বৃষ্টি ভেজা রাত

#বৃষ্টি_ভেজা_রাত
#অর্পিতা_সরকার
এটাই আমার পুরস্কার জেতা গল্প,কথা দিয়েছিলাম পোস্ট করবো 😊

এই ছোট্ট গ্রামের ধুলো আবর্জনার পরিবেশে রাই যে এতটা একাত্ম হয়ে যাবে সন্দীপ কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবে নি । ওর নিজের তৈরি স্কুলের ,ওর ফার্ম হাউসের সমস্ত কর্মীরা এখন রাই দিদি বলতে অজ্ঞান । সন্দীপের সাথে রাই এর পরিচয় হয়েছিল কলকাতার কলেজে পড়ার সময়ই । ওদের প্রেমের প্রথম পর্বে সন্দীপ জানিয়েছিল এই এগ্রিকালচার নিয়ে ওর পড়ার উদ্দেশ্যেই হচ্ছে নিজের গ্রাম কৃষ্ণগঞ্জের মাটিকে চাষের জন্য উন্নত করে তোলা ।কৃষ্ণগঞ্জের মানুষের জন্য কিছু করার প্রচেষ্টাই ছিল সন্দীপের জীবনের একমাত্র লক্ষ্য ।
রাইও সন্দীপের পাগলামিতে মদত দিতো । সন্দীপের এই সরকারি চাকুরীর চেষ্টা না করে গ্রামের চাষাদের সাথে নিজেকে মিশিয়ে দেবার সিদ্ধান্তে রাইএর বাড়ির লোক মোটেই মেনে নেয়নি ।তাদের ফ্যামিলির একটা স্টেটাস আছে ,আর আদরে মানুষ হওয়া রাই কোনোদিনই ঐ গ্রামের দরিদ্র পরিবেশে মানিয়ে নিতে পারবে না এটাতে রাইএর বাবা নিশ্চিত ছিলেন ।তাই হায়দ্রাবাদে চাকুরীরত ইঞ্জিনিয়ারের সাথেই রাইএর বিয়ে ঠিক করেছিলেন ।

ফোনটা প্যান্টের পকেটে বাজছে সন্দীপের । রাইএর ফোন .... গ্রামের স্কুলের শিক্ষক রতনের বৌএর আজ সাতদিন ধরে খুব জ্বর এদিকে বৌটা আবার সন্তানসম্ভবা ।তাকে নিয়ে কাছের একটা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে গেছে রাই ।ফিরতে দেরি হলে সন্দীপ যেন চিন্তা না করে তাই এই কল ।
মাঝে মাঝে সন্দীপের মনেহয় একমাত্র রাই -ই তার যোগ্য সহধর্মিনী ।

আজ বিকেল থেকেই অঝোরে বৃষ্টি পরে যাচ্ছে। বেশির ভাগ সময়ই কৃষ্ণগঞ্জে লোডশেডিং থাকে, বিশেষ করে এই বৃষ্টির দিনগুলোতে ।
এরকমই বছর দুয়েক আগের এক বৃষ্টিভেজা সন্ধ্যেতে গৌতম সন্দীপের মেসে এসেছিলো ঝড়ের মতো ।গৌতম সন্দীপের ছোটবেলাকার বন্ধু ।একেবারে সেই প্রাইমারীর বন্ধু ।ওরা একসাথে উচ্চমাধ্যমিক পর্যন্ত পড়েছিল ।তারপর গৌতমের বাবার চাকুরীর বদলির জন্য ওরা চলে যায় চেন্নাই । তারপরও অবশ্য ফোনে যোগাযোগ হয়েছিল ।হঠাৎ এতো বছরের পুরনো বন্ধুকে পেয়ে সন্দীপ আনন্দে দিশাহারা হয়ে পরে । সন্দীপের বিয়ের খবরে একটা কথাই শুধু বলেছিলো গৌতম ,"তুই সেই ছোট্ট থেকে আমার কাছ থেকে ফার্স্টএর প্রাইজগুলো ছিনিয়ে নিয়েছিলিস ।আমি ক্লাসে সেকেন্ড হতাম কিন্তু তোর প্রথম হওয়ার আনন্দে আনন্দিত হতাম ,জানিস সন্দীপ ।
আজও রাই এর সাথে আমার বাড়ি থেকে বিয়ে ফাইনাল হওয়ার পরও আজ রাই আমাকে না দেখেই বাতিল করে দিলো শুধু তোকে ভালোবাসে বলে ।"
আর কোনো কথা না বলে হতভম্ব সন্দীপকে একা ফেলে ছুটে বাইরে বেরিয়ে গেল গৌতম । সন্দীপের মেসের সামনের যানবহুল রোডটা পেরোতে গিয়েই চিৎকারটা কানে গেলো সন্দীপের "রাইকে ভালো রাখিস " । তারপরের হৈ হৈ টা হয়েছিল ছ চাকায় পিষ্ট হয়ে যাওয়া গৌতমকে ঘিরে ।মাঝে মাঝেই গৌতমের ঐ শেষ চিৎকারটা কানে আসে সন্দীপের।
ঘুমটা তখন আচমকাই ভেঙে যায় সন্দীপের ।কপালে বিন্দু বিন্দু ঘামের উদ্ভব ঘটে।কখনো ঘুমন্ত রাইকে জড়িয়ে ধরে দুঃস্বপ্নের হাত থেকে রেহাই পেতে চায় সন্দীপ । 12ই জুন সেই বৃষ্টি ভেজা রাতে গৌতমের চিতার সামনে দাঁড়িয়েও সেই কথাটাই মনেপড়ে যাচ্ছিলো ওর ,"তুই সব কেড়ে নিতিস সন্দীপ "।
দুবছর পরও সন্দীপ যেকোনো বৃষ্টি ভেজা সন্ধ্যায় একলা ঘরে ঐ বিভীষিকাময় মুহূর্তের কথা মনে করে শিউরে ওঠে । কোনোদিন রাইকে বলতে পারে নি গৌতমের এক্সিডেন্টের কথা বা গৌতমের সাথেই যে রাইএর বিয়ের ঠিক হয়েছিল সে কথা ।

দরজাটা ঠকঠক করছে কেউ ।কড়া নাড়ার আওয়াজ ।দরজা খুলতেই কাক ভেজা রাই ঢুকলো । রতনের বৌএর ম্যালেরিয়া হয়েছে জানো ।পেটের বাচ্চাটা বাঁচলে হয় , গামছা দিয়ে মাথা মুছতে মুছতেই রাই জানালো ।
এই জানতো তোমার ছোটবেলার বন্ধু আমাকে আর রতনের বৌকে বাড়ি পৌঁছে দিলো ।দরজা টা ফাঁক করে হাসি মুখে রাই ডাকলো ,"গৌতমবাবু প্লিস ভিতরে আসুন ।আর বন্ধুকে চমকে দেবার লোভে বৃষ্টিতে ভিজবেন না ।"
চমকে উঠেছে সন্দীপ ।বাইরে কেউ নেই দেখে রাই সন্দীপকে বলল ,"বিশ্বাস করো সন্দীপ তোমার ছোটবেলার বন্ধুর সাথে স্টেশনে দেখা হলো ।আমি তো চিনতাম না ,উনিই ডেকে পরিচয় করলেন ।তোমাদের আম চুরি ,মাছ ধরার কত গল্প করছিলেন ।কোনো একটা বিশেষ কারণে নাকি আমাদের বিয়েতে আসতে পারেন নি ।এমন কি আমার ছবিও দেখেছেন বোধহয় তোমার কাছে ।কেন তোমার সাথে দেখা না করেই চলে গেলেন বলো তো !! "রাই এর চোখে তখন ও বিস্ময় !!
হারিকেনের আলোয় ভয়ার্ত দুটো চোখে তাকিয়ে রাইকে জড়িয়ে  ধরলো সন্দীপ ।আধো অন্ধকারেই ক্যালেন্ডারের তারিখে চোখটা আটকে গেলো সন্দীপের ,আজও 12  জুন ।কানে ভাসছিল ,"রাইকে ভালো রাখিস সন্দীপ".....

সমাপ্ত

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি