কেয়ার অফ্ A.R.T.I. শালবনী
কেয়ার অফ্ এ.আর.টি.আই-শালবনী @রাজেন্দ্র
------------------------------------
।। ভূমিকা ।।
---------
আমি রাজেন্দ্র । বাড়ি কলকাতার মফস্বলঃ এলাকায় । কর্মসূত্রে মালদার মানিকচক ব্লকের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের আধিকারিক, বি.এল.আর.ও. অফিসের রেভিনিউ অফিসার ।
অনেকদিন ধরেই আমার একটা শখ ছিল - শিক্ষামূলক ভ্রমণ নিয়ে, নিজস্ব অভিজ্ঞতার নিরিখে, একটা ব্যক্তিগত ডায়েরী লেখার ।
অনেকের মুখেই বিভিন্ন সময়ে একটা খুব মূল্যবান এবং প্রাসঙ্গিক কথা শুনেছিলাম, - যদি মন থেকে গভীর ভাবে কোনও কিছু চাওয়া যায়, তবে নাকি সেই ভাবনা বাস্তবায়িত হওয়ার সম্ভাবনাও তৈরী হয়ে যায়, উপযুক্ত সময় বুঝে । সুতরাং সুযোগও সত্যিই এসে গেলো ।
শোনা গেল, রাজ্যের প্রতিটি জেলায় জেলায়, মহকুমা ভিত্তিক, একটি করে ল' (Law) সেল খোলা হবে জেলার ল'সেলের মতোন, যাতে জেলাস্তরের আধিকারিকদের উপর থেকে কাজের ভার একটু লঘু করা যায় ।
আরও শোনা গেল, সরকার, বিশেষতঃ আমাদের ভূমি দপ্তর নাকি, ভবিষ্যতে আইন নিয়ে কাজ করতে আগ্রহী, ভূমি আধিকারিকদের বিশেষরকম ভাবে আইনি প্রশিক্ষণ দিতে চাইছে । তার কারণ বেশ গভীর ।
মূলতঃ আমাদের দপ্তরের প্রধান উদ্দেশ্য হলো, সিলিং বহির্ভূত অতিরিক্ত জমির মালিকদের জমিগুলোকে, সরকারী অধীনে নিয়ে আসা এবং ল্যান্ড ব্যাঙ্ক তৈরী করে, সেই সব সরকার অধিকৃত জমি, ভূমিহীন কৃষিজীবী মানুষদের ভিতর বিলি বন্টন করে দেওয়া । এই ভাবনা অবশ্যই সংবিধান স্বীকৃত আইন দ্বারা অনুমোদিত ।
সেই জমি অধিগ্রহণ করতে দপ্তরকে সময়ে সময়ে ভেস্টিং এর পথ অবলম্বন করতে হয়েছে । রাজস্ব আধিকারিকদের সংবিধান দিয়েছে বিশেষ ক্ষমতা । সংবিধানের দেওয়া সেই বিশেষ ক্ষমতার প্রয়োগ করতে গিয়ে কখনো কখনো পদ্ধতিগত ত্রুটি বিচ্যুতিও ঘটেছে । আর বিশাল বিশাল জমির মালিকেরা, যাদের অধিকাংশই জমিদার শ্রেণীর প্রতিভূ, তারাও সুযোগ বুঝে শরণাপন্ন হয়েছে জমি সংক্রান্ত ট্রাইবুনাল আদালতের । সেখান থেকে পরবর্তী ধাপে হাইকোর্ট আর সুপ্রীমকোর্টে ।
এইভাবে দেখা গেছে যে, ব্লক স্তরের থেকে দেওয়া রায় মাথায় নিয়ে, অনেকেই ট্রাইবুনাল আদালতের ও পরবর্তী ধাপে হাইকোর্টের দ্বারস্থ হয়েছে । আর মহামান্য আদালতও অনেক সময়েই জমিদারদের পক্ষে দাঁড়িয়ে রায় দিয়েছেন জমির রেকর্ড সংশোধন করে দেওয়ার আদেশনামা সহ । দপ্তরের আধিকারিকরাও অনেকেই বিভিন্ন ত্রুটি বিচ্যুতির কারণে আদালতের রায়ে ভর্ৎসিত হয়েছেন, শাস্তি পেয়েছেন এমন কারণে, যার জন্যে হয়তো তিনি নিজেও ব্যক্তিগতভাবে দায়বদ্ধ নন ।
তাই এই বিশেষ ট্রেনিং এর ব্যবস্থাপনা করেছে আমাদের ভূমি দপ্তর, যাতে আমাদের মতো আইনি কাজে আগ্রহী আধিকারিকেরা সঠিক পদ্ধতি অবলম্বন করি ও আইনি কাজকর্মে বিশেষভাবে প্রশিক্ষণ লাভ করি, যাতে ভবিষ্যতে সরকারি প্রয়োজনে, ট্রাইবুনাল, হাইকোর্ট আর সুপ্রীমকোর্টে গেলে, আমরা সাংবিধানিক পথেই আমাদের শেষটুকু দিয়েও লড়াই করতে পারি জমিদারদের বিরুদ্ধে, তাদের অর্থকৌলিন্যের বিরুদ্ধে ।
__________________
পটভূমি ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার
---------------------
মাস খানেক আগে, জেলার ভূমি দপ্তরের সিনিয়ার দাদা'দের কে আমি অনুরোধ করেছিলাম, আইনি প্রশিক্ষণের সুযোগ বা সম্ভাবনা তৈরী হলে যেন আমার কথা একবার বিবেচনা করা হয় ।
বিবেচিত হলো, আমার নাম গেল কলকাতায় । আর যাদের জন্যে শালবনীতে আমার এই দ্বিতীয়বারের জন্য পা রাখা সম্ভবপর হলো, তাদের অবদান তো আমাকে অতি অবশ্যই কৃতজ্ঞতাস্বরূপ স্বীকার করতে হয় ।
সুতরাং মূল ডায়েরীতে যাওয়ার আগে, আমি অতি অবশ্যই আমার সেই তিনজন প্রিয় দাদাদের নাম সবার আগে রাখবো - অভিজিত দা (অভিজিত রায়), অরুণ দা (অরুণ সামন্ত) আর শুভাশিষ দা (শুভাশিষ চক্রবর্তী) ।
এক এবং একমাত্র, এই তিন দাদার সম্মিলিত ও ঐকান্তিক প্রচেষ্টায়, জেলার আর বাকি পছন্দের মানুষদের নাম টপকিয়ে, আমি আবার পা রাখলাম, লালমাটি আর মোরামে ঢাকা অসাধারণ ক্যাম্পাসে ।
আমার অন্তর থেকে আমি এই তিন দাদার জন্যে সর্বাঙ্গীনভাবে মঙ্গল কামনা করি । প্রার্থনা করি, যেন এনাদের সব ইচ্ছে সময়মত পূর্ণ হয় ।
এবার আসি মূল ডায়েরীর পাতায় । প্রসঙ্গক্রমে: বলে রাখি, এর আগের বারে যখন প্রথমবার শালবনীর মাটিতে পা রেখেছিলাম, তখন ছিলো সেপ্টেম্বর মাস । দুর্গাপূজা আগতপ্রায় । কাশফুলে আর শিউলিতে ছেয়ে গিয়েছিলো মাটি । আকাশে সব সময়েই ভেসে থাকতো ইতস্ততঃ ও বিক্ষিপ্ত, টুকরো টুকরো মেঘ । যেন গোটা আকাশ জুড়ে কেউ কোদাল চালিয়ে রেখে দিত ।
রাতের শালবনী ক্যাম্পাসের উপর দিয়ে বয়ে যেত হাল্কা হিমেল বাতাস । একটু রাত বাড়লেই গায়ে জড়াতে হতো চাদর । এই হাল্কা শীত শীত আমেজটা সকাল আট'টা অবদি রয়ে যেত ।
শাল, ইউক্যালিপটাস, নিম, কাজুবাদাম আর কৃষ্ণচূড়ায় ঢাকা শালবনীর এই অনাবিল রূপ কতবার যে আমি আমার কবিতার লাইনে খুঁজে পেয়েছি, তার কোনও ইয়ত্তা নেই ।
সেই বছর কোনও এক রবিবার বিকেলের শেষে এক মাতালের সাথে কিছুক্ষণ শালবনীর রেলগেটের ধারে বসে আড্ডা মেরেছিলাম । নাম তার রামকিঙ্কর হেমব্রম । শালপাতার ঠোঙায় মশলা ঝালমুড়ি দিয়ে দুর্দান্ত চাট বানিয়ে এনেছিলো সে মহুয়া দিয়ে খাবে বলে । সেই চাট দিয়েই আমরা দুই জনা মহুয়া খেলাম । হেমব্রম দাদা সেই সন্ধ্যায় ইঁদুর মেরে রান্না করবার গল্প করেছিলেন । তুলকালাম নেশা হয়েছিলো আমাদের । পরে আবার সেই রাতেই হস্টেলের কমন্ রুমে বসে ট্যাবে লিখেছিলাম কিছু লাইন, যা এখানে শেয়ার না করে পারলাম না __
পুনর্জন্ম
------
গল্পের শেষে বেহেড মাতালটা যখন
ধেড়ে ইঁদুরের কষা মাংসের চাট
আর ঝালমুড়ি খায়
আমি পোয়াতির মতো 'ওয়াক্' তুলে
একবার ছুটে যাই বেসিনে
আর একবার বাতাস পেতে জানলায়
দম বন্ধ হয়ে আসে কেন আমার এমনটা দেখে
ওর তো কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে
আজ নয় মাস হলো
হয়তো আর মাত্র দশদিন পরেই
ওর ধৈর্য্যের পুনর্জন্ম হবে
অভাবের তাড়নায় এতদিনেও ওর
ক্ষোভের গর্ভপাত হয়নি কেন
মেরুদন্ড কি নেই ওদের
নাকি ভাষা হারিয়ে ফেলেছে ওরা
কিছুদিন আগেই তো কোলের শিশুটাকে
বেচতে হয়েছে ওকে
না না
বেশ করেছে
ঠিক করেছে
আর কেনই বা করবে না
কি দিতে পারত সন্তানকে ও বাবা হয়ে
ওর বাপ ওকে কি দিয়েছে এত বছরে
বাপ মায়ের জৈবিক অস্থিরতায়
ওর মায়ের গর্ভাশয়ের ডিম্বানু
ভেদ করেছিল ওর মাতাল বাপের
একফোঁটা বীর্য্য
বেড়ে উঠেছিলো হতভাগাটা
বাকি সব সম্ভাব্য ভাই বোনেদের টেক্কা দিয়ে
যারা ওর সাথে প্রতিযোগিতায়
টিঁকে উঠতে পারেনি সেই সময়
মরে গিয়েছিলো তারা বাদ বাকি
দুই লক্ষ নিরানব্বই হাজার নয়শ' নিরানব্বই জন
একে একে বাহাত্তর ঘন্টায়
এরপরেও আরো অনেক হাজার হাজার
বাহাত্তর ঘন্টা পার করে এসেছে ওর জীবন
এখনো রোগ আমাশা হতাশা ডিঙিয়ে
ঘর পাড়া এলাকা টপকে রাজ্য ছেড়ে
অন্যত্র পড়ে আছে অন্নের আশায়
হায় অন্ন !
অন্ন তুমি কোথায় ?
এখনও তুমি কোনও হোটেলে
কোন লাটের ব্যাটার কিংবা
বাপের রাজকন্যে আলালের দুলালীর
পাতের উদ্বৃত্ত উচ্ছিষ্ট মাত্র
এখন সবাই নাকি খেতে পায় প্রযুক্তির কৃপায়
না না
কাস্তে হাতে আর ধান কাটা নয়
এখন ওরা খ্যাঁচাকলে ইঁদুর ধরে খায়
-----------------------------
।। ক ।। - ( 02.05.2017 ) / প্রথম রাত /
------------------------------
আজ মঙ্গলবার, দুই হাজার সতেরো সাল; মে মাসের দুই তারিখ । প্রায় আড়াই বছর পর, আজ রাতে আবার এসে উঠলাম, পশ্চিম মেদিনীপুরের জঙ্গলমহলের অন্তর্গত শালবনীর অ্যানালিসিস রিসার্চ ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের ক্যাম্পাসে ।
আঠাশে মে, শুক্রবার, মালদার জেলা অফিস থেকে রিলিজ নিলাম । বাড়ি ফিরে পরিবারের সান্নিধ্যে দিন দু'য়েক বিশ্রামও নিয়ে নিলাম ।
আমাদের কে যে নির্দেশিকা দেওয়া হয়েছিলো, তাতে হাওড়া স্টেশন থেকে পুরুলিয়া এক্সপ্রেস ট্রেন ধরবার কথা সবাইকে বলা হয়েছিলো । আমি সেই মাফিক আগে ভাগেই আসা এবং যাওয়ার টিকিট রিসার্ভেশন করে রেখেছিলাম ।
মালদার দুটো সাব-ডিভিশন । আমার সাথে আমার ব্যাচমেট শুভেন্দু, অভিজিত দা আর অরুন দার নাম গিয়েছিলো । ভেবেছিলাম আমাদের সকলকেই একসাথে শালবনী ঠেলে দেবে । আমরাও এই ভেবে মনে মনে এই আনন্দেই ছিলাম যে আবার একসাথে কিছু বন্ধু আর পরিচিত দাদা'দের কে কাছে পাব ক'টা দিনের জন্য । কিন্তু সেটা সম্ভবপর হলো না । প্রথম ব্যাচে গেল আমার আর শুভেন্দুর নাম ।
যাই হোক, নির্ধারিত দিনে আমরা হাওড়া স্টেশনে এসে উপস্থিত হলাম । পরিচিত কিছু মুখের সাথেও দেখা সাক্ষাৎ হয়ে গেল - আমার ব্যাচের বড়ো শান্তনু ( আমার ব্যাচে তিন জন একই পদবী ধারী তিনজন শান্তনু আছে ), দীপশঙ্কর, প্রবীর গুপ্তা এবং সিনিয়র দাদাদের ভিতরে মনোতোষ দা, মিঠুন দা, শৈবাল আর শ্রীকান্ত দা । আলাপ হলো নতুন কিছু সিনিয়র জুনিয়র দাদা আর ভাই দের সাথেও ।
আমাদের ট্রেন পুরুলিয়া এক্সপ্রেস নির্ধারিত সময়ের থেকেও সাত মিনিট দেরীতে ছাড়লো । আমি দুপুরে দেড়'টা নাগাদ ভাত খেয়েছিলাম । আর ট্রেন ছাড়লো প্রায় চার ঘন্টা পরে । সুতরাং খিদেটা অল্প স্বল্প পাচ্ছিলো । বাদাম ওয়ালা দিয়েই শুরু করলাম । শেষ করলাম গরম গরম ঘুগনী দিয়ে । সবার শেষে হাফ বোতল জল ।
সময় যেন দেখতে দেখতেই পার হয়ে গেল । শালবনী স্টেশনে এসে নামলাম প্রায় সাড়ে সাতটায় । আমাদের জন্যে এসেছিলো ট্রেনিং সেন্টারের নিজস্ব বাস আর গাড়ি এসেছিলো ।
স্টেশনে নেমে মেজ শান্তনুর সাথেও দেখা হয়ে গেল । আর আমাদের বাচ্চা শান্তনুটা তো বীরভূমের বোলপুরে পোস্টিং । ওর আর আসা হয়নি এ যাত্রায় । মাঝে খড়্গপুর থেকে গোবিন্দটাও আমাদের সাথে জুড়ে গেল ।
সবাই মিলে গল্প করতে করতে পৌঁছে গেলাম ক্যাম্পাসের প্রধান গেটে । সেখানে আমাদের নাম-ধাম-উদ্দেশ্য-ফোন নম্বর, এসব যাবতীয় তথ্য নিয়ে নেওয়া হলো । তারপর পড়লো লম্বা লাইন করে অ্যালোটেড ঘর গুলোর চাবি নেওয়ার পালা ।
যে যার ঘরে পৌঁছে গেলাম । আমার সাথে মালদায় পোস্টেড, ব্যাচমেট শুভেন্দুর সম্ভবতঃ আমার সাথে থাকার প্রতি অনীহাই ছিলো । সেই উদ্বেগটা আবার ও বড়ো শান্তনুকে আমার সামনেই প্রকাশ করেছিল । কিন্তু ঐ যে, কথায় বলে, যেখানে বাঘের ভয়, সেখানেই নাকি সন্ধ্যে হয় । বিধির বোধ হয় একটু আলাদা রকমের ভাবনা ছিল । শালবনীর প্রশাসন বোধহয় বিধাতার ইচ্ছেতেই মনের কথা আগেভাগে পড়ে, শুভেন্দুর মানসিক প্রার্থনা নাকচ করে দিয়ে, তাকে আমার সাথে, এক ঘরে রুম শেয়ার করে থাকার জন্যে, সীলমোহরে ছাপ মেরে দিলেন ।
আমি শুভেন্দুকে বললাম, যে তার যদি আমার সাথে থাকার সমস্যা হয়, তবে যে রুম বদলিয়ে নিতে পারে অন্য কারো সাথে । আমার কারো সাথে কোনও সমস্যাই নেই । আর ভবিষ্যতেও হবেনা । তা যে কারণেই হোক, শুভেন্দু আর ঘর বদল করলো না ।
মেজ শান্তনু পুরুলিয়ার মানবাজারে পোস্টিং । ও জানালো গত রাতে নাকি ভয়ানক ঝড় বৃষ্টি হয়ে গেছে ওর নিকটবর্তী এলাকাগুলো তে । তাই হয়তো এলাকায় গরম ভাবটা এখন অনেকটাই কমে এসেছে ।
এখানে আসার কিছুক্ষণ পর থেকে থেমে থেমেই ফাটছিল বোমা গোছের বেশ উঁচু শব্দের পটকা । এখনো মাঝে মাঝেই সেগুলো ফাটছে । কারণটা জানতে পারলাম ক্যান্টিনের ছেলেগুলির কাছ থেকে ।
এদিকটায় নাকি অবাঞ্ছিত ভাবে হাতির পালের সংঘবদ্ধ উৎপাত বেশ বাড়াবাড়ি রকমের । মাঝে মাঝেই ওরা দলবেঁধে হামলা করে এই দিকটায় । আজকেও করেছে । আসল ব্যাপার হলো ক্ষেতে লাগানো ফসলের উপর ওদের নজর । জঙ্গলে খাবারের অভাব বোধ হলেই ওরা মানুষের নিকটবর্তী হয়ে উঠতে চায় ।
রাতের মেনু ছিলো ডাল ভাত পাঁপড় সয়াবিন চিকেন । ডিনার সেরে, বোতলে জল ভরে, আমাদের আবাসিক হোস্টেলের সামনের আড্ডা মারার কমন্ রুমে এসে বসতে না বসতেই একটা ঝোড়ো হাওয়া উঠলো ।
আমাদের হস্টেলের চারপাশ জুড়ে শালগাছের আধা নিবিড় জঙ্গল । বড়ো বড়ো শালপাতা গুলো হাওয়ার তালে তালে ক্রমান্বয়ে সোঁ সোঁ শব্দ করে চলেছে ।
হস্টেলের প্রধান প্রবেশদ্বারের মুখ থেকে মোরাম দেওয়া রাস্তার দুই পাশ জুড়ে জ্বলছে ভেপার আলোর বাতিদান । আলোর রঙটা একটু সোনালী হলদে গোছের । শাল আর ইউক্যালিপটাসের পাতা আর ডালপালায় মেখে আছে আলো । মোরামের নুড়ি গুলো বিনদাস ছড়িয়ে ছিটিয়ে ইতিউতি পড়ে রয়েছে ।
আমার আর শুভেন্দুর রুম নম্বর ছিলো চোদ্দ । একতলায়, হস্টেলের বামদিকে । এই দো'তলা আবাসনে উপর নীচ মিলিয়ে মোট ঘর সংখ্যা বত্রিশ । আর প্রতি রুমে দুইজন, কোথাও বা তিনজন অবদি থাকতে পারে । আমার রুমের সামনে রয়েছে টানা ব্যালকনি । আর ঘরের পিছনেও রয়েছে একটা ছোট্ট বারান্দা গোছের । রুমের সামনে আর পিছনে রয়েছে মুক্ত প্রকৃতি । কাজু নিম শাল ইউক্যালিপটাস ।
রাতের মাটিতে হাল্কা হিমের চাদর পড়ে সারা বছর জুড়েই কম বা বেশী ।
নাহ্, এবার থাক্ । আর না । গল্পে গল্পে রাত হলো অনেক । এবার একটু ঘুমাতে চেষ্টা করি । আগামী কাল ট্রেনিং এর প্রথম দিন । সকাল দশ'টা থেকে নামের রেজিস্ট্রেশন শুরু হবে । কলকাতা থেকে ডাইরেক্টর সাহেব আসবেন । সাথে আসবেন অ্যাডিশনাল ডাইরেক্টর ম্যাডাম্ ।
শুয়ে তো পড়েছি মশারী টাঙিয়ে । কিন্তু ঘুম আর আসে না । আমার খাট খানা আমি টেনে সিলিং ফ্যানের নীচে নিয়ে এসেছি একটু বেশী হাওয়া পাবো বলে । কিন্তু ঘুম আর আসছে কই । তাও ভালো যে এটা রাতের বেলা । দিনের বেলা হলে এত শব্দ খরচ করে লেখা ছুটেই যেত আমার ।
যাইহোক্, আবার আগামী কাল এই দিনলিপি লেখার প্রয়াস করবো ( যদি সময় সুযোগ পাই ও মন চায়; তবেই __ )
- আপাততঃ সকলকে শুভরাত্রি । সকলে ভালো থাকবেন ।
_________________________
।। খ ।। - ( 03.05.2017 ) / প্রথম দিন /
------------------------------
এখন সকাল পাঁচটা বেজে চল্লিশ । আমার ঘুম ভেঙে গেছে প্রায় মিনিট কুড়ি আগে । বিছানাতে শুয়ে শুয়েই এমন নিম্নচাপের বেগ এলো যে ঘুম ভেঙে উঠেই প্রাকৃতিক আহ্বানে সাড়া না দিয়ে পারলাম না ।
ফ্রেশ হয়ে আমাদের জন্যে নির্দিষ্ট ঘরের পিছন দিকের দরজাটা খুলে দিতেই একরাশ হাল্কা নরম তুলতুলে মিষ্টি হাওয়া ছুটে এলো আমার দিকে ।
কাল খালি গায়ে মশারি খাটিয়ে শুয়েছিলাম । মশারিটা এখানে খুব জরুরী একটা সামগ্রী । সাধারণতঃ মশারি জিনিসটার উপর আমার সেই ছোটবেলা থেকেই একটা সহজাত অ্যালার্জিও আছে । একে ঠিক ঠাক করে টাঙানো আর ভাঁজ করার কসরৎ যে শব্দজব্দের ধাঁধার থেকে কিছুমাত্র কম নয়, তা বোধহয় আমার থেকে ভালো আর কেউ জানে না ।
এর আগে প্রথমবারের মতোন এখানে যখন এসেছিলাম, সেবার একটি হতচ্ছাড়া পোকা আমার গলার ডানপাশে এমন কোনও একটা কম্মো করে গিয়েছিলো, যে ঐ অংশটি সম্পূর্ণরকম ভাবে জ্বলে পুড়ে গিয়েছিলো । তারপর অনেক সাধ্য সাধনা করে অনেকটা সময় নিয়ে সারাতে হয়েছিলো আমাকে সেই পোড়া দাগ ।
তাই ঘরপোড়া গরুর মতো এবার আমিও আগেভাগেই বেশ সতর্ক । গতকাল রাত্রেই না জানি কেমন করে, শুভেন্দুর বিছানায় টাঙানো মশারীর ভিতর, মোটাসোটা গোছের বিষ পিঁপড়ে ঢুকে পড়েছিল । সুতরাং কিছু থাক না থাক, মশারি একেবারে মাস্ট । ঘরের খোলা জানলা দিয়ে একটা হাল্কা মিষ্টি হাওয়া ফুরফুর করে ঢুকছিলো । আমার খালি গায়ে একটা হালকা শির্ শিরানি গোছের ভাব আর কি ।
মনটাও একেবারে ফুরফুরে হয়ে গেল রাঙামাটির দেশের ভোরের এই হাওয়ার গুণে । চোখটা এখনো অল্প স্বল্প জ্বালা জ্বালা করছিলো । ঘুমটা হয়তো আরও একটু দরকার । আর আজ তো সবেমাত্র ট্রেনিং এর প্রথম দিন । সকাল দশটা থেকে শুরু হবে রেজিস্ট্রেশন এর মতো প্রাথমিক কাজ । সুতরাং আরও ঘন্টা দুই তিন চোখ বুঁজে শুয়ে থাকলেই বা মন্দ কি !
এখানে তো আর অফিস যাওয়ার বা বাজার করবার তাড়াহুড়ো নেই । খাও দাও, যতখুশি ঘুমাও, লেখাপড়া করো, আড্ডা মারো, এনজয় করো । অতএব আসুক না খোলা জানলা বেয়ে, শাল আর ইউক্যালিপটাসের দেহ ছুঁয়ে, ঠান্ডা মিষ্টি হাওয়া । দুই চোখ ভরে সবুজের দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে আর ইউক্যালিপটাস পাতার ঘ্রাণ নিতে নিতে চোখের পাতা আবার লেগে গেলো ।
সুতরাং আপাততঃ বিরতি নিলাম । পরে না হয় আবার সময় সুযোগ বুঝে বসে পড়বো লিখতে । আপাততঃ এখনকার জন্যে বিদায় ।
- সকলকে সুপ্রভাত ।
।। গ ।।
বেলা প্রায় দশটা । ঘরের বাইরে টন্ টন্ করছে রোদের আগুনমাখা ঝলক । ঝলসানো তাপে চারপাশ যেন জ্বলছে । আর একটু পরেই লাল মোরামের পথে দুপাশের শাল নিম আর ইউক্যালিপটাসের মাঝখান ধরে হেঁটে ঢুকে পড়বো এয়ার কন্ডিশনড্ ক্লাসরুমে ।
অথচ ঘন্টা খানেক আগেই ঘরের পিছনের দিকের কোনও একটা গাছের মাথায় কোকিল ডাকছিল তারস্বরে । এখন আর ওর পাত্তা নেই । দুই একটা প্রজাপতিও এদিক ওদিক করছিল কিছুক্ষণ আগে পর্যন্ত । এখন ওরাও হাওয়া ।
কোথায় যে গেল বেচারিরা কে জানে ! মনে হচ্ছে সহচরী বান্ধবীদের সাথে চুটিয়ে টাইমপাস্ করছে । এই সময় কোকিলের ডাক ভাবাই যায় না কলকাতায় ।
সমস্ত দিন ধরে আগুনের হলকা চলবে এখন । চলবে ক্লাস; আর ক্লাসের ফাঁকে ফাঁকে চা পানের বিরতি ।
আর আমাদের এখন আইনের নিয়ম কানুনের সাথে স্বনির্বাচিত ও খানিকটা বাধ্যতামূলক সহবাস করতে হবে । এই বৈপরীত্য আছে বলেই জীবনটাকে জীবন বলে ভ্রম হয় কখনো সখনো । সবাই কে সারা দিনটা ভালো কাটানোর জন্যে আগাম শুভ কামনা রইলো ।
।। ঘ ।।
এখন সবে বেলা সোয়া এগারোটা । অথচ মনে হচ্ছে যেন বেলা দুটো । এ.সি. ক্লাসরুমের বাইরে একটু বেরিয়েছিলাম টি ব্রেক আওয়ার্স এ । খালি মনে হচ্ছে, কেউ যেন বালতি উপুড় করে আগুন ঢেলে দিয়ে যাচ্ছে । গন্ গনে আঁচের কাঠ কয়লা আর ঘুঁটের উনোন এ সেঁকতে সেঁকতে ক্লাসরুমে এসেছি ।
স্নান করে এসেছি বটে । তবে গায়ের চামড়া যেন পলক ফেলার আগেই শুকিয়ে বালির চড়ায় পরিণত হয়েছে ।
কোনমতে এক মিনিটের ভিতর তিন চুমুকে চা শেষ করেই আবার ক্লাসরুমে গ্যারেজ হয়ে গেছি ।
চারপাশের গাছগুলোর সব পাতা স্থির । সময় যেন রুদ্ধশ্বাসে থমকে গেছে । এখানে যেন মাটি বলে কিছু নেই । যা আছে, তার সবটুকু যেন নানা রকমের লাল রঙের রকমারি বাহার ।
কোথাও হাল্কা কোথাও গাঢ় রঙের মোরাম । মাঝে মাঝে একটা গরম হলকা বাতাস নিজের মতো করে বয়ে যাচ্ছে । ঘন্টা খানেক দুটো একটা কুকুর চোখে পড়েছিলো বটে । এখন তারাও সব উধাও ।
শাল ইউক্যালিপটাসের গোড়ায় কোথাও কোথাও বিশাল লাল মাটির ঢিপি । বোধহয় কোনও একসমই উই এর পাল দল বেঁধে সেগুলো নির্মান করেছিল । এখন সেগুলোর সবকটাই প্রায় চন্দ্রবোড়া সাপ আর বিছেদের আস্তানা ।
বিছে এখানে দুই রকম দেখেছিলাম এর আগের বার । সেবার একটা বড়োসড়ো গোছের তেঁতুলবিছে পাইপ বেয়ে আমার দোতলার রুমের বাথরুমে চলে এসেছিল সন্ধ্যা নাগাদ ঘুরতে ঘুরতে । ভাগ্যিস ওটাকে দেখে ফেলেছিলাম । নয়তো বিছানায় এসে উঠে পড়তে দেরী করতো না হতভাগাটা । একটা ঝাঁটা জোগাড় করে ওটাকে আবার বিদেয় করে দিয়েছিলাম সেদিন । প্রাণে মেরে ফেলতে পারিনি । নিজের প্রাণ তো আমাদের সবারই প্রিয় । তবে ওই হতচ্ছাড়াটাই বা কি দোষ করলো । তাই ওর জীবনের অধিকার সেদিন কেড়ে নিতে পারিনি ।
আর দেখেছিলাম কাঁকড়াবিছে । সেই মহাপুরুষ অবশ্য এসেছিলেন একটু রাত করেই । আমরা সেদিন ডিনার সেরে একতলার খোলা বারান্দায় আড্ডা দিচ্ছিলাম । এখন আমি যেই রুম এ আছি তার ঠিক আগের ঘরের সামনের বারান্দায় উনি কারো একজনের পায়ের চপ্পলের কাছে এসে উসখুস করছিলেন । তেনাকেও ঝাঁটার সাহায্যে নালা দিয়ে বের করে বাইরে ফেলা হয়েছিল অনেক কসরতের শেষে ।
এই ফাঁকে সাপ নিয়েও গতবারের অল্প কিছু অভিজ্ঞতা শেয়ার করি । সকালের দিকে আমাদেরকে ফিল্ডে সার্ভের কাজ করতে হত । সমস্ত ব্যাচমেটদের কয়েকটা গ্রুপে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল । এমনই একটা ব্যাচে ছিল পাসাং শেরপা ।
আমরা মাপজোকের কাজ করে যে যার টেবিলে এসে জড়ো হতাম । শাল আর ইউক্যালিপটাসের ছায়া খুঁজে খুঁজে এদিক সেদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসে থাকতাম । নানা রকমের ভালো মন্দ সুখ দুঃখের গল্প চলতো আমাদের । কেউ কেউ নতুন বান্ধবীদের সাথেই মশগুল হয়ে যেত । কেউ বা মোবাইলে । আমি বসে বসে নানা রকমের ছড়া কাটতাম ।
এই রকমই একদিন আমি বসে আছি একটা গাছের ছায়ায় । হঠাৎ একটু হৈ চৈ শুনে মুখ তুলে তাকালাম । দেখি পাসাং এর চারপাশে জড়ো হয়েছে আমাদের কিছু পোলাপান । পাসাং খানিকটা উত্তেজিত কিছুটা উৎসাহিত । ভয় ডর বলে তো ওর ভিতর তেমন কোনও বস্তু নেই । ওর মুখে জানলাম, কোনও একটা কাঁটাঝোপের পাশে দাঁড়িয়ে, ও মনের সুখে প্রকৃতির ডাকে সাড়া দিয়ে জল ত্যাগ করছিলো । আচমকা ঝোপটা নড়াচড়া করে ওঠায় ও সতর্ক হয়ে যায় । দেখে একটি চন্দ্রবোড়া সাপ আড়মোড়া ভাঙছে । বেচারা বোধহয় একটু শীতঘুমের আয়োজন করেছিলো । ঘুমের ব্যাঘাত ঘটালো পাসাং এর হিসির জলধারা ।
আমি নিজেও অনেকবার সাপের ছেড়ে দেওয়া খোলস দেখেছি মাঠে সার্ভের সময় । কিন্তু জলজ্যান্ত সাপ দেখার সৌভাগ্য হয়নি একবারও ।
আর একবার একটা ভয়ানক ঝামেলা হয়েছিলো অতনুর সাথে দেবাশিস পান এর । সেবার আমি অবশ্য অতনুকেই সাপোর্ট করেঠিলাম ।
পান সেবার নীল ফনাওয়ালা একটা বাচ্চা কোবরা সাপকে অকারণে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলেছিলো । সাপটা ওদের চলার পথে বাধাও দেয়নি । বরং অতজনের পায়ের শব্দ শুনে ভয় পেয়ে অন্য পথ ধরে পালাতেই চেয়েছিলো । পানকে বারবার নিষেধ করেছিলো অনেকেই । তবুও পান শোনেনি । অতনু জানিয়েছিলো যে ঐ নীল মাথার কোবরা সাপটা ছিলো বিরল প্রজাতিভুক্ত, অর্থাৎ এনডেনঞ্জার্ড স্পিসিস্ । সেই নিয়ে একটা বড়োসড়ো গোলমালও পেকেছিলো আমাদের দলের ভিতর ।
সময় বয়ে চলেছে । অতীতের স্মৃতি আর বর্তমানের সময়ের কাঁটার মাঝে পেন্ডুলামের মতো আসা যাওয়া করছি । জানিনা, কার কেমন লাগছে এই খোলা ডায়েরী পড়তে ।
পড়তে থাকুন । ভালো থাকুন ।
- সকলকে শুভ দ্বিপ্রাহরিক শুভেচ্ছা ।
।। ঙ ।।
সারা দিন ক্লাস সেরে এইমাত্র ঘরে এলাম । মাঝে দুইবার মতো বিরতি দেওয়া হয়েছিলো । এখন রাত সোয়া নয়টা । নিঝুম ক্যাম্পাস জুড়ে আজ এক ফোঁটাও হাওয়া নেই কোথাও । সব গাছের পাতা থমথমে মুখ করে গোমরাথেরিয়াম সেজে দাঁড়িয়ে ।
সবারই চোখে মুখে চরম ক্লান্তির ছাপ । ডাইনিং হলে ডিনার সার্ভ করা শুরু হয়ে গেছে । আমি রুমে ফিরে এসে প্রথমেই স্নান করে ফেললাম ।
সেই সকাল থেকে একটানা এ.সি. তে বসে থাকা, আমার কাছে মোটেই শান্তির নয় । মানছি যে বাইরে চারপাশ জুড়ে আগুনের হলকা বয়ে চলেছে নিরবিচ্ছিন্ন ভাবে, কিন্তু দুপুরে মাটন ভাত সহযোগে মহাভোজ দিয়ে পেটপুজোর পরে এ.সি. রুমে বসা মানেই চোখের পাতাজোড়া একে অন্যের সাথে লেগে আসার সম্ভাবনা খুব প্রবল । আর সেই ভাতঘুম কে অগ্রাহ্য করে এ.সি. রুমে বসে থাকাটা একটা বিরাট মাপের শাস্তি গোছেরই ব্যাপার, অন্ততঃ আমার কাছে তো বটেই ।
যাদের এমন পরিবেশে চোখে ঘুম লেগে আসে না, হয় তারা হতভাগ্য অভাগার দল, নয় তারা মহাপুরুষের সন্তান সন্ততি । ধন্য তাদের বীর্য্যবান পিতারা । তাদের চরণে আমার অযুতকোটি প্রণিপাত ।
রাত বাড়ছে । আর তার সাথে পাল্লা দিয়ে খিদেও । আমি আর কালবিলম্ব না করে ডিনারে চলে গেলাম । আজ রাতের মেনুকার্ডে মাছ দেখতে পাচ্ছি । নাহ, এবার শালবনীর ক্যান্টিনের পরিষেবা ও খাদ্যগুণের মান অনেকটাই উন্নত দেখতে পাচ্ছি ।
এর আগের বার শালবনীর ক্যাম্পাসে যে গুণমানের খাবার সার্ভ করা হতো, তা ছিলো রীতিমতো নিম্ন-মাঝারি মানের । সকালের চা পানের পর ব্রেকফাস্টে আসতো ডিম, প্রায় অনেকটাই কাঁচা শক্ত গোছের পাঁউরুটি, কলা আর মিষ্টি । আমরা পাঁউরুটি গুলোকে তন্দুরী চিকেন ভেবে টেনে টেনে ছিঁড়ে খাওয়ার চেষ্টা করতাম । আর এর জন্যে চোয়ালে ব্যাথা হত, আর প্রায়ই পেটের গোলমাল হতো । আড়াই বছর পার করেও সেই স্মৃতি এখনো টাটকা জেগে রয়েছে মনের গভীরে কোনও এক কোণায় । এখান কার মাটি বাতাসের প্রতি ভালোলাগা, গাছপালা আর পাখির ডাকের উপর মায়া কখনোই ভুলবার জন্যে নয় ।
তবে খেয়ে দেয়ে আজ আর আড্ডাবাজি হবে বলে মনে হচ্ছে না । সবাই বেশ ক্লান্ত । আমিও খাওয়া মিটিয়ে ঘরে এসে আমার অপ্রিয়তম কাজটা সেরে ফেললাম, মশারিটা টাঙালাম আগের দিনের মতো ।
আর টানতে পারছি না । চোখের পাতাগুলো লালচে, হাল্কা জ্বালাও করছে । ভারী হয়ে এসেছে ওরাও । এবার শুয়ে পড়ি । কাল তো আবার সেই ভোর থেকেই রগড়ানো শুরু ।
- সকলকে আজকের মতন শুভরাত্রি ।
________________
।। চ ।। - ( 04.05.2017 )
-------------------
আজকেও ঘুমটা বেশ ভোর ভোরেই ভেঙে গেছে । উঠে ট্যাব অন করে দেখি সাড়ে পাঁচটা প্রায় । আজ সকাল নয়টা থেকে পুরোদমে ক্লাস শুরু ।
আজকের থেকে আর বোধহয় লেখালেখির সময় সুযোগ পাবো না বন্ধুরা । আমার ঘরের খোলা জানলা বেয়ে হাল্কা ঠান্ডা একটা বাতাস বয়ে আসছে । কোকিল ডাকছে আশে পাশেই কোথাও ।
এখানে যে ভোরে বসন্তসখা এসে সময় কাটিয়ে যায় কিছুক্ষণ, তা গতকালকেই বিলক্ষণ টের পেয়েছি । আর আছে হলুদ রঙের কমলা ছোপের লালচে গোছের প্রজাপতি । এমন গরমেও সবচেয়ে কেয়ার ফ্রি বোধহয় ওরাই । অবাক হইনি । কারণ এটা শালবনী । এখানে ভোরের ও রাতের প্রকৃতি এতটাই রোম্যান্টিক, যে অসংখ্যবার অসংখ্য ভাবে বললেও এর সঠিক বর্ণনা করা আমার কলমের আঁচড়ে সম্ভব নয় ।
আমি আর কালবিলম্ব না করে বিছানা ছেড়ে দিলাম । এবার ফ্রেশ হয়ে চা পান । তারপর একটু গত কালকের ক্লাসের নোটস্ গুলো দেখা _ কিছু আইনের ধারায় পাশাপাশি চোখ বোলানোর চেষ্টা আর কি ।
আমাদের বলা হয়েছে যে ট্রেনিং এর শেষদিন পরীক্ষা নেওয়া হবে । সেখানে যারা বিশেষ বুৎপত্তি দেখাবেন, তাদের নিয়ে সরকার আবার বিশেষ ভাবে চিন্তা ভাবনা করবে । বিশেষতঃ তাঁদের জমি সংক্রান্ত আইনি জ্ঞানের উপযুক্ত ব্যবহার করবেন ।
রাজ্যের প্রায় সব কটি ব্লকেই, দপ্তরের আধিকারিকদের কাজকর্মের বিরুদ্ধে, অনেক রায়তই ট্রাইবুনাল, হাইকোর্ট বা সুপ্রীম কোর্টে গিয়ে সুবিচার দাবী করেন । সেখানে নানা রকম ভাবে, বিভিন্ন কারণে, আমাদের আধিকারিকরা, বিভিন্ন সময়ে, ভীষণ রকম ভাবে বিপদে পড়ছেন, অপদস্থ হচ্ছেন ।
আমাদের রাজস্ব আধিকারিকবৃন্দ বড়ো বড়ো জমিদার জোতদারদের জমি জায়গা ভেস্টিং করে দিয়েছেন বিভিন্ন সময়ে আইনের বিভিন্ন ধারা প্রয়োগ করে । তার ফলশ্রুতি হিসেবে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতন ধেয়ে ধেয়ে আসছে, একের পর এক কোর্ট কেস ।
ভাবতেই অবাক লাগে । একদিকে সংবিধানে বলা হচ্ছে ভূ- সম্পদের সুষম বন্টনের কথা । আবার এই পরিপ্রেক্ষিতে, সরকার জমি ধরে রাখার সীমাবদ্ধতা নির্দিষ্ট করে দিয়ে, সিলিং বহির্ভূত জমি ভেস্টিং করে খাস সম্পত্তি করে নিলে, জমিদারেরা আইনের শরনাপন্ন হচ্ছেন । আর আইনের হর্তা কর্তা বিধাতাদের একটা বিরাট অংশ জমিদার বংশোদ্ভূত হওয়ার কারণে জটিলতা আরও বেশি বেড়ে চলেছে; রাজ্য সরকারকেও অনেক ক্ষেত্রেই ব্যাকফুটে চলে যেতে হয়েছে আইনি ধাক্কায় ।
আর সেই আইনি ঝড়ে, ঢেউয়ের ক্রমাগতঃ আক্রমণাত্মক ধাক্কায় আমাদের দপ্তর মাঝে মধ্যেই খাবি খাচ্ছে । এখন তাই দপ্তর উঠেপড়ে লেগেছে বিশেষজ্ঞ নির্মানে, যারা সমুদ্রের বুকে খুব সহজেই সুদক্ষ নাবিকের মতো দপ্তরের বিশালকায় জাহাজকে টেনে ঠিকমত গন্তব্যস্থলে নিয়ে যাবে, দিশাহীনতায় পথ দেখাবে ।
আমাদেরকেও এই বিশাল দায়িত্বের কিছুটা হয়তো আগাম ভবিষ্যতে নিতে হবে । সুতরাং আর বিলম্ব করছি না । এখন আপাততঃ রাখলাম । ভালো থাকবেন বন্ধুরা ।
- সকলকে সুপ্রভাত ।
______________________
।। ছ ।। - ( 05.05.2017 ) / লিগ্যাল ম্যাটার্স ট্রেনিং এবং তারপর ...../
---------------------
সরকারী কোষাগার থেকে প্রাপ্ত অর্থের সদ্ব্যবহার করছে আমার দপ্তর । ল্যান্ড ল' সংশ্লিষ্ট সিভিল কোর্ট সংক্রান্ত মামলা গুলোকে কি ভাবে সামাল দেওয়া যেতে পারে, তারই ক্লাস করছি আমরা তিন বেলা । কালকেও রাত আট'টার পরে ছাড়া পেলাম । রোজ বারো ঘন্টার ক্লাস্ শিডিউল্ । মাঝে মাঝে ছুটকো ছাটকা টুকটাক বিরতি ।
আর এই ট্রেনিং অন্তে, আবার ব্লকে ফিরে গিয়ে, সব কিতাবী আইন আর কোর্ট কেস রেফারেন্স গুলোকে, সম্পূর্ণভাবে ভুলে মেরে দিয়ে, সেই আগের মতো বাসি কালি দিয়ে কলমের আগা রগড়ানো । পাবলিকের ডিমান্ডে নেতা দাদা দের সামাল দিয়ে অনলাইন মিউটেশনের আলুসিদ্ধ মাখা চটকানো ।
কে কতগুলো মিউটেশন কেস ঘষটিয়ে ডিসপোসড্ করতে ফেলতে পারে, তারই হিসেব রাখবে জেলার সর্বোচ্চ প্রশাসন । আর এই ছয় সাত দিনের পিলে চটকানো মাথা রগড়ানো ট্রেনিং এর ধামাকা ধীরে ধীরে আবার ফিকে হয়ে যাবে । পড়ে যাবে ধূলো । লেগে যাবে মরচে ।
ভাবলেও হাসি পায় । জেলার নির্দেশিকা চলে কলকাতা বাসী ঠান্ডা ঘর নিবাসী প্রোমোটেড্ আই.এ.এস. এর তদারকি তে, যারা আদৌ নির্ভেজাল ভাবে আমাদের সার্ভিসের নয় । তারা শুধুই জানে কাকে কোথায় কি ভাবে কতখানি তেল মর্দন করলে নিজের পোস্টিং টা বছরের পর বছর একইভাবে একস্থানে ফেলে রাখা সম্ভব হবে ।
নিজেরাও যেমন, আশা আকাঙ্খাও তাদের তেমন । আমাদের সার্ভিসের পন্ডিতেরা অ্যাসোসিয়েশন গত ভাবে বহুধা বিভাজিত । আর এই সাংগঠনিক বিভাজনের ফায়দা তুলে, লুটে পুটে খাচ্ছে মুষ্টিমেয় কিছু মানুষ, যারা নিজেরা অঘোষিত অথবা স্বঘোষিত নেতা ।
তারা নিজেরা সুবিধাজনকভাবে যে কোনও মূল্যে তাদের নিজেদের আখের গোছাতেই শুধু ব্যস্ত - সংগঠনের নেতা হওয়ার সুবাদে ঘরের কাছে পোষ্টিং, অন্য জেলায় ট্রান্সফার নিয়ে এলে সেখানেও জেলা বা সদরের অফিসের কোলে বসে বসে তেল চুপচুপে তেলভাজা চানাচুর খাওয়া - ব্যস্ _ এই টুকুই ।
আর এর খেসারত গুনছি আমরা বাকী অবশিষ্টরা, যারা নেতা হতে চাইনা _ দলবাজি আর তেল মাখানোর কাজটা নির্লজ্জের মতো করতে যাদের বিবেকে বাধে, তারাই সব চেয়ে বেশী ভুগে চলে অবসর জীবন না আসা অবদি ।
আমরা সবাই যদি রাজস্ব আধিকারিক হয়েই থাকি, তবে এত সংগঠনগত ভেদাভেদ কিসের ? কেন আমরা আমাদের বিভেদগত ধারণাগুলোকে বিসর্জন দিয়ে একসাথে একপথে চলতে চাই না ? কি আমাদের নিজস্ব ব্যক্তিগত স্বার্থ ? হ্যাঁ, সে তো একটা কিছু অবশ্যই আছে - প্রাপ্তিযোগ । তবে এই নেতার সংখ্যা তো খুব একটা বেশী কিছু নয় । তবে আমাদের কিসের এত দ্বিধা দ্বন্দ্ব আর ভয় ? কেন আমরা পারছিনা সব বিভেদের রাজনীতি ভুলে একসাথে এক ছাতার তলে মিলে মিশে একাকার হয়ে যেতে ?
এই বিভাজনের ফল খেয়ে নিচ্ছে আমাদের বিমাতারা, যাঁরা আমাদের মাথার উপর বসে ছড়ি ঘোরাচ্ছে অহরহ । তাঁদের কিন্তু একটিমাত্রই সবেধন নীলমনি সংগঠন । তাঁরা কিন্তু আমাদের মতো বহুধাবিভক্ত নন । তাঁদের একতার তেজ প্রবল এবং প্রখর ।
রাজ্য সরকার নির্বাচিত এইসব হাফপ্যান্ট এক্সিকিউটিভ আমলাদেরকে ( যাঁরা রাজ্যস্তরের সিভিল সার্ভিস পরীক্ষায় মাত্র একটা ঐচ্ছিক বিষয়ে অতিরিক্ত কিছু নম্বর কুড়িয়ে কাচিয়ে নিয়ে এসেছেন ) মাথায় বসিয়ে রাখলে কি কখনো আমাদের দপ্তরের উন্নতি হবে ? দপ্তরের উচ্চপদস্থরা যদি দপ্তর থেকেই প্রমোশন পেয়ে উঠে আসেন, তবে কি তা আনন্দের নয় ? কাম্য নয় ?
ছোটবেলায় কারো কারো মুখে শুনেছিলাম _" কু'পুত্র যদি বা হয়, কু'মাতা কখনো নয় "_ এখানে আমরা যদিও বা কুপুত্র হয়েই ট্যাগড্ হয়ে রইলাম, তবুও তো কুমাতার কিছুটা স্পেস থেকেই যায় সংশোধনের !
এটাই আমাদের ট্রাডেজি _ আমরা রাজস্ব আদায় করি । আর হাফ্প্যান্টেরা তা খরচ করে উড়িয়ে দেন । জমি জমা নিয়ে মানুষের আবেগের অবস্থান চরমে । রাজস্ব আধিকারিকদের অনেক সময় অনেক অস্থানে কুস্থানেও যেতে হয় কাজের প্রয়োজনে । অথচ তাদের জন্যে বছরে মাত্র ছয় মাসের জন্য (ভাইফোঁটার পর থেকে মার্চ মাস) গাড়ি ( এর আগে অবশ্য ধার করে চেয়ে চিন্তে ভিক্ষে করে গাড়ি জোগাড় করতে হতো জেলা অফিস থেকে ) ।
ভাবতেও অবাক লাগে যে, বি.এল্.আর.ও. রা কাজের গুরুত্বের নিরিখে ব্লকের বি.ডি.ও.র ( যাঁদের হাতে থাকে খরচ করবার মতো প্রভূত অর্থ, যাঁদের ব্যবহার করে ভোটবাক্স গুছিয়ে নিতে চায় নেতা মন্ত্রীরা ) থেকে কোনও অংশেই কম কিছু নয় ( নিন্দুকেরা বলেন _ কোনও এক সময় নাকি স্কেলটাও সমান সমান ছিলো ) _ ব্লকের রাজনৈতিক আখের গুছাতে রাজনীতির আখড়া এই বি.এল্.আর.ও অফিস ।
ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো এই বি.এল্.আর.ও. পোস্টটির গুরুত্ব আজন্মকাল থেকেই ছিলো । এখনো আছে । আর আগামী দিনেও থাকবে । অথচ এইসব ভাবনা চিন্তাগুলো কি বিভিন্ন সংগঠনের নেতাদের মাথায় আসে না ? আচ্ছা, এনাদের নেতা কারা করেন ? যাঁরা এই নেতা নির্বাচনের কাজটি করছেন, তাঁরাই বা কেন "এক দপ্তর এক সার্ভিস এক সংগঠন" - এর কথা ভাবতে চান না ।
ভাবলে কিন্তু সবচেয়ে বেশী লাভজনক অবস্থায় আমরা অবশ্যই থাকতে পারতাম । কারণ জমির দপ্তরে সকলকেই আসতে হয় জীবনের কোনও না কোনও এক সময় । আর একথা তো ছোটবেলার নীতিকথায় কতবার কতভাবে পড়েছি - একতাই বল । তবে এই পড়াটা কেন আজ অবদি বুঝে উঠতে পারলাম না আমরা রাজস্ব আধিকারিকরা ?
ইসস্ _ সকলে ভাবছেন কি সব আবোল তাবোল বকছি সাত সকালে ! আসলে এইসব ছাইপাশ ভাবনাগুলো কাল আমার মগজের ধুসর কোষ সমষ্টিতে এসে বড়োই উৎপাত করছিলো গভীর রাতে । তাই বুদবুদের মতো সেগুলো বার হয়ে এল অতল গভীর ঠেলে ।
যাক্ গে - কেউ কিছু মনে করবেন না । আর এ সব আবোল তাবোল মনেও রাখবেন না অনুগ্রহ করে । সকলে ভালো থাকবেন । সকলকে সুপ্রভাত ।
।। জ ।। - ( 06.05.2017 )
জীবনানন্দের "বোধ" আর আইনী সম্পৃক্তি - অনেকখানি পাওনার দিন
-------------------
আজ বিকেলে একটু আগেভাগেই ছাড়া পেলাম । দুপুরে ক্লাসরুম থেকে ঘরে ফিরতে ফিরতে প্রায় আধপোড়া হয়ে গেছিলাম । বিকেলেও তাপের পরিমাণ ছিলো মারাত্মক ।
এখন সন্ধ্যে সাত'টা । একটু হেঁটে একপাক চক্কর মেরে এসেছিলাম গোটা ক্যাম্পাস খানা । আলো আঁধারি আবছা পরিবেশে, লম্বা লম্বা ইউক্যালিপটাস্ গাছগুলোর দেহগুলোকে দেখে মনে হচ্ছিলো, যেন কেউ রূপোর পাত দিয়ে আগাপাশতলা মুড়ে দিয়েছে ওদের । একটু দূর থেকে পরিবেশটা আরও মায়াবী মনে হচ্ছিলো ।
আড়াই বছর আগে যখন প্রথমবারের মতো এসেছিলাম, তখন ভোর থেকেই আমাদের প্রশিক্ষণ পর্ব চালু হয়ে যেত । সকালে উঠেই যে যার টিমের সাথে চলে যেত ক্যাম্পাস সংলগ্ন আধা জঙ্গল মাঠে ।
তবে এবার দেখছি ক্যাম্পাসের ভিতরের গাছপালা অনেক ছেঁটে ফেলা হয়েছে কোনও বিশেষ কারণবশতঃ ।
তখন আমাদের বেলা এগারটা অবদি রোদে পুড়ে ঘুরে ঘুরে শিখতে হতো সার্ভের কাজ । তারপর ঘরে ফিরে এসে স্নান খাওয়া সেরে আবার দুপুর থেকে বিকেল পর্যন্ত চলত থিয়োরী ক্লাস ।
এবারের শিডিউলে যেহেতু আইনি আলোচনাই একমাত্র আলোচ্য বিষয়, তাই সকাল সাড়ে আট'টা থেকেই শুরু হয়ে যাচ্ছে ক্লাস । আর তার জের চলছে রাত নয়টা - সোয়া নয়টা পর্যন্ত ।
সুতরাং গত বারের মতোন এবছর নড়াচড়া ঘোরাফেরার পরিস্থিতি বা সুযোগের প্রবল অভাব । আর জমাটি আড্ডার আসরও তেমন করে দানা বাঁধছে না ।
আর সারা দিন এ.সি. ক্লাসরুমে বসে থাকার পর যখন বাইরে বের হয়ে আসছি, নিজেদের রুমে আসতে না আসতেই ঘেমে জল হয়ে যাচ্ছি । দেহ হয়ে যাচ্ছে আঠালো । তিন চার বার করে স্নান করেও শান্তি মিলছে না । বিছানায় শুয়ে আসছেনা ঠিকঠাক ঘুম । চোখের তলায় ক্রমশঃ গাঢ় হয়ে উঠছে কালির দাগ । জানিনা, ট্রেনিং শেষে এরপর আবার গা এলিয়ে পড়বে কিনা ।
তবে এই কয়'টা দিনের ক্লাস থেকে সবচেয়ে বড়ো প্রাপ্তি ছিল গত কালকের ক্লাস । ক্লাস নিচ্ছিলেন অজয় সান্যামঠ স্যার, আমাদের দপ্তরের সম্পদ - Additional Director of Land Records & Surveys এবং Ex Officio Special Secretary - অসাধারণ ব্যক্তিত্বসম্পন্ন বাগ্মী এবং পন্ডিত মানুষ । আমি মনে মনে সত্যিই ওনার ফ্যান্ হয়ে গেছি । এমন মানুষের পদরেণুর এক ছিটে ফোঁটাও যদি মাথায় লেগে যায়, তবে জমি দপ্তরে জ্ঞানের সমুদ্রে আমি আর কখনো পথ হারাবো না । কাল ওনার ক্লাস করতে করতে আবেগে আনন্দে আপ্লুত হয়ে গেছিলাম । এমন মোটিভেশনাল মানুষ যিনি এমন সহজ সরল ভাবে আমাদের মনের গভীরে বসে গেলেন কাল, ভাবলে অবাক হতে হয় । আলোচনার ফাঁকে প্রবেশ করেছিল গুরুদেবের গীতাঞ্জলীর কথা । বললেন জ্ঞানের উত্তরাধিকার বহনের কথা । আলোচনায় উঠে এলো জীবনানন্দ দাশের "বোধ" কবিতা । কাল এমন ইন্টেলেকচুয়াল অসাধারণ পন্ডিত মানুষের সাথে কাটানো ঐ ঘন্টা খানেক সময় যেন শালবনীর এই বারের যাত্রায় সেরাতম পাওনা হয়ে রইলো । স্যার ক্লাস শেষ করলেন । চলে গেলেন । কিন্তু ওনার আবেগঘন শব্দের আর ভাবনার আবেশ ছড়িয়ে রইলো সবার মনে মনে গোটা ক্লাসরুম জুড়ে ।
এখন সকাল সাড়ে সাতটা । এখনো আমি বিছানা ছেড়ে উঠিনি । স্যারের সাথে গত কালকের সেই ঘন্টাখানেক কাটানো সময়ের কথা আমি এখনো ভুলতে পারিনি । স্যারের কথা ভাবলেই মনে পড়ছে সেই বিখ্যাত লাইন - ভিনি ভিডি ভিসি ( Vini Vidi Vici )
আর কাল বিছানায় শুতে যাওয়ার আগের শেষতম পাওনা হলো ষোল নম্বর ঘরে "ভট্টা" দাদাদের রুমে নতুন আরও এক সিনিয়র সুব্রতদার সাথে আলাপ । সেই দাদাকে গান শোনানোর অনুরোধ করেছিলাম আমরা সবাই । দাদা এমন পারফরমেন্স দিলেন, যে মন একেবারে ফুরফুরে হয়ে গেল । শুনলাম - "মহব্বৎ বরষা দেনা তু", শুনলাম - "হাম তেরে বিন অব্ রহ্ নেহি স্যকতে" এবং আরও কিছু মাস্টারপিস্ ।
সত্যিই, শালবনীতে এবারের প্রাপ্তিযোগের তালিকা বেশ লম্বা । ষোল নম্বর রুমের "ভট্টা" দাদা গত সন্ধ্যায় আমায় প্রাণায়ামের প্রাথমিক পাঠে দীক্ষা দিলেন গুরুর মতো । এই ব্যাপারে ভট্টা' দার প্রথম শিষ্য ভাস্করদা ও রুমেই ছিলেন । আমি বাধ্য অনুগত ছাত্রের মতো প্রাণায়াম অনুশীলন করতে লাগলাম দুই দাদার সাথে ।
খুবই শার্প আর চমৎকার বিশ্লেষণী ক্ষমতার অধিকারী মালদা নিবাসী এই "ভট্টা দাদা" এখন বীরভূমে কর্মরত ।
কিছু সময়ের ভিতরেই টের পেলাম কোমরের দুইপাশ জুড়ে আর পেটের মাসলে বেশ চাপ চাপ ব্যাথা । পেট ভিতরে ঠেলে নাক দিয়ে ঘাড় ধাক্কা মেরে নিঃশ্বাস ছাড়াটা খুব সহজ কাজ নয় । ঠিকঠাক করে বসতে বসতেই পায়ের থাই ধরে এলো ।
আমার প্রথম দিনের এই কান্ড কারখানায় হাসির খোরাক হয়ে গেলাম । ভাস্করদা আমায় দেখবেন নাকি প্রাণায়াম করবেন । শেষমেষ হাসতে হাসতে ধড়াম্ করে বিছানায় কাৎ । আর ভট্টা'দা কিন্তু দেবাদিদেব মহাদেবের মতোই অনড় । ঘরের ভিতর আশেপাশে কি হচ্ছে, ডোন্ট কেয়ার । মোবাইলে বাজতে লাগলো ভজন । গায়কের গান না থামা অবদি পেট দিয়ে নাক ঠেলার কাজটা করবার কথা ছিল আমাদের তিন জনের । প্রথম হিট্ উইকেট হলাম আমি । মিনিট পাঁচেকের ভিতরেই বার তিনেক পায়ের অবস্থান বদল করলাম বটে কিন্তু বিশেষ কিছু সুবিধা করতে পারলাম না । নির্বিকার ভট্টা'দা চোখ বুঁজে একমনে প্রাণায়ামে রত ।
আমি হাল ছেড়ে পা ছড়িয়ে বসে পড়লাম । চরম খিদেও পাচ্ছিলো । ভাস্করদা ও উঠে পড়লো আসন ভেঙে । আমরা আর পারছিলাম না । ভট্টাদা যোগনিদ্রায় অনড় ।
অবশেষে ভাঙলো তার আসন সমাধি । আমি যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম । দাঁত বের করে বোকার মতো ভাস্করদার দিকে চাইলাম । তারপর তিন মূর্তি এগিয়ে গেলাম ডাইনিং হলের দিকে পেটপুজো করতে ।
বিনদাস ফুরফুরে মেজাজের খোলামেলা মনের চমৎকার দুই সিনিয়ার দাদার ঘরেই অনেকটা সময় গল্পগুজব করে সময় কাটছে এবার ।
যাই হোক, বেলা বাড়ছে । তার তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়ে চলেছে রোদের তেজ । এবার উঠে পড়লাম । ফ্রেশ হয়ে তৈরী হয়ে নিই আজকের ক্লাসের ইন্টারঅ্যাকটিভ্ সেশানের জন্য । দেখি, কি অপেক্ষা করছে আজ আমাদের কপালে ।
সকলকে সুপ্রভাত । ভালো থাকবেন ।
____________________________
।। ঝ ।। - 07.05.2017 / শেষ নিঝুম রাতে /
---------------------------------
রাত বারোটা বেজে সাত মিনিট । আমার রুমমেট তার হবু সহধর্মিনীর সাথে একান্ত আলাপচারিতায় রত ।
আমি এতক্ষণ পাশের ঘরে ছিলাম । কবিতা গান আর তার সাথে শেষ রাতের ভুরি ভোজনে । শুনলাম মন মেজাজ বিনদাস করে দেওয়া কিছু গানের লাইন । এক মুহূর্তের জন্যেও মনে হয়নি যে ঘরের বাইরে আছি একান্ত আপনার পরিবেশ ছেড়ে ।
রাত সাড়ে দশ'টার পর ডিনার সেরে এসে একবার ঘরের পিছনের খোলা ব্যালকনিতে গিয়ে কিছু সময় চুপচাপ একলা দাঁড়িয়েছিলাম । রাতের খোলা আকাশে প্রায় সম্পূর্ণ ঝলমলে চাঁদ । তারাগুলো সব মিটিমিটি করে চোখ পিটপিট করে চলেছে । এক ফোঁটাও হাওয়ার নাম নেই । ঘরের পিছনে বেশ কিছু ঘোড়ানিম আর মহানিমের গাছ । তাদের পাতাগুলো থেকে ঠিকরিয়ে পড়ছে ভেপার ল্যাম্পের হাল্কা হলদে গোলাপী আলো । কদাচিৎ মাঝে মাঝে আলতো করে বয়ে যাচ্ছে হাওয়া । আমি খালি গায়েই দাঁড়িয়ে ছিলাম বারান্দায় । মনে হচ্ছিলো, যেন হাওয়া নয়, কেউ তার শাড়ি বা সালোয়ারের আঁচল ছুঁয়ে বুলিয়ে দিয়ে যাচ্ছে আমার সারা দেহের রোমকূপ জুড়ে । অনেকক্ষণ ঐ ভাবে ঠায় দাঁড়িয়ে ছিলাম । মনে পড়ছিল বিভূতিভূষণের বিখ্যাত 'আরণ্যক' উপন্যাসের কথা । অসাধারণ সাযুজ্য পেয়ে অবাক লাগছিলো নিজেকে ।
আমাদের হস্টেল রুম থেকে ক্লাসে আসা যাওয়ার পথে লাল মোরাম দেওয়া রাস্তার দুই পাশেই বেশ কিছু কাজুবাদামের গাছে কাজু ফল ঝুলতে দেখেছিলাম ।
কাজুবাদাম গাছের ফলগুলো ভারি অদ্ভুত রকমের দেখতে । যে বাদাম অংশটা আমরা খাই রোস্টিং করে, সেটা ফলের নীচের অংশে বাইরের দিকে আলাদা করে আটকিয়ে নীচের দিকে ঝুলে থাকে । আর বাদামের উপরের অংশে গাছের সাথে আটকে থাকা অংশে থাকে লালচে হলুদ গোলাপী রঙের সুগন্ধী একটা অংশ । কিন্তু ওটা নাকি খাওয়া যায় না ।
কাঁচা বা পাকা অবস্থায় বিনা রোস্টিং এ কাজুবাদাম খেলে জিভ আর মুখের চামড়া জ্বলেপুড়ে যাবে । এটা হয়তো অনেকেই জানেন না । তাই এখানে সুযোগ বুঝে আগাম সতর্ক করে দিলাম বন্ধুদের ।
আমার সিনিয়ার ভাস্কর দাদার মনে হলো বৌদির জন্যে ই কাজুর নমুনা নিয়ে যাবে । প্রথমে আমি রাজি হইনি । রাত বিরেতে গাছকে বিরক্ত করতে, তার ফল ছিঁড়ে পেড়ে নিতে আমার আপত্তি একটু হলেও ছিলো । কিন্তু মনে মনে ভাবলাম, বেশ তো, ভারি তো একটা দুটো ফল । নিক্ না । কি আর হবে !
যেমন ভাবা, তেমন কাজ । চলে গেলাম জনা তিনেক মিলে কাজু পাড়তে । হাতের কাছাকাছি দুই একটা কাজু পাড়া হলো । আমরা আবার গাছটির কাছে ক্ষমাও প্রার্থনা করলাম এত রাতে ওকে বিরক্ত করবার জন্য । মনে মনে বলেও বসলাম - কিছু মনে করবেন না, হে বৃক্ষদেবতা । আমাদের অপরাধ নেবেন না । ক্ষমা করুন আমাদের এই অযাচিত আকস্মিক উৎপাত । আরও ক্ষমা চাইলাম ঐ গাছে আশ্রয় গ্রহণকারী প্রাণিদের কাছেও । কারণ ওদেরও বিশ্রামে ব্যাঘাত ঘটিয়েছি আমরা ।
ঘরে ফিরে এসে স্নান সেরে বিছানায় এসে মনে হলো - আজকে এখানে শেষ রাত । তার আগের দিন শনিবার রাতে অর্থাৎ ছয় তারিখে রাতের ক্লাস সেরে ঘরে ফিরে দেখি কোথাও কোনও প্রান্তেই খাবার জল নেই এক বিন্দুও । রাত বাড়ছে । গরমে গলা শুকাচ্ছে ।
গোটা দিনে বারো ঘন্টারও বেশী সময় আমরা এ.সি. ক্লাসরুমে থাকি । সেখানে গদিওয়ালা চেয়ারে বসে বুঝতেই পারিনা বাইরের অবস্থা । আর দিনের বেলা চা পানের বিরতিতে বাইরে বের হলে মনে হয় চুল্লীর গরম আঁচে গা হাত পা সেঁকে দিচ্ছে ।
যাই হোক, শনিবার রাতের খাওয়ার জলের ক্রাইসিসে অনেকেই বাথরুমের বেসিনের জল খেয়ে প্রাণ বাঁচিয়েছে । এই এলাকায় রাত ন'টা মানে অনেক কিছু । তাই অত রাতে কোনও মিস্ত্রি ডেকে অবস্থা আয়ত্তে আনা সম্ভবপর হয়নি । আমরাও সমস্যার গুরুত্ব বুঝে ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের কারো সাথেই অপ্রীতিকর কিছু করতে পারিনি, এমনকি আমাদের ভিতরে কেউ কোনও রকমের অশোভনীয় আচরণও করেনি । এটা এবারের ট্রেনিং সেশনের একটা বড়োসড়ো পাওনা ছিলো । আর জলের অভাবের এই সমস্যা মিটলো তার পরের দিন অনেক বেলার দিকে । আমরা ততক্ষণ আমাদের অনেকেই ফ্যাকাল্টি বিল্ডিং থেকে পানীয় জল সংগ্রহ করেছেন ।
প্রায় মালভূমি এলাকা এটা । খাবার জল আনবার জন্য এলাকাবাসী দূর থেকেও আরও অনেক দূরে চলে যায় । কত কষ্ট ওদের ।
আর আমরা এখানে সরকারী পরিষেবায় কত কিছু পাই । জলের অপচয় কম করিনা আমরা অনেকেই । এক সন্ধ্যা থেকে পরের দিন - এই বারো ঘন্টার পানীয় জলের অভাবে আমাদের কত না অভিযোগ অনুযোগ ।
শহুরে বাবু আমরা । সবকিছু মুহূর্তের ভিতর হাতের মুঠোয় ইচ্ছের নাগালে পেতে অভ্যস্ত আমাদের মন । নাহ্, যা হলো ঠিকই হলো । অভাব না হলে, মানুষ সহজে কোনও কিছুর মূল্য সহজে টের পায়না ।
ছোটবেলা থেকে পড়ে এসেছি জলই জীবন । আর বড়ো হয়ে জেনেছি জলাভাবে পৃথিবীর কত জায়গা জুড়ে কত রকমের বড়ো বড়ো রাজনীতির খেলা চলে, চলে নোংরামি ।
প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় করা অপরাধ । আর আমরা শহুরে বাবুরা অপচয় করি খোলা হাতে । এখন মনে হচ্ছে আগের দিনের ঐ জলাভাবের অনুভূতি আমাদের খুবই প্রয়োজন ছিলো ।
জানি, এর পরেও অনেকেই আমার ভাবনাকে বলবেন প্রলাপ । কারণ এটাই সার যে, সকলের অনুভূতি আর উপলব্ধির মাত্রা কিন্তু সমান নয় ।
যাই হোক্, আশা তো করতেই পারি, সকলের ভাবনা চিন্তা সুগঠিত, সুন্দর, সহজ, স্বাভাবিক, বিশ্লেষণমূলক আর যথাযথ রকমের বাস্তববাদী হোক ।
যাই হোক্ । রাত কম হলো না । আবার আগামী কাল সকালে ওঠার ব্যাপার আছে । তাই সকলকে শুভরাত্রি জানিয়ে আপাততঃ বিরতি নিচ্ছি ।
__________________________
।। ঞ ।। - 08.05.2017 / ভ্যালিডিকশন্ /
--------------------------------
আজ আমাদের ভ্যালিডিকশন্ ডে । আমরা যে সাফল্যের সাথে এই ট্রেনি সম্পন্ন করলাম, তার সার্টিফিকেট প্রাপ্তির দিন । মনটা খুব ভারী হয়েছিলো শেষ বেলায় । এর আগের বারেও শালবনী ক্যাম্পাস ছেড়ে আসার সময় মন মেজার ভার হয়ে ছিলো । অনেকের চোখেই জল আসতে দেখেছিলাম । মনে পড়ছে আমার পুলকের কথা । আমায় জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে সে কি ভয়ানক কান্না ভাইটার । আরো অনেকের অনেক কথাই মনে পড়ে যাচ্ছিলো আমার ।
দিনের শেষে বইছিলো হাওয়া
কৃষ্ণচূড়া পলাশ আর
ইউক্যালিপটাসের ফাঁকে
আমি জানিনা
কি ফেলে গেলাম আবারও
লাল মাটির দেশে
রাঙা পথের বাঁকে
- চলি বন্ধুরা,
জানিনা আবার কবে হবে দেখা ।
আপাততঃ ঘরের পথ ধরলাম ।
আর নিয়ে চললাম সাথে রাঙা মোরামে মাখা লাল ধূলোর পরশ, ইউক্যালিপটাসের ঘ্রাণ, রাতের শালবনীর মায়াবী বাতাস আর দাদা বন্ধু ভাইদের সাথে কাটানো চিরস্থায়ী সোনালী মুহূর্ত ।
__ সকলের যাত্রা শুভ হোক্ । ভালো থাকুন সকলে ।
@ রাজেন্দ্র ( চ্যাংশোল, Analysis Research & Training Institute, শালবনী )
Comments