ভ্রমণ নিয়ে

"আমার নিজের মুক্তি
একমাত্র আমি নিজেই

আর কেউ কোথাও নেই"

- একমাত্র আমার মনই একথা জানে । তাই সে একাকী চরে, করে ভ্রমণ, মুক্তির আস্বাদনে ।

ট্যুরিস্ট প্লেসে সাইট সিন মানেই কি শুধু টিকিট কেটে লাইন ধরে এগিয়ে চলা ? ঐ এগিয়ে চলার সময়টুকু কি অবশ্যই ভ্রমণপিপাসুর হাতে নয় ?

চারপাশের রূপ - রস - ঘ্রাণ - বাতাস, পরিবেশের চারপাশ, পরতে পরতে অনুভব করতে করতে, আশপাশের থেকে ভেসে আসা শব্দ শুনতে শুনতে, টুক টুক করে ছবি তুলতে তুলতে, টিপ টিপ পায়ে এগিয়ে চলাই, মগজ ফুসফুসের অক্সিজেন আর হৃদয়ের রক্তকে চলমান করে বছরভর ।

যেখানে ছবি তোলাই কঠোরভাবে নিষিদ্ধ পর্যটন ব্যবসার খাতিরে, সেখানে তো সবকটা ইন্দ্রিয়কে সমানভাবে সচেতন করে তুলেই এগিয়ে চলতে হয়, কখনো ধীর পায়ে, কখনো বিরতি নিয়ে একটানা অনেকটা সময় ।

গভীর জঙ্গল থেকে বের হয়ে আসা অজানা পাখি আর রাতের অন্ধকারে একটানা ভেসে আসা নাম না জানা পোকার ডাক, পাতা ফুল ফলের আকার বিন্যাস আর ভিন্নতর সুবাস, পাথরের ভিতর থেকে সবুজের গভীর চিরে, উপর থেকে গড়িয়ে পড়তে থাকা সশব্দ শীতল হিম কনকনে পাহাড়ি ঝর্ণার কলতান, আকাশের কোণে, পাহাড়ের নাভির খাঁজে, সবুজ পাতার বুকের ভাঁজে, পাথুরে শ্যাওলা মাখা পিচ্ছিল রঙিন নদীর আকার ধারণ করে বয়ে চলে ।

পুরানো জলের দাগ শুকিয়ে আসার আগেই নতুন জলের কণা ভিজিয়ে দেয় মস ফার্ণে আচ্ছাদিত পিচ্ছিল পাথুরে স্যাঁতস্যাঁতে শরীর । বসে থাকতে চায় শহুরে ক্লান্ত দেহ পাথরের বোল্ডারের উপর চলমান হিমেল জলের শরীর ছুঁয়ে । ভিজে যায় চলন্ত গাড়িতে বসে পপকর্ণ আর স্ন্যাকস খাওয়া হাতের আঙুল ।

অনতিদূরের গভীর খাদে ঝাঁপিয়ে পড়তে থাকা বিপুল উদ্দাম জলরাশি টেনে নিয়ে চলে মনের ভাবনাকে, রামধনুর দেওয়াল বেয়ে অনন্ত মহাশূন্যের সীমান্তহীন পথে, রকমারি বাহারী রঙিন মেঘের রথের সোনালী সূর্যের আসনে বসার আবাহন জ্ঞাপন করে ।

রাত গত হলে, মন বিস্মৃত হতে চায়, বিগত দিনের অসুখের অস্থায়ী দাগ । একটানা, বৃষ্টিভেজা, পিচ ঢালা, শাল আর বাঁশের বন ছুঁয়ে, এঁকেবেঁকে নেমে আসা তিস্তার শরীরী বিভঙ্গে আন্দোলিত মন, একমুখী অনন্ত ছায়াপথ বেয়ে, ক্রমশ ছুটে চলে মৎস্যকন্যার পার্শ্বরেখার স্পর্শক অভিমুখে । কানে কানে ঘুরে ফেরা সামাজিক নীতিকথার রামধনু ভুলে, রঙিন পাথরের পাললিক ভাঁজে, দেহের যৌবন সমুদ্র ঢেউ, ধাক্কা মেরে ভেঙে ফেলতে চায়, ঘুমিয়ে থাকা কচ্ছপের, নিঃসঙ্গ মনের সমুদ্র প্রাচীর ।

এই ভাবেই চলে আমার ভ্রমণ । এই ভাবেই চলতে থাকি আমি, একটানা নিরন্তর, আমার অন্তর পথের একাকী টানে ।

তাই যেই দৃশ্যপট পরিবারের সঙ্গীরা দুই মিনিটে দেখেই ক্লান্ত আর বিরক্ত হয়ে যান , সেখানেই আমার কেটে যায় দুইশো রকমের রকমারী মুহূর্ত ।

যেখানে বাদবাকীদের নজর এড়িয়ে, নাম না জানা পাহাড়ি বুনো ফুল, শুকিয়ে খসে পড়া হলুদ পাতা আর পথের পাথর, খাদের কোণায় পড়ে থাকে অবহেলায়, তাকেই আমি মুঠোফোনে ফ্রেমবন্দী করি ধীর পায়ে পথ চলতে চলতে, বাদ বাকী সঙ্গীদের হাসি বিদ্রুপ ঠাট্টাকে উপেক্ষা করতে করতে ।

এখানে অর্জুন নেই, নেই পার্থকে বিশ্বরূপ দর্শন দানকারী কৃষ্ণও । তাই এ হেন মহা ভারতে "আমি"র একমাত্র সঠিক সঙ্গী শুধুমাত্র "আমি"ই হতে পারি ।

আর বাদবাকীরা তাই, একে একে সবাই, হয়ে ওঠেন মহাভারতের যুদ্ধক্ষেত্রে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে থাকা মৃতদেহ তুল্য নিমিত্ত মাত্র ।

চরৈবেতি ।।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি