ঋক 1 - 19
(ঋক)
-----
এক এক্কে এক
---------------
জানলার ধারে এসে দাঁড়ালো ঋক । হাতে চায়ের গ্লাস । চোখের রেটিনা পার হলো পাশের আবর্জনা ভরা এবড়ো খেবড়ো এঁদো গলি । পাশ কাটালো পার্থেনিয়ামের বুড়ো জঙ্গল । সোজা গিয়ে আটকে বসে গেল কংক্রিট রাস্তার ধারে গড়ে তোলা শিশু উদ্যানে । মনিজোড়া স্থির হয়ে গেল ওর সবুজ ঘাসে দাঁড়িয়ে থাকা একলা মুক্তমঞ্চের উপর । দূর থেকে মঞ্চের ছাদের জ্যামিতিক আকৃতি ঠিক যেন একমাথা বাবরি চুল ভরা রামানন্দ সাগরের রাম লক্ষণ । ব্যাকস্টেজ দেওয়ালের দুই পাশে দুটো ঠাকুরবাড়ি টাইপ জানলা আঁকা । মাঝখানে ঢালাই করা পাতাঝরা গাছের শুকনো কংক্রিটের গুঁড়ি । জানলাদুটো যেন বাবরিচুল ওয়ালা মঞ্চের এক জোড়া বিস্ফারিত দুই চোখ । কোটর ঠেলে বার হয়ে আসা মনিজোড়া যেন আর বইতে পারছে না রণক্লান্ত ঝরণার জলের একটানা ধাক্কা । সব ছাপিয়ে ভেসে আসছে গুমরানো কান্নার শব্দ । আর ওর কানে বেজে চলেছে সেই কান্না জানলার পাশে লেজ গুটিয়ে শুয়ে থাকা কুকুরছানাটার ভিতর থেকে, যার হতচ্ছাড়ী মা সব খাবার খেয়ে নেয় একা একা । ছানাটা জেগে থাকে একলা আধপেটা । দূরের ওই বাবরিচুল মঞ্চটা সব দেখে চলে নীরবে আর কান্নারা ঘুরে ফেরে রাতভোর স্বপ্নের আকরে ।
দুই এক্কে দুই
-------------
আচ্ছা, কেমন হতো, যদি উন্নয়নের মেকী রাস্তা সব হয়ে যেত গুঁড়ো গুঁড়ো কাঁচের মতোন ? উড়তো সবাই ঝোড়ো কালবৈশাখী তালে । শিলাবৃষ্টির শিলান্যাসে সবাই বালতি মগ জগ হাতে বের হতো পছন্দমতোন শিলা কুড়োতে । আমের মুকুল ভেঙে পড়তো আটপৌরে পাড় ভাঙা শাড়ির মতোন মড়মড় শব্দে । আর শিল পড়ত সারাক্ষণ একটানা, যতক্ষণ না কালশিটে জমত সারা পথ জুড়ে । পথের গর্ত সব উঠত ভরে চারপাশ থেকে ধেয়ে বেয়ে আসা ঘোলাটে কাদায় । নরকের কীটগুলো সব আটকে থাকতো পচা পাঁকালো কাদার ভিতর আর ছুটে আসত দামাল জগন্নাথ রোড রোলার চেপে । গরম গলে যাওয়া কয়লা আলকাতরা ঢেলে দিত মুখের উপর, চেপে পিষে মিশিয়ে দিত গণকবরের ভিতর । মিলিয়ে দিত গর্তের গভীরে । থাকতো ওরা জমে ততদিন, যতদিন না ধ্বংস হতো সব । মরুভূমির তপ্ত বালিতে নিস্ফল আঁচড়ের মতোন প্রবল জলতৃষ্ণায় ধুঁকতো ওরা জিভ ঝোলানো চারপেয়ের মতোন । আর পিঠে পড়ত কাঁটামোড়া চাবুক 'সপাং সপাং' পরাধীনের ঘুম ভাঙা স্বাধীন গণতন্ত্রের ।
তিন এক্কে তিন
---------------
ঘুম ভাঙল ঋকের । চোখ চলে গেল পায়ের লাগোয়া দেওয়ালে ঝুলতে থাকা পুরানো বাংলা ক্যালেন্ডারে । ইস্কনের বিখ্যাত এক মহাভারতের ছবি । যেখানে অভিমন্যু একা লড়াই করছিল সাত মহারথীর বিরুদ্ধে । অসম অসাধারণ অসীম সাহসী প্রত্যয়ে একটা ভাঙা রথের চাকা সম্বল করে দুর্নিবার ছিলো তার প্রত্যাঘাত । অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলো ছেলেটা সেই কত হাজার বছর আগে । এখন তো বদলেছে সময় । অভিমন্যু বোধহয় বোকা ছিল । না হলে কেউ এমনভাবে খুদিরাম হয় নাকি ! আরে বাবা, আজকাল তো আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই । জিততে চাই । অভিমন্যু ছেলেটা তো সেই কত হাজার বছর আগের একটা বোকাবোকা কল্পনা মাত্র । ঋকেরা আজকালকার চালাক স্মার্ট আখের গোছানো ছেলেপুলে । ওসব সেন্টু খেয়ে কী জীবন চলে নাকি ! তবে কেন ওর রাতে ঘুম আসেনা ! কেন ওর মাথার শিরাগুলো দপ্ দপ্ করে মাঝে মাঝেই ! কেন ওর বারবার মনে হয় স্বরচিত সেই লাইন - "এখনো কি আসেনি সময় আবার ? সময় ঘড়ির কাঁটা অতীতে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার" ! কেন ওর কলেজের সঞ্জয় স্যারের কথাগুলো মনে খোঁচা মারে - "ছিলাম চারপেয়ে । পরবর্তীতে দুইপেয়ে । এখন চাকা যে উল্টো গতিপথে চলেছে । আবার আমরা চারপেয়ে হয়ে গেছি । ভাবো তোমরা, হাতে স্মার্টফোন । পরনে আলট্রা আলফা বিটা পোষাক । কিন্তু ঘিলু সেই আদিম প্রবৃত্তির দাস । সমস্ত অমানবিক পশুত্বের ভাবনায় নতশির আমরা" । নাহ্, কাউন্সেলিং করাতে হবে ঋককে এবার । বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ।
চার এক্কে চার
--------------
নেট অন করতেই একগাদা ম্যাসেজের উঁকি স্ট্যাটাস বারে । বিডিও অফিসের থেকে একটা পিক্চার মেসেজ ডাউনলোড্ করে নিলো ঋক । এখন ইলেকশন টাইম । মহা আপদের জিনিস । যতক্ষণ না পুরোপুরি মিটছে সবকিছু, স্বস্তি নেই । পিক্চার মেসেজ টা একটা লোকাল অর্ডার । তাতে সেক্টর অফিসারদের পূর্ব-নির্ধারিত কিছু সেক্টরের অদল-বদল করা হয়েছে । ঋক জানত তার নাম থাকতে পারে । তাই কনফার্মড হয়ে নিল । অনুমান তার শতকরা সত্যি হয়ে গেল । বিডিও সাহেব তাকে ব্লক অফিসের নিকটবর্তী সেক্টর থেকে সবচেয়ে দূরের সেক্টরে পুনঃনিয়োগ করেছেন । কোন শালা ওনাকে উস্কে দিয়েছে, কে জানে । একে তো বিডিও অফিস । দিনরাত তেল মারা ও কাঠিবাজির আড়ত । তার উপর ঋকের দপ্তরটা নিয়ে বিডিও অফিস স্টাফদের একটু অ্যালার্জিও আছে । তাই দুইয়ে দুইয়ে চার করা, আর কী ! সিগারেটটা ভালো করে টানার আগেই শেষ হয়ে গেল । নাহ্, আজ দিনের শেষে একটা চিল্ড ভালুক নিয়ে বসতেই হবে । মাথাটা ঠান্ডা রেখে সব সামাল দিতে হবে । সেক্টর অফিসার সাফ্লিংটা আবার কোনও প্রব্লেম হলো নাকি ! ধুস্ !
পাঁচ এক্কে পাঁচ
---------------
নাহ্ । ঋকের চাপটা বেড়েছে বহুগুণ । নিজের অফিসের কাছে সেক্টর এলাকা হলে কত সুবিধে হত ওর ! শুধু কি ওরই ? সামনেই ইয়ার এন্ডিং এপ্রিল । এবছর রাজস্বের লক্ষ্যমাত্রাও প্রায় দুইগুণ করে দেওয়া হয়েছে । একে তো কর্মচারীর অভাবে ধুঁকছে ওর দপ্তর । নতুন করে কোনও নিয়োগ প্রায় নেই বললেই চলে । যেটুকু যা আসছে, তার সবটাই হয় অবসরপ্রাপ্তির পর পুনঃনিয়োগ প্রাপ্ত নয়তো কোনও কর্মচারীর মৃত্যুজনিত কারণে পোষ্যের চাকরি । আর এগুলো প্রায় সবটাই রাজনৈতিক প্রভাবের ফসল । ইলেকশনের কাজ ঘাড়ে চাপা মানেই নিজের দপ্তরের কাজে খিল তুলে দেওয়া । তার দপ্তর জমিজমা নিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে চলে । আর এই সময়ে তার কাজ করতে না পারার অর্থ পাবলিকের চরম হয়রানি । তার সাথে রাজস্ব আদায়েও বিপুল ধাক্কা খেতে হবে ব্লককে । হায়রে গণতন্ত্র । হায়রে দেশের বোদাপাঁঠা আপামর জনসাধারণ । তোদের দেওয়া বিপুল কর থেকেই নির্বাচনী খরচের কাজ করছে সরকার । সেই খরচের আবার কোনও হিসাবও রাখা হয়না । প্রশাসনের সরকারী কর্মচারী ও আধিকারিকরা বছরের অধিকাংশ সময় জুড়ে এই সংক্রান্ত কাজই করে চলেছে । কারণ কিছু রক্তপায়ী জীব নেতা হয়ে সিংহাসনে চেপে বসে থাকবে আগামী পাঁচটা বছর আর ভীরু অমেরুন্ডী জনতার রস শুষে খাবে । ছিবড়ে করে লুটেপুটে খাবে দেশের সম্পদ, জনগনের কর । তার জন্যেই এত বিশাল নির্বাচনী কর্মযজ্ঞ ও গালভারী করা সাংবিধানিক সংস্থা - নির্বাচনী কমিশন !!! যত্তো সব !!
ছয় এক্কে ছয়
-------------
উইন্ডো ফোনটা বেজে উঠলো ঋকের ।
- স্যার, আমি নাসিম বলছি । আজ আপনার পাট্টা অ্যানালমেন্টের একটা তদন্তে যেতে হবে ।
- কিন্তু আমার যে ইলেকশনের মিটিং আছে ভাই ! ওটা আমায় অ্যাটেন্ড করতেই হবে । না গিয়ে উপায়ও নেই ।
- স্যার, পার্টিকে তো বলে দিয়েছি । ওরা গাড়ি নিয়ে ডট এগারোটায় সেটেলমেন্ট অফিসে এসে যাবে ।
- হবে না, নাসিম । ওদের ফিরে যেতে বলে দিও ।
- তবে স্যার আবার একটা ডেট ওদের কে দিয়ে দিন । না হলে ওদের কেসটা তো ঝুলে থাকবে ।
- থাকলে তো আর আমার কিচ্ছু করবার নেই ভাই । এখন ইলেকশন টাইম । সব কাজ বাদ এখন । এখন শুধু ভোটের কাজের প্রস্তুতি । ওদের কে আমার কথা বলো । আর বলো যে এটা সাহেব সংবিধানের কথাই বলেছেন ।
- কি বলবো স্যার ?
- বলবে যে দেশের সুনাগরিক হিসেবে, গণতন্ত্রকে বাঁচিয়ে রাখার জন্য নির্বাচন প্রক্রিয়ায় ওরা যেন অবশ্যই নির্ভয়ে যোগদান করে । আর ভোট দিয়ে আমাদের এই কর্মযজ্ঞকে সার্থক করে । আরে বাবা, এটা তো বোঝো, এত কষ্ট করে ইলেকশন ডিউটি করছি কেন ? যাতে আম আদমী নির্দ্বিধায় তাদের ভাগ্যবিধাতাকে বেছে নেয় আগামী পাঁচ বছরের জন্য, যাতে সে গদি পেয়ে সব দেওয়া প্রতিশ্রুতি ভুলে যায়, আর নানাভাবে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে, নানা ফন্দি ফিকির করে পাবলিকের ****** মারতে পারে ।
ফোনটা কেটে দিলো ঋক । মিটিংএর জন্যে তৈরী হতে হবে ।
সাত এক্কে সাত
---------------
সারাদিন মিটিং অফিস সেরে ফিরছিল ঋক । দেখা হয়ে গেল কাজী বদরুজ্জামানের সাথে । সবাই একে চিটিংবাজ ছোট্টু বলেই চেনে । প্রথমটায় ঋভু খেয়াল করেনি । সামনে এসে ডাকলো বদরু ।
- সাহেব, কেমন আছেন ?
- কি ব্যাপার ছোট্টু ?
- একটু কাজ ছিলো সাহেব । আছেন কেমন বলুন ?
- এই চলে যাচ্ছে । তুমি কি কাজের কথা বলছিলে ? বলে ফেলো ।
- চলুন না স্যার । একটু এসি বারে গিয়ে বসবেন । একটু রিল্যাক্স করুন । পরে না হয় কাজের কথা বলবো ।
- দ্যাখো ভাই, দিনভর চাপ চলছে । আর গরমটাও পড়েছে খুব । টায়ার্ড লাগছে । মেসে গিয়ে বিশ্রাম নেব ।
- তবে স্যার আমার কাজ !
- তুমি বরং ইলেকশনের ঝামেলা মিটে গেলে সময় বের করে অফিসেই এসো । আমি বারে যেতে পারছি না । দুঃখিত ভাই ।
ছোট্টুকে বিদায় দিয়ে বাঁচল ঋক । এই হতভাগার জন্য সেটেলমেন্ট অফিসে ঝামেলা আর গন্ডগোলের শেষ নেই । শালা এক নম্বর জালিয়াত । আবার মাফিয়া ও নেতা মাস্তানদেরও খুব পেয়ারের । ওর জন্যেই এর আগের এক রাজস্ব আধিকারিক মারধর খেয়েছিল । ঋকের ঐ চাপটা নেই । কারণ, প্রথমতঃ ওর কোনও লোভ নেই । দ্বিতীয়তঃ ব্লকে ওর একটা আলাদা জনপ্রিয়তা রয়েছে । সুপিরিয়র অথরিটি স্টাফ্ পাবলিক নেতা দালাল মাফিয়া সবার সাথেই কমবেশী অ্যাডজাস্টমেন্ট করাটা এই চাকরির প্রথম ও প্রধান শর্ত । ঋক গোড়া থেকেই এই আবহাওয়ার সাথে খাপ খাইয়ে নিয়েছে ভালো অলরাউন্ডারের মত । প্রয়োজন মত চাপও তৈরী করতে পারে ও । এবছর ব্লকের বাংলা ইঁটভাটাগুলোর মালিকদেরকে ও যে ভাবে সামলে রয়্যালটি আদায় করেছে, তা যথেষ্টই প্রশংসার দাবী রাখে । মনে মনে একটু হাল্কা হাসিও খেলে যায় ওর । রাতটা আজ ভালই জমবে । সুমন্ত যতীনদারা বলছে ভালুক নিয়ে বসবে । গোল্লায় যাক্ দুনিয়া এখন । "লেটস্ হ্যাভ্ ফান নাউ" ।
আট এক্কে আট
--------------
মনটা ভাল নেই তিলকের । অফিসের কাজ, বাড়িতে মায়ের একটানা বিয়ের চাপ, সিভিল সার্ভিসের জন্য পড়াশোনা, নিজের কিছু ভালোলাগা, প্যাশন এসবের ঘোরে খুব ক্লান্ত তার মন । এমন সময় হোয়াটস্ অ্যাপে ঋক দাদার লেখা কিছু কবিতার লাইন এসে উঁকি দিল -
১
ঘাসের মাথায়
শিশির আগায়
জলেরা রঙ বদলায়
ঘুমভাঙা জোনাকির
সময়ে অসময়ে
নিজের মুখোশ চিনতে
আর বুঝতে ভুল হয়
তারাদের আয়নায়
রু ...
জানিনা কেন ভালোবাসারা
কলপ চুল লেপের ওমে
অকারণ স্বাদ পাল্টায়
২
আট বাই দশ ঘরে
শিশিরে ভেজা বালিশ
ঘাসে ঘাসে থাকে শুয়ে
কালিন্দীর চর রাতভোর
জোনাকির ফ্ল্যাসে ভাঙেনা ঘুম
শুষে নেয় বারুদ আর্তনাদ
ছেঁড়ে স্বপ্ন মায়ের আঁচল
ভো-কাট্টা ঘুড়ির সঙ্গে
ল্যাপটপ
আট বাই দশ ঘর
শিউলি-র মুখে সন্ধে এসে পড়ে
এপারে আমি মুঠো ভর্তি জল কুড়াই
সন্ধে কলারে
৩
খোপকাটা ঘরে
একলা জেগে
দেখি তোমায়
যখন সোহাগ তৃপ্ত
শহর সুখে ঘুমায়
দাগ পড়া মোবাইলের
হাল্কা স্ক্রিনের আলোয়
আমার ভালোবাসা ডটকমে
৪
ভেজা ঠোঁটে ঠোঁট রেখে
মিশে যেতে যেতে
গলন্ত মোমের মত
জমে যাই চুম্বন শেষে
ঘামের প্রতিটি বিন্দুতে
যেমন হেমন্তের শিশির
এসে জমে যায়
ভোরের ঘাসের আগায়
ভালোবাসা কি এতোটাই
নিরুপায়
রু ...
---------------------------
কবিতা আর নীরবতা বোধহয় সমগোত্রীয় । তিলকের গা শিরশির করে বেয়ে উঠল অজানা বিপন্নতা । ভালোবাসার বিকারে এত অসহায়তা কেন, আজও বোঝেনি অবুঝ তিলক । ফুলের চারপাশে কত প্রজাপতি ওড়ে । কোথাও তো তার নেই মানা অবাধ আসা যাওয়ায় । নাহ্, ঋক দাদা কি করছে দেখা যাক্ ।
নয় এক্কে নয়
-------------
রাত প্রায় সোয়া এগারো । ঋক শুয়ে আছে । ঝিম ঝিম ভাব । মুখের উপরে চলটা ওঠা সিলিং । ঝুঁকে পড়া পাখাটা ঘুরছে মাথার উপর একটানা বিরক্তিকর শব্দে কিন্তু হাওয়ার কোনও নামগন্ধও নেই । বাঁদিকের দেওয়ালে দুটো টিকটিকি অনেকক্ষণ ধরে ঘুরঘুর করছে একে অন্যের পিছনে জীবনের চরম আকাঙ্খায় । বিছানাটা ঈষৎ কাঁপলো । মোবাইলটা সাইলেন্ট ও ভাইব্রেট মোডে সেট করা । তিলকের নাম ভেসে উঠছে । আজ দু'বোতল টিউবর্গ হয়ে গেছে গল্পে আড্ডায় । এসময় অন্য কেউ কল করলে নির্ঘাত দুই চার কাঁচা খিস্তি দিত ঋক । শুধু তিলকটার জন্য ওর একটা আলাদা দুর্বলতা বরাবর, সেই শালবনীর ক্যাম্পাস থেকেই । এই হতভাগাটা ওর ভাইয়ের চেয়েও যেন বেশী কিছু । ওর বাড়িতে না গিয়ে থাকতে পারেনি ঋক । বার কয়েক গেছে ও গোকর্ণ । ভারী সুন্দর গোছানো সবুজ জনপদ এই গোকর্ণ । মন ভরে যায় । অবশ হাতে একটু টলে ফোনটা ধরল ঋক - বল্ ভাই ?
- দাদা, তোমার কবিতা পেলাম । মনটা যেন কেমন কেমন করছে গো !
- যাহ্, তা তোর মন খারাপের ওষুধ তো তোর বান্ধবীরাই আছে । ওদেরকে আমার কবিতা শোনা । হয়তো বুঝবে না । না হয় আমি তোকে শব্দের মানে বলে দেব ।
- ধুর্ ! তুমি না কিচ্ছু বুঝতে চাও না দাদা । ওকে ফোন করেছিলাম ।
- কার কথা বলছিস ভাই ! তোর তো অনেক গুলো 'ও' আছে । যাক্, নাম বাদ দে । কি কথা হলো বল্ ?
- ওকে বৃষ্টির কথা বললাম । বৃষ্টিভেজার কথা বললাম । ওর মেসেজের অপেক্ষায় বসে থাকার কথা বললাম । ওকে বললাম বৃষ্টি হয়ে নেমে আসতে আমার আঙিনায়, জানলায় । ও সব একটানা শুনে গেল । তারপর বললো 'রাখি' । ফোনটা কেটে দিলো দাদা ।
- যাহ্ বাবা, কি চায় ও ?
- আমার মনে হয়, ও খুব অহঙ্কারী দাদা । একে তো অপরূপা । তার উপর এক আই আইটিয়ান ইন্জিনিয়ারের সাথে ওর পাকা দেখার কথা চলছে ।
- আর তুই তো সরকারী আমলা । তোর কার্যক্ষমতার এক্তিয়ার Quasi Judicial - সেটা কি ও জানেনা !
- ও বললো আমি যদি আইএস হতাম বা আইপিএস, তবে একটা ব্যাপার ছিলো । ওর মতে আই আইটিয়ান ইন্জিনিয়ারের গ্ল্যামার নাকি আমার চেয়ে বেশী ।
- তা তুই হতভাগা আইএস বা আইপিএস হয়ে যা, কে মানা করেছে ! হয়ে ওকে দেখিয়ে দে, আর জীবন থেকে ঠেলে দূরে হটিয়ে দে । ওর চেয়ে তখন আরো ভালো কাউকে পটাবি আর ওর বাড়ি গিয়ে তোর এনগেজমেন্ট এর ইনভাইটেশন দিয়ে আসবি । এটা কি ভালোবাসা হচ্চে নাকি অ্যাকাউন্টেন্সির হিসাব ! যত্তোসব ! তুইও পারিস ভাই । এই সব ভুলভাল মেয়েকে সময় দিস্ কেন ?
- দাদা, ও পি.এইচ.ডি. করছে জেনেটিক্স এ
- তাতে হলোটা কি ! তোর কটা পি.এইচ.ডি ওয়ালা বান্ধবী চাই । ছাড় তো । কত পি.এইচ.ডি বসে আছে । বাজারে চাকরী নেই । আমার অনেক বন্ধু এখানে কিছু না পেয়ে বিদেশ গিয়ে পোস্ট ডক্টরেট করছে । আর আমি তো .... যাক্, বাদ দে । শোন্ ভাই, অপমান বোধ কে কাজে লাগা ।
- দাদা, এত রাতে তোমার ঘুমটা চটকালাম । সরি ।
- ধুর্ পাগল । আমার আইডিয়া নে । প্রজাপতি হয়ে উড়ে বেড়া । কেন বাঁধা পড়বি আমাদের মতো । আমরা তো হেজে মজে গেছি ভাই । তুই আর এসব বিয়ে টিয়ের চক্করে পড়িস না । যা, অনেক রাত হলো । ঘুমো এবার, গুড নাইট ।
ফোনটা সুইচ্ড অফ্ করে দিলো ঋক । আবার কে ফোন করে এত রাতে, সেই ভয়ে । ঘুম আসছে না কেন !
দশ এক্কে দশ
--------------
ঘুমটা আর আসছেনা ফিরে কিছুতেই । অতীতের ছবির কোলাজ ভাসা ভাসা ফুটে উঠছে স্মৃতির টাচ্স্ক্রিনে । কপালে জমছে বিন্দু বিন্দু ঘাম । আলো নেভানো অন্ধকার ঘরেও সবকিছু যেন বেশ স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে ওর নিশাচর প্রবৃত্তি । বাইরে কিছু খসখস্ শোনা যাচ্ছে । সম্ভবত কুকুরের চলার শব্দ । রাতের নীরবতা, নেশার মাদকতা, সারা দিনের ক্লান্তিও আবিষ্ট করতে পারেনি ওর দেহ মন । ও দেখতে পাচ্ছে ছেলেবেলায় বর্ষায় জলভরা উঠোনে ভাইবোনেরা মিলে কাগজের নৌকো ভাসানোর কথা আর শুনতে পাচ্ছে একটানা বৃষ্টির শব্দ । নৌকাগুলোর কয়েকটা তো শুরুতেই পালটি খেত আর বাকিরা কম বেশী টিকে যেত । ঋকের মনে হত একদিন ও এমনি করেই গোটা দুনিয়াটা চষে ফেলবে ঐতিহাসিক নাবিকদের মতো । ওর মনে আছে বিমল কাকুর সাথে গঙ্গার বুকে নৌকো চেপে জাল ছাড়ার কথা, ওদের পুকুরেও জাল পড়ত । অনেক মাছ উঠতে দেখেছে ও । দেখেছে মাছেদের ছট্ফটানি, মরার আগের দপ্দপানি, দম্ নেওয়ার চরম আকুতি । এখন তো ঋকও অমনি করেই রোজ দম্ নেয় মাছেদের মতো জীবন যুদ্ধে হাঁপাতে হাঁপাতে । ওর মনে ভাসছে বিকেলে সবাই মিলে ছাদের চিলেকোঠার ঘরে বসে ঠাকুরমার পাতা আচারের সদ্গতি করা । পুকুর পাড়ে গামছা পরে জলে পা ডুবিয়ে বসে থাকা আর ফেলে দেওয়া এঁটো ভাত মাছের কাঁটা কুকুর বিড়ালদের পরম যত্ন করে খাওয়ানো । গ্রীষ্মের বিকেলে কালবৈশাখী শেষে পড়ে থাকা আম আর শীতের দুপুরে পাড়া ঘুরে কুল কুড়ানো - এ সবই যেন এখন স্বপ্নের মতো মনে হচ্ছে ওর । ছবি আঁকা বা অঙ্ক কষাতে সে ছিল দারুণ পটু আর ছিল গল্পের বইয়ের পোকা । কী অপরিসীম ভালোবাসা ছিলো ওর অঙ্কের প্রতি । অথচ ইন্জিনিয়ার বা ডাক্তার, কোনও পথেই এগোয় নি ও । কেন, তার উত্তর এখনো খুঁজে পায়না । কিসে যে ভালো হয়, আর কিসে যে খারাপ, সেটা তো ও আজও বোঝেনা । বাড়ির লোকজন, বন্ধু ও তাদের মা বাবারা, শিক্ষক - এনারা শুধুই প্রতিযোগিতার কথা বলত । কি পড়ছিস্, কি করছিস্, কি করবি - এইসব শুনলেই মন বলত পালাই সব ফেলে । কে কত রোজগার করছে, কার কত সুন্দরী বান্ধবী, কে বিদেশ যেতে চায় - এই সব ছিল সবার পছন্দের আলোচ্য বিষয় । ঋকের খেলা ছবি আঁকা গানবাজনা নাটক বইপড়ার জগৎ ক্রমশঃ ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর হয়ে গেল । লক্ষ্য হলো একটা ভালো চাকরি । রোজগার করতে হবে । শখগুলো সব কমবেশী মেটাতে হবে । নিজের মতো করে নিজের শর্তে বাঁচতে হবে । টাকার প্রতি আকর্ষণ নেই তেমন, অথচ টাকাটাই যেন সবকিছু । ধীরে ধীরে সব এলো ওর একে একে । বানিজ্যকর, আয়কর, রাজ্য পুলিশ, কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা দপ্তরের এজেন্ট ও সবশেষে রাজ্য সরকারী আধিকারিক । যে চাকরী পাওয়ার জন্যে জীবনের অনেকটা সময় চলে গেল ওর, তা কি আর ও ফিরে পাবে কখনো ? সময় মূল্যবান । সেটা ও বোঝে । অনেক কিছু ছাড়তে হয়েছে ওকে এই চাকরীগুলো জোগাড় করতে । একেবারেই অসামাজিক হয়ে উঠেছিলো চাকরীপ্রত্যাশী ঋক । আর এখন এই চাকরী ওর জীবনের সবটাই প্রায় গ্রাস করে নিয়েছে । এখন ওর রোজগার আছে, অথচ সময় নেই । কি পরিহাস জীবনের ! চাকরীর জন্যে সব ছেড়ে দিল ও আর সেই চাকরীই সব ছিনিয়ে নিল ওর জীবন থেকে - পরিবার, বন্ধু, শখ, আনন্দ - সবকিছু যেন কোথায় মিলিয়ে যাচ্ছে বাতাসে ফেটে যাওয়া বুদবুদের মতন । বিচ্ছিন্নতাবোধের আগ্রাসনে আজ বিপন্ন তার সামগ্রিক স্বত্ত্বা । গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছে ঋকের । জল চাই । অনেক জল । লাইট জ্বালতে হলো আবার । যাহ্ বাবা, জলের জগটা গেল কোথায় !
এগার এক্কে এগার
------------------
ঘুম ভাঙতে দেরী হলো ঋকের । অন্যদিন অ্যালার্ম সেট করা থাকে । আজকেও ছিল । তবে সম্ভবত ও টের পায়নি । আজ কাল অফিস ছুটি । ঠিক পুরোপুরি ছুটি নয় । আসলে কাল রবিবার, ব্লকের রিটার্নিং অফিসার আসবেন মিটিং করতে ইলেকশন্ নিয়ে । সেই অর্থে আজ তেমন কোনও কাজ নেই । বাড়ি যেতে পারেনি ঋক এই মিটিং এর কারণে । অন্য সময় হলে এখন ও বাড়িতে ছেলের সাথে বসে সময় কাটাতো । ঋকের জন্ম বড় হওয়া লেখাপড়া বিয়ে আত্মীয় স্বজন সবটাই কলকাতা কেন্দ্রিক । ওর আগের কর্মস্থলও ওখানেই ছিল । মালদায় আসা অবধি ওকে বিস্তর অসুবিধার সাথে মানাতে হয়েছে । এখনও সবকিছু নিয়ন্ত্রণে নয় । বিশেষতঃ বাড়ি । তাছাড়া এর আগের দপ্তরে ও একটানা সাড়ে ছয় বছর কাজ করেছিল । তার মায়া কাটানোও খুব সহজ ছিলোনা । আজকের ঋক অনেক স্বাবলম্বী, পরিণত । কিছু মানুষ ওর জীবনের বাঁকগুলো ঘুরিয়ে ওকে অন্যপথে নিয়ে গেছে । তাদের প্রতি ও চিরকৃতজ্ঞ । এটা ঠিকই যে, সব সময় এইসব মানুষ গুলোর সান্নিধ্য ও পায় না । তবে মর্মে মর্মে ও অনুভব করে ওঁদের । ভাড়া বাড়িতে একলা থাকছে ও । খাওয়াটা মেসেই সেরে নেয় । যেখানে ও থাকছে, তার থেকে মিনিট পাঁচেকের হাঁটাপথ ওর মেসবাড়ি । ঋক বাজারের পথ ধরল । ওখানে একটা চায়ের দোকান আছে তিনমাথার মোড়ে । চা টা ব্যাপক বানায় । এই মুহূর্তে ওর টিফিনটা করাও খুব দরকার । তার সাথে দরকার চা আর নিকোটিনের ধোঁয়া । গতরাতে ও ঠিকমতো সলিড ফুড খেতে পারেনি । জলটাই বেশী টানা হয়ে গেছে । আর অফিস দিনে তো সাতসকালেই বেরোতে হয় । তখন আর ভারী টিফিন করাও সম্ভব হয়না । শঙ্করের দোকানে গিয়েই গোটা পাঁচেক ডালপুরী মেরে দিল ঋক । এরপর চায়ের সাথে নিকোটিনের ধোঁয়ার আমেজ নিতে নিতেই ফোন এলো এক মুহুরীর । কি অশান্তি রে বাবা ! ছুটির দিনেও এদের উৎপাত মেনে নেওয়া যায় ! আর কিই বা করবে ও এখন । সারাদিন কোনও বিশেষ কাজও নেই । তার চেয়ে বরং একটু মহানন্দার পাড়ে কাটুক ওর সময় । ফোনে ও নিতাইকে বলে দিল যেন বিকেলের দিকটায় নতুন ব্রীজের ধারে চলে এসে ফোন করে দেয় । কে জানে, কি এমন কাজ, যেটা ফোনে বলা যাবেনা ! এখন আপাততঃ স্নানটা সেরে ল্যাপটপে সিনেমা নিয়েই বসুক ও । শখগুলোর মধ্যে আপাততঃ ওর শুধু এটাই আছে এখন । আর আছে কালেভদ্রে টুকটাক লেখালেখি । সেটা অবশ্য ওর নিজের কাছে নিজের একটা দায়বদ্ধতার মতো । ওর চারপাশ জুড়ে এত কিছু ঘটে চলে রোজ, যে সব সময় সব কথা সবাইকে বলতেও পারেনা ও । তখন একমাত্র সাথী ও ভরসা ওর নিজের কলম খানা । সিগারেট টা ফেলে ঘরের পথ ধরল ঋক ।
বারো এক্কে বারো
-----------------
ঘরে ফিরে স্নান খাওয়া সেরে সিগারেট টানতে টানতে পেপারটা দেখছিল ঋক । সম্পাদকীয়তে ফলাও করে ছাপা হয়েছে সরকারী উন্নয়ন কর্মের হাল হকিকত । সেখানে শাসকদলের কর্মযজ্ঞের সাফল্য ও ব্যর্থতার কথা উঠে এসেছে শানিত শব্দের ফলায় । পড়তে পড়তে অক্ষরগুলো সব অস্পষ্ট ঘোলাটে হয়ে গেলো ঋকের । জীবন মানে কি শুধুই মানিয়ে নিয়ে চলা ? বাঁচার উদ্দেশ্যটা তবে ঠিক কি ? ভাবনারা খচ্খচ্ করছিল করোটির ভিতর পিটুইট্যারী গ্ল্যান্ডের দেওয়াল জুড়ে । অনেকের অনেক লেখা পড়েছে ও । শুনেছেও অনেক কথা । দেশ তার কাগজে কলমে ইতিহাসের বইয়ে স্বাধীনতা পেয়েছে সেই সাতচল্লিশে । আর যখনই তাকে যেতে হয়েছে বাংলার প্রত্যন্ত এলাকায়, যেখানে নিজের বাহন ছাড়া চলাই অসম্ভব, যেখানে এখনো অর্ধেকের বেশী মানুষ খালি পায়ে, গামছা গলায় চলে, দু'চাকা বা ট্রাক্টর ছাড়া আর কোনও যোগাযোগ মাধ্যম নেই, দেশের এমন এলাকাকে সে যখনই তুলনা করেছে কলকাতার সাথে, ভীষণ লজ্জা করেছে তার বলতে, "আমরা স্বাধীন" । বরং নেতাদের উদ্দেশ্যে বলতে ইচ্ছে করেছে, "তোরা লোভী, মিথ্যেবাদী, প্রতারক, প্রবঞ্চক । পাঁচ বছরে একবার তোরা জোড়হাতে বের হোস্ দলের প্রতীক নিয়ে ভোটভিক্ষা করতে । তোদের ভরসা করে ভোট দেয় যারা, তারা কেন বোঝে না যে উন্নয়নের সব ঘি মাখন নোট তোদের জন্যেই আসে । তোরা মানুষের ভিতর ভেদনীতির খেলা খেলবি ধর্ম জাতপাতের নামে । অনগ্রসর শ্রেণীর জন্য ভর্তুকি দিবি । অথচ উন্নয়নের মূল স্তম্ভ শিক্ষা থেকে জনগনকে বঞ্চিত করে রাখবি । মানুষ অশিক্ষিত নিরক্ষর হলেই তোদের লাভ । শিক্ষিত হয়ে প্রতিবাদ করলেই দেশদ্রোহী । দেশের বিরোধীতা কি কেউ করতে চায় ? বরং যারা রাষ্ট্রনেতা, যারা দেশ চালাচ্ছে, তারা ভুলভ্রান্তি বা অন্যায় করলে তার প্রতিবাদ তো করতেই হবে । কারণ দেশটা তো আর একা ঐ নেতার কেনা বা পৈতৃক সম্পত্তি নয় । মানুষের ভোট পেয়ে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধি যদি মানুষের অভাব অভিযোগের প্রতিকার না করে, তবে তো তার সেই ক্ষমতার গদি ছেড়ে দেওয়া উচিৎ । ঋক মালদায় আসা অবদি এখনো পর্যন্ত বার পঁচিশেক গেছে ভূতনীর চরে কাজের সূত্রে । প্রতিবার তার মনে একটাই প্রশ্ন তৈরী হয়েছে - "এরা কেমন করে বেঁচে আছে" ! ভূতনীর চর হল মালদা আর ঝাড়খন্ডের রাজমহলের মাঝে গঙ্গার উপর গজিয়ে ওঠা তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েতভুক্ত এক সুবিশাল চর । এলাকাটা একেবারেই বাংলার মূল ভুখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন । স্বাধীনতা পরবর্তী উনসত্তর বছরে একটাও পাকা সড়ক তৈরী করা সম্ভব হয়নি এখানে । এখানে এলেই প্রাচীন গ্রাম বাংলার কথা মনে হয় ঋকের । এখানে কারো কারো অনেক জমি । উদ্বাস্তুদের অনেকেই আবার খাসজমি অধিকার করে বসে আছে । কিছু কিছু জমি পাট্টামূলে সরকার থেকে বিলিবাট্টা করা হয়েছে । জমি এখানকার খুব উর্বর । মাটি একেবারে সোনা । এলাকার লোকের প্রধান জীবিকা কৃষি, কৃষি নির্ভর শিল্প, জনখাটা ও পশুপালন । এলাকার মানুষ এখনো নাগরিক সুযোগ সুবিধা সম্পর্কে সচেতন নয় । এমন এলাকায় শহুরে ঋভুরা পিকনিক করতে পারে, নদীর বুকে পূর্ণিমার আলোয় নৌকায় বসে বিয়ার আর মাছভাজা টানতে পারে বড়জোর । কিন্তু এখানে থাকা বা বাদবাকী দৈনন্দিন প্রয়োজন মেটানো কার্যতঃ অসম্ভব ওদের পক্ষে । ভাবতে ভাবতে চোখের পাতা জুড়ে যায় । তন্দ্রাভাব ছুটে যায় ফোনের রিংটোনে । নিতাই কল করছে । যাহ্, ঋক তো একেবারে ভুলেই মেরে দিয়েছিলো । ওকে টাউনে আসতে বলেছিল বিকেলে । এখন বাজে কটা !
তেরো এক্কে তেরো
------------------
মোবাইলে এখন চারটে বেজে দশ । মিসড্ কল লিস্টে নিতাইয়ের নাম দেখাচ্ছে । ঋক কল ব্যাক করতে গিয়ে ফোন ব্যস্ত পেল । পরক্ষণেই নিতাইয়ের কল এসে ঢুকলো ।
- স্যার, নিতাই বলছি । আমি চলে এসেছি স্যার । হাতে একটু সময় নিয়েই এলাম ।
- এত আগেভাগে এলে কেন ? আর একটু পরে আসতে, রোদটা পড়ে গেলে । মহানন্দার পাড়ে একটু বসতাম ।
- স্যার, কিছু মনে করবেন না । ব্যাপারটা একটু সিরিয়াস্ । আর আমার তো বাড়িটাও ধরমপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে অনেকটা ভিতরে । একেবারে কালিন্দীর পাড়ে । এদিকের রাস্তাগুলোও সব খারাপ । একেবারে চোর ডাকাত আর অপদেবতার আড়ত । পাশেই শ্মশান । প্রচুর বলি টলি পড়ে এখানে । আর প্রায়শই বাচ্চা কাচ্চা চুরি হয়ে যায় । আমরা সন্দেহ করি এলাকার কিছু তান্ত্রিকদের । কিন্তু প্রমাণ অভাবে কিচ্ছু করতে পারিনা । ওদের বিরাট সব হাতযশ । এলাকার নেতারাও ওদেরকে ঘাঁটায় না ।
- বলো কি গো ?
- হ্যাঁ স্যার, আর বলবেন না । আপনারা শহুরে বাবু । আপনারা এসব হেসে উড়িয়ে দেন । কিন্তু আমরা সত্যিই বড় অসহায় ।
- যাক্ গে । তুমি এক কাজ করো । তুমি ফোয়ারা মোড় এর কাছে পোস্টঅফিসের মেন গেটের সামনের দিকে দাঁড়াও । আমি দশ মিনিটে ঢুকছি ।
ফোন কেটে দিয়ে দ্রুত রেডি হয়ে নিলো ঋভু । ঘর থেকে বের হয়েই টোটো পেয়ে উঠে বসল ।
- ফোয়ারা মোড় চলুন কাকা ।
সিগারেট শেষ । এক প্যাকেট ফ্লেক নিয়ে নিলো ঋক । একটা জমাটি কিছু অপেক্ষা করছে মনে হচ্ছে ।
চোদ্দ এক্কে চোদ্দ
------------------
নিতাই ফোয়ারা মোড়ে পোস্ট অফিসের সামনে এসে দাঁড়ালো । সাহেবের জন্যে এক প্যাকেট ফ্লেক নিয়ে এসেছে । ও জানে এই একটা ব্যাপারে সাহেবের কোনও না নেই । চোখে মুখে একরাশ দুশ্চিন্তা । কয়েক রাত ধরে চোখে ঘুম নেই ওর । বাড়িতে শরিকি গন্ডগোল মিটছে না কিছুতেই । দিন কয়েক ধরে কাজে যাওয়াও বন্ধ । ছেলেটা এবছর মাধ্যমিক দিয়েছে । লেখাপড়াতে মোটামুটি । নিতাই জানে, যেমন তেমন করে ছেলেটাকে লেখাপড়া শিখিয়ে বা হাতে কলমে কারিগরী কাজ শিখিয়ে ওকে নিজের পায়ে দাঁড় করাতেই হবে । নিজের শরীরটাও ভালো যাচ্ছে না একদম । রাত বাড়লে শ্বাসকষ্ট শুরু হয় । টেনশন অনিদ্রা আর পরিশ্রমে শরীরটাও সঙ্গ দিচ্ছে না ।
- আরে নিতাই, তুই এখানে ! ব্যাপার কি ভাই ?
চিটিংবাজ ছোট্টুকে দেখে একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল নিতাই । সেকেন্ড খানেক ভেবে নিল কি বলবে । ছোট্টুকে ভরসা নেই ওর একটুও । কে জানে, কি দিয়ে কি ভাবে কি করে দেয় ! যে নিজের কাকাকে ঠকিয়ে ঠাকুমার জমি নিজের নামে রেকর্ড করিয়ে নেয়, তাকে কোনও কথাই বলা নয় ।
- সাহেব ডেকেছেন । তাই এসেছি ।
- কোন্ সাহেব ?
- ছোট সাহেব । কি ব্যাপার নিয়ে বলেননি কিছুই ।
- আর তোর ছোট সাহেব ! ওনার মাথাটা কোন্ শালা যে খেয়েছে, কে জানে । আমার নামে ওনাকে সিওর কেউ উস্কে দিয়েছে । নাহলে, আমায় কত সুন্দর করে পাশ কাটালেন সাহেব কাল রাতে ।
- কেন এমন করে বলছিস তুই ?
- কেন বলবো না তুই বল ? যখন উনি ব্লকের কোয়ার্টারে থাকতেন, রোজ অফিস থেকে বের হয়ে রাজমহল ঘাটের শ্মশানে গিয়ে বসে থাকতেন রাত অব্দি একা একা । মাছভাজা দিয়ে বিয়ার টানতেন । আর কেউ ফোন করলে বা ডিসটার্ব করলেই খিস্তি দিয়ে ধুইয়ে দিতেন ।
- সে উনি দিতেই পারেন । উনি হলেন গিয়ে সাহেব মানুষ । সারা দিন পাবলিক, আমাদের মত মুহুরী, তোদের মত দালাল মাফিয়ারা, পার্টির দাদারা সাহেবের মাথার চুল ছিঁড়ে খায় । আর বিকেলের পর উনি ওনার মতো করে রিল্যাক্স করতেই পারেন । সে সময় উনি কার সাথে গল্প করবেন, না করবেন, সেটা পুরোটাই ওনার মর্জির ব্যাপার । এতে তুই দোষের কি দেখলি ?
- দেখব না ! এই সাহেব কাল যখন ক্লান্ত হয়ে টাউন ঢুকলেন, আমার সাথে ওনার মুখোমুখি দেখা হলো । সাহেবকে রিকোয়েস্ট করলাম আমার সাথে একটু এসি বারে বসতে । ভালো মাল খাওয়াতাম । একটু কাজের গল্পও হয়ে যেত । কিন্তু সাহেব সোজা মুখের উপর আমায় 'না' বলে দিলেন । আমায় বললেন ভোট শেষ হলে অফিসে গিয়ে কথা বলতে । তুই বল নিতাই, আমার মত হাইফাই লোকের সেটেলমেন্ট অফিসে যাওয়া পোষায় ? আমি তো নিজের বাড়িতেই যাইনা । গেলেও লেট নাইটে যাই ।
- সে তো যাবিই । তোর তো সব ব্যাপারই স্পেশাল । আমরা ভাই পাতি মুহুরী । সাহেব ডেকেছেন । চলে এসেছি । ব্যস্ । এবার তুই কেটে পড় । সাহেব তোকে দেখলে ক্ষেপে যাবেন । কথা তো বলবেনই না । উল্টে কাল অফিসে ওনার কাছে গেলে গালাগাল দিয়ে ঘর থেকে বের করে দেবেন । তুই এখন যা ভাই ।
ছোট্টু চলে গেল । আর ঠিক তখনই একটা টোটো এসে থামলো নিতাইয়ের সামনে । ঋক নেমে এলো ।
পনেরো এক্কে পনেরো
--------------------
- বলো, কি ব্যাপার নিয়ে এত চাপে আছো ?
- তার আগে আপনি বলুন, ক্যামন আছেন?
- আচ্ছা নিতাই, তুমি কি অসময়ে এতদূর এসেছ আমার ভালোমন্দ খোঁজ খবর নিতে ! চলো, আমরা একটু বাঁধ রোডের ধার বেয়ে এগিয়ে যাই ।
ওরা এগিয়ে গেলো । পাশেই মজে যাওয়া মহানন্দা । এখন শীত শেষে গরম পড়তে শুরু করেছে । এ সময় ছাগল ছানাও মহানন্দাকে উপহাস করতে ছাড়ে না । সবাই পায়ে হেঁটেই ওপারে পুরনো মালদা শহরে চলে যায় । তবে বর্ষায় পরিস্থিতি একেবারে বদলে যায় । আশেপাশের গ্রামে জল ঢুকে পড়ে । গত বছর তো গোটা কয়েক কুমীরও চলে এসেছিল । শেষমেশ বনদপ্তরের হস্তক্ষেপে সবকিছু নিয়ন্ত্রণে আসে । ওরা হাঁটতে হাঁটতে চলে এসেছিলো নতুন ব্রীজের সামনে । বাঁধ রোডের মেরামতির পর আজকাল অনেকেই এখানে দুই বেলা নিয়মিত হাঁটাচলা করেন । ঋক আর নিতাই একটা সিমেন্টের বেঞ্চিতে বসে পড়ল । আকাশে টুকরো টুকরো মেঘ জমাট বেঁধে মন্ড পাকিয়ে আছে । আলো কমে এলে এখানে আলো জ্বলে ওঠে । পুরসভার নজরদারি বেশ ভালোই । রবীন্দ্রসঙ্গীতও বাজানো হয় মাইক্রোফোনে । ওদের বেঞ্চির সামনেই একটা পুরানো সাবেকি আমলের দালানসহ বাগানবাড়ি । বাড়ির নাম শৈলরাণী নিবাস । শৈলরাণী ঋকের ঠাকুরমার নাম । মুহূর্তের ভিতর ঋক যেন কেমন করে হারিয়ে গেল অতীতের স্মৃতিগর্ভে । যদিও ছোটবেলার কথা খুব বেশি মনে পড়েনা ঋকের । তবে কিছু কিছু মুহূর্ত ওর স্মৃতির পর্দায় কোলাজ হয়ে রয়েছে । অতীতের অ্যালবামে সবার আগে ওর মনে ভেসে ওঠে ঠাকুরমার ছবি । অবিভক্ত ভারতের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্নাতক ওর ঠাকুরমা । সকালে উঠে পুকুরের জলে ডুব দিয়ে স্নান, বাড়িময় গোবর জল ছড়ানো, নিকোনো মাটিতে মাঠের কাটা ধান ফেলে রাখা, বিশাল বড়ো বাগানের গাছপালা ও তুলসীতলার পরিচর্যা, গোয়ালঘর সামলানো, ঘুঁটে কাঠ কয়লার আগুনে মাটির বিশাল উনুনে দিনভর রান্না ও সবশেষে শালগ্রাম শিলার ঠাকুরের নিত্যসেবা - সব কাজেই সমানভাবে পারদর্শী ঠকুরমার সাথে সর্বক্ষণ আঠার মতো সেঁটে থাকতেই ঋক সবচেয়ে বেশি পছন্দ করত । এছাড়াও ছিল দুলাল দা আর নিশিকান্ত জেঠু । দুলাল দা বাড়ির সকলের সব ফাইফরমাস খাটত আর নিশিকান্ত জেঠু ছিলো বাড়ির ঠাকুর । দূলালদা ও নিশিকান্ত জেঠু ঋককে পালা করে স্কুলে নিয়ে যেত । দুলালদার সাথে ঋকের রাতদিন ঝামেলা লেগে থাকত । আর দুলাল দাও সুযোগ খুঁজতে থাকত ঋককে বেকায়দায় ফেলে হেনস্থা করবার । ঠাকুরমার কাছে প্রায়শই নানা রকমের নালিশ জমা পড়ত । আর ঠাকুরমা সেগুলো হেসেই খারিজ করে দিতেন । কিন্তু সেই অভিযোগ যদি মায়ের কাছে দাখিল হতো, তবে আর বাঁচার কোনও উপায় ছিলোনা । হাতপাখা, গরম খুন্তির ছ্যাঁকা, বেলনচাকী - এসবের কিছুই বাদ যেতনা । ঋকের ঠাকুরদা ছিলেন রাশভারি, মেজাজি ও বদরাগী গোছের মানুষ । পান থেকে চুন খসলেই ওনার মাথার অল্প কয়েক গাছা চুল রাগে খাড়া হয়ে যেত । সবাইকেই উনি কমবেশি গালমন্দ করতেন । এহেন মানুষের কাছে ঋক কেন, পশু পাখিরাও ঘেঁষাঘেঁষি করবার সাহস পেত না । বাড়ির অতি সাধারণ ফেলে দেওয়া জিনিসও উনি কুড়িয়ে পরম আদরে তুলে রাখতেন । অথচ বাড়ির সদস্য ও বাইরের লোকজন কে বিন্দুমাত্র রেয়াত করতেন না । ওনার বিশাল বড়ো বাগান ও পুকুরে কাকপক্ষী ও বসার সুযোগ পেত না । কোনও চেনা জানা লোকও যদি ঘাসপাতা কুড়াতে আসত, তবে তার চোদ্দ গুষ্টির উদ্ধার না করে তিনি ক্ষান্ত হতেন না । এমন ভয়ঙ্কর জাঁদরেল গোছের ঠাকুরদাও মাঝে মধ্যে ঋকের পাল্লায় পড়ে নাজেহাল বোধ করতেন । ওনার লুকিয়ে রাখা বিস্কুট, চানাচুর, হজমিগুলি, মায়েদের ছাদে পাতা আচার প্রায়ই গায়েব হয়ে যেত । পুকুরে ছিপ ফেলে, জাল পেতে ওনার তোলা মাছগুলো প্রায়ই আবার পুকুরের জলে জীবন্ত ফিরে যেত । পুকুরে স্নান করতে নামলে লুঙ্গি গামছা সব কোথায় যেন হাওয়া হয়ে যেত । এমনকী একবার শীতের রোদ্দুর মেখে আরামকেদারায় চোখ বুঁজে এলিয়ে থাকা বিশালবপু ঠাকুর্দার ভুঁড়ির লোমও আতশকাঁচ দিয়ে জ্বালিয়ে দিয়েছিল ঋক । ঠাকুরদা গোটা গরমে ফোঁড়ার যন্ত্রণায় কষ্ট পেতেন । ঋক ওনাকে এই বলে সতর্ক করত যে সেগুলো নাকি সব ঠাকুর্দার খুচরো পাপের কর্মফল । আরও সতর্ক করে দিয়ে বলতো যে এরপর নাকি ওনার মুখে ফোঁড়া হবে, যাতে ওঁর আজেবাজে কথা বলার ওপর উপরওয়ালা স্থগিতাদেশ জারি করেন ।
- সাহেব, আপনার কি কিছু হয়েছে !
- নাহ্, কেন বলতো ?
- আপনি যেন কিসের একটা চিন্তায় আছেন ।
- ওহ, তাই বল । আসলে ঐ যে ফলকে খোদাই করা নাম দেখতে পাচ্ছ, ওটি আমার ঠাকুমার নাম । তাই একটু অতীতে চলে গেছিলাম মুহূর্তের ধাক্কায় । এবার বলো শুনি । কি এত দরকারি কথা তোমার যে ছুটির দিনেও তোমাকে এতদূর দৌড়ে আসতে হয় ।
ষোলো এক্কে ষোলো
--------------------
নিতাইয়ের সাথে কথা হতে হতে রাতটা যে কতখানি এগিয়ে গেছে তার খেয়াল হলো পমদার আসা ফোনে,
- কিরে ভাই, কোথায় আছিস ! আজ কি রাতে উপোস দিবি নাকি ?
- না দাদা, বাঁধ রোডে আছি । দশ মিনিটের ভিতরে ঢুকছি ।
নিতাই গুড নাইট করে চলে গেল । ঋকের মাথায় ঠাণ্ডা জলের বড়ো বড়ো ফোঁটা এসে পড়তে লাগলো । চাঁদটা একেবারেই উধাও হয়ে গেছে । তারাদেরও আর কোনও হদিস নেই । হাওয়াও দিচ্ছে বেশ জোরদার । ধূলো বালি পাক খেয়ে উড়ে এসে আছড়ে পড়ছে ঋকের চোখে মুখে । আর সবচেয়ে বড়ো অস্বস্তির ব্যাপার হলো রাস্তার ধারে যেখানে সেখানে ফেলে রাখা ময়লা আবর্জনার একাধিপত্য । তার উপর ঝড়টা এসে পথঘাটে চলাফেরা আরও দুর্বিষহ করে তুলেছে । এটাই মালদা শহরের একটা অন্যতম বিশেষ বৈশিষ্ট্য বলা যেতে পারে । শহরবাসীর এমন অপরিচ্ছন্ন মনোভাব, বিশেষত বাড়ির সামনেই আবর্জনা উপুড় করে ফেলে রাখার এই সংস্কৃতি বড়োই পীড়াদায়ক । ঋক কোনওমতে এসে ঢুকলো মেসে । এমন আবহাওয়ায় একটু জমাটি মুখরোচক হলে বেশ হতো । কিন্তু ম্যাড়ম্যাড়ে রান্না আর ট্যালট্যালে ঝোল ভাতই ওদের কপালে বরাদ্দ । শনিবারের ছুটির দিনে সবাই বাড়ি কেটে পড়েছে । রয়ে গেছে শুধু ও আর পমদা । পমদা মানে পবিত্র মাজি । বাড়ি তারকেশ্বর লাইনে । একটু কমপ্লিকেটেড টাইপের । খটখটে রুক্ষ হাবভাব । সবসময় অ্যাটেনশন আদায় করতে চায় । দাদাগিরিতেও কিছু কম যায় না । এমনিতে কাঠিবাজ নয় । তবে লেগ পুলিং টা ভালোই জানে । আর সিনিয়রদের তেল মারতেও বেশ দড় । তবে মেসের রুমমেট হিসেবে বেশ কেয়ারিং । এই একটি মাত্র কারণে ঋক ওর সব ওস্তাদিপনা হাসিমুখে মেনে নেয় । মেসে ঢুকতেই পমদার শব্দবাণ তেড়ে এলো - অনেক এদিক ওদিক চরে বেড়ালি ভাইটি । এবার বসে উদ্ধার করে দে ।
- কাল সকাল দশটা থেকে ব্লকের মিটিং । আশাকরি তোমারও একই অবস্থা দাদা ।
- সে আর বলতে । সবাই বাড়িতে এনজয় করছে । আর আমাদের কপাল টা দ্যাখ্ ।
ওরা দুজন খেতে বসে গেল । শনিবারের আলুসেদ্ধ ডাল ভাতের নিরামিষ রাতটা ঠিক জমলো না ।
নিতাই যা যা বলে গেল এক নাগাড়ে, সেগুলো কতটা সত্যি আর কতটা রঙ চড়ানো তা বোঝা মুস্কিল ব্যাপার । এর জন্য চাই সরোজমিন তদন্ত । তদন্তকারী যদি সততার সাথে সবকিছু পর্যবক্ষেণ করে তবে হয়তো বা একটা সিদ্ধান্ত নেওয়া যেতে পারে । নিতাই বলছিলো একজন চমৎকারী সাধুবাবার অলৌকিক ক্ষমতার কথা । সেটা যে কতখানি সত্যি, তা অবশ্যই পর্যবক্ষেণ সাপেক্ষ । এর জন্যে চাই উপযুক্ত সময় । ঋক এখন নির্বাচনের ও নিজের দপ্তরের কাজ নিয়ে এতটাই চাপে আছে যে তার বাড়িতে যাওয়াও মোটামুটি বন্ধ হয়ে গেছে । নিজের সময় বলতে গেলে তার আর প্রায় কিছুই নেই । নিতাই চাইছে তার একমাত্র সবেধন নীলমণি ছেলেটা যেন ঐ তান্ত্রিক সাধুবাবার পাল্লায় না পড়ে । এ ব্যাপারে ও ঋকের দ্বারস্থ হয়েছে । ওর একান্ত বিশ্বাস সাহেবের কাউন্সেলিং ওর ছেলেকে সঠিক পথের দিশারী করবে । নিতাই চায় ওর ছেলেকে ভালো করে লেখাপড়া শেখাতে । সে নিজে ভালো করে পড়তে পারেনি । কাঁচা বয়সেই একেবারে বখে গিয়েছিল ওর মৈথিলি বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে । ওর ছেলেটাও এখন সেই পথেই হাঁটছে । আর এখন ওর নতুন শখ গজিয়েছে মস্ত বড়ো তান্ত্রিক হওয়ার । তার জন্যে লেখাপড়া শিকেয় তুলে দিয়ে সে এখন ঐ তান্ত্রিকের আখড়ায় গিয়ে সময় কাটায় । সব হাতখরচ সাধুবাবার ভাঁড়ারে অকাতরে বিলিয়ে দেয় । নেশাভাঙ ও ধরে ফেলেছে । এমনকী বাড়তি খরচ মেটাতে ঘর থেকে টুকটাক খুচরো টাকা পয়সাও সরিয়ে ফেলছে । সব শুনে ঋকের একটাই কথা মনে হয়েছে । এমন ভন্ড তপস্বীকে উপযুক্ত সাজা দেওয়া দরকার । আর তার জন্যে তার ভন্ডামি জালিয়াতি সকলের সামনে তুলে ধরা খুবই প্রয়োজন । কিন্তু সেটা কি ভাবে ! গ্রামে গঞ্জে এখনও মানুষের মন অন্ধবিশ্বাস কুসংস্কারে ভরপুর । কোনও সাবেকি ভাবনা চিন্তায় আঘাত এরা কখনওই বরদাস্ত করতে পারে না । আপাতদৃষ্টিতে এরা খুব নিরীহ গোবেচারা গোছের হলেও আদতে এদের অধিকাংশই বেশ সেয়ানা আর ধান্দাবাজ টাইপের । শহরের মানুষের মন জটিলতায় পূর্ণ ও অহংকারে আচ্ছন্ন । সবাই সংস্কৃতিমনস্ক আধুনিক নয় । আর গ্রামীণ বাংলার লোকজন তো আরও কঠিন জিনিস । নাহ্, ঋকের উপর আরও একটা কঠিন চাপ তৈরি হচ্ছে । একটা কিশোরের জীবনের জীবিকার প্রশ্ন এখন তার উপর ন্যস্ত করা হলো । সে কি ভাবে এর মুখোমুখি মোকাবিলা করবে এটাই এখন ভাবনার বিষয় । শুয়ে শুয়ে নিতাই এর অসহায়তার কথা মনে আসতে আসতে চোখের পাতা লেগে গেলো ঋকের ।
সতেরো এক্কে সতেরো
--------------------
ঘুম ভাঙল বেশ দেরিতে । গত রাতে ঋক আর তার ভাড়া বাড়িতে ফিরতে পারেনি । অনেক রাত পর্যন্ত এক নাগাড়ে ঝড় বৃষ্টি হয়েছিলো । সাথে ছাতা না থাকায় বাধ্য হয়েই মেসের বিছানায় রাত কাটাতে হলো ওকে । বাড়ি ফিরে ওর চোখের পাতা বিস্ফারিত হলো । বিছানার দিকের জানলা হাট করে খোলা । জানলার গ্রীল সংলগ্ন লোহার তারজালি বেঁকিয়ে উঁচু করে ওঠানো । বিছানার চাদর জানলার দিকে টানা । ল্যাপটপ ব্যাগ জানলার দিকে খোলা অবস্থায় কাৎ হয়ে এলানো । ভিতরের ল্যাপটপ উধাও । মুহূর্তের জন্য সবকিছু যেন এলোমেলো হয়ে গেল । নিজের কত লেখা, ডাউনলোড করা সিনেমা, গান আর ই-বুকের সম্ভার নিয়ে চলে গেল চোর বাছাধন । কতদিন ধরে অল্প অল্প করে টাকা জমাতে হয়েছে তাকে তার এই সাধের ল্যাপটপের জন্য । কত মুহূর্তের কথা লেখা আছে সেখানে । কত কবিতা, অনুকবিতা, অনুগল্পের সৃষ্টির সাক্ষী এই ল্যাপটপ খানা । চোখে জল এসে গেল ঋকের । নিজের এই বিড়ম্বনাতেও চরম হাসি ছাড়া আর কিছু এলোনা ঋকের । সে খুব ভালো করেই জানে যে তার এই মুহূর্তের একমাত্র করণীয় কাজ একটাই । থানায় ডায়েরি করা । অথচ এখন তাকে যেতে হবে বি.ডি.ও. অফিসে মিটিং করতে । ইলেকশনের কাজ । "না" - বলার বিন্দুমাত্র সুযোগ নেই ওর । উপায়হীন ভাঙা মন নিয়ে ও হাজির হলো মিটিং এ । মিটিং এর কথাগুলো একটাও বসালো না ওর মগজের ধূসর বস্তুতে । বার বার মনে পড়তে লাগলো ল্যাপটপের সাথে হারিয়ে যাওয়া ওর লেখাগুলোর কথা । শব্দ সমষ্টি গুলো ওর সিগারেটের ধোঁয়ার সাথে পাক খেয়ে খেয়ে দূরের মেঘলা আকাশে বিদ্রূপ করে মিলিয়ে যেতে লাগলো ।
আচমকা ঘোর ভাঙলো - স্যার, চা । একটা অতি ছোট্ট কাগজের কাপে অনেক বার ফোটানো লিকার চায়ের স্বাদ নিতে এক ফোঁটাও মন করলো না ওর । এই বি.ডি.ও. কে পৃথিবীর কঞ্জুসতম মানুষ ভাবতেও মানসিকভাবেে অনেক কসরত করতে হয় ঋককে । ইলেকশনের জন্য ব্লকের তহবিলে অনেক টাকা দেওয়া হয় জেলার থেকে । আর প্রতিটি মিটিং বাবদ থাকে রিফ্রেশমেন্ট এর জন্য আলাদা টাকার ব্যবস্থা । অথচ এই স্মিতহাস্যময় আধিকারিকের মন এতটাই কাঙাল ও অভাবী যে প্রতি মিটিংয়ে তিনি শুধুমাত্র ঐ ছোট্ট কাপের চা আর একটা বিস্কুট ছাড়া আর কিছুর বন্দোবস্ত রাখেন না । এইসব অর্থের কোনও হিসাব হয় না । কোথায় কোথায় কার কার পকেট ফুলে উঠছে, সে সব বেশ ভালোই টের পায় সে । এবারের ভোটে কেন্দ্রীয় বাহিনীর আধিক্য ও তৎপরতা অনেকটাই বেশি হওয়ার সম্ভাবনা আছে । সেই ভাবেই বার্তা এসেছে আজকের মিটিং এ । বাহিনীর সহায়তায় জোর কদমে চলছে অতর্কিত অভিযান । অভিযোগ জমা পড়লে অতি দ্রুততার সাথে পরিস্থিতির মোকাবিলা করতে হচ্ছে । এখনও অব্দি ধরা হয়েছে অনেক টাকা, অস্ত্র আর দেশি বিদেশি মদের সম্ভার । টাকা আর অস্ত্র জমা পড়েছে জায়গা মতো । কিন্তু বিলিতি মদের বোতলগুলো সব সেক্টর আধিকারিকদের ও তাদের সাঙ্গোপাঙ্গ দের সুনজরে পড়েছে । ফলতঃ সন্ধ্যে হলেই বসছে রঙিন আসর ব্লকের কোয়ার্টার গুলোয় । অদ্ভুত সব মানসিকতা দেখতে পাচ্ছে ঋক । ভাবনার ঘরের দরজা ভেঙে এমন ভাবে লুঠপাট ও ডাকাতির গল্প এর আগে আর কখনও দেখতে হয়নি ওকে । মিটিং ভাঙতে দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল । এবার থানায় গিয়ে অভিযোগ দায়ের করতে হবে তাকে । ব্লকের স্ট্যান্ড থেকে ম্যাজিক গাড়ি ধরে নিল ঋক ।
আঠারো এক্কে আঠারো
---------------------
বাসায় ফেরার পথে থানায় অভিযোগ দায়েরের কাজটা সেরে নিলো ঋক । আজ আর ওর কিছুই ভালো লাগছে না । কতগুলো টাকা আর লেখা চলে গেলো ওর । চলে গেল ওর শেষ আট মাসের সব পরিশ্রম । ভাবনা গুলো যখনই কিলবিল করতো মাথায়, ল্যাপটপ খুলে বসে পড়তো ঋক । আর এখন !!! ওর একটা ট্যাবলেট আছে স্যামসাং গ্যাল্যাক্সি ব্র্যান্ডের । সেটায় তিলকের একটা ম্যাসেজ এসে ঢুকলো - দাদা গো, কেমন আছো ? প্রত্যুত্তরে ঋক প্রথমে ভাবলো ফোন করবে । তারপর কি যেন মনে আসতেই চুপচাপ সে লিখে ফেলল কিছু লাইন -
স্মৃতিরা ক্ষত বিক্ষত পাঁপড়ি হয়ে
পড়ছে ঝরে ভেজা মনের
স্যাঁতসেঁতে বারান্দায়
রাতভর বর্ষার পরোয়া না করেই
জলফড়িঙের পায়ের ছাপ
অনুসরণের খেয়াল হল সৌদামিনীর
তার ছেঁড়া গীটারের খোলে
ঘর বেঁধে সুখে আছে
প্রজাপতির অনুরাগ
এখনও কি আছে সময়
অকারণ ভালোবাসার
সম্পর্কের রথযাত্রার দড়ি টেনে
দিশেহারা অনেকেই
শুধু একরাশ হাসিমুখ করে
মিথ্যে মিথ্যে কথার খেলা -
"ভালো আছি"
মিনিট পাঁচেকের ভিতরেই ফোনের রিঙটোন্ বেজে উঠলো । তিলক ইজ কলিং - বল্ ভাই !
- দাদা, তোমারও একলা বাঁচার অসুখ বাসা বেঁধেছে মনে !
- কি আর করবো বল্ ! মন খারাপের বৃষ্টির জলে মাপজোক করে স্নান করবো কেন বল্ ভাই ? আমি এত মেপে দুঃখ বিলাস করতে চাইনা রে ।
- তোমার শব্দ গুলো তো কেটে কেটে বসে যাচ্ছে দাদা । জখম হয়ে যাচ্ছি যে ক্রমাগত ! এবার একটু আনন্দ বিতরণ করে মন ভালো করে দাও দাদা আমার ।
- ভাইটি, আমার শেষ আট মাসের সব লেখা হারিয়ে গেছে । ল্যাপটপ আর মোবাইল খোয়া গেছে । এত দিনের মগজ খাটানো এক লহমায় বেকার হয়ে গেল ।
- দাদা, কেন হলো এমন - কি ভাবে হলো - এসব জানতে চেয়ে বিব্রত করবো না তোমায় । শুধু একটাই অনুরোধ রাখছি, আবার ঘুরে দাঁড়াও । এটা তুমি বলেই বললাম ।
- ভাই রে, মনটা আমার সত্যিই ভালো নেই ।
- জানি দাদা, বাড়ি যেতে পারোনি এই সপ্তাহে । ইনফ্যাক্ট আমাদেরই সবাইকেই এই ইলেকশনের কাজে আটকা পড়তে হয়েছে । আমি বুঝি ছেলেকে কোলে তুলে আদর করার আনন্দ কোনও স্কেলেই মাপা যায় না । মায়ের হাতের রান্নার পাশে কোনও ভাবেই মেসের মাসির রান্নাকে তুলনায় আনা যায় না । রাস্তায় যতই সুন্দরী মহিলারা চোখের রেটিনার স্পর্ধা বাড়াক না কেন, ঘরের বউয়ের সাথে শত ঝগড়া ঝামেলা করেও মানিয়ে চলার মাহাত্ম্যটাই আলাদা ।
- ভাই রে, তুই তো সত্যিই অনেকটা বড়ো হয়ে গেছিস । এত ভালো থট রিডিং তো আচ্ছা আচ্ছা জ্যোতিষীও পারবেনা ।
এত সিরিয়াস আলোচনার পরিসরেও হাসি পেয়ে গেল তিলকের
- আচ্ছা দাদা, তুমি নিজের খেয়াল রেখো । একলা থাকো বলে অনিয়মের ঢেউ তুলো না । তোমার উপর আমার অনেক প্রত্যাশা । তুমি, তোমার চোখ, তোমার ভাবনা জাল আমাদের ব্যাচের সবার চেয়ে একদম আলাদা । তুমি আর তোমার ভাবনা অনেক দূর যাবে ।
তিলককে গুডবাই উইশ করে ফোন রেখে দিল ঋক । হাঁটাপথে এগিয়ে গেলো মহানন্দার পথে ।
উনিশ এক্কে উনিশ
--------------
মহানন্দা এখন কল্লোলিনী । বর্ষার নতুন জলে টইটম্বুর । ঋকের খুব ইচ্ছে করছিল স্রোতে নামতে । সে সাঁতার কাটতে পারে খুব সামান্যই । বেশি সময় সে টানতে পারবে না । অগভীর সুইমিংপুলে সে যেন মাইকেল ফেল্পস্ ।
Comments