প্রিয় কবিতারা - তিন

স্বপ্নে দেখা ঘর দুয়ার!
নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্ত্তী।

পুকুর, মরাই, সবজি বাগান, জংলা ডুরে শাড়ি।
তার মানেই তো বাড়ি!
তার মানেই তো প্রাণের মধ্যে প্রাণ
নিকিয়ে নেওয়া উঠোনখানি
রোদ্দুরে টান টান।
ধান খুঁটে খায় চারটে চড়ুই
দোল মঞ্চের পশে।
পায়রা গুলো ঘুরে ঘুরে বেড়ায় ঘাসে।
বেড়ালটা আড়মোড়া ভাঙছে।
কুকুরটা কান খাঁড়া করে শুনছে কথা বলছে কারা।
পূবের্র সূর্য্য পশ্চিমে দেয় পাড়ি।
দুপুরবেলা ঘুমের থেকে জেগে উঠছে বাড়ী ।
লাঠির ডগায় পুটলি বাঁধা অনেকটা পথ ঘুরে
লোকটা যাচ্ছে দূরের থেকে দূর।
ওর চোখেও কি এমনি একটা বাড়ির স্বপ্ন টানা?
ওর বুকেও কি গন্ধ ছড়ায়, গোপন হাসনুহানা?
ও বড় বৌ ডাক ওকে ডাক.....
ওই যে লোকটা পার হয়ে যায় কাঁসাই নদীর সাঁকো।
----
নরকে এক মুহূর্ত
- আজীজুল হক

আমি দশ পায়ে দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছি আর বলছি আমি খোঁড়া
একশোবার চেঁচিয়ে বলছি আমি বোবা
          কথা বলবো কী করে?
মগজটাকে চটপট একটা গাছের কোটরে লুকিয়ে রেখে
চোখ দুটোকে একটা নিরীহ ঝোপের মধ্যে ফেলে রেখে
পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ চক্রাকারে তাকাচ্ছি
আমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ভেবে এক লক্ষ বর্বরতা
আমার খুলির মধ্যে হৈ-হৈ গান জুড়ে দিচ্ছে;
        নরকে চলো নরকে চলো
        যে-কোনো মুহূর্তে তা নিভে যেতে পারে
        নরকে চলো নরকে চলো
        তা নিভে গেলে কী উপায় হবে
        নরকে চলো নরকে চলো
        প্রভুরা আমাদর কথা দিয়েছেন
        এবং ওখানেই অপেক্ষা করেছেন
        নরকে চলো নরকে চলো
        ফূর্তির জন্য আমরা তাকে নিভতে দেবো না
        দ্রুত চলো আরো দ্রুত
        তা নিভে গেলে কী উপায় হবে

কিন্তু তারা মোটেই চলছে না যেন নরকেই এসে গেছে
কেবল চেঁচাচ্ছে, মেয়েমানুষের লাশ অন্তত একটা পাওয়া গেছে
দিনগুলো রাত্রি এবং রাতগুলো দিনের পেটের মধ্যে
          নাড়ীভুঁড়ির মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে
অবলীলাক্রমে সকাল সন্ধ্যা হয়ে বেরিয়ে আসছে
কয়েকজন দেবদূত সোনায় বাঁধানো দাঁতে হলদে হলদে হেসে
খুব সস্তায় ভূমিকম্পের অভিনয় শেখাচ্ছে
একজন জমকালো পোশাকপরা সূর্য লাল নীল হলদে সবুজ
অর্কট মর্কট কর্কট কী সব খেলা দেখাচ্ছে
যেন সে ভারী একজন উমদা খেলোয়াড়
এক্ষুণি তাকে একটা থাপ্পড় মারতে  পারি, কিন্তু না
দুহাত জুড়েই হঠাৎ একটা কাজ:

   হে ঈশ্বর তোমার ক্ষমতাকে কে অস্বীকার করে?
   কিন্তু আমরা তোমাকে অন্যমনস্ক হতে দেবো না
   দশ লক্ষ কাটা হাত তোমার দিকে উৎক্ষিপ্ত
   দশ লক্ষ উপড়ানো চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারো না
  গ্রন্থ দ্বারা তুমি অঙ্গীকারাবদ্ধ
  ঘড়ির কাঁটা আমাদের মস্তিষ্কে বিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত
বিচ্ছিন্ন হৃদযন্ত্র দিয়ে আমরা সময় মাপছি
  নরকের লোভ দেখিয়ে অবিশ্বাসীদেরকে এখানে
                                             আটকে রাখছি
  যতোক্ষণ না তোমার সময় হয় হে ঈশ্বর
  তোমাতেই অনন্ত
  এবং তোমাতেই মুহূর্ত
দেখ দেখ
প্রবীণ জ্ঞানগুলো কেমন উদোম ন্যাংটা হয়ে গেল
চিন্তাগুলো কেঁচোর মতো খুলির ঝাঁজরা দিয়ে
    কিলবিল ক'রে বেরিয়ে আসছে
উচ্চারণগুলো ভীমরুলের মতো জিহ্বাকে রক্তাক্ত করছে
প্রেম পুঁজ হয়ে গলছে
বনবিড়ালটা নিজের ঘিলু নিজেই বের করে খাচ্ছে
নাঃ ঈশ্বরকে ওরা সময় দেবে না
লাশটা তবে কার?
লাশগুলো তবে কাদের?
স্মৃতিগুলোর সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার
তারা সব সীমান্তে
ভয়গুলোর সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার
তারা সব সীমান্তে

সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে সীমান্ত খোলা হয়েছে
জ্ঞান যুদ্ধরত
বোধ যুদ্ধরত
ইচ্ছা যুদ্ধরত
প্রেম যুদ্ধরত
না, এখন আমি পালাতে পারছি না
না স্পর্শ থেকে না শব্দ থেকে না দৃশ্য থেকে;
    একটি কবিতা একজন কবির হৃৎপিণ্ড চিবিয়ে খাচ্ছে
    রক্ত
    একটি গান একজন গায়কের গলা টিপে ধরছে
    রক্ত
    একটি স্বপ্ন একজন প্রেমিকের চোখ উপড়ে নিচ্ছে
    রক্ত
রক্ত রক্ত রক্ত
উন্মোচিত জরায়ুতে কি এতো রক্ত থাকে?
কিন্তু ওই সুতীক্ষ্ণ কান্না আমি সহ্য করতে পারবো না
এক্ষুণি আমার ঝিমিয়ে পড়া উচিত
কান্নাটা তরঙ্গিত হবার আগেই
      আমার ঝিমিয়ে পড়া উচিত
ঝিমিয়ে পড়া উচিত।
----
প্রেম ছিল মনেই পড়ে না
- অশোক রায় চৌধুরী

খুব ভোরে নেমে এলো চুপিচুপি কামিনী ফুলের মতো বৃষ্টি।
আহা! শীতের কুয়াশা ভাঙ্গা হিমেল, কৈশোর।
যতদূর চোখ যায় শুধুই কুয়াশা। প্রথম প্রেমের মতো
                                                        ঘন, ক্ষীরকুয়াশা।
কুয়াশার মধ্যে তীক্ষ্ণ ছুরি চালিয়ে নেচে ওঠে কিশোরীর মতো
তীব্র। খর। উলম্ব বৃষ্টি জানলাটা খুলে দিই। যাবতীয় গোছ-গাছ, ব্যস্ততা
মরা ইঁদুরের মতো পড়ে থাকে।
একটি নিঃসঙ্গ, বিষণ্ন কাক যাবতীয় প্রাকৃতিক লাঞ্ছনা উপেক্ষা করে
উড়ে এসে কার্নিশে বসে। তখনই অকস্মাৎ মনে পড়ে-এই স্থবির,
ক্লিশে ও হিম রক্তের ভিতরে একদা প্রেম ছিল। ঠিক এমনি এক
বৃষ্টির দিনে স্কুল পালিয়ে এক জোড়া কিশোর-কিশোরী চূর্ণী নদীর পাড়ে
কাঁঠালতলায় বসে ধুম ভিজেছিল। তারপর একটানা সাতদিন ধুম জ্বর।
জ্বর, সেও একদিন থেমে যায়। পৃথিবী তার আহ্নিক, বার্ষিক গতিপথ
              অসংখ্যবার
শেষ করে ফিরে আসে।
তিরিশ বছর আগের পৃথিবীর অতিশয় তুচ্ছ, নগণ্য এক গুরুত্বহীন ঘটনা
বেমালুম ভুলে গেছে শহরের পরিণত কোন এক হাইফাই প্রাজ্ঞ নাগরিক।
এ জীবনে কোন দিন প্রেম ছিল মনে নেই, এখন আর মনেই পড়ে না।
-----
নারী
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

এ কেমন প্রেম যার অন্য নাম দয়া, উদারতা?

নাকি যা নারীর কাছে গণনীয় নারীর অধীত
তার মুখ একাগ্র, ব্যাপ্তি অদ্বৈতবিসারী?
তাই হতভাগ্য শঠ ফেরিওয়ালা পাষণ্ড তঞ্চক
কিংবা লুলা
মসৃণ পায়সে
বঞ্চিত এবং খুশী, ---যেমন পাখিরা সরে বসে
জ্যোৎস্না থেকে।
পথে হাঁটতে ব্রাত্যদের অনঘ কফোণি ঠেকে যায়
দু-একটি প্রতীকে, ওরা
নৈবেদ্যের সঙ্গে তুলনীয় কিন্তু আধুনিক মর্মরনির্মিত।

দুধে ও ব্যথায় ভারী ছোট-ছোট স্তূপগুলি অর্পিত কোথায়
না জেনেই ওরা ভাবে---নারী, সব নারী
পরোক্ষপ্রেমিকা, এক, পরিধানে ভিন্ন ভিন্ন শাড়ি।

যে জানে, সে জানে।
দিলে সে একজনকে দেবে, অন্যদের কিচ্ছুই দেবে না।।
------
মুখুজ্যের প্রতি
- জয়দেব বসু

রাজার সঙ্গে আঁতাত করেন যিনি
আমাদের সেই গুহকের প্রতি ঘেন্না

রাজপুত্রকে খাওয়ান-পরান ভালো
টাকা-পয়সার প্রতিদান তিনি নেন না

ভালোই তো হয়, বদলে গদির গা
চুমকি বসানো কিংখাবে যায় ঢেকে

এবং পুরাণে সোনার আখরে নাম,
ছেলেমেয়ে যাতে এরকম হতে শেখে

শেখে অনেকেই, শেখেওনা কেউ-কেউ
দূর থেকে ঠোকে ভালোমানষিকে পেন্নাম

রাজার পড়োশি হতে চান যিনি আজ
আমাদের সেই দালালের প্রতি ঘেন্না।
-----
ফুলঝুরি, তোমার নাম
- শক্তি চট্টোপাধ্যায়

ছেলেবেলার ফুলঝুরি, তোমার নাম আমার এখনো মনে আছে।
বলো তো আমার মন ভালো কিনা?
মোরগঝুঁটি ডাকবাক্সে শাদা পাতা ফেলবামাত্তর কি তুখোড় সব চিঠি---
নিচে লেখা : প্রণাম জানবেন, ভালোবাসা নেবেন।

আরে বাপু, আমি তো ওইটুকুর জন্যেই ব্যাকুল!
সেই যবে থেকে চটা-ওঠা মার্বেল-গুলি জমাই,
যবে থেকে চুড়ি-লপর যোগাযোগে বানাই শিকলি,
অষ্টপ্রহর বুকে ছিপি এঁটে গুমোরে মাটিতে পা পড়ে না;
তবে থেকেই, ভালোবাসা, তোমার জন্যে ওৎ পেতে আছি।

জন্মভূমি---কথাটার মধ্যে এক আশ্চর্য মাদুর বিছানো আছে,
তাতেও শুয়ে দেখতে পারো।
জ্বালাযন্ত্রণার কথা মুখ ফুটে না বললেও টের পাই---
মানুষ যেমন ফুল, মানুষ তেমনি কাঁটা!
ঘরের ভেতরকার আসবাবে হোঁচট খেলেও তো তাকে রাখো!
সুতরাং---
ভালো মনকে বুঝ দিতে সময় লাগার কথা নয়
ফুলঝুরি, তোমার নাম আমার এখনো মনে আছে।
------
অনুগ্রহ দেখালে বড় বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠো তুমি
- সুহিতা সুলতানা

ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে স্মৃতির আকাশ, চিমনির ধোঁয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে পথের দৃশ্যাবলী!
এই পথ কি কখনো আমাদের ছিল? দূরত্বের ওপারে ভেঙে ভেঙে পড়ে সম্পর্কের অমল
বিন্যাস। যখন আমার কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না ঠিক তখন তোমার টেলিফোন
শোনাতে শুরু করলে হৃদরোগের গল্প! আশ্চর্য চৈত্রর রাতের অভিসার দূতাবাসের প্রশস্ত পথ
ধরে তোমাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এলো নিদ্রাহীন নগরীর উদাসীন উপত্যকায়, বুনো
হাওয়ায় ভাসে ক্যানভাসের অভিসম্পাত! অনুগ্রহ দেখালে বড় বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠো
তুমি! স্বদেশের উঠোনে তোমার ছায়ার পাশে অদ্ভুত নীরবতা শুয়ে থাকে, তোমার অপেক্ষার
ওপর দুলে ওঠে স্বপ্ন, শৈশব! চেয়ে দেখি জীবনের পক্ষে অলক্ষুণে ঘোলা চোখ ধুলোর
অনুনয় আর অরুপের রক্ষক হয়ে অর্ধচাঁদের ভঙ্গিমায় নগ্নতা হনন করে নিঃশব্দে!
--------
ভালোবাসতে বাসতে ফতুর করে দেবো
- ত্রিদিব দস্তিদার

ভালোবেসে কি ফতুর করা যায় ?
ভালোবাসা ফতুর হয় না কখনো
তবে আমি তোমাকে ভালো বাসতে বাসতে
ফতুর করে দেবো
তোমার ভালোবাসা এক সময় ফুরিয়ে যাবে
আমার ভালোবাসার আজন্ম উত্তাপে
বাষ্পায়িত হবে তোমার ভালোবাসা
আমার ভালোবাসার গতি ও তীব্রতায়
ম্রিয়মান হবে
জলে, অন্তরীক্ষে
ভালোবাসা-স্থলের অতি ব্যবহারে,
হবে তুমি প্রাচীন কোন নৃতত্বের সন্ধান
নতুন প্রেমিকের কাছে
ভালো বাসতে বাসতে তোমাকে
ফতুর করে দেবো
ফতুর করে করে দেবো
ভালো বাসতে বাসতে বাসতে…..
------
মধুবংশীর গলি
- জ্যোতিরিন্দ্রনাথ মৈত্র

তোমারই প্রেরণা পেয়েছি
বারে বারে আনন্দে পেয়েছি
নিরঙ্কুশ এ জীবনের কলনাদে ভরেছে অম্বর
হে পঁচিশ নম্বর
মধুবংশীর গলি,
তোমাকেই আমি বলি।
রৌদ্রস্নাত খাটুনির পর সমস্ত দিন
মেরুদণ্ডহীন
মানুষগুলিকে সন্মান করে,
ঘৃণা করে আর হিংসা করে,
নগ্ন নগন্য সন্ধ্যাকে পাই
- তোড়াবাঁধা শ্মশানে পাঠাবার ফুল -
একটা অন্যায় শৌখিনতায় মন হারায় কূল,
ঘ্রাণ নিই প্রাণ ভরে।
হলদে আকাশ থেকে কার আশীর্বাদ যেন পড়ে ঝরে।
ছারপোকার দৈনিক খাদ্য হিসাবে তাই
খাটিয়ার ওপর বসি, বিড়ি ধরাই
আর, মনে মনে প্রতিজ্ঞা রোজ করি -
দোহাই পতিতপাবন হরি,
আর নয়, আমার লম্পট প্রবৃত্তিগুলিকে,
দস্যু লোভগুলিকে,
চালান করো আন্দামানে।
তার মানে,
স্বার্থ, অর্থ,
জমিদারী অনর্থ,
টাকা, টাকা আর টাকা,
সমস্ত দিনের হীন বাণিজ্যটাই ফাঁকা।
শ্রান্ত শ্লথপদে তাই
তোমার দিকে ফিরবার প্রেরণা পাই,
হে অনবগুন্ঠিতা,
অকুন্ঠিতা,
পঁচিশ নম্বর মধুবংশীর গলি,
তোমায় চুপি চুপি বলিঃ
আকর্ষণ? অনেক অনেক আছে
তোমার শীতে ঠাসা
অমাবস্যার বাসা
ইট বের করা দেয়ালের কোণে কোণে।
তেলমাখা পাঁচ আঙুলের দাগ, বোনে
পুরনো স্বপ্নের জাল,
মলিন জীবন মহীরুহের ডাল।
তারই নিচে ---শ্রীহরি সহায়---আঁকা বাঁকা
কাঠকয়লায় আঁকা,
জগন্নাথের পট পেরেক দিয়ে আঁটা,
কোনো সিনেমা-বনিতার জঘন্য সুন্দর মুখ
আঠা দিয়ে সাঁটা
অপর দেয়ালে। এই আবহাওয়াই সার
অধমর্ণ অস্তিত্বের সাধু টঙ্কার।
কোনো কোনো ছুটির দিনে অবশ্য স্ত্রীর চিঠি পাই,
দেশান্তরের নিবিড় বাহুর আশ্লেষে সময় হারাই,
অক্ষম মিনতির সুর - পড়ি আর তুলি হাই।
তবু চিঠি পাই আততায়ী জীবনের
যখন চাল কিনি চল্লিশ টাকায়,
চায়ে চিনি খুঁজে পাওয়া দায়।
এরই অন্তরালে দ্বিপ্রহর দগ্ধ মরে শুকিয়ে
যাওয়া খড়খড়ে দিনগুলির উপর দিয়ে
দুর্মর বসন্তের দ্বিধাকম্পিত পদধ্বনি শুনি।
দশ আঙুলের নিংড়ে নেওয়া আয়ুর শেষ প্রহর গুণিন।
হঠাৎ চিঠি আসে,
কোনো তন্ময় মুহূর্তে।
জানলা গলিয়ে পিয়ন দেয়, কাশে
একটু জানানি হিসাবে। হলদে খামে পোরা
শ্রান্ত বিকেলের রং! ছোরা
শানিয়ে আসে রাত্রি,
ধীরে ধীরে বড়ো রাস্তার চৌমাথা পেরিয়ে,
হিংস্র আগ্নেয় কামনা নিয়ে -
মত্ত আততায়ী আসে - রাত্রি
অনন্ত পথযাত্রী, -
মিলিটারী লরীর ঘর্ঘর,
রিকশ’র নূপুর, সুদূর ট্রামের মর্মর,
ধাবমান মোটরের ক্ল্যাকসন্ হর্ণ, আর
মেঘে মেঘে এরোপ্লেনের শব্দের ভার
আকাশ ছেঁড়ে ; পঁচিশটা, -
হবে,---চট্টগ্রাম ফেরতা ত্রিশটা,
হবেও বা, - কিন্তু হে অনন্তযাত্রী !
হয় নাই এখনও, হয় নাই শেষ তোর রাত্রি।

আতঙ্কের ঘোমটাপরা রাস্তার আলো
অতিকৃত কালো কালো,
নৈশজীবনের ছায়াদের ডাকে,
ঘরে বাইরে জানালার ফাঁকে ফাঁকে।
নিরুদ্ধ তৃষ্ণার তাই খুলে যায় খিল,
চলে রণদগ্ধ জীবনের ছায়ার মিছিল,
ক্ষুদার হুঙ্কারে ডোবে উন্মার্গের গান।
বাঁকা টুপিপরা কোনো আমেরিকান
কাপ্তেনের লোলুপ শিস
তরুণী রাত্রির গালে চাবুক মারে। সামরিক আশিস
ঝরে পড়ে বিধ্বস্ত মাথায়,
চালে ডালে কাপড়ে ও মধ্যবিত্ত জীবনযাত্রায়।
কিন্তু ওরা আছে বেশ !
( এ যাত্রাই অবশ্য শেষ)
যারা মধ্যরাত্রে অগাধ নীলিমা চষে নিরীহ ঘুম ভাঙায়,
জেলেদের মতো তাজা মাছ তোলে ডাঙায়,
যারা তোমার আমার অবসরের গান ভেঙে চুরমার করে।
মুক্ত প্রাণে মুক্ত ইচ্ছার সিন্দুকে তালা পড়ে,
শ্লোগানমুখী মন শানানো সঙীনের মতো ঝলক দিয়ে ওঠে,
ফ্যাসিস্ট - বিরোধী সঙ্ঘে যোগ দেয়,
মুখে মুখে ফোটে বিদ্রোহের দস্তর হাসি,
আর,বুকে সামাজিক যক্ষার কাশি।
তবু এক ফালি চাঁদের পিঠে ভর করে রাত্রির আকাশ,
আর সপ্তব্যহৃতি মন্থন করে অসীম নীল বাতাস,
উঠে আসে শ্রান্ত অন্যমনস্ক পৃথিবীর  উপর।
ছিন্নভিন্ন অস্তিত্বের ক্লিষ্টগতি ভঙ্গী আনে তারই মর্মর।
পারিশ্রমিকহীন শ্রমে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া আয়ু
নিয়ে, রুগ্নস্বপ্ন দেখি, দীর্ঘশ্বাসে ভরে যায় বায়ু।
তবু, তোমার চিঠির উত্তর দিয়ে যাচ্ছি ঠিক, প্রতি সপ্তাহে একটা করে
মল্লিক বাগানের চুরিকরা ফুল খামের ভিতরই দিই ভরে।
তারপর, বর্গীরা আসে।
আকাশে বাতাসে স্থলে জলে দস্যুদের দুরন্ত পদধ্বনি।  ত্রাসে
প্রকম্পিত মৃগীদের মন। অলস দুর্বল স্নেহ কুড়িয়ে নেয়   প্রচণ্ড সূর্য।

অগ্নিবর্ষী সকাল বাজালো তূর্য।
মনে হয়, জীবনের যুদ্ধ এল।
কলোনিতে কেরানীরক্তে প্রচন্ড দোলা,
গম্ভীর স্থির প্রতিজ্ঞাগুলি সারি দিয়ে দাঁড়া
ত্রস্ত মনের সামনে প্রহরীর মতোঃ
আমাদের প্রত্যেকের ইঁদুরের মতো মরাই শেষ নয়,
তারপরেও মহত্তম ভবিষ্যৎ।
আপাতত তার আগে পলাশ-রজনীগন্ধা-কিংশুকের
পাঁপড়িগুলি ছিঁড়ে  কুটি কুটি
ঝড়ের নখরাঘাতে; মেঘে মেঘে বজ্রের ভ্রূকুটি।
তা হোক অস্ত্রোপচার ও আরোগ্য এই ভরসায়
সকালে উঠি, মাটির ভাঁড়ে চা খাই,
চালের দোকানের সামনে সারি দিই,
সন্ধ্যায় সমীকরণ সমিতির মিটিং থেকে ফিরি।
পাগলেরা বলে কি ! সমীকরণ আপনিই হবে
কোনো এক অনিবার্য অমোঘ মুহূর্তে।
ইতিমধ্যে হাত পা ছুঁড়ে যাও,
অদৃশ্য অস্ত্র শানাও
কিছু কিছু  মারকাটও চলুক,
যে যাই বলুক
গূঢ় স্বার্থের খেয়ালী আবহাওয়ায় পাল তুলে দাও।
অর্বাচীন ! অর্বাচীন !
জানে না সে দুর্ধর্ষ জাপান আর পর্যুদস্ত চীন।
অর্থাৎ কে যে শত্রু ঠিক নেই, নিজেরাই মারামারি করছি,
ঘরে বাইরে মরছি।
শেষে বঙ্কু পালের নির্বোধ চিৎকারে  সভা ভাঙে,
আমার মনও। সাময়িক যুদ্ধবিরতি। মরা গাঙে
বান ডাকায় দিনান্তের পরিচ্ছন্ন মর্ষিত মন
অবসন্ন শান্তির স্রোতে।
তাই নিরঙ্কুশ, পবিত্র, নির্মমন অস্তিত্বের পৌরাণিক সুরে,
বাইরেকে ভুলি, ঘরকে ডাকি
একটা বিশুদ্ধ বিশ্রম্ভালাপের ডিকাডেন্ট সুরেঃ
শোনো,
তুমি কোনো,
বরযাত্রার মিছিলে কখনো
বাঁশী-পতাকায় আলোতে মাখানো
নবযাত্রার মিছিলে দেখেছ রূঢ় বিধাতার হাসি।
দূরে,
অতিদূরে,
শ্যামলিম কোন মেদুর সুদূরে
চেন নাই বুঝি পরাণ বঁধুরে
স্বল্প আলোকে কান্নায় ঢাকা ব্যথা মুকুলিত হাসি।
উদ্দাম ভালবাসি।
তোমার তন্ময় ধ্যান হয়েছে আকাশ পৃথ্বী
পর্বত প্রাকার -
ধরো, এই ভাবেই যদি বা বুঝাই তোমাকে
তোমার বিকল মনকে - আধুনা যা বিরস মলিন, -
কিংবা পাহাড়ে পাহাড়ে একাকার এই কাজের দিন
তোমার মুখেই বাঙ্ময় এই পাইন বন -
শুনে বলেছ হেসে,
রূঢ় বন্ধুর ধারালো চূড়ার এ সমাবেশে,
চলে যাই দূরে, পার হয়ে যাই ঘুমের শেষে -
বলেছ হেসে।
কিংবা, তোমাকে করেছি লক্ষ্য হে অনন্য গতি
রৌদ্রের মুকুটপরা প্রাণঃপুত দিন।
বিচক্ষণ বণিকের অন্যায়ের আভা
আর মুগ্ধ করে না অগণিত মন।
সম্রাটের অনুকম্পা, প্রভুহীন করুণ কুক্কুর,
পথে পথে ফেরে, দুস্থ শহরে শহরে
শেষ অপমৃত্যুর প্রহরে।
কাহারও পরার্থপ্রজ্ঞা সভাতে সঙ্গতে
ছিটায় শান্তির কণা, গলিত তুষার।
বক্তব্য আমার
এই যে, আমি বহুবার
শিল্পিত মনের চারু বনেদী ভঙ্গীতে
প্রেম নিবেদন করেছি। সঙ্গীতে
ফুটো ঘর ভরিয়েছি কিংবা কূট কবিতার
মহিমায় আত্মপ্রসন্ন হয়েছি।
কিন্তু মন পেলাম কই,
কর্মের প্রভায় উজ্জ্বল, এই করুণ গানের উপনিবেশে!
কাউকে তো দেখি না বেশ বলিষ্ঠ হেসে
জীবনের দ্বিধান্বিত মুঠোয় চাপ দিয়ে
শক্ত করে ধরে পৃথিবীর কঠিন জাগ্রত পিঠের উপর
চলে ফিরে বেড়ায়।

পট যায় ঘুরে।
অন্ধীকৃত রাত্রির শহরে,
পথে পথে সুগম্ভীর ছায়ার বহর,
ষড়যন্ত্র সঙ্কুল ত্রস্ত কবন্ধের ভিড়।
সুর-রিয়ালিস্ট কবিতার দেশে।
পিকাসো বা যামিনী রায়ের আঁকা
পথঘাট গাছপালা বাড়ী।
ঊর্ধ্বে নীলে আঁকাবাঁকা চাঁদ,
তারই নীচে নিরন্ন বুড়োবুড়িদের চাপা আর্তনাদ,
ক্লিষ্ট চলাফেরা।
অতঃপর ব্রাহ্ম মুহূর্তে, ঘর্মস্রাবী রাত্রির ওপারে
আলোকসম্ভবা উষার ওষ্ঠপুটে ভৈঁরোর অস্ফুট আলাপ।
ক্ষুধার গর্জনে ছিন্ন প্রশান্ত গৈরিক।
অগণন বালকবালিকাদের
বুভুক্ষা মুখর যাত্রা লেক মার্কেটের দিকে।
নিশ্চিন্ত অবিবেকী মনের শৌখিন গান
তিরস্কৃত,পলাতক দিশাহীন দূরে।
তবু ভাল, আমি এই মধুবংশীরপুরে
আছি বেশ ; এ বেলা  ও বেলা কেটে যায় ব্যর্থ অন্বেষায়।
তোমার মহিম্ন স্তোত্রে মুখরিত আকাশ বাতাস
হে স্বর্ণবণিক ! তুমি দীপ্ত হিরন্ময়।
তোমারই হোক ক্ষয়, হোক ক্ষয়।
(আজ শুনি এক ভরি সোনা একশো ছয়
টাকা।) বুভুক্ষারই জয়।
এ স্বর্ণসন্ধ্যায়
কাতারে কাতারে জমে হিরণ্য শকুন
ডানার ঝাপটে কাঁপে আদিগন্ত স্থবির আকাশ
প্রচ্ছন্ন শবের দেশে।
হ্যাঁ, বলতে ভুলেছি আর এক কথা।
এই তো সেদিন, ট্রেন থেকে দিলো নামিয়ে,
হাতের তলায় সযত্নে চাপা অচল পুরনো টিকিটে, -
দিলো কে নামিয়ে অচেনা স্টেশনে
জীবনের ট্রেন থেকে।
তাই সেই থেকে
বারবারই অক্ষম প্রয়াস,
চলন্ত রথের পানে খঞ্জের দুরন্ত অভিলাষ
ব্যর্থ হয়, চূর্ণ হয় ঘৃণার পাহাড়ে।
দূরে চলে ট্রেন
দ্রুত - টক্রকঙ্কন ঝঙ্কারে।
সম্রাজ্ঞীর মতো উপেক্ষায়, ফেলে চলে যায়।
আমি থাকি পড়ে কোনো বিষন্ন সন্ধ্যায়
শেষহীন চাঁদছত্র উপত্যকায়।
চলেছি কোথায় ?
একাকী ? ইশারায়
মনে পড়ে দিয়েছিল কেউ এ প্রশ্নের উত্তরও।
একাকীত্বের শৌখিনতায়
সমীক্ষার ক্রূর শ্লেষ হেনেছিল সেও।
(তখন অবশ্য বড় জোর
শ্মশ্রুহীন কৈশোর,)
শিল্পকে কাব্যকে বাঁচাবার জন্যে তবু
বলেছিলাম, তুমি তো আজো এই মুখেরই প্রভু,
হে অনন্ত প্রেম!
এই জীবনের সান্ধ্যসভায়
তোমার আসর শূন্য হল
হে প্রেম শূন্য হলো, বিরস গানে
ভরলো আকাশ - (লাগছে না ভালো বলছ?
থামা যাক তবে।)
একাকীত্বের দুস্তর প্রান্তর থেকে কবে
উত্তীর্ণ হলাম উদ্দাম শহরে।

ব্যবহারে, বাণিজ্যে
গ্রন্থিতে গ্রন্থিতে জোট বাঁধে মনে প্রাণে।
নির্জন শীর্ণ একতারা ডোবে সহস্রের ঐকতানে।

এখন চিনেছি যদিও, আরো অনেককে চিনেছি এবার,
অজ্ঞাতবাসের কঠিন আস্তরণ ভেদ করে
বুঝেছি এবার।
দ্বৈপায়ন হ্রদে ডোবা ভগ্নজানু মন,
তোমাকে দেখেছি বারবার এ শহরে হে দুর্যোধন।
লালসার জতুগৃহে ভস্মীভূত তোমার চক্রান্ত

এনেছে যুগান্ত।
অর্জুন, অর্জুন শুধু!   
অর্জুন, অর্জুন আজ লক্ষ লক্ষ জনগণমন
দোর্দণ্ড গান্ডীব তাই অতি প্রয়োজন,
বৃহন্নলা ছিন্ন করো ক্লীব ছদ্মসজ্জার ব্যসন।
বিদ্রোহের শমীবৃক্ষে সব্যসাচী অর্থ খোঁজে আজ।
ঘুণগ্রস্ত এরই যুগ মৃত্যুজ্বরে কাঁপে হাড়ে হাড়ে,
আরক্ত সূর্যের অস্ত পশ্চিমের রক্তিম পাহাড়ে।
এই বার্তা তৃপ্তি দেয় আমাদের
যাদের,
মন রাঙিয়েছে আগামী যুগের রাঙা আলোয়,
আগত যুগের ‘কামারাদেরিতে’ যারা মুখর,
আমরা তো জানি স্থির বিশ্বাস করি সবে -
ইতিহাসই দেয় আগুনের রঙে সে স্বাক্ষর।
শোনো শোনো তাই,
হে নবীন, হে প্রবীণ, মজদুর, ওহে কৃষাণ,
ওহে মোটা সোটা বেঁটে খেটেখাওয়া কেরানিদল,
হে কাব্যে পাওয়া পালাতক ক্ষীণ কবির দল,
শিল্পীর দল,
হে ধনিক, হে বণিক, আর্য, অনার্য
করো শিরোধার্য -
বৃদ্ধযুগের গলিত শবের পাশে
প্রাণকল্লোলে ঐ নবযুগ আসে।
প্রস্তুত করো তোমাদের সেই সব দিনগুলির জন্য
যখন প্রত্যেক সূর্যোদয়ে পাবে নবজীবনের স্তোত্র,
প্রখর প্রাণরৌদ্রের পানীয় তোমাদের আনন্দিত করবে,
(দুর্বলদের নয়।)
শতধা সভ্যতার পাশে,
লক্ষ কোটি ভগ্নস্তুপের পাশে,
বিদীর্ণ আকাশের নিচে,
উপদ্রুত ঘুমের শিয়রে,
ছিন্নভিন্ন পৃথিবীর  বসন্তের পাশে,
লক্ষ লক্ষ নির্জন নিষ্পত্র কৃষ্ণচূড়ার পাশে,
দ্বিধাদীর্ণ জনগণমনে
মহা - আবির্ভাব।
স্বপ্নন জেগে উঠেছে, উঠেছে
স্টালিনগ্রাদে, মস্কোভায়, টিউনিসিয়ায়,
মহাচীনে।
মহা আশ্বাসের প্রবল নিঃশ্বাসে
দুর্দমনীয় ঝড় উঠেছে সৃষ্টির ঈশান কোণে।
উড়িয়ে দেবে দিগ্বিদিকে
শুকনো ধুলো
শুকনো পাতা
ঝরিয়ে দেবে।
অন্ধকারের দুর্গের সিংহতোরণ
গুঁড়িয়ে দেবে।
ইতিমধ্যে প্রস্তুত থাকো সবাই
যখন অত্যাচারীদের পতন -
চরম পতন হবে।
প্রাসাদে, বন্দরে,
বাহিরে, অন্দরে,
প্রতি গ্রামে, নগরে
লক্ষ লক্ষ মনে, দেশে দেশান্তরে,
নীরন্ধ্র নির্মম পতন।
তারপর,  অবকাশ
রাত্রি উঠে আসবে গাঢ় নীল,
স্তব্ধ ডানা পৃথিবীর নীড়ে আসবে নেমে
সুস্থ কামনার স্বর্ণচিল,
প্রতিদিনের জ্বলন্ত অস্তের পর,
শ্রম বিরতির পর।
তারপর সুস্থ মুক্ত অনর্গল প্রাণসঙ্গিনীদের নিয়ে
আবিশ্ব প্রাণ-নৃত্যের আসরে
জমবে ভাল, জমবে তখন
মধুবংশীর গলি,
বজ্রনিনাদে তোমাকেও ডেকে বলি।।
---------
মমতার চিঠি
মূলঃ হেম বড়ুয়া
অনুবাদঃ রমানাথ ভট্টাচার্য

If you are coming down through the narrows of the river Kiang
Please let me know beforehand,
And I will come out to meet you
            As far as Cho-fu sa.
                                    Ezra Paound

প্রিয়তম,
একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে নিলাম। আজ অনেক দিন পর তোমাকে
চিঠি লিখছি। বাইরের দমকা হাওয়া মোমবাতি নিবিয়ে দিতে
চাইছে। ...যাক গে, জানালাটা বন্ধ করে দিই। ...
সাত বছর আগের কথা তোমার মনে
পড়ে? আমরা যে নতুন জীবন
শুরু করেছিলাম। ...সেই অজানা নেশা আমাকে খুব করে
পেয়ে বসেছিল।
সেদিন ছিল কার্তিকের কুয়াশা ছড়ানো কোমল সকাল।
উঠোন আবৃত ছিল ঝরে-পড়া শেফালি ফুলে। আর সন্ধে বেলা,
তোমাদের বাড়িতে প্রথম আসার দিনে, আকাশের
মেঘের মোহনা থেকে হলদে রঙের চাঁদ নৌকা হ’য়ে আমাকে যে
ডেকেছিল তারার দেশে। ...
আমার পরনে লাল শাড়ি দেখে তুমি
কেন অমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছিলে?
আমার কীরকম লেগেছিল, জানো? তুমি যেন কোন দূর
বিদেশের স্বপ্নাতুর আলোর মানুষ। আর আমি? আমি যেন
ঝরে-পড়া এক শেফালি ফুল।
সেদিন মনের সাগরে ভেঙে-পড়া ঢেউ আর
জেগে ওঠা ঢেউ অসংখ্য কম্পন তুলেছিল। তোমার বুঝি
ওসব কথা মনে নেই?
বাবা যে চিঠিতে লিখেছিলেনঃ “মা, তুই নতুন
বাড়িতে হেসে খেলে থাকিস।”
ওসব সাত বছর আগের কথা। আমার যে সব কিছুই
পুরানের গল্প মনে হয়। ... জৈষ্ঠ মাসে বাবার
বাৎসরিক হয়ে গেল। বাবুল এখন বড় হয়েছে।
ওর উপর পাটীতে ডালিমদানার মতো ছোট ছোট
দাঁত উঠেছে। ও আমাকে ছেড়ে একটুও
থাকতে পারে না। ( এক এক সময় ওমন রাগ হয়,
তুমি না নেই, তাই।)

ও আমার সাদা থানপরা বেশ এরকম বিস্মিত হয়ে
দেখে কেন? জন্ম থেকেই এই বেশ ওর
পরিচিত, --সে জন্যই কি? শোনো , বাবুল এখন বড়
হয়েছে? ( আরেকটু বড় হলে ইস্কুলে
দেবো। ও ইস্কুলে চলে গেলে
আমার বুকটা খাঁ খাঁ করবে, প্রিয়!)
আর কি লিখবো। বিশেষ কিছু বলার নেই। প্রতিশ্রুতি দাও,
তুমি যেদিন ফিরে আসবে, আমাকে আগে থেকেই জানিয়ে দেবে।
আমি ভোগদৈ নদী-দিয়ে ভেসে গিয়ে লুইতের বুক থেকে তোমাকে
ডাকবো,--তুমি যেদিন
ফিরে আসবে। আমাকে আগের থেকে জানাতে ভুলো না।
ভালোবাসা নিও। ইতি
           তোমার মমতা

পুনঃ এবার মাঘ বিহুর ‘মেজি’র আগুন খুব
লাল হয়ে জ্বলেছিল। ...আমাদের বুড়িমার নতুন ছাগলী
দুটি বাচ্চা দিয়েছে। একটি নিখুঁত সাদা।
অন্যটি চিতল।
-------
সন্তাপ
- ভাস্কর চক্রবর্তী

হে সন্ধ্যা, যাবার আগে
এবার আমাকে কিছু বলে যাও।

আজো আমি
বেঁচে থাকতে চাই। ---আজো আমি
সহসা উজ্জ্বলভাবে
হেসে-উঠতে গিয়ে দেখি

এখনো আমার মুখ
হুগলী জেলার মতো ম্লান।
-----
আমার যা-কিছু
- ভাস্কর চক্রবর্তী

আমি শুধু দারিদ্র্যের কথা জানি---
আর কোনো কথাই জানি না।

দেখেছি কিশোরী, তার ম্লান মুখ---
আমি আর কিছুই দেখিনি।

আমি শুধু
ভালোবাসবার কথা বুঝি---
আর কোনো কথাই বুঝি না।
-----
রেস্তোরাঁয়
- ভাস্কর চক্রবর্তী

ভাষা-প্রেমিকের কাছে বসে আছি।
এখন বিকেল যায়, আস্তে, চলে যায়।

মনে পড়ে আলিঙ্গন---
মনে পড়ে শান্ত হাসিমুখ।

রক্তে বিষ মিশে আছে, প্রিয়তমা
এখন জীবন যায়, আস্তে, চলে যায়।
-------
বেণী

জহর সেনমজুমদার
________________________________

ষোড়শ শতকে তোমার কবিতা পড়েছিলাম
তুমি অতীন্দ্রিয় প্রেম নিয়ে কবিতা লিখেছিলে; ভাল লাগেনি
সপ্তদশ শতকে তোমার কবিতা পড়েছিলাম
তুমি কবিতা লিখেছ,দৈববন্দনামূলক,ঐশী কবিতা
ভাল লাগেনি ; খুব একটা ভাল লাগেনি
তারপর আঠারো গেলো ; উনিশ গেল
একটা সময় বিশ শতকও চলে গেলো আমাদের ছেড়ে
বহুদিন পর, অস্তচূর্ণ, বহুদিন পর
আজ হঠাৎ তোমার কবিতা পড়লাম
দেখলাম, তুমি অগ্নিদগ্ধ মেয়েদের কথা লিখেছ
রক্তমাখা নুপূর আর রক্তমাখা ছেঁড়া ছেঁড়া বেণীর কথা লিখেছো
খুব ভাল লাগল ; তোমার কবিতায় এই প্রথম
আমরা  স্পষ্ট দেখলাম ; ভাঙা বাংলা ; ভাঙা হ্যারিকেন.....
-----
ডাক সাজ প্রতিমায় রং দেয় অভিরাম পাল
জ্যোতিরিন্দ্র মৈত্র

বাড়িভাড়া বাকি কয়মাস, তবু
রুগ্ন ক্লান্ত দেহটুকু ঘিরে
অত্যাশ্চর্য  আবরণ নিয়ে, ঘোরে
তালি দেওয়া অস্তিত্বের সামগ্রী সংগ্রহে --,
অভিরাম পাল।
লগ্ন-জ্বরী কন্যা  তার।
স্ত্রীও ধোঁকে শ্বাস রোগে।
রেশন আনার কড়ি, বাড়ন্ত, সংসারে।
বাঁচবার অধিকার ধার করে
কয়েকদিন চলে।
তারপর অনিবার্য, শেষ হয়ে যাওয়া।
এই তো সেদিন,
ছোট ভাই মারা গেল গুলি খেয়ে
রাস্তার  মোড়ে।
ওদিকে, অনেক রাত্রে ফেরে,
একদা সুন্দরী তার বোন্ --
তনিমাকে চেনে সব পাড়ার মস্তান।
অত্যন্ত পঙ্কিল ঘৃণ্য জীবনের ফেন পুঞ্জ
পণ্য-দেহ ঘিরে,
অবিরাম ঘুর্ণাবর্ত রচে।
ইতিমধ্যে আকাশ কি ফর্সা হয়ে ওঠে !
নীল নীল আকাশের গায়ে লাগে
কাশ ফুল মেঘ !
ছোট ছোট সারি সারি আশ্বিনের বাৎসরিক সমারোহ   
ভেসে ওঠে চোখে।
ঢাকীরা  বায়না নেয়।
স্কুলের উদগ্রীব ছেলে-মেয়েদের শিরদাঁড়া বেয়ে
ছুটি শিরশিরিয়ে ওঠে।
খেলা-খেলা অন্ধকার আলো,
ভাঙ্গা দালানের কোণে,
উঠোনের ঘাস ওঠা বুকে।
স্টেশন, ট্রেনের বাঁশী, পোড়াকয়লার  ধোঁয়া-গন্ধ, আর
হঠাৎ দূরের দেশ, পাহাড়ের বাঁক ঘুরে পদ্ম-বিল।
এই সব চাল-চিত্র নিয়ে,
গহনার  নৌকো করে  প্রতিমারা পিতৃগৃহে আসে।
দ্রুত টোকা পড়ে যায় ভাঙ্গা দরজায় -- 
সামন্ত বাড়ীর পেয়াদাটা
বায়না  নিয়ে আসে, --- মোটাথাম পূজার দালান।
ভুলে গেল,
আজ কাল পরশুর কথা ভুলে গেল।
অনশন অর্ধাসন বিরোধ বিদ্রোহ আর মিছিলের সং।
সব ভুলে গিয়ে, আসে আশ্বিনের সোনার সকাল।
ডাক সাজ প্রতিমায় রং দেয় অভিরাম পাল।।
-------
ঠিক
-- মঞ্জুষ দাশগুপ্ত

খুব উঁচু দিয়ে পাখি উড়ে গেলে পড়ে না মাটিতে ছায়া --
তুমি কি তেমনি দূরে?
গাঢ় ভাবনার মুখগুলি দেখি কাছের তৃণাঙ্কুরে।

উইলো গাছের উঁচু হয়ে মাপে পাহাড়ী দীর্ঘতাকে --
তুমি কি তেমনি বড়ো?
আমি এইখানে হাড়গোড় ভাঙা সংকোচে জড়োসড়ো।

যত দূরে থাকো, যত বড়ো পাহাড়, পাখি বা তুমি --
জেনেছ কি সব ঠিক?
আমার হাতেই সুন্দর হলে নিখুঁত অলৌকিক।
-----
হেনরি পারসেলের শেষ কথাগুলো
- খালেদ হোসাইন

দেরি হয়ে গেছে ঘরে ফিরতে, তুষার ঝরছে তুষার-ঝড়।
দরজাটা খোলো, লক্ষ্মী বউটা, আটকে যাচ্ছে আপন স্বর।
হাত-পা কাঁপছে, শরীর কাঁপছে, হাড়েও কাঁপন পাচ্ছি টের
জানি তো আমার ভুল হয়ে গেছে, মাফ নেই পাপ আধিক্যের।

মাথায় কেবল সুর ভর, গুনগুন করে তাই গাই গান
মনে হয় যেন শরতের রোদে ভেসে বেড়াচ্ছে আমার প্রাণ
তাই তো আমার দেরি হয়ে যায়, পাখির ডাক আর ফুলের ঘ্রাণ
আমাকে দেরি করিয়ে দেয় যে, দরজাটা খোলে আমার জান।

আমি কি কেবল সুর ভালোবাসি, গান গেয়ে ফিরি সমস্ত ক্ষণ
সত্যি কি তুমি জানো না তোমাকে কত ভালোবাসে আমার মন?
কাকে সুরে ধরি, কাকে তবে গাই করি এ ব্যাকুল সন্তরণ?
তুষারে যে আমি ঢাকা পড়ে গেছি, দরজাটা খেলে আমার ধন!

আর কেনোদিনও দেরি হবে না, বাইরে যাব না প্রিয়তমা
কেবল তোমাকে সঙ্গ দেব, আজকের মতো করো ক্ষমা
চোখপর পাপড়িতে তুষার জমে আছে নেই তো তাদের দাঁড়ি-কমা
ঠোঁটের কাঁপুনিতে কথাই বলা দায়, তুমি কি রাত্রির চেয়ে অমা?
------
ধূধূ
- তারাপদ রায়

কি যেন নাম ছিলো তোমার অল্প বয়সে?
লজ্জা পাচ্ছো কেন, আমি ছাড়া আজ আর কেউ জানে না,
তুমি নিজেও কি জানো,
               কারা যেন তোমাকে একদিন অনেকদিন আগে
               ধুধু বলে ডাকতো।

ধুধু শব্দটির এপারে ওপারে কিছু নেই।
যেন আমাদের সেই শহরতলীর বাসার উত্তরের জানালা,
শুধু ফাঁকা মাঠ, নীল আকাশের নীচে কাশফুলের মহাসাগর।
তোমাকে আজকাল যেন এসব কিছুর থেকেও
             সুদূর ও উদাসীন মনে হয়।
আবার মনে পড়ে যায়
             একদিন তোমাকে আমরা ধুধু বলে ডাকতাম।

আজ আর কেউ জানে না।
ধুধু শব্দটির অর্থও আজ আর একরকম নয়।
শহরতলীর শেষ জানালার নীচে এক আদিগন্ত মাঠে
তোমার ছোটবেলার নামের সঙ্গে
           সেই আশ্চর্য শব্দটিও কবে হারিয়ে গেছে।
-------
কবি জন্মাবেন বলে
- গীতা চট্টোপাধ্যায়

You are to attain the impossible, You are immortal
                                  - 'দ্য পোয়েট'স রিলিজিয়ন', ক্রিয়েটিভ য়্যুনিটি, রবীন্দ্রনাথ

কবি জন্মাবেন বলে এত কিছু স্বপ্ন, অবিশ্বাস,
এত রূঢ় জনরব এত বিষাদের ব্যাপকতা
এই সব গ্লানিপুঞ্জ হিমালয় পথে দাবানল
বিরহের নামান্তর অন্তহীন এক পূর্বরাগ।
প্রেম তো নিসর্গ নয়, নয় প্রেম প্রগাঢ় অভ্যাস,
সে স্বরূপ ভাঁজে ভাঁজে এমন সহজ নির্ভরতা
'নিজেকে উদ্ধার করো' তার কন্ঠ খুব কাছে বাজে:
তার স্বপ্নে দেখা দেয় কৈলাসের সোনার কমল।

হে কবিপুরুষ, তিনি অন্তরাত্মা, নিজেকে জানেন,
প্রেম মৃত্যু পরাভব দেন না আসন ছাড়তে যদি
তবুও তোমার চোখ ছলছল হে তমসা নদী,
অন্ধকার অন্ধকার কিছুক্ষণ অন্ধকার থাক।
আজ কাল আগামীর সব কিছু জানা-ও হারায়
সে কি আসে, কান পাতে পলাতক প্রতিটি আওয়াজে।

আকাশের তারাগুলি পূব থেকে পশ্চিমে পারায়
সন্ধ্যা আসে, সন্ধ্যা যায় প্রতীক্ষায়, কবি জন্মাবেন?

৮.৯.৯৬
-------
ছবি
- মণিশংকর বিশ্বাস

এখন গানের শীর্ষে আমপাতা, জামপাতা, শরণার্থী কাক
বুকের ভিতর আকুলি বিকুলি---ছেঁড়া পোস্টকার্ড---
শুধুমুধু চীৎকার সে-তো জবাফুল---নদীর ভিতর
যেইখানে চর জেগে ওঠে, সেইখানে জন্ম এই নক্সীকাঁথার---
সে এক দূরের নীলিমা---প্রথা, প্রথাবিরোধিতা, কল্পনায় ভাসমান
অসমান তল, মাটি এবড়ো খেবড়ো---
মালীর কিন্তু কাজের থেকে গান বেশী---
'পেয়েছি এক ভাঙা নৌকা, জনম গেল ছেঁচতে পানি...'
বাবুদের ছুতোর আড় চোখে লক্ষ্য রাখছে ফাঁকা কলতলা---
বিকেল রঙের একটি ডাহুক পাখি নীচে নেমে আসে---
মানব জনম এক বোঝা---মেয়েটি বোঝে---
বকুল গাছের ডালে তার নিছক দোলনা---
এগোয় পিছোয়---সরল দোলগতি---
দু'টি দাড়ির ফাঁকে সূর্যদেব তুলির একটানে
মুছে যায়---কার তুলি?
প্রতিটি ঘরে দূর হতে একইরকম বাতি জ্বলে ওঠে
প্রতিটি জানালায় একটিই মুখ---
তুমি অন্ধকার আয়না---তাই এত ক'রেও
আমি নিজেকে দেখিনি কোনোদিন
তোমার বুকের পরে ন্যস্ত, ভীরু, মুগ্ধ, শিশুর মতন।
-------
চিঠি, ১৩৩৭
- গীতা চট্টোপাধ্যায়

বাবা আমার গানের খাতা হারিয়ে গেছে সারা জীবন
      সেই যে তুমি উথাল গঙ্গা পারাপারে শিখিয়েছিলে
            'অমল ধবল' বাবা আমার এস্রাজে ছড় হারিয়ে গেছে।

মাকে আমার কিচ্ছু মনে পড়ে না, মা ছেলেবেলার
       গল্পে শুধু রাঙাপাড়ের ঘোমটা টেনে জ্বরের ঘোরে
              ভাইকে নিয়ে খাটের থেকে রাত নিশুতি চলে গেল।

সেইখানে তো গল্প শুরু তোমার সঙ্গে বাবা আমার
        রাত্তিরে ঘুম  ভেঙে গেলেই মুখের দিকে চেয়ে আছ
সেই যে তুমি হাঁটতে শেখার সঙ্গে সঙ্গী করে নিলে
        সেই যে তুমি বিশ্বকোষে হাত ধরিয়ে ঘুরিয়েছিলে
সেই যে তুমি দার্জিলিংয়ে ঘোড়ায় চড়তে শিখিয়ে দিলে
        উথাল গঙ্গা পারাপারে অমল ধবল বাবা আমার!

কিচ্ছু আমার মিলছে না যে তারই সঙ্গে মিলছে না গো
        বেগনি বেনারসির ঘোমটা চারদিকে সব রাত নেমেছে
এরা জানলা খোলে না ভয় ঠাণ্ডা লাগতে পারে 'খোকার'
        তাবিজ কবজ ভারাক্রান্ত ঢুকেছি কোন বন্ধ বাড়ি!

প্রবল দুটি প্রতিদ্বন্দ্বী একটি পুরুষ আরেক নারী
       আমার ভাগ্যবিধাতারও ভাগ্য নিয়ে খেলেন পাশা,
এঁরা পারেন বশীকরণ মন্ত্র-সিঁদুর জটিবড়ি
       আমাকে সব কেমন চোখে দেখেন, আমি কী করেছি!

ঠারাঠারি ফিসফিসিয়ে বিষমাখানো নিচু গলায়:
       'আমার যেমন হয়েছে তোর হবে না কি তাই, ভেবেছিস?'---
চারদিকে এই কী সব হাওয়া, শ্বাস নিতে খুব ছটফটিয়ে
        বুকের মধ্যে গানের আকাশ হারিয়ে গেল বাবা আমার।

১১ এপ্রিল ১৯৭৮
------
ব্যাকরণ

রমাকান্ত রথ
ওড়িয়া কবিতা থেকে অনুবাদ : জ্যোতির্ময় দাশ
____________________________________________________________________________

#
পুরুষ নারী আর শিশুদের দগ্ধ মৃতদেহ পড়ে রয়েছে
এখানে রেলের কামরায়।  আশ্চর্য,  একজনও জীবিত মানুষ নেই
আশেপাশে  কোথাও,প্রত্যেকটি রাস্তার দুধারে শুধু ভাঙা-বাড়ি।
এগিয়ে যাও।  এগিয়ে যাবে কোথায় ?  অন্য কোনোও গ্রামে ?
অন্য শহরে ?  সবকিছু তো একইরকম  সবজায়গায় !
মৃতদেহের পোড়া গন্ধ, পেট-কাটা কবন্ধ লাশ,সবকিছুই
এই এক তুমি দেখতে পাবে সব জায়গাতেই।

#
শব্দের দেওয়ালে বিশাল সব ফুটো, দরজা-জানলা নেই
কোনো বাক্যেরই শরীরে।  ব্যক্তিবাচক সমস্ত বিশেষ্যরা
হয় মৃত, নাহলে আশ্রয় নিয়েছে কোনো শরনার্থী শিবিরে।
অর্থবহ সুশ্রী সমস্ত বিশেষণেরা চলে গেছে ট্রেনে চেপে,
লরিতে চেপে অথবা পায়ে হেঁটে রাতের অন্ধকারে।
তাদের মধ্যে যদি কেউ এখনও থেকে থাকে এখানে কোথাও
তারা নিশ্চয় লুকিয়ে রেখেছে স্বজন-আত্মীয়ের বাড়িতে।
কিছু দাঙ্গাবাজ ক্রিয়াপদ  সাংঘাতিক অস্ত্র আর পেট্রলের টিন হাতে
এখন শাসন করছে সমস্ত রাজপথ এবং দোকান-বাজার।

#
ছোটোরা সকলে এসো,  নতুন স্কুল খুলেছি তোমাদের জন্য আমরা
এখন থেকে কেউ যদি ক্লাশের মেয়েদের বলতে না পারে
কেমন দেখতে ছিল পাখি ফুল চাঁদ আর রামধনুরা
তাতে আর কি হবে ?  তোমরা নিশ্চয় এগিয়ে যেতে থাকবে
এক ক্লাশ থেকে উঁচু আরও ক্লাশে
মানুষ থেকে......
যদি জানতাম মানুষের বিপরীত শব্দটা কী হবে
তাহলে বলতে পারতাম তোমাদের কোথায় যাবে তোমরা !
------
যা লিখি সহজে লিখি
- শক্তিপদ ব্রহ্মচারী

যা লিখি সহজে লিখি যা লিখি না তারও কণা কণা
মনের আকাশে ঘোরে চেতনায় অবচেতনায়
বিষণ্ণ সন্ধ্যায় ভাবি শব্দ নিয়ে আত্মপ্রতারণা
সে কি তবে? অন্য কোনো সামাজিক দায়
আমার বহনযোগ্য! ভাষা-ব্যূহ-বৃত্তের সীমানা
বচনে প্রসিদ্ধ হলে, পুষ্ট হবে বেদনার দানা?

আমার সহজ শব্দে যদি তুমি বশ্য হয়ে থাক
বাকপ্রতিমার নিচে মেধার মুখোশ ছিন্ন করে
আমার কাঙাল মুখ শুধু ভালোবাসা দিয়ে ঢাকো
শুধু ভালো, ভালোবাসা যা কিছু না বলুক ইতরে
মিষ্টান্ন তোমার ভোগ্য সঙ্গে আছি আমি সুখে দুখে
আজ উৎসবের দিন, এসো মুখ রাখি এই মুখে।
------
দূরত্ব
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

চোখ থেকে চশমার দূরত্ব যতখানি
জীবন থেকে মৃত্যুর দূরত্ব ততটাই।
আমরা চশমার ভেতর দিয়ে দুনিয়া দেখি
খবরের কাগজ পড়ি, মুগ্ধ হয়ে রাতের আকাশে তাকাই।
খালি চোখে দুটো চাঁদ দেখি এখন
পাশাপাশি সেঁটে আছে,
ডাক্তার গা ঘেঁষে দাঁড়ায়, পাওয়ার বদলে দেয়,
বলে দেয়, ছানি কাটার সময় হয়েছে---
চশমা ক্রমশ অনিবার্য হয়ে ওঠে।
দুই কাচের মধ্যবর্তী ব্রিজ নাকের ওপর
ঠিক বসে যায়। মুখের দু'পাশ দিয়ে ঠিক
আটকে যায় কানের খাঁজে। যেন কানদুটো
চশমা পরার জন্যই তৈরি হয়েছে।

সমস্ত মুখটা ঘিরে থাকে চশমা
ছবিতে চশমা-পরা মুখ ওঠে
চশমা এসে মুখের গাম্ভীর্য বাড়িয়ে দেয়
চোখকে পেছনে রেখে নিজে এগিয়ে আসে মানুষের দিকে।
জানিয়ে দেয়
চোখ থেকে চশমার দূরত্ব যতখানি
জীবন থেকে মৃত্যুর দূরত্বও ততটাই।
---------
বেহালার ছেলেটা
- সুবোধ সরকার

বেহালা কোনও গ্রাম নয়। বেহালা কোনও উপত্যকা নয়
বেহালা কোনও শহর নয়। বেহালা কোনও আঙুরখেত নয়
রাত সাড়ে দশটায় নক্ষত্রের আলোয় ট্রামভর্তি লোক।
রাত এগারোটায় খিদিরপুরের দিক থেকে পাঁচখানা ৩৭ নম্বর
ছুটে আসছে গোটা খিদিরপুর নিয়ে।
রাত বারোটায় ডায়মন্ডহারবার রোড চলতে শরু করল।
ডায়মন্ডহারবার রোড কীর্তিনাশার মতো ছড়িয়ে পড়ল ভারতবর্ষে।
কয়েক হাজার মাইল দূরে বেহালার ছেলেটা ব্যাট করছে এখন।
শান্ত কিন্তু রাগি
স্থির কিন্তু তেজি
সমাহিত কিন্তু ছটফটে
'মা, দেখ, কী সুন্দর দেখাচ্ছে আমাদের ছেলেটাকে'।
কে বলল কথাটা?
আমি
কে আমি? তারাতলায় থাকো।
না, আমি রাজারহাটে থাকি, আমি বারাসতে থাকি
আমি বহরমপুর, আমি বালুরঘাট, আমি কুচবিহার।
রাত্রি সাড়ে বারোটা। আকাশ থমথমে। ভারতবর্ষের আকাশ
চিরকালই থমথমে। জ্যোৎস্নায় ভরে গেছে ভারতবর্ষ
গরিবের ভারত, অভিজাতের ভারত, দলিত ভারত।

একটা দুরন্ত ছয় মারল ছেলেটা।
জ্যোৎস্না পার হয়ে বলটা গিয়ে পড়ল আসামের জঙ্গলে,
সেখানে তিনজন টেররিস্ট বসে আছে সাইনাইড খাবে বলে
তিনজনই লাফিয়ে উঠল , আঃ মৃত্যু! দাঁড়াও!
আর একটা ছয় দেখে যেতে চাই
জ্যোৎস্না পার হয়ে, পার হয়ে , বল এসে পড়ল এবার
বম্বের ধারাভিতে-এশিয়ার সবচেয়ে বড় বস্তি
তিনজন মারামারি করছিল রুটি তরকা নিয়ে,
থেমে গেল। জোয়ারের মত বেরিয়ে গেল গোটা ঝোপড়ি
খেতে-না-পাওয়া জ্যোৎস্নায় থমকে দাঁড়ানো ভারতবর্ষ ।
জ্যোৎস্না পার হয়ে বল এসে পড়ল আহমেদাবাদে
বল জিজ্ঞেস করল , তোমরা কাকে পুড়িয়ে মারছ?
বল এসে পড়ল শ্রীনগরে , বল জিজ্ঞেস করল :
কী হয়েছে তোমাদের , এত বছর ধরে
একই ভুল করে চলেছ তোমরা?
মা, দেখ কী সুন্দর দেখাচ্ছে আমাদের ছেলেটাকে !
কে? কে বলল কথাটা?
আমি? আমি কে?
আমি ধর্ম, আমি অধর্ম, আমি ব্রাক্ষ্মণ, আমি মেথর,
আমি রাস্তা ঝাঁট দিই, আমি ইটভাটায় ইট তুলি
আমি কলেজে পড়ি, আমি জেলখানায়
আমি মাঠে, আমি বস্তিতে, আমি বারোতলায়....
আমাকে চিনলে না?
আমি ভারতবর্ষ।

ট্রামলাইন চলে গেছে গরিবের ঘর ছুঁয়ে
অনন্ত নক্ষত্রে ঘেরা ওটাই বেহালা, ওটাই ওর পাড়া
বিদ্যুৎবেগে একটা বল ছুটে যাচ্ছে বাউন্ডারির বাইরে
গ্যালারি নয় , গোটা ভারত বর্ষ উঠে দাঁড়িয়েছে এত রাতে
ধর্ম ভুলে, জাতি ভুলে, দাঙ্গা ভুলে
বলটা কোথায় গিয়ে পড়ল একটু দেখবে বলে।
--------
- উষ্ণতার গল্প
-তসলিমা নাসরিন

এক কাপ চা পর্যন্ত অপেক্ষা করেছি
অপেক্ষারও তো একটা সীমা আছে অথবা বয়স ।
আমি কি এখনো স্কুল পালানো কিশোরী
ঝোপেঝাড়ে শেষ ঘন্টা পর্যন্ত দাঁড়িয়ে থাকবো ?
আমার শেষ ঘন্টা বেজে গেছে সেই কতোকাল
দপ্তরিরা ঘুমোতে গেছে ।
এখন হাজার রকম ব্যস্ততা আমার
এখন বড়জোড় কারো জন্য এককাপ চা পর্যন্ত
                            অপেক্ষা করতে পারি ।
এখন কুশল জিজ্ঞাসা ছাড়া দু'দন্ড সময় নেই
তবু তোমার জন্য একটি একলা চেয়ারে বসে
এক কাপ চা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে করতে দেখেছি
এতো ঠান্ডা করে চা এর আগে কখনো আমি পান করিনি ।

এরকম শীতল পাখি কবে থেকে পোষা ছিল বুকের খাঁচায় ?
--------
নিজের ছায়ার প্রতি
-বিনয় মজুমদার

নিজের ছায়ার প্রতি যখন পৃথিবী চায় তখনি সে ছায়ার ভিতরে
বিশ্বের প্রকৃত রূপ বেশ কিছু দেখা যায়, দেখা যায় অন্ধকার
               আর তারাগুলি।
এ বিশ্বে কিছুই নেই অন্ধকার আর তারা ছাড়া আর কিছুই নেই
                  এই মনে হয়।
ফলে ভালোবাসার জন্য আছে শুধু তারা যেহেতু তারারা ছাড়া
                    আর কেউ নেই।
আমি রাত্রিবেলা ওই আকাশের দিকে চেয়ে ভাবি ভাবি ভাবি,
যদি কিছু বোঝা যায়, যদিও এ বিশ্বের সব রহস্যাবলীর কিছু বুঝি।
তারাগুলি একে একে জড় হয় রেলওয়ে প্ল্যাটফর্মে, কিছু তারা
                 বই হাতে আসে।
তারার আলোক আসে একে বেঁকে তার ফলে তারাকে যেখানে
দেখি সেখানে সেই তারা নেই আছে অন্য কোনোখানে অতীব গোপনে।
-------
পূর্বাভাস
- দাউদ হায়দার

সমস্ত তল্লাট স্তব্ধ হয়ে আছে
কোনো পূর্বাভাস কি-না ঝড়বাদলের
মালুম হচ্ছে না ঠিক, হতে পারে
ছকটা রাজনৈতিক কলাকৌশলের

চোখের আড়ালে এত খেলা
এত ছলাকলা, এত মিথ্যাচার
কখনো দেখিনি আগে।
যে-ঘটনা প্রচারিত, সব মিথ্যে নয় মিডিয়ার

এক ঢিলে দুই পাখি মেরে ভাবো
হাতের নিশানা ঠিক আছে।
কতটা সঠিক জানো না নিজেই
ঘুরে মরো আনাচেকানাচে

মরার সময় ঘনিয়ে আসছে
ঝড়ের আভাস চারদিকে
কোথায় পালাবে, কী কৌশলে
মোকাবেলা করবে রাজনৈতিকে?
------
পিতা বলেছেন
- মাকিদ হায়দার
[কবি শহীদ ইকবাল প্রীতিভাজনেষু]

আমার প্রতি মাতুলের-ক্ষেত্রের কথা
কেউ না জানলেও আমি জানি।

সকলেই জানতে চান তোমার হাত দুটি
কি বাতাসে উড়ে গিয়েছে
নাকি অন্য কিছুতে? আমি এক প্রশ্ন
এঁটে দিয়ে বিনয়ের সাথে বলি
                            বাতাসে, বাতাসে
উড়ে গিয়েছে আমার দুই হাত, চোখ দুটি
প্রায় অন্ধ।

তক্ষুনি তারা চিৎকার করে জানতে চান,
তুই আর কতদিন মিথ্যের আড়ালে ঢাকবি সত্যকে?
নিজের ক্রোধকে লোহার শেকলে বেঁধে আস্তে করে বলি
সবই আমার অপকর্ম-কর্মের দুর্ভোগ।
                                  দুর্ভোগ যদি নাই হবে
তাহলে কেন আমি বলতে গেলাম, বিচার চাই।
কেন বলতে গেলাম
আর কত দিন দাঁড় করিয়ে রাখবে-থাকতে হবে পথে।
আশায় আশায়।

যদিও মাতুলের ভাইবোনদের একজন আমার মা,
তিনি তো নির্বাক দীর্ঘদিন থেকে।
                        তিনি তো জানতেন না
তারই রক্তের ভাই, চুষে খাবে অন্যদের মাঝ রাতে।
তিনি তো জানতেন না, দেশকাল ভুলে গিয়ে একদল
                      মানুষ হারাবে পথ,
                      নিজেদের সম্ভ্রম।
গতরাতে মৃত পিতাকে পেয়েছিলাম আমার স্বপ্নের
ঠিক মাঝখানে।
তাঁকে বললাম-তিনি শুনলেন, শেষে জানালেন,
তোর রাঙ্গা খালাম্মার ছেলে দুটির ভীষণ অসুখ
কখন কি যে হয়-তবু তোকে বলে রাখি-
মাতুলের চোখ থেকে তোরা ক'ভাই দূরে থাকিস,
সুযোগ সুবিধে পেলে
ফিরে যাবে আগের আসনে তোর
প্রিয় রোকোনালী মামা।

ঘুম ভাঙতেই দেখি শ্যামাবুবু তাকালেন বার দুই
আমার চোখের দিকে,
কিছু একটা ভেবে বললেন, গতরাতে পিতাকে দেখলাম।
তিনি বলেছেন
ভয় নেই।
-------
সমকালীন
- দাউদ হায়দার

যে-কোনো মুহূর্তে খুন হয়ে যেতে পারি
অামার সামনে-পেছনে শতেক অাততায়ী
স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টি নেই।
শ্রীকৃষ্ণউবাচ : 'মানবজীবন ক্ষণকালীন, অস্থায়ী'

এখনো যে বেঁচে আছি সেটাই রহস্য
অবিমৃশ্য-কাল বলতে যা বুঝি
দশদিক -জুড়ে সেই ছায়া গাঢ়,
আমার সমকালীনতায় কেবল ধ্বংসের পুঁজি

প্রকৃতপ্রস্তাবে বেঁচে থাকা মানে
দিনগত পাপক্ষয়ে
ভেসে যাই চোরাস্রোতে, অজানায়
যেতে-যেতে দেখি সন্ত্রাসী মাতে মহোৎসবে, জয়ে।
-------
দেখি তোমার ভালোবাসা
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

'তোমাকে ভালোবাসি'- এই কথা অমন সহজে
বলার নয়।যুক্তাক্ষর নেই বলে এই দুটি শব্দ উচ্চারণ
মেয়েদের পক্ষে সোজা, যেমন 'খিদে পেয়েছে' যেমন 'বাড়ি যাবো'।
তবু হঠাৎ 'তোমাকে ভালোবাসি' শুনলে আমার বুক
কেঁপে ওঠে, মিথ্যে কথা, এ তোমার মিথ্যে কথা-
দেখি, তোমার চোখ দেখি, আমার মুখের দিকে তাকাও-
দেখি, তোমার করতল মুষ্টিবদ্ধ হতে চাইছে কি না,
তোমার পা কাঁপছে কি না, দেখি দেখি,
তোমার স্তনের আড়ালে হৃৎপিণ্ডটা-
তোমার সর্বস্ব আমার হাতে দাও, আগে দেখি তোমার ভালোবাসা।
কী চাও স্পষ্ট করে বলো-
আমি এখনো সক্ষম, এখনো একাধিক রমণী
আমার কাঁধে মাথা রেখে দাঁড়াতে পারে, নির্ভরতা
আমার বাহুতে বৃক্ষের মতো অটল, বলো কী চাও,
বলো, 'তোমাকে ভালোবাসি'- এ ছলনা।
ভালোবাসা প্রকাণ্ড ব্যাপার, ভালোবাসা পথ বুলিয়ে দেয়
আয়ু নষ্ট করে, ভালোবাসা ঘরের মানুষকে চুলের মুঠি ধরে পথে নামায়-
অত সহজে ও-কথা বলতে নেই, আমার মাথা ভর্তি নেশা,
এখন যা বলবে বিশ্বাস করতে ইচ্ছুক,- কারণ সারা শরীর ক্লান্ত...
অত সহজে হাত থেকে ফেলে দিও না আধুলিটা।

তোমার ঘর জোড়া শোবার খাট, রাখার আলমারি,  লুকোবার তোরঙ্গ
ঠাকুরপুজোর সিংহাসন--- না, এত আসবাবের তলায় হামাগুড়ি দিয়ে
পয়সা খোঁজার কষ্ট থেকে আমাকে বাঁচাও।
--------
আলোর কাক
- পুণ্যশ্লোক দাশগুপ্ত

ধীরে ধীরে সেই অক্টাভিয়া সম্পর্কের উপর ঝুপ করে বসে পড়লো
চড়ুইপাখির ডানায় ডানায় খুব নিচু স্বরে কথাযা তোরা ঠান্ডা অন্ধকারে যা,বোকা কোথাকার, তুমি কোথায় তুমি কোথায় ধুলো উড়িয়ে,উত্তেজিত কাক।
অক্টাভিয়ার সাথে আমার নতুন পরিচয়,সৌজন্যমূলক,
আসলে অরুন্ধতী, সুদৃঢ নীরবতা,ফুলের বাগান নতুন রসায়ন।
পাখি,ডায়মন্ডহারবার,রোম থেকে বুলবুলি শালিখ পায়রা
কী সুন্দর গুছানো বৃক্ষের সারি,বাঁশঝাড়,উপত্যকার ঝিল
সেসব খালবিলে টিলার মাথায় টংঘরে আমি রোজ
হিসেব মেলাই,কি হলো কেমন করে হলো
যা তোরা ঠান্ডা অন্ধকারে যা,বোকা কোথাকার
শিশির ভিজিয়ে নিলাম শিশিরে
মা মাখনের প্রতি হাত বাড়ালেন আর কিছুতেই তার মন নেই
কাঁচা লঙ্কায় ভিজিয়ে নিলেন ভাতের প্রদাহ
আমার ইচ্ছে করে না মাকে ছেড়ে দূরে কোথাও যাই
তবু যাই তবু যেতে হয় মাকে ভালো রাখবো বলেই তো
মা তা কিছুতেই বোঝে না
যাস না যাস না তুই আমি একা
কাকেরা পাহাড়া দেয় মাকে
মা ওদের ভাত বেড়ে দেয় চৌকাঠে
ঝাঁকে ঝাঁকে পাখিরাও আসে
মা ওদের দানা দিয়ে বলে যাবি না কোথাও
-------
একটি রঙিন নারী
- বীতশোক ভট্টাচার্য

একটি রঙিন নারী মনে হয় সে আমাকে কখনো দ্যাখেনি;
কোনোদিন দেখবে না, আমি শুধু একবার দেখে নিতে পারি
দুপুর গড়িয়ে গেলে খেলাচ্ছলে সে যদি বাগানে
নামে বা এখানে যদি অকৃত্রিম মনে হয় অলিন্দ শব্দটি,
তাহ’লে উদ্ধৃত ক’রে আমিই সেখান থেকে তাকে দেখে নেব
বা শিল্পসন্নিভ বুঝি সেই এত তার ওই শিখাময়ী শাড়ি
তার ওই ঝরনাস্রোত আর ওই শরীরের আনন্দপ্রবাহ
সমস্ত আকাশ জল আলো হাওয়া শীত রোদ সৃজন করেছে
স্বাভাবিক প্রাকৃতিক তবে আর তার চেয়ে মিথ্যাচারী নেই :
এই অপবাদ দিতে সাধ গেল, কিন্তু চেয়ে সে তো আর দেখবে না তাও।
--------
কুয়ালা লামপুর

সৌভাগ্যকুমার মিশ্র
_________________

ওড়িয়া কবিতা থেকে অনুবাদ : জ্যোতির্ময়  দাশ
_______________________________________

#

বহরমপুরের উকিলবাবু রসিকলাল, আপনি কি কুয়ালা লামপুর
দেখেছেন কখনও, বিরহে যদি না-ও দেখে থাকেন,
ভালোবাসায়,সিনেমায় অথবা অসফল পঞ্চবার্ষিকী
পরিকল্পনা বাতিল করার মুহুর্তে কখনও ?

#
গতকাল বিকেলের ম্যাজিক শো-তে এলোকেশী মহিলার
জাদু-কৌশলগুলো তার স্বামীর থেকে বেশি ভাল ছিল।
সোনার-গিল্টি-করা খাঁচার ভেতরে কখনও আপনি
অশরীরী কঙ্কালকে দেখেছেন নাচতে ?

#
টাউন হলের চৌকিদারকে জিজ্ঞাসা করতে পারেন,
জিগ্যেস করুন আপনার খামারের ট্রাকটারটিকে,
জেলখানার ফটকের ওপাশের অন্ধ খুনিকে,
কুয়ালা লামপুর, তোমরা কখনও কুয়ালা লামপুর দেখেছ কী ?

#
জিজ্ঞাসা করে দেখুন সেই সধবা মহিলা তপস্বিনীকে,
শুকনো-ডাঙায় লাফাতে থাকা মাছকে, বাইশটি সিঁড়ি* - ভেঙে
উঠতে থাকা মাতালকে, বন্ধ হয়ে যাওয়া ঘড়িটিকে, চন্ডাশোক এবং
বাল্মীকিকে, কক্ষচ্যুত হয়ে পথভ্রষ্ট গ্রহটিকে, শীতের রাতে
গভীর জঙ্গলে বিকল হয়ে যাওয়া ফিয়াট গাড়িটিকে,
মোটা চেকবই হাতে নাচতে থাকা ভিখিরিকে, নিজের প্রাসাদোপম
বাড়ির দোতলায় তন্দ্রাচ্ছন্ন  সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপককে, আপনার
স্ত্রীর- হাতের সোনার বালার ওপরে বসে থাকা মাছিটিকে,
আপনার খাট বেয়ে লতিয়ে উঠতে থাকা মালতীলতাটিকে,
চাঁদের গায়ে হামাগুড়ি দিতে থাকা পিঁপড়েটিকে।

#
ওহে বিদেশি জাদুকর !  রসিকলালও নয়, আপনি কিংবা আমিও নয়,
আমরা কেউ-ই কুয়ালা লামপুর দেখিনি কখনও ।
কোনাকুনি সোজা হেঁটে ১-নম্বর প্ল্যাটফর্ম  থেকে ২-নম্বরে যাওয়াই
আমাদের বিক্রম প্রকাশের একমাত্র পথ ; সরাসরি ২-নম্বর প্ল্যাটফর্ম
থেকে ১-নম্বরে আসতে পারাই আমাদের সাবধানতা দেখানোর শ্রেষ্ঠ নিদর্শন।
তার মধ্যেই কোথাও একটা ট্রেন ছুটে বেরিয়ে যায়, কোন ট্রেন ?  কোথায়
যায় সেই ট্রেনটা ?  কুয়ালা লামপুর !  কুয়ালা লামপুর !
-------
একটি ব্যর্থপ্রেম
- শম্ভুনাথ চট্টোপাধ্যায়

মধ্যরাতে চুপিচুপি বেদুইন-তাঁবুর ভিতরে,
কিংখাবে লুকানো হাত---এসেছিল দ্বিচারিণী ছায়া :
আমার নিদ্রিত মুখ দেখেছিল জ্যোৎস্নার আলোতে...

আশ্চর্য তখন কেন নিদ্রাসুখ ভাঙে নি আমার?
তবে কি কোথাও কিছু সন্দেহের আভাস ছিল না?
শিয়রে নিশ্চিন্ত ছিল আমার রক্ষিত তরবারি।

হলো হত্যাকান্ড তাই। একবার বিদ্যুৎ চকিত
সাদা হাত উঠেছিল শূন্যে আর দ্রুত নেমেছিল...
তারপর অট্টহাসি ফিরে গেছে নৈশ মেরুপথে!

আমার নিহত বুকে গেথে আছে আমুল ছুরিকা!
--------
আঁধার পরিধি - চার
- একরাম আলি

অবিচ্ছেদ্য, তোমাকে পেরিয়ে গেলে স্বাধীনতা পাব?
তোমাকে ছাড়িয়ে?

তোমাকে পেরিয়ে দেখি দূরদ্রষ্টা অন্ধ এক প্রাণ
বাড়ে-কমে। তার রূপ--- অশান্ত গঠন
চাঁদ থেকে সূর্যের কম্পন অব্দি জড়িয়ে রয়েছে
ফলে অধিকাংশ দিন অংশত সে অপ্রকাশ্য থাকে

তবু তার মুখোমুখি বসে আজ চিরত্ন অগ্নির
আস্বাদ পাব কি প্রিয়, পেরিয়ে তোমাকে?
---------
সংস্কার
- বীতশোক ভট্টাচার্য

খুঁজে মরি সন্তানের নাম।
মেয়ে সে কাননতারা, আর ছেলে গগনকুসুম;
আকাশপ্রসূন অথবা কি।
কে যেন নিবিদ থেকে জাগিয়েছে অগ্নির অভিধা :
জাতবেদা তুমি, বৈশ্বানর।
জানি না নিরুক্ত থেকে এ ছেলেকে আর কোন অন্য নাম দেবো।
অহনা অরুষী উষা ডেকে উঠি নিজের মেয়েকে।
আগুনে তুষারে প্রাণ জাগে।

নাম নাম সংখ্যা নেই, শঙ্খ পদ্ম নাম।
কে তুমি আভূমিনত একক প্রণামে।
নাম্নী একা বাংলাভাষা, নাম বঙ্গদেশ।
ধরো আরো বেশি কিছু…পল্লবিত স্পুষ্পক শিশিরচ্ছুরিত
জীবন, বিজন, ভালোবাসা।
পুন্নাম নরকে ঢেউ, ছড়ায় ছাপায় নাম ঊর্মিল মর্মরে।

নাম সে প্রথমজাত অমৃতের মতো।
কম নয় সময় নামের :
দশ মাস কিংবা দশ হাজার বছর।
সগরসন্তান জেগে ওঠে।
ক্রমে দ্যাখো বাঁকে বাঁকে সমতল গঙ্গার মাটিতে
নাম ওঠে নির্মিত কুটির।
ওঠে নাম উদ্যত কুঠার।
নাম নাম ঘিরে নামে স্নিগ্ধ কুয়োতলা।
বাঁধানো চাঁপার তলা---এসো নাম, বসো ঘরে নাম।
নাও নাম গোলার বিছন।
নামের ভেতর চলে প্রণয়ীর হাতে ধরা হাত বনবীথি।
নামের আবেগে নদী চলে।

নাম থেকে নদীগর্ভে নৌকো জেগে ওঠে :
সপ্তডিঙা মধুকর চন্দ্রখোল নাম।
ডিঙার ওপরে জাগে সনকার সন্তান স্বজন।
এসো গো জোকার দাও, শাঁখ বাজা না লো।
চলো হে ধ্বনির ধারা উৎসে চলো, সাগরসঙ্গমে।
কেবলই নিক্কনে বাজে নানা নাম : বিপুলা বিহ্বলা
ও বেহুলা, কার নাম, কার…
সন্তর্পণে ঢোকে নাম জন্মের বাসরে।
-------------
পুরী সিরিজ ৮
- উৎপলকুমার বসু

সামুদ্রিক মফস্বলে ফিরে চলো। সস্তা ও কোমল
তরিতরকারিময় ঐ দেশে। গাছের ছায়ায় বসে ভেবো এই।
তোমার তর্জনী ধরে এরো বেশি যাওয়া যাবে, শিশুর তর্জনী
আরো দূরে টেনে নাও, এমন-কি যে-দেশে এবার
অনাবৃষ্টি, অসম্ভব মহামারী, বেকারবিপ্লব,
চাষীদের মাথায় কাঁঠাল ভেঙে খাদ্যরত রাজনীতিজ্ঞের দলে
ভিড়ে যাই, চলো, সময় বড়ই অল্প, তা'ছাড়া, যত দিন যায়
সময় ক্ষুদ্রতর, সে বামন, লাফিয়ে পিঠের
উপরে আরূঢ় হই, চলো, নইলে অনেক ছোট, মুর্খ ম্লান হয়ে
যাবে সে-ও। বামন ঘোড়ার পিঠে ন্যস্ত হয়ে কবিতার ব্যাখ্যা চেয়ো না
সস্তা ও কোমল তরিতরকারিময় দেশে ভালমন্দ খাও দাও
তোমার পিছনে কোনো গোয়েন্দার চোখ নেই। শুধু কবিতার
যে-কোনো ব্যবস্থা তুমি করে যাও। অন্তত এসব লেখা
ব্যবহারযোগ্য কিনা, বসবাসযোগ্য কিনা, না জানালে
কৌতূহল থেকে যায়। না হয় মফস্বলে সামুদ্রিক
মাছের সম্পাদনা তুমি কোরো। আমার ঘোড়াটি চাই।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি