রাতের চাদর - রাজেন্দ্র
- ভাই, তবে ঐ কথাই রইলো । আমি চললাম । তুই শুক্রবার চলে আসিস । একসাথে শনিবার বই পাড়ায় যাবো ।
- হ্যাঁ দাদা, তবে শুক্রবার টাই ফাইনাল রইলো কিন্তু । তুমি আবার অন্য কোথাও ব্যস্ত হয়ে পড়ো না যেন ।
- আরে না না ভাই । তুই এতদূর থেকে আসবি । আর আমি সেটা ভুলে যাব ! কি যে বলিস না তুই । শোন, আমি এখন টোটো থেকে নামছি । রাখলাম রে ।
টোটোওয়ালা কে ভাড়া মিটিয়ে দিয়ে স্টেশনের প্রধান প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেল অর্ণব । মেন গেট পেরোতে না পেরোতেই মাইকে ঘোষণা শুরু হয়ে গেলো - শিয়ালদাগামী গৌড় এক্সপ্রেস এক নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে ।
অনুর কাকার ছেলের বিয়ের অনুষ্ঠান । তাই সপ্তাহের মাঝেই যেতে হচ্ছে ওকে । তার উপর আবার উকিলের সাথেও কথা বলতে হবে ভাড়াটে উচ্ছেদ নিয়ে ।
অনু হচ্ছে ওর সহধর্মিনী অনুশ্রী । ওরা আগে ভাগেই চলে গেছে যাদবপুরে । ওর আগামীকাল বিকেলের ভিতর ওখানে যাওয়ার কথা ।
অনুর খুড়তুতো ভাইয়ের শ্বশুরবাড়ি এলাহাবাদে । পাত্র পাত্রী কলকাতায় একসাথে চাকরি করবার সূত্রেই এই আলাপ আর তার পরেই এই বিয়ের সম্বন্ধটা তৈরী হয় ।
অর্ণব বেশ ফুরফুরে ঝরঝরে মেজাজ নিয়ে এস ফোর স্লিপার ক্লাসে গিয়ে উঠলো । এই টিকিট টা ওকে আচমকাই কাটতে হয়েছে । কারণ এই বিয়ের অনুষ্ঠানটার কথা ও একেবারেই ভুলে মেরে দিয়েছিল । হঠাৎ করেই দিন পনেরো আগে অনুর সাথে কথার সূত্রে ওর আবার এই তারিখটা মনে পড়ায় বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পড়েছিলো ও । তারপর শেষবেলায় এক এজেন্টকে ধরে একটা আর.এ.সি. সীট ম্যানেজ করা গেছে, অর্থাৎ দুই জনে মিলে একটা সীট ভাগাভাগি করে শেয়ার করে গোটা রাত যেতে হবে ।
এমন ভাবে যেতে একটুও অভ্যস্ত নয় ও । এই জাতীয় অভিজ্ঞতা ওর এই প্রথমবারের মতো । ও জানে না, আদৌ বিশ্রাম পাবে কিনা ওর ক্লান্ত অবসন্ন দেহটা । এমনিতেই ট্রেনের দুলুনিতে ওর ঘুম আসতে চায় না । তার উপরে রয়েছে আবার ব্যাগ সাফাই হয়ে যাবার মতো বাড়তি টেনশন । যদিও ওর সাথে একটাই লাগেজ । তবুও এই তৃতীয় বিশ্বের দেশটার এই জাতীয় পরিষেবায় ওর নিজেকে যথেষ্টই অপ্রস্তুত বলে মনে হয়েছে একাধিকবার । এবার অবশ্য পরিস্থিতিটা একেবারেই আলাদা । এক সীটে দুই জন প্রাপ্ত পূর্ণবয়স্ক মানুষ যে কেমন করে দুই হাত পা মেলে দেহ ছড়িয়ে রাতের ট্রেনযাত্রায় আরামে ঘুম লাগাতে পারে, সেটা একটা গভীর আশ্চর্যজনক বিষয় ওর কাছে ।
- এই যে ভাই, আপনার পা খানা একটু সরাবেন দয়া করে ?
অর্ণবের ভাবনার স্তর শরতের মেঘের মত এক ধাক্কায় খন্ড বিখন্ড হয়ে গেলো । একজন ষাটোর্ধ প্রৌঢ় একটা চাকা লাগানো বড়োসড়ো ভি.আই.পি ট্যুরিস্ট ব্যাগ হাতে ওর দিকে তাকিয়ে । সঙ্গে রয়েছেন খুব সম্ভবতঃ ওনার সহধর্মিনী । মুহূর্তের জন্য অর্ণবের চোখ আটকে গেল ওদের গতিপথের দিকে । ও একটু সরে গিয়ে বসলো আর আড়চোখে দম্পতির গতিবিধি লক্ষ্য করতে লাগলো । ভদ্রলোক বেশ শ্যামবর্ণের সুন্দর নির্মেদ চেহারার । আর ওনার সাথের মহিলার গায়ের রঙ ঠিক একেবারে যেন দুধে আলতায় । আর চেহারা এবং মুখশ্রী মিলিয়ে সুন্দরী বললেও কম করে বলা হয় ।
ফোনের রিঙটোন বাজতে লাগলো । অনু ফোন করেছে - কাল কখন ঢুকছো ?
- সাড়ে ছ'টা থেকে সাতটা বেজে যাবে কিন্তু । আর গিয়েই আবার দশ'টা নাগাদ বেরোতে হবে । একটু উকিলের সাথে কথা বলে নেব ।
- দুপুরে লাঞ্চ করবে তো ?
- সেটা এখন থেকে কি করে বলবো বলো ? উকিল কতক্ষণ সময় নেবে সেটা এখন থেকে কেমন করে বুঝবো ? আগে তো বাড়িতে ঢুকি । তারপর না হয় ভাববো । তেমন হলে দুপুরে বাইরেই কিছু একটা খেয়ে নেবো । ট্রেন ছাড়বে একটু পরেই । আমি বরং এখন রাতের খাবার টা খেয়ে নিই ।
ফোন রেখে ব্যাগ খুলে পলিপ্যাকে মোড়ানো রুটি আর তরকা বের করলো অর্ণব । সাথে সকালের খবরের কাগজও ছিল । সেটা সীটের উপর পেতে নিলো । ইতিমধ্যে ওর সীটের আরেকজন ভাগীদারও এসে হাজির - এক্সকিউজ মি স্যার ? উইল্ ইউ প্লিজ্ কেয়ার টু শেয়ার দিজ্ সীট্ উইথ্ মি ? আই অ্যাম্ পি. জোজো ।
অর্ণব একটু হেসে বললো - ইয়েস্ । অফ্ কোর্স । বাট রাইট নাউ, আই অ্যাম হ্যাভিং মাই ডিনার স্যার্ । ক্যান ইউ প্লিজ ওয়েট ফর ফিউ মিনিটস্ ?
মিস্টার জোজো সহাস্যে বললেন - ডেফিনিটলি ইয়েস্ । প্লিজ্ হ্যাভ ইওর ডিনার । আই অ্যাম্ গোয়িং টু টয়লেট ফর স্মোকিং । প্লিস টেক কেয়ার অফ্ মাই ব্যাগ । আই অ্যাম কামিং ফিউ মিনিটস্ আফটার । এনজয় ইয়োর মিল্ স্যার ।
অর্ণব আর দেরী করা সমীচীন মনে করলো না । চটজলদি হাল্কা গরমাগরম রুটি আর তরকা খেতে লাগলো । সাথে পেঁয়াজ আর কাঁচা লঙ্কাও ছিলো । খেতে খেতেই ওর চোখ বার বার চলে যেতে লাগলো সামনে বসে থাকা দম্পতির দিকে । ঐ সুন্দরী মহিলাটি তার সামনের সীটে বসে থাকা বরকে বার বার বলতে লাগলেন ঠিকমতো করে খাওয়া দাওয়া করতে আর সময়মতো ওষুধ গুলো খেতে ।
গাড়িটা একটু নড়েচড়ে উঠলো । এতক্ষণে ছাড়বে হয়তো । ওর খাওয়াও প্রায় শেষ । সামনে বসে থাকা ভদ্রলোকটি তার স্ত্রীকে বিদায় জানিয়ে ধীরপায়ে নেমে চলে গেলেন । ইতিমধ্যে স্মোকিং পর্ব সমাপ্ত করে মিস্টার জোজোও সহাস্যে উপস্থিত । বেশ হাল্কা মেজাজের ফুরফুরে বলে মনে হচ্ছে ওনাকে ।
জোজোকে নিজের ব্যাগটা দেখতে বলে টয়লেটের দিকে এগিয়ে গেলো অর্ণব । বেসিনে গিয়ে হাত ধুয়ে নিলো । ওর ডান হাতের টয়লেটের দরজাটা ভিতর থেকে বন্ধ করা । বামদিকের টাও তাই । কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো ও গেটের হাতল ধরে । ট্রেন ছুটতে শুরু করেছে ।
হাওয়ার কনকনে ভাবটা অনেকটাই স্তিমিত । ঠান্ডাটা আগের মত নেই আর । টয়লেটের দরজাটা খুলে গেলো । একজন বেরিয়ে আসতেই ও টয়লেট সেরে হাতমুখ ধুয়ে রুমাল দিয়ে মুছতে মুছতে নিজের সীটে এসে হেলান দিয়ে বসে পড়লো । ওর সামনে মুখোমুখি আপার মিডল্ লোয়ার মিলিয়ে ছ'টা বার্থ । নীচের বার্থ দুটোর একটাতে ঐ মহিলা আর অপরটায় একজন বয়স্ক ভদ্রলোক । সুন্দরী ভদ্রমহিলা একাই চলেছেন তবে ।
ইতিমধ্যেই অর্ণবের বামদিকের সীট থেকে উঠে এল প্রায় ওরই সমবয়সী একজন । চেহারা অনেকটাই ভারী । মাঝারি উচ্চতার । উজ্জ্বল শ্যামবর্ণ । বছর চল্লিশের আশেপাশেই হবে বয়স । পরণে বারমুডা এবং হাতকাটা গোল গলার নীল টি-শার্ট । পায়ে ঘরে পরার স্লীপার ।
ওনাকে দেখেই ভদ্রমহিলাকে যেন খুব উৎফুল্ল বলে মনে হলো - আরে, কি ব্যাপার ? কোথায় যাওয়া হচ্ছে ?
- যাই, রাতে শোবার আগে একটু টয়লেট ঘুরে আসি । ফিরে এসে আড্ডা দেব ।
ইতিমধ্যে মিস্টার জোজোও আবার একবার টয়লেটের দিকে গেলেন । খুব সম্ভবতঃ স্মোকিং করবেন ।
অর্ণবের ফোনের রিঙটোন আবার বেজে উঠলো - সাহেব, ঝামেলাটা শেষ । গণেশদা ছাড়া পেয়েছেন ।
- বাহ্, খুব ভালো খবর দিলে গো । তা এখন উনি কোথায় ? আছেন কেমন ? শরীর ওকে তো ?
- হ্যাঁ স্যার । ওকে আছেন । এখন উনি বাড়িতেই । যা ঝড় গেলো ওনার উপর দিয়ে ।
- সবটাই ওপরওয়ালার ইচ্ছে । তিনি যা ভাবেন, সেটাই করান । আর আমরা শুধু পুতুলের মতো ওনার নির্দেশে আঙুলের ডগায় খেলতে থাকি ।
- স্যার কি আগামী সপ্তাহে আসবেন ? আমার স্যার একটু কথা ছিলো আপনার সাথে । একটা ব্যাপারে আপনার একটু মতামত নিতাম ।
- বেশ তো, আমি আগামী সোমবার ভোরে চলে আসবো । একটু বেলা করে অফিস যাবো । তখন না হয় এসো । এখন আমি রাখি । চলন্ত ট্রেনে কথা শুনতে খুব সমস্যা হয় ভাই ।
ফোন কেটে যেতে না যেতেই ওর বাম সীটের লোকটি টয়লেট থেকে ফিরে এসে ওর সামনে বসা ভদ্রমহিলার সীটে গিয়ে বসলো । এ কথা সে কথা বলতে বলতেই ওরা ওদের উল্টোমুখের নীচের বার্থে হেলান দিয়ে বসে থাকা বয়স্ক ভদ্রলোকটির সাথেও গল্প জুড়ে দিলো । অর্ণবের নজর বার বার চলে যেতে লাগলো ওদের কথোপকথনের দিকে ।
এদিকে মিস্টার জোজোও আবার স্মোকিং সেরে এসে ওনার সীটে বসে পড়লেন । কানে হেডফোন গুঁজে মনের আনন্দে গান শুনতে লাগলেন সীটে হেলান দিয়ে ।
অর্ণব গণেশবাবুর সাথে ঘটে যাওয়া দুর্ঘটনার কথা ভাবছিলো । মহিলার পাল্লায় পড়ে এমন ফাঁসা ফেঁসে গিয়েছিলো বেচারা যে আর বলবার নয় । নারী জাতটা সত্যিই অদ্ভুত । কেউ যেন বটগাছ । .......
Comments