রাতের তারা - রাজেন্দ্র
রাতের তারা - রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
--------------------------
মাথাটা অল্প বিস্তর ঘোরাচ্ছে । চোখে নতুন চশমা লেগেছে । সকাল থেকেই আফিমখোরের মতো ঝিম্ মেরে চুপটি করে বিছানার একটা কোণে বসে রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রথম খন্ড পড়তে শুরু করেছিল ঋক । গায়ে জ্বর জ্বর ভাব । চোখের পাতা ভারী । গলা খুসখুস । নাকের একপাশ বন্ধ । একপাশ হাফ্ খোলা ।
হফাৎ নির্ঝরের স্বপ্নভঙ্গের মতো ঝটিকা হাওয়া সহযোগে গিন্নি এসে দাঁড়ালেন মুখের সামনে । একথা সেকথার পরে বললেন ছেলেকে নিয়ে সেলুনে যেতে ।
ছেলের মাথার চুল বড়ো হয়ে কান পর্যন্ত ঢেকে যাচ্ছে । বিকেলের সাঁতারের ক্লাসে গেলে টিচার নাকি বকাঝকা করছেন । আর ইস্কুলের দিদিমনিরাও নাকি এত বড়ো বড়ো চুলের বাহার পছন্দ করছেন না ।
ঋক একটু দোনামনা করছিলো প্রাথমিক ভাবে । কিছুটা বিরক্তি কিছুটা অস্বস্তি নিয়ে একটু আধটু খুচরো বাদানুবাদ সেরে অতি কষ্টে জিনসের প্যান্টখানা কোমরে গলিয়ে নিলো শেষমেষ ।
এক হাতে সর্বক্ষণের সাথী ছাতাটিকে নিয়ে ছেলেকে সাথে করে যখন ঘরের বাইরে পা দিলো ঋক, তখন চারপাশ উঁচুনীচু এবং সবকিছু কেমন যেন টলছে । ও ভালো রকম ভাবেই জানত, এই দুইরকম পাওয়ার ওয়ালা বাইফোকাল প্রোগ্রেসিভ লেন্স চোখে সেট হতে দিনকয়েক সময় লাগবে । এটা দোকানদার বলেছিলো ওকে ।
ঘর থেকে বের হলেই সামনের খোলা উঠোনের লাগোয়া আমগাছ । সেখানে রোজ পালকওঠা অতিবৃদ্ধ জ্ঞানী গোছের একজন কাক এসে বসে থাকে গোটা দিন এবং দুপুর । আজকেও নির্দিষ্ট ডালের মাথায় এসে বসেছিলো সেই জ্ঞানবৃদ্ধ সর্বজ্ঞ কাকটি ।
বার কয়েক গলা খাঁকারি দিয়ে কাকটি যেন মানুষের ভাষায় ঋকের দিকে চেয়ে ব্যঙ্গ করতে লাগলো । বলতে লাগলো - "আহা, বাছা । মন মেজাজ শান্ত রাখো । ধীর স্থির হয়ে ভাবো । সংসার বড়ো বিষম বস্তু । আর সাধু সন্যাসীর জীবন আরও জটিল । তাঁদের সংসার ভুবনজোড়া । তুমি বাপু তুচ্ছপ্রাণ ক্ষুদ্র জীব । এইসব ছোটখাটো সংসারী কাজ চুপচাপ সেরে ফ্যালো । নচেৎ নিজের কাজ, নিজের জগতে নিজের মতোন করে বেঁচে থাকা বেরিয়ে যাবে ।"
ঋকের মনে পড়ে গেলো রবীন্দ্র-রচনাবলীর প্রথম খন্ডের অবতরনিকার কিছু লাইন যেখানে গুরুদেব কবিকুলকে মৎস প্রজাতির সাথে তুলনা করেছেন । সেখানে কবি লিখছেন, - "মাছ যতক্ষণ জলে আছে ওকে কিছু কিছু খোরাক জোগানো সৎকর্ম, সেটা মাছের নিজের প্রয়োজনে । পরে যখন তাকে ডাঙায় তোলা হল তখন প্রয়োজনটা তার নয়, অপর কোনো জীবের । তেমনি কবি যতদিন না একটা স্পষ্ট পরিণতিতে পৌঁছয় ততদিন তাকে কিছু কিছু উৎসাহ দিতে পারলে ভালোই - সেটা কবির নিজেরই প্রয়োজনে । তার পরে তার পূর্ণতায় যখন একটা সমাপ্তির যতি আসে তখন তার সম্বন্ধে যদি কোনো প্রয়োজন থাকে সেটা তার নিজের নয়, প্রয়োজন তার দেশের" ।
ঋক নিজে একজন অপরিণত কবিতা লেখক । নিজেকে সে কবি বলে ভাবতে পারেনি এখনো । তবে কবিতার চর্চায় সে ডুবে থাকতে চায় । চায় উদ্বায়ী ভাবনায় ভেসে থাকতে । আর তার জন্যে প্রয়োজন উপযুক্ত মানসিক স্থিতি । অস্থিরতা অশান্তি একেবারেই কাম্য নয় তার । সুতরাং প্রসন্ন মনে ছেলের হাত ধরে বেরিয়ে পড়লো সে ।
একটুখানি এগোনোর পরেই ছেলের চোখে পড়ে গেল একটা মরা কুনো ব্যাঙ্ । কোনও একটি ভারী কিছুতে বেচারী পিষ্ট হয়ে প্রাণত্যাগ করেছে । সাত বছরের ছেলে খুব সরলভাবে একটা প্রশ্ন রাখলো এবার ঋকের সামনে - আচ্ছা বাবা, ঐ ব্যাঙ্ টা কি এখন স্টার হয়ে গেছে ? নাকি ভূত হয়ে গেছে ?
ঋক মৃদু হাসলো - না বাবা, ও স্টারও হয়নি । ভূতও হয়নি ।
ছেলে আবার পাল্টা বলে উঠলো - আচ্ছা বাবা, কোনটা বেশী ভালো ? স্টার হওয়া ? নাকি ভূত হওয়া ?
ছেলের কোর্ট থেকে ছুটে আসা প্রশ্নের বলটাকে আবার ঘুরিয়ে দিলো ঋক - তোমার কি মনে হয় ? কোনটা ভালো ?
ছেলে স্বতঃস্ফূর্ত ভাবে জবাব দিলো - আমার মনে হয় ভূত হওয়াটাই বেশী ভালো । তাহলে ওদের নাক ধরা যাবে ।
এবার হেসে ফেললো ঋক । ও জানে ছেলে নাক ধরে চটকাতে ভালোবাসে । ও এবার ছেলেকে বললো - না বাবা । ওদের ধরা ছোঁয়া যাবেনা । কিন্তু ওরা তোমায় ধরতে ছুঁতে পারবে । ভূতে না পারুক, রাতের তারার আলো আমাদের সকলকে ছুঁতে পারবে । ওদের নরম তুলতুলে মোলায়েম আলো আমাদের গায়ে মাথায় মুখে বুলিয়ে দিতে পারবে । এই আলো মেখে আমরা অনেকেই পূর্ণিমার রাতে সামনের খোলা মাঠে ছোটাছুটি করতাম, খেলতাম । এখন আমরা ঘর শপিংমল ছাড়া আর কিছু বুঝি না । তাই ওদের ভারী দুঃখ হয় । রোজ রাত থেকে ভোর পর্যন্ত ওরা জেগে থাকে আমাদের আসার অপেক্ষায় । আর রোজ আমরা ওদেরকে হতাশ করি । তাইতো আমরা ভাবি মরে গিয়ে একদিন আমরা তারা হয়ে ওদের দলে যোগদান করবো । ওদের সাথে ওদের ভীড়ে মিশে যাব ।
ছেলে কি বুঝলো জানা গেলো না । ও শুধু বললো - বাবা, তুমি মরে গেলে স্টার হয়ে যেও না । ভূত হয়ে থেকে যেও আমার চারপাশে । আমি তোমার নাক ধরে খেলবো ।
হাঁটতে হাঁটতে বাপ ছেলে সেলুনে পৌঁছে গেলো ।
@ রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
Comments