আমার দুর্গা

আমার দুর্গা রক্তবর্ণা বিভীষণা ভয়ঙ্করী কেন ?
----------------------
আজ মহালয়া । দেবীপক্ষের সূচনা । ঘুম ভেঙে গিয়েছিল চারটের কিছু আগেই । অ্যালার্ম দেওয়া ছিলো না, তবুও ।

কিন্তু আমি একদম ভুলেই গিয়েছিলাম আজকের দিনটার কথা । দিনটা যে আর বাদ বাকি পাঁচটা দিনের থেকে একেবারেই আলাদা ।

ভোর চারটে নাগাদ আকাশবানী থেকে যে মহালয়া সম্প্রচারিত হয়, তা আর মগজের ঘিলুতে ছিলো না । উঠে বাথরুম করে আবার শুয়ে পড়লাম ।

আবার উঠলাম সাড়ে সাতটা নাগাদ । তখনো মোটা মাথায় আসেনি মহালয়ার কথা । ট্যাব অন্ করলাম । নেট অন্ করতেই গাদা খানেক মেসেজ এলো পরপর ননস্টপ্ ।

দেখছি প্রায় সকলেই পিকচার মেসেজ করেছে । কেউ কেউ ভিডিও পাঠিয়ে দিয়েছে । ঘুরে ফিরে হাতেগোনা কয়েকটা পুরানো সেই একঘেয়ে বস্তাপচা ছবি আর ভিডিও । শুধু একজনকেই পেলাম হাতে লিখে বাঙলায় টাইপ করে মেজেজ করেছে । এবার মনটা একটু ভালো হলো ।

আতি পাতি একই ধরণের ছবি আর তার উপর দিয়ে লেখা পড়ে পড়ে আমি ক্লান্ত বোধ করছিলাম । এবার আমারও ইচ্ছে হলো ওদের সকলকে প্রতি উত্তরে একটা ছবি এঁকে উপহার দিতে । মিনিট দশেকের ভিতরেই একটা ছবি তৈরী করে ফেললাম । সেটা সকলকে ফরোয়ার্ড করে মেসেজ লিখে ছেড়ে দিলাম । আমি জানি, কেউ আমাকে নিজের হাতে ছবি এঁকে বা লিখে তার ব্যস্ত সময়ের বরবাদি চাইবে না ।

আজকাল সকলেই খুব ব্যস্ত ডীবন যাপনে অভ্যস্ত । কারো হাতে আর আমার মতোন এন্তার অফুরন্ত অতিরিক্ত সময় নেই । আমি আমার সময়কে নিজের মতন করে খরচ করি । কখনো পড়ে, কখনো ছবি এঁকে বা একটু শব্দ খরচ করে লিখে, কখনো বা দুমদাম ঘুরতে বেড়িয়ে যাই আশে পাশে যেদিকে মন চায় ।

মা দুগ্গার আঁকাটা বেশ রাগী রাগী হলো । ফেসবুকেও দিয়ে দিলাম সেটা । একজন দিদি আবার আবার আমাকে হোয়াটস্ অ্যাপে জানতে চাইলেন - আমার আঁকা দেবীর এমন ভয়ঙ্কর রূপ কেন ?

আমি প্রতি উত্তরে তাকে জানালাম - দেবী ক্রুদ্ধ এবং বিরক্ত । যে ভাবে রাজ্যের মাননীয়া দিদিমনি তাঁর আসা এবং চলে যাওয়া নিয়ে বিধি নিষেধ চাপাতে চাইছেন, যে ভাবে তিনি সনাতনীদের মনোভাব নিয়ে ছিনিমিনি খেলছেন, যে ভাবে তিনি মৌলবাদীদের সন্ত্রাসবাদী ভাবনায় উৎসাহ দিচ্ছেন, ইন্ধন যুগিয়ে চলেছেন ভোটের বাক্স ভারী করবার তাগিদে, তা আর বোধকরি দেবী দুর্গার সহ্য হচ্ছে না । তাই ওনার সেই বিরক্তি, সেই রাগ ফুটে উঠতে চাইছে ছবির পরতে পরতে । এর সাথে তো শিক্ষা স্বাস্থ্য জীবিকার প্রশ্নে এত বছরের জমে থাকা অসন্তোষ তো আছেই ।

ঠিক আজকের এই দিনটায়, আজ থেকে তেত্রিশ বছর আগে, আমার ছোটকাকু মালবাহী ট্রাকের তলায় পিষ্ট হন । সেদিন ভোর রাতে ছিলো দারুণ কুয়াশা । চারপাশ জুড়ে ঘন অন্ধকার । কাকু বাড়ি থেকে সাইকেল চেপে রেললাইন আর বি.টি.রোড পার করে গঙ্গায় গিয়েছিলেন স্নান করে জল আনতে ।

তখন ছোটকাকার বয়স ছিলো মাত্র চব্বিশ । সাথে একজন বন্ধুও ছিলেন । স্নান সেরে কলসিতে জল ভরে সাইকেলে চেপে ফেরার পথে, ঘন কুয়াশায় বি.টি.রোডের উপর বৃষ্টির জল জমে তৈরী হওয়া গর্তে, কাকুর সাইকেল হুমড়ি খেয়ে পড়ে যায় ।

পড়ে যায় গঙ্গার জলভরা কলসী । পড়ে যান সাথে থাকা বন্ধুটিও । পেছন থেকে আসা ট্রাকের আলো নেভানো থাকায় দুজনের কেউই সেই মূর্তিমান বিভীষিকাটিকে লক্ষ্য করেননি ।

কিন্তু ছোটকাকু শেষ মুহূর্তে বুঝতে পেরে বন্ধুটিকে টেনে তুলে সরিয়ে দেন । তারপর পড়ে থাকা সাইকেলটিকে তড়িঘড়ি ওঠাতে যান । আর ঠিক সেই সময়েই ঘটে যায় দুর্ঘটনাটি । ট্রাকটির ধার দিয়ে লাগিয়ে রাখা লোহার আংটায় ছোটকাকুর জামার কলারটা যেন কেমন করে আটকে যায় ।

ছুটন্ত ট্রাক ছেঁচড়ে টেনে নিয়ে যেতে থাকে ওনাকে । উনি বাঁচার জন্যে আপ্রাণ চেষ্টা করেন । যুঝতে থাকেন আসন্ন মৃত্যুর বিভীষিকার সাথে । চিৎকারও করেন অনেকবার । পিছনের আর চারপাশের দোকান থেকেও কিছু লোকজন হৈ হৈ গ্যালো গ্যালো রব তোলেন । মূর্খ ট্রাক ড্রাইভার ভেবে নেয়, লোকজন চাঁদা নেবার তাল করে গাড়ি থামাতে বলছে । সে আরও গতি বাড়িয়ে দেয় গাড়ির ।

অবশেষে ছোটকাকুর পরণের হাফশার্টের কলার ছিঁড়ে যায় । আর কাকু গাড়ির সামনের এবং পিছনের চাকার ঠিক মাঝখানে পড়ে যান । ট্রাকের পিছনের চাকা ওনার বুকের উপর দিয়ে গলার পাশ কেটে আড়াআড়ি ভাবে চলে যায় ।

আমার তখন সাত বছর বয়স । একমাত্র বন্ধু ঠাকুরমা গত হয়েছেন আট মাস আগেই । দুঃসংবাদটা এলো অনেক বেলা করে । ঠাকুরদা বাড়িতে পুজো করতে বসার ঠিক কিছুক্ষণ পরেই । দেহটা আনা হয়নি বাড়িতে । আমাদেরকেও দেখতেও দেওয়া হয়নি । তবে আমার কল্পনায় সেই ছোট কাকুর যন্ত্রণাক্লিষ্ট মুখখানা আমি বেশ খানিকটা কল্পনা করে নিতে পারি । ভাবতে পারি শেষ মুহূর্তে কাকুর সেই ছটফটানি । দেহটা নাকি ভ্যান রিক্সায় তুলে লোকাল থানায় অনেকক্ষণ রাখা হয়েছিলো । ট্রাক ড্রাইভারটিও নাকি ধরা পড়ে গেছিলো পরবর্তীতে ।

কিন্তু আমি আর দেখতে পেলাম না আমার ছোটকাকুকে । সেদিনও আমার ঘুমটা বেশ দেরী করেই ভেঙেছিলো । আর কাকু খুব কাকভোরেই গঙ্গার উদ্দেশ্যে জল আনতে রওনা দিয়েছিলেন । এবার বোধহয় বুঝতে পারবেন আপনারা, কেন আমার ঘুমটা ভোর চারটের আগে ভেঙে গেলেও আমি আবার বাথরুম করে এসে শুয়ে পড়েছিলাম ।

আসলে সব দিন সকলের জন্য নয় । আমার জন্যে যেমন মহালয়ার দিনটা নয় । তাই আমার আঁকা দুর্গা দুর্গতিনাশিনীর রঙ রক্তরর্ণের, উগ্র, ভয়ঙ্করী, বিভীষণা ।

সকলকে শুভ মহালয়ার প্রীতি এবং শুভেচ্ছা । মা দুর্গা আমাদের সকলের শুভ ইচ্ছা, কামনা বাসনা পূরণ করুণ । আর শয়তানী উগ্রবাদী জেহাদী আতঙ্কবাদী বিচ্ছিন্নতাবাদীদের স্ববংশে নির্বংশ করুন । সকলে ভালো থাকুন ।

@ রাজেন্দ্র

মহালয়া / ১৯ ।০৯।২০১৭

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি