নোট বাতিল
আচ্ছা, টাকা জিনিসটা আসলে কী? টাকা হল আসলে একটা দলিল। একশো টাকার একটা নোট হাতে নিয়ে দেখুন, তাতে খুদে খুদে হরফে লেখা আছে, ‘I promise to pay the bearer the sum of one hundred rupees.’ তলায় দেখবেন রিজার্ভ ব্যাঙ্কের গভর্নরের সই। তার মানে রিজার্ভ ব্যাঙ্কের অধিকর্তা আপনাকে একশো টাকার সম্পত্তি দেবার অঙ্গিকার করছেন। তাহলে সম্পত্তি কোনটা? দেশে ছড়িয়ে থাকা নৌকো-ফানুস-পিঁপড়ে-মানুষ-রেলের গাড়ি-তেলের ভাঁড় – সবই দেশের সম্পত্তি। আপনার কাছে যত টাকার দলিল আছে, তত টাকার সম্পত্তির মালিক হবার অধিকার আপনার আছে। দেশের এই সমস্ত সম্পত্তির অছি বা ট্রাস্টি হল রিজার্ভ ব্যাঙ্ক। সম্পত্তির যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ হচ্ছে কিনা, তার দেখাশোনা করে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক এবং তার বকলমে অন্যান্য ব্যাঙ্ক। মনে রাখা দরকার, এই সম্পত্তি কিন্তু সদাই চলমান। টাকা যত গড়াবে বাজারে, তত আমদানি-রপ্তানি-বিকিকিনি বাড়বে, ততই সম্পত্তি বাড়বে। কথায় বলে, ‘টাকায় টাকা বাড়ে’। তাই ব্যাঙ্কের চোখকে ফাঁকি দিয়ে টাকা লেনদেন মানেই দুর্নীতি। এমনকী বেশী পরিমাণ বৈধ টাকাও ব্যাঙ্কে না রেখে নিজের কাছে জমিয়ে রাখা অন্যায়। কারণ টাকা সেক্ষেত্রে পাথর হয়ে আটকে থাকে।
তাহলে কালো টাকা কী? আপনার অধিকারে যে সম্পত্তির থাকার কথা নয়, তার দলিল যদি আপনি বাগিয়ে বসে থাকেন, সেটাই কালো টাকা। আর যে সম্পত্তির জন্য আপনার কর দেওয়া উচিত, যা দিয়ে রাষ্ট্র জনগণের জন্য রাস্তা-জল-বিদ্যুতের ব্যবস্থা করবে – তা যদি না দেন, সেটাও কালো টাকা। আর জাল টাকা? যে সম্পত্তি আদৌ নেই, তার দলিল যদি আপনার হাতে থাকে, সেটাই জাল টাকা। জাল দলিলে এলাকা ভরে গেলে জমির বাজার মুখ থুবড়ে পড়ে, জাল টাকায় দেশ ভরে গেলে মুখ থুবড়োয় অর্থনীতি।
তাহলে সমান্তরাল অর্থনীতি কীরকম জিনিস? ধরুন, কলকাতা শহরের নামী একজন ডাক্তার দিনে চল্লিশটা রুগী দেখে পার হেড পাঁচশো হিসেবে দিনে কামায় কুড়ি হাজার। হপ্তায় সাত কুড়িং এক লাখ চল্লিশ। মাসে...থাকগে। তো এই বিপুল টাকা পুরোটাই সে নেয় ক্যাশে, ব্যাঙ্কের চোখ ফাঁকি দিয়ে। ব্যাঙ্কে জমা না দিয়ে কয়েক হপ্তা ঘরে জমায় তারপর দুম করে একদিন শহরতলিতে একটা জমি কিনে নেয় বা সোনার বাঁট কিনে লকারে ভরে দেয় বা নার্সিং হোম তৈরিতে বিনিয়োগ করে দেয়। সরকারের ট্যাক্স হাওয়া। সেই টাকাটা ভবিষ্যতে এভাবেই আরও বারো হাত ঘুরে বেড়াব। শুধু ডাক্তার নন। উকিল, ফ্লিমস্টার, টিউশনজীবী প্রাইভেট মাস্টার, পোস্তার ব্যবসাদার – সবাই এই পথের পথিক। অঙ্কটা স্বাভাবিকভাবেই প্রতিদিন লাখ থেকে কোটি, কোটি থেকে হাজার কোটিতে পৌঁছয়। আর এর সঙ্গে প্রতিবেশী রাষ্ট্র থেকে ছড়ানো আড়াই হাজার কোটির কালো টাকা যোগ হয়, তাহলে পরিস্থিতিটা কী দাঁড়ায়, তা আপনি বাজারের চারাপোনা কেনা মধ্যবিত্ত আন্দাজও করতে পারবেন না। পিঁপড়ের পক্ষে হাতির বাসাটা কত বড় সেটা আন্দাজ করাও শক্ত। পরিস্থিত সামলানোর এই ব্যর্থতার জন্যই বোধহয় পূর্বতন গভর্নর রঘুরাম রাজনকে সরে যেতে হয়েছিল। কাজটা আসলে মোদির নয়, রিজার্ভ ব্যাঙ্কের। তবে তাঁর প্রশংসা যদি করতেই হয়, তাহলে বলা যায়, তিনি অন্তত এই দুঃসাহসিক কাজে বাধা দেননি।
সাধারণ মানুষের হয়রানির কী হবে? ‘সাধারণ মানুষ’ কথাটা উচ্চারণ করলেই গরিবের দুঃখে বামপন্থী বাঙালির বুকের ভিতর কেমন গুড়গুড় করে ওঠে। তা উঠুক। মুশকিল হল, সাধারণ মানুষ তা সে চাষী বা সরকারি কর্মচারি যাই হোক না কেন, বরাবরই অত্যন্ত ত্যাঁদোড় জীব। তারা ট্রেনের টিকিট কাটে না, কেনাবেচায় রসিদ চায় না, দেয়ও না, সুযোগ পেলেই ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, রাস্তার ধারের সরকারি ইট চুরি করে বাড়ি নিয়ে যায়, ইলেকট্রিকে হুকিং করে, জাল নোট পেলে সব বুঝেও চালানোর চেষ্টা করে, সিগন্যাল ভেঙে ট্রাফিককে ঘুষ দেয়, ফেসবুকের লেখা চুরি করে...আরও কত বলব! তাদের জন্য এত চোখের জল ফেলার কোনো মানেই হয় না। রাষ্ট্রকে তারা আমের আঁটির মত চুষে ছিবড়ে করে দেয়, দু’দিনের ভোগান্তি তাদের প্রাপ্য বলেই ধরে নিতে হবে। আবারও বলছি, কোলাটোর্যাল ড্যামেজ।
সবই বুঝলাম, ক’দিন আগে জানানো যেত না দাদা? পাগল হলেন? খেয়াল করে দেখেছেন কিনা জানিনা, ঘোষণাটা হয়েছিল রাত ৮টার পর। আটটায় শেয়ার মার্কেট বন্ধ হয়। ওই বাজারটি খোলা থাকলেই আর কিছুর দরকার হত না। মিলিয়ানস অব ব্ল্যাক রুপিস কয়েক ঘন্টায় ফরসা হয়ে যেত। আর আপনি বলছেন দুদিন আগে জানাতে? ইনকাম ট্যাক্স অফিসাররা কি আগাম চিঠি দিয়ে হানা দেয় নাকি?
আর পাবলিকও মাইরি বদের হাঁড়ি। বলা হল রেল, পেট্রোল পাম্প পাঁচশো হাজারের নোট নেবে। ব্যস্, পাবলিক হামলে পড়ে পাঁচ টাকার মাল কিনে পাঁচশোর খুচরো চাইল। যেন ওগুলোই টাকা ভাঙানোর কাউন্টার। ফলে এক ঘন্টায় সব খুচরো শেষ। অতএব অভিযোগ, ‘সরকারি জায়গাতেও টাকা নিচ্ছে না’। ওরে ছাগল, ওগুলো জরুরি পরিসেবা বলে ওখানে ছাড় দেওয়া হয়েছিল। তোর টাকা ভাঙানোটা ‘জরুরি পরিসেবা’ নয়।
লাভের লাভ তাহলে কী হল? খুব বেশি কিছু নয়। সুইস ব্যাঙ্কের টাকা ফিরে আসেনি, আসবে বলে মনেও হয় না। সোনার বাটগুলো লোহার হয়ে গেল? ভবিষ্যতের সব দুর্নীতির রাস্তা বন্ধ হল? তাও নয়। যা হল, তাকে বড়জোর কার্পেটের ওপরের ধুলো পরিষ্কার বলা যায়।
কালোবাজারি,কালোটাকার মজুতদার আর জাল নোটের কারবারিদের কানের নীচে একটা থাপ্পড় পড়ল – এই মাত্র। এই পোড়া দেশে সেটুকুই যুগান্তকারী, দুঃসাহসিক পদক্ষেপ। কার্পেটের তলায় হাত দেবার সাহস মোদিজী দেখান কিনা, সেটা সময় বলবে। ইচ্ছা করলে এখান থেকেই ইতিহাস নতুন করে লেখা যায়, সে সাহস উনি দেখাবেন কিনা সেটাই দেখার। রাজনীতিক হিসেবে এক পা এগিয়ে দু'পা পিছিয়ে আসা আর জাতি হিসেবে হিসেবে যেকোনো কাজ শুরু করে শেষ না করার ঐতিহ্য ভারতবাসীর মজ্জাগত কিনা...।
(সংগৃহীত)
Comments