Financial Emergency???

দেশ কি আর্থিক জরুরি অবস্থার পথে অগ্রসর হচ্ছে?
প্রণব চট্টোপাধ্যায়
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী মঙ্গলবার নজিরবিহীনভাবে তাঁর টেলিভিশন ভাষণে ঘোষণা করেছেন যে, (১) ৮ই নভেম্বর মধ্যরাত থেকে পাঁচশো ও এক হাজার টাকার নোটের লেনদেন বন্ধ; (২) চেক, যাবতীয় কার্ড এবং ডিমান্ড ড্রাফট-এর ব্যবহার বহাল; (৩) বুধবার দেশের সমস্ত ব্যাঙ্ক বন্ধ; (৪) সারা দেশে বুধবার বন্ধ থাকবে এ টি এম, দেশের কিছু অংশে বৃহস্পতিবারও এ টি এম পরিষেবা বন্ধ থাকবে; (৫) এ টি এম পরিষেবা চালুর পর কিছুদিন কার্ড প্রতি দু’হাজার টাকা তোলা যাবে...পরে তা চার হাজার টাকা হবে; (৬) এগারোই নভেম্বর মধ্যরাত পর্যন্ত পাঁচশ ও এক হাজার টাকার নোট যে সমস্ত ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যাবে সেগুলি হলো : (ক) হাসপাতাল, (খ) সরকারি ওষুধের দোকান, (গ) সরকারি বাস ডিপো এবং রেলের টিকিট কাউন্টার, বিমানবন্দর, (ঘ) শ্মশান ও সমাধি ক্ষেত্রে, (ঙ) দুধের ডিপো, (চ) সরকার পরিচালিত সমবায় বিপণি, (ছ) পেট্রোল পাম্প।
প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় আরও বলা হয়েছে যে, নভেম্বরের ১০ তারিখ থেকে ডিসেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত সমস্ত ব্যাঙ্ক এবং ডাকঘরে পাঁচশ টাকা ও এক হাজার টাকার নোট জমা দেওয়া যাবে। ৩০শে ডিসেম্বরের মধ্যে জমা দিতে না পারলে ২০১৭ সালের ৩১শে মার্চ পর্যন্ত রিজার্ভ ব্যাঙ্কের নিকট জমা দেওয়া যাবে। এক্ষেত্রে দিনে ১০ হাজার টাকা এবং সপ্তাহে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত বদলানো যাবে।
প্রধানমন্ত্রীর এই ঘোষণার লক্ষ্য কি? ৯ই নভেম্বর অর্থমন্ত্রকের পক্ষ থেকে বিভিন্ন দৈনিক সংবাদপত্রের দেওয়া বিজ্ঞাপনে পাঁচশ টাকা ও হাজার টাকার নোট বাতিলের কারণ হিসাবে বলা হয়েছে, (ক) বেআইনি অস্ত্র লেনদেন, গোয়েন্দাগিরি, সন্ত্রাসবাদীদের জন্য অর্থ নিয়োজন বন্ধ, (খ) বেশি সংখ্যক নকল নোট ছাপানো বন্ধ হবে। বিজ্ঞাপনটির শিরোনাম হলো ‘ভারত এক ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিয়েছে...দুর্নীতি, কালোটাকা, সন্ত্রাসবাদ এবং নকল টাকার বিরুদ্ধে’। প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণা এবং কেন্দ্রীয় অর্থমন্ত্রকের বিজ্ঞাপনী ভাষায় উত্থাপিত বক্তব্যের কতখানি সারবত্তা রয়েছে, এরফলে সাধারণ মানুষের জীবনে এর প্রভাব এবং এই ঘোষণার প্রকৃত উদ্দশ্য সম্পর্কে আলোচনা প্রয়োজন।
।। এক ।।
সরকারি বিজ্ঞাপনে এবং প্রধানমন্ত্রীর টেলিভিশন বক্তৃতায় কালো টাকা উদ্ধার, কালো নোটের কারবার বন্ধ এবং সন্ত্রাসবাদের মোকাবিলা করা — এর উদ্দেশ্য সম্পর্কে এটা বলা হয়েছে। প্রসঙ্গত স্মরণ করা প্রয়োজন যে, ২০১৪ সালে অনুষ্ঠিত ষোড়শ লোকসভা নির্বাচনের পূর্বে বিভিন্ন নির্বাচনী বক্তৃতায় নরেন্দ্র মোদী এবং বি জে পি সভাপতি অমিত শাহ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, বি জে পি সরকার গঠিত হলে তার একশ’ দিনের মধ্যে দেশে এবং বিদেশে সঞ্চিত কালো টাকা উদ্ধার করে তা প্রতিটি ভারতীয় নাগরিকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা যুক্ত করা হবে। নির্বাচনে বি জে পি নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে নরেন্দ্র মোদী সরকার গঠন করেছেন এবং তারপর অন্তত নয়টি একশ’ দিন অতিক্রান্ত হয়েছে, কিন্তু একজন ভারতীয় নাগরিকের অ্যাকাউন্টে ১৫ লক্ষ টাকা দূরের কথা ১৫ টাকাও যু্ক্ত হয়নি। এরজন্য নরেন্দ্র মোদীকে কৈফিয়ত দিতে হবে।
দ্বিতীয়ত, বিদেশে সঞ্চিত কালো টাকা, এদেশে পাঁচশ-হাজার টাকার নোট বাতিল হলে, বিদেশের ব্যাঙ্কের সঞ্চিত কালো টাকা কিভাবে উড়ে আসবে, তা নরেন্দ্র মোদী বা তাঁর বশংবদ সংবাদমাধ্যমগুলি জানাবেন? প্রধানমন্ত্রীর ঘোষণায় বলা হয়েছে যে, এর মধ্য দিয়ে কালো টাকার লেনদেন বন্ধ হবে এবং ভ্রষ্টাচার নির্মূল হবে। বিশ্বব্যাঙ্কের তথ্য উল্লেখ করে ইকনমিক টাইমসে (৯ই নভেম্বর) বলা হয়েছে যে, ভারতে কালো টাকার আয়তন ১৯৯৯ সালে ছিল ২০.৭ শতাংশ, ২০০৭ সালের তা বৃদ্ধি পেয়ে হয়েছে ২৩.২ শতাংশ। গ্লোবাল ফিনান্সিয়াল ইনটিগ্রিটি প্রদত্ত তথ্য অনুযায়ী ২০১২ সাল পর্যন্ত ভারত থেকে বিদেশের ব্যাঙ্কে পাচার হওয়া অর্থের পরিমাণ ৯৮৭৬ কোটি ডলার বা ভারতীয় টাকায় (১ ডলার—৬৫ টাকা) এর পরিমাণ ৬ লক্ষ ১৫ হাজার ৯৪০ কোটি টাকা। এই পরিমাণ ভারতের জি ডি পি’র প্রায় ছয় শতাংশ। এই বিপুল পরিমাণ কালো টাকা ও বিদেশের ব্যাঙ্কে পাচার হওয়া ভারতীয় অর্থ ফিরিয়ে আনতে গেলে আন্তর্জাতিক স্তরে যে কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো প্রয়োজন, তার কোনো রাজনৈতিক সদিচ্ছা নরেন্দ্র মোদী সরকারের নেই। লাতিন আমেরিকার বিভিন্ন দেশে গত শতাব্দীর শেষের দিকে সরকার পরিবর্তনের পর একটি দেশে বিশেষত বলিভিয়া, ভেনেজুয়েলা, ইকুয়েডরের সরকার সুইশ ব্যাঙ্কে জমা টাকা উদ্ধারে পদক্ষেপ গ্রহণ করেন এবং সফল হন। তাছাড়া ভারতীয় মুদ্রার বাজারে ১৯৮৭ সালের অক্টোবর মাস থেকে ৫০০ টাকার নোট এবং ২০০০ সালের ডিসেম্বর মাস থেকে এক হাজার টাকার নোট চালু হয়েছে। তার পূর্বে কি অর্থনীতিতে কালো টাকার অস্তিত্ব ছিল না?
তৃতীয়ত, একথা সর্বজনবিদিত যে দেশে বিপুল পরিমাণ কা‍‌লো টাকার যারা মালিক তাদের কেউই লক্ষ লক্ষ টাকা, পাঁচশো বা হাজার টাকার নোট সিন্দুকে বা মাটির তলায় পুঁতে রাখে না। ভারতীয় কালো টাকার বড় অংশই সোনার গহনা কিনে বা বিভিন্ন ব্যবসায় বিশেষত চিট ফান্ড, রিয়েল এস্টেটে বিনিয়োগ করা হয়। কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত তাদের কেশাগ্রও স্পর্শ করতে পারবে না।
চতুর্থত, জাল নোটের কারবার বন্ধে এই পদক্ষেপ কতটা কার্যকর হবে? পাঁচশ, হাজার টাকার নোট যদি জাল করা যায়, তবে নতুন পাঁচশ, দু’হাজারী নোট জাল করা যাবে না, এই নিশ্চয়তা কে দিল? জাল নোট বন্ধ করতে না পারার প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায় কেন সাধারণ মানুষের উপর চাপিয়ে দিয়ে তাদের হয়রানি করা হচ্ছে।
পঞ্চমত, সীমান্ত পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদীরা এদেশে সন্ত্রাস সৃষ্টির চক্রান্ত করছে। পাঁচশো, হাজার টাকার নোট বাতিল করে এই চক্রান্ত বন্ধ করা যাবে? এই বক্তব্য কতখানি তথ্যভিত্তিক তা এখনই বলা যাবে না। কারণ ভারতের মাটিতে যে সমস্ত সীমানা পেরিয়ে আসা সন্ত্রাসবাদীরা ধরা পড়েছে, তাদের কাছে থেকে প্রচুর পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র, গোলা বারুদ উদ্ধার করা গেছে। কিন্তু কোটি কোটি টাকার ভারতীয় মুদ্রা তাদের কাছে থেকে পাওয়া গেছে বা পাওয়া যদিও যায় তা জাল নোট — এরকম কোন তথ্য কখনই সরকারিভাবে জানা যায়নি। এর অর্থ এই নয় যে, সীমানা পেরিয়ে সন্ত্রাসবাদের বিপদ নেই। কিন্তু তা সমাধানে প্রশাসনিক দিক থেকে করার পাশাপাশি রাজনৈতিক কূটনৈতিক তৎপরতা চালানো দরকার।
।। দুই ।।
কেন্দ্রীয় সরকারে সাম্প্রতিক নোট বাতিলের সিদ্ধান্ত কালো টাকা উদ্ধার, জাল নোটের কারবার বন্ধ বা সন্ত্রাসবাদ নির্মূল করার লক্ষ্যের কথা বলা হলেও, প্রকৃত প্রস্তাবে এসবের সাথে নোট বাতিলের কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু এই সিদ্ধান্তে জনগণের হয়রানি যেমন বাড়িয়ে দিয়েছে তেমনই জাতীয় অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ উপাদান মুদ্রা ব্যবস্থাকেও প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
এক তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, বর্তমানে জাতীয় মুদ্রার বাজারে ১৬৫০ কোটি ৫০০ টাকার নোট এবং ৬৭০ কোটি এক হাজার টাকার নোট রয়েছে। এই পরিমাণ নোটের বিকল্প নোট ছাপিয়ে সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া সহজ ব্যাপার নয়। এই নোটের বৃহৎ অংশই সাধারণ মধ্যবিত্ত, ক্ষুদ্র বা মাঝারি ব্যবসায়ীদের কাছে রয়েছে। এই হস্তান্তরের দীর্ঘ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ব্যাঙ্কের অন্যান্য আর্থিক পরিষেবা ব্যাহত হবে।
দ্বিতীয়ত, বর্তমান সময় ধান কাটার মরশুম। গরিব কৃষক, খেতমজুরদের এই সময় কিছু অর্থ রোজগার হয়। হঠাৎ করে পাঁচশ, হাজার টাকার নোট বাতিলের ঘোষণায় এই অংশের মানুষেরা প্রচণ্ড অসুবিধায় পড়বে। গ্রামাঞ্চলের অর্থনীতিতে বেশ কিছুদিন আর্থিক লেনদেন বন্ধ হয়ে যাবে। এর প্রভাব অন্য ক্ষেত্রেও পড়তে বাধ্য।
তৃতীয়ত, বেশ কিছু ধর্মীয় উৎসব যেমন গণেশ পূজা, শারদীয়া ও দেওয়ালি উৎসব সদ্য সমাপ্ত হয়েছে। এসবকে কেন্দ্র করে সর্বত্রই বিপুল আর্থিক লেনদেন হয়েছে কিন্তু তা এখনও শেষ হয়নি। এক্ষেত্রে পাওনা রয়েছে বিপুল টাকা। কবে এর নিষ্পত্তি হবে কে জানে।
চতুর্থত, এই ঘোষণায় সব থেকে বড় বিপদের সম্মুখীন হয়ে পড়ে হাসপাতাল, নার্সিংহোম বা বেসরকারি চিকিৎসা কেন্দ্রে চিকিৎসারত রোগী ও তাঁদের আত্মীয়-স্বজন। হাজার হাজার টাকা এখানে লেনদেন হয় যার প্রধান মাধ্যম পাঁচশো ও হাজার টাকা। এক্ষেত্রে রোগীর আত্মীয়দের ভয়ংকর সম্মুখীন হতে হবে। একই অবস্থা হবে তাদের যাদের বাড়িতে বিবাহ, জন্মদিন, অন্নপ্রাশনের অনুষ্ঠান রয়েছে। এর জন্য প্রয়োজনীয় অর্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা করতে মানুষ হিমশিম খাচ্ছে।
পঞ্চমত, এই পরিস্থিতিতে সব থেকে বিপদে পড়েছে গ্রামের গরিব মানুষ, খেতমজুর এবং শহরাঞ্চলের গরিব ও নিম্নবিত্ত মানুষ। কারণ পাঁচশ ও হাজার টাকার নোট বাতিল হলেও প্লাস্টিক মানি অর্থাৎ ডেবিট কার্ড, ইন্টারনেট ব্যাঙ্কিং ব্যবস্থা প্রভৃতি চালু থাকবে। বলাই বাহুল্য এইসব ক্ষেত্রে গ্রাম-শহরের গরিব মানুষ, নিম্ন-মধ্যবিত্তদের অংশগ্রহণ প্রায় নেই বললেই চলে। ফলে স্বাভাবিক অবস্থা না ফেরা পর্যন্ত এই অংশকে মুখ বুজে সহ্য করতে হবে।
সর্বোপরি, এই সিদ্ধান্ত জাতীয় অর্থনীতির ক্ষেত্রে চরম কলঙ্কজনক। যেকোন দেশের অর্থনীতিতে মুদ্রার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। শুধু অভ্যন্তরীণ ক্ষেত্রেই নয় বৈ‍‌দেশিক বাণিজ্যিক অর্থনীতির ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা রয়েছে। দুর্বল মুদ্রার অধিকারী দেশকে কোনো দেশই হিসাবের মধ্যে রাখে না। তাছাড়া যে সমস্ত কারণকে সামনে রেখে এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তার মধ্য দিয়ে এই সরকারের অপদার্থতা, অকর্মণ্যতা, অযোগ্যতা প্রকট হয়েছে। তাই এর প্রভাব শুধু জাতীয় জীবনেই নয়, আন্তর্জাতিক স্তরেও ভারতীয় অর্থনীতি সম্পর্কে এক নেতিবাচক বার্তা এর মধ্য দিয়ে পৌঁছে গেল।
।। তিন ।।
কেন্দ্রীয় সরকারের ৫০০ টাকা ও ১০০০ টাকার নোট বাতিলের সিদ্ধান্তের পিছনে প্রকৃত কারণ কি? জাল নোট বাতিল, কালো টাকা উদ্ধার, সন্ত্রাসবাদীদের মদতদান, প্রভৃতি যুক্তি নিছক অজুহাত মাত্র। এর কোনো সারবত্তা নেই। তাহলে প্রকৃত উদ্দেশ্য কি?
প্রথমত, কেন্দ্রীয় সরকার কিছুদিন পূর্বে কালো টাকা উদ্ধারের জন্য স্বঘো‍‌ষিত প্রকল্প চালু করেছিল যাতে মানুষ স্বেচ্ছায় তার কালো টাকা ঘোষণা করে সরকারের নিকট অর্থ জমা দেন। এই প্রকল্প কার্যত ‘ফ্লপ’ করেছে। সরকারি প্রত্যাশার মাত্র বিশ শতাংশ অর্থ এই প্রকল্পে জমা পড়েছে। এর ফলে নরেন্দ্র মোদীর ৫৬ ইঞ্চি চওড়া ছাতি এখন ৩৬ ইঞ্চিতে নেমে গেছে। ক্ষোভ, অপমানে তিনি এখন কালো টাকার মালিক বা সন্ত্রাসবাদের মদতদাতাদের জব্দ করতে না পেরে, সাধারণ মানুষকে দুর্ভোগে ঠেলে দিচ্ছেন।
দ্বিতীয়ত, কেন্দ্রীয় সরকার যাই বলুক না কেন, ভারতীয় অর্থনীতিতে বিশ্ব অর্থনৈকি মন্দার ছায়া ক্রমশ প্রলম্বিত হচ্ছে। গত জুলাই মাস পর্যন্ত প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যাচ্ছে যে, শিল্পোৎপাদন সূচক ২.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। কর্মসংস্থানের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রটি হলো ম্যানুফ্যাকচারিং সেক্টর; এই ক্ষেত্রেও বৃদ্ধির হার ৩.৪ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। ২২টি প্রধান ম্যানুফ্যাকচারিং শিল্পের মধ্যে ১২টিতেই উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে। সব থেকে উদ্বেগজনক চিত্রটি স্পষ্ট হয়েছে মূলধনী শিল্পে। এই শিল্পে উৎপাদন ২৯.৬ শতাংশ হ্রাস পেয়েছে। গত বছর এই সময় হ্রাসের পরিমাণ ছিল ১৬.৫ শতাংশ। মূলধনী শিল্পে উৎপাদন হ্রাসের অর্থ হলো এই ক্ষেত্রে ‍বিনিয়োগ হ্রাস পেয়ে চলেছে। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র যেমন বিদ্যুৎ উৎপাদন, রেলওয়ে পণ্য পরিবহণ প্রভৃতি ক্ষেত্রে মন্দা প্রকট হয়েছে। এর প্রভাব কর্মসংস্থান সৃষ্টির ক্ষেত্রেও পড়ছে। ২০১৪ সালে নির্বাচনের পূর্বে নরেন্দ্র মোদী বলেছিলেন যে, তিনি ক্ষমতায় এলে দু’কোটি বেকারের চাকরির ব্যবস্থা করা হবে। কিন্তু সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে সংসদে জানানো হয়েছে যে, ২০১৫ সা‍‌লে মাত্র ১.৩৫ লক্ষ কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে যখন ব্যাপক মন্দা তখন অন্যদিকে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রীসহ সমস্ত পণ্যেরই মূল্যবৃদ্ধি ঘটে চলেছে। অর্থনীতিবিদদের একাংশের ধারণা যে পাঁচশো, হাজার টাকা নোট বাতিল করে কেন্দ্রীয় সরকার বাজার থেকে কিছু পরিমাণ অর্থের জোগান হ্রাস করতে চাইছে। অথচ এই মন্দা অতিক্রমে প্রয়োজন ছিল সরকারি বিনিয়োগ, প্রয়োজন ছিল চাহিদা সৃষ্টি করা। সেই পথে না গিয়ে এক ভ্রান্ত পথ যা জনগণের মধ্যে হয়রানি সৃষ্টি করেছে — সেই পথ গ্রহণ করা হচ্ছে।
তৃতীয়ত, নরেন্দ্র মোদী পরিচালিত কেন্দ্রীয় সরকার সবদিক থেকেই ব্যর্থ। মূল্যবৃদ্ধি, মুদ্রাস্ফীতি, বেকারি, দারিদ্র্য, কৃষি অর্থনীতির অবনতিতে ক্রমবর্ধমান কৃষক হত্যা, প্রভৃতি ব্যাধি সমাজে দগদগে হয়ে উঠেছে। সামাজিক সুরক্ষা এখন তলানিতে। পাশাপাশি দেশব্যাপী সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের লক্ষ্যে হিন্দুত্ববাদীরা কেন্দ্রীয় সরকারের পৃষ্ঠাপোষকতায়, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, গোহত্যা, লাভ জিহাদ প্রভৃতিকে ব্যবহার করছে। সন্ত্রাসবাদ বন্ধ করতে পারছে না। প্রতিদিন সীমান্তে ভারতীয় সেনারা ও সীমান্ত এালকায় বসবাসকারী জনগণ নিহত হচ্ছে। তথাকথিত সার্জিকাল অ্যাটাকের পর এই আক্রমণ বন্ধ হওয়ার পরিবর্তে বৃদ্ধি পেয়ে চলেছে। কাশ্মীর অগ্নিগর্ভ। স্বাধীনতার পর দেশের কোন প্রান্তে এত দীর্ঘকাল ধরে কার্ফু বহাল হয়নি। দেশের পররাষ্ট্রনীতিকে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের পদতলে সমর্পণ করা হয়েছে। এককথায় বলা চ‍‌‍‌লে যে, সমস্ত দিক থেকে নরেন্দ্র মোদীর সরকার ব্যর্থ। তাই জনগণকে বিভ্রান্ত করার জন্য কখনও তিন তালাক বন্ধের হুমকি, কখনও পাকিস্তানের বিরুদ্ধে যুদ্ধের হুমকি — নরেন্দ্র মোদী দিয়ে চলেছেন। কিন্তু জনগণকে বিভ্রান্ত করা যায় না। সম্প্রতি এক পদ এক পেনশনের সিদ্ধান্ত কার্যকর না হওয়ার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে হরিয়ানার প্রাক্তন জওয়ানের আত্মহত্যা, বি জে পি’র জনবিচ্ছিন্নতায় নতুন মাত্রা যুক্ত করেছে। সামনে উত্তর প্রদেশ, পাঞ্জাবের নির্বাচন। তাই জনগণের দৃষ্টিভঙ্গি অন্যদিকে ঘুরিয়ে দিতে বিভিন্ন পন্থা অবলম্বন করা হচ্ছে। পাঁচশ ও হাজার টাকা বাতিলের সিদ্ধান্ত এরই অংশ।
চতুর্থত, কেন্দ্রীয় সরকার শুধু নোট বাতিলই করেননি, এর সাথে আরও কিছু অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত ঘোষণা করছে। এইসব সিদ্ধান্ত থেকে যে প্রশ্নটি সামনে আসছে তাহলো নরেন্দ্র মোদী সরকার কি অর্থনৈতিক জরুরি অবস্থা জারি করতে চলেছে? খুব সঙ্গত কারণেই পার্টির রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্র প্রশ্ন তুলেছেন, ‘‘সাধারণ মানুষের হয়রানি হচ্ছে। দেশে নৈরাজ্য তৈরি করে প্রধানমন্ত্রী কি সন্ত্রাসবাদের জুজু দেখিয়ে জরুরি অবস্থা জারি করতে চাইছেন?’’

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি