবশ্যিক লালায়।

রাত্রিতে

স্বপ্নেতে কে এসেছিল? ঘুম ভাঙলে দেখি

মুখ অশ্রুকলঙ্কিত হয়ে আছে। স্বপ্নে কেউ এসেছিল, যার

হাতের গভীর জলে হাত ডুবিয়ে বসেছিলাম? শুনেছি

স্বপ্নের হ্রদ দুলে উঠে এলানো বাগানবাড়ি দেখায়, যেখানে

হাসিগুলি যৌথ, দুঃখ কটি বিকলাঙ্গ পাখি

সেবায় হৃদয়গত বাগান বাগান নয়, আসলে প্রচ্ছন্ন ফুলমালা

যা মরে গেছে বা আজো ফোটেনি সব বুকে ধরে আছে; কুয়াশায়

জ্যোৎস্নায় বাইরে মুগ্ধ শোভা, কিন্নরেরা খেলা করে, শাদা

ফুল ঝরে যায়, সাপগুলি সুকুমার রমণে নিয়ত, হৃদয়েরা

সারি সারি পাখা ধোয় শান্ত হয়ে।

বৃষ্টিতে ভাসান হলে পর

গরীব খড়ের হাড় বুকে নিয়ে শুয়ে আছি। যে জাতকুমোর

তার হাত মুগ্ধ স্বেচ্ছাচারী যন্ত্র,হাওয়ায়, পঙ্খের দাগ, যাকে

ভালোবাসা, সে কোনো জটিল জলে চলে গেছে,ফেলে যাওয়া

  নীলিমায় কেন

হৃদয় হাঁসের মত অসাড় পড়ে থাকেনা, কেন ওড়াউড়ি, ব্যথা

কেন পরিশ্রম করে কাতর স্তম্ভিত চেনা দীনতায় , ঘুমে

কাকে যে কান্নায় গলা মেলায়, পাখা ঝাপটায়,কে সে প্রিয়কথা

যার নীহারিকাময়

মুখ দেখা যাবে না, বাঁশি শুনেছিলাম কি? রহস্যের বুক

থেকে উঠে এসে নিশি ডেকে যায় দুয়েকটি হৃদয়কে, তাদের কী শেখায়

এই অহেতুক নির্বাচন?

এখন কি জাগরনে আছি নাকি সম্মোহিত

চিরকাল কিছুতে বুঝিনা, এই নষ্ট অরাজক দৃশ্য একি স্বভাবের ঘুম?

মাঠ

কে তুমি ভেঙ্গে আছো ছিন্নলতার মতন, তুমি কার

বিধবা গো? ইচ্ছা হয় তোমাকে স্বান্তনা দিই,মুখ ফুটে

মিথ্যাগুলি বলি, আমি তোমাদের ভালোবাসি, তোমাদের

সমস্ত কাদায় আমি গাল রেখে শুয়ে আছি, কান্নার হাটের

সঙ্কুচিত ডোম আমি, শেষ মালাকার;

যতো হাত রাখি চুলে

যতো কান্নার ওঠানামা দেখি,মনে হয়,এমন গভীর কোনো মাঠ

আছে যেখানে পিঁপড়েগুলি পরস্পরকে চেনেনা,বা চেনে,

জন্ম সকলকেই অসম্ভব পরিশ্রমী করে রেখে গেছে,কিছুতেই

অজ্ঞান হওয়া যায় না। দল বেঁধে শিউলির বোঁটায়

পুতুল ছোপাতে খুব ব্যস্ত যারা দেখে এসেছিলাম

কিছু বুঝেছিলাম, তারাও

আকালে বিকল হয়ে আছে যেন, ওই সব মাঠের

চারিধারে মর পিঁপড়েগুলি অত্যন্ত যত্নের সাথে ফাঁকি

দিয়ে যেতে চায় মাঠের বুকের কোনো রহস্যকে, মৃত্যু কি?

ঠিক মৃত্যু না, আরো কোনো অদ্ভুত জ্যোৎস্না সব ভুল

যেন না করে দেয়, ভালোবাসা, ধাবমান যৌনতা, রক্তের

স্বস্তির লোভ, নেশাগ্রস্ত চাষী, যদি ক্ষেত ভরে অবান্তর ফল

কখনো বা ফলে, অন্যে এসে খেয়ে যাবে, বা খাবে না।

কান্নার

চরমপন্থিতাগুলি কী শেখায় তবে, আমি কী জানি চেষ্টার

মটকানো ঘাড় দেখে, ফুল তুলে হাজা হোলো, অথচ সে ফুলও

মানুষের মতো ভয় দেখায়, বিধবা গো, যে সাক্ষীগোপাল

নুপুরের শব্দ তুলে বলেছিল পিছে পিছে আসবে, তাকে কি

মুখ ফিরিয়ে অমূল দেখে নিতে চেয়ে ভুল করেছিলাম, যে লোভ

অনেক শিখিয়েছিল,সেই কি শত্রুতা করে গেল শেষবেলায়?

       স্বভাব

পরিশ্রম করায়, রহস্যের মাঠে মরা পিঁপড়েগুলি, জ্যোৎস্না পড়ে আছে।

যন্ত্রনা

কেন ভালোবাসলাম তাকে?

এত ব্যাথা তাও সয়ে, এত পথ হেঁটে

আমি কেন হারালাম আবার আমাকে।

আমি কেন হারালাম। আর তো আমরা কিছু নেই

যা ছিল সে নিয়ে গেছে সব

শান্তি কি পাব আমি সব হারালেই।

কোথায় পালাব আমি। এতকাল নিজেকেই খুঁজে

ক্লান্ত হলাম শুধু, কী পেয়েছি আমি।

কিছু নেই কিছু নেই ঘাসের সবুজে।


কেন আমি এলাম এখানে, আজকের এ কলকাতায়,

কাউকে চিনি না আমি, আমাকে চেনে না এরা কেউ

আমি যে একাই জ্বলি কী করুণ দারুণ জ্বালায়।

আমাকে লুন্ঠন করে এ কোথায় নিয়ে এল এরা

আমার কত যে ব্যথা, কিছুই বোঝে না, হায়, কেউ

এতদিনে জানলাম এ পৃথিবী জাল দিয়ে ঘেরা।

যাকে আমি চিনতাম কই সে তো থাকে না হেথায়

আমাকে বিকালো কে যে এখানের এই বুড়ো হাটে

কী আমার অপরাধ। কে আমাকে সঁপে দিল এ কলকাতায়।

শিল্পী

কাঁধেতে ফুলের ছাতা, শিল্পী চলে একা পথ দিয়ে

মুখ হয়তো দেখা যাবে অবিমৃষ্যকারী ভবিষ্যতে,

ততদিনে মুখ না; আপাতত ফুলের ছাতাই

শিল্পীর অদ্ভুত মুণ্ড, জন্মের রক্তের চেনা লোক

নিশ্চিত রয়েছে পাশে, কায়িক সংস্থান জানে, ঠিক,

ধড়, নাভি, লিঙ্গদেশ; ভালোবাসা করে চারিদিকে।

শিল্পী, তুমি কাহাদের? মাতা পিতা রয়েছে নিশ্চিত,

কখন ভিখারি হল, বড়ো দুঃস্থ হলদে আলো হাতের শরীরে,

কেউ মূর্খ কেউ ভালো একাকার পরিচিত জন;

রমনী লোভায়ও যদি, কৃশ লোভ শিল্প গড়ে গেলে

চরিতার্থ হয় কিছু? নাকি নিম্নে বীজের ভাণ্ডার,

প্রকৃতি যা দিয়ে দেহে পাঠিয়েছে সংসারে, দুয়ারে,

যাবে না অক্ষয় রাখা? দিতে হবে মাংসে কিংবা সাদা

গভীর কৃত্রিম করে? নিশ্চিত কি, হে চিরকুমার,

হয়েছে সৃষ্টির দায়ে? মাংসময় জন্ম এই, তবু

ঈশ্বরে হারায়ে যেন রেখে যাবে বিস্ময় মন্ডল,

যা বাড়ে অন্যের হাতে; সেই সন্তানের স্পৃহা; উত্তরাধিকার,

আমার দুঃখের গান, রাখা হয় কারো কারো কাছে,

যেন রেখে যেতে হয়, দায়িত্ব বর্তেছে যেন বড়।

(কবিতা সংগ্রহে বিশেষ ঋ স্বীকার ও ধন্যবাদ -কবি নীলাব্জ চক্রবর্তীকে)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি