15th Jan. 2017
মঞ্চে উপস্থিত মাননীয় সুধীবৃন্দ _ সামনে উপস্থিত আমার ভাই বোন দাদা বন্ধুরা __ আজ 15ই জানুয়ারী, রবিবার _ আমরা এই মুক্তমঞ্চে সকলে সমবেত হয়েছি __ ।
আমি একজন ভূমি রাজস্ব এবং ভূমি সংস্কার আধিকারিক এবং সেই কর্মসূত্রেই বর্তমানে আমি মালদার একটি ব্লকে কর্মরত ।
আমি আজকের এই অনুষ্ঠানে যোগদান করতে পেরে অত্যন্ত আনন্দিত এবং সম্মানিত বোধ করছি । তার কারণ ___
1. রহড়া খড়দা অঞ্চল _ বাংলা তথা ভারতবর্ষের মধ্যযুগের যুগাবতার _ পরমপুরুষ শ্রী চৈতন্যদেব মহাপ্রভুর পরিকর _ মহাপুরুষ স্বামী নিত্যানন্দজী মহারাজের পদধূলি ধুসরিত পবিত্রক্ষেত্র মহাপূণ্যধাম ।
আর আমার এই জন্মভূমিতে, আমার মাতৃভূমিতে _ আমার শৈশবকাল ও ছাত্রাবস্থার আঠারোটি বসন্ত _ রহড়া রামকৃষ্ণ মিশনের পরিবেশের ছত্রছায়ায় এবং স্নেহ সান্নিধ্যে লালিত পালিত হয়েছে _
এখানকার জল মাটি বাতাস মানুষ পশু পাখি জীব ও জড়জগতের প্রতি আমার এক অমোঘ আকর্ষণ রয়েছে _ আর আমি আমার এই শৈশবের নন্দনকাননের প্রতি সব সময় বিশেষভাবে দায়বদ্ধ _
এই রহড়া অঞ্চলের মাটি, স্বামী পূণ্যানন্দজী মহারাজের মতো মহান এক কর্মবীর ভারতসন্তানের পদরেণু স্নাত _ তাই এই সব কারণে এই স্থানকে আমি অত্যন্ত পবিত্র পূণ্যভূমি বলে সর্বদা সম্মান করি _
আমার মনে হয় এই স্থান কোনও ধর্মীয় স্থানের চেয়ে কোনও অংশেই কম কিছু নয় ।
2. আর শুধু আমি নই, আমার পিতারও বাল্য ও ছাত্রজীবনের আঠারোটি বসন্ত রহড়া রামকৃষ্ণ মিশন বালকাশ্রমের ছত্রছায়ায় লালিত পালিত হয়েছে ।
3. আজ এই মুক্তমঞ্চে আমাকে স্বামী পূণ্যানন্দজীর সম্পর্কে কিছু স্মৃতিচারণ করতে অনুরোধ করা হয়েছে আমার পিতার তরফ থেকে ___
কারণ কোনও একটি বিশেষ কারণ বশতঃ তিনি আজ এখানে আমাদের মাঝে অনুপস্থিত __
আমি পরম পূজনীয় পুন্যাত্মা _ শ্রীমৎ স্বামী পূণ্যানন্দজী মহারাজকে স্বচক্ষে কখনো দেখিনি _ ওনার পদরেণু স্পর্শ করবার সৌভাগ্যলাভ হয়নি আমার মতো অধমের _
তবে আমার বাবা _ গোবিন্দ কৃপা ভট্টাচার্য্যের ছেলেবেলা তথা ছাত্রজীবনের বেশ কিছু ঘটনাবলী রয়েছে যা স্বামীজীর সাথে সম্পর্কিত । তার কিছু অংশ আজ আমি আপনাদের সাথে অতি সংক্ষেপে ভাগ করে নেবো ।
__________________________________
ক।। আমার বাবা 1953 সালে তাঁর দাদু _ শ্রীযুক্ত শশাঙ্কশেখর কাব্য ব্যাকরণতীর্থের হাত ধরে জীবনে প্রথমবারের মতো স্বামীজীকে দর্শন করেন এবং ক্লাস ওয়ানে ভর্তি হন
খ।। বাবাকে স্বামীজী কখনো বলতেন - "পন্ডিত মশাইয়ের নাতি" । আবার কখনো বা সম্বোধন করে বলতেন - "জাপানি ছেলেটা"
___ স্বামীজী যখন বর্তমান বাংলাদেশের ঢাকার একটি বিদ্যালয়ে লেখাপড়া করতেন, তখন ঐ স্কুলের হেড পন্ডিতমশাই ছিলেন আমার বাবার দাদু _ শ্রীযুক্ত শশাঙ্কশেখর কাব্য ব্যাকরণতীর্থ । তাই স্বামীজী বাবাকে "পন্ডিত মশাইয়ের নাতি" বলে ডাকতেন ।
__ আর আমার বাবার গায়ের রং আর মুখশ্রী ছিলো অনেকটাই জাপানীদের আদলে _ তাই আদর করে "জাপানি ছেলেটা" বলেও বাবাকে ডাকতেন
গ।। বাবা যখন চতুর্থ শ্রেণীতে, তখন একদিন স্বামীজী ক্লাসে প্রবেশ করে বাবাকে কাছে ডাকলেন । গল্পের ছলে হাসতে হাসতে বাবাকে তিনি জানালেন যে __ আমার বাবাকে নাকি দার্জিলিং পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে কুড়িয়ে পেয়েছিলেন আমার ঠাকুরমা ___
আসলে ঢাকাতে থাকা ও লেখাপড়ার সুবাদে আমার ঠাকুরমাকে খুব ভালোভাবেই চিনতেন স্বামীজী __ কারণ আমার ঠাকুরমা ছিলেন স্বামীজীদের হেড পন্ডিত মশাইয়ের কন্যা ।
ঘ।। স্বামীজী প্রতি রবিবার নিয়ম করে ধর্মের ক্লাস নিতেন __ গীতা উপনিষদ বেদান্তের শ্লোক ধরে ধরে ব্যাখ্যা করতেন । কখনো কখনো ধর্মক্লাসে এসে স্বশরীরে উপস্থিত হতেন _ দলাই লামা, পাঞ্চেন লামা, কৈলাশ নাথ কাটজু, রাষ্ট্রপতি শ্রীযুক্ত ভি.ভি. গিরির মতো পন্ডিত ও মহান মানুষ
ঙ।। 1965 সালে বাবা বিবেকানন্দ সেন্টিনারী কলেজে পদার্থবিদ্যা নিয়ে সাম্মানিক স্নাতকের পাঠক্রমে ভর্তি হতে গেলেন । কিন্তু ভুলবশতঃ ভর্তির জন্য নির্ধারিত সময়সীমা পার করে প্রায় দশ'-বারো দিন পরে গিয়ে কলেজে উপস্থিত হলে কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপ্যাল স্বামী নিত্যানন্দজী মহারাজ বা কেষ্ট মহারাজ ( যিনি পরবর্তীকালে ব্যারাকপুর বিবেকানন্দের প্রতিষ্ঠাতা ) বাবাকে তিরষ্কার করে কলেজ প্রাঙ্গণ থেকে বের করে দিলেন ।
নিরুপায় বাবা তখন স্বামীজীর চরণে গিয়ে আশ্রয় নিলেন । স্বামীজী কেষ্ট মহারাজকে ডেকে বললেন, - "ঘরের ছেলেকে ফেলবি কোথায় কেষ্ট ? অন্যায় করেছে । একটু বকাবকি করে ক্ষমা করে দে" ।
চ।। এরপর আরো একবার বাবা অর্থাভাবে কলেজের ইউনিফর্ম বানাতে না পারায় বাবার নামে কলেজে নোটিশ ঝোলানো হলো এবং বাবাকে কলেজ থেকে বহিষ্কার করা হলো । সেই সময়েও স্বামীজী তাঁর বটবৃক্ষের মতো স্নেহের আশ্রয় দিয়ে বাবাকে আগলিয়ে রক্ষা করেছিলেন ।
------------
আমার বাবা বলেন, জীবনের চতুর্থভাগে এসেও তিনি এখনো মনে প্রাণে তাঁর জীবনে স্বামীজীর প্রভাব মর্মে মর্মে অনুভব করেন ।
আর এর পাশাপাশি যখন তিনি এখনকার মঠ ও মিশনের সন্যাসীদের তুলনা করেন, তখন একথাই তিনি নির্দ্বিধায় বলেন যে, ___ অত উচ্চ মার্গের, অত বড়ো মাপের, ছাত্র দরদী, কর্মবীর সন্যাসী ___ বর্তমান সমাজে পাওয়া সত্যিই দুর্লভ ।
Comments