প্রিয় কবিতারা - ছয়
জানালা
- বীতশোক ভট্টাচার্য
বিকেল শেষের জানালার দিকে তাকালে
একটি দমকা হাওয়া এসে একা একদা
ঘেঁটে দিয়ে যেতো বাঁধা চুল, তার পোশাকের
ভাঁজ ভেঙে যেতো, আর আজ সাজানো আলনা
টের পেয়ে গেছে অগোছালো কোনো কিছু নেই :
যা করে তা শুধু খোঁপায় সরল পাপড়ি,
আর চেয়ে থাকা তার আকাশের চাহনি
একটি তারার সারা দেহ ভরা জাগরণ;
চেয়ে থাকা, কোনো কথা নয়, কিছু খুঁজে পায়
একটি কণার পিপাসা যদিও আলোময়
তারার আকাশ, তবু জানালায় দাঁড়ালে
সে দেখায় একা জীবনে একটি অশ্রু।
----
স্বামী সন্মাত্রানন্দ
-------------
আমি হাহা করে হাসতে থাকি
আমি হোহো করে হাসতে থাকি
এত জোরে যে, সংস্কৃতিমনস্করা ভয় পান, এই বুঝি
খসে যাবে তাঁদের সাধের গুলমোহর!
সংস্কৃতি কি চিনামাটির পেয়ালাপিরিচ নাকি যে তা এতই ভঙ্গুর?
আমার খেয়াল হলে আমি সুগভীর উচ্চারণ করি,
কিন্তু সেই সুগভীর সত্যের সঙ্গে হাহাহোহোর কোনো বিরোধ নেই,
বিরোধ নেই তীক্ষ্ণ বিদ্রূপের,
এবং আমার বৈরাগ্যের সঙ্গে সীমাহীন ক্রোধের কোনো দ্বন্দ্ব নেই,
একথা যারা বুঝতে পারেন না, যারা বুদ্ধিকে বন্ধক রেখেছেন
পৃথিবীর গতায়ু চিন্তকদের পচাগলাবাসী মৃতদেহের মর্গে,
তাঁরা আতঙ্কে নীল হয়ে গিয়ে ভাবেন, এ লোকটা আসলে কী,
এর মধ্যে কী কী সিনড্রোম আছে, কতোগুলো বিরোধী সত্তা আছে ইত্যাদি।
তাঁদের সুরচিত সাংসারিক অবস্থানগুলি ভেঙে পড়ে,
আমি জানি অন্যায়কারীর জন্য ক্ষমা নয়,
উদ্যত শাস্তিই তাদের প্রাপ্য এবং
সে-শাস্তি আমিই দেবো।
আমি বুদ্ধ নই, অঙ্গুলিমালও নই, আমি সেই মানুষ যে বিশ্বাস করে,
হত্যা করতে এসেছে যে আততায়ী, তাকে হননেও পাপ নেই,
আমার এইসব প্রতিক্রিয়া দেখে
নিজ নিজ নারীর আঁচলের তলায় গিয়ে লুকোয় সুরুচিবানেরা
আর সেই সব উটপাখিদের দিকে তাকিয়ে
আমি হাহা করে হাসতে থাকি
আমি হোহো করে হাসতে থাকি।
-----
বৃষ্টির ভ্রূণ দেখে
- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
দাঁড়িয়ে পড়লে কেন? বাঁক পেরোলেই ঝর্ণা,
আর ঝর্ণা মানেই তোমার চুল, কালো জল।
থামলে যে? পাড় ধ'রে হেঁটে যেতে থাকি,
জানি না কি ফুল, তার নাম, তবে আছে
অচেনা অনেক ফুল।
অচেনা ইচ্ছার মতো ফুটে থাকে বুকের বাগানে-
দাঁড়ালেই থেমে যাবে, ভালোবাসা হাঁটি চলো।
হাঁটতে হাঁটতে ভালোবাসা, চলমান স্মৃতি,
হাঁটতে হাঁটতে কিশোরের গোলাপি মার্বেল
কুড়িয়ে পাবার মতো সুখ।
হাঁটতে হাঁটতে সুদূরের নিবিড় দিগন্ত,
যেন এগুলেই ছোঁয়া যাবে নরোম আঙুলে তার
নিভৃতের দুঃখ কষ্ট,
নিরালোকে ফুটে থাকা স্বপ্নময় হৃদয়-গোলাপ।
আসলে তো পরস্পর পরস্পরের দিগন্তে দেখি মেঘ,
আমরা বৃষ্টির ভ্রূণ দেখে চৌচির প্রাণের জন্যে,
শস্যহীন হৃদয়ের জন্যে আশাবাদী হয়ে উঠি-
পরস্পরের দিগন্ত ছুঁতে চাই, ছুঁতে চাই
দিগন্তের মেঘ।
হৃদয়-দিগন্ত ছুঁতে চেয়ে একদিন জেগে উঠে দেখি
ছুঁয়ে আছি পরস্পর আমাদের নশ্বর মাংসের দেহ।
----
উড়িয়ে দাও দুপুর তোমার
- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
মেলার মধ্যে একটুখানি খোলামেলা-
একটুখানি কেন ?
খোলামেলা একটুখানি কেন ?
খুলতে পারো হৃদয় তোমার সমস্তটুক,
দেবদারু চুল খুলতে পারো
ভুরুর পাশে কাটা দাগের সবুজ স্মৃতি
স্বপ্ন এবং আগামীকাল এবং তোমার
সবচে’ গোপন লজ্জাটিও খুলতে পারো।
উড়িয়ে দিতে পারো তোমার স্মৃতির ফসিল-
উড়িয়ে দাও দুপুর তোমার শিমুল তুলো,
মেঘের খোঁপায় মুখর বিকেল উড়িয়ে দাও,
উড়িয়ে দাও ব্রীজের নিচের স্বচ্ছ জলে
স্বপ্ন লেখা সবুজ কাগজ।
এ বৈশাখে হাত মেলে চাও ঝড়ের ঝাপটা,
ভেজা মাটির গন্ধে ফেলে পায়ের আঙুল
এ বৈশাখে হাত মেলে চাও জীবন বদল।
-----
হেমন্ত যেখানে থাকে - শক্তি চট্টোপাধ্যায়
হেমন্ত যেখানে থাকে, সেখানে কৌতুক থাকে গাছে
সাড়া থাকে, সচ্ছলতা থাকে।
মানুষের মতো নয়, ভেঙে ভেঙে জোড়ার ক্ষমতা
গাছেদের কাছে নেই
হেমন্ত বার্ধক্য নিতে আসে
খসায় শুকনো ডাল, মড়া পাতা, মর্কুটে বাকল
এইসব।
হেমন্ত দরোজা ভেঙে নিয়ে আসে সবুজ নিশ্বাস…
মানুষের মতো নয় রক্তে পিত্তে সৌভাগ্য সরল
শিশুটির মতো রাঙা ক্রন্দন ছিটিয়ে চারিপাশে
হেমন্ত যেখানে থাকে, সেখানে কৌতুক থাকে গাছে।।
-----
বলছিলাম কী – সুভাষ মুখোপাধ্যায়
বলছিলাম–
না, থাক্ গে|
যা হচ্ছে হোক, কে খণ্ডাবে
লেখা থাকলে ভাগ্যে|
পাকানো জট,
হারানো খেই,
চতুর্দিকের দৃশ্যপট
এখনও সে-ই–
শক্ত করে আঁকড়ে-ধরা
চেয়ারের সেই হাতল|
বিষম ভয়, কখন হয়
ক্ষমতার হাতবদল|
বলছিলাম–
না, থাক্ গে!
কী আসে যায় হাতে নাতে
প্রমাণ এবং সাক্ষ্যে|
মোড়লেরা ব্যস্ত বেজায়
যে যার কোলে ঝোল টানতে|
সারাটা দেশ হাপিত্যেশে,
পান্তা ফুরোয় নুন আনতে|
চোর-বাটপার
সাধুর ভেখে
ফাঁদে কারবার
আড়াল থেকে–
হাতিয়ে জমি, বানিয়ে বাড়ি
করছে টাকা কাঁড়ি কাঁড়ি
কতক সাদা কতক কালো
মারছে কার খোরাক কে|
জানি না যখন কোনো কিছুই
বলাই ভালো
জী-আজ্ঞে|
বলছিলাম কী–
থাক্ গে|
-----
কবিতার গভীরে নগ্ন নারী
- রুদ্র মুহম্মদ শহিদুল্লাহ
কবিতার গভীরে একটি মগ্ন নারী
শুয়ে আছে--- শুয়ে থাকে অস্পষ্ট।
কখনো বেশ্যার মতো অশ্লীল
খেমটাপনায় ভ'রে তোলে কবিতার শরীর।
গর্বিত স্তনে হাত রাখতেই দ্যাখায়
নাভিমূল, বলে অন্য কিছু, অসভ্য
ভাষায় যেন সমস্ত কবিতাই
তার নিজস্ব এলাকা---রঙিন বেশ্যালয়।
ধেই ধেই কখনো নাচে আনন্দে
নিতম্বে থলবলে মাংশে ওঠে ঢেউ
উরুর কামনা থেকে খ'সে পড়ে রুপোলি ফুল
মাটি কাঁপে বুঝি বা ভূমিকম্পের সূচনা
থেমে থাকে ঈশ্বরের যাবতীয় কাজ
মৃত্যু এসে ফিরে যায় দ্বিধাগ্রস্ত
প্রসবের অপেক্ষারত জরায়ু খোলে না দ্বার।
হে নারী হে কবিতা তোমার তলপেটে মানবের
কাংখিত ক্ষত আমি দেখতে চাই
তুমি কুয়াশার শাড়ী খুলে ফ্যালো।
১৯.০৫.৭৪ (সকাল) লালবাগ ঢাকা
----
লুপ্ত পূজাবিধি
- জয়দেব বসু
উদর আঁট করে বসেছি ঠাকরুন, খাদ্য দাও কিছু আদ্যা মা
উপোসে বমি পায়, পিত্তরক্ষায় পারলে দুই মুঠো ভাত দে মা
শ্রাবণে বনময় অঝোর ঝড় কাঁপে, দাওয়ার মাটি গলে জল
এমন দুর্দিনে অতিথ ফিরে যায়, আকাশ ঘোর কজ্জল
অস্থি বাঁকা করে পরাই গুণ, তবু বারংবার ছেঁড়ে গুণ
এত কি গুণ ধরি নিজের শিরদাঁড়া লম্বা করি দুই গুণ
কুলুঙ্গিতে জমা নিকষ অমা, ও মা, নিষ্কাশনে ঝরে অশ্রু
ভরে না অঞ্জলি, আপন মনে জ্বলি, কী খাব কাল আর পরশু
কুল্যে একটাই জন্ম, তন্ময় হয়েছি তাই, আমি বাধ্য মা
তুলিকা টান করে বসেছি অভাজনে ভাত না-দিলে দাও সাধ্য মা
রাত ০১.৩৫ মিনিট
২৬/৭/৮৭
-----
শক্তি চট্টোপাধ্যায় / ঊষা এলাঙ্গোভান
বড় দীর্ঘতম বৃক্ষে ব'সে আছো, দেবতা আমার।
শিকড়ে, বিহ্বল প্রান্তে, কান পেতে আছি নিশিদিন
সম্ভ্রমের মূল কোথা এ-মাটির নিথর বিস্তারে ;
সেইখানে শুয়ে আছি মনে পড়ে, তার মনে পড়ে ?
যেখানে শুইয়ে গেলে ধীরে, ধীরে কত দূরে আজ !
স্মারক বাগানখানি গাছ হ'য়ে আমার ভিতরে
শুধু স্বপ্ন দীর্ঘকায়, তার ফুল-পাতা-ফল-শাখা
তোমাদের খোঁড়া-বাসা শূন্য ক'রে পলাতক হলো।
আপনারে খুঁজি আর খুঁজি তারে সন্ব্ঞারে আমার
পুরানো স্পর্শের মগ্ন কোথা আছো ? বুঝি ভুলে গেলে।
নীলিমা ঔদাস্যে মনে পড়ে নাকো গোষ্ঠের সংকেত ;
দেবতা সুদূর বৃক্ষে, পাবো প্রেম কান পেতে রেখে।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় / ঊষা এলাঙ্গোভান
-----
আমার শরীর থেকে দূরে থাক
বাংলাদেশ-৩
(ঢাকা থেকে ফেরার পর)
- ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
- জাফর আলম
অনেক সাক্ষাতের পর আমরা এখনো অপরিচিত
জানি না আর কতবার সাক্ষাতে
গড়ে উঠবে বন্ধুত্ব আবার
কবে দেখা যাবে নিদাঘ বসন্ত
কত বর্ষার পর ধুয়ে যাবে রক্তের দাগ।
ভালবাসার সেই শেষ মুহূর্ত ছিল দারুণ অসহনীয়
তোমার করুণার রাতের পর আসে নিষ্ঠুর সকাল।
মন চেয়েছিল কিছু বলতে, পরাজিত হৃদয় দেয় নি সময়
ক্ষমা প্রার্থনার পর কিছু অভিযোগ অনুযোগও হয়তো করতাম।
প্রাণ উৎসর্গ করে যা কিছু বলতে গিয়েছিল ফয়েজ
অনেক আলাপের পরও হয়নি বলা সেই না-বলা কথা।
১৯৭৪
-----
আমার শরীর থেকে দূরে থাক
বাংলাদেশ-২
- ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
- অনুবাদঃ জাফর আলম
এভাবেই আমার পলেস্তারা পড়া হৃদয়ের তিক্ততা
অবশেষে আমার চোখে ভেসে উঠলো
তখন কোনো উপায় ছিল না।
বন্ধুদের কথা মেনে নিলাম
আমি ধুলোয় ভরা চোখ দু'টো রক্তে ধুয়ে নিলাম।
আর জগতের প্রতিটি মুখ আর বস্তু
আমার চোখের রক্ত থেকে এমনভাবে একই রং ধারণ করেছে।
সূর্যের সোনালী রং রক্তিম
চাঁদের রূপালী রংও রক্তাক্ত
সকালের আলোর হাসিও রক্তিম
রাত্রির কান্নাও রক্তিম।
প্রতিটি বৃক্ষ যেন রক্তের মিনার
প্রতিটি ফুলের চোখও রক্তমাখা
প্রত্যেক দৃষ্টি রক্তের তারের মতো
প্রতিটি ছায়া রক্তে রক্তাক্ত।
রক্তের ঢেউ যতক্ষণ প্রবহমান এর রং লাল থাকবে,
শাহাদত বরণের আবেগ, আকাঙ্ক্ষা, বেদনা
আর দুঃখ ক্রোধের রং
আর যদি থেমে যায় নিভু নিভু আগুনের মতো
থাকবে শুধু ঘৃণা, রাত আর মৃত্যু
সব কিছুর রং মাতমের রং।
বন্ধুরা এমন হতে দেবে না
এর বদলে কোথাও থেকে নিয়ে এসো প্রবল অশ্রুর বন্যা
এবার সেই অশ্রুতে ওজু করে
আমার চোখ দু'টো যদি ধুয়ে যায় যাক,
আর ধুয়ে মুছে যাক চিরতরে আমার ধুলিকণায় ভর্তি দু'চোখের রক্ত।
এপ্রিল ১৯৭১
-----
আমার শরীর থেকে দূরে থাক
বাংলাদেশ-১
- ফয়েজ আহমদ ফয়েজ
- অনুবাদঃ জাফর আলম
সাজাবো তবে কিভাবে সাজাবো গণহত্যার শোভাযাত্রা
আমার রক্তের চিৎকারে কাকে আকর্ষণ করবো?
আমার দুর্বল দেহে কতটুকুই বা রক্ত আছে?
এতে কোনো প্রদীপ জ্বলবে না
সুরার গ্লাস ভরবে না
জ্বলবে না আগুনের স্ফুলিঙ্গ আর মিটবে না তৃষ্ণা।
আমার ক্ষত বিক্ষত দেহে কতটা রক্ত আছে?
অথচ আমার শরীরের প্রতিটি শিরা বিষে ভরা।
যদি তুমি আমার যে কোনো শিরা কেটে ফেলো
প্রতিটি রক্তের ফোঁটায় বেরিয়ে আসবে
সাপের গরল
প্রতি ফোঁটায় শতাব্দীর বেদনা আর আকাঙ্ক্ষার নিদারুণ যন্ত্রণা
প্রতি ফোঁটায় মুদ্রিত হচ্ছে ক্রোধ ও দুঃখের উত্তাপ।
আমার কাছ থেকে দূরে থাক, আমার শরীর বিষাক্ত নদী
আমার কাছ থেকে দূরে থাক, আমার দেহ মরুতে পোড়াকাঠের গুঁড়ি
যদি একে জ্বালাও তো দেখবে, আঙ্গিনার বাগানে
এটা দাউ দাউ জ্বলছে।
কিন্তু জুঁই চামেলির বদলে আমার হাড়ের কাঁটা যদি ছিটাও,
তবে তা মাঠে পাহাড়ে ছিটকে পড়বে।
সকালের প্রসাধনীর সুগন্ধির পরিবর্তে
আমার পোড়া হৃদয়ের ছাই ছিটিয়ে দাও
সাবধান, আমার কাছ থেকে দূরে থাক,
কারণ আমার হৃদয়ে রক্তের পিপাসা।
মার্চ ১৯৭১
পরমা
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
বারেবারে চমকে উঠি, সে আসেনি; গোধূলির আলো
পশ্চিমে তির্যক হয়ে দেবদারু চূড়ায় দাঁড়ালো।
মন যদি নিভে যায় তবুও গভীরে
রত্নের সন্ধানী চোখ বারে বারে আসে ঘুরে ফিরে
খুঁজে পায় টুকরো, ভাঙা, শৈশব সুদূর;
আহত পাখির মতো শূন্যে কাঁপে যন্ত্রণার সুর।
নিজের দু'চোখে যদি মুকুরের রূপ মনে আসে
তবে কার শান্ত ছবি, কার অতলান্ত প্রেম ভাসে?
নিশ্বাসে স্মৃতির সঙ্গ চেতনার দিগন্তে ছড়ালো
বারবার চমকে উঠি, কে এসেছে, গোধূলির আলো।
----
ভিখিরি
- জীবনানন্দ দাশ
একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি আহিরীটোলায়,
একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি বাদুড়বাগানে,
একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো--
তবে আমি হেঁটে চলে যাব মানে মানে।
---ব'লে সে বাড়ায়ে দিল অন্ধকারে হাত।
আগাগোড়া শরীরটা নিয়ে এক কানা যেন বুনে যেতে চেয়েছিল তাঁত ;
তবুও তা নুলো শাঁখারির হাতে হয়েছে করাত।
একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি মাঠকোটা ঘুরে,
একটি পয়সা আমি পেয়ে গেছি পাথুরিয়াঘাটা,
একটি পয়সা যদি পাওয়া যায় আরো---
তা হলে ঢেঁকির চাল হবে কলে ছাঁটা।
---ব'লে সে বাড়ায়ে দিল গ্যাসলাইটে মুখ।
ভিড়ের ভিতরে তবু---হ্যারিসন রোডে---আরো গভীর অসুখ
এক পৃথিবীর ভুল ; ভিখিরির ভুলে : এক পৃথিবীর ভুলচুক।
----
অমানুষের গপ্পো
- শুভ দাশগুপ্ত
আমরা ডাক্তার ইঞ্জিনিয়ার উকিল ব্যারিস্টার হয়েছি।
আমরা বাড়ি গাড়ি জমির মালিক হয়েছি।
ব্যাঙ্কের পাশবইতে মোটা অঙ্কের হকদার হয়েছি।
মানুষ হইনি।
আমরা নাগরিক, গ্রামীণ হয়েছি
আমরা ভোটার, পার্টি সদস্য হয়েছি
আমরা সমর্থক, বিরোধি হয়েছি-
মানুষ হইনি।
আমরা পুজোর নামে হুল্লোড় করেছি
জীবন যাপনের নামে হাজারো বদ অভ্যাসকে মজ্জায় মিশিয়েছি
প্রতিবেশীর সঙ্গে দাঁত বের করে হেসে বাক্যালাপ করেছি-
মনে মনে তার সর্বনাশ চেয়েছি।
রক্তদান অনুষ্ঠানে চাঁদা দিয়েছি। রক্ত দিইনি।
খবর কাগজ আর টিভি-নিউজ দেখে দেশকাল নিয়ে
বাজার গরম করেছি-দেশকাল নিয়ে ভাবিনি।
আমরা শ্রী, শ্রীযুক্ত শ্রীমান, শ্রীমতী হয়েছি-
মানুষ হইনি।
আমাদের চোখ নাক কান ঠোঁট সবই মানুষের মত-
তবু আমরা মানুষ নই।
আমরা হিন্দু, খ্রীষ্টান, মুসলমান হয়েছি। মানুষ হইনি।
একটা ছোটো ফুলের জীবনও আমাদের চেয়ে অনেক সুন্দর, অনেক সার্থক।
ফুল হিন্দু হয়না। মুসলমান হয়না, সি.পি.এম হয় না, তৃণমূল হয়না।
ব্রাক্ষ্মণ হয়না, শুদ্র হয়না-কেবল ফুল হয়।
ঝরে পড়ার আগে সে কাজে লাগে,
মানুষের কাজে, মন্দিরে মসজিদে গীর্জায়, বিবাহে, শোকযাত্রায়।
জন্মদিনে, স্মরণ বাসরে।
যতক্ষণ পৃথিবীতে থাকে-অন্যের আনন্দের কারণ হয়-
এমনকি বৃন্তচ্যুত হয়ে যখন তার মৃত্যু হয়
তখনও
আমরা?
----
মাথুর
- জয়দেব বসু
ও দুঃখ, এই বাঙাল প্রাণে সফল হয়ে বাজো
তারে পাইনি খুঁজে আজো,
এক ঋতুতে আর এক ঋতু সন্নিহিত, আমি
কী করব, কোথায় যাব স্বামিন?
যদি অন্ধকার নাচো,
ওগো রহস্যনীল, জানাও আমার ভরবে কিনা আঁচল
কলস ভাসে এ ঘাট থেকে অন্য ঘাটে, প্রভু
জল মেলে না তবু
আমার কন্ঠ পোড়ে তরল সিসার আঁচে,
বুকের আরো কাছে
ও দুঃখ, নীলকান্তমণি, বহন করো ঋত,
অঙ্গে নামুক অনঙ্গ সম্বৃত
অচিন ঘাটে চন্দ্রাবলীর অস্থি পুড়ে খাক
গায় জয়দেব : নন্দদুলাল বহ্নিতে লুকাক
সকাল ১০.৩৪ মিনিট
২৭/৪/৮৭
-----
কূর্ম
- রমেন্দ্রকুমার আচার্যচৌধুরী
তুরতুর কোথা যাও, শশব্যস্তে, কচ্ছপঠাকুর?
শক্ত পিঠে গোল গোল সিঁদুরের ফোঁটাচিত্র এঁকে
কে তোমাকে দিয়েছে সাজিয়ে? মনে হয়, বাতাসে নড়েছে কল,
উল্লোল ঢাকের শব্দ শুনতে পেয়েছ,
তাই বেরিয়েছ রোঁদে,
লোকে বলেঃ তুমিই রাতের বেলা অন্ধকারে ফের
কাচ কাচো, প্যাঁচা হয়ে চতুর্দিক ঘুরে-ফিরে দেখ---
কার ঘরে সিঁধ কাটে ধূর্ত চোঁর, কে পোড়ায় নথিপত্র সব
আয়কর ফাঁকি দিতে, মণিমুক্তা, গহনার রাশ
ক্যাশবাক্স ভ’রে ফেলে দেয় গভীর কুয়োয়,
পিছনদুয়ারে চুপি চুপি
রাঙা এক বৌমানুষ, কচুবনে অস্পষ্ট আলোয়
দুজনের ধুগধুগ মাখামাখি, এই তীক্ষ্ণকশা ভরদুপুরে
কূর্ম, তুমি নাছোড় কামড়ে যার পায়ের আঙুল ধরতে যাও,
সে যদি তোমাকে পট থেকে কড়ির মতোই উলটে দিতে পারে,
তবে তো তোমার মহাশূন্যে অসহায় হাতপা নাড়াই সার!
জনশ্রুতিঃ যেখানেই কোনো পাপ, গৈবী খুন, একটু চোট্টামি,
সেখানেই তুমি যাও, যত দেরি হোক, ঠিক গ্রেফতার করো একদিন।
আমি বলিঃ ধর্ম মানে আত্মরক্ষার বুদ্ধি, যে পারে সে
পিছলে যাইয় পিচ্ছ দেখিয়ে---
কোথায় ময়ূরভট্ট, ঘনরাম? কুবিন্দুতে কে গায় মঙ্গল!
অঘ্রান ১৩৮৪
Comments