প্রিয় কবিতারা - চার
মাধবী এসেই বলে: ‘যাই’
-- রফিক আজাদ
খণ্ডিত ব্রিজের মতো নত মুখে তোমার প্রতিই
নীরবে দাঁড়িয়ে আছি: আমার অন্ধতা ছাড়া আর
কিছুই পারি নি দিতে ভীষণ তোমার প্রয়োজনে;
উপেক্ষা করো না তবু, রানী—তোমার অনুপস্থিতি
করুণ বেদনাময়—বড় বেশি মারাত্মক বাজে
বুকের ভিতরে কী যে ক্রন্দনের মত্ত কলরোলে।
দালি-র দুঃস্বপ্নে তুমি, আর্তো-র উন্মাদ মনোভূমে,
সবুজ মৎস্যের মতো অবচেতনের অবতলে
রঙিন শ্যাওলা-ঝাড়ে সুজাতার মতো সরলতা।
মুহূর্তের নীলিমায় তরুণ ধ্যানীর মনে হয়
তুমি হও ছলাকলাহীন, রূপশালী ধান-ভানা
জীবনানন্দের মনোবাঙলার এক শাদাসিধে
নেহাৎ রূপসী। তবু কেন প্রাণপাত পরিশ্রমে
তোমাকে যায় না পাওয়া?—তুমি নেই মস্তিষ্কে, হৃদয়ে।
কখনো জ্যুরিখে তুমি, কিয়োটোতে, বাম-তীরে,
গ্রীনিচ পল্লীতে কিংবা রোমে পড়ে থাকো; কখনোবা
যোগ দাও পোর্ট-সৈয়দের নোংরা বেলাল্লাপনায়।
তোমার স্বভাব নয় স্থিরতায়—অস্থির, অধীর
তুমি আছ অনুভবে, তুমি আছ শিশুর স্বভাবে।
ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পরিশ্রমে গড়ে-ওঠা রম্য-
অট্টালিকা, স্বভাবের ডালপালা—বিশ্ব-চরাচর।
যেনবা কোথাও গর্জে ওঠে ভয়াবহ অগ্নিগিরি
সোনালি লাভার স্রোতে ভরে দিল গ্রাম ও নগর।
যেন গর্ভগৃহ থেকে নেমে ডিনামাইটের মতো
অসম্ভব তোলপাড় তুলে দিল একটি শৈশব।
অবিশ্বাস্য উষ্ণতায়, চাপে দ্রুত গলে যেতে থাকে
ঘড়ির ডায়াল আর তোমার নিটোল অবয়ব।
তুমি সেই লোকশ্রুত পুরাতন অবাস্তব পাখি,
সোনালি নিবিড় ডানা ঝাপটালে ঝরে পড়ে যার
চতুর্দিকে আনন্দ, টাকার থলি, ভীষণ সৌরভ!
রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে
অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে
কেবল তোমার জন্যে বসে আছি উন্মুখ আগ্রহে—
সুন্দর সাম্পানে চড়ে মাধবী এসেই বলে—‘যাই’।
------
নক্ষত্র
- মণিশংকর বিশ্বাস
যাকে এতক্ষণ গুপ্ত-ঘাতক মনে হ'য়েছিল
কাহিনির শেষে বোঝা যায় সে আসলে
ভালো মানুষের পো
অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে, সরলাবালা বালিকা বিদ্যালয়ের মতো।
ভিজে আকাশের নীচে খুব আস্তে
ফুটে উঠছে এক দু:খী রাজপুত্র, একা, অবুঝ...
------
শেফালী
- মণিশংকর বিশ্বাস
নক্ষত্র জাহাজে এসেছিলে, নীল...গম্ভীর...উপত্যকার
যে সব ফুলের কথা লিখি
তারা সব কুয়াশার সন্তান, মৃত।
এখন তোমার মুখ ঝাপসা কান্নার মতো...
তবু ভাল লাগে সব---ফেরিঘাট---
সুখী বাঁধাকপি বোঝাই ট্রাক---মিনারের নীচে পায়রার ঝাঁক---
তোমাকে যে অবিস্মরণীয় করেছে, সে এই মন।
-----
~আমার মেয়েরা~
~শঙ্খ ঘোষ
লিখে যাই জলের অক্ষরে
আমার মেয়েরা আজও অবশ ভিক্ষার হাতে পড়ে আছে সব ঘরে ঘরে।
-----
নির্বাসন
- অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
আমি যত গ্রাম দেখি
মনে হয়
মায়ের শৈশব।
আমি যত গ্রামে যত মুক্তক পাহাড়শ্রেণী দেখি
মনে হয়
প্রিয়ার শৈশব।
পাহাড়ের হৃদয়ে যতো নীলচে হলুদ ঝর্ণা দেখি
মনে হয়
দেশগাঁয়ে ছিল কিন্তু ছেড়ে আসা প্রতিটি মানুষ।
ঝর্ণার পাশেই নদী, নদীর শিয়রে
বাঁশের সাঁকোর অভিমান
যেই দেখি, মনে হয়
নোয়াখালী, শীর্ণ সেতু, আর সে-নাছোড় ভগবান
----
নব্বই দশক
- মণিশংকর বিশ্বাস
যেন হাওয়া এসে নিজ হাতে ছড়ায় শুকনো পাতা
আর ছিঁড়ে ফেলে মেঘের প্রাসাদ, খেলার নিয়ম ।
‘আমার পরাণ কান্দে তোর লাগি’ — এই মতো ফুটে আছে
অজস্র শিমুল; আমি এই নিচু বনগ্রামে ঢুকে পড়ে
দু’হাতে সরাই মহুয়ার ফুল, আর এইভাবে খোলা জানলার ’পরে
দেখা যায় সোনায় সোনায় মোড়া আকাশী গম্বুজ;
একটি সরল অংক—যার একদিকে জ্বলে ওঠে থোকা থোকা অচিন্ত্য পলাশ
আর অন্যদিকে হলুদ পাতার স্তূপে রোগা এক ভুঁইসাপ ।
তার বাউলে চলন ডাক দেয় আরো দূর কোনো অরণ্যের দিকে
যেন বলে, ‘মন ছুটি দাও, ছুটি দাও এইবার...’
সমস্ত গ্রীষ্মের ছুটি জুড়ে কাপাসবালক ওড়ে, না বুঝেই
ওড়ে বহুদূর, সবার অলক্ষ্যে
অথচ তোমার স্কুল আজো খোলা
যেইখানে কৃষ্ণচূড়ার নখে ছিঁড়ে যায় নীলিমার নীল
আর বয়ে যায় বেলা
যেন বয়ে যায় বেলা ...
----
দুশ্চিন্তা
- জয়দেব বসু
আমি কি তরুণ কবি? রোহিতাশ্ব, মতামত দাও। উদাসীন হাসো কেন? একথা শুনেছি বটে, তুমি কোনো কবিফবি পাত্তা দাও না। শিল্পে তোমার হায়, দিলচসপি নেই। কী আর করার আছে, সকলে পাঠক নয়, কেউ কেউ আরো বেশি --- কবিতাবিরোধী। তবু এই অভিধার মীমাংসা আশু প্রয়োজন। তরুণ কবিরা শুনি অনেকেই অতিবিপ্লবী। কেউ কেউ দাড়ি রাখে। কেউ যায় খালাসিটোলায়। বাকি সব করে রব এখানে সেখানে। তবু তারা নিয়মিত জ্যান্ত কবিতা লিখে থাকে। রোহিতাশ্ব, লাল ঘোড়া, আমাদের অতিবামে অ্যালার্জি রয়েছে। অন্য সব রোগভোগও সম্প্রতি কাটিয়ে উঠেছি। এবং কবিতা, দেখো, লিখতে পারি না। আমার ব্যাপার তবে বাদ দাও। এসো, ঐ কবিদের ছুঁয়ে দেখি অনুভূতি দেশ। এখানেও সমস্যা ঘনাল। কে কবি কবে কে মরে? যে জন ডিভোর্স দেয় শবদে-শবদে সেও কেন কবি নয়? যদি সেই দম্পতি হয়ে থাকে পুরাতন---সরস্বতীহীন?
রাত ১১.৫০ মিনিট
২৫/৫/৮৮
----
মৃত্যু
- হাবীবুল্লাহ সিরাজী
মৃত্যু শুয়ে আছে পাশে। হেই মৃত্যু, চিনি না তোমাকে
যে গভীর বিশ্রামের মধ্যে খেলিতেছি মায়া-মৃত্যু
আমি সেই চিহ্ন খুঁজি, তার কোনো শরীর মেলে না
তবে কি আমার মৃত্যু আমারই দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মিলে
সমান সমান ছায়া? অস্তিত্বের হ্রস্ব অলংকার
হে সংসার! রুদ্ধদ্বার মৃত্যুময় নগ্ন অভিসার
বিনাশের সহোদর বঞ্চনার কড়িকাঠে দড়
সান্ত্বনা যে হ্রদে লুপ্ত সেই বুঝি স্নানে মজিয়াছে
গুপ্তলীলা ভেদ-ভোগ যতো মানি ততো শোকসভা
মৃত্যুর মালিক যদি মৃতদের বিপক্ষে দাঁড়ায়
কোনো বস্তু কোনো প্রাণ পুনর্বার ভ্রমে না ভুবন
মৃত্যুর সম্মুখে শোয়া এই আমি ঠিক তাকে চিনি
----
ভালোবাসা
- দেবব্রত সিংহ
'লাল শালুকের ফুল ফোটে আঁধার রাতে
যার সঙ্গে যার মনের মেল সে মরিলে কি টুটে
বঁধু এত রাত কীসে
ও বঁধু এত রাত কীসে।'
শারুল পরবের রাতে
ফুল ফুটেছে ডুংরিতে বাঘমুণ্ডীর ডুংরিতে
ই শারুল পরবের রাতে
কী যে হল্য দেখা হতে
তোর সঙ্গে লো
কী যে হল্য দেখা হতে,
ভালোই ছিলম
আমি বাগাল ছেল্যা
ছিলম ভালোই
শুদু অ্যাক মেঘ থমথম বাদলবেলায়
যখেন ফুটল কদম কদমতলায়
তখেন বাজানছিলম বাঁশি
মোষের পিঠে পাহাড়কোলে জোড়ের ধারে বাজানছিলম বাঁশি।
তাবাদে কার কথাতে কী যে হলি
রাগ করে তুই পালাই গেলি
শুদু রাগ করে লয়
গরব দেখাই পালাইগেলি,
বললি, তোর সঙ্গে আর কথা লয়
তোর সঙ্গে আর দেখা লয়
তুই অ্যাকটা বাগাল ছেল্যা
পাহাড়কোলে নদীর ধারে
কাড়ার পিঠে মোষের পিঠে ঘুরে বুলিস
বাঁশি ফুঁকিস,
তোর কী আছে
তোর কী আছে মুরাদ?
আমি-
আমি আর কী বলি
আমি ত জানি আছে
ভালবাসার মুরাদ আছে
সে তো দেখেনদারি জিনিস লয়
তবু তুই নাই শুনলি
বললি, দেখা আছে
বাগাল ছেল্যার মুরাদ কত দেখা আছে,
আমি বললম
তোর অত কীসের কথা বঠে
অত কীসের কথা
তুই যাবি যদি চল্যে যা
যিখানে যাবি চল্যে যা
ই পাহাড় ছাড়্যে লদী ছাড়ে
আমোদ রাঙামাটির গাঁ ছাড়্যে
যিখানে যাবি চল্যে যা।
তাবাদে দিন গড়াতে মাস গড়াতে
ঘুরতে ঘুরতে শারুল পরব,
বেশ ত ছিলি
তবু থাকতে কেনে নাই পারলি
অমন ঘরকন্না ফেল্যে দিয়ে
অমন মরদ সতীন ছাড়্যে দিয়ে
কীসের টানে চল্যে আলি
ই শারুল পরবের রাতে
ই মাদল বাজানো জ্যোস্টা রাতে
ই বাঘমুন্ডীর ডুংরিতে
তুই কীসের টানে চল্যে আলি
কুঁড়চি ফুলের মালা গাঁথে
তুই কার লাগে লো ঘুরে আলি
তুই আবার ক্যানে ঘুরে আলি।
------
হেরে গিয়ে খুশি
- অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত
এই সিন্ধুমরালের সঙ্গে আর
পেরে-ওঠা সম্ভব হবে না
হাল ছেড়ে বসে থাকি, পাখি তবু
আমার ভুবনখানি কুরে-কুরে খায়
এবং আমার পরমায়ু
আমি হেরে ভূত জেনে তান্ত্রিক আনন্দে একাকার
বিদ্ধ করে জলের জরায়ু!
----
স্বাতীতারা
- জীবনানন্দ দাশ
স্বাতীতারা, কবে তোমায় দেখেছিলাম কলকাতাতে আমি
দশ-পনেরো বছর আগে;---সময় তখন তোমার চুলে কালো
মেঘের মতন লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালাল,
তোমার নিশিত নারীমুখের;---জানোতো অন্তর্যামী।
তোমার মুখ : চারিদিকে অন্ধকারে জলের কোলাহল।
কোথাও কোনো বেলাভূমের নিয়ন্তা নেই---গভীর বাতাসে
তবুও সব রণক্লান্ত অবসন্ন নাবিক ফিরে আসে।
তারা যুবা, তারা মৃত; মৃত্যু অনেক পরিশ্রমের ফল।
সময় কোথাও নিবারিত হয় না, তবু, তোমার মুখের পথে
আজও তাকে থামিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছো, নারি---
হয়তো ভোরে আমরা সবাই মানুষ ছিলাম, তারই
নিদর্শনের সূর্যবলয় আজকের এই অন্ধ জগতে।
চারিদিকে অলীক সাগর---জ্যাসন ওডিসিয়ুস ফিনিশিয়
সার্থবাহের অধীর আলো---ধর্মাশোকের নিজের তো নয়, আপতিত কাল
আমরা আজও বহন করে, সকল কঠিন সমুদ্রে প্রবাল
লুটে তোমার চোখের বিষাদ ভর্ৎসনা...প্রেম নিভিয়ে দিলাম প্রিয়।
আনন্দবাজার পত্রিকা। শারদীয় ১৩৫৬
-----
রক্তকরবী
- জয়দেব বসু
তোমার কথা শুনেছি কতবার
কত যে লোক বলে তোমার নাম,
আমি ছিলাম নির্বাপিত দেশে
আমি কি আর তোমায় চিনতাম!
পুরাণে বলে, লোককথায় বলে---
আসবে তুমি, কখনো, কোনোদিন
মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ,
অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।
পেরিয়ে গেছি মেঝেনদের দেশ,
পেরিয়ে গেছি কুষ্ঠে খশা গ্রাম,
জানো কি তুমি, অনেকে এখানেও
ফিসফিসিয়ে বলে তোমার নাম!
পেরিয়ে গেছি দস্যুদের তাঁবু,
পেরিয়ে গেছি ভগ্ন বন্দর
সেখানে রোজ বালিতে দোহা লেখে
বিলাপরত দু'জন অন্ধ।
তাদের থেকে তোমার নাম করে
টুকে নিয়েছি লুপ্ত প্রার্থনা,
না-হলে ঐ হতভাগ্যদের
মনোবিকার কখনো সারত না।
পেরিয়ে গেছি নিশানরাঙা পথ,
কোথায় আছো, কীভাবে আছো তুমি?
পায়ের নিচে দগ্ধ ধানখেত
পায়ের নিচে শীতল মালভূমি।
চেরাগ হাতে নানান দেশে যারা
ঘুরে বেড়ায়, সাত-সুলুক রাখে,
তারা বলেছে, 'আমরা কেউ নই,
সেই মেয়েরা চিনতে পারে তাঁকে।'
যাদের হাত ফ্যাকাশে হয় ক্ষারে,
যাদের হাত চুলোতে স্যাঁকা হয়,
যাদের খুব কথা বলার সাধ
কথা বলতে যাদের আরো ভয়...
তাদের সাথে যখন দেখা হল
তখন ভীতু দৃষ্টি অনুসারে
মানচিত্রে পথ বসিয়ে আমি
একছুট্টে, তেরো-নদীর পারে---
মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে
পরের পর দরজা ঠেলে-ঠেলে
খুঁজে পেলাম---তোমাকে, নন্দিনী,
নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।
রাত ১২.২১ মিনিট
২০/৮/৯৪
-----
নিসর্গ
- তারাপদ রায়
শ্রীমতি নিসর্গসুন্দরী দেবীর সঙ্গে শেষবার দেখা হলো
রাণাঘাট শহর পেরিয়ে চূর্ণী-নদীর উত্তর পারে।
তখন বিকেল বেলা
একটু একটু বৃষ্টি হচ্ছে, পশ্চিমে কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে
সার্চলাইটের মতো দেখা যাচ্ছে লম্বা-লম্বি রোদের রেখা।
একটা রামধনু পূর্ণবৃত্ত হবে কি অর্ধবৃত্ত হবে
এ বিষয়ে ঠাণ্ডা মাথায় মনস্থির করার জন্যে
তিন মিনিট সময় নিলো,
একটু পরে ম্যাজিক
দমকা হাওয়ায় মেঘের তাঁবু ছড়িয়ে ছিটকিয়ে পড়লো
কিন্তু তার নীচে বিশ্রামরত রামধনুর রা পর্যন্ত পাওয়া গেল না।
তখন ধানখেতের মধ্য থেকে জোর বৃষ্টি
সারা শরীর ভেজা, মাথার চুল দিয়ে জল পড়ছে।
আলের ওপর দিয়ে সোজাসুজি হেঁটে
ন্যাশনাল হাইওয়েতে উঠে এলেন স্বয়ং নিসর্গসুন্দরী দেবী।
অনেক দিন পরে দেখা, তবু চিনতে পারলাম,
হাত তুলে নমস্কার করলাম,
শ্রীমতী নিসর্গসুন্দরী মৃদু হেসে বললেন,
'এ বছর আর রামধনু হবে না, আবার সামনের বছর,'
বলে হাসতে হাসতে বৃষ্টিতে মিলিয়ে গেলেন।
-----
মন ভাঙার খবর
- বেণু দত্তরায়
ইস্কুলে যখন পড়ি
তার পক্ষেই ছিল
আদ্দিকালের
ইদ্রাকপুর কোর্টের মস্ত বাড়িটা
যেন ভৌতিক জাহাজ
কেউ বলতেন, ওই দুর্গটার
চুড়োয় দাঁড়িয়ে
চাঁদ রায় প্রতাপ রায় নাকি
কার্ভালোর নৌযুদ্ধ দেখতেন
কেউ বলতেন, যাঃ কেমন করে হবে
ওটা জাহাঙ্গীরের তৈরি
তার তলায়-তলায়
সুড়ং গেছে ঢাকায়
আমাদের বালককালের কথা -
(সত্যিই কি একটা বালককাল ছিল?)
দেশভাগের পর শুনেছি
এখন ওখানে এস্-ডু সাহেবের
দরবার
মস্ত সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়
ইন্দ্রাকপুর কোর্টের কথা
মনে থাকবার নয়
কিন্তু দেশভাগের আগে-আগে
বন্ধু জয়নালের বোন শাহানা
ওই দুর্গের পাথুরে দেয়ালের
ধার থেকে
কয়েকটা সূর্যমুখী ফুলের গোছা ছিঁড়ে
আমাকে উপহার দিয়েছিল
কী যে পাগলাটে মেয়েটি ছিল
সেই বয়সে শাড়ি ধরেছিল
হাত-ভরা নানারঙের চুড়ি
আর কাঁচের টিপ থাকত কপালে
দাদার বন্ধু আমাকে
শুধু-শুধুই সে তুই বলত -
তোদের হিঁদুদের তো আবার
এ-ফুল পুজোয় লাগে না
তোকে দিলাম পুজো করতে নয়
পড়ার টেবিলে রেখে দিবি
ও-বাংলা থেকে
সাততাড়াতাড়ি চলে আসতে গিয়ে
শাহানার কথা মনেই হয়নি
সূর্যমুখী ফুল দেখলে
এখনো বুকের মধ্যে ব্যথা হয়
দেশ তো কতই ভাঙে -
মন-ভাঙাভাঙির
খবর কেউ রাখে?
----
তোমার কাছেই
______________সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
সকাল নয়, তবু আমার
প্রথম দেখার ছটফটানি
দুপুর নয়, তবু আমার
দুপুরবেলার প্রিয় তামাশা
ছিল না নদী, তবুও নদী
পেরিয়ে আসি তোমার কাছে
তুমি ছিলে না তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা!
শিরীষ গাছে রোদ লেগেছে
শিরীষ কোথায়, মরুভূমি!
বিকেল নয়, তবু আমার
বিকেলবেলর ক্ষুৎপিপাসা
চিঠির খামে গন্ধ বকুল
তৃষ্ণা ছোটে বিদেশ পানে
তুমি ছিলে না তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা!
-----
ব্যাধি
- মিতুল দত্ত
ধর্মের ষাঁড়ের মতো খেপে উঠলে
যত বলি, এসব বুজরুকি দিয়ে ভাত মাখো,
অর্থহীন খোঁপা বাঁধো, খুলে রাখো মাংসাসী স্বভাব
সামনেরও পেছন আছে, পেছনেরও সামনে আছে চোখ
অস্বীকার করবে বলে কী যে খোঁজো নিজেই জানো না
পালকের নিচে যাকে পাখি ভাবো, সে তোমার মায়া
মায়া এক ব্যাধি, তাকে ঠোঙা ভেবে ফাটিয়ে ফেলেছি
গতকাল, নাকি গতজন্মে আজ মনেই পড়ে না
ছেনালি শিখিয়ে গেছে সত্যবতী নাকি সত্যভামা
রথের চাকার মতো কিছু একটা ঘুরে যায় নাব্যতার দিকে
কারা বলে তুমিই মহান আর গণতন্ত্র বলে কিছু নেই
তোমাকে খেপিয়ে দিয়ে হাল্লাবোল করে ওরা কারা
-----
জ্যোৎস্নায় কারা রাইফেল কাঁধে
- নবারুণ ভট্টাচার্য
চন্দ্রালোকেতে লাফ দিল কোন তিমি
কারা বসে বসে লোভী আঁকিবুঁকি কাটছে
অন্তর্বাস খুলে ফেলে কোন মিমি
জ্যোৎস্নায় কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
হাইরাইজের ছায়ায় হলুদ চারা
ওপরেতে কারা মুনাফা হিসেব আঁটছে
এখনই howona না প্রেমেতে আত্মহারা
অরণ্যে কারা রাইফেল নিয়ে হাঁটছে
কীসের কবি সে যে না লেখে দাবানল
ভিকিরিবাচ্চা ফাঁকা পাতাগুলো চাটছে
তেষ্টায় হাত তুলে আছে টিপকল
মাঝরাতে কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
সাহিত্য বলে লেখা হয় যত ভাট
মিডিয়াবনিক মগজের গায়ে সাঁটছে
চেতনার ঘুড়ি কেটে গিয়ে খায় লাট
তখন ও কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
শব্দতে বুঝি প্রাণ পায় কবিতারা
কবি কি তাহলে শব্দই শুধু ঘাঁটছে
ভীতু চোখে দেখা উনুন কেবলই চিতা
বলো কারা রাতে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
মাঝরাতে কারা কিনে নিলো আই- ফোন
বলো তো ক্ষুধার রাত্রি কেমন কাটছে
হয় লড়ে যাবে, নয় তো সমর্পণ
কারা ভয় ভুলে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
ছন্দতে নয়, ক্ষমতা দখল চেয়ে
স্বপ্নের কুঁড়ি মাইনের মতো ফাটছে
প্রশ্নবোধক সাতটি তারারা চেয়ে
কারা এত রাতে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
ওরা কারা যারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
তারা সারারাত রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
পায়ে ব্যাথা নিয়ে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
জ্যোৎস্নায়ে ওরা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
----
বিধাতার ব্যর্থতা
- শুভ দাশগুপ্ত
বাপের জন্ম গান শেখেননি, তাতে কী?
আপনার SMS এর জোরেই নির্বাচিত হবে শ্রেষ্ঠ গায়ক।
সাতকূলে কখনও দেশ নিয়ে ভাবেনও নি, দেশের জন্য কিস্যু করেনও নি।
তবু আপনার ভোটেই দেশনেতা নির্বাচিত হবেন।
জীবনে মাঠে নামেন নি। তবু
ট্রেনে বাসে, চায়ের দোকানের সবজান্তা আড্ডায় আপনিই রায় দেবেন
শচীন আদৌ ভাল ব্যাটসম্যান কিনা
সৌরভ আদৌ ক্রিকেটটা বোঝে কিনা।
পথে আর পথ নেই। ফুটপাথ হকারে ছয়লাপ।
কেন এত হকার? কারা এদের বসালো? কাদের দয়ায় এরা
সরকারী জায়গা দখল করলো? এসব নিয়ে
আপনি চিল্লে গলা ফাটিয়ে ফেলছেন, আবার
অফিস ফেরৎ সেই আপনিই হকারদের কাছ থেকে
ব্যাগ ভর্তি করে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন-কমলালেবু, গানের নকল সি.ডি. বাচ্চার খেলনা, আমলকির প্যাকেট।
ভাই' এর সঙ্গে বনিবনা নেই, মা বাপকে বাদ দিয়ে আলাদা সংসার পেতে
হমতুম' এর সংসারে একপিস বাচ্চা নিয়ে
'সুখ' খুঁজছেন-আর সুযোগ পেলেই সর্বসমক্ষে বলছেন
"ওঃ ছোটবেলাটা যা দারুণ ছিল, একান্নবর্তী বৃহৎ পরিবার। কত আনন্দ!"
পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে পাহাড় না দেখে
লাউ এর দর করছেন। দু কিলোমিটার হেঁটে কেবলে গিয়ে
ঘোঁড়ায় চাপছেন। ফিরে এসে গুল ঝাড়ছেন:
ওঃ পথ যা খারাপ না। শালা দম বন্ধ হয়ে আসে।
তবু বুঝলি, হেঁটে মেরে দিলাম এগারো কিলোমিটার।
পাড়ার ছেলেরা পুজোর চাঁদা বাড়াতে বললে চটে যাচ্ছেন।
গজগজ করছেন। আবার সন্ধ্যেবেলা বৌ বাচ্চা শালা শালী সহ
ভিড় জমাচ্ছেন প্যান্ডেলে।
লজ্জাও হয় না। তাই না?
লজ্জা তো নারীর ভূষণ। আপনি তো পুরুষ।
লজ্জা পাবেন কেন!
চালিয়ে যান। চালিয়ে যান।
বিধাতা বাঁদর থেকে মানুষ হবার ব্যবস্থা রেখেছিলেন।
আপনি উল্টো পথে হাঁটলে
বিধাতার বাপের সাধ্যি কি
আপনাকে বাঁচায়?
----
মেয়েদের প্রতি
- জয়দেব বসু
চিনি চিনি বলে বটে তোমায় চেনা যায় না শ্যামা
চণ্ডী তুমি, দুর্গা, কালী, ছিন্নমস্তা, তিলোত্তমা
এই দেখি পিঞ্জরে বাসা, এই দেখি হা-হা শূন্যে
অনন্ত পাপ ওষ্ঠে মেখেছ, তবু সাঁতরাও পুণ্যে
চিনি চিনি বলি বটে তোমায় চিনতে পারি না মা
লায়লা তুমি, দেবী ম্যাকবেথ, বেহুলা ও বদউজ্জামাল
আমি পাগল কেঁদে ভাসাই, আগুন ঝরাই আক্রোশে
তুমি থাকো নির্বিকল্প, নিঃস্বরূপা, নির্বিশেষ
আজন্ম অধীনা ওগো, নৈরাত্ময় নাচো
মরতে মরতে বাঁচাও আবার মারতে মারতে বাঁচো
সকাল ০৭.৪৭ মিনিট
৩/৪/৮৭
----
আশা
- জয়দেব বসু
তুমি জানো, রোহিতাশ্ব, বহুদিন কান্না আসে না। তাহলে কি বড় হচ্ছি? সেই যে বছর তুমি এলে, শেষবার কান্না পেয়েছিল। কেউ এল অন্তত। দেশময় হুলস্থূল সে বছরে, মন্ত্রীরা চোর প্রমাণিত। সে সময়ে তুমি এলে; তোমার কেশর ঘন, তামাবর্ণ, তীব্রগন্ধী দেহ। তুমি জান, রোহিতাশ্ব, তারপর থেকে শুধু ছিন্ন দিন, ছন্ন রাত্রি। একমাত্র বন্ধু তুমি লাল ঘোড়া ---প্রিয়াসন্নিধান। কষ্ট খুব কামড়ায়, মাঝে মাঝে। তিক্ত রসে ভরে যায় জিভ। রোহিতাশ্ব, প্রিয় সখা, এই গান, নির্জনতা, আসন্ন শরতে এই দেশজোড়া খরা-বন্যা, এসবের মধ্যে দিয়ে কোথায় চলেছি? ক্যুয়ো ভার্দিস, ঘোড়া বন্ধু? এত রক্ত, উপবাস, অস্ত্রের যবনিকা ভেদ করে যেখানে পৌঁছব, সেথায় কে কান্না ফিরে দেবে? বস্তুত, আজ ঐ মেয়েটিকে দেখে চোখময় বাষ্প ঘনাল। তবু বাষ্প, বহুদিন পর। রোহিতাশ্ব, সেই মেয়েটি কি কান্না ফিরে দেবে?
দুপুর ১২.৪৭ মিনিট
২১/৯/৮৭
-----
নিমন্ত্রণ
- মণিশংকর বিশ্বাস
কোন নিরাশার বুকে তুমি ব'সে আছো সম্রাজ্ঞীর মতো, শান্ত, স্থির---
যেন শিকারে বিঁধেছে তীর
আর নিজে থেমে গেছো ব্যথা পেয়ে।
পৈতের মতন পথ সরু, আড়াআড়ি
চলে গেছে মাঠের ভিতর।
দূরে শালের জঙ্গল, শ্মশানের মতো কালো...
আমি সব কালো ফেলে রেখে চলে যাই কখনো-বা
তোমাকে দেখতে।
তোমার শরীর---গোলাপের আরক্ত সংসার---
ফলের মতন নগ্ন সকল কামনা---
আমাকে ডাকেনি কেউ
তবু আসি
নিজেকে দেখবো বলে, এইসব দেখি---
রূপ, অরূপরতন জল, কুটুমবাড়ির আলো, শুদ্রফুল
ঝিলের লাগোয়া নিরতিশয় অশ্বত্থ, মানতের থান...
অন্ধকারে যাকে আরো স্পষ্ট দেখি
তার নাম অন্ধকার।
----
ঈশ্বরের প্রতি
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়
তোমার সম্পর্কে ওরা কত কথা বলে।
ক্রমবর্ধমান এই বিশ্ব তুমি রচনা করেছ,
নাকি এই বিশ্বের মানুষ
তোমাকে করেছে সৃষ্টি?
তুমি কোন দলে?
ধনী---যারা প্রাপ্যের অধিক নিয়ে
ছিটেফোঁটা ছুঁড়ে দেয় দরিদ্র্যের দিকে, আর তোমাকেও দেয়?
নাকি দরিদ্র---যে আশা করে তুমি সব ওলট-পালট
করে দিতে পার? কিন্তু কখনও কর না।
যুদ্ধের সময় তুমি বিজেতার পক্ষে ব'সে থাক।
নিটশে বলেছেন, তুমি মৃত।
প্যাসকেল বলেন, তুমি আছ কিনা অনিশ্চিত, তবে
অবিশ্বাস করে ঠকা বিশ্বাস করার চেয়ে শ্রেয় নয়।
এ সব গভীর তত্ত্ব বড় শক্ত বোঝা, আমি দেখি
পেছনে অরণ্য আর সামনে মরুভূমি
মাঝখানে মানুষ, জনপদ।
গরুর গাড়ি করে গোমাংস চলেছে প্রতিদিন।
-----
শপথ
- সরোজ দত্ত
রাজনীতি বুঝি না আমি,
বুঝি না তোমাদের সমাজ বিপ্লবের জটিল তত্ত্ব কথা।
ঐতিহাসিক পরম লগ্নের প্রতীক্ষায় দিন-গোনার
ধৈর্য্য আমার নেই।
তোমাদের কুটিল যুক্তির সূক্ষাস্ত্র অঙ্কুশের
হাজার আঘাতেও বিচলিত হবে না আমার
বিবেকরূপিনী গজেন্দ্রানী।
আমি পুরুষ,
আজ এই আমার একমাত্র পরিচয়।
আমি দেখেছি আমার প্রেয়সীর
বিষন্ন বিদ্রোহের রক্তাক্ত পরিণতি
বস্তিতে, বন্দরে, ক্ষেতে, খামারে,
শহরের রাজপথে।
দেখেছি আমার ব্যথিত রুদ্রাণীর ললাটে
অপমান যন্ত্রণার রুষ্ট নক্ষত্রের জ্বালা।
তাই, তত্ত্বের আকাশে তর্কের শরজাল
রচনা করো তোমরা, আমাকে মুক্তি দাও।
সময় নেই আমার,---
অভিমানিনী যাজ্ঞসেনীর বেণী বাঁধতে হবে আমাকে
দুঃশাসনের রক্তমাখা হাতে।
-----
আকাঙ্ক্ষার ঝড়
- অসীম সাহা
এখন ঈশ্বর মানে বৈকুন্ঠের ঘাট, আফটার সেভ লোশন,
আর তোর ষোলো আনা বাউল-শরীরে চন্দনের সুবাস।
স্নানশেষে ভেজাচুলে কন্ডিশনারযুক্ত শ্যাম্পুর
তীব্র সুরভিমাখা চাঁদ আলো-আঁধারিতে ডুবে গেলে দুপুরবেলার নির্জন ঘরের মেঝেয় মহাসমারোহে
সমুদ্রের নিঃশব্দ মন্থনে উঠে এলো উপাদেয় স্কচ।
হালকা লিপস্টিক দেয়া ঠোঁটের রক্তিম আভাসটুকুও
মুছে দিলো ইচ্ছেপূরণের ভঙ্গিমায় দুরন্ত দেবদূত!
তোমাকেই অজস্র অভিবাদন!
নিছক খেলাচ্ছলে আরো একবার বুকের কাছে
নামিয়ে আনলে বাঙ্ময় আকাঙ্ক্ষার ঝড়।
বিশ্বাস হচ্ছে না-এ-মুহূর্তে মনে হচ্ছে
কোনো জাদুকরি স্পর্শে অলৌকিক সাম্পান
ভেসে যাচ্ছে দূর-অজানায়।
----
সুখের দিন
- অনিতা অগ্নিহোত্রী
আমাদেরও সুখের দিন ছিল
শীতের রোদ ছিল আর লাল উলের বল
কালো বেড়ালছানা সেই বল নিয়ে ছুটে বাগানে নেমে যেত
মা চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়াতেন, তাঁর কোল থেকে
খসে পড়ত কল্পাপাড় শাল।
আর সেই সময় কড়া নড়ত, বাবা ফিরতেন।
গায়ে দেশ জয়ের গন্ধ, হাতের ব্যাগ থেকে কোনোদিন
কবিরাজি কাটলেট বার হয়ে আসত, কোনোদিন ভিজে জামরুল
আমাদের অনেক সুখ ছিল, এ বাড়ির আম আচার
কখনও কাকে ঠোকরায়নি
বড়ি কখনও ভাঙেনি শুকোবার আগে
আমরা স্পোর্টসে কমলালেবু পেতাম, জিলিপিও
সবুজ ঘুড়ির মতো প্রগ্রেস রিপোর্ট বুকে চেপে দৌড়ে
আসতাম
আমাদের কখনও লাল সিগন্যালে দাঁড়াতে হয়নি।
আজ অনেক দিন পর আমাদের সদর ও খিড়কি হাট খোলা
শীতের হাওয়া চরে বেড়াচ্ছে ববঘুরে গরুর মতন।
বাগানে অজস্র উলখড়, ঘাস ও জ্যোৎস্না, পরিম্লান,
মায়ের কল্পাপাড় শাল উবে গেছে,
বাবা হাঁটেন না অনেক অনেক দিন
বিছানায় মেশা তাঁকে দেখে মনে হয় অন্য কেউ
অন্য কারও বেদনা
আমরা কেউ এখানে জায়গা পাইনি, দেশ দেশান্তর ঘুরছি
একছিটে জমি আর এক ফালি বাড়ির জন্য
হাত পায়ে ধরছি ভিনগ্রহের দালালদের
মাঝে মাঝে ইস্টিশানে দেখা হয়ে যায়
আমার সঙ্গে বড়দির
রাঙার সঙ্গে মেজদার
কেউ আপ ট্রেন ধরছে, কেউ ডাউন ট্রেন
স্টেশনে ঠা-ঠা রোদ, তার মধ্যে বাতি বুড়ো
ঘষা কাঁচ মুছে যাচ্ছে লন্ঠনের
ট্রেনের শব্দ এগিয়ে আসতে থাকলে
আমরা এ ওকে বলি হ্যাঁরে আমাদেরও তো
দিন ছিল,
সুখের দিন।
চাকার ঝকঝক শব্দ পাশে পাশে হাঁটে, বলে
সুখের দিন ছিল হ্যাঁ ছিল দিন সুখের।
-----
জিজ্ঞাসা
- অজিত দত্ত
যদি ওই হৃদয়ের রঙটুকু নিয়ে কোনোদিন
বাতাস উদাস হয়, আকাশ রঙিন -
শরতে কি বসন্তের কুহু-কাকলিতে
নতুন জন্মের স্বাদে দুঃস্বপ্নেরে চায় মুছে দিতে,
তবে কি এ-পৃথিবীর ছদ্ম নটীবাস
শাস্ত্র শস্ত্র রাজনীতি বাণিজ্য-বিলাস
সেই মুহূর্তের অভিসারে
প্রাণের নিভৃতে এসে খ'সে প'ড়ে যাবে একেবারে?
যদি এই ভেজা মাটি শিশির দুর্বায়,
অনেক বিপথে ঘুরে পা দু-খানি পথ খুঁজে পায় -
তবে কোনো প্রান্তরের পারে,
কিংবা কোনো ভুলে-যাওয়া নদীর কিনারে,
মানুষের প্রেমের কি সংসারের বিচিত্র কাকলি,
ধূসর পাহাড়ে ঘেরা গ্রাম কিংবা শ্যাম বনস্থলী,
পুরাতন আকাশ কি পুরোনো তারারা,
ধ্যানের শাসনে পেয়ে ছাড়া
হবে নত আমার এ হৃদয়ে পুরোনো পুঁথিতে
কোনো-এক নতুন কবিতা লিখে দিতে?
আমি সেই মুহূর্তরে খুঁজে
শহরে, বাজারে, হাটে, মাঠের সবুজ,
কখনো, অরণ্যে, কভু রাজধানী-পথে জনতায়,
ঘুরেছি অনেক ক্লান্ত পায়।
রুপকাহিনীর মায়াপুরীতে নিভৃতে,
কত সোনা-ছাওয়া দিনে, কত হীরে-ছড়ানো রাত্রিতে,
সহস্রের স্রোত ভেসে, কখনো, বা নির্জন সৈকতে,
দ্বীপে ও মরুতে আর কত তীর্থপথে,
কখনো বা মিনারের চূড়ায় দাঁড়ায়ে
দেখেছি দু-চোখে খুঁজে, সম্মুখে পশ্চাতে ডাইনে বাঁয়ে,
শুধু মনে হয় -
বুঝি সে রয়েছে কাছে, বুঝি কাছে নয়।
হ'লো কতদিন!
সকালের রোদ আজ বিকালের ছায়ায় মলিন।
তবু জানি প্রাণের-সে-চরম জিজ্ঞাসা
আজো করে উত্তরের আশা
আকাশে বাতাসে চাঁদে, কখনো বা মানুষের ঘরে,
পাখির আওয়াজ আর প্রণয়ের মৃদু কন্ঠস্বরে।
হয়তো জীবনে কিংবা জীবনেরও বড়ো কল্পনায়
সে-মুহূর্তে আছে যেন, আছে প্রতীক্ষায়।
Comments