Nirmalendu Gun short story

মামদোবাজি
নির্মলেন্দু কুণ্ডু

পা টিপে টিপে হাঁটছে শ্রীমন্ত৷পিছল রাস্তাঘাটে চলার এটাই সবচেয়ে ভালো উপায়৷উঃ,কি কুক্ষণেই যে মার কথা অমান্য করে মামুদপুরে এসছিল রতনের কথা শুনে!মা তখনই পইপই করে বলেছিল এই ভরা বর্ষায় কোত্থাও না বেরোতে৷কিন্তু শ্রীমন্ত তা শুনলে তো!মাকে লুকিয়ে রতনের সাথে চলে এসছে মামুদপুরে,একা একা৷যদিও খুব একটা দূরের পথ নয়,তবুও এই ভরা বর্ষায়,যখন হঠাৎ করেই আকাশ কালো করে বৃষ্টি নেমে আসছে,তখন ঐ অল্প দূরত্বও মনে হয় মাইলখানেক৷রতনদের বাগানের হরেক রকম সব্জির শোভা দেখে যখন শ্রীমন্ত বাড়ি ফেরার প্ল্যান করলো,তখনই দেখলো আকাশের এক কোণে কালো একটা মেঘ গুটিসুটি মেরে আছে৷ও ঠিক করে নিল,তাড়াতাড়ি ফিরতে গেলে বাঁশবাগানের পথ ধরতেই হবে৷রতনের বাড়িতে অবশ্য থাকতে পারতো রাতটা,কিন্তু মাকে বলা হয়নি,শুধু শুধু মা হয়রান হবে—এই ভেবেই বাড়ি ফেরার সিদ্ধান্ত নিল শ্রীমন্ত৷মামুদপুরের সীমানা ছাড়াতেই শুরু হল টিপ-টিপানি বৃষ্টি৷তবু তার মধ্যেই এগিয়ে চললো সে৷এখন পিছোনোর কোন উপায় নেই৷তাই পা টিপে টিপেই পেছল পথ পেরোচ্ছে শ্রীমন্ত৷

একটু যেতেই নজরে এল বাঁশঝাড়টা৷এমনিতেই জায়গাটা অন্ধকার৷ভরদুপুরেও কেমন গা-ছমছম করে৷আর এখন তো আকাশ কালো৷তার ওপর বিকেলও শেষ হয়ে এসছে৷তাই যেন আরও বেশি আঁধার হয়ে আছে বাঁশবাগান৷অমন ডাকাবুকো শ্রীমন্তরও বুকের ভেতর ছ্যাঁৎ করে উঠল বাঁশবাগানেরদিকে তাকিয়ে৷কিন্তু এখন কিচ্ছু করার নেই৷বৃষ্টি জোরে নামার আগেই এই বাঁশবাগানটা পেরোতে হবে ওকে৷তবেই ও ওর গাঁয়ে যাওয়ার পাকা রাস্তাটায় উঠতে পারবে৷এই ভেবেই দ্রুত পা চালালো ও৷বাগানের ভেতরে ঢুকতেই ওর কানে এল অনেক ঝিঁঝির কোরাস সঙ্গীত৷পাশের ছোট্ট ডোবা থেকে ব্যাঙের দল গান গেয়ে বৃষ্টিকে ডেকে চলেছে৷হাওয়ার চোটে বাঁশগুলো দুলতে দুলতে ক্যাঁচকোঁচ শব্দ করছে৷কিছুটা এগোতেই হঠাৎ বৃষ্টির তেজ বেড়ে গেল৷
যাঃ,এবার কী হবে!শ্রীমন্তর আবার মনে পড়ল মার মুখটা৷কিন্তু এভাবে গেলে তো ও ভিজে চুপসে যাবে৷এখন ঘন বাঁশঝাড়ের তলায় খুব একটা ভিজছে না ও৷তাই ঠিক করলো,দেরি যখন হয়েইছে,আর মার বকুনি যখন কপালে নাচছেই,তখন ভিজে আর লাভ কি!কিছুক্ষণ দাঁড়ানো ভালো৷

যেমন ভাবা,তেমন কাজ৷একটা বাঁশগাছের নিচে হাঁটু মুড়ে বসে পড়লো শ্রীমন্ত৷আর শুনতে লাগলো বৃষ্টি পড়ার শব্দ৷এমন সময় পিছন থেকে একটা খচমচ করে শব্দ হল আর সঙ্গে সঙ্গে কে যেন বলে উঠল—"তোমার নাম কী গো!"
বুকটা ধড়াশ করে উঠলো শ্রীমন্ত,আমতা আমতা করে বলল—"কে.....কে ওখানে?"
—"আরে,আমি গো আমি,বঙ্কু"
—"কে বঙ্কু?আমি ওই নামে কাউকে চিনি না!"
—"আরে সবাই যে সবাইকে সব সময় চিনবে,তার কোন মানে আছে?পথে যেতে যেতে তো কত লোকের সাথেই আলাপ হয়,তাই না?"
আস্তে আস্তে ভয় একটু কাটে শ্রীমন্তর৷
—"তা তুমি কোথায়,তোমায় দেখতে পাচ্ছি না কেন?"
—"এই তো তোমার পাশেই দাঁড়িয়ে আছি৷অন্ধকার বলে হয়তো বুঝতে পারছো না৷"
এবার বাঁশঝাড়ের দিকে ভালো করে দেখলো শ্রীমন্ত৷অন্ধকারে চোখটা একটু সয়ে যেতেই দেখলো একটা কালো,সরু লিকলিকে হাত-পা ওয়ালা মানুষ ওর সামনে দাঁড়িয়ে আছে৷কান দুটো ছাগলের মতো বড় বড়৷মাথা জোড়া টাক৷
—"তা তুমি এখানে কখন এলে?তোমাকে তো আমি আসতে দেখিনি!"
—"তোমার আগে থেকেই আছি৷তুমি তো ছুট্টে এসে সেঁধোলে,আমাকে দেখার ফুরসত কোথায় তোমার!"
শ্রীমন্ত মনে মনে ভাবলো,তা বটে৷
—"তা তুমি কোন গাঁয়ে থাকো,মামুদপুর,নাকি সবুজডাঙা?"
—"আর গাঁ,আমাকে কী ওখানে রেখেছো গো,পুরো খেদিয়ে দিয়েছে!"
—"খেদিয়ে দিয়েছে!কে?"
—"ওই যে কালী তান্ত্রিক৷সবুজডাঙার শ্মশানে যার বড় মন্দির আছে৷যে মরার খুলি নিয়ে দিনরাত কিসব মন্তর আউরাচ্ছে৷"
—"তা তোমাকে খেদালো কেন?ও তো কোন মানুষের কোন ক্ষতি করে না৷ঠাম্মা বলে,ও নাকি সাক্ষাৎ ভগবান!কত লোকের অসুখ-বিসুখ সারিয়ে দিয়েছে৷এমনকি ও নাকি ভূতেরও ওঝা!"
—"ভগবান না,শয়তান!আর ভূতের ওঝা!ছোঃ!আরে ধুনো জ্বেলে লোককে ঝাঁটার বাড়ি মারলে যদি ওঝা হয়ে যায়,তবে তো বাড়ির মা-দিদিমারাই ও কাজ পারবে৷তবে ওর ধোঁয়ার জোর আছে৷বাপরে,ওই ধোঁয়ার জ্বালাতেই তো আমি ওই শ্মশানের নিমগাছ ছেড়ে এখানে চলে এসছি৷"
চমকে উঠল শ্রীমন্ত—"মানে,তু...তু...তুমি...."
—"আরে,মামদো গো,মামদো৷তা এতে এত ভয় পাওয়ার কী আছে?আমি কী কোন ক্ষতি করেছি তোমার?এই যে এতক্ষণ কথা বলছো,কিছু উল্টোপাল্টা মনে হয়েছে তোমার?"
—"তা বটে!কিন্তু কালী তান্ত্রিক যে গাঁ-ময় রটিয়েছে,ভূতেরা খুব বদ৷কাউকে একবার ধরলে আর ছাড়ে না৷ও-ই নাকি একমাত্র পারে ভূতের হাত থেকে বাঁচাতে!"
—"সব ঢপ!এসব না বললে তোমরা ওর কাছে যাবে কেন?বিজ্ঞাপন বোঝো তো,টিভিতে,কাগজে দেয়,এ হচ্ছে তাই৷ওর মতো বদ লোক আর দুটো নেই!"
—"কেন?"
—"কেন!ও নিজের ঐ তান্ত্রিকগিরি আর ওঝাগিরি চালাতে যা খুশি তাই করে৷সাধারণ মৃগীর রোগীকেও ভূত তাড়ানোর নাম করে পেটায়!এমনকি তোমাদের মনে যাতে ভূতের ভয় বজায় থাকে,তাই মাঝে মাঝেই নিজের সাঙ্গোপাঙ্গোদের দিয়ে লোকের বাড়িতে ঢিল ফেলে,চলতি রাস্তায় মুখোশ পড়ে লোককে ভয় দেখায়,মারে৷"
—"ইস্"
—"হুম,আমি ভূত বলে কিছু করতে পারি না৷কিন্তু দেখে গা রি-রি করে ওঠে৷আর তোমরাও কেমন!এত-এত বই পড়ে এখনও ওঝাতে বিশ্বাস করো!"
—"কিন্তু এমন লোকের কোন শাস্তি হবে না!"
—"হবে তো!তবে আমি তো সূক্ষ্ম শরীরে কিছু পারবো না,তাই তোমাকে দরকার৷"
—"আমি!আমি কী করবো?"
—"আজ মঙ্গলবার তো?আজ ওই ব্যাটা ভন্ড তান্ত্রিক এই পথ দিয়েই ওর মন্দিরে ফিরবে৷আজ ওকে দেখাবো ভূতের খেল কাকে বলে!তুমি শুধু ওর পথ রুখে দাঁড়াবে,ওকে বলবে ওর সব কু-কীর্তি ফাঁস করে দেবে,তারপর দেখো আমি কী করি!"

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর দেখা গেল কালী তান্ত্রিক হনহন করে আসছে বাঁশবাগান দিয়ে৷হাতে একটা বড় ঝোলা৷বঙ্কুর কথামতো লাফ দিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালো শ্রীমন্ত৷
—"এই!কে রে!কে দাঁড়িয়ে ওখানে!"
—"আমি রে!তোর সব কুকর্মের সাক্ষী!"
—"কুকর্ম!কীসের কুকর্ম!জানিস,আমি কে?"
—"জানি রে,তুই একটা বদ লোক,ভন্ড তান্ত্রিক৷লোককে টুপি পড়িয়ে ফাঁকিবাজি করে ব্যাবসা করিস৷"
—"তবে রে!যত বড় মুখ নয়,তত বড় কথা৷দাঁড়া,দেখাচ্ছি মজা"
বলে যেই এগোতে যাবে,অমনি দেখলো সামনের ছেলেটা হাওয়ায় ভাসছে৷দেখে তো চক্ষু চড়কগাছ কালী তান্ত্রিকের৷বাপ রে,এ আবার কী?ও খুব ভালো করেই জানে,ওসব ভূত-ফুত হয়না৷তাই তো নির্ভয়ে থাকে শ্মশানে৷কিন্তু এ সামনে কী দেখছে!
—"কী রে!আমাকে দেখবি বলছিলি!কই দেখা!"
চেঁচিয়ে ওঠে শ্রীমন্ত৷
—"হিঁক....না..মানে ..কে তুই...মানে আমি তো কোন...কী চাস!"
—"তুই আর কোনদিন গাঁয়ের লোকগুলোকে ঠকাবি?কোনদিন ভূতের নাম করে রোগীদেরকে ঝাঁটাপেটা করবি?"
—"না..না..আমি কিচ্ছু করবো না৷আমি আর থাকবোই না গাঁয়ে৷আ...আমাকে মারিস না৷আমি ভুল করেছি৷"
—"যা,চলে যা এখান থেকে,আর যেন না দেখি তোকে,নইলে কিন্তু..."
—"না,না..."
বলেই দৌড় মারলো কালী তান্ত্রিক৷শ্রীমন্তকে ঘাড় থেকে নামিয়ে বঙ্কু বলে উঠল—"বাঃ,তোমার খুব সাহস তো!"
—"মা বলেছে,অন্যায়ের সামনে সাহসী হতে হয়৷"
—"তোমার মা ঠিক বলেছেন!"
মার কথা বলতেই শ্রীমন্তর বাড়ির কথা মনে পড়ে যায়৷বৃষ্টিও ততক্ষণে ধরে এসেছে৷ও বলে ওঠে—"আমি মার কাছে যাব৷"
—"হ্যাঁ,হ্যাঁ,চলো,আমিই পৌঁছে দিচ্ছি৷তবে খবরদার,আজকের কথা কিন্তু কাউকে বলো না৷"

পাড়ার মোড়ের ঝোপের কাছে শ্রীমন্তকে নামিয়েই বঙ্কু চলে যায়৷মোড়ের রেডিওর দোকান থেকে তখন গান ভেসে আসছে—"করিস না রংবাজি রে"
শ্রীমন্ত মনে মনে বলে উঠল—
"এ হচ্ছে খাঁটি মামদোবাজি"

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি