ঋক _ তিন
তিন এক্কে তিন
---------------
ঘুম ভাঙল ঋকের । ট্রেনের দুলুনিতে আর পাশে সিট ভাগ করে বসা প্যাসেঞ্জারের বকবকানিতে রাতভর ঘুম হয়নি ওর এক ফোঁটাও । প্ল্যাটফর্মে নেমে টোটো ধরে একেবারে রথবাড়ি বাসস্ট্যান্ড । সেখান থেকে ব্রীজে উঠে সোজা মানিকচকের বাস বা ম্যাজিক । ব্লকেই আজ যেতে হবে ওকে সরাসরি । এখন আর টাউনের ভাড়া বাড়িতে উঠে ফ্রেশ হয়ে বিশ্রাম নেবার সময় ওর নেই । হাতে অনেক কাজ জমে আছে আজ । একটা বাস দাঁড়িয়েছিল ফ্লাইওভারের মাথায় । সেটায় চেপে বসে গেল ও । একটা চা ওয়ালা জানলার সামনেই দাঁড়ানো । এলাচ ফ্লেভারের দুধ চা । এই মুহুর্তে চা বস্তুটা ওর কাছে খুবই দরকারী । আর মাটির ভাঁড়ে দুধ চায়ের আমেজটাই আলাদা । সুতরাং এককাপ চা নিয়ে সিগারেট ধরিয়ে বেশ মৌজ করে ভাবনার গভীরে ডুবে গেল ও । এখানে ওর আসার তেরো মাস হলো । আর এই তেরো মাসে ওর তেরোশো রকমের ঝামেলা বইতে হয়েছে ওকে । যেদিন প্রথমবার মালদায় পা রেখেছিল ও, সেদিন ওর সাথে ছিল শালবনীর থেকে ট্রেনিং করে আসা ওর সহকর্মী বন্ধুরাও । এসে ওরা প্রথম দিন দশেক ছিল রাজ হোটেলে । তারপর জেলা হেড কোয়ার্টার থেকে ওদের জন্যে সার্কিট হাউসে থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছিল । সার্কিট হাউসে থাকাটা এতকাল সত্যজিৎ রায়ের 'সোনার কেল্লা' তেই দেখে এসেছিল ঋক । এখানে যে মন্ত্রী বা ভিআইপি রা এসে ওঠে, সেকথা অজানা নয় ওর । সেই সোনার কেল্লার সার্কিট হাউসের সাথে মালদার এই বাংলো টাইপের বাগানবাড়ির খুব একটা তফাৎ পেলো না ও । সেই সময়ের জন্য সাময়িক ভাবে খুব একটা লেজমোটা কেউকেটা গোছের বলে নিজেকে মনে হয়েছিল ঋকের । এরপর হলো ওদের পোস্টিং । ঋককে পোস্টিং অর্ডার দেওয়া হল মানিকচকে । মানিকচক মালদার পশ্চিমপ্রান্তে গঙ্গা সংলগ্ন ব্লক । গঙ্গার অপর প্রান্তে ঝাড়খন্ডের সাহেবগঞ্জ জেলার বিখ্যাত রাজমহল এলাকা । রাজমহলের পাহাড়গুলো ওর মানিকচক ঘাটের থেকেই সরাসরি দেখা যায় যদি আকাশ পরিস্কার থাকে । সূর্যাস্তের আলোয় সবকিছু কেমন ক্যালেন্ডারের ছবির মত স্বপ্নময় বলে মনে হয় । এমন ব্লক পেয়ে নিজেকে বেশ ধন্য বলে মনে হয়েছিল ওর । ব্লকের চারপাশ জুড়ে নদী খাল বিল আমবাগান । এখানে এসেই ব্লকের কোয়ার্টারের জন্য আবেদন করে দিল ও । পেয়েও গেল । কিন্তু চারপাশের লোকজন খুব শিগগিরই টের পেল দিলদরিয়া বিনদাস এক সাহেবের ব্লকে আসার কথা । ব্যাস্, অমনি শুরু হল যখন তখন উৎপাতের ঢেউ । মুহুরী আর আম পাবলিক কখনো বাজারের ব্যাগে সব্জী ফলমূল কখনো বা আনতে লাগল গঙ্গার মাছ, খাসি বা দেশী মোরগ । বিরক্ত হয়ে গেল ঋক এদের জ্বালায় । এসব ও একেবারেই পছন্দ করে না । মাঝে মধ্যে একটু আধটু হাল্কা করে বীয়ার খেত ও, সেটাও অফিস শেষে গঙ্গার পারে শ্মশানের ধারে মড়া পোড়ানো দেখতে দেখতে । মৃত ব্যক্তির আত্মীয়বর্গ আর ডোম ছাড়া কেউ যেত না সেদিকে । আকাশে কখনো অমাবস্যার নিকষ কালো অন্ধকার, কখনও আবার পূর্ণিমার ঝলমলে আলোর উচ্ছ্বাস । অনেকটা দূরে ওপারে রাজমহলের দিক থেকে বিন্দু বিন্দু আলো ভেসে আসত । বীয়ার আর জোলো হাওয়ায় সেই মায়াবী ঘোর আর মড়া পোড়ার কটু গন্ধ আর চোখ জ্বালাপোড়া ধোঁয়ায় টাল খেতে খেতে ভুটভুটি চেপে ব্লকের কোয়ার্টারে ফিরত ও । এসে খেয়ে টানা এক ঘুমেই রাত কাবার । এসব ভাবতে ভাবতেই এসে গেল ওর অফিস । সারাটা দিন চলে গেল মিউটেশন কেসের হিয়ারিং করতে করতে । কাজের ফাঁকে জল খাওয়া, টয়লেট, টিফিন - এসব কিছু অনেক সময়েই ব্যাহত হয় পাবলিকের ক্রমাগত চাপে । অফিস থেকে বেরোতে অনেকটাই দেরী হলো ওর । সকাল থেকে স্নানও করতে পারেনি আজ ও । বাসের শেষপ্রান্তে চাকার ঠিক উপরে একটা সিট জুটে গেল ওর । ব্যাস্, শরীর ছেড়ে দিল । চোখের পাতা আর খুলে রাখা যাচ্ছেনা । হায় রে, ভূমি দপ্তরে এমন চাপে থাকার কথা যদি আগেভাগে কোনওমতে জানতে পারত ও, তবে আর ইন্টারভিউ ফর্মের পছন্দ তালিকায় এই সার্ভিসের জন্য পেনের কালি খরচ করত না ও । সবই ভাগ্যের পরিহাস । নয়তো এই সময় ওর কলকাতায় থাকার কথা । এর আগের দপ্তরে ও ছিল কেরানী । আর্থিক সুখ ছিল না সেই অর্থে, তবে শান্তি অবশ্যই ছিল । ছিল অখন্ড অবসর । অফিস ঢোকার পর থেকে দিনভর গুলতানি, আড্ডা, ক্যান্টিনের ঠেক, দফায় দফায় চা সিগারেট, খবরের কাগজ পড়া ও বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা - এই সবই ছিল ওদের মত কেরাণীদের কাজ । এই অলস জীবনটার উপর বিরক্তি এসে গিয়েছিল ওর । ভাবত কবে এর থেকে মুক্তি আসবে ওর । কবে ও প্রকৃত অর্থে পাবলিক সারভেন্ট হবে । জনপরিষেবামূলক কাজ করতে চেয়েছিল ঋক । আর এখন ওর মনে হয় আগেই ভালো ছিলো ও । সেই যেন ঠিক "নদীর এ পাড় কহে" র মতো ব্যাপার । এখন আর ফিরতে মন করেনা ওর । কথা শোনার, ব্যঙ্গ শোনার ভয়, পুরানো বন্ধুদের টিপ্পনী এড়ানোর ভয় - "কী রে, হাওয়া বের হয়ে গেল তোর ? বেশ তো লাফাতে লাফাতে চলে গেছিলি ? সেই তো শেষমেষ ফিরে আসতে হলো তোকে" - এ জাতীয় শব্দবানের আঘাত সহ্য করতে পারবেনা ঋক । যতই তার কষ্ট হোক না কেন, সহ্য করতেই হবে ওকে । হার মেনে পালিয়ে যেতে পারবেনা ও । ঢুলতে ঢুলতে বাস থেকে নেমে টোটো ধরে নিল ঋক ।
Comments