সুমন সরকার

ফিরে আসা , যদিও ক্ষণিকের

ফেসবুকে আমি আর নেই । কারণ , আমি আর লিখিনা , গান গাইনা , কিছুই করিনা । আমি এখন অনিচ্ছা সত্ত্বেও  'বেঁচে থাকা' নামক বাল ছিঁড়ি । তবু কিছু লেখা , যা প্রকাশিত হয়, সেই খবর জানাতেই আসবো মাঝে মধ্যে । ২০১৪ সালে আমি জীবনে প্রথম গল্প লিখি । সেই গল্পটি এমাসের 'তথ্যকেন্দ্র' পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছে । আমি গল্প লিখতে পারিনা , কিছুই ঠিক পারলাম না এ জীবনে ,  শুধু ছিঁড়লাম । পত্রিকাটি কিনে পড়তে পারেন , না পারলে আমি গল্পটি এখানেই তুলে দিলাম । সময় থাকলে পড়ুন ...

গল্প ------      " দাগ " 

‘শালা বিশ্বাসঘাতক ! কলেজে ডেঁও পিপড়ের মতন থাকতিস । দেবরেকাকে তুই নাকি ওই চোখে দেখিস না !   আমার চলে যাওয়াটা তোর কাছে লটারি পাবার মতন । তোদের মতন লোকেদের জন্য আমাদের আন্দোলনটা ব্যর্থ হয়ে গেলো । হারামির বাচ্চা দেবী রায়ের পুলিশ,  আমার পিঠে গুলি করেছিল । ওইদিন,  দেবরেকার কিনে দেওয়া পাঞ্জাবিটা পরেছিলাম । দেখবি , সেই গুলির দাগটা !  দাঁড়া , পাঞ্জাবিটা তুলি ...।' 

-  ঘুম ভেঙে গেলো বিকাশের । চোখ খুলতেই এক ডেলা অন্ধকার । অন্ধকার ভারী অদ্ভুত জিনিস , দৃষ্টিহীনরাও দেখতে পায় । আগে ঘরের ভেতরে জামায় কালির দাগের মতন রাস্তার আলো লেগে থাকতো । এখন জানলা বন্ধ করে ঘুমোয় , বিকাশ । নতুন একটা এসি কিনেছে । হাই প্রেশার , গরমে থাকতে পারে না । প্রাইভেট বাসের ড্রাইভারের অপটু হাতে হঠাৎ ব্রেক মারার পরবর্তী অপ্রত্যাশিত ঝাঁকুনির মতন করে ঘুমটা ভেঙে গেছে , স্বপ্ন দেখতে দেখতে । বিকাশ বেশ কিছুক্ষণ চেতন আর অবচেতন মস্তিষ্কের মধ্যবর্তী ঝুলন্ত সেতুটায় দুলতে দুলতে থাকে । দুলুনি থামলে অব্যর্থ আন্দাজে বেড সুইচ টিপে আলো জ্বালালো । খাটের পাশের ছোট্ট টেবিলে রাখা  বোতল থেকে খানিকটা জল খেলো । জলটা বেশ ঠাণ্ডা হয়ে গেছে , এসির হাওয়া খেয়ে । বিকাশের আবার টনসিলের ধাত , ঠাণ্ডা জল খেতে পারে না । এটা অবশ্য তেমন ঠাণ্ডা নয় যে টনসিলের ক্ষতি করবে । বেশ খানিকটা ঠাণ্ডা জল গলা বেয়ে শরীররে ভেতরে প্রবেশ করার অনুভূতিটা ভালো লাগে বিকাশের । মোবাইল আনলক করে দেখল , রাত প্রায় শেষ চলল । রেবা বাড়িতে নেই । ওঁর দাদার মেয়ের বিয়ে । দমদমে বাপের বাড়ি গেছে । বাবা-মা বেঁচে না থাকলেও 'বাপের বাড়ি'  নামটা থেকে যায় । যাদবপুরের ফ্ল্যাটে বিকাশ একা । ভাবলো , একটা সিগারেট ধরাবে । বয়স বাড়লে ঘুম পাতলা হতে থাকে । তবে এই এসিটা কেনার পর থেকে ঘুমটা বেশ ভালোই হচ্ছে । বিকাশ সিগারেট না ধরিয়ে আবার শুয়ে পড়ে ।

পরদিন রবিবার । একটু দেরিতে ঘুম ভাঙার পর , বিকাশ আবিষ্কার করলো সে গত রাতে বেড সুইচটা অফ করতে ভুলে গেছে । সকালের টাটকা আলো ঘর ভরিয়ে দিচ্ছে । টিউব লাইটটা বাংলার পাঁচের মতন মুখ করে চেয়ে আছে ওঁর দিকে । কাল রাতে বেড সুইচ অফ করতে ভুলে গেছে । রেবা দেখতে পেলে নির্ঘাত কুরুক্ষেত্র বাধিয়ে দিতো । মাখন-পাউরুটি সহযোগে ব্রেকফাস্ট সেরে খবরের কাগজে মননিবেশ করেছে বিকাশ । রবিবার ও তিনটে খবরের কাগজ নেয় । প্রায় গোটা দিনটা কাগজ পড়েই কেটে যায় । ডাক্তার যদিও সিগারেট খেতে বারণ করেছে , তবু বিকাশ সিগারেট ছাড়তে পারেনি । তবে অনেক কমিয়ে দিয়েছে , দিনে দু- তিনটে । রেবা যদিও খুব রাগ করে । রবিবারের প্রথম সিগারেট আদ্ধেকটা পুড়েছে । একসঙ্গে অনেকটা ধোঁয়া ছাড়ার পর , হঠাৎ আগের রাতের স্বপ্নটা মনে পড়ে গেলো বিকাশের । স্বপ্নের খুঁটিনাটি ওইভাবে মনে থাকার কথা নয় । এক দৈত্যাকার পর্দায় যেন স্বপ্নটা ভেসে উঠছে । বিকাশ , অন্ধকার প্রেক্ষাগৃহে একা । সে বেড়িয়ে আসতে চাইছে , পারছে না । রবিবারের প্রাণচঞ্চল আবেশ থেকে দুরে সরে যাচ্ছে !  আজ এতোগুলো বছর পরে , রণবীরকে কেন সে স্বপ্নে দেখল ! রণবীরের মৃতদেহ সে দেখেনি , দেখার কথাও নয় , মৃত্যুর খবর পেয়েছিল । রণবীর কেন তাঁকে ওঁর পিঠে গুলির দাগ দেখাতে চাইল ?  দেবরেকা যে রণবীরকে পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিল , একথা তো বিকাশ জানে না । রণবীরের সঙ্গে তো সে কোনো বিশ্বাসঘাতকতা করে নি , তাহলে কেন স্বপ্নে রণবীর ওকে 'বিশ্বাসঘাতক'  বলল !  এই শব্দটা যেন একটা অলস চিউইং গামের মতন লেগে আছে , একরাশ অস্বস্তি নিয়ে । 'চোখের আলোয়... ‘ - মোবাইলটা বেজে উঠল । রেবা ফোন করেছে । শ্যামলীর মা কাজে এসেছে কিনা , পাম্প চালিয়েছে কিনা , বিকাশ ওষুধ খেয়েছে কিনা এইসব  রেবা ফোনে জেনে নিলো । ফোন রাখার আগে বলল - 'তোমার কমলা পাঞ্জাবিটা ইস্ত্রি করে রেখেছি । কাল বিয়েবাড়িতে ওটা পরে এসো ।'  ফোন রাখার পর, বিকাশের মনে পড়ল সকালে প্রেশারের ওষুধটা খাওয়া হয়নি ।

রেবার মুখ থেকে 'পাঞ্জাবি' শব্দটা শুনে কেমন একটা খটকা লাগলো বিকাশের । গতরাতের স্বপ্নেও রণবীর   বলেছিল , দেবরেকা তাঁকে একটা পাঞ্জাবি কিনে দিয়েছিল । সব কেমন যেন গুলিয়ে যাচ্ছে । স্বপ্নে শোনা কথাগুলো যে মিথ্যেও হতে পারে এমন সম্ভাবনার কথা বিকাশের মাথায় আসেনি । কেমন একটা শিশুসুলভ হিংসুটেপনা গ্রাস করছে বিকাশকে । বিকাশ আর রেবার বাইশ বছরের বিবাহিত জীবন , সন্তান নেই । বিকাশ আর রেবা সুখীই বলা যায় । যদিও জীবনে একটা সময় , 'সুখ'  শব্দটা , ব্যাঙ্কের সেভিংস অ্যাকাউনটের মিনিমাম ব্যাল্যান্সের মতন হয়ে যায় । সুখ আছে ভেবেই জীবনে বাঁচতে হয় , বাঁচতে বাঁচতে আর সুখ খোঁজা হয়ে ওঠে না । বিকাশ আর রেবা দুজনেই কলেজে পড়ায় । কলেজের ছাত্রছাত্রী , টিচার্স রুমের রোজকার একঘেয়ে   টিভি সিরিয়াল প্লট , সুগার-ইউরিক অ্যাসিডের হিসেব , এসব করে দিব্যি জীবন কেটে যাচ্ছিল । স্রোত ছিল না , কিন্তু জীবন ছিল প্রবহমান , আগাছায় আটকে যায়নি । হঠাৎ একটা শনিবারের রাতের স্বপ্ন এসে ক্যানভাসে রঙের জায়গায় একরাশ বিষণ্ণতা ঢেলে দিয়েছে । একটা স্বপ্নের পেছনে কেন সে এভাবে পড়ে আছে নিজেও জানে না । যেন সে ওই স্বপ্নের  রেশটার দ্বারাই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে । এক এক করে অনেক পুরনো কথা মনে পড়ে যাচ্ছে বিকাশের । উঁচু তাক থেকে পুরনো কথাগুলো নামাতে গিয়ে একরাশ জঙ্গি ধুলোর সম্মুখীন সে ।

তখন ৭০-দশক চলছে । নকশাল আন্দোলনে উত্তাল  পশ্চিমবঙ্গ । বিকাশ , দেবরেকা দুজনেই প্রেসিডেন্সী কলেজের পড়ুয়া । বিকাশ মধ্যবিত্ত ঘরের খুবই শান্ত , নিরীহ প্রকৃতির ছেলে । সে রাজনীতি বোঝে না , সে ডুবে থাকতো কবিতায় । নিজে অল্পস্বল্প লিখলেও , পড়তে ভালোবাসতো অনেক বেশী । সে যখন ইতিহাস বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র , দেবরেকা কলেজে ভর্তি হল বাংলা বিভাগে । কলেজের একটি অনুষ্ঠানে দেবরেকার গাওয়া রবীন্দ্রসঙ্গীত শুনে বিকাশ  তাঁকে ভালবেসে ফেলল । প্রথম দর্শনেই প্রেম !   যদিও দেবরেকার সঙ্গে যেচে গিয়ে আলাপ করার সাহস বিকাশের ছিল না । সময় নিজের ছন্দে এগিয়ে চলল । কলেজ স্ট্রিট , প্রেসিডেন্সী তখন উত্তাল । প্রায় সময় , গুলি , বোমা , পুলিশ । চারমাস বন্ধ ছিল প্রেসিডেন্সী । দেওয়ালে লেখা থাকতো - 'নকশালবাড়ি লাল সেলাম’ , 'কমরেড কাকা লাল সেলাম' ,  'তোমার নাম , আমার নাম , ভিয়েতনাম ভিয়েতনাম' । ফাইনাল পরীক্ষা পুরোটা দিতে পারেনি বিকাশ , ড্রপ দিতে হয় । পরীক্ষার মাঝখানে বাবা মারা যায় । সেই  সময় হিন্দু হস্টেলের বন্ধুরা তাঁকে আগলে রেখেছিল । মাকে সে হারিয়েছিল ছোটবেলায় । গোটা পৃথিবীতে হঠাৎ যেন একা হয়ে গেছিলো । বড় কঠিন সময় । দেবরেকার প্রতি ভালোবাসা বেড়েই চলেছে । ওই কঠিন সময়ে দেবরেকাকে পাশে পেতে  ভীষণ ইচ্ছে করতো ওঁর । অনেক চেষ্টা করেও ঘনিষ্ঠ বন্ধুদের কাছে তাঁর এই প্রেমের গোপন করতে পারেনি । যদিও বিকাশ জানতো , তাঁর এই প্রেম , কবিতার কল্পজগতের মতোই । মাঝে মাঝে , মনের আলমারির গোপন কুঠুরি খুলে সে ছুঁয়ে দেখত , তাঁর সঙ্গে দেবরেকার ভালোবাসার অলীক আদানপ্রদান । হিন্দু হস্টেলের রাতজাগা আড্ডায় বন্ধুরা অনেকবার সাহস যুগিয়েছিল , দেবরেকার সঙ্গে আলাপ করার । বিকাশ রাজী হয়নি , এমনকি কোনো চেষ্টাও করেনি । যদিও , দেবরেকা জানতো না বিকাশের এই যন্ত্রণার কথা । সে ভালোবাসতো , ফিজিক্সের রণবীরকে । রণবীর ছিল মেধাবী ছাত্র , মাধ্যমিকে র‍্যাঙ্ক করা ছেলে । রেড বুক , সি এম , ওয়ান শটার , লাল-সাদা , আর বেশ কিছু তাজা স্বপ্ন নিয়ে বাঁচত সে । রণবীর অনেকবার বিকাশকে নকশালপন্থী রাজনীতিতে উদবুদ্ধ করতে চেষ্টা করেছিল । না পেরে , বিকাশকে মধ্যবিত্তের এঁটো-কাঁটা বলে গালাগাল দিতো । একটা স্মিত হাসি বিকাশের কাছে কোনো উত্তর থাকতো না । সে রাজনীতির থেকে সহস্র হাত দুরে থাকতো । কলকাতার রাস্তায় কাঁদানে গ্যাস , বোমার গন্ধ , গুলির আওয়াজ তাঁকে যন্ত্রণা দিতো । হিন্দু হস্টেলের এক বন্ধু তিমির হঠাৎ হারিয়ে গেছিল । পরে খবর পায় হাজারিবাগ জেলে পুলিশ পিটিয়ে মেরে ফেলেছে ।   মনে হতো এ শহর ছেড়ে কোথাও পালিয়ে যায় । কিন্তু,  দেবরেকা পথ আটকাত কল্পনায় । একদিন খবর আসে , রণবীর মারা গেছে পুলিশ এনকাউনটারে ।

মাস্টার ডিগ্রি করার সময় ক্যালকাটা ইউনিভারসিটির ক্যাম্পাসে মাঝে মাঝেই দেবরেকাকে দেখতে পেতো বিকাশ । তাঁকে বড় অচনা লাগতো । কেমন যেন নির্জীব !  যেন বাতিল পাণ্ডুলিপির মতন নিজেকে ঘরের কোনে ছুঁড়ে ফেলে দিয়েছে । একদিন একই ট্রামে ফিরছিল ওঁরা দুজন , বসেছিল পাশপাশি । এতদিন পর বিকাশ দেবরেকার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করলো অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে । রণবীর আর বেঁচে নেই বলেই কি এই সাহসটা সে পেয়েছিল !   অবচেতন মস্তিষ্কে কত কিছুই চলে , সবকিছুর খোঁজ মেলে না । অন্যদিন হলে , দেবরেকা হয়তো একটা সৌজন্যমূলক চাহনি ছাড়া কোনো উত্তর দিতো না । কিন্তু, সেদিন বোধহয় যা যা হবার কথা ছিল না , সেগুলোই হয়েছিল । বিকাশ আর দেবরেকার কথোপকথন ছিল অতটাই দীর্ঘ , যা তাঁদের দুজনকেই নিজেদের গন্তব্য ভুলে যেতে বাধ্য করে । ট্রাম তার ডিপোতে পৌছবার পর তাঁদের কথোপকথনে ছেদ পড়ে । দেবরেকা অনেকদিন পর একটু হলেও হেসেছিল । আসলে ট্রাম ডিপোতে পৌছে যাবার পর সে কিঞ্চিত লজ্জা পেয়েছিল । সেই লজ্জা ঢাকতেই এই স্নিগ্ধ হাসি । এটাই ছিল শুরু । তারপর দেবরেকা চলে গেলো যাদবপুর ইউনিভার্সিটিতে গবেষণা করতে , বিকাশ ততদিনে ক্যালকাটা ইউনিভারসিটিতে রিসার্চ শুরু করে দিয়েছে । মাঝে মাঝে তারা দেখা করতো । উত্তর কলকাতার অলিগলি , গড়ের মাঠ ঘুরে বেড়াতো । তখন নকশাল আন্দোলন প্রায় শেষ , লক আপে মারা গেছেন চারু মজুমদার , হাজার হাজার শহীদের মৃত্যুতে সময় ক্লান্ত । মূর্তি ভাঙার রাজনীতি , লুম্পেনদের যথেচ্ছাচার , রাজনীতির নামে অযথা মানুষ খুন , সব মিলিয়ে সাধারণ মানুষের আর বিশ্বাস ছিল না নকশাল আন্দোলনের উপর । দেবরেকা আর বিকাশের মধ্যে সম্পর্ক তৈরি হয় , দেবরেকা হয়ে ওঠে বিকাশের রেবা । তারপর বিবাহিত জীবনের বাইশটা বছর কেটে যায় । বিয়ের আট বছর বাদে , একটা বুধবারের বিকেলে বিকাশ সামনে হঠাৎ করেই উদয় হয় , একটা উদ্ধত মেশিনগান । কলেজ ছুটির পর সরকারী বাসে চেপে সে বাড়ি ফিরছিল । বাসে ধীমানের সঙ্গে দেখা । চেনা মুশকিল , উপযুক্ত সময়ের আগেই যেন বুড়ো হয়ে গেছে । ও সিটি কলেজের ছাত্র ছিল । নকশালপন্থী আর একই পাড়ার ছেলে হবার সুবাদে রণবীরের সঙ্গে গলায় গলায় বন্ধুত্ব ছিল ধীমানের । হিন্দু হস্টেলে , রণবীর , ধীমান , আরও কয়েকজন মিলে গোপন মিটিং করতো । বিকাশকে দেখে ধীমান উৎফুল্ল হয়ে উঠল । ভিড় বাসে চিৎকার করে তাঁদের এই অপ্রত্যাশিত মুলাকাতের উচ্ছ্বাস জাহির করতে লাগলো । ধীমানের এমন ব্যবহার খুব মেকি ঠেকছিল , বিকাশের কাছে । কলেজ জীবনে ওঁদের মধ্যে এমন আহামরি কোনো সম্পর্ক ছিল না , যার জন্য এই অপ্রত্যাশিত সাক্ষাতে এমন বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস প্রকাশ করা যায় । ধীমান একরকম জোর করে , বিকাশকে কফি হাউসে টেনে নিয়ে গেলো । বিকাশ খুব জোর দিয়ে না বলতে চিরকালই অপটু । সে নিমরাজি হলেও , ধীমান যেভাবে ডানা ঝাপটাচ্ছিল , তাতে ওঁর কিছু করার ছিল না । ধীমান একটা সংবাদপত্রের অফিসে কাজ করে । বিকাশ নিজের সম্পর্কে প্রায় কিছুই বলেনি , এড়িয়ে গেছে দেবরেকার প্রসঙ্গ । ধীমানই কথা বলে চলেছে । শোনার চেয়ে বলার আগ্রহ অনেক বেশী তাঁর । এদিক-ওদিকের কথাবার্তার পর এসে গেলো রণবীরের প্রসঙ্গ । ধীমান একটুও না থেমে বলে চলল - 'শালা , রণবীর একটা গানডু । বেঘোরে প্রাণটা খোয়ালো । কিন্তু, শালা মরার আগে মস্তি করে গেছে । ওই মেয়েটা ছিল না , আরে কি যেন আনকমন নাম , হ্যাঁ মনে পড়েছে , দেবরেকা ।  রণবীরের জন্য পাগল ছিল । রণবীর ওকে আদেও ভালোবাসেনি কোনোদিন । কিন্তু, ওই ডানাকাটা পরীর নিজেকে সঁপে দেবার আর্তিটাকে ব্যবহার করতে ছাড়েনি । রণবীর যেদিন গিরিডিতে পালিয়ে যায় , তার আগের দিন দেবরেকা আমাদের বেলঘরিয়ার শেলটারে এসেছিল । রণবীরের হাতে বেশ কিছুক্ষন সময় ছিল , যা করার করে নিয়েছে । আমি একটা  ফুটো দিয়ে আবছা দেখেছিলাম ওই বায়োস্কোপ । শুনেছি , দেবরেকার বাপ ছিল কংগ্রেসি আমলা । শ্রেণীশত্রুর মেয়ের উপযুক্ত জায়গায় নকশালি বীর্যের গ্রেনেড চার্জ করেছিল কমরেড রণবীর । হা...হা...।'   একটা অট্টহাসি দিয়ে ধীমানের কথাগুলো শেষ হয় । যেন একটা নাটকের বিশেষ অংশ পড়ে শোনালো ধীমান । যেন অনেকদিন ধরে সে রিহার্সাল করে নিখুঁত করেছে তার প্রকাশভঙ্গী । বিকাশের কানে হঠাৎ তালা ধরে গেছে , সবকিছু ওলট-পালট হয়ে যাচ্ছে । কফি-হাউস গমগম করছে  নানান আড্ডা-তর্কে-আলোচনায় , সাদা উর্দি-পাগড়ি পরা বেয়ারার দল হাতে খাবার-কফির কাপ সাজানো প্লেট  নিয়ে আনাগোনা করছে । এসবের মাঝখানে বিকাশ যেন একটা ছন্দপতন !  ভীষণ রাগে ওঁর ভেতর থেকে একটা দমকা হাওয়া উঠে আসছে , মিলিয়ে যাচ্ছে ঠোঁটের কাছে এসে । ইচ্ছে করছে টেবিলে একটা সজোরে লাথি মেরে উঠে যায় । কিছুক্ষণ চুপ  করে বসে থাকার পর , টেবিলের উপর একটা কুড়ি টাকার নোট রেখে বেড়িয়ে আসে । নাকি পালিয়ে আসে বিকাশ !  ধীমান ওই কথাগুলো বলার পর একটাও কথা বলেনি , বিকাশ এভাবে হঠাৎ উঠে গেলে একবারও আটকায়নি । বিকাশ চলে যাবার পর ধীমানের মুখে লেগে ছিল নোংরা একটা হাসি, যে হাসি ধর্ষকের মুখে নির্যাতিতার রক্তমাখা যোনিতে বীর্যপাতের পর লেগে থাকে । একসময় ধীমান ভালবেসেছিল দেবরেকাকে । রণবীর ওঁদের আলাপ করিয়ে দিয়েছিল । দেবরেকা ধীমানকে সহ্য করতে পারতো না । দেবরেকা আর বিকাশের বিয়ের খবর সে পেয়েছিল । তারপর থেকে একটা ছুরি নিয়ে ঘুরতো । সুযোগ পেয়ে সেই ছুরি বসিয়ে দিয়েছে বিকাশে নরম বুকে । বিকাশ জানতো , ধীমান ভীষণ মিথ্যে কথা বলে । কিন্তু, কফি হাউসের কথাগুলোকে  মিথ্যে ভাবতে সে অসফল হচ্ছিল বার বার । অনেক মিথ্যে বললেও , হয়তো ধীমান এবার সত্যি বলছে !  এতদিন পর মিথ্যে বলেও বা লাভ কি !  বিকাশ নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তে পৌছতে পারে না । দেবরেকাকে এই কথাগুলো জিজ্ঞাসা করতেও পারবে না । কিন্তু, ধীমানের কথাগুলো সত্যি না মিথ্যে , ভাবতে ভাবতে বিকাশের মনের ভেতরে ক্যানসার সেলের মতন কিছু অস্থিরতা তৈরি হয়ে গেলো ।

বাড়ি ফিরে বিকাশ নিপুণভাবে সহজ থাকার অভিনয় করে গেছে । রেবা আন্দাজ করেছিল , কিছু একটা হয়েছে । বিকাশ বলে উঠতে পারেনি । ধীমানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা পুরোপুরি চেপে গেছে সে । সারা জীবনে এরকম অনেক কথা , অনেক যন্ত্রণা নিজের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছে । অনেক চেষ্টা করেছে প্রকাশ করার , কিন্তু স্তব্ধতার একটা বৃহৎ পূর্ণছেদ সে অতিক্রম করতে পারেনি । বাড়ি ফেরার পর , রেবার উপর রাগ হয়নি বিকাশের । শুধু একটা অবান্তর প্রশ্নে সে জেরবার হয়েছে দিনের পর দিন । তবে কি , রণবীরের বীর্য দেবরেকার যোনিতে  এমন একটা দাগ রেখে গেছে , যা তাকে কোনোদিন  গর্ভবতী হতে দিলো না !  রেবা কি বেলঘরিয়ার সেই শেলটারে মিলনের পর গর্ভবতী হয়েছিল , পরে হয়তো গর্ভপাত করিয়েছিল । হয়তো , সে কারনেই সে চিরকালের মতন সন্তান ধারণে অক্ষম হয়ে পড়ে !  উত্তর খুঁজে পায়নি বিকাশ । প্রত্যেকটা দিন এই প্রশ্নগুলোর সঙ্গে লড়াই করে সে বেঁচেছিল । সে স্বীকার হচ্ছিল অত্যন্ত সংকীর্ণ মানসিকতার । শুরু হয়েছিল মানসিক সমস্যার । রেবা কাছে এলে লিঙ্গত্থান হতো না বিকাশের । শুধু মনে হতো কোথাও যেন একটা দাগ লেগে আছে । রেবা ভাবত হয়তো সন্তান হয়নি বলেই , বিকাশের যৌনতা , অভ্যাসে পরিণত হবার আগেই হাত গুটিয়ে নিয়েছে  । আসতে আসতে বিকাশ স্বাভাবিক হয়েছে , রেবা ওঁর পাশে ছিল সবসময় । যদিও সে বিকাশের মনের গোপন কুঠুরিতে জোর করে প্রবেশ করার চেষ্টা করেনি । বিকাশও রেবাকে প্রচণ্ড ভালবাসলেও সেই গোপন কুঠুরির চাবি রেবার হাতে তুলে দিতে পারেনি । ধীমানের সেই ছুরির আঘাতে অনেক রক্তক্ষরণ হলেও , আসতে আসতে মিলিয়ে গেছে সেই আঘাতের দাগ । আজ কত বছর পর , একটা স্বপ্নের আঁচড় লেগে , সেই আঘাত যেন নদীর বুকে চরের মতন জেগে উঠছে । বিকাশ ভাবছে , সেই অবান্তর প্রশ্নগুলোর কাছে আবার সে হেরে যাবে !  বিকেল হতেই সে বেড়িয়ে পড়ল । গাড়িটা নিলো না , বাসে , ট্রামে , পায়ে হেঁটে ঘুরে বেরালো । কফি হাউস , প্রেসিডেন্সী কলেজ , কলেজ স্ট্রিট , সূর্য সেন স্ট্রিট , হিন্দু হস্টেল । কই , কোথাও কোনো দাগ নেই , কোনো ধীমান নেই , শুধু অনেক স্মৃতি পড়ে আছে । হয়তো শনিবার রাতের স্বপ্নের মতন , বহু বছর আগে ধীমানের সঙ্গে দেখা হওয়াটাও একটা স্বপ্ন । অনেক বাস্তব তো আসলে স্বপ্ন !

পরের দিন সোমবার , কলেজে ছুটি নিয়েছে । দমদম যেতে হবে , রেবার দাদার মেয়ের বিয়েতে । এই বয়সে বিয়েবাড়ি যেতে সে খুব একটা উৎসাহী বোধ করে না , ভদ্রতা রক্ষা করতে যাওয়া । কিন্তু, এবার যেন মনে একটা অদ্ভুত টান রয়েছে । যেন , রেবার সঙ্গে অনেকদিন পর আবার দেখা হবে !  কমলা পাঞ্জাবিটা পরে বাড়ি থেকে বেড়িয়ে গেলো বিকাশ । বাপের বাড়ির যেকোনো অনুষ্ঠানে রেবা হয় কেন্দ্রবিন্দু । রেবাকে ভারী সুন্দর লাগছে । ও খুব সুন্দর সাজতে পারে । অল্প অলংকার আর শূন্য অহংকারে  সে নিজেকে গড়ে তুলতে পারে সবার থেকে আলাদা । ওঁর রূপের মধ্যে অদ্ভুত এক স্নিগ্ধতা আছে , যা বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে আরও কাব্যিক হয়ে উঠেছে । বিকাশ পৌছতেই রেবা বলল - 'শোনো , মাটন কোর্মা হয়েছে । তোমার তো আবার মাটন দেখলে মাথার ঠিক থাকে না । বুঝে শুনে খাবে , আর পাঞ্জাবিতে ঝোলের দাগ লাগিয়ো না ।' 
'আর কোথাও কোনো দাগ লাগবে না'  - মনে মনে বলল বিকাশ ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি