প্লবতা বাড়ানোর চেষ্টায়
প্লবতা বাড়ানোর চেষ্টায় _ রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
-------------------------------------------------------------
সুমির কাছে সকাল বেলাতেই এক পশলা মুখ ঝামটা খেল সৌম্য । সদ্য সে বিছানা ছেড়ে উঠেছে । ব্রাশটাও করেনি । রান্নাঘরে গিয়ে গ্যাসের ওভেন অন করে জলটা গরম করতে বসিয়ে বেসিনের সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে, এমন সময়ে সুমির টিক টিক শুরু । উফফফ্, এভাবে রোজ ঘ্যানর ঘ্যানর শুনতে শুনতে সৌম্য কেমন যেন পাথরের মতো অবশ অসাড় হয়ে যাচ্ছে । এখন ও শুধুই বাক্যবাণে একতরফা চুপচাপ বিদ্ধ হয় । ক্ষত বিক্ষত হয় । রক্তক্ষরণের পাট চুকে গেছে অনেক আগেই ।
একমনে ব্রাশটা সেরে নিল সৌম্য । গরম জল নামিয়ে লেবু আর মধু মিশিয়ে চুমুক দিতে দিতে পেপারটা দেখতে লাগল ও । এরপর বাজার সেরে ওকে অফিস ছুটতে হবে । পান থেকে সামান্যতম চুন খসলেই ওর জন্য রাশি রাশি মুখ ঝামটা বরাদ্দ । খবরগুলো কোনওমতে গিলেই বাজারের দিকে দৌড় দিল সৌম্য ।
সবেমাত্র সব্জীর বাজারটা শেষ করে মাছের বাজারে ঢুকতে যাচ্ছে, ঠিক তখনই মোবাইলের রিঙটোনটা বেজে উঠল,
- হ্যাঁ রে সৌমেন, বল্ ।
- ভাইটি, বড় বিপদে পড়েছি রে । পারলে একটু আয় আমার এখানে ।
- সে না হয় যাব, কিন্তু হয়েছেটা কী শুনি ?
- ভাই রে, এখানে খুব চুরি চামারি শুরু হয়েছে মাস খানেক ধরে । মা বাবা তো উত্তরাখন্ডে ঘুরতে গেছে দিন কয়েক হলো । বাড়িতে তো এখন আমি একাই আছি । কিন্তু আমার আবার একটা কল্ এসেছে ভুবনেশ্বর থেকে । আমি আজই রাতের ট্রেন ধরব । কাল বাদে পরশু আমার ইন্টারভিউ । না গেলে একটা খুব ভালো সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে । আর তুই তো নিজেও খুব ভালো করেই জানিস, এখানে চাকরির বাজার কেমন । আমি খুবই টেনশনে আছি রে ভাই । আর এই সময় সবার আগে আমার তোর কথাই মনে এল ।
- বেশ তো, আমি না হয় যাব । কিন্তু রান্না বান্না ? আমিতো আবার তোর মত হাত পুড়িয়ে খেতেও পারিনা ।
- আরে, সে সব নিয়ে তোর কোনও চাপ নেই । আমি পাড়ায় দাদা বৌদির ভাতের হোটেলে বলে দিচ্ছি । ওরা হোম সার্ভিসও দেয় । তুই আগামী তিনটে দিন এখান থেকেই অফিস আসা যাওয়া করিস । তোরও কদিন একটু অন্যরকম লাগবে । সুমিতা বৌদিকে একটু ম্যানেজ করে নে ভাই ।
- আচ্ছা বেশ । আজ অফিস ফেরতা তোর সাথে দেখা করে চাবিটা নিয়ে নেব না হয় ।
- না না ভাই, তুই রাতের গল্প করিসনা । একটু কষ্ট করে দিনের বেলাতেই চলে আয় । আর তোর এখানে ড্রিঙ্ক করলেও তো সমস্যা হবেনা । আমার হার্ড ড্রাইভ মেমরি টাও রেখে দিচ্ছি কম্পিউটারের সাথে অ্যাটাচ করে । যত খুশী সিনেমা আর গান নিয়ে সময় কাটাস ।
- ওকে ভাই । তবে আমি অফিসে একটু দেরী করেই না হয় যাব । লেট দিলে দিক গে । আর তেমন দেরী হয়ে গেলে যাবোই না । যা ঘন্টার মাইনা পাই, সেন্ট্রালের একটা গ্রুপ-ডি স্টাফও তো প্রায় আমাদের সমান সমানই মায়না পায় এখন ।
- বেশ, তবে আয় তুই । আমি না হয় একটু পেপার্স গুলো গুছিয়ে নিই আর জামাকাপড়গুলোও প্যাকিং করে নেই এই ফাঁকে ।
ফোন্ কাটার সাথে সাথেই সৌম্য ঠিক করে নিল একেবারে চার-পাঁচ দিনের বাজার টা সেরে নেবে । সুমিকে সৌমেন এর বাড়িতে যাওয়ার ব্যাপারে একবার জানাবে । ওর যা যা লাগতে পারে, সেগুলো কিনে দিয়ে হাতে আপৎকালীন কিছু টাকা পয়সাও দিয়ে আসবে সৌম্য ।
বাজারের ব্যাগটা রেখে, বেসিনের লিক্যুয়িড সাবান দিয়ে হাত ধুতে ধুতে, সৌমেনের পুরো ক্রাইসিস টা সংক্ষেপে বলতেই ক্ষেপে লাল হয়ে গেল সুমি,
- তোমার এই বন্ধুপ্রীতিই একদিন কাল হবে দেখে নিও ।
- এমন করে বলতে নেই সুমি । সৌমেন আমার অনেক বছরের বন্ধু । আমার কিছু বেস্ট ফ্রেন্ডের ভিতর ও একজন ।
- কই, এমনিতে তো তোমার ব্যাপারে কাউকে বিশেষ খোঁজ নিতেও দেখিনা । আর বেস্ট ফ্রেন্ডদের হয়ে কীর্তন গেয়ো না তো । যেখানে যাচ্ছ যাও । আমার হাড় জুড়াবে কটা দিনের জন্য ।
সৌম্য আর কথা না বাড়িয়ে চুপচাপ শেভিংটা সেরে নিল । ওকেও কিছু জামাকাপড় নিতে হবে । ব্রাশ তোয়ালে চিরুণী ভরতে হবে । কোন পথটা দিয়ে সৌমেনের বাড়ি যাবে ও সেটা ভাবতে ভাবতেই প্যাকিং আর স্নানটা সেরে নিল । কিচেনে গিয়ে দেখল রান্না বলতে প্রায় কিছুই করেনি সুমি ওর জন্যে আলাদা করে । সৌম্যর এইসব এখন অভ্যেস হয়ে গেছে । ও চট্ করে চার চামচ ছোলার ছাতু একটু বীটনুন আর লেবু দিয়ে গুলে নিল । এটা পেটে গেলে বেলা দুটোর আগে আর পেটে ছুঁচোয় ডন বৈঠক করবে না । গাঢ় নীল জিনসের প্যান্ট আর সাদা টী শার্ট পড়ে বেরিয়ে এল ও ।
হিন্দমোটর থেকে ট্রেন ধরে রিষড়া রেল স্টেশনে এসে নামল । আর নামার সাথে সাথেই শুরু হলো ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি । প্ল্যাটফর্মের টিনের ছাদ জল পড়ার শব্দে মড়মড় করতে লাগল । ছাতা খুলে স্ট্যান্ডে এসে দাঁড়ালো ও । না অটো, না কোনও টোটো, শুধু সামনের শনি মন্দিরের সামনে একটা আধভাঙা রিক্সা আর তার জীর্নদেহ চালক । রিক্সাওয়ালাটার সামনে এগিয়ে গেল সৌম্য,
- ঘাটে যাবেন নাকি দাদা ?
- যাবো, ত্রিশ দিতে হবে ।
- সেকি, পনেরো তো ছিলো । একেবারে ডবল্ কেন ?
- দেখুন, যাওয়ার হলে চলুন, মেলা সময় নষ্ট করবেন না আমার । আপনি না গেলেও আমার ভাড়ার অভাব হবে না । আজ অটো টোটো সব বন্ধ । কিচ্ছু পাবেন না । না উঠলে পায়ে হেঁটে যান ।
সৌম্য আর কথা না বাড়িয়ে উঠে পড়ল রিক্সায় । দরাদরি করে কোনও লাভ নেই এদের সাথে । দীর্ঘ একটা সময় তো এদেরই একচেটিয়া রাজত্ব ছিল । আর তারপর অটো টোটোর যুগে এদের জোরজুলুম দাদাগিরি তো একেবারেই শেষের পথে । ভাবতে ভাবতে খেয়াঘাট অবদি চলে এল মাঝবয়সী রিক্সাওয়ালা ।
ভাড়া মিটিয়ে ও এগিয়ে গেল টিকিট ঘরের দিকে । খেয়াপারের জন্যে ব্যক্তিপিছু ভাড়া পাঁচটাকা । এইবারে একটু বেকায়দায় পড়ে গেল সৌম্য । ওর কাছে তো পাঁচ টাকার খুচরো নেই । টিকিট কাউন্টারের লোকটারও খুচরো চাইই চাই । অগত্যা উল্টোদিকের একটা দোকানে ঢুকলো ও । গোটা তিনেক চুইংগাম নিতে হলো ওকে । টিকিট টা কেটে টি শার্টের বুক পকেটে রেখে নৌকার দিকে এগোল ।
ইতিমধ্যে বৃষ্টিটা আবার শুরু হয়ে গেছে । এবারে যেন আরও জোরে নেমেছে । সাথে বইছে তুমুল এলোপাথারি জোলো হাওয়া । ছাতাটা উল্টে গেল একবার । পড়ি কি মরি করে এবার জেটির দিকে আরও জোরে জোরে পা চালালো সৌম্য ।
লোহার বিশাল জেটি টা ভেসে আছে গঙ্গার উপর । এই পাড়ের মূল ভূখন্ডের সাথে জেটিটা জোড় দেওয়া আছে ব্রীজের মাধ্যমে । ব্রীজটার কাঠামোটা লোহার হলেও পায়ে চলা পথটায় বড়ো বড়ো কাঠের পাটাতন পাতা ।
প্রচন্ড পিছল হয়ে আছে যাতায়াতের গোটা পথটাই । খুব সাবধানে পা না ফেললে যে সমুহ বিপদের সম্ভাবনা পদে পদে, এটা খুব ভালো করেই জানা আছে ওর । খুব সন্তর্পণে ও ব্রীজটা পার করে চলে এলো ভাসমান জেটির উপর, যেখানে গোটা দুই ছোটবড় খালি নৌকা দড়ি ফেলে বাঁধা আছে ।
একজন মাঝ বয়সী মহিলা যাত্রীও ওর সামনে দাঁড়িয়ে ছিল হাতে একটা শপিং ব্যাগ নিয়ে । তাকেই ও প্রশ্ন করে বসলো,
- ও মাসিমা, একটু বিরক্ত করছি আপনাকে ।
মহিলাটি একমনে ওপার থেকে ভেসে আসা নৌকার দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিলেন । সৌম্যর কথায় মাথাটা একবার ঘোরালেন ।
- বলছি ওপারে যাওয়ার নৌকা আসবে কখন ? এই দুটো তো মনে হচ্ছে আর যাবেনা ।
- ঐ তো, ঐ নৌকাটা যাত্রী নিয়ে যাবে । ওপারের থেকে দ্রুতগতিতে ভেসে আসা একটা যাত্রীবোঝাই নৌকা জল ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে আসতে দেখা গেল ।
এদিকে বৃষ্টি এখন বেশ চরমে । হাওয়াতে সব ওলটপালট অবস্থা । জেটির লাগোয়া একটা চায়ের দোকানের টিনের চালটা সশব্দে উড়ে গেল । পাশেই মোবাইল টাওয়ার । তার উপর কানে তালা লাগানো আওয়াজ করে চোখ ঝলসানো আলো এসে ঠিকরে পড়লো । মাথাটা মুহূর্তের জন্য ঘুরে গেল সৌম্যর । মনে হলো ওর যেন এখুনি মাথা ঘুরে পড়ে যাবে । কিন্তু তেমন কিছুই হলো না । ও বুঝতে পারলো যে ভাসমান জেটিটা প্রচন্ড রকম ভাবে দুলছে । গঙ্গার ঢেউগুলো ক্রমশ ফুলে ফেঁপে উঠছে ।
ইতিমধ্যে ওর মতন আরও কিছু যাত্রী জড়ো হয়েছে চারপাশে । সবাই কমবেশি আতঙ্কিত । দুই একজনের কোলে বাচ্চা । তারা কোনওমতে নিজের মাথা আর বাচ্চাকে বাঁচাতে ব্যস্ত । এলোপাথাড়ি হাওয়া আর বড় বড় বৃষ্টির ফোঁটাগুলো যেন শপাং শপাং করে চাবুকের মতো আছড়ে পড়ছে পিঠের উপর । আর সেই চাবুকের আঘাতে যেন ধুয়ে যাচ্ছে ওর সমস্ত রক্তক্ষরণের জমাট বাঁধা দাগ ।
মোবাইল টা বাজছে । সৌমেন ফোন করেছে । সম্ভবত কতদূর আছে ও এখন, সেটাই জানতে চায় । ও আর ফোনটা বের করলোনা ব্যাগ থেকে । যা জলের ছাঁট, ভিজে গেলে খুব সমস্যা হবে ওর । আর এই একটাই সর্বসাকুল্যে ফোন ওর । খারাপ হলে ওর সমস্যার শেষ থাকবে না ।
ইতিমধ্যে যাত্রীবোঝাই নৌকো এসে দড়ি ফেলেছে ভাসমান লোহার জেটির উপর, যার উপর ওরা সকলে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছিল । একজন বয়স্ক মানুষ দুলন্ত নৌকা আর লোহার জেটির মধ্যে সামঞ্জস্য রাখতে না পেরে জলেই পড়ে যাচ্ছিল প্রায়, যদিনা সৌম্য ওনাকে শক্ত করে ধরে ফেলত ।
- কাকু, সাবধানে চলবেন তো । দেখছেন তো, কি খারাপ অবস্থা ।
- আর অবস্থা । আটান্ন চলছে । এখনো এই সামনের কারখানায় আসি । একজন মেয়ের বিয়ে এখনও বাকি । একটিমাত্র ছেলে বেকার । গিন্নী শয্যাশায়ী ।
ভদ্রলোক আপনমনে আরো কি সব বলতে বলতে সামনের দিকে এগিয়ে গেলেন । ওনার যাওয়ার পথের দিকে একদৃষ্টে চেয়েছিল সৌম্য । তারও কেমন যেন গুলিয়ে উঠছে শরীর খানা ।
হঠাৎ মাঝির ডাকে ওর ঘোরটা কেটে গেল,
- ও দা'বাবু, আসেন এবার । নাও ছাড়তি হবেক ।
সৌম্য সামনে তাকালো । সারি সারি কালো কালো মাথা ছাউনির ভিতর গাদাগাদি করে ঠাসা । তিলধারণেরও বিন্দুমাত্র জায়গা নেই । নৌকার সামনের দিকে সাইকেল আর গোটা দুই বাইক হেলান দিয়ে রাখা ।
সৌম্য ছাউনির ভিতর মাথা গোঁজার ঠাঁই পেলো না । অগত্যা ছাতা মাথায় বাইরের দিকে দাঁড়িয়ে রইলো । মাঝি ততক্ষণে জেটির থেকে দড়ি খুলে পা দিয়ে একটু ঠেলা দিয়ে দিলো নৌকায় । নৌকো টা অসম্ভব রকম দুলতে লাগলো ঢেউএর ধাক্কায় । বৃষ্টির ফোঁটাগুলো ক্রমশ বড়োসড় আকার ধারণ করল । অতো দম আটকানো ভিড়ের ভিতর থেকেই কয়েকজনের মুখ খুলে গেল, - একটু দেখে শুনে, সাবধান ! সামনে বান ।
সৌম্য এতদিন শুধু বান শব্দটা কানেই শুনেছে, কখনো দেখেনি । এবার সে দেখল তার অসাধারণ পৌরুষ । পাগলের মত বিশাল বিশাল এলোপাথাড়ি ঢেউ এসে আছড়ে পড়তে লাগলো ওদের নৃত্যরত দোদুল্যমান নৌকায় ।
ওর মনে পড়ে গেল ছোটবেলার সেই বর্ষার মেঘাচ্ছন্ন আলোআঁধারি দিনগুলোর কথা । বাড়িতে উঠোনময় শুধু জল আর জল । ও বাড়ির হোমওয়ার্কের খাতার পৃষ্ঠাগুলো খুব যত্নসহকারে খুলে নিত আর বানাতো কাগজের নৌকা । নৌকাগুলোর কয়েকটা হাঁটু জলের আকুলিবিকুলি সামলে নিতে নিতেও শেষরক্ষা করতে পারত না । আর বাকিগুলো টালমাটাল অবস্থা সামলেও ভিজে তলিয়ে যেত কিছুক্ষণ যেতে না যেতেই । আজকের এই বৃষ্টিভরা গঙ্গার বুকে এমন জলোচ্ছ্বাস দেখে সৌম্য র মনে হলো যেন সে কাগজের নৌকো চড়ে পাড়ি দিয়েছে জীবনে শেষবারের মতো ।
ও চটজলদি ব্যাগ খুলে ভিতরে রাখা দুই লিটারের জলের বোতলখানা বার করল । কিছুটা খেলো শুকিয়ে আসা গলা ভেজাতে । বাকিটা ও ঢেলে ফেলে দিল । খালি বোতলের ভালো করে মুখ বন্ধ করে আবার তাকে পিঠের ব্যাগে ভরে ফেলল । এরপর সে তার ব্যাগের ভিতর রাখা কালো বড়ো পলিপ্যাক টা বের করলো । ভিতরে রাখা আপেল টা সে কিছুটা কামড়িয়ে খেল । বাকিটা ছুঁড়ে ফেলে দিলো জলে । এরপর ফুঁ দিয়ে পলিব্যাগটা ফুলিয়ে নিয়ে বেলুনের মতো করে মাথায় একটা গিঁট মেরে দিল ।
পাশের একজন মোটাসোটা গোলগাল মতো যাত্রী ওর কান্ডকারখানা মনে দিয়ে লক্ষ্য করছিল, - এসবের মানে কী দাদা ? আপনি কি ভাবছেন আমরা সকলে নৌকাডুবি হয়ে মরবো ? আর আপনি একা বহাল তবিয়তে ও পাড়ে উঠবেন ?
- আরে না না, তেমন কিছুই না । ঐ একটু প্লবতা বাড়ানোর চেষ্টা আর কী ।
বাতাস ভরা পলিথিনের প্যাকেটটা নিশ্চিন্তে ব্যাগে ভরে নিল সৌম্য ।
ইতিমধ্যেই নৌকা চলে এসেছে ঘাটের কাছাকাছি । তেমন কিছুই অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটলো না । নৌকা এসে নিশ্চিত নিরাপদে ভিড়লো খেয়াঘাটে । সকলেই একে একে নামতে লাগল । এ নৌকা যে কাগজের নয় আর চালকহীন অসহায় দিশেহারা নয়, তা টের পেতে ওর বেশি সময় লাগলো না ।
এপাড়েও ভাসমান জেটির সামনে কংক্রিটের ঢালাই করা সেতু । ঘাটের মুখে একজন টিকিট পরীক্ষক ওর জন্যে অপেক্ষারত । লোকটা ঈষৎ বেঁটে ও গোলগাল প্রকৃতির সদাহাস্যময় অবয়ব নিয়ে একটা কাঠের বেঞ্চে বসে আছে । সৌম্য এগিয়ে গেল । পকেটে হাত দিয়ে টিকিট টা হাতড়ে বের করে তুলে দিল লোকটির হাতে । তারপর আবার জোরকদমে পা চালালো ।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো এখন একটু ধরেছে । মিনিট দশেক টানা হেঁটে ও পৌছে গেল বি.টি.রোডের ধারে । সৌমেনের বাড়িটা এখানেই কাছাকাছি কোথাও একটা হবে । মোবাইল বের করে দেখলো গোটা তের খানা কল্ । সবকটাই সৌমেনের । এবার ও কল্ লাগালো,
- ভাই, এসে গেছি তোর এলাকায় । থানার পাশেই গায়ে লাগানো রাস্তার মাথায় আমি অপেক্ষা করছি । তুই আয় ।
- সে তো আমি আসছি । কিন্তু তোকে হতচ্ছাড়া এতবার আমি কল্ করলাম । ফোনটা ধরলি না কেন তুই ?
- কি করে ধরবো ভাই বল্ ? একটা মাত্র সবেধন নীলমনি ফোন আমার । আর যা বৃষ্টির নমুনা । জল লেগে বারোটা বেজে গেলে আমার যে সর্বনাশ হয়ে যেতো ।
- বেশ, তুই মিনিট দুই দাঁড়া ভাই । থানার উল্টোদিকের বাসস্ট্যান্ডেই অপেক্ষা কর ।
- হ্যাঁ, আমি এখানেই অপেক্ষা করছি । তুই আয় । আমি অপেক্ষা করছি ।
এম.পি.ল্যাডের টাকায় তৈরী নতুন ঝকঝকে বাসস্ট্যান্ডের সিটে বসলো সৌম্য । ওর পাশেই এক কোণে একটা শতছিন্ন পোষাকের পাগলা গোছের লোক বসা । গান দিয়ে তার উৎকট পূতিগন্ধ ভেসে আসছে । এখানে বসাই ওর কাছে দায় । পাশেই অটো আর রিক্সার লাইন । কি অদ্ভুত ব্যাপার রে বাবা । গঙ্গার ওপারে অটো টোটোর দেখা মেলাই ভার । আর এপারে গমগম রমরমা ব্যাপার ।
পিঠের পিছনে একটা আলগা চাঁটি এসে পড়লো ।
- ভাই, এসে গেছি ।
- এবার চল দেখি তোর বাড়ি । প্যাকিং কমপ্লিট আশা করি ?
- আর প্যাকিং ! এই জন্যেই তো তোকে তেরো চোদ্দোবার কল করলাম । তুই তো ধরলিই না ।
- আমি ঝড় বাদলের দিনে রাস্তায় থাকলে মোবাইল ধরিনা রে ভাই । তুই তো জানিস আমার পকেটের হাল হকিকত । তোকে তো আর আমার লুকোবার নেই কিছু । আর তুইও এতবার ফোন করলি কোন্ দুঃখে ? আমি তো আসবো বলেই দিলাম । না আসার হলে তো তোকে তখনই না বলে দিতাম । অদ্ভুত পাগলা তো তুই !
- আচ্ছা শোন্, যে জন্য তোকে এতবার কল্ করলাম, তার কারণটা একটাই ।
- সেটা কি এমন হাতিঘোড়া মার্কা কথা যে মোবাইল ছাড়া জানান দেওয়া যাবে না । এই টুকু সময় কি তোর অপেক্ষা না করলে চলছিল না হতভাগা?
- আরে, আমার কথাটা তো শোন্ । আসার পর থেকে শুধু বকেই চলেছিস ।
- আচ্ছা বেশ । বলে তুই । আমি শুনি ।
- শোন্, তোকে কল্ করে আমি প্যাকিং শুরু করে দিলাম । এমন সময়ে ফোন এলো ঐ স্টিল কোম্পানির । বিশেষ কারণবশতঃ ওদের ইন্টারভিউ নেওয়ার কাজ এখন স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ওদের ম্যানেজমেন্ট প্রশাসন । আবার ওরা পরে ফোন ও মেইল করে আমাকে সময় ও তারিখ জানিয়ে দেবে ।
- সুতরাং আজ তোর যাওয়ার প্রোগ্রাম স্থগিত । আর আমাকে ফিরে যেতে হবে আবার ঘরের ছেলে ঘরে ।
- স্যরি ব্রাদার । এই জন্যেই তোকে আমার অতোবার কল করা, যাতে আর তোকে কষ্ট করে এতটা এসে আবার ফিরে যেতে না হয় ।
- তবে আর কি কাজ বল তোর বাড়িতে ঢুকে? আমি বরং অফিস চলে যাই । ওখানের কাজ সেরে আবার বাড়ি ফিরে যাব । এদিকটায় আর আসছি না ।
- ভাই, রাগ করিস না । মনখারাপ ও করিস না । কি করবি বল্ ? এতো আমার হাতেই ছিলোনা । আমিও কি জানতাম যে এমনটা করবে ওরা ।
- যাক্ গে । বাদ দে এসব । আমি চললাম অফিসে ।
- ভাই রে, কিছু মনে করিস না প্লিজ । এক্সট্রিমলি স্যরি ।
- আরে না না, বন্ধুদের ভিতর নো স্যরি । ফর্ম্যালিটি রাখ । আমি এগোলাম । তুই ভালো থাকিস ভাই ।
- আরে দাঁড়া না রে ভাই । শোন্ না । কথা আছে ।
- আচ্ছা বল্ ।
- বলছি তোর বাড়ি আর অফিস তো জানেই যে তুই এখানে এসেছিস ।
- তো ?
- কি তো ? শোন্, আজ বরং তুই আমার এখানেই থেকে যা । আমি ভালো স্কচ হুইস্কি এনে রেখেছি । সাথে দারুণ দারুণ সব চাট জোগাড় করে নেব । এখন তুই আমার বাড়ি চল । স্নান খাওয়া সেরে বিশ্রাম নে । সিনেমা দ্যাখ । তারপর না হয় বিকেল করে আমরা বসে পড়ব । একদম শেষ রাত অবদি আসর চলবে । আমি আমার আরো দুটো বান্ধবীকে ডেকে নিচ্ছি । ওরা খুব ফ্রী মাইন্ডের । আর খুব দিল খোলা । তোর মন খুশ করে দেবে আজ ওরা । চল আমার সাথে । সামনেই ভালো রেস্টুরেন্ট আছে । যা যা খাবি আনিয়ে নেব ।
সৌম্য হাঁ করে অবাক হয়ে গিলছিল সৌমেনের সব কথাগুলো । মদ অবদি ব্যাপারটা ঠিকই ছিল এতক্ষণ । এতদিন পর দুই বন্ধুর দেখা ।একটু আধটু আনন্দ ফুর্তি হতেই পারে । কিন্তু তাই বলে মেয়েমানুষ নিয়ে .... !! যদি প্রেমিকা হতো, তবুও ওর কেমন বাধো বাধো ঠেকত । আর এই হারামজাদা টা বলে কী এসব ! ও বললো,
- দেখ ভাই, তোর মদ অবদি যে পরিকল্পনা, তাতে আমার কোনও আপত্তি নেই । কিন্তু তুই পরের যে অংশটা বললি, তাতে আমার প্রবল অনীহা । আমার নিজের বউএর সাথেই আমার মানসিক টানাপোড়েন এতটা যে আমরা আলাদা ঘরে রাত কাটাই । আর তুই বলছিস ... না না ভাই, আমি নেই তোর এসবের মধ্যে । তুই বরং একাই ওদের ডেকে এনজয় নে । আমি এমন মানসিকতার সাথে একটুও অভ্যস্ত নই । আমি বরং আসি ।
- আরে দাঁড়া না ভাই । অত জলদি জলদি সিদ্ধান্ত টানিস না । এতদিন পরে পেলাম তোকে । বেশ, তোর কথাই রইলো । কাউকে ডাকছিনা । এখন তুই চল্ তো আমাদের বাড়িতে । এবার তো আর কোনও সমস্যা হবার কথা নিয়ে তোর ।
ওরা দুজনে এগিয়ে গেল বাসস্ট্যান্ড ছেড়ে । এদিকটায় কোনও গাছপালা নেই । চারদিকে শুধুই বহুতল । কংক্রিটের চিরস্থায়ী জঙ্গল । এই জঙ্গলে ধনী মানুষদের অধীনেই বাকি সব জীবজগৎ । এই ধনীরা অধিকাংশই কালো টাকা আর তার সুদ হিসেবে সব রকমের পাপ জমিয়ে রাখে নানা উপায়ে । মদ মেয়েছেলে জুয়া নানা রকম নেশার সম্ভারে এদের জীবন যেন রঙিন প্রজাপতি । এক ফুল ছেড়ে অন্য ফুলে আনাগোনাতে এরা অনন্য ।
বাড়িতে ঢোকার আগে এক প্যাকেট মার্লবোরো সিগারেট নিলো সৌমেন । আসার সময় ও পনেরো লাখ টাকার হার্লে ডেভিডসন বাইক নিয়ে এসেছিলো । মডেলের নাম ফ্যাট বয় । এই মডেল হিন্দি সিনেমাজগতের দুই তারকাও ব্যবহার করে । সঞ্জয় দত্ত আর শাহিদ কাপুর । সৌম্যর নিজের কোনও বাহন নেই তেমন । ছিল একটা বাবার আমলের হিরো সাইকেল । তাও আবার সেকেন্ড হ্যান্ড । সেটার ব্যবহার এখন আর প্রায় হয়না বললেই হয় । তবুও বাইক নিয়ে তার একটা ফ্যান্টাসি কাজ করে । তার মনে হয় সেও একদিন বুদ্ধ ইন্টারন্যাশনাল সার্কিটে রেসে অবতীর্ণ হবে তার নিজের বাইকে চেপে ।
ভাবতে ভাবতেই ওরা এসে দাঁড়ালো সৌমেনের বিশাল বাগানবাড়ির সামনে । ক্যামেরা বসানো দরজার ডিজিটাল ফিঙ্গারপ্রিন্ট লকিং সিস্টেম বাঁ হাতের তর্জনীর সাহায্যে খুলে ভিতরে প্রবেশ করলো ওরা । বাড়ির সামনের অংশে দুই পাশ জুড়ে বিশাল বড়ো বাগান । মাঝখানে রয়েছে দুটো স্করপিও গাড়ি পাশাপাশি চলার মত মোরাম দেওয়া চওড়া উঁচু রাস্তা । জল জমে প্যাচপ্যাচে কাদা বা কাগজের নৌকা ভাসানোর কোনও সুযোগ এখানে নেই ।
ওরা ভিতরে ঢোকার সাথে সাথেই টেপ করা মহিলার স্বরে ওদেরকে স্বাগত জানানো হলো । এখানে সব ঘরেই স্বয়ংক্রিয় সেন্সর বসানো । ওদের ঘরে ঢোকার সাথে সাথেই আলো ফ্যান জ্বলে উঠল । ঘরের উষ্ণতা আর ভয়েস কম্যান্ড অনুসারে আলো পাখা আর উষ্ণতা নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে এখানে । মেঝেতে কাশ্মীরি গালিচা, কাঁচের জানলার উপর ভারী পর্দা, মেহগনী কাঠের আসবাব সামগ্রী, সবকিছুই যেমন কোন বিদেশী সিনেমার প্যালেস বা পাঁচতারা হোটেলগুলিতে দেখা যায় ।
সৌম্যের মাথাটা একটু ধরেই ছিল । সম্ভবত কিছুটা বৃষ্টি ভেজার কারণে আর বাকিটা এই বিলাস বৈভবে ।
- যে ভাই, স্নানটা সেরে ফেল্ । আমি এই ফাঁকে খাবার গুলো হাল্কা হাল্কা গরম করে নেই মাইক্রোওয়েভ এ ।
সৌমেনের কথামত সৌম্য প্রথমে গেল বাথরুমে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিতে । ব্যাপক খিদে পেয়ে গেছে ওর । সেই কখন বের হয়েছে । বাথরুমে ঢুকেই আরেক প্রস্থ মাথাটা ঘুরে গেল ওর । যেই দরজা খুলেছে আলোটা জ্বলে উঠলো আর এক্সজর্জস্ট ফ্যানটাও নিজের মতো করে ঘুরতে শুরু করলো । কলের কাছে গিয়ে দাঁড়াতেই ওর বাঁহাতে এক ফুট তফাতে দেওয়ালে সাঁটা একটা বাক্স থেকে ভেসে এল নির্দেশ । ও ঠান্ডা গরম মেশানো জলের কথা বলতেই কল থেকে জল বের হতে লাগল ওর কথামতো ।
সৌমেন ভাবলো শুধু চাকরি বা ব্যবসার ধনে সাধারণ বাঙালী এত কিছু করতেই পারবেনা । সৌমেনের বাবা রাজ্যের অগ্নি নির্বাপন দপ্তরের উচ্চষদস্থ সরকারী আধিকারিক । সম্ভবতঃ এখন উনি দপ্তরের ডাইরেক্টর জেনারেল । মানুষ হিসেবে খুব একটা সুবিধার নয় । ঘুষখোর আধিকারিক হিসেবে খুবই দুর্নাম ওনার । এমন লোকের বাড়ি তো এই ধরণের হওয়াই খুব স্বাভাবিক ।
সৌমেনের মা গত হয়েছেন বছর দুয়েক হলো । এখন যাকে ও 'মা' বলে সম্বোধন করে, তিনি ওর বাবার দ্বিতীয় পক্ষের । ওর বড়ো ভাই ব্যাঙ্গালোরে বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন নিয়ে পড়া শেষ করে এখন ওখানেই কর্মরত ।
স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে ডাইনিং এ গিয়ে বসলো ওরা দুজন । একটি বছর কুড়ির মেয়ে এসে খাবার বেড়ে দিলো ওদের । সৌমেন আলাপ করিয়ে দিলো, - এই হলো সোনালি । বাড়ি ক্যানিং লাইনে । আমার দেখভাল করে । বাবার এক ক্লায়েন্ট ওকে আমাদের এখানে রেখে দিয়ে গেছে । ওর মা বাবা কেউ নেই ।
- দেখভাল করে মানে ? তুই কি বাচ্চা নাকি ! না কি বয়সভারে অসুস্থ রোগী ?
সৌমেন একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ে, - এগজ্যাক্টলি ঠিক তা নয় । আসলে ঘরের দেখাশোনার সাথে সাথে আমারও সমস্ত প্রয়োজন মেটায় ও ।
সৌম্যের আর এসব দেখতে শুনতে ভালো লাগছিলো না । কতখানি পরিবর্তন হয়ে গেছে ছেলেটার মানসিকতা । অতিরিক্ত প্রাচুর্য বোধহয় স্বভাব আর অভ্যেস দুটোকেই এই ভাবে অবনতির দিকে ঠেলে দেয় । একসময় এই ছেলেই ওদের বাকি সকলের মত মেয়েদের দিকে চোখ তুলেও চাইত না । মদ সিগারেট বা অন্য কোনও নেশার ধার ধারত না কেউ । নেশা বলতে ছিলো শুধু ফুটবল ক্রিকেট আর সাইকেল চেপে টো টো করে ঘোরা । সময় যে সৌমেনকে এতখানি পাল্টে ফেলেছে, এটা যেন ভাবতেই পারছেনা সৌম্য ।
খাওয়া শেষ । হাতমুখ ভালো করে ধুয়ে দাবার বোর্ড সাজিয়ে বসলো ওরা । সোনালি এসে বলে গেল কোনও প্রয়োজন পড়লেই যেন ওকে ডাকা হয় । এখন ও শুয়ে বসে গড়িয়ে টিভিতে সিরিয়াল দেখবে রোজকার মতন নিয়ম করে । খেলাটা যখন একটু জমে উঠেছে, এমন সময় সৌমেন একটু অপেক্ষা করতে বলল সৌম্যকে, - একটু বস্ ভাই । আমি তোর আর আমার জন্য সোনালিকে দুটো পেগ বানাতে বলি ।
- তার কোনও দরকার নেই ভাই । আমরা কি কিছু কম যাই বল ? কেন, তোর কি মনে নেই, শিলাজিৎদের গঙ্গার ধারের সেই পুরানো বাড়ির ছাদে আমরা চারজন মিলে প্রথমবার বীয়ার খেলাম । সেদিন আবার স্বরস্বতী পুজো ছিল । আমরা ভোগ খেয়ে নিলাম একটু আগেভাগে । মনে পড়ছে কী কিছু ?
সৌম্য মাথা দুই পাশে দোলালো । অর্থাৎ কিছুই মনে নেই ওর, শুধু বললো, - চল্, স্কচের বোতলটা বের করি । বরফও লাগবে সাথে । আপেল শশা ডাঁসা পেয়ারা বীটনুন আর কাঁচালঙ্কা দিয়ে চাট বানাতে বলে দিই সোনালিকে ।
সোনালি গদিওয়ালা সোফায় পায়ের উপর পা তুলে একমনে দেহটা এলিয়ে টিভি দেখছিল । সৌমেন নিঃশব্দে ওর পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো । তারপর আলতো করে ওকে জড়িয়ে ধরে কানের কাছে মুখটা নিয়ে গিয়ে খুব আদুরে আদুরে গলায় বলে উঠলো,
- সোনু ডার্লিং, একটু উঠতে হবে যে । ফলগুলো একটু স্যালাডের মতোন করে কেটে নুন লঙ্কা ছড়িয়ে দাও । আমরা একটু ড্রিঙ্ক করবো ।
সোনালি যেন খুব বিরক্তির সাথে সোফা ছেড়ে উঠে গেল কিচেনের দিকে । এখানে খাঁচায় বন্দী ডানাভারী পাখির মত অসহায় জীবন ওর । কোথাও গিয়ে যে নিজের মতো করে মেয়েটা বাঁচবে, এমন বিকল্প উপায়ও ওর নেই । এখানে তবুও সে যেমন খুশি খেতে পড়তে পাচ্ছে । এইসব তৃতীয় বিশ্বের দেশে বাপ-মা মরা অসহায় মেয়েদের জীবনে এর থেকে বেশি ভালো কিছু আশা করাটাই বোধকরি অন্যায় ।
সোনালি ফিরে এলো । মেয়েটা সালোয়ার পরে আছে । আহামরি রকমের সুন্দরী নয় । তবে মুখটায় একটা লক্ষীশ্রী ভাব রয়েছে । বেশ নরম আর মিষ্টি স্বভাবের আচরণ । কোনও ডাঁট বা অহঙ্কারের লেশমাত্রও নেই ।
ফ্রুট স্যালাড রেডি । বেলাও এখন অনেকটাই । বাইরের অবস্থা ঘর থেকে বোঝার উপায় নেই । হয়ত অন্ধকার হয়ে এসেছে । পেগ তিনেক শেষ হওয়ার পর টেবিল ছেড়ে উঠলো সৌমেন,
- ভাই, একটু বস্ । আমি জল ছেড়ে আসছি । এক নম্বর লেগেছে জোর ।
সৌম্যেরও যে বাথরুমে যেতে মন করছিল না, তা নয়, ওটা বলে উঠলো, - বেশ তো । চল্ । আমিও সেরে আসি এক প্রস্থ । তোদের এখানে তো অতিরিক্ত বাথরুম আছে আশাকরি ?
- সে আর বলতে ! সব ঘরে একটা করে অ্যাটাচ বাথরুম করা আছে । তুই যেটায় খুশী যা । হাল্কা হয়ে আয় ।
সৌম্য হাল্কা ঘোরে বিলাস বহুল আলো আঁধারিতে যেন হারিয়ে ফেলল নিজেকে । ভুলবশতঃ এগিয়ে গেল সামনের বসবার ঘরে । ঘরে ঢোকার মুখেই একটা চরম ধাক্কা খেল ও । দেখল সৌমেন আর সোনালি একে অপরকে সাপের মতো জড়াজড়ি করে মেঝের কার্পেটের উপর গড়াগড়ি খাচ্ছে ।
সোনালি বোধহয় সৌমেনের নাগপাশ থেকে নিজেকে আপ্রাণ ছাড়াতে চাইছে,
- ছাড়ো আমায়, প্লিজ আমাকে ছেড়ে দাও । পায়ে পড়ি তোমার । এসব আমার একটুও ভালো লাগছে না । রোজ এমন করে উন্মত্ত মদ্যপের মত হিংস্রতা আমার ভালো লাগেনা । আজ আমার শরীরটাও ভালো না ।
- নাগো, এখন যে ছাড়তে পারবো না তোমায় । একটু আদর তো করতেই হবে তোমাকে । নইলে তো তুমি জানোই, আমি কি করতে পারি ।
- এই সৌমেন, কি করছিস এসব ! ছাড় ওকে । এই তোর বাথরুম আসা ! আর আমি ওখানে একা ..
- অ্যাবে শালা, তুই একা কী বে ? এই তো আমার জানু রয়েছে । চল, আজ এই ডবকা মাগীকে দুজন মিলে ...
সৌমেনের মুখের কথা শেষ হলো না । সৌম্য ওর মুখ লক্ষ্য করে সপাটে একবার পা চালালো । ইতিমধ্যেই সোনালি নিজেকে আলাদা করে নিয়ে কিছুটা তফাৎ চলে গিয়ে দাঁড়িয়ে আছে ।
- তুই আমাকে মারলি ! মারতে পারলি ! তবে রে শালা নিমকহারাম .. টলতে টলতে সৌম্যকে কব্জা করতে চেষ্টা করল ।
ওদিক থেকে সোনালি যেন এমন একটা সুযোগেরই অপেক্ষায় ছিল । সোফা সংলগ্ন টেবিলে পড়ে থাকা পাথরের অ্যসট্রেটা তুলে সোজাসুজি বসিয়ে দিল সৌমেনের মাথার পিছনে । কার্পেটের উপর লুটিয়ে পড়লো সংজ্ঞাহীন সৌমেনের দেহ ।
সৌম্যের নেশা নিমেষের ভিতরে কোথাও যেন উধাও হয়ে গেছে । সম্বিত ফিরে আসতেই ও দেখল কার্পেটের উপর রক্ত । আর সোনালি ওর পাশে এসে দাঁড়িয়েছে । উত্তেজনা ভয় দুশ্চিন্তা সব যেন একসাথে জমাট বেঁধেছে মাথায় ।
- এখন কি হবে ! ও কি মরে গেল নাকি ? কি করবো এবার ? যাব কোথায় আমি ?
সৌম্য ঝুঁকে পড়ে সৌমেনের নাকের কাছে আঙুল নিয়ে গেল । অনুভব করতে পারলো নাক থেকে বের হয়ে আসা গরম হলকা বাতাস,
- নাহ, মরে নি হতভাগাটা । বেঁচে আছে । এক কাজ করুন বোন, শিগগির কাউকে ডাকুন তো । হাসপাতালে নিয়ে গেলে ও ঠিক হয়ে যাবে ।
- কিন্তু ওকে বাঁচিয়ে কি লাভ ? ও তো ছাড়বেনা আমাদের ।
- শুনুন, অন্যায়টা ও করেছে । আর পালিয়ে বেড়াব আমরা ? তার চেয়ে বরং আমরা ওকে বাঁচাই । আর লোকাল থানাতেও লিখিতভাবে বিবৃতি জানাই সম্পূর্ণ ঘটনা টা শুরু থেকে শেষ ।
- কিন্তু দাদা, এর বাবা যে খুব প্রভাবশালী । উনি তো ঠিক ওনার ছেলেকে সুরক্ষা দেবেন । আর আমাদের ক্ষতি করবার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাবেন । উনি কিন্তু ছেলের চেয়েও আরও বেশি খারাপ লোক ।
- সে দিন না । তবে এটা জেনে রাখবেন, আমরা কেউ আইন ও সংবিধানের ঊর্ধ্বে নই । এখনো এই দেশে অনেক নেতা মন্ত্রী আমলার সাজা হয় । আর এই বাড়িতে তো সিসিটিভি ও আছে । আমরা বরং ঘটনা ঘটার রেকর্ডিং করা অংশ টা আমাদের কাছেই রেখে দেই একটা কপি । আমার কাছে ল্যাপটপ আর পেনড্রাইভ আছে । নো টেনশন্ সিস্টার । আর আমি গোটা ঘটনাটা আমার এক উকিল বন্ধুকে জানিয়ে রাখছি বিশদে । অত ভয় পাওয়ার কিছু নেই । আপনি এখানে একলা থাকেন । এটা গোটা পাড়া জানে । আর ওর যে স্বভাব চরিত্র খুব একটা সুবিধের নয়, এটাও তো ওর বাবা লুকিয়ে রাখতে পারবে না । তাছাড়া বাড়িতে পুলিশ আসবে । এত বিলাসবহুল বাড়ির খবর যদি আয়কর আর ভিজিল্যান্স দপ্তরের লোকজন জানতে পারে, তবে তো ওর বাপেরও রেহাই নেই । ওর বাবা চালাক লোক । এত ঝামেলার ভিতর দিয়ে যেতেও চাইবেনা । বরং তোমাকে বড়সড় টাকার অ্যামাউন্ট অফার করবেন উনি । আর তুমিও এই সুযোগ হাতছাড়া করো না ।
- দাদা, এই সব কী বলছেন আপনি !
- শোনো বোন, আমি কিন্তু ভুল কিচ্ছু বলিনি তোমাকে । এরা যেমন খারাপ লোক, এদের সাথেও এমনটাই করা উচিত । তুমি বাস্তবটা বুঝতে পারছোনা কেন বলতো ? আজ এই মুহুর্তে তোমার পাশে একমাত্র আমি ছাড়া আর কেউ নেই । আজ আমি না থাকলে তোমার সাথে যে কি কি হতে পারতো তা ভেবেই আমার গায়ে কাঁটা দিচ্ছে । এই জানোয়ারটাকে আমি কিছুতেই আমার ছোটবেলার বন্ধুর সাথে মিলিয়ে উঠতে পারছিনা । এটা মানুষ নয়, পশুরও অধম । আজকের পর তুমি কোথায় যাবে, কি করবে আমি জানি না । তবে আমি এটুকু জানি যে তোমার যদি একটা ব্যাঙ্কের অ্যাকাউন্ট থাকে আর সেখানে একটা মোটা অঙ্কের টাকা, তবে তোমার সেই টাকা অনেক উপকারে লাগবে । আর যতদিন না তুমি অন্য কিছু কাজ দেখছ, ওটা তোমার কাছে আশীর্বাদ বলে জেনো ।
সোনালির চোখের পাতা ভিজে গেলো । সত্যিই এই দাদাটি বড়ো ভালোমানুষ আর চরম বাস্তববাদী । ও মনে মনে প্রণাম করলো নিজের এই নতুন ইষ্টদেবতাকে ।
সৌম্য প্রথমে হাসপাতাল, তারপর থানায় ও শেষে নিজের উকিল বন্ধু জয়দীপকে ফোন করল । জয়দীপও ওকে জানালো যে থানায় যা যা বয়ান দেবে ওরা, তা যেন উকিল কে সাথে করে নিয়ে গিয়েই জানায় । সৌম্য জয়দীপ আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করল ।
ইতিমধ্যে সোনালিও সৌমেনের চিকিৎসার বন্দোবস্ত করে ফেলল লোকাল ক্লাবের ছেলেদেরকে ডেকে । আধঘন্টার ভিতরেই জয়দীপ এসে হাজির । এরপর থানায় গেল ওরা ।
থানার সেকেন্ড অফিসারকে বিশদে সব জানালো জয়দীপ । লিখিতভাবে সবটুকু জমা দিলো । অফিসার আশ্বস্ত করলেন যে এই ক্ষেত্রে থানাও ওদের পাশেই থাকবে । সৌম্যের সবকিছু কেমন যেন স্বপ্নের মতো বোধ হচ্ছিল । থানার কাজ মিটতেই সৌম্যকে বাসস্ট্যান্ড থেকে বাসে তুলে দিল জয়দীপ । সৌম্য জানলার ধারে খালি সীট পেয়ে বসে পড়লো ।
মনে এখন আর তার বিন্দুমাত্রও চাপ নেই । সে এই এক বেলায় অনেকগুলো দারুণ দারুণ শিক্ষা পেয়েছে তার এই জীবন থেকে । সে বুঝেছে জীবনের চেয়ে, আনন্দে বেঁচে থাকার চেয়ে আর বড়ো কিছুই নেই । সুমির বলা শব্দগুলো শুধু যে ফলে গেল, তাই নয়, অনেক পথের সন্ধান দিয়ে গেল তাকে । ভাগ্যিস আজ অমন করে বৃষ্টি হলো । নয়ত ওকে সৌমেনের ফোন ধরে অফিস চলে যেতে হত । এই অন্যরকম বৈভবময় কদাকার জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বঞ্চিত হতে হতো তাকে । আজ সে যখন সে দোদুল্যমান নৌকায় মৃত্যুভয়ে কাতর না হয়ে ধীরে ধীরে জীবনে টিঁকে থাকার লড়াইয়ের প্রস্তুতি নিচ্ছিল তখন সে ভাবতেই পারেনি যে জীবনে আর কাউকে সে দেখতে পাবে । দুর্ঘটনা তো কিছুই হয়নি । আর সেও তো দিব্বি বহাল তবিয়তেই আছে । আজ সে যেমন করে তার পিঠব্যাগের প্লবতা বাড়াচ্ছিল ঐ অশান্ত জলের মোকাবিলা করবে বলে, ঠিক তেমন করেই ওকে জীবনের সমস্ত বাধা আর সমস্যার বিরুদ্ধে প্লবতা বাড়াতে হবে রোজ, যাতে তাকে অযাচিতভাবে ডুবে মরতে না হয় । সে নিজেও রোজ বাঁচবে আর অন্যকেও বাঁচাতে চেষ্টা করবে । একবুক নিঃশ্বাস নিয়ে জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো সৌম্য । সোনালি আর জয়দীপ তার দিকে হাসিমুখে চেয়ে রয়েছে । সৌম্য না এলে আজ ঐ মেয়েটিও হয়ত বাঁচত না । হাতটা তুলে বিদায় জানাল ওরা দুজন । সৌম্যও ঘুরে দেখল ওদেরকে আরও একবার । জয়দীপ সোনালিকে ওদের মাসির বাড়িতে বৃদ্ধা মাসির দেখাশোনার প্রস্তাব দিয়েছে । সেখানে আছে তার মাসি আর ডিভোর্সী মাসতুতো বোন । বোন ব্যাঙ্কে চাকরি করে । বৃদ্ধা মাকে একলা বাড়িতে ফেলে রেখে কাজ করতে ওর বোনের হাজারখানেক টেনশন । আর আয়াসেন্টার গুলোও সব কেমন যেন । টাকা নেবে গুনে অথচ পরিষেবায় লবডঙ্কা । সোনালিও মেনে নিতে দেরি করেনি । ওরও তো মাথা গোঁজার একটা ঠিকানা দরকার এই মুহূর্তে । সত্যিই বোধকরি ভগবান মুক্তি দিলেন ওকে এত যন্ত্রণার পরে । বাসের ড্রাইভার এবার ইঞ্জিনে স্টার্ট দিয়েছে । ওদের সবার জন্যেই জীবন এখনো অনেকভাবে অপেক্ষা করে আছে, আরো একটু প্লবতার সন্ধানে ।
Comments