নাক খোটার নেশা

নাক খোটার নেশা
( আগে পড়লেও, আবার পড়ুন , অনেক কিছু যোগ হয়েছে ) 

আমার এক বন্ধু ছিল অনি , প্রেসিডেন্সীতে অর্থনীতি পড়তো , এখন আইআইএমে পড়ায় । ওঁর এক ছোট্ট ভাই ছিল । সেই ছোট্ট ভাইকে স্কুলে 'নাক' দিয়ে বাক্যরচনা করতে  - 'আমরা নাক খুঁটি ।' আমাদের দেশের যে শিক্ষাব্যাবস্থা , তাতে সত্যি কথা লেখা পাপ , সবই পচা নোট নিয়ে চলছে । ফলে , সেই ভাইটিকে শাস্তি পেতে হয়েছিল । ফ্যাতারু পড়তে গিয়ে জীবনে প্রথমবার , নাক খুঁটে গদিতে লাগিয়ে দেবার কথাও যে সাহিত্যে আসতে পারে সেটা জানতে পারলাম । কারন , এটাও সত্যি কথা । নাক খুঁটে গদিতে লাগিয়ে নিজের প্রতিবাদ জানানো , বা নিজের হতাশা দাবীয়ে রাখতেও দম লাগে ।

দেখুন , আমাদের শরীরে যা অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ আছে , সব কিছুতে আপনি খোঁটাখুঁটি করতে পারবেন না । যেমন , নিজের চোখ খুঁটতে পারবেন না , কিন্তু চোখের নীচে ব্রণ অবশ্যই খুঁটতে পারবেন । নাক , পোঁদ এগুলি সানন্দে খুঁটুন । আপনি চাইলেই কিডনি , লিভার , হার্ট , বিচি এসব খুঁটতে পারবেন না ।  বড়জোর চুলকোতে পারেন । এসব ডাক্তারের কাজ । ওঁদের আবার পছন্দ হলে , কিডনিটা খুলেও নিতে পারে , ৩০ লাখ দাম হয় শুনেছি ! দেখুন , নাক আমরা সবাই খুঁটি । নাক খোঁটা একটা শিলপো ! ওই যে কবিতা তো সবাই লেখে , কিন্তু সকলেই কবি নয় , কেউ কেউ কবি ! তেমনি , আমরা সকলেই নাক খুঁটি , কিন্তু এই ব্যাপারে আমরা সবাই শিল্পী নই ।

সেদিন রাস্তায় ভারী মজার একটা দৃশ্য দেখলাম । একজন বাবা , তাঁর বাচ্চা মেয়ের হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছেন । সেই বাবার নাকের ফুটো দুটো , দোনলা বন্দুকের নলের মতন ! বাচ্চা মেয়েটিকে একহাতে ধরে আছেন , আর অন্যহাত দিয়ে মনের সুখে নাক খুঁটছেন । ভদ্রলোককে দেখে মনে হচ্ছিল , পৃথিবীর সবচেয়ে সুখী মানুষ ! চারপাশের ট্রাফিকের শব্দ , চিৎকার অগ্রাহ্য করে শুধু নাক খোঁটা । খুঁটে নিয়ে   যে গুপ্তধন পেলেন , সেটাকে দুটো আঙুলের মাঝে নিয়ে একবার ক্লক ওয়াইজ ,আর একবার অ্যানটি ক্লক ওয়াইজ ঘুরিয়ে চলেছেন । বাচ্চাটি লাফাচ্ছে , এবং বাবার আর একটা হাত ধরতে চাইছে , খুব সম্ভবত কোলে উঠতে চাইছে । বাবার হুঁশ নেই , যেভাবে দক্ষ মৃৎশিল্পী দুহাতে মাটির পাত্র গড়ে তোলেন , উনি দুআঙুলে পোঁটা গড়ছেন । ভাগ্যিস , বাচ্চার মা কাছে নেই ! আমি এটা দেখে ভাবলাম , এটা কি এমন নেশা , যা বাচ্চার কথাও ভুলিয়ে দেয় ! 'গোপনে নাক খোঁটার নেশা ছাড়ান' - এমন বিজ্ঞাপন দেখিনি কখনো । 

আমাদের স্কুলে একটি ছেলে ছিল , ওঁকে কানা গরু বলে ডাকা হতো । বেচারি একদিন নাক খুঁটে , পোঁটা টেস্ট করছিল , কেউ একজন দেখে ফেলে , কথাটা গোটা ক্লাসে রাষ্ট্র করে দেয় । কানা গরুর আর কোনদিন আইডেনটিটি ক্রাইসিস হয়নি । ওঁকে দেখলেই সবাই বলতো - 'কানা গরু , নাক খুঁটে খায় ।' নাক খুঁটে  অনেকেই খেয়েছে ছোটবেলায় , কেউ স্বীকার করবেনা । পলিগ্রাফ টেস্ট করুন , সব সত্যি বেড়িয়ে পড়বে ।

হাগতে তো সবাই পারে , আমরা মানুষ তাই ভাবতেও পারি । এই ভাবনার সাথে নাক খোঁটার একটা সম্পর্ক আছে । মানে ধরুন , আপনি একা একা বসে কিছু একটা ভাবছেন । কিভাবে ভাববেন , কবি সুকান্তর মতন পোজ দিতে পারেন , মাথার পেছনে দুহাত দিতে পারেন , চিবুকে বুড়ো আঙুল রাখতে পারেন , যা খুশি । এভাবে কেউ নাকে আঙুল ঢুকিয়ে দেন । কিন্তু , এটা মনে রানদিন ওই পোঁটাবাজের সাথে হ্যান্ডশেক করেনি । সেই বন্ধুটি এরকম নাকখোঁটা মালদের একদম সহ্য করতে পারতো না । একদিন সে হাওড়া থেকে ব্যান্ডেল লোকালে উঠে , জানলার ধারে সিট পেয়েছে । বেশ গরম পড়েছে , ট্রেনের হাওয়া খেতে খেতে যাবে বলে সেই বন্ধুর মন বেজায় খুশি । ওঁর সামনের একটা লোক এসে বসলো , কেমন একটা উদ্ভট , কুরুমচোদার মতন দেখতে , কানে চুল । লোকটি ট্রেন ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গে নাক খুঁটতে শুরু করলো । আমার বন্ধুটির বার বার চোখ পড়ে যাচ্ছিল । সে শ্রীরামপুরে নেমে যাবে , লোকটি তখনো নাক খুঁটে চলেছে । আমার বন্ধুটি ট্রেন থেকে নেমে , জানলার ওপাশ থেকে লোকটিকে বলে - ‘দাদা , হাওড়া থেকে উঠে শ্রীরামপুর অবধি খুঁটে গেলেন । কিছু খুঁজছেন ওখানে ? কিছু কি পেলেন নাকি ?’ লোকটি উত্তর দিয়েছিল - 'তোর বাবার নাক খুঁটিনি বোকাচোদা ।' আর একটা ঘটনা মনে পড়ছে । একদিন পার্ক স্ট্রিট মেট্রো স্টেশনে দেখেছিলাম , একটা লোক নাক খুঁটছে , মেট্রোর অপেক্ষায় , সময় কাটাতে । লোকটা বুড়ো আঙুল বাদ দিয়ে চারটে আঙুল , দুটো গর্তে একবার করে ঢোকাচ্ছে আর বার করছে । একজন বলল , এটা নাকি রামদেব বাবা শিখেছেন । এটা নাক খোঁটা নয় , এক ধরনের প্রাণায়াম , এতে স্ট্রেস কমে ।

তবে একটা কথা জেনে রাখবেন , আমরা কিন্তু প্রায় সকলেই নাকের পোঁটা খেয়েছি । আহা , নিজের নাকের পোঁটা নয় , অন্যের পোঁটা । মানে আমরা সকলেই ফুচকা খেয়েছি । সেই ফুচকাওয়ালার নাকের পোঁটা অবশ্যই ফুচকার জলে মিশে আছে । আমরা যারা হস্টেলে থাকি , পোঁটা তাঁদের ডেলি ডায়েটে পড়ে । আমাদের মেসে যারা ময়দা মাখে , মাঝেখানে নাক খোঁটার বিরতি নেয় না । যে হাতে নাক খুঁটলো , সেইটা দিয়েই ময়দা মেখে দিলো । আমরা সেই পোঁটাযুক্ত ময়দার রুটি খেয়ে বিশ্বজয় করলাম । 

আমি ছোটবেলায় কারো বাড়ি গেলে , সেখানকার লোকেরা ঝাঁট জ্বালালে , তাঁদের বিছানার চাদরে নাক খুঁটে লাগিয়ে দিতাম । ছোটবেলা থেকে আজ অবধি আমি রোগা , কারো সাথে মারপিট করার মতন গায়ে জোর ছিল না । কিন্তু , বন্ধুরা ক্যালাতে এলে নাক খুঁটে , দুটো আঙুল ওঁদের সামনে তুলে ধরতাম । পোঁটার ভয়ে কেউ আমার গায়ে হাত তুলতে পারে নি । হস্টেলের অনেকে পোঁটা কুমার  (PK) বলতো । আমার প্রেমিকা সম্পর্কের শেষের দিনগুলোতে খুব ঝাঁট জ্বালাতো । তখন , আমিও ঝাঁট জ্বালাতাম । হঠাৎ বলতাম - 'ডার্লিং তোমার জন্য একটা জিনিস আছে । চোখ বোজো ।' সে চোখ খুললে আমার আঙুলের ডগায় একটা পোঁটা দেখতে পেতো । একবার হেবি চুলকেছিলাম ।  পোঁটা বার করে দু আঙুলের মাঝে চেপে ধরে , এমন একটা শেপ দিয়েছি , যেন কালো বিন্দি মনে হয় । আমি তো হেবি হারামি । ওকে বললাম  - 'পুচু সোনা তোমার কপালটা খালি লাগছে , একটা কালো বিন্দি পরলে দারুণ লাগবে ।' পুচু সোনা খুব খুশি হন । তারপর আমি আমার আঙুলে ধরা অরগ্যানিক বিন্দি দেখাই । উনি প্রথমে বোঝেন নি । তারপর বুঝতে পারেন । এভাবেই সম্পর্কটা ভেঙে গেছিলো ।       

এক ফেসবুক বন্ধুর কাছে একটা গল্প শুনেছিলাম। ট্রেনে বা বাসে কানে রেডিও নিয়ে ক্রিকেট কমেন্ট্রি শুনতে শুনতে এক ভদ্রলোক যাচ্ছেন। আর নাক খুঁটে হাতে পাকাচ্ছেন। পাশের জন অনেকক্ষণ ধরে দেখে শেষে থাকতে না পেরে জিজ্ঞেস করে, দাদা, গোল হল। উত্তর মেলে, না দাদা, ক্রিকেট। বারবার একই প্রশ্ন শুনে শুনে রেডিও ভদ্রলোক বেদম খিস্তি দ্যায়। দ্বিতীয় লোকটা বলে দাদা রাগ করেন কেন, আমি হাতের ওটার কথা বলছিলাম।

নাক খোঁটা আসলে একটা বাজে নেশা । ঢেঁকি স্বর্গে গিয়েও ধান ভাঙে , পোঁটাল স্বর্গে গিয়েও নাক খোঁটে । যে মাল খেয়ে মাতলামি করে সে মাতাল , যে নাক খুঁটে পোঁটা নিয়ে নেশা করে সে পোঁটাল । এরকম পোঁটাল আপনি ট্রেনে বাসে একটু চোখ খোলা রাখলেই দেখতে পাবেন । একবার বাসে যাচ্ছি , বসার সিট পেয়েছি , হেবি ভিড় । সামনে একটি লোক দুহাত বাসের ছাদে লাগানো হাতল ধরে দাঁড়িয়ে আছেন । প্রচণ্ড ভিড়েও নিজের পজিশন একটু স্টেবল দেখে , এক হাত হাতলে রেখে অন্য হাতের আঙুল নাকের গর্তে ঢোকালেন । তারপর দুটি গর্তে বেশ কিছুক্ষণ ধরে খনন সম্পূর্ণ করে , যা জোগাড় হল , সেই নামানো হাতের আঙুলে ধরে পাকাতে লাগলেন । পাশে একটা পকেটমার দাঁড়িয়ে ছিল , সে সেই পোঁটাল লোকটির পকেটে অ্যাটাক করলেন । পোঁটাল বাবুর সেদিকে খেয়াল নেই , ডান হাত বদলে বাঁ হাতে পোঁটা নিয়ে ঘুরিয়ে চলেছেন । এ যেন সেই জপজন্ত্রের মতন , ঘুরিয়ে যাও । এবার হল কি , বাসটা রেসারিসি করছিল , ফলে আচমকা ব্রেক মারে । অনেকক্ষণ ঘোরানোর ফলে পোঁটার আদ্রতা কমে গেছিল , বলা উচিত নিজের মালিকের প্রতি মায়া কাটিয়ে উঠেছিল সেই পোঁটা । সেই ব্রেক কষার ফলে , পোঁটা খসে পড়ে , পোঁটালের হাত থেকে । সে সৈন্যর হাত থেকে বন্দুক খসে পড়ে , সে সৈন্য মৃত । পোঁটাল প্রচণ্ড রেগে ড্রাইভারকে খিস্তি করে - 'বাঞ্চত ! বউ এর ডেলিভারি হবে নাকি , এতো জোরে চালাচ্ছিস !’ মাটির দিকে তাকিয়ে খুঁজতে থাকে তাঁর হাত থেকে খসে পড়া ছোট্ট চারাগাছ । সেই গোলাকার পোঁটার সঙ্গে নাকের একটা চুলও জুড়ে ছিল , অনেকটা চারাগাছের মতন লাগছিল দেখতে । পোঁটাল মনে মনে গান ধরে -

"পোঁটা ছিল , ভালোবাসা ছিল ,
আজ পোঁটা নেই , ভালোবাসা নেই ।
এই সেই ঢ্যামনা বাস ,
যার তলে দাঁড়িয়ে ,
বোজা চোখ , নাকে হাত , কথা যেতো হারিয়ে ।
বাসের মেঝেতে আমার পোঁটার সমাধি ,
নাকে আর একটুও পোঁটা নেই ,
পোঁটা নেই , ভালোবাসা নেই ।"

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি