মানুষের জন্য
খিদিরপুর মুন্সীগঞ্জ রেড লাইট এরিয়া হিসাবেই পরিচিত।
সেখানকার ফাইভ স্টার ক্লাবের দুর্গাপুজো কমিটির সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর দেবীপক্ষের সূচনা থেকে নিরামিষ খাচ্ছেন।
জানালেন, প্রতিবছরের মতো এ বারও পুরোহিতের সঙ্গে দুর্গাপ্রতিমার সামনে বসতে হবে তাঁকে!
দুপুরবেলা ঘুম থেকে উঠে এসে আলসে গলায় জাহাঙ্গীর বললেন, ‘‘সারা বছর সব রকম খাবার খাই তো, তাই এই ক’দিন একটু শুদ্ধ থাকছি। আগে আমার মামা সাহিদ আলি পুরোহিতের সঙ্গে বসতেন। এখন আমি বসি। বুঝতেই পারছেন, বড় দায়িত্ব।’’
ওই পাড়াতেই দেখা হয়ে গেল কোহিনূর বেগম, আয়েশা বিবি, সাবিনা বেগমের সঙ্গে।
জাহাঙ্গীরের বন্ধু বিকাশ রায়ের স্ত্রী পূজার সঙ্গে সিঁদুর খেলবেন তাঁরা। প্রসাদের ফল কাটা থেকে শুরু করে বরণ— অন্য বছরগুলির মতো এ বারও সব কিছুই করবেন একসঙ্গে। ঠিক যেমন জাহাঙ্গীর, সালাউদ্দিন, আল আমিনদের সঙ্গে প্রতি বছর নিয়ম করে ঈদের সময় রোজা রাখেন বিকাশ।
পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক মহম্মদ সালাউদ্দিন লেবারের কাজ করেন। অসম্ভব ঝকঝকে আর স্মার্ট। হাসিখুশি। সালাউদ্দিন বলছিলেন, ‘‘এই যে প্রতিমা দেখছেন, এর ঠিক সামনেই আমরা মহরমের দিন তাজিয়া সাজাই। লাঠিখেলা হয়, ঢোল বাজাই, মিছিল বেরোয়। এই বছর দুর্গাপুজো আর মহরম একসঙ্গে হওয়ায় অনেকে অনেক কথা বলছেন। আমাদের কিন্তু সুবিধাই হয়েছে।’’ কেন? হাসতে হাসতে সালাউদ্দিন বুঝিয়ে দেন, ‘‘আমাদের এটা তো গরীবপাড়া, লোকের হাতে টাকাপয়সা তেমন থাকে না। উৎসব-অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদা ওঠে কম। এবার সবমিলিয়ে দেড় লক্ষ টাকা উঠেছে। ওই টাকা দুই ভাগে ভাগ করে পুজো আর মহরম পালন করছি। একসঙ্গে হওয়ায় খরচ কমেছে।’’
পুজোটা ঠিক কতদিনের পুরনো, নির্দিষ্টভাবে বলতে পারলেন না প্রায় কেউই। জাহাঙ্গীর জানালেন, আশি বছর তো হবেই! তাঁর ঠাকুরদার আমল থেকে শুরু হয়েছে। এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় প্রথম থেকেই প্রধান উদ্যোক্তা তাঁরাই। পাশাপাশি হিন্দুরাও আছেন।
মুসলিম হয়ে এ ভাবে আচার-অনুষ্ঠান মেনে পুজো করেন! সমস্যা হয় না?
জাহাঙ্গীর বললেন, ‘‘মাঝেমাঝে বাইরে থেকে সমস্যা তৈরির চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। তবে আমরা পাত্তা দিইনি কখনও। এই এলাকায় ও সব কোনওদিন ঢুকতে পারবে না।’’ এরপরই তাঁর সংযোজন, ‘‘দাদা, আপনারা বিষয়টাকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখছেন, আমরা তা দেখি না। পুজো, মহরম, ঈদ— সবগুলোই তো উৎসব। আমরা গরীব মানুষ, উৎসবে একসঙ্গে আনন্দ করি।’’
বিকাশ রায় পুজো এবং মহরমের কোষাধ্যক্ষ। তাঁর কাছে রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে বললেন, ‘‘আমি শুনেছি, এতে শরীর সুস্থ থাকে। তাছাড়া বন্ধুরা সবাই রাখে, তাই আমিও রাখি। ভাললাগে। ভাসানে নাচতাম, মহরমের দিন আগে লাঠি খেলতাম, এখন বয়স বেড়েছে তো, তাই শুধু ঢোল বাজাই।’’
সালাউদ্দিন, জাহাঙ্গীর, বিকাশ, আসিফ, আল আমিন, নূরজাহানরা গরীব মানুষ। কেউ সিপিএম করেন, কেউ তৃণমূল। মহরমের দিন রাস্তার উপরে একসঙ্গে পাত পড়বে সবার। শরবত আর ভেজ বিরিয়ানি তৈরি হবে।
সালাউদ্দিন, বিকাশরা জানালেন, উৎসবের সময় যৌনপল্লীতে বাইরে থেকে অনেক মানুষ আসেন। মাংসজাতীয় কিছু রান্না হলে যদি তাঁদের খেতে সমস্যা হয়, তাই ভেজ বিরিয়ানির আয়োজন। নেমতন্ন করলেন আমাকে আর সুমনদাকে। দেখলাম, একচিলতে ক্লাবঘরে দুর্গা মন্ডপ সাজানোর সরঞ্জামের পাশেই রয়েছে তাজিয়া সাজানোর জিনিসপত্র।
দাঙ্গার কথা শুনেছেন নিশ্চয়? পারবেন এভাবে একসঙ্গে থাকতে? কিছুটা যেন বিরক্তই হলেন জাহাঙ্গীর। বললেন, ‘‘আপনাকে বলছি তো বারবার, এমনটাই থাকব আমরা। এটা গরীবপাড়া। আমাদের কাছে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি বন্ধুত্ব। আপনি হিন্দু-মুসলমান করছেন কেন! এই বিকাশ দাঁড়িয়ে আছে, ও আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমার কিছু হলে ও রক্ত দেবে না! ওর কিছু হলে সালাউদ্দিন আসবে না! এমনটা হয় না কি কখনও! আমরা সব একসঙ্গেই করব। এই মহল্লায় বিভেদ ঢুকবে না, সোজা কথা!’’
আমরা শিখেছিলাম, মানুষের কাছে যেতে হবে। কারণ, মানুষই শিক্ষক। আমরা শিখেছিলাম, বাধ্য ছাত্রের মতো নতজানু হয়ে বসতে হবে মানুষের কাছে। শিখতে হবে। যেমন কৃষক পাঠ নেন প্রকৃতির কাছে। আমরা শিখেছিলাম, মানুষ, কেবলমাত্র মানুষই পারে তোমাকে স্নান দিতে। মানুষ, একমাত্র মানুষই পারে সব ক্লেদ মুছিয়ে দিতে আদরে আদরে।
শিখেছিলাম, বাজপাখির ডানার নীচে তোমায় জন্য কোল পেতে রেখেছে মানুষ।
Comments