সিকস্তি - রাজেন্দ্র

সিকস্তি - রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
---------------------

সকাল থেকেই একটানা বৃষ্টি পড়ে চলেছে । কাপড়চোপড় সব দরমার ঘরের ভিতরেই কোনওভাবে মেলে রেখেছে রানি । রোদ না ওঠা অবদি মাথার উপর টালির চালে জামা কাপড় মেলবারও কোনও উপায় নেই । আর মুন্নিটাও একটানা কেঁদেই চলেছে । সাবুটা সেই কখন সাতসকালে বেরিয়েছে নতুন মাস্টারের বাড়ি, এখনো হতভাগার ফেরার কোনও নামগন্ধ নেই । সাবুকে ইস্কুলে পাঠাতে হবে । তারপর রানিকে আবার গিয়ে হাজিরা দিতে হবে ব্লকের সেটেলমেন্ট অফিসে । আজ তার একটা জমির কেসের শুনানী আছে । এদিকে রাস্তার যা অবস্থা, চারদিকে শুধু থইথই করছে জল । ওদের বাড়িটা গঙ্গার পাড় ঘেঁষে, পশ্চিম নারায়ণপুর এলাকায় । এবার তো খুব একটা বৃষ্টিও হয়নি ওদের এখানে । হঠাৎ করে আজ ভোররাত থেকেই আকাশটা কালো । বৃষ্টি যে খুব জোরে পড়ছে, তাও নয় । তবুও চারদিকে এমন বানভাসি কেন যে হলো, ভগবানই জানে । মনে হচ্ছে বাঁধের জল ছাড়ছে কাল রাত থেকে । তাই ওদের এই অবস্থা । বৃষ্টি ধরবার কোনও নামগন্ধও নেই । কোনওরকমে প্লাস্টিক বোতলে তুলে রাখা জলে মুড়ি ভিজিয়ে মুন্নির পেটের চুল্লীতে জল ঢেলে দেয় রানি । গতরাতের বাসি ভাতে জল ঢালাই ছিল । তাতে এক চিমটে নুন মিশিয়ে দিয়ে এক টুকরো লেবু আর দুটো কাঁচালঙ্কা সাবুর জন্যে তুলে রাখে রানি । নিজেও ওর থেকে খানিকটা উদরস্থ করে ফেলে । ওর জমির সব কাগজপত্র আর দলিল খুবই নাকি প্রয়োজনীয়, একথা তাকে জানিয়েছিল ভোলা মুহুরী । আর সেটা রানি নিজেও বেশ ভালোই বোঝে । জমিটা কিনেছিল ওর শ্বশুরমশাই । কিন্তু জমিটা শ্বশুরের নামে রেকর্ড করা নেই । ওর বিয়ে হয়ে আসার পর পরেই শ্বশুরটা মরে গেল । এরপর গেল ওর মরদ । ফলে এখন জমিটা আর রেকর্ড না করালেই নয় । কে জানে, কোনদিন কে এসে হঠাৎ করে উৎখাত করে দেয় ওদের । আর ওর যা অবস্থা, তাতে কোনও মুহুরীর খরচও দিতে পারবে না । তবে ভোলা মুহুরী ওর উপর একটু বেশীমাত্রায় দয়াপরবশ । আর তার কারণটাও রানি বেশ ভালোই বোঝে । লোকে বলে অভাবে নাকি স্বভাব নষ্ট হয় । কিন্তু কই, তাকে তো রানি এখনো অবদি তেমন কোনও প্রশ্রয় দেয়নি । ভোলা পাশের গ্রামে থাকে । বেশিরভাগ সময়েই হাতে করে কিছু না কিছু নিয়ে আসে রানির জন্যে, ওর ছেলেমেয়ের জন্যে । এটা সেটা টুকটাক আনতে রানিও ওকে বাধা দেয়নি কখনো । ভোলা ওর চেয়ে হয়তো সামান্যই বড়ো হবে । বিয়ে থাও করেনি এখনো পাগলটা । তবে রানির সাথে কখনোই জোর জবরদস্তি কিছু করেনি ও । মনে হয় ওকে নিয়ে রানিকে এবার একটু ভাবতে হবে । তার আগে ওদের জমিটার একটা গতি করা খুবই দরকার । মুন্নির বাপকে ও অনেকবার বলেছিল জমিটা নিয়ে একটু ভাবনাচিন্তা করতে । ওর মরদ ছাক্কু মহালদার পেশায় জেলে ছিলো । মাছ মেরে দিন গুজরান হতো ওদের । ছাক্কুটা তিন দিনের জ্বরে সোজা উপরওয়ালার কাছে চলে গেল । ব্লক হাসপাতালের ডাক্তার তো কিচ্ছু করতে পারলো না । আর ওদের তো তেমন কিছু টাকা পয়সাও নেই, যা দিয়ে মালদা শহরে নিয়ে গিয়ে একটু ভালো চিকিৎসা করানো যায় । টাকাও যেমন ছিলোনা তেমনই ছিলোনা চিকিৎসার জন্যে যথেষ্ট সময়ও ।

- "মা, এসে গেছি । জলদি কিছু খেতে দেবা আমারে । খুব খিদা পেয়েছে গো"।

রানির হুঁশ ফিরে আসে । চটজলদি সাবুকে গতরাতের জল ঢালা নুনলঙ্কা ভাত তুলে দিতে দিতে বলে, - "বেটা, আজ আর তোকে ইস্কুলে যেতে হবেনি রে । চারদিকে কত জল দেখেছিস । কেমন সমুদ্রের মত ঢেউ খেলছে উঠান জুড়ে ইধারে উধারে । তার চেয়ে বরং পারলে কিছু চুনো মাছ তুলে আনিস । রাতে না হয় মাছের টক খাওয়া যাবে"।

সাবুর দারুণ খিদে পাচ্ছিল । কোনও কথা না বলে একমনে হুড়মুড়িয়ে ভাত খাচ্ছিল সে গোগ্রাসে । জলঢালা নুন লেবু লঙ্কা মাখা মোটা চালের ভাতগুলো এই মুহুর্তে তার কাছে ঠিক যেন অমৃতের মতোই লাগছে । সারাদিন রাতে মাত্র বার দুই খেতে পায় ওরা । কখনো সখনো একবেলাও কোনওমতে খেয়ে পড়ে বাঁচতে হয় । খাওয়া বলতে নদীর মাছ, ভাত, মড়ি আর শাচপাতা । জমিজমাও ওদের তেমন কিছুই নেই । থাকার মধ্যে শুধুমাত্র এই ভিটেখানা । ও নিশ্টিত বিশ্বাস করে, এই যন্ত্রণাটা তার আর কিছু বছরের । যদি কষ্টেসৃষ্টে ওর লেখাপড়ার গতি করে নিতে পারে, তবে ও একদিন সরকারী আধিকারিক হবেই হবে । ওর নিজের এলাকার মানুষের দেখভাল করবে । সুন্দর করে সাজাবে ওর জন্মভিটা ও চারপাশ । এখানে যতগুলো বিডিও এসেছে, সবকটা চোর আর অকর্মার ধাড়ি । শুধুই কন্ট্রাকটারের সাথে ওঠাবসা ওদের । আর ওদের কাজকর্মের সবটাই ভোটভিত্তিক । এখানে সাবুরাই সংখ্যালঘু । তাই ওদের নিয়ে উন্নয়নেরও কোনও মাথাব্যাথা নেই কোনও রাজনৈতিক দলের । সবাই হিসেব কষে লাভ লোকসান বুঝে উন্নয়নের রাজনীতি করে । এসব ভাবতে ভাবতেই খাওয়া সেরে ফেলে সাবু । রানি ততক্ষণে ট্রাঙ্ক খুলে জমির কাগজপত্র সব বের করছে । কাঁচা বয়সেই বিয়ে হয়ে গেছিল ওর । তখন ওর সবেমাত্র বারো কি তেরো । স্কুলের আঙিনাতেও পা রেখেছিল । তখন ওর ক্লাস সিক্স । বাংলাটা ভালোই পড়তে পারে ও । ইংরাজীতে নিজের নাম ও টুকটাক শব্দ বা বাক্যও গঠন করতে পারে । কিন্তু অভাবী মা বাবা । অনেকগুলো বোন ছিল ওরা ।তাই বিয়ে না করেও কোনও উপায় ছিলো না রানির । ওর মা অনেক কান্নাকাটি করেছিল বিয়ের আপত্তি এনে । কিন্তু টেকেনি সেই বাধা । খড়কুটোর মত সব উড়ে গেছিলো অভাবী পেটের তাড়নায় । বিয়ের পাঁচ বছরের ভিতর চার চারটে বাচ্চা হয়ে গেলো ওর । সাবু ওর মরদের প্রথম পক্ষের ছেলে । জন্মের সময় থেকেই ছেলেটা মা হারা । রানিকেই ও মা বলে জানে জ্ঞান হওয়ার পর থেকে । আর ওর নিজের সবকটাই তো মেয়ে । ছেলে হয়নি একটাও । ওর মরদ ছাক্কুর শরীরে ওর জন্যে কোনও দয়ামায়াই ছিলো না । মেয়েগুলো সবকটা প্রায় না খেতে পেয়েই মরে গেল । বেঁচে গেল শুধু শেষ জন, মুন্নি । এই ছেলমেয়ে দুটোকে ভালো করে লেখাপড়া করাতে চায় রানি । এসব ভাবতে ভাবতেই কাগজগুলো গুছিয়ে একটা প্লাস্টিক প্যাকেটে ভরে নিল ও । বাইরে থেকে ডাক ভেসে এল ভোলার, - "আরে ওই রানি, জলদি জলদি কর । হাতে একটু সময় নে চল । ওখানে বিরাট লাইন পড়ে যাবে গো । হাজিরা যত আগেভাগে দিবি, তত চটজলদি ডাক আসবে তোর"। রানি আর দেরী না করে বের হয়ে পড়ে । যাওয়ার সময় সাবুকে বলে যায় মুন্নির দেখভাল করতে ।

জল ইতিমধ্যে অনেকটাই বেড়ে উঠেছে । ওদের উঠানের মাটির পাঁচিলটাও পড়ি কি মরি অবস্থায় কাত হয়ে আছে । ছোট্ট টিনের ডোঙায় চেপে বসল ওরা দুজন । ছোট আকারের জন্য একজন বসলেই ভালো । কিন্তু রানির যে উপায়ও নেই । ডোঙা একটাই । আর সেটা ঐ পাগলা ভোলার । ওই বাঁশের লগি দিয়ে ঠেলা মেরে মেরে এগিয়ে নিয়ে চলছে ডোঙা । রানির সাথে ভোলার ছোঁয়া লেগে যাচ্ছে । দুজনেই চাপাচাপি করে বসা । দাঁড়ানোর কোনও সুযোগ নেই । কারণ দাঁড়ালেই উল্টে যাবে ডোঙা । অথচ ওর মন এখনো পড়ে আছে ঐ ঘরের চৌকাঠে । জলটা যে এখন কতদূর উঠলো ! আতঙ্কে বুক ধড়ফড় করে ওঠে রানির । ক্রমশ: ডোঙাটা বাজারে এসে ভেড়ে । এখানে এক হাঁটুর চেয়েও একটু বেশী জল জমে আছে । আরও খানিকটা যাওয়ার পর ওরা দুজন নেমে পড়ে । এখান থেকে এবার পায়ে চলা পথে যেতে হবে ওদের ।

- "আর কতটা দূর যাব রে ভোলা"?

- "এই তো । এসেই গেছি প্রায়, আর মিনিক পাঁচেক চলতে হবে রে"।

দেখতে দেখতে ওরা পৌঁছে গেল সেটেলমেন্ট অফিসে । ধবধবে সাদা রঙের দোতলা বাড়ি । একতলায় হাজিরা দিল ওরা । সাহেব নাকি অফিসে এসেই আবার বেরিয়ে পড়েছেন । এখনও এসে পৌঁছান নি । ভোলা খোঁজ নিয়ে জানালো যে কোথায় নাকি উনি পাট্টা খারিজের কেসে সরেজমিন তদন্ত করতে গেছেন । ফিরে এসে সব কেসের হিয়ারিং নেবেন । রানির ছটফটানি আরও বেড়ে গেল । সাবু নিজেই ছোট ছেলে । বোনের খেয়াল রাখছে ও একা একা নিজের লেখাপড়া ছেড়ে । ওদিকে এখন হালচাল কেমন কে জানে ।

অপেক্ষায় টেনশনে দেওয়াল ঘড়ির কাঁটা দু'টো ছুঁয়ে গেল । সাহেব অফিসে ঢুকে গেলেন । এসেই টিফিন সেরে চা খেলেন । তারপর প্রথম জনের ডাক পড়লো । রানির নাম আছে সাত নম্বরে । এই সবে মাত্র প্রথম জন গেল । রানীর বুক ধড়ফড় করছে । গলা শুকিয়ে যাচ্ছে । একটু ঢোক গিলে সে ভোলাকে বললে, -"আর কত দেরী হবে রে ভোলা"। ভোলা একটু কঠিন হয়ে চোখ পাকিয়ে চাইলো রানির দিকে -"তার আমি কী জানি বল্ ? কার কতক্ষণের ব্যাপার সেটা তো তার কেসের জটিলতার উপর নির্ভর করবে । তুই এখন চুপচাপ বসে থাক্ তো বাপু । এত কম ধৈর্য্য নিয়ে এ দপ্তরে পা বাড়াতে নেই রে রানি । কার কপালে যে কত হয়রানি লেখা আছে, তা কি কারো মুখ দেখে বোঝার উপায় আছে বল্ ? এই দপ্তরে পা রাখা আর শনির দশা লাগা একই ব্যাপার । বুঝলি"? সময়ের কাঁটা থেমে নেই । প্রায় সাড়ে তিনটে নাগাদ ভিতরে ডাক পড়লো রানির ।

পিওন এসে আওয়াজ দিয়ে গেল, -"রানি মহালদার"। আর কালবিলম্ব না করে দুরুদুরু বুকে অফিসারের ঘরে ঢুকলো রানি । সাথে ভোলা । সাহেব একবার রানির দিকে চাইলেন । আর একবার ভোলার দিকে ।

-"আপনি কি বাদী রানি মহালদার"?
-"জি হাঁ"
-"আর আপনি"? প্রশ্ন ধেয়ে গেল ভোলার দিকে ।
-"আজ্ঞে আমি ওর মুহুরী, সাহেব"।
এবার যেন সাহেব একটু বিরক্ত, -"তা হিয়ারিং এর সময় মুহুরী কেন"?

ভোলা জানত, সাহেব এই প্রশ্নই করবেন । সে তৈরী হয়েই এসেছিল, বলল -"সাহেব, ও তো লিখাপড়া তেমনি শিখে নাই । জমির ব্যাপারে কিছু জানার থাকলে আপনি আমাকেই জিজ্ঞাসা করেন সাহেব । এই কেসটা আমারই লিখা আছে"।

সাহেবের বেঞ্চ ক্লার্ক কাগজপত্র সব দেখে খুঁটিয়ে মেলাল । বলল, -"এই দাগ গুলো তো সব সিকস্তি হয়ে আছে । সিকস্তি জমি তো রাজ্য সরকারী সম্পত্তি । মানে ভেস্টেড । এই জমি কী করে রেকর্ড করাবে তুমি । এ জমি রেকর্ড হবে না । জমি যেমন আছে, তেমনি থাকবে"।

ভোলা সাহেবকে অনুরোধ করল । রানিও অনেক কাকুতি মিনতি করল । কিন্তু সাহেবের চিন্তা গলানো গেল না ।

সাহেব বললেন, -"আমার ডিলিং অ্যাসিস্টেন্ট ভুল তো কিছু বলেনি । ওটা আপনি আপনার দখলে রেখে দিন রানি দেবী । এখান থেকে রায়তের নামের রেকর্ড সংশোধন সম্ভব নয় । এ কাজ আমরা পারবো না । স্যরি । এই কেসের আবেদনটা আমি খারিজ করলাম"। অর্ডার শিটে কি যেন লিখতে লাগলেন সাহেব ।

নিরাশ হয়ে বের হয়ে এল রানি । এতটা পথ জল ঠেঙিয়ে এল ও । এতক্ষণ অপেক্ষা করে রইলো ওরা দুজন । আর শেষ পর্যন্ত কিনা ওর আবেদনটা বাতিল করে দিলেন সাহেব ! রানি সহজে কান্না কাটির মেয়ে নয় । তবুও এই অবস্থায় ওর চোখের কোণের এক প্রান্তে টলটল করতে লাগল আবেগের ধারা । শাড়ির আঁচলের খুঁট দিয়ে চোখ মুখ মুছতে মুছতে বের হয়ে আসছিল ও, এমন সময় অফিসের পিওন টা পিছন থেকে ডাক দিলো ।

-"আপনাকে ডাকছেন আমাদের সাহেবের অ্যাসিস্ট্যান্ট । একটু আসবেন"? একটু অবাক হলো রানি । ব্যাপার টা কী ? এই তো কেসখানা নাকচ হয়ে গেল ।

-"আবার কি দরকার আছে ওনার"?

-"সে আমি বলতে পারবো না, তবে মনে হচ্ছে আপনার কেসখানা নিয়ে কিছু বলতে চান দামোদরবাবু"।

রানি বুঝে নিল দামোদরবাবু বলতে ঐ সাহেবের অ্যাসিস্টেন্ট এর কথাই বলছে পিওনটা । মনে এক ঝলক আশার ফুলঝুরি চলকে উঠল ওর । দেখা যাক কি চায় ও । টাকা পয়সা চাইলে ও যে করে হোক, সেটা ধারকর্জ করে বন্দোবস্ত করতেই হবে ওকে । জমিটা যে করেই হোক, হতছাড়া করা চলবে না কোনওমতে । একবুক আশা বেঁধে লাফাতে লাফাতেও দামোদরবাবুর কাছে গেল ।

গোলগাল নাদুস নুদুস দামোদর তখনও সাহেবের সাথে বসে অবশিষ্ট কেসের হিয়ারিং গুলো নিচ্ছিল । রানি কে তার মোটা ফ্রেমের চশমার ওপর দিয়ে আড়চোখের ইশারায় বাইরে অপেক্ষা করতে বলল সে । প্রায় পৌনে পাঁচটা অবদি সাহেবের সঙ্গ দিয়ে এবার নিজের টেবিলে গেল ও । বাইরের বেঞ্চে বসে থাকা রানিকে কাছে ডাকল । চা খেতে বলল । রানির তখন ঘরে ফেরার জন্য মন ছটফট করছে খাঁচায় বন্দী পাখির মতো । চা খাওয়ার জন্য একটুও মেজাজ নেই তার ।

-"বলেন সার্, কেন ডাকলেন"?
-"ভাবছি সাহেবকে বলে কয়ে তোর কাজটা আমি করিয়ে দেব, তবে .."
-"কত দিতে হবে বলেন"?
-"ওরে, আমি কি টাকার কথা বলেছি নাকি"?
-"তবে"?
-"দেখ, আমি জানি তুই একলা মেয়েছেলে । অনেক অভাব অসুবিধা তোর । ঐ টুকু জমি পেলে তোর একটু সুরাহা হয়"..
-"সে তো হবেই । কিন্তু আপনিই তো প্রথমে বলে দিলেন, ঐ কাজ করবেন না"।
-"আরে পাগলী, সে তো সাহেবের সামনে বলেছি । সাহেব যখন অন্য কাজ করবেন, তখন আমি তোর কেসটা কম্পিউটারে ভরে টুক করে সাহেবের অ্যালাউ করা কেসের ভিতর মিশিয়ে দেব । স্যার টের পাবেন না । তোর কেসটা তামিল হয়ে তোর নামে খতিয়ান খুলে যাবে । তবে কাজটা খুবই রিস্কি । ধরা পড়লে আমার কপালে অনেক দুঃখ আছে । চাকরি নিয়েও টানাটানি হতে পারে আমার"।
-"আমি অতশত বুঝি না, কি দিয়ে কি ভালো হবে তা আপনিই দ্যাখেন । শুধু আমায় কত কী দিতে হবে বলেন ? আমি যেমন করেই হোক, ধারদেনা করে..."

কথাটা শেষ করতে পারলো না রানি । শেষ বিকেলের ফাঁকা অফিসঘরে ওর একটা হাত চেপে ধরল লোভী দামোদর । ব্যাস, সাথে সাথে বাঘিনীর মতো ক্ষেপে উঠল রানি । সপাটে একটা চড় বসিয়ে দিলো সে জানোয়ারটার গালে । মুখের চিবানো পান এক থাপ্পড়ে বাইরে ছিটকে এল, সোজা পড়লো ওর সামনের টেবিলটায় ।

আর একটুও দাঁড়িয়ে থাকতে ভালো লাগছিলো না সবার চোখে কাঁচা বয়সের বিধবা, রানি মহালদারের । চোখের জল শুকিয়ে গেছিল রাগে ।মাথাটা বেশ দপ্ দপ্ করতে লাগলো ওর । কোনওমতে নিজেকে সামলে নিয়ে, দামোদরকে হতভম্ভ করে, অফিসের বাইরে ওর অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা ভোলার সাথে বাজারের দিকের পথ ধরল ও । বাজারের একপ্রান্তে এসে আবার ডোঙায় চড়ে বসল ওরা । এবার ও নিজের হাতে তুলে নিল বাঁশের লগিখানা । ভোলা কোনওরকম নিষেধ করলো না । কারণ ও জানে এখন রানি কারো কোনও কথাই শুনবে না ।

আরও কিছুটা সময় কেটে গেল চুপচাপ । কানে শুধু বাজছে লগি ঠেলার শব্দ । ভোলা চুপচাপ মাথা নীচু করে বসেছিল । দূরের আকাশটা এখন টকটকে লাল আপেলের মত রঙ ধরেছে । একফোঁটা মেঘের চিহ্ণমাত্র নেই কোথাও । অনেকটাই চলে এসেছে ওরা । চারদিকে শুধু ঢেউ আর ঢেউ । কোথাও কোনও ডাঙার হদিস নেই । মাথার উপর দিয়ে এক ঝাঁক সাদা বক উড়ে গেল ।

হঠাৎ ও শুনলো জলের উপর সজোরে কিছু একটা লাফিয়ে পড়বার শব্দ । মুখ তুলে চাইলো ভোলা । দেখল রানি জলে ঝাঁপিয়ে পড়েছে আর আঁতিপাতি করে খুঁজছে ওর ভিটাবাড়ি । বন্যার জল বাড়তে বাড়তে ওর ঘরের দেওয়াল সহ পুরো বাড়িটাকেই নদীর পেটে ভরে ফেলছে । রানি পাগলীর মত চারপাশের ঘোলাটে জল দাপিয়ে কিছু যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে ।

চোখেমুখে তার একটাই কথা, একটানা আপনমনে সে বিড়বিড় করে চলেছে -"সব ভেস্ট হয়ে গেল, আমার ঘরদোর সন্তান.. সব নদীর কোলে সিকস্তি হয়ে গেল"।

(সমাপ্ত)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি