" ব্যোম্ " ভাইদের সাথে (C) রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য

" ব্যোম্ " ভাইদের সাথে তিন রাত (C) রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
-----------------------
এক
---

আজ ৬ই আগস্ট, ২০১৭, রবিবার । ভোর সাড়ে পাঁচটায় বিছানা ছেড়েছি । উঠে মুখ হাত ধুয়ে শেভিং করে স্নান সেরে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়েছি । সকাল সাতটার ভিতর গাড়ি ঢুকবে টাউনে । গন্তব্য আপাততঃ দেওঘরের বাবাধাম ।

এই সপ্তাহে আর বাড়িতে যেতে পারিনি । গতকাল ৫ই আগস্ট, শনিবার মালদা জেলার ভূমি রাজস্ব দপ্তরের সাথে ব্লক স্তরের ভূমি রাজস্ব অফিসের সম্প্রীতির ফুটবল ম্যাচ ছিলো দুপুর তিন'টে থেকে । আমার ব্লক থেকে আমি ছিলাম ।

আমাদের ছিলো ইতালির নীল জার্সি । আর ওনাদের ছিলো জার্মানির সাদা জার্সি । শুরু হলো ঐ ভয়ানক গরমে মাথা ধরানো গা জ্বালানো ভরা দুপুরে আমাদের ফুটবল খেলা ।

আমাদের দল তিন গোল দিলো । ওরা একটাও গোল শোধ করতে পারলো না । হেরে গেলো ওরা । আমরা জিতে গেলাম । পাক্কা সতেরো বছর পরে আবার ফুটবলে পা দিলাম । খেললাম ডিফেন্স পজিশনে ।

কাল বুঝলাম বয়সটা আগের চেয়ে কতখানি বেড়ে গেছে আর পাশাপাশি কমে গেছে দমটাও অনেকখানি (নেশাভাঙ না কমালে হয়তো আরও কমে যাবে আগামী দিনে) ।

তবে সবকিছু মিলিয়ে জয় হলো সেই খেলারই । আর আমাদের মতো দিনভর ব্লক অফিসে হাড়ভাঙা খাটনি খাটা মানসিকতার ।

তবে হার হলো একজনের । আমাদের নীল'দার বাড়াবাড়ি রকমের নাক উঁচু অহংকারের । প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি এই খেলাধূলোর ব্যাপারটা নিয়ে নীলদা খুবই উৎসাহী ছিলেন গোড়া থেকেই ।

গতকালকের আগের দিন, শুক্রবার বিকেলে যখন গেছিলাম জেলার হেড অফিসে, নীলদা তখন আরও জনা তিনেক সহকর্মীর সাথে ফুটবল নিয়ে গা ঘামাচ্ছিলেন । আর আমাদের ব্লকের টিম নিয়ে খুবই হেলাফেলা করছিলেন ।

গতকাল খেলা শুরুর আগে মাঠেও সেই ব্যাপারটা আমার নজরে পড়েছিল । নিজেকে আদ্যন্ত হিরো ভাবা এবং বাকি সব বিনা প্র্যাকটিসে ম্যাচ খেলতে আসা খেলোয়াড়দের উনি তৃণসম জ্ঞান করছিলেন । সোজা বাংলায় বিরাট হাবভাব নিয়ে এদিক সেদিক করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ।

আমি ডিফেন্সের রাইট উইং এ ছিলাম । চেহারাটা আমার বেশ গাঁট্টাগোট্টা গোছের । আমার একটাই লক্ষ্য ছিলো । যে কোনও উপায়ে সুযোগমতো প্রতিপক্ষের পা থেকে বলটা কেড়ে নেওয়া ।

কারণ আমি খুব ভালোমতনই এটা জানতাম যে এই দশ'টা - ছ'টা চাকুরীজীবনে ফুটবল খেলাটা ঘরে বা মাঠের গ্যালারীতে বসে দেখার লোক প্রায় সব বাঙালীই । কিন্তু পায়ে বল নাচিয়ে, পাশ কাটিয়ে ডজ আর ড্রিবলিং করে বল নিয়ে ছুটে গোল করার মতো মারাদোনা বা মেসি এখানে কেউ নেই ।

স্ট্র্যাটেজিটা ব্যাপক কাজে লাগলো । প্রতিপক্ষের বল ধরা অবদি অপেক্ষা করলাম । কিন্তু জানতাম ওরা কেউ বল রিসিভ করে মেসি মারাদোনার মতো পায়ের সাথে আঠার মতো বলকে আটকে রাখতে পারবে না । সুতরাং ওদের বল রিসিভ করার পরবর্তী চার পাঁচ সেকেন্ডের ভিতর বল ক্লিয়ার করে আমাদের মাঝমাঠের প্লেয়ারদের দিকে বলটা পাস করে দিচ্ছিলাম ।

তাতেই যা কাজ হওয়ার হলো । ওরা আমাদের এলাকায় গোটা ম্যাচ জুড়ে মাত্র বার তিনেক ঢোকার সুযোগ পেলো । আর বাকি সময়ের পুরোটাই আমাদের ছেলেরা উপরে উঠে খেলে গেল । ওদেরকে চাপে টেনশনে রেখে তিনখানা গোলও দিয়ে দিলো ।

আরও গোটা দশ বারোটা গোল দেওয়া যেত । কিন্তু সবাই প্রায় বয়স্ক । প্রচন্ড দাবদাহে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত কলেবর । আর পায়ের লক্ষ্যও বিনা প্র্যাকটিসে নড়বড়ে ।

আর নীলদা একাধিকবার পায়ে বল পেয়েও কিছুই করতে পারলেন না । শুধু ছুটে বেড়ালেন গোটা মাঠ জুড়ে । কখনো বল নিয়ে, কখনো বলের পিছনে ।

মনে পড়ে গেলো সেই লঙ্কার রাবণ রাজার কথা । অহংকার পতনের কারণ । নীলদার টিম তিন গোল হজম করলো মুখ বুঁজে । এক বাক্যে গো হারান হারলো ।

একটা হোয়াটস্ অ্যাপের জোকস্ এখানে এই প্রসঙ্গে শেয়ার না করে পারলাম না -
খবর আছে যে ব্রাজিলের বিখ্যাত স্ট্রাইকার নেইমারের দাম উঠেছে ১৭৭৩ কোটি টাকা। আর একটা মানুষের দেহে প্রায় যে কয়টি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থাকে, তার সংখ্যা হলো উনআশি (৭৯) । সেই হিসাবে নেইমারের এক একটা অন্ডকোষের দাম ২১কোটি টাকা 😵😵😵😵😳😳 !!!!! ভাবা যায় !!!!!

আচ্ছা - আমাদের এই অতি অহংকারী, নাক উঁচু, ধরাকে সরা জ্ঞান করা, আত্মঅভিমানী স্ট্রাইকার নীল দাদার এক একটি অন্ডকোষের বাজার মূল্য কত হতে পারে ???

এটা পড়ে আমায় যে যাই ভাবুন না কেন, আমার প্রশ্ন টা নিয়ে কিন্তু অবশ্যই ভাবনা চিন্তা করবার মতো রসদ আছে সকলের কাছে । কারণ অত্তো ভারী দ্বিখন্ডিত অন্ডকোষের ওজন নিয়ে গোটা মাঠে ছোটাছুটি করা এবং শেষ অবদি গোল না পাওয়াটা কি কম চাট্টিখানি কথা বলুন !!!

একটু আগেই একটা ফোন এসেছিলো । আমায় এবার তৈরী হতে হবে । আর একটু পরেই বেরিয়ে যাবো দেওঘরের পথে বাবাধামের দিকে । সুতরাং এখন আপাততঃ একটা বিরতি নিচ্ছি । পরে আবার সুযোগ সুবিধে বুঝে লিখতে বসবো ।

সকলে ভালো থাকুন । আরামে আয়েসে আনন্দে কাটুক ছুটির দিন । সকলকে সুপ্রভাত ।

দুই
---

যাত্রা শুরু হলো আমাদের ঠিক পৌনে দশটায় । তার আগে ছবি তোলা হলো সকলের ।

আমার সাথে রয়েছে রাম । আর আছে ড্রাইভার সহ তিন জন । অর্থাৎ মোট পাঁচ জনের একটা দল আমাদের ।

ড্রাইভারকে বলে রেখেছি, যদি ও ক্লান্তি বোধ করে, তবে স্টীয়ারিং হুইল আমাকে দিতে । গাড়ি এখন ৩৪ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে হু হু করে ছুটছে । স্পীডোমিটারে দেখছি কখনো আশি কখনো পঁচাশি । এই হাইওয়ের জ্যাম্ এর খ্যাতি ভারতজোড়া ।

বাঁ দিকে মোহদিপুর ছাড়ালাম । মোহদিপুর দিয়ে মাস খানেক আগে গৌড়ের রামকেলি মেলায় বিকেলের দিকে ঘুরতে গেছিলাম এক সন্ধ্যায় । সেখানকার স্মৃতি হিসেবে কিনে এনেছিলাম বড়োসড়ো গোছের একটা তামার ঘটি । রাতে ভরে রাখা জল ভোরে উঠে খালি পেটে খাবো বলে । ওটা নাকি অ্যান্টি গ্যাস অম্বল ।

কিন্তু আজ অবদি ওর থেকে এক চামচ জলও আমার খাওয়া হয়ে ওঠেনি । আর কবেই বা খাওয়া শুরু করবো জানি না । আমি যা মহান কুঁড়ের বাদশা ।

এর ভিতর বুলেরো গাড়িটার গতি একশো কুড়ি ছুঁয়ে গেছিলো বার তিনেক । এখন সুজাপুর ঢুকলো গাড়ি । এই সেই কুখ্যাত মাফিয়া ডনদের আস্তানা । আফিম চাষ, জাল নোটের কারবার, অস্ত্র কেনা বেচা, যে কোনও ইলেকট্রনিক গ্যাজেটস আর সীমানা দিয়ে গোরু পাচার - এসবের জন্যেই এলাকাটা খবরের শিরোনামে চলে আসে মাঝে মাঝেই ।

এখানে প্রায় অধিকাংশ বাড়িতেই বাংলাদেশী উগ্রবাদীদের গোপন আস্তানা । দাঙ্গাবাজ গুন্ডা বাহিনীর রমরমা এখানে । রাজনৈতিক প্রশ্রয় আর প্রশাসনিক নিষ্ক্রিয়তা এখানে সমান ভাবে সক্রিয় ।

পার করলাম কালিয়াচক বৈষ্ণবনগর । আঠারো মাইলের মুখে টোল ট্যাক্স নিলো । ফারাক্কাও পার হয়ে বল্লালপুর ছেড়ে আরও খানিকটা এগিয়ে এসে একটা জায়গাতে গাড়ি থামানো হলো । দেখলাম ফারাক্কাতে জল এখনও বিপদসসীমা ছুঁয়ে বইছে ।

আমাদের গাড়ির মাথায় রান্না বান্নার সব সাজ সরঞ্জাম রয়েছে । রয়েছে চাল ডাল তেল নুন সব্জী আর ত্রিপল । টিফিনটা এবার সেরে নেব ভাবছি ।

হাইওয়ের পাশে যেখানে গাড়ি থামানো হলো, সেখানে চারপাশে অনেক তালগাছ দাঁড়িয়ে রয়েছে দেখলাম । আমি তালের রস ( ভদ্রলোকেরা ঐ রস কে 'তাড়ি' বলে সম্বোধন করেন প্রায়শই ) অনেকবার খেয়েছি । কখনো আমবাগানের ভিতরে বসে, কখনো গঙ্গার পাড়ে বসে রামের পাইট মিশিয়ে দেশী বিড়ি আর ঝালমুড়ি মাখা দিয়ে । বেশ লেগেছে । নিজেকে ভূমিপুত্র বলে মনে হয়েছে ।

এখানেও নিজেকে খানিকটা সেই রকমই মনে হচ্ছে । আমার সঙ্গী সাথীরা এখন ছাতুর সরবৎ বানাচ্ছে । ওটা খেয়েই আমরা আবার শুরু করবো আমাদের যাত্রা ।

এবার হয়তো স্টিয়ারিং এর হাতলটা আমি ধরবো । আবার পরে বসবো সময় করে লিখতে । এখন আপাততঃ বিরতি নিলাম ।

তিন
---

চমৎকার ছাতুর সরবত খেলাম নুন লেবু কাঁচালঙ্কা আচার মিশিয়ে গ্লাস তিনেক । তারপর কল্কে মুখে টেনে নিলাম ভোলেনাথের প্রসাদী ধোঁয়া । খৈনি আর এক নম্বর গ্রেডের গাঁজার মিক্সচার টানলাম চরম মৌতাত নিয়ে । আবার ছুটলো গাড়ি আমাদের । আমি আর বসিনি ড্রাইভিং সীটে । বরং পাশে বসে আছি ড্রাইভারের ।

আমরা বল্লালপুর ছেড়ে ধুলিয়ানের ডাকবাংলা মোড় দিয়ে ডানদিকে টার্ন নিয়ে পাকুড় রোডে উঠলাম । আরো কিছুটা পথ পার করলে তারপর ঝাড়খন্ড পুলিশ এলাকা পড়বে । পাকুড় স্টেশনের লেভেল ক্রসিং এ আটকে রইলাম কিছুক্ষণ । কামরুপ কামাখ্যা এক্সপ্রেস পার হলো ।

আমরা এখন প্রপার ঝাড়খন্ডে আছি । পাকুড় স্টেশনের রেলগেট পার করে গাড়ি আবার আগের ফর্মে । গাড়ির ভিতরে একনাগাড়ে বেজে চলেছে নানা রকমের রকমারি গান । আর মাঝে মাঝে পিছনের সীট থেকে আওয়াজ আসছে - "হর হর ব্যোম্ ব্যোম্ । হর হর মহাদেব । ওঁ নমঃ শিবায় ।"

ঝাড়খন্ডের রাস্তা অসাধারণ । রাস্তার দুই পাশে প্রচুর গাছ । একেকটা গাছ বিশাল বড়ো বড়ো । একটু পরে পরেই চোখে পড়ছে ছোট খাটো মাঝারি আকারের পাহাড় । দুপাশ জুড়ে কখনো সবুজ ধানক্ষেত । আর ইতস্ততঃ যত্রতত্র ছড়ানো রয়েছে তালগাছ ।

আমরা লিটিপাড়া বাজারে এসে গাড়ি থামালাম । বাজারে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আদিবাসী সাঁওতাল ছেলে আর মেয়েরা বসেছিলো । কেউ বিক্রি করছে মহুয়া । কেউ বা জিলিপি আর তেলেভাজা । আমরা একশ' টাকায় দুই বোতল মহুয়া নিলাম । আর দুটো বড়ো প্যাকেটে ঝুরিভাজা । গরম গরম জিলিপিও খাওয়া গেলো ।

গাড়ি চলার পথেই মহুয়া খাওয়া চলতে লাগলো ঝুরিভাজার সাথে । আর ফাঁকে ফাঁকে বাবার প্রসাদী ছিলিম ।  আমাদের মতো আরো কিছু "বম্ বম্ পার্টি নজরে এলো । ওরা কেউ সুমো তে । কেউ বুলেরো তে । কেউ কেউ আবার বাইকে । গোটা শ্রাবণ মাস ধরে এমনটাই চলতে থাকবে ।

গোড্ডাহাট পৌঁছানোর তিন কিলোমিটার দূরে আমাদের গাড়ি থামানো হলো । চারপাশে প্রচুর গাছপালা । এদিকে ওদিকে ছড়ানো ছেটানো জলাধার । আমার সঙ্গীরা চাটাই পাতলো । গ্যাসের সিলিন্ডার আর ওভেন নামানো হলো । রান্না চেপে গেলো । আমরা মহুয়া আর কল্কে মিক্সচার চালাতে লাগলাম । মহুয়া শেষ হয়ে গেলো । নামানো হলো SOLID 7000 কান্ট্রি লিকার । এদিকে ওভেন থেকে নামানো হলো গরম গরম পটলভাজা আর মশলা পাঁপড় । নেশা জমে একেবারে ক্ষীর । দেহ মন শান্ত ধীর স্থির হয়ে গেলো । একদৃষ্টে চেয়ে রইলাম কড়াই থেকে উঠতে থাকা ধোঁয়ার দিকে । রান্নার ধোঁয়া ভেদ করে চোখ চলে গেল একটু দূরের হাওয়ায় দুলতে থাকা পাতাগুলোর দিকে । মনে পড়লো কিছুক্ষণ আগে অবদি আমার নিজে হাতে স্টিয়ারিং ধরে গাড়ি চালানোর কথা ।

চার
---

লিটিপাড়া থেকেই আমি ড্রাইভিং করছিলাম । বেশ কিছু ছোট বড়ো মাঝারি পাহাড় পার করে এলাম এখানে । মাঝে পড়েছিল গভীর জঙ্গল আর জিলাবিয়া পাহাড় । গোটা পাহাড় ঘিরে জিলিপির প্যাঁচের মতো রাস্তা ছিল । পাহাড়ের নামটাও সেই অনুসারী ।

কলকাতার জনবহুল চরম ভীড়ে গাড়ি চালানোর বিলক্ষণ অভ্যেস আছে আমার । এমন চওড়া ফাঁকা পাহাড়ী জঙ্গল এলাকার ভিতর দিয়ে আদিবাসী পাড়ার পাশ ছুঁয়ে এই ভাবে গাড়ি চালানো; তাও আবার ভোলেনাথের প্রসাদী আর মহুয়া টেনে উদোম হয়ে - স্বপ্নেও ভাবতে পারিনি ।

এখানে রান্না চলবার ফাঁকে ফাঁকে মনে পড়তে লাগলো ভুলভাল কিছু এলোমেলো লাইন । সেগুলো খানিকটা এই রকম __

(অ)

পাতার ফাঁকে হাওয়া
গাছের ডালে ছাওয়া

[ { পাথরাতে
(ঝাড়খন্ডে) আছি

সাথে আছে
(গাঁজা মহুয়া বিড়ি দেশি মদ সিগারেট)

চোখের পাতা পঁচাত্তর  ভাগ ঝুলে }
(কোনরকমে ঠেলে রেখেছি তুলে ওদের) ]

[ "বোল্ বম্" নামে আছি জেগে
ঢুলু ঢুলু ঘুম ঘুম চোখে  ]

বয়ে চলেছে একটানা
উদ্দাম হাওয়া

(আ)

গ্যাসের ধোঁয়ায় কড়াই
আর
কড়াই এ ওঠা ধোঁয়ায়
জ্বলে দুব্বো ঘাস

বাবার প্রসাদ, মহয়া
আর
কানট্রি লিকারে
আমার সব্বোনাশ

(ই)

অমরত্ব পেলাম আজ

ঘাসের ফুল কানে কানে
জানালো

সে ভালোবেসেছে আমাকে

লেখা শেষ করতে না করতেই চলে এলো গরম গরম ভাত, মুগের ডাল, কাগজি লেবু, পাঁপড় আর পটলভাজা । অন্যদিন যা খাই, তার চারগুণ ভাত খেয়ে ফেললাম নেশার ঘোরে হুমহাম্ করে । তারপর প্রায় দশ পা দূরের একটা জলাশয়ে নেমে হাত মুখ ধুলাম । মাথায় জল ঢাললাম খানিকটা মগ দিয়ে ।

এরপর আবার গাড়িটা ছেড়ে দিলো আমাদের । গোড্ডাহাটের মোড়ে একজন বিহার পুলিশের সাব-ইন্সপেক্টর আমাদের দেখে গাড়ি থামাতে বললো । আমাদের সবার পরনে গেরুয়া পোষাক । গাড়ির মাথায় গেরুয়া রঙের ত্রিপল আর দুটো হর হর মহাদেবের গেরুয়া পতাকা বাঁধা । আমরা ওদের আঞ্চলিক ভাষায় "বোল্ বোম্" পার্টি ।

পুলিশ অফিসারটি লিফট্ চাইলো বারাহাট মোড় অবদি । আর আমার পাশেই আমার সীটে একসাথে শেয়ার করে বসে পড়লো । আমার একটু ঘুম ঘুম পাচ্ছিলো । আমার মুখ দিয়ে মহুয়া আর কান্ট্রি লিকারের মিক্সড্ একটা তীব্র গন্ধ ছাড়ছিলো । পুলিশটা দেখলাম কিছু মনেই করলো না । এটা সেটা গল্প করতে করতে ওর নামার জায়গা চলে এলো ।

পুলিশটা নেমে যেতেই আমি মহা স্বস্তির একটা দ্বিপ্রাহরিক ঘুম দিলাম । রান্না চাপিয়ে খেতে খেতে প্রায় বেলা চারটে বেজে গিয়েছিলো আমাদের । আর পুলিশটা গাড়ি থেকে নামলো প্রায় পৌনে পাঁচটা নাগাদ ।

আমার যখন ঘুম ভাঙলো, তখন চারপাশ অন্ধকার । আরো মিনিট তিরিশ চল্লিশ চললেই সুলতানগঞ্জ । গাড়ি থেকে নেমে সবাই বাথরুম সেরে একটু চা খেয়ে নেওয়া গেলো ।

সুলতানগঞ্জ এলাকাটা বিশাল বড়ো । বাবার লক্ষ লক্ষ মহাভক্তরা এখানেই প্রাথমিক বিরতি নিয়ে নিকটস্থ গঙ্গা থেকে কলস ভর্তি জল উঠিয়ে আবার হাঁটাপথে রওনা দেয় দেওঘরের পথে বাবাধামে ।

আমরাও সেটাই করলাম । একটা চটি গুমটি গোছের বিশ্রামাগার দেখে গাড়ি পার্কিং করা হলো । আবার দুপুরের মতো রান্না চেপে গেলো । এবার আলুর চোখা সহযোগে গরমাগরম ঘি ভাত । বেশ অনেকটা খেয়ে ফেললাম । একটা জিনিস অবাক লাগলো এখানে । রাতের বেলা মাছির উৎপাত ।

এবার এখানেই চাটাই পেতে শুয়ে পড়বার পালা । আর দেহটাও প্রচন্ড ভারী । ক্লান্ত শরীরে দেহ এলিয়ে দিলাম । আর দেখতে দেখতে ভারী চোখের পাতা বুঁজে এলো । আজ মাঝ রাতে একটা নাগাদ উঠে নদী অবদি হেঁটে যেতে হবে । সেটা এখান থেকে দেড় কিলোমিটার । তিন কিলোমিটার আপ ডাউন করে স্নান করা এবং জল টেনে এনে আবার রাত তিনটের ভিতর আমাদের গাড়ি ছাড়বার পরিকল্পনাটা বেশ অভিনব ।

দেওঘর যেতে যেতে সকাল সাতটা বেজে যাবে আমাদের । সুতরাং সকলকে শুভরাত্রি জানালাম বন্ধুরা । সকলে ভালো থাকবেন ।

পাঁচ
---

আজ ৭ই আগস্ট, সোমবার, রাখী পূর্ণিমা । সোমবার ভোলেবাবার মাথায় জল ঢালার জন্যে দিন হিসেবে অসাধারণ । আমার জন্ম তারিখ ইংরেজী মাসের ৭ তারিখে । আবার আজকের দিন, অর্থাৎ ০৭ + ০৮ + ২০ + ১ + ৭ = ২৫ > ২ + ৫ = ৭, অর্থাৎ সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে আজকের দিনটির সংখ্যামান ৭ ।

আজ ভোর চারটেয় উঠে গেছি । কাল রাতে ঘুম আসতে আসতে প্রায় একটা বেজে গেছিলো । কথা ছিলো রাত একটায় সুলতানগঞ্জের গঙ্গার পাড়ে পায়ে হেঁটে জল আনতে যাবো ।

কিন্তু কাল গোটা দিনে প্রায় সাড়ে তিনশো কিলোমিটার জার্নি কম কিছু নয় । তার একটা স্বাভাবিক ক্লান্তি আছেই । আর তার উপর নেশা ভাঙ্ ও কম কিছু করা হয়নি । যাই হোক্, একটা রক সলিড পাওয়ার ন্যাপ্ দিয়ে উঠে পরলাম ।

এখানে শৌচালয় গুলোতে ব্যক্তি পিছু দশ টাকা করে নিচ্ছে ভোরের প্রাতঃকৃত্য করবার জন্য । এই হারে টাকা নেওয়াটা অনেকেই মেনে নিতে পারে না বলে আশেপাশের খোলা মাঠে অনেককেই ঘটি / বোতল হাতে চলে যেতে দেখলাম ।

শৌচালয় থেকে ফিরে এসে ব্রাশ করে মুখ হাত ভালো করে ধুয়ে গঙ্গার পথে হাঁটা দিলাম । যেই পথে আমরা পায়ে হেঁটে চলছিলাম, তার দুই পাশ জুড়ে গায়ে গায়ে অগুনতি দোকান ।

সব দোকানেই গেরুয়া রঙের পোষাক, গামছা, জল নেওয়ার ঘটি, কাঁধে করে জল নিয়ে যাওয়ার বাঁক - এসব দেদার বিক্রিবাটা চলছে ।

এখানে আসার পর থেকেই একটা জিনিস লক্ষ্য করেছিলাম । এখানকার ছোট ছোট বাচ্চা ছেলে মেয়েরাও ঘুরে ঘুরে টুকটাক এটা সেটা বিক্রি করছে । আমি একজনের থেকে গেরুয়া রঙের প্লাস্টিকের পলি প্যাক নিলাম খুচরো টাকা পয়সা রাখার জন্য ।

আমাদের গুমটি থেকে গঙ্গা দেড় কিলোমিটারেরও বেশী । হাঁটতে হাঁটতে ঘাম ছুটতে লাগলো । আমাদের পাশাপাশি আগে পিছে চলছিল অগনিত অসংখ্য নরনারী । সকলেই ব্যোম্ পার্টি । সবার মুখে একটাই কথা - বোল বম্ ।

আমরা গঙ্গার দিকে এগোতে লাগলাম । উল্টো দিক দিয়ে ব্যোমযাত্রীরা পালে পালে আসতে লাগলো । সকলের কাঁধেই গঙ্গা জল ভর্তি বাঁক । পরনে গেরুয়া । মাথায় ফেট্টি । কপালে লাল সিঁদুরের টিকা । আর সকলেই খালি পায়ে প্রায় ছুটেই চলছেন ।

কিছু নারী পুরুষকে দেখলাম দন্ডী কেটে কেটে গঙ্গার দিক থেকে ফিরতে । হয়তো কোনও মনস্কামনা পূরণ হয়েছে তাঁদের । ভাবলাম, যদি রাত একটার সময় অন্ধকারে আসতাম, তবে এই ভক্তির মাহাত্ম নমুনা আর আবেগ হয়তো নজরেই আসতো না আমাদের ।

চলতে চলতে আমরা পৌঁছে গেলাম পাড়ে । গঙ্গা এখানে পূর্ব বাহিনী । নজরে পড়লো গঙ্গার উপর প্রায় মাঝামাঝি এলাকায় রাতারাতি গড়ে ওঠা বিশালকায় "বাবা আজগুবিনাথ" এর মন্দির । গঙ্গার পাড় থেকে কংক্রিটের ঢালাই করা ব্রীজ বানানো রয়েছে মন্দিরের পাদদেশ পর্যন্ত ।

এই প্রবল জনসমুদ্রের ভীড়ে মনে হচ্ছিলো হারিয়ে যেতে । টুকটাক ছবিও তোলা হলো । আমরা গঙ্গার একেবারে পাড়ে এসে দাঁড়ালাম । একটা বড়োসড়ো দোকানে এসে ঢুকলাম । গেরুয়া রঙের হর পার্বতীর ছবি লাগানো কলার ছাড়া একটা টি শার্ট আর গেঞ্জি কাপড়ের বারমুডা নিলাম । আর নিলাম একটা সম্পূর্ণ সূতির কাপড়ের বড়োসড়ো গামছা ।

আর একটু এগিয়ে কিনলাম ফুল বেলপাতা, প্লাস্টিকের জল রাখার গেরুয়া রঙের ঘটি, ধূপকাঠি । গঙ্গায় নামার সময় এক ব্রাহ্মণ ঠাকুর পাকড়াও করে ফেললেন আমাদের । জন প্রতি একুশ টাকায় ওনার সাথে রফা করলাম । আমরা একটা চৌকিতে সব রেখে জলে নামলাম ।

যত জলের দিকে এগোলাম, তত প্যাচপ্যাচে কাদার পরিমাণ বাড়লো । দুই একজন অতি সাবধানীকে দেখলাম পা হড়কাতে । আমি আর রাম আগে নামলাম । কথা হলো আমরা স্নান সেরে ফিরলে ওরা বাকি দুই জনা জলে নামবে ।

জলে নেমে মন ভরে গেল । আমি কাঁধ জলে গেলাম । পরপর বেশ কয়েকটা ডুব দিলাম "হর হর মহাদেব" বলে । স্নানের জায়গাতে জলের নীচে বালির বস্তার মেঝে করা আছে । আর চারপাশটা বাঁশ দিয়ে ঘেরা । গঙ্গার চারপাশ দেখে মন ভরে গেলো এক কথায় । পশ্চিম দিক থেকে পূর্ব দিকে জল ছুটে চলেছে । ভালোই স্রোতের বেগ এখানে ।

একজন ফটোগ্রাফার পাকড়াও করলো আমাদের । দুটো ছবি তোলা হলো । একটায় আমি একলা । ছবির সাইজ অনুসারে রেট বাঁধা ছিলো । আমরা ছবি তুলে জল থেকে উঠে পড়লাম । ঠাকুর মশাই আমাদের অপেক্ষাতেই ছিলেন ।

রাতের পোষাক বদল করে নতুন কেনা পোষাক পরলাম । গামছাটা প্রথমে বাঁধলাম কোমরে । পরে আবার কাঁধের দুই পাশে ঝুলিয়ে নিলাম । পুরোহিত মশাই পুজো করালেন আমাদের ধূপকাঠি জ্বালিয়ে । ইতিমধ্যেই সেই ছবি তোলার লোকটি এসে হাজির ফটো রেডি করে ।

আমরা গঙ্গা থেকে ফেরার পথ ধরলাম । আসলাম হেঁটে । ফিরলাম ভুটভুটিতে চেপে । রাস্তায় মানুষের ঢল দেখে মন ভরে গেলো । এত ভক্তির প্রাবল্য দেখে ছবি তুলে নিলাম কয়েকটা । গুমটিতে ফিরে এসে আর দেরী করলাম না । আবার রওনা দিলাম আমরা সুলতানগঞ্জ ছেড়ে ।

হোটেলে না থেকে খোলা চটিতে রাত্রিবাসের এই অভিনব অভিজ্ঞতা ভোলার নয় একেবারেই । চলতে চলতে এলাম জিলাবিয়া মোড় । এখানে আবার গাড়ি থামিয়ে কলা কিনে খেলাম । কোনও নুন দেওয়া জিনিস এখন আর খেতে পারবো না । কিনলাম প্রায় আমার সমান উচ্চতার একটা মোটাসোটা গোছের ভারী লাঠিও ।

এবার পেলাম সুইয়া পাহাড় । সুদিয়া থানা পার করে গাড়ি এখন ছুটছে আপরাক্ষা ধর্মশালার দিকে । ঠিকঠাক গেলে আর সোয়া এক ঘন্টা মতন লাগবে আমাদের দেওঘর ঢুকতে । ততক্ণ একটু চারপাশের ছোটখাটো পাহাড় আর জঙ্গলের সবুজ দেখে চোখের তৃষ্ণা মেটাই । সকলকে সুপ্রভাত বন্ধুরা ।

এখন আমরা ছুটে চলেছি মহুয়া বনের ভিতর দিয়ে । যে মহুয়ায় মাতাল হয়ে উঠেছিলাম কাল, সেই সব মহুয়া এই সব এলাকার । পৌষ মাঘে মহুয়ার ফল পাকে । হালকা লাল রঙের ঐ ফলের গন্ধতেই চারপাশ জুড়ে নেমে আসে অসাধারণ মাদকতা । মন পড়ছে সেই গানটা - "ফাগুনের মোহনায়/ মন মাতানো মহুয়ায়/ রঙ্গিলি বিহুর নেশা কোন আকাশে নিয়ে যায়" ।

ছয়
---

আজ আমরা দেওঘরে বাবার মাথায় জল ঢেলে একটা খোলামেলা জায়গা দেখে গতকালকের মতো মাদুর পেতে বসবো । হাঁড়িতে রান্না চাপানো হবে । খেয়ে দেয়ে তপোবনের পথে রওনা দেব । সেখান থেকে যাবো ত্রিকূট পাহাড় । শোনা যায় রাবনের সাথে সম্মুখ যুদ্ধে পরাজিত রামায়নের সেই বিখ্যাত গৃধরাজ বৃদ্ধ জটায়ূর পাখার খন্ড অবশেষ ছিটকে এসে পড়েছিলো ঐ ত্রিকূটের মাথায় ।

ত্রিকূট থেকে আমরা রওনা দেবো বাসুকীনাথের পথে । হিন্দিভাষীরা একে আঞ্চলিক ভাষায় বলেন "বাস্কিনাথ" । ওখানেও বাবা ভোলেনাথের মাথায় আবার জল ঢালবো আমরা । তারপর রওনা দেব তারাপীঠের পথে । আপাততঃ তারাপীঠেই রাত্রিবাসের পরিকল্পনা আছে আমাদের ।

পরদিন অর্থাৎ আগামীকাল মঙ্গলবার আমরা তারাপীঠে তারামায়ের পূজা দেব । তারপর সেখান থেকে আবার ছুটবো নবদ্বীপ ধামের দিকে । মায়াপুরের ইস্কন মন্দিরের আরতি দেখে আবার মালদার পথে ফিরে আসবো আমরা ।

জানিনা, কি ইচ্ছা আছে ওপরওয়ালার । দেওঘর ঢুকতে এখনো প্রায় আধা ঘন্টা । ততক্ষণ একটু চোখ বন্ধ করে বিশ্রাম নিয়ে নিই বন্ধুরা ।

সাত
---
দেওঘর পৌঁছে গেলেও এখনো বৈদ্যনাথ  বাবার ধাম যেতে কিছুটা সময় বাকি ।  এখন আমরা যাবো তপন পান্ডার বাড়ি । ওখানে গাড়ি রেখে ট্যাব খানা চার্জিং এ বসাবো । তারপর পায়ে হেঁটে যাবো বাবাধাম মন্দিরে ।

এখানে আসার পরে আমরা কিছুটা সময় বেকার নষ্ট করলাম তপন পান্ডার আসার অপেক্ষায় । উনি এলেন না । আমাদের আধপাগল পাতাখোর ড্রাইভারটার জন্যে অনেকখানি সময় এখানে বরবাদ হলো । আমরা তারপর নিজেরাই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে চটি জুতো গাড়িতে রেখে খালি পায়ে এগিয়ে চললাম ।

প্রথম প্রথম খালি পায়ে চলতে একটু অসুবিধে হলেও পরের দিকে ব্যাপারটা সয়ে গেল । মাথার উপর সূয্যিমামা প্রবল প্রতাপের সাথে আগুন ঢেলেই চলেছেন বিরামহীন ভাবে । সামনেই শিবগঙ্গা । ওখানে স্নান করতে হবে আবার ।

এখন আপাততঃ বিরতি নিলাম বন্ধুরা । একটু দেখে আসি ভক্তদের উৎসাহ উদ্দীপনা উন্মাদনা । আবার পরে সময় বের করে লিখবো ।

আট
---

বৈদ্যনাথ বাবার ধাম এ জল ঢালার আগে আমরা শিবগঙ্গা তে আবার চান করে নিয়েছিলাম নিয়ম মেনে । শিবগঙ্গা নামের বিশালকায় চারকোণা জলাশয়টি নাকি বিরাট গভীর । সরোবরে ঘুরছে স্পীড বোট আর লাইফ গার্ড । গোটা জলাশয় কেই দুটো তিনটি সিঁড়ি জলে নামার পর থেকে লোহার রড আর চেন দিয়ে ঘেরা । বহুযুগ আগে এখানে রাবন রাজা শিবলিঙ্গ নামিয়ে নাকি বাথরুম করেছিলেন ।

শিবগঙ্গায় স্নান সেরে পায়ে পায়ে আর বাকী সকলের সাথে এগিয়ে চললাম আমরা বাবার মন্দিরের দিকে ।

মন্দির যাওয়ার পথে দুইপাশ জুড়ে একটানা সারি সারি দোকানপাট । সকলেই পূজার সামগ্রী নিয়ে বসে । কেউ কেউ ডাকছে । কেউ পারলে হাত ধরে টানছে । আমরা পাঁচজন আগে পিছে করে চলতে লাগলাম ।

হিন্দুদের ধর্মস্থান যে এত অগোছালো আর নোংরা হতে পারে, তার কিছুটা পূর্বতন ধারণা আমার আগের থেকেই ছিলো । ভক্তদের যেই পরিমাণ ভক্তির বহর দেখলাম, সেই পরিমাণ যদি পরিচ্ছন্নতারও বহর দেখতে পেতাম, তবে হয়তো মনের ভাবাবেগ সত্যি সত্যিই ঈশ্বর প্রেমে ঐশ্বরিক হয়ে উঠতে পারত । কিন্তু সেটা বোধহয় হওয়ার ছিলো না । তাই চারপাশের দোকানপাট গুলি সাফ হলেও পায়ে চলা রাস্তার অবস্থা রীতিমত শোচনীয় ।

যত এগিয়ে আসতে লাগলো বাবার মন্দির, ততই পাল্লা দিয়ে বাড়তে লাগলো লোকজনের উন্মাদনা আর ভীড় । আমার একটা জিনিস খুব মনে হচ্ছে । এই যে শয়ে শয়ে কোটি কোটি মানুষ আসছেন বাবার ধামে, মাথায় জল দুধ দই ঘি ফুল বেলপাতা ঢেলে দিচ্ছেন, এতে কি আদৌ বাবা ভোলেনাথ ভালো আছেন ? এত কিলো কিলো পাতা আর ফুল এখানে সেখানে পায়ে পায়ে পিষ্ট হয়ে চলেছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে, বাবার মন্দির / ঘর নোংরা আবর্জনার স্তূপে পরিণত হচ্ছে, এতে ঠিক কেমন মনে হচ্ছে বাবা ভোলানাথের ? ওনার ভক্তরা ওনাকে চান করাচ্ছেন ভালো কথা; কিন্তু চারপাশের এই অপরিচ্ছন্নতা, এই দূষণের থেকে মুক্তির উপায় ঠিক কী ? আর ভোলেবাবাই বা কেন তার বড়ো বড়ো শিষ্য ভক্তদের স্বপ্নাদেশ দিচ্ছেন না ? কেন স্বপ্নে এসে এই রকমের নারকীয় অপরিচ্ছন্নতার প্রসঙ্গ তুলে অভিযোগ করেছেন না ? তবে কি বাবা ভোলানাথ এমন দূষিত পরিবেশে জন্ম জন্মান্তরকাল একই ভাবে রয়ে যেতে চান ? তবে কি উনি শুধুমাত্রই একটা প্রস্তরখন্ড শিলা বিশেষ ? তার বেশিকিছু কি তিনি হতে চান না এই অমানবিক কলিযুগে ?

এই যুগে মানুষই যখন পাথরের মতো নিষ্প্রাণ তখন আর দেব দেবীদের কি দোষ ? তবে কি ওনাদের উপর আস্থা বা ভরসা রাখাও বৃথা ? তবে আমি এখানে কেন এলাম ? তীর্থ দর্শন ? পূণ্য অর্জন ? অতীতের পাপকর্ম স্খালন ? নাকি স্রেফ কিছু একটা লেখবার তাগিদে ? নাকি রোজকার একঘেয়ে  রুটিনমাফিক নিরবিচ্ছিন্ন দশটা ছয়টা জীবন থেকে একটা সাময়িক মুক্তি পেতে ? নাকি ছবি তুলে ফেসবুক আর হোয়াটস্ অ্যাপে পোষ্ট করে সবার কাছে নানারকমের ভালো, মাঝারি বা সস্তার মতামত পেতে ?

আমার কাছে এত সব প্রশ্নের কোনও উত্তর নেই । কারণ আমি নিজেই একটা দিকভ্রষ্ট স্থান কাল পাত্র নিরপেক্ষ অজানা আকাশ থেকে খসে পড়া শুটিং স্টার । নিজেকে আবিষ্কার করে চলেছি রোজ প্রতিনিয়ত প্রতিমুহূর্তে ।

তাই হয়তো পছন্দ আর ভালোলাগারা সময়ে সময়ে স্থান কাল পাত্র অনুসারে বদলে যায় । আর আমিও আত্মসমীক্ষণের গভীরে নিমগ্ন হই পেঁয়াজের মত একটার পর একটা খোসা ছাড়িয়ে ।

মন্দিরে প্রবেশের ঠিক মুখেই দেখলাম দর্শনার্থীদের পা ধুইয়ে দেওয়ার জন্যে বিশেষ ব্যবস্থা করা আছে । আমরা এই পথ টুকু খালি পায়েই এসেছিলাম । ভালো করে পা ধুয়ে যখন মন্দিরে প্রবেশ করলাম, জন সমুদ্রে যেন হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলো ।

একে অন্যের সাথে দূরত্ব কমিয়ে নিলাম । পায়ে চলার গতি প্রায় থেমে এলো । মন্দির প্রাঙ্গনে চাতালের প্রায় সর্বত্র জল আর জল । জলে ভেসে রয়েছে পদপিষ্ট ফুল, বেলপাতা, ভেজা চাল । ভেসে আসছে আতরের আর ধূপকাঠির ঘ্রাণ । ভেতরে অনেকগুলো ছোট ছোট মন্দির । আর মূল মন্দির দুটো । একটা বাবার আর একটা মায়ের । দুটো মন্দিরের চূড়া একে অন্যের সাথে লাল সুতো দিয়ে বাঁধা ।

আমরা চিন্তা ভাবনা করে দেখলাম যে দুটো মন্দিরের ভিতরেই প্রবেশ করে পুজো দিতে দিতে, সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ ছয় ঘন্টার আগে কিছুতেই বের হওয়া সম্ভব হবেনা । তাই আমরা মন্দিরের বাইরে রাখা ডোঙা তে জল ঢেলে দিলাম ।

এখানে একটু বলে রাখি যে, আজ আমরা বৈদ্যনাথ বাবার ধাম থেকে বেরিয়েই কাছাকাছি একটা হোটেল এ পঁয়তাল্লিশ টাকায় "ভরপেট থালি" তে দুপুরের খাওয়াটা সেরে নিলাম । এখানে আতপ চালের ভাত দিচ্ছিলো । আমি খেলাম না । বদলে খেলাম আলুর পরোটা, আচার, আলু পেঁপের ঝোল, শুকনো লঙ্কা দিয়ে আলুভাজা ।

নয়
---

এখন বেলা সাড়ে বারোটা । আমরা বৈদ্যনাথ বাবার ধাম থেকে রওনা দিলাম বাবা বাসুকিনাথ এর মন্দিরের পথে । এবার পথে পড়বে তপোবন আর তারপর ত্রিকূট পাহাড় ।

আমাদের গাড়ি তপোবন এসে ঢুকে পড়লো । এখানে ঢোকার কিছুটা আগে থেকেই দেখলাম সারি সারি দিকচক্রবাল বিস্তৃত সোলার প্যানেল, যার থেকে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন করে গোটা শহরবাসীকে দূষণমুক্ত বৈদ্যুতিক পরিষেবা দেওয়া যায় ।

এই সময়টায় গরম মারাত্মক । বেশ গায়ে জ্বালা ধরানো রোদ । আমি আর তপোবনের পাহাড়ে চড়লাম না । আমি রাম আর ড্রাইভার রয়ে গেলো । আর আমাদের সাথের দুই জগাই মাধাই পাহাড় চড়তে অতি উৎসাহ নিয়ে চলে গেলো ।

আমি আর রাম ল্যাট্রিন খুঁজতে লাগলাম । পেটে একটা হাল্কা চাপ আর মোচড়ের অনুভূতি হচ্ছিলো খানিক্ষণ ধরেই । অত ভোরে সাত সকালে উঠে পেট ভালো করে পরিস্কার হয়নি আর কী । তার উপর আছে গাঁজার কনস্টিপেশনের সাইড এফেক্ট ।

গাঁজা টানলে মারাত্মক খিদে পায় । শরীর ঢিলে ঢালা ধীরস্থির হয়ে যায় । চলা ফেরা নড়াচড়ার গতি কমে আসে । আর জল তেষ্টা পায় খুব । আর পেটটাও ভালোমতন করে কষে যায় । আর এই সবকটা লক্ষণই আমার উপরে কম বেশী চড়াও হয়ে পড়েছিলো ।

পেট খালি করে শৌচালয়ের পাশেই রামের অপেক্ষা করতে লাগলাম । পাশেই একটা বয়স্ক বুড়ি বসে ছিল টাকা নেওয়ার জন্যে । সুলতানগঞ্জের মতো এখানেও সেই একই রেট । জনপ্রতি দশ টাকা ।

বুড়িটা জানালো নেপালী আর বাঙালী হিন্দু বাবুরা নাকি খুব ভালো, ভদ্র সভ্য গোছের । টাকা পয়সা নিয়ে খুব বেশী দরদাম কষে না । খুব বেশী ঝামেলাতে জড়ায় না । নিরীহ শান্তিপ্রিয় বলতে যা বোঝায় আর কী । তবে ঐ বুড়ির মতে বিহারী গুলো মহা বদ । ওরা ঝগরুটে, হাঙ্গামাবাজ । কথায় কথায় মুখ খারাপ করে মা বোন মাসি পিসি তুলে গালি গালাজ করে । আর টাকা পয়সা চট্ করে দিতে চায়না । আর গাদা খানেক করে ল্যাট্রিন করে । জল একেবারেই দেয় না । বুড়ি কিছু বললে উল্টে বুড়িকে বলে ঐ দশ টাকা করে সে নিচ্ছে - এর অর্থ সাফাই করবার সব দায় দায়িত্ব নাকি ঐ বুড়িয়ার ।

রাম আর আমি গাড়িতে এসে বসলাম । বাইরে খুব গরম । তবে আগুনের হলকা ভাবটা একটু কম । কারণ একটা ঠান্ডা হাওয়া ছাড়ছে মাঝে মাঝেই । এর মধ্যেই একজন তালপাতার টুপি আর হাতপাখা নিয়ে এসে হাজির । আমি দশটাকা দিয়ে একটা হাতপাখা নিলাম । আমাদের সঙ্গী দুইজন ইতিমধ্যে এসে পড়ায় আমরাও গাড়ি ছেড়ে এগিয়ে চললাম ত্রিকূটের দিকে ।

খানিকটা চলার পরেই দূর থেকে নজরে এলো ত্রিকূট পাহাড় শ্রেণী । সবুজ অথচ শুকনো এবং রুক্ষ প্রকৃতি । আর বাইরে মারাত্মক রোদের তেজ । আমার আর এই রোদে ঝলসে আগুনে গরমে পুড়ে পাহাড়ে চড়তে মন চাইলো না ।

এই পাহাড় নিয়ে একটা মজার গল্প আছে । আজ থেকে অনেক বছর আগে একটা ছোট্ট মেয়ে তার মা বাবার হাত ধরে এখানে এই পাহাড়ে এসেছিলো । তারপর সে আর তার কলকাতার বাড়িতে ফিরে যায়নি এখান থেকে । মা বাবার অনেক চেষ্টার পরেও সে শেষদিন পর্যন্ত এখানেই থেকে যাওয়ার জন্যে মনস্থির করে ফেলে ।

এখানকার সরকার এবং প্রশাসন মেয়েটির জন্যে ঐ পাহাড়ের উপর থাকার বন্দোবস্ত করে দেয় । মেয়েটি এখানকার এবং আগত টুরিস্টদের কাছে তাদের আগাম ভবিষ্যৎ বলার জন্য অত্যন্ত জনপ্রিয় হতে থাকে । এই ঘটনাটি আমি শুনলাম আমার ড্রাইভারের মুখ থেকে । সে বছর পাঁচেক আগে ওনাকে দেখেছিলো । তখন তার বয়স ছিলো নব্বই বছরেরও বেশি । এখন হয়তো আর সেই বৃদ্ধা রমনী জীবিত নেই ।

ত্রিকূটের উপর রোপওয়ে আছে দার্জিলিং এর মতো । এখানেও দার্জিলিং এর মতো এক পাহাড়ের মাথা থেকে অন্য পাহাড়ে নিয়ে যাওয়ার বন্দোবস্ত করা আছে । আমাদের আর মেজাজ ছিলো না । এনার্জিও ছিলো না এই দাবদাহে উপরে চড়বার । সুতরাং গাড়ি আর থামানো হলো না ।

এবার আমরা এসে থামলাম ঘড়িশ শালে । জায়গাটা "প্যাঁড়া মন্ডী" নামেই বেশি পরিচিত । আমরা সবাই গাড়ি থেকে নেমে পড়লাম । দেখি সব দোকানদারেরা আমাদেরকে - "ও বম্ ভাই, ইধার আইয়ে" - বলে ডাক দিচ্ছে । আমরা দু তিনটে দোকানে ঢুকে স্যাম্পেল টেস্ট করে কমবেশী একই স্বাদ পেলাম ।

অবশেষে একটা দোকানে মনস্থির করে ঢুকে পড়লাম । আমাদেরকে বলা হলো সবটাই ফিক্সড প্রাইস । সাইজের বা স্বাদের কোনও ছোটো বড়ো বা মাঝারি ভাগ ছিলো না । দু'শো টাকা কিলো । আমি দুই কিলো প্যাড়া নিলাম আর রাম নিলো আড়াই কিলো ।

এরপর আমাদের গাড়ি এসে থামলো বাবা বাসুকীনাথ এ । আমরা পঞ্চাশ টাকা চার্জ দিয়ে পার্কিং স্পেসে গাড়ি রাখলাম । আমি আর গাড়ি থেকে নামলাম না । ড্রাইভারও রয়ে গেলো আমার সাথে । ওকে একটা বাবার প্রসাদী ধোঁয়া বানাতে বললাম ।

আমি সকাল থেকে এই প্রথম বাবার ছিলিম টানলাম । কারণ ভরা পেট ছাড়া আমি এই মহাপ্রসাদ টানার সাহস পাইনা । আমার সাথের লোকজন সকাল থেকেই এই প্রসাদ টেনে চলেছে । গোটা রাস্তাতেই ওরা তাই সব সময়ে মুডে ।

প্রায় আধ ঘন্টার ভিতর বাসুকীনাথের ডোঙা তে জল ঢেলে ওরা ফিরে এলো । আমরাও আর কালবিলম্ব না করে এগিয়ে চললাম দেওঘরের যাত্রা শেষ করে তারাপীঠের পথে । এখানকার কয়েকটা ব্যাপার দেখে আমার মন খুব মজে গেলো । একটা হলো যারা পায়ে হেঁটে বাবাধামে জল ঢালতে যাচ্ছেন, তাদের মুখে কিছু কিছু টিপিক্যাল্ শব্দ বন্ধনী । যেমন "সাইড ব্যোম্" ( যখন তাদের চলার পথে কেউ বাধা তৈরি করছে অনিচ্ছাকৃত ভাবে ), "ব্যোম্ ভাই" ( গেরুয়া পরিহিত সেই সব তীর্থযাত্রী, যারা বাবার মাথায় জল ঢালার পূণ্যার্জনে এসেছেন ) । আরো মজার লাগলো ওদের মুখে মুখে কাটা ছোট ছোট ছড়া _

১।।
আগে ওয়ালা ধীর কদম্
পিছে ওয়ালা তেজ কদম্

বোলতে রহো বোল ব্যম্
বোল ব্যম্ বোল ব্যম্

২।।
চাচা কদম্ ভাবী কদম্
বোল ব্যম্ বোল ব্যম্

৩।।
দাদা বম্ বৌদি বম্
চলতে রহো বোল ব্যম্

৪।।
বোলো কমারিয়া বোল ব্যম্
বোল ব্যম্ বোল ব্যম্

৫।।
চলতে রহো বোল ব্যম্
বোল ব্যম্ বোল ব্যম্

আরো একটা ব্যাপার লক্ষ্য করলাম ঝাড়খন্ড থেকে বীরভূম আসার পথে । সেটা হলো রাস্তার ধার দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট ছোট আদিবাসী ছেলে মেয়েদের অদ্ভুত আচরণ । ব্যোম্ ভাইদের প্রাইভেট গাড়ি আসতে বা যেতে দেখলেই তারা সকলে মিলে তারস্বরে "বোল্ বম্ বোল্ বম্" বলে চেঁচাতে লাগলো ।

এটা করার উদ্দেশ্য একটাই । ব্যোম্ পার্টিদের মনোযোগ আকর্ষণ করা । তীর্থযাত্রীদের অনেকেই গাড়ির ভিতর থেকে ওদের দিকে পয়সা ছুঁড়ে ছুঁড়ে দেয় । আর সেটা সংগ্রহ করতে ঐ বাচ্চা ছেলেমেয়েদের ভিতর হুটোপুটি লেগে যায় ।

আমরা ফেরার পথেও বেশ খানিকটা পাহাড়ি এলাকা আর ফরেস্ট এরিয়া পেলাম । এই অঞ্চলের বেশিরভাগ রাস্তাই বেশ ভালো । গাড়ি চালিয়ে বা চড়ে বেশ আরাম ।

বীরভূম ঢোকার একটু আগের থেকে রাস্তার দুইপাশে পাথর ভাঙার ক্র্যাশার দেখলাম । আর লক্ষ্য করলাম চারপাশে একটা মোটা ধূলোর আস্তরণ । ধূলোটা ঐ ক্র্যাশার থেকে পাথর ভাঙার সময় উৎপন্ন হয়ে চারপাশে মেঘের মতো হয়ে থাকে অনেকক্ষণ । আমি নাকে গামছা মুড়ে চুপ করে বসে রইলাম ।

তারাপীঠ ঢুকে আমরা এসে উঠলাম ___ লজে । একটা ছয় বেড ওয়ালা বড়োসড়ো রুম পেলাম সাড়ে তিনশো টাকায় । রুমে এসে প্রথমেই হাত পা মুখ ধুলাম । তারপর সটান বেডে । শরীর বেশ ক্লান্ত ছিলো । কখন যে ঘুম লেগে গেলো চোখে, টের পাইনি ।

ঘুম ভাঙলো মশার কামড়ে । জানলা আর বাথরুমের দরজা খুলেই শুয়ে পড়েছিলাম । ইতিমধ্যে পাশের ডোবা থেকে যে গাদাখানেক মশা এসে দলবদ্ধ ভাবে আমাকে আক্রমণ করে বসবে, সেটা খেয়াল ছিলোনা । উঠে পড়লাম বিছানা ছেড়ে ।

ঘরে মোবাইলের টাওয়ার পাচ্ছিলাম না । হোটেলের বাইরের দরজার দিকে গিয়ে টাওয়ার পেলাম । ফোনে বাড়িতে একটু কথা বলতে না বলতেই কেটে গেল । তারপর আর লাইন পাইনি ।

এদিকে মাথায় দেখি টিপ্ টিপ্ করে বড়ো বড়ো জলের ফোঁটা পড়তে শুরু করেছে । আকাশ পুরো কালো । আমি আর বাইরে দাঁড়ালাম না । যাত্রাপথে এতক্ষণ বৃষ্টি পাইনি । এবার যে কি হবে জানিনা ।

এদিকে ওরা সাজ সরঞ্জাম নামিয়ে বাজার থেকে খাসির মাংস নিয়ে এসে রান্না চাপালো । মাংসের গন্ধে চারপাশ ম ম করতে লাগলো । আমি একটা বীয়ার আনালাম । আর ওরা ওদের জন্যে হুইস্কি আনালো ।

খাওয়া শেষ করে আমরা যে যার মত শুয়ে পড়লাম মশার ধূপ জ্বালিয়ে । ক্লান্ত শরীর আর হাল্কা নেশায় শুতে না শুতেই চোখের পাতা ভারী হয়ে নেমে এলো ।

দশ
---

ঘুম ভাঙতে ভাঙতে সকাল সাড়ে সাতটা বেজে গেলো । বিছানা ছেড়ে উঠে বাইরে হোটেলের সামনের দিকটায় গিয়ে কিছুক্ষণ দাঁড়ালাম ।

আজ ৮ই আগস্ট, মঙ্গলবার । আজকের দিন, অর্থাৎ ০৮ + ০৮ + ২০ + ১ + ৭ = ২৬ > ২ + ৬ = ৮, অর্থাৎ সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে আজকের দিনটির সংখ্যামান ৮  । কি অদ্ভুত সংখ্যাতাত্ত্বিক সংযোগ !

ঘরে ফিরে এসে ফ্রেশ হলাম । খুব ভালো করে স্নান করলাম । ইতিমধ্যে রামও উঠে পড়েছে । আমরা দুইজন হাঁটাপথে মন্দিরের দিকে রওনা হলাম ।

আমাদের গেস্ট হাউসের উল্টো দিকেই একটা চায়ের দোকান । হোটেলের মালিক গতকাল বিকেলেই জানিয়ে দিয়েছিলো ঐ দোকানের বৌদির হাতে চা এর সুনামের কথা ।

আমরা রাস্তা পার করে বৌদির দোকানের সামনে পাতা বেঞ্চিতে গিয়ে বসলাম । কথা প্রসঙ্গে রাম জানালো আমাদের ড্রাইভারটার প্রচন্ড জ্বর । গতকাল রাত থেকেই হাই টেম্পারেচার । সুতরাং ওর পক্ষে আর নবদ্বীপ ধাম - মায়াপুর অবদি যাওয়া সম্ভবপর নয় ।

আমাদের সিদ্ধান্ত বদলাতে হলো । ঠিক হলো আজ আমরা তারা মায়ের দর্শন করে গেস্ট হাউসে ফিরে নিরামিষ রান্না খেয়ে আবার মালদার পথে রওনা দেব । আর যেহেতু আমি ড্রাইভিং টা খুব একটা খারাপ করিনা, সুতরাং এবার ফেরার পথে স্টিয়ারিং হুইল আমি ধরবো ঠিক হলো ।

চা টা অসাধারণ খেলাম বৌদির হাতে । দুইজনে এটা সেটা হাবিজাবি নানান কথা বলতে বলতে বাজারের পথ ধরে মায়ের মন্দিরের দিকে এগিয়ে গেলাম । বাজারের ভিতরের টালি বসানো সুন্দর ছিমছাম্ পরিস্কার পথ ধরে এগোতে লাগলাম আমরা । পথের ধারে মিষ্টির দোকানে দেখলাম বিশাল বড়ো বড়ো ল্যাংচা । ঠিক হলো ফেরার সময়ে এক পিস্ করে টেস্ট করে দেখবো ।

দেখতে দেখতে মায়ের মন্দিরে প্রবেশ করলাম আমরা । আজ যেহেতু মঙ্গলবার, সুতরাং ভীড়টাও বেশ অস্বাভাবিক রকমের বেশী বলে মনে হলো । কারণ এর আগেও আমি মায়ের এখানে বার তিনেক এসে ঘুরে গেছি ।

আমরা মন্দিরে মায়ের দরজার সামনে যে উঁচু মতন বিরাট ছাউনি দেওয়া বসার জায়গাটা আছে, সেখানে ঠায় দাঁড়িয়ে রইলাম । জায়গাটা লোকে লোকারণ্য । প্রায় সকলের হাতেই পুজোর ডালি । চারপাশটা ফুল আর ধূপকাঠির গন্ধে ম ম করছে । এপাশ ওপাশ থেকে ভেসে আসছে পান্ডা আর লাল জামা পরা পুরোহিতদের মুখে মায়ের মন্ত্রের অশুদ্ধ বাংলায় ভুল উচ্চারণ । কানে এসে বাজছে রীতিমত শব্দগুলো ।

মায়ের দরজা খোলা ছিলোনা । দরজা খোলার সময় পার হয়ে গেছে অনেকক্ষণ আগেই । অথচ দরজা খোলার নামগন্ধ নেই । একজন আবার অধৈর্য্য হয়ে এর কারণ জানতে চাইলে পাশ থেকে এক পান্ডা জানালো, আজ নাকি মায়ের অনেক দেরীতে ঘুম ভেঙেছে । কি অদ্ভুত আজব ব্যাখ্যা রে বাবা !

গোটা বিশ্ব ব্রহ্মান্ডের ধারিকা বাহিকা পালিকা পরমব্রহ্ম জগৎজননী জগদম্বা জগন্মাতা কেমন করে ঘুমিয়ে থাকেন ? তিনি কি আমাদের মত স্থূল শরীরের অধীশ্বরী ? তাঁর কি আমাদের মতো চাকরি বা ব্যবসা বা দালালি করা কাজ ?

তাঁকে আমরা সাকার রূপে দেখতে চাই । আমাদের মনের কল্পনায় তিনি খান ঘুমান জামাকাপড় পড়েন । আমরা আমাদের কামনা বাসনা ইচ্ছা চরিতার্থ করতে আমাদের পছন্দের যা কিছু, তা তাঁর চরণে উৎসর্গ করি । সেই উৎসর্গের পর সেটাই হয়ে যায় মায়ের প্রসাদ ।

যাই হোক, অবশেষে দরজা খুলে গেলো । ভিতর থেকে মায়ের অপরূপ আলোর ছটা ছিটকে এসে পড়লো সকলের নয়নে । সবাই "মা মা" বলতে লাগলো । নানা জায়গা থেকে হাজারে হাজারে "জয় তারা" / "জয় মা তারা" / "তারা মায়ের জয়" - এসব শব্দগুচ্ছ ভেসে আসতে লাগলো ।

সামনের নারী পুরুষেরা দুই হাত তুলে প্রণাম করতে লাগলো মা'কে । তাদের অধিকাংশের হাতেই হয় মোবাইল ফোন নয়তো পুজোর ডালি । মায়ের মুখোমুখি আমি দাঁড়িয়ে । অথচ মায়ের মুখ ওদের জন্যে দেখতে পাবোনা ! এ কেমন কথা !

আমি এবার মায়ের মুখটা দেখবো বলে ভীড় ঠেলে, একে তাকে পাশ কাটিয়ে একেবারে রেলিং এর সামনে চলে এলাম । ওদিকে মায়ের মন্দিরের দরজার সামনে যে লোহার রেলিং টা আছে, সেখান দিয়েও পান্ডারা টপকিয়ে আসা যাওয়া করতে লাগলো । আমি দুই পায়ের পাতায় ভর দিয়ে আরো কিছুটা উঁচু হয়ে দাঁড়াতে চেষ্টা করতে লাগলাম ।

অবশেষে মা দেখা দিলেন । অনেকক্ষম সময় নিয়ে পরম তৃপ্তি নিয়ে মন ভরে দেখলাম মায়ের মুখ খানা । সেই সময়টুকুর জন্য আমি গোটা জগৎ সংসারকে ভুলে গেলাম । মুছে গেলো আমার সবটুকু অস্তিত্ব । মুছে গেল এই অস্থায়ী জগত সংসার । আমার নাম ধাম কাজ বন্ধু অফিস পরিজন লোকজন পরিবার । শুধু মনে হতে লাগলো মায়ের মুখের দিকে পলকহীনভাবে চেয়ে থাকি । এই সংসার দুনিয়া থেকে যেন আর আমার কিচ্ছু চাওয়ার নেই ।

অদ্ভুত ব্যাপার ! আজ অবদি আমি কতবার কত ধর্মস্থানে গেছি । কখনো কোনো দেবতা বা কোনও দেবদেবীর কাছে কোথাও কিছু চাইতে পারিনি । আর যদিও বা চেয়েছি, বলেছি মানুষের মতো গুণসম্পন্ন মানুষ করে তোলো আমায় । আর সকলকে ভালো রেখো । আজও তো কিছুই চাইতে পারলাম না । কেন পারলাম না জানিনা । তবে মনের ভিতরে অপার্থিব এক আনন্দধারা সেই ক্ষণস্থায়ী সময়ের জন্যে বয়ে গেলো ।

ঐ কিছুটা সময় যেন একটা ঘোরের ভিতরে ছিলাম । নাহ্ । নেশাভাঙ্ কিচ্ছু করিনি । খালিপেটে জল আর দোকানের চা বিস্কুট । ব্যাস্ । তবে এই রকমের ভাবনাগুলো আমার কেন আসে মায়ের কাছে এলেই ?

আসলে আমি এক এক সময়ে নিজেকেই নিজে চিনতে পারিনা । আর তাই হয়তো প্রতিনিয়ত নতুন নতুন ভাবে নিজেকে আবিষ্কার করি নতুন ভাবনায় । আমার একটা দিক ঘোর অন্ধকার । সেদিকে শুধুই হতাশা রাগ ক্ষোভ মোহ আর লোভের অন্ধ হাতছানি । আর একদিকে শুধুই আলো । সমস্ত মায়া মোহের বন্ধন থেকে চাওয়া পাওয়ার উর্দ্ধে উঠে যাওয়া । এই দুই গোলার্দ্ধের ফাঁকে আমি সময়ের প্রবাহে ভাসমান অস্তিত্বহীন এক ভ্রাম্যমাণ স্বত্ত্বা ।

মন্দিরের ভিতরে আনা ব্যান্ডপার্টি শ্যামা মায়ের গানের কলি বাজাতে শুরু করে দিলো । রামের ফোন আসতে হাতের ট্যাবলেট কেঁপে কেঁপে উঠলো । রামের কল আসায় ঐ অদ্ভুত ঘোর থেকেও বের হয়ে এলাম । মন্দির থেকেও বের হয়ে এলাম ।

তারপর একটা মিষ্টির দোকানে ঢুকে গরম গরম ল্যাংচা আর কালোজাম খেলাম দুজনে এক পিস্ করে । সদ্য বানানো গরম গরম মিষ্টির স্বাদ অনেকক্ষণ মুখে লেগে রইলো । আমরা হাঁটাপথে গেস্ট হাউসের দিকে ফিরতে লাগলাম ।

রান্না চেপে গেছিলো । আজকের মেনু ভাত ডাল আর ঘি দিয়ে আলুসেদ্ধ মাখা । ঘি টা আনা হয়েছে গয়লার বাড়ি থেকে । এক্কেবারে খাঁটি গাওয়া ঘি বলতে যা বোঝায় আর কি ।

আমরা পাঁচজনে একসাথে বসে পড়লাম খেতে । গতকাল রাতে আমি খুব বেশী খেতে পারিনি । বীয়ারের সাথে রাম মিশিয়ে খেয়ে ফেলেছিলাম অনেকটা । তারপর আবার বাবা ভোলানাথের প্রসাদও টেনেছিলাম জোরসে । সাথে চাট ছিলো পাঁপড় আর বাদাম ভাজা । আমার পেটে অ্যাসিড ফর্ম করে গিয়েছিলো । খুব বেশী করে জল খেয়ে গলায় আঙুল দিয়ে টয়লেটে গিয়ে বার তিনেক বমি করে সব উগরে দিয়েছিলাম । তারপর শুধু জল খেয়ে শুয়ে পড়েছিলাম । আর ঘুমটাও সাথে সাথে এসে গেছিলো ।

আমার রাতের মাংস ভাত ওরা ঢাকা দিয়ে তুলে রেখেছিলো । ভেবেছিলো আমি পরে হয়তো রাতে উঠে আবার খেতে বসবো । কিন্তু আমি আর ঘুম থেকে উঠিনি । সকালে উঠে আর মাংস ভাত খেতে মন চায়নি । তার উপর গত রাত্রে চন্দ্রগ্রহণ লেগেছিলো । আর আজ মঙ্গলবার আমি সাধারণতঃ নিরামিষ খাই । তাই ভোরে উঠে কুকুর ডেকে ঐ মাংসভাত ওদের কে খাইয়ে দিলাম ।

এখন আমরা প্যাকিং সেরে মালদার পথে রওনা হয়ে যাবো আর একটু পরেই । এবার গন্তব্য ঘরের ছেলে ঘরে ফেরা । কাল থেকে আবার সেই অফিস । আবার সেই দালাল সেই দাদাগিরি সেই মুহুরীদের উৎপাত আর হুজ্জোতি । বকলমে আমরা রাজস্ব আধিকারিকেরা হলাম জমিহীন জমিদার । একটা ছোট্ট প্রবাদ আছে আমাদের নিয়ে । বলা হয় -  জমির দপ্তরে ওপরে নাকি ভগবান আর নীচে নাকি রেভিনিউ অফিসার ।

আমার উপরে ওঠা বা নীচে থাকার কোনও ইচ্ছা বা অভিপ্রায় নেই । আমি আমার মতো করে ভাবতে, থাকতে, চলতে আর বাঁচতে চাই । এই নশ্বর জীবনটা অর্থহীন সাধারণের নজরে বাঁচতে ভালো লাগে না আমার । আমায় কে কেমন ভাবলেন বা ভাববেন, এ নিয়ে আমার বিন্দুমাত্র মাথাব্যথা নেই ।

এবার আমরা গেস্ট হাউস ছেড়ে বের হয়ে এলাম । এখন গাড়ির স্টিয়ারিং এ আমি বসবো । সুতরাং আর লেখালেখি করবার বা বলবার মতো কিছু নেই আমার এই মুহূর্তে । এখানেই কলম দিয়ে শেষ দাঁড়িটা টেনে দিলাম । ইতি টানলাম । সকলকে শুভ দ্বিপ্রহর । আপনারা সকলে ভালো থাকুন । আনন্দে থাকুন ।

(সমাপ্ত)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি