মহাপুরুষের আকাল

অতীতে বাংলার মাটি থেকে উঠে এসেছেন পরমপুরুষ শ্রীরামকৃষ্ণ পরমহংসদেব, স্বামী বিবেকানন্দ, ঋষি অরবিন্দ, নেতাজী সুভাষচন্দ্র বসু, গুরুদেব রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর । উঠে এসেছেন আরও অনেক মহামানব বিভিন্ন দিক থেকে উজ্জ্বল নক্ষত্রের মতো ।

সেই স্বর্ণযুগের সময় আমরা ফেলে এসেছি অনেক পিছনে । এখন আর নতুন করে কোনও নাম বা মুখ পাচ্ছিনা আমরা দেখবার মতো, ভাববার মতো, আদর্শ হিসেবে মেনে নেওয়ার মতো ।

কেন ?

এ নিয়ে কিছুটা ভাবনা চিন্তা করলাম । অবশেষে উঠে এলো কারণ ____

এক ।। মাতা পিতা আত্মীয় পরিজন শিক্ষককুল__ এদের দেখেই তো শিখি আমরা ।

এখনকার মা বাবা শিক্ষকগোষ্ঠী আমাদের কে Well Trained করে তুলতে চান __ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার কর্পোরেট পার্সন বা আমলা হিসেবে ।

নৈতিকতার ধার ধারেন না কেউ । তারা নিজেরাও অবসরে সুযোগ পেলেই ফেসবুক হোয়াটস্ অ্যাপ নিয়ে মেতে থাকেন । বোকাবাক্সের টিভি সিরিয়াল, গান, সিনেমা আর সংবাদ চ্যানেলেই মজে থাকেন । বই পড়ার অভ্যাস এখন আর প্রায় নেই বললেই চলে । পরনিন্দা পরচর্চা, আত্মমগ্নতা আত্মতুষ্টি এতেই আমরা যেন বেঁচে আছি । অপরের ভালো দেখলে হিংসায় জ্বলে উঠি । আত্মসমালোচনা করিনা । নিজের সব কিছুকেই ভালো মনে করি । সামান্য কিছু করলেই অহংকারে মাটিতে পা পড়তে চায় না আমাদের । ভালোবাসি প্রয়োজন আর স্বার্থবোধে । স্বার্থ ফুরালেই ভালোবাসাও পালিয়ে যায় ।

যদি মাতা পিতা গুরুজন শিক্ষককুলের এমন অভ্যাস হয়, তবে তার অনুকরণেই তো সময় যাবে শিশু মনের । এটাই স্বাভাবিক ।

তাই এখন কার ছেলে মেয়েরা মাঠে খেলতে যায় না খুব একটা । স্কুল কোচিং আর বাড়ি । আর মোবাইলে গেম খেলা বা মা বাবা দাদা দিদি দের মতো ফেসবুক হোয়াটস্ অ্যাপ নিয়ে মেতে থাকা ।

শরীরচর্চা কমেছে । শরীরের বিকাশ রুদ্ধ হলে তা অবশ্যই মনের জগতে প্রভাব বিস্তার করবে । আর সেটাই হচ্ছে । বৌদ্ধিক জগতের বিকাশও তাই শুকিয়ে মজে যাচ্ছে মরা নদীর মতো । খুব দ্রুত হারিয়ে যাচ্ছে শৈশব ।

আর আমাদের আরো একটা বড়ো সমস্যা হলো ___ আমরা অন্যের মুখের কথাকেই মেনে নিই । নিজেরা লেখাপড়া করিনা । ভাবিনা । আর যতটুকু পড়ি, সেটাও নম্বর বা প্রয়োজনভিত্তিক ।

এর কারণ ছোটবেলা থেকে কোচিং আর নোটস্ মুখস্থ করবার প্রবণতা । স্বাধীন চিন্তা ভাবনার চর্চা আর বিকাশ তাই এখন কম । সবাই সিস্টেমের দাসানুদাস ।

Counselling আর Guidance এর নামে মেশিনে পরিণত হচ্ছে আমাদের সন্তান শিশুরা । যেমন করে ওদের মগজে Programming set করা হচ্ছে __ তেমন করেই ধোলাই হচ্ছে মগজের ।

শিক্ষা বলতে শুধু কিছু বই মুখস্থ করে নম্বর পাওয়া নয়, কোনও প্রতিষ্ঠান প্রদত্ত কিছু কাগজের সার্টিফিকেট বা মানপত্র নয় __ মানুষের অন্তরে যে ঐশ্বরিক ভাব বা দেবত্বের অধিষ্ঠান; তার বিকাশ আর প্রকাশ কেই আমরা শিক্ষা বলে মেনে নিতে পারি । Education is the manifestation of perfection, already in man __ Swami Vivekananda __ এ যেন বারবার করাঘাত করে মনের দরজায় ।

তাই আমার মনে হয় সবার আগে নিজেদের ভাবনাকে বদলাতে হবে । সততার সাথে পড়তে হবে অনেক । ভাবতে হবে । আর সেই ভাবনাগুচ্ছ কে লিপিবদ্ধ করতে হবে অক্ষর বন্ধনী মালায় । আবার পুনরায় সেই ভাব ও ভাবনার বিচার বিবেচনা করতে হবে । নয়তো আগামী দিনের সংস্কার এর অবকাশ অবরুদ্ধ হয়ে যাবে ।

আমাদের ঘর থেকে অবশ্যই মেধাবী ছাত্র ছাত্রী বের হচ্ছে । কেউ ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার গবেষক অধ্যাপক হচ্ছেন । কেউ বা হচ্ছেন আমলা খেলোয়াড় বা ব্যবসায়ী । অর্থ রোজগার আর ক্ষমতার মসনদ দখল এখন সকলের মূল লক্ষ্য । ক্ষমতার অপব্যবহার আর আত্মপ্রচার আত্মপরিচিতি নিয়েই সকলে মজে রয়েছেন ।

তবে সত্যিকারের মান আর হুঁশ (বোধ) যুক্ত মননশীলতার মানুষ আর তেমন আসছেন না । এর জন্যে কিন্তু আমরাই দায়ী । আমাদের নির্মিত সিস্টেম দায়ী ।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বা রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব স্কুলের গন্ডি পার করতে পারেন নি । তবুও দুনিয়াজুড়ে তাঁদের অসংখ্য অনুরাগী । তার কারণ তাঁরা Self Taught...

সুতরাং স্বাধীন ভাবনা চিন্তা চেতনার বিকাশ ___ আর পিতামাতা শিক্ষক গুরুজনদের আদর্শ সৃজনশীল সাংস্কৃতিক জীবন যাপন ___ সন্তানকেও মহা মানব করে তুলতে সক্ষম হবে ।

শরীর আর মগজের সমান তালে পাশাপাশি চর্চা করতে হবে । শিক্ষক শিক্ষিকাদের ভাবনাচিন্তা আর জীবনযাত্রা হতে হবে সহজ, সরল, স্বাভাবিক এবং তা ছাত্র ছাত্রীদের কাছে অনুকরণীয় হয়ে ওঠে ।

মনে রাখতে হবে যে, আমরা নিজেরা যেমন আচরণ করবো, যেমন ভাবনা চিন্তা আর ব্যবহার করবো, আমাদের সন্তানেরাও তেমন করেই আমাদের অনুসরণ ও অনুকরণ করবে ___ অর্থাৎ গাছ যেমন হবে, গাছের পরিচর্চা যেমন হবে, তার ফুল আর ফলও তেমনি হবে __ এটাই অনুগ্রহ করে মাথায় রাখবেন ।

@ রাজেন্দ্র

●■●■●■●■●■●■●■●■●■●■●■●

রামকৃষ্ণ মিশনের একজন মহারাজকে প্রশ্ন করা হয়,
"মহারাজ,এত মহাপুরুষ কিভাবে ভারতীয় উপমহাদেশে জন্ম নিতেন ?আর বর্তমানে কেন আর সেই মহাপুরুষরা জন্মায় না ?"অসাধারণ উত্তরে মহারাজ বলেছিলেন,
"আকাশে প্লেন ওড়ে,সে তো আর যেখানে সেখানে ইচ্ছামত নামতে পারে না !তার নামার জন্য উপযুক্ত এয়ারপোর্ট প্রয়োজন হয় !ঠিক সেই রকম এক সময় ছিল যখন এই ভারতবর্ষে উপযুক্ত 'মা' ছিল।এখন সেই এয়ারপোর্ট নেই,তাই বড় বড় প্লেন আর নামতে চাইলেও পারছে না"।

আধুনিক মনঃ বিজ্ঞানের মতে,সন্তান কেমন মানুষ হবে সেটা ৮৫% নির্ভর করে মা-এর উপর।আর তা নির্ধারণ হয়ে যায় মায়ের গর্ভে সন্তান আসাএবং জন্মের ৫ বছরের মধ্যে।মায়ের চিন্তা,কথা,ভালো লাগা- মন্দ লাগা,রুচি,আদর্শ,সন্তানের উপর দারুনভাবে প্রভাব ফেলতে থাকে গর্ভে থাকা অবস্থাতেই।মায়ের কষ্ট, তার কষ্ট।মায়ের আনন্দ, তার আনন্দ।মায়ের খাবার, তার খাবার।তাহলে মায়ের ইচ্ছা, তার ইচ্ছা হবে না কেন !!মায়ের আদর্শ, তার আদর্শ,মায়ের জীবনবোধ,সন্তানের জীবন বোধ হবে।সেখান থেকেই তার শিক্ষা শুরু 3 Idiots এরAll is Well এর মত।

আমরা আজও সে যুগের কৌশল্যাকে মনে রাখি,পুত্র রামের কারণে।এ যুগে ভুবনেশ্বরী দেবীকে চিনি কারণ,তিনি স্বামী বিবেকানন্দের 'মা' ছিলেন।প্রভাবতী দেবীকে চিনি,কারণ তিনি নেতাজী সুভাষ চন্দ্র বসুর 'মা' বলে।ভগবতী দেবীকে চিনি,কারণ তিনি বিদ্যাসাগরের 'মা' ছিলেন।সারদা দেবীকে মনে রেখেছি,কারণ তিনি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের গর্ভধারিণী ছিলেন।যুগে যুগে কত মহাপ্রান এসেছেন আমাদের পথ দেখানোর জন্যে।বারে বারে তারা আমাদের বলেছেন,যদি জীবন সার্থক করতে চাও,তাহলে এই পথে এসো।আমরা তাদের কথা না শুনে,চলি উল্টো পথে।এখন কার সময়ে কয়জন বাবা-মা আছেন,যারা এমন সন্তান চান ??

আমাদের কি অহঙ্কার -আমরা আধুনিক,আমরা বিজ্ঞান মনস্ক lআমাদের ভদ্রতা -সভ্যতা গাদা-গাদা বই পড়ায়,অনেক সার্টিফিকেটে,ভাল রোজগারে,ফ্ল্যাট,গাড়ি বাড়ি,স্যুট-বুট,দামি শাড়ি,গয়না,
Internet,
i-phone,
i-pad,
Tab,
Capsule...etc
কিন্তু.....কত আশা নিয়ে ছোট্ট দেব শিশুটি অন্ধকার জগৎ থেকে এলো,তাকে কি আমরা সত্যিকারের আলোর সন্ধান দিতে পারছি ?সে পথ তো আমাদেরই অচেনা।

ছোট্ট নরেন (তখনও বিলে) একটা অন্যায় করল।
মা তাকে কোন কটু কথা না বলে,কোনও শাস্তি না দিয়ে,একটা কাগজে সেটি লিখে ঘরে টানিয়ে দিলেন।দুরন্ত বিলের পড়ায় মন নেই,মা পড়ছেন,বিলে শুনছে,সব আয়ত্ত হয়ে যাচ্ছে।মা শিক্ষা দিচ্ছেন,"বাবা, জীবনে যেটা সত্য বলে জানবে, কখনও সেই আদর্শ থেকে সরে এস না।"

তাই তো পরবর্তীতে আমরা পেলাম"সত্যের জন্যে সব কিছু ত্যাগ করা যায়,কিন্তু কোনও কিছুর জন্য সত্যকে ত্যাগ করা যায় না।""ছোট বেলায় মায়ের কাছেই জীবনে বড় হওয়ার সব শিক্ষা পেয়েছি,তাই বলতে পারি- সত্যই আমার ঈশ্বর,সমগ্র জগৎ আমার দেশ,জগৎ এর সবাই আমার ভাই,আমার রক্ত।"এই হল যথার্থ 'মা' এর শিক্ষা।

১৪ - ১৫ বছরের সুভাষ বসু'মা' কে চিঠি লিখছেন-"তোমরা আমার কাছে কি চাও মা ?তোমরা কি চাও আমি লেখাপড়া শিখে ডাক্তার- ইঞ্জিনিয়ার হই।আমার অনেক টাকা,বাড়ি-গাড়ি হোক।নাকি এই চাও- আমি পৃথিবীর সবথেকে গরীব হব।কিন্তু এমন মানুষ হব,যেন শ্রদ্ধায় পৃথিবীর প্রতিটা মানুষ মাথা নিচু করে।"ক'জন বাবা-মা আছি আমরা,সৎ সাহস নিয়ে আমাদের সন্তানদের এই উৎসাহ দিতে পারি!বলি শুধু পড়,ভালো রেজাল্ট করো,টাকা রোজগার করার একটা মেশিন হয়ে ওঠো।আমরা শেখাই,কি করে সে মিথ্যাবাদী হতে পারে,কি করে সে আরও স্বার্থপর হতে পারে।ছোট শিশুর কোমল অন্তরে এই 'বিষ-বৃক্ষ' আমরাই লাগিয়ে দিই।আর সত্যিই এক সময় যখন সে আবেগহীন,ভালবাসা হীন,বিবেকহীন মেশিনের মত আচরণ করে,তখন আমরা বুক চাপড়াই।আমরা প্রত্যেকেই দ্রুত গতির এক ব্রেকহীন গাড়িতে উঠেছি,যার গতি শুধু বাড়তে পারে কমে না।আমরা ভেসে চলেছি......সন্তানদেরও তুলে দিচ্ছি ব্রেক ফেল করা আর এক গাড়িতে।এই গাড়ি কখনথামবে.....???যখন সব শেষ !!!"

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি