মোহ

মোহ _ রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
-----------------------------------------------------------

অফিস যায়নি আজ অতনু । জেলা সদর অফিসে মিটিং ছিল সারা দিন । ওদের দপ্তরের জেলা আধিকারিকের আজ শেষ কর্মদিবস উপলক্ষে একটা আনুষ্ঠানিক সমাবেশ ছিল দিনভর । ওর সতীর্থরা সকলেই খুব খুশী আধিকারিকের চলে যাওয়ার জন্য । সুতীর্থ তো আনন্দের সাথে একটা আঁটোসাঁটো ভাষণই ঝেড়ে দিলো,
- ভাইসব, আজ আমাদের জেলার দপ্তরের ব্যর্থতম সেনাপতি, কর্মজগতে নির্লিপ্ততম ও ব্যক্তিগত স্বার্থসিদ্ধি চরিতার্থকারী জড়ভরত, যিনি শুধুমাত্রই ফেসবুক আর হোয়াটস্ অ্যাপ এ রাতদিন বিচরণকারী, আমাদের জেলার অতিরিক্ত জেলাশাসক বিদায় নিলেন । আমাদের মুক্তি দিয়ে গেলেন । ওনার কর্ম নিস্পৃহতাকে আমাদের আধিকারিক সংগঠনগুলির তরফ থেকে অর্বুদকোটি প্রণাম । উনি ওনার পূর্ববর্তী দপ্তরে অগ্নি নির্বাপন তো অনেক করেছেন । আর এই জেলার দপ্তরেও শুধুমাত্র শব্দবানেই কেশোৎপাটন করেছেন । ওনার পরবর্তী দপ্তরবাসীদের জন্য আমরা আগাম শুভেচ্ছা জানাই । আর এই আনন্দঘন মুহূর্তে আমরা আজ সকলে মিলিত হই ব্যারন এ, আমাদের আনন্দপানের মুক্তিক্ষেত্রে ।
অতনু এই সময় একমনে চ্যাট করছিল হৈমন্তীর সাথে । হৈমন্তীর সাথে ওর সদ্য আলাপ হয়েছে সপ্তাহ খানেক আগে একটি অনুষ্ঠানকে কেন্দ্র করে । মেয়েটি শিক্ষিতা রুচিশীল সুন্দরী ও ডিভোর্সী । আবার পাত্র দেখাশোনা চলছে ওর । ওকে নিজের ব্যাপারে কিছুই লুকায়নি অতনু । নিজের বৈবাহিক ও পারিবারিক জীবনের একাকীত্ব রোজ ওকে কুরে কুরে খুবলে খায় । নিজের সবকিছুই ও বিশদে বলেছে হৈমন্তীকে । আর আলাপচারিতাও বেশ জমে উঠেছে মিটিংয়ের ফাঁকে ফাঁকে । ওরও বেশ ভালো লাগছে এই ভার্চুয়াল আবেগ ও সান্নিধ্য । আজ ওর বিকেল থেকেই খুব মদ খেতে ইচ্ছে করছে । তার উপর সতীর্থ বন্ধু ও দাদাদের এমন উদাত্ত আহ্বান মোটেই ফেলে দেওয়ার নয় । আর সেটা ও হৈমন্তীকে জানান দেওয়ার সাথে সাথেই ওপাশ থেকে ভেসে এসেছে কড়া ও ঝাঁঝালো সাবধানবাণী,
- না, একদম না । আপনি একদম খাবেন না । আমার দিব্যি রইলো । আর যদি আপনি খান, তবে আমার কিন্তু দারুণ ক্ষতি হবে ।
একটু অবাকই হয়েছিল অতনু । মেয়েটা বলে কী ! এই তো সবে আলাপ ! তার ভিতরেই এত জোর কি করে পেলো ও ! আর কীই বা ক্ষতি হবে হৈমন্তীর যদি ও মদ খায় ! আচ্ছা অদ্ভুত আবেগ তো মেয়েটার ! তবে কী হৈমন্তী ওকে পছন্দ করতে শুরু করেছে ? আর অতনুর দিক থেকেও ইতিমধ্যে একটা দুর্বলতার জায়গা তৈরী হয়ে গেছে মনের ভিতরে । মনের ভিতর ওর মোটামুটি ভাবে প্রস্তুত । হৈমন্তীকে ও মোটেই হারাতে চায়না কোনোও মূল্যে । আর মিথ্যাচারিতাও ওর ধাতে সয়না । তাই মনে মনে ঠিক করল আর ও মদ খাবে না কোনোভাবেই । ইতিমধ্যে চ্যাট বক্সে ফুটে উঠেছে হৈমন্তীর রাগ মনখারাপ আর অভিমান । এমনঅবস্থায় কেমন করে ও মিথ্যাচার করে হঠাৎই সন্দীপনের গলা, - কী রে ভাই, চল্ । মিটিং তো শেষ । আর ইটিংও । এখানে বসে থেকে করবি টা কি তুই । চল্ ব্যারন ঘুরে আসি ।
- না রে ভাই, আজ ছাড় । ভালো লাগছে না । আজ যাবো না । তোরা চরে আয় । চুটিয়ে মৌজ করে আয় । আমি ঘরে যাচ্ছি ।
বেরিয়ে টো ।টো তে চেপে বসলো অতনু । মোহের ঘোরে সে আজ তার বিশেষ কাউকে কথা দিয়ে ফেলেছে । আর সেই কথা তাকে যে রাখতেই হবে যে কোনও মূল্যে । নয়তো, কিসের এই সম্পর্ক । হৈমন্তীকে জিজ্ঞাসাও করছিল ও । উত্তরে ওদিক থেকে ওর স্ক্রিনে ফুটে উঠেছিল দুটো ছোট্ট শব্দ, - সবটাই মোহ ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি