স্বামী পূণ্যানন্দজী মহারাজ - বাবার স্মৃতি তে
গত 15ই জানুয়ারী, রবিবার __ উত্তর চব্বিশ পরগণা জেলার রহড়া খড়দহ অঞ্চলের রূপকার __ রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রমের প্রতিষ্ঠাতা __ শ্রীমৎ স্বামী পূণ্যানন্দজী মহারাজের জন্মদিন পালনকে কেন্দ্র করে মহা উৎসাহের সাথে পালিত হলো স্বামী পুণ্যানন্দ জয়ন্তী ।
স্থান __ স্বামী পুণ্যানন্দ মুক্তমঞ্চ, রহড়া __ খড়দহ সংস্কৃতি অঙ্গনের উদ্যোগে __ এর সাথেই করা হয়েছিলো স্বামীজীর একান্ত প্রিয় __ পিঠে পুলি ও পায়েসের আয়োজন ।
আমার বাবা _ গোবিন্দ কৃপা ভট্টাচার্য্যের ছেলেবেলা তথা ছাত্রজীবনের বেশ কিছু ঘটনাবলী রয়েছে যা স্বামীজীর সাথে সম্পর্কিত _ তার সামান্য কিছু অংশ সেদিন আমি অতি সংক্ষেপে ভাগ করে নিয়েছিলাম উপস্থিত দর্শকমন্ডলীর সাথে ____
আজ সেটা এখানে আমার পরিচিত অপরিচিত ফেবু বন্ধুদের সাথেও ভাগ করে নিচ্ছি _____
ক।। আমার বাবা 1953 সালে তাঁর দাদু _ শ্রীযুক্ত শশাঙ্কশেখর কাব্য ব্যাকরণতীর্থের হাত ধরে জীবনে প্রথমবারের মতো স্বামীজীকে দর্শন করেন এবং ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হন
খ।। বাবাকে স্বামীজী কখনো বলতেন - "পন্ডিত মশাইয়ের নাতি" । আবার কখনো বা সম্বোধন করে বলতেন - "জাপানি ছেলেটা"
___ স্বামীজী যখন বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন, তখন ঐ স্কুলের হেড পন্ডিতমশাই ছিলেন আমার বাবার দাদু _ শ্রীযুক্ত শশাঙ্কশেখর কাব্য ব্যাকরণতীর্থ । তাই স্বামীজী বাবাকে "পন্ডিত মশাইয়ের নাতি" বলে ডাকতেন ।
__ আর আমার বাবার গায়ের রং আর মুখশ্রী ছিলো অনেকটাই জাপানীদের আদলে _ তাই আদর করে "জাপানি ছেলেটা" বলেও বাবাকে ডাকতেন
গ।। বাবা যখন চতুর্থ শ্রেণীতে, তখন একদিন স্বামীজী ক্লাসে প্রবেশ করে বাবাকে কাছে ডাকলেন । গল্পের ছলে হাসতে হাসতে বাবাকে তিনি জানালেন যে __ আমার বাবাকে নাকি দার্জিলিং পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন আমার ঠাকুরমা ___
আসলে ঢাকাতে থাকা ও লেখাপড়ার সুবাদে আমার ঠাকুরমাকে খুব ভালোভাবেই চিনতেন স্বামীজী __ কারণ আমার ঠাকুরমা ছিলেন স্বামীজীদের হেড পন্ডিত মশাইয়ের কন্যা ।
ঘ।। স্বামীজী প্রতি রবিবার নিয়ম করে ধর্মের ক্লাস নিতেন __ গীতা উপনিষদ বেদান্তের শ্লোক ধরে ধরে ব্যাখ্যা করতেন । কখনো কখনো ধর্মক্লাসে এসে স্বশরীরে উপস্থিত হতেন _ দলাই লামা, পাঞ্চেন লামা, কৈলাশ নাথ কাটজু, রাষ্ট্রপতি শ্রীযুক্ত ভি.ভি. গিরির মতো পন্ডিত ও মহান মানুষ
ঙ।। 1965 সালে বাবা বিবেকানন্দ সেন্টিনারী কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে সাম্মানিক স্নাতকের পাঠক্রমে ভর্তি হতে গেলেন । কিন্তু ভুলবশতঃ ভর্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা পার করে প্রায় দশ'-বারো দিন পরে গিয়ে কলেজে উপস্থিত হলে কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল স্বামী নিত্যানন্দজী মহারাজ বা কেষ্ট মহারাজ ( যিনি পরবর্তীকালে ব্যারাকপুর বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠাতা ) বাবাকে তিরষ্কার করে কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দিলেন ।
নিরুপায় বাবা তখন স্বামীজীর চরণে গিয়ে আশ্রয় নিলেন । স্বামীজী কেষ্ট মহারাজকে ডেকে বললেন, - "ঘরের ছেলেকে ফেলবি কোথায় কেষ্ট ? অন্যায় করেছে । একটু বকাবকি করে ক্ষমা করে দে" ।
চ।। এরপর আরো একবার বাবা অর্থাভাবে কলেজের ইউনিফর্ম বানাতে না পারায় বাবার নামে কলেজে নোটিশ ঝোলানো হলো এবং বাবাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো । সেই সময়েও স্বামীজী তাঁর বটবৃক্ষের মতো স্নেহের আশ্রয় দিয়ে বাবাকে আগলিয়ে রক্ষা করেছিলেন ।
আমার বাবা বলেন, জীবনের চতুর্থভাগে এসেও তিনি এখনো মনে প্রাণে তাঁর জীবনে স্বামীজীর প্রভাব মর্মে মর্মে অনুভব করেন ।
আর এর পাশাপাশি যখন তিনি এখনকার মঠ ও মিশনের সন্যাসীদের তুলনা করেন, তখন একথাই তিনি নির্দ্বিধায় বলেন যে, ___ অত উচ্চ মার্গের, অত বড়ো মাপের, ছাত্র দরদী, কর্মবীর সন্যাসী ___ বর্তমান সমাজে পাওয়া সত্যিই দুর্লভ ।
আমি বা আমার সমসাময়িক দাদা ভাই বন্ধুরা ওনার পদরেণু কণার পরশ পাইনি । তবে একথা এখনো সত্যি যে, আজকের এই স্বার্থপরতার যুগে, দলতন্ত্রের যুগেও উনি এবং ওনার কর্মযোগ ভীষণরকম ভাবে প্রাসঙ্গিক ।
Comments