ঋক _ চার

চার এক্কে চার
-----------
আজও ঘুম ভাঙতে দেরী হয়ে গেল ঋকের । আগের রাতের ট্রেন জার্নি, দিনভর বিরামহীন কাজে সারাদেহ ভার ভার লাগছিল । মনে হচ্ছে আরও খানিকটা ঘুমের প্রয়োজন ছিল ওর । গ্যাস জ্বালিয়ে একটু ব্ল্যাক কফি বানাল ও কড়া করে । কফি মগ নিয়ে আবার বসে পড়লো বিছানার ওপর । আর জ্বালাপড়া করা আধাবোঁজা চোখ চলে গেল পায়ের লাগোয়া, দেওয়ালে ঝুলতে থাকা, পুরানো বাংলা ক্যালেন্ডারে । ইস্কনের বিখ্যাত মহাভারতের ছবি । যেখানে অভিমন্যু একা লড়াই করছিল সাত মহারথীর বিরুদ্ধে । অসম অসাধারণ অসীম সাহসী প্রত্যয়ে একটা ভাঙা রথের চাকা সম্বল করে দুর্নিবার ছিলো তার প্রত্যাঘাত । অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে সরব হয়েছিলো ছেলেটা সেই কত হাজার বছর আগে । এখন তো বদলেছে সময় । অভিমন্যু বোধহয় বোকা ছিল । না হলে কেউ এমনভাবে খুদিরাম হয় নাকি ! আরে বাবা, আজকাল তো আমরা সবাই ভালো থাকতে চাই । নিজের মতো করে একা একা জিততে চাই । এখন তো ওর কর্মস্থলেও প্রায় প্রত্যেকদিনই স্বৈরতান্ত্রিক ভাবনা ও আচার আচরণের ব্যাপার চলছে জেলা প্রশাসনের তরফ থেকে অধস্তন আধিকারিকদের উপর । এমনিতে মালদা জেলা যে কোনও রকমের অপরাধমূলক কাজকর্মের জন্য রীতিমত কুখ্যাত । আফিম চাষ, জাল নোট ছাপানো, অস্ত্র তৈরী, পশু শিশু ও নারী পাচার এসব নিয়ে পুলিশ প্রশাসনের কোনও মাথাব্যথা বা আপত্তি নেই । অপরাধীরা এখানে বুক দাপিয়ে চরে বেড়ায় । এমনকি ঋকের অফিসেও অনেকেই কোমরে রিভলভার নিয়ে আসা যাওয়া করে । অথচ ওর ভূমি দপ্তরের কোনও আধিকারিক যদি ছুটির দিনে কাজ না থাকলে বাড়ি চলে যেতে চায়, তখনি নেমে আসবে শো'কজের খাঁড়া । জেলার অনেকগুলো সেটেলমেন্ট অফিসেই অনলাইনে কাজ শুরু হয়ে গেছে । অথচ অনলাইন কাজের জন্য যা প্রথম শর্ত, সেই লিঙ্ক বা কানেক্টিভিটির দেখা পাওয়াই ভার । এখন আর হাতেকলমে অফিসে কেস নম্বর দেওয়া যায়না, সেক্ষেত্রেও কানেক্টিভিটি খুব জরুরী । কম্পিউটারে কেস ভরতে হয় অনলাইন । সেখান থেকেই কেস নম্বর বের হয় । গ্রামের খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষ এসব কিছুই বুঝতে চায় না । এই জাতীয় সমস্যা নিয়ে প্রশাসনের উপরমহলেরও কোনও মাথাব্যথা নেই । তারা শুধু নরম মাটির উপর আঁচড় কাটতে বেশি পছন্দ করে । এরা আসলে ভীরু ও পরস্পরবিরোধী ভাবনার পাঁচমিশেল মাত্র । এরা ভয় পায় সম্মিলিত শক্তিকে । আর তাই চায় যে কোনও উপায়ে বিভেদনীতির তাস খেলতে । নিয়মের একটু উনিশ বিশ মানেই অধস্তন আধিকারিকের জন্য কারণ দর্শানোর নোটিশ । ঋক ভাবে, আর কতদিন এমন করে চলবে চূড়ান্ত অব্যবস্থা । ও পরিস্কার বুঝতে পারে যে  সবকিছুই মায়াজাদুর আড়ালে মোড়া । আসলে এই অভিমন্যু ছেলেটা তো সেই কত হাজার বছর আগের একটা বোকাবোকা কল্পনা মাত্র । ঋকেরা আজকালকার চালাক স্মার্ট আখের গোছানো ছেলেপুলে । ওসব সেন্টু খেয়ে কী জীবন চলে নাকি ! তবে কেন ওর রাতে ঘুম আসেনা ! কেন ওর মাথার শিরাগুলো দপ্ দপ্ করে মাঝে মাঝেই ! কেন ওর বারবার মনে হয় স্বরচিত সেই লাইন - "এখনো কি আসেনি সময় আবার ? সময় ঘড়ির কাঁটা অতীতে ঘুরিয়ে নিয়ে যাওয়ার" ! কেন ওর কলেজের সঞ্জয় স্যারের কথাগুলো মনে খোঁচা মারে - "ছিলাম চারপেয়ে । পরবর্তীতে দুইপেয়ে । এখন চাকা যে উল্টো গতিপথে চলেছে । আবার আমরা চারপেয়ে হয়ে গেছি । ভাবো তোমরা, হাতে স্মার্টফোন । পরনে আলট্রা আলফা বিটা পোষাক । কিন্তু ঘিলু সেই আদিম প্রবৃত্তির দাস । সমস্ত অমানবিক পশুত্বের ভাবনায় নতশির আমরা" । নাহ্, কাউন্সেলিং করাতে হবে ঋককে এবার । বাড়াবাড়ি হয়ে যাচ্ছে ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

নগ্নতা নিয়ে কথোপকথন

মরণ vs যৌনতা