রুমির কবিতাগুচ্ছ

জালালউদ্দিন রুমির কবিতা ____

তেরো শতাব্দীর পারসিক কবি, দার্শনিক, সূফী, স্কোলার, মাওলানা জালালুদ্দিন রুমির জন্ম ৩০ সেপ্টেম্বর, ১২০৭। তৎকালীন আফগানিস্তানে জন্ম নেয়া রুমি(বর্তমান তাজিকিস্তান) ১২১৫ থেকে ১২২০ সালের মধ্যে সপরিবারে প্রবাসিত হয়ে বর্তমান তুরষ্কে আসেন। তার অধিকাংশ লেখা পারসিক ভাষায় হলেও, তুর্কী, অ্যারাবিক ও গ্রীক ভাষাও তিনি ব্যবহার করেছেন।

এখানে ওনার কিছু কবিতা বন্ধুদের জন্যে শেয়ার করলাম ___

স্থিরতা

মৃত হও, নতুন এই ভালোবাসা— মৃত হও এর অভ্যন্তরে—
তোমার যে পথ, তার শুরু— ঠিক এর অন্যপাশে।

বিস্তৃতআকাশ হও তুমি—
কুঠারে আঘাত হানো কারাগার দেয়ালে
—পালাও, মুক্ত হও—
বেড়িয়ে পড়ো অসীমে,
বেড়িয়ে পড়ো এমন, যেনো কেউ মাত্রই জন্ম নিয়েছে হটাত রঙে
জলদি, এক্ষুনি!
—ঘনমেঘাবৃত তুমি—
সরে পড়ো অন্যপাশে— মৃত হও এবং স্থির…
স্থিরতা একটি নিশ্চিত নিদর্শন যে তুমি মারা গ্যাছো—
তোমার অতীত জীবন যা ছিলো নিরবতা থেকে এক ক্ষিপ্র দৌড়;

আশ্চর্য-নির্বাক করা পূর্ণিমার চাঁদ দ্যাখো— বেড়িয়ে এসেছে এখন!

অতিথিশালা

এই মানবসত্তা একটা অতিথি ঘর—
প্রতি সকালেই একজন নতুন মেহমান।

একজন সুখ, একজন হতাশা, একজন ক্ষুদ্রতা,
অপ্রত্যাশিত অতিথি হয়ে আসেন—
ক্ষণস্থায়ী কজন সচেতনতা…

স্বাগত জানাও এবং আপ্যায়িত করো তাদের সবাইকে
—তা যদি এক দঙ্গল দুকখোও হয়,
যা ঠেলে সরায় গৃহের সকল আসবাব সহিংসভাবে,
এরপরও, আন্তরিকচিত্তে গ্রহণ করো সবাইকে—
হয়তো সে তোমাকে পরিষ্কৃত করছে জেনো,
নতুন কিছু আনন্দআগমন উপলক্ষে।

অন্ধকার আশংকা, অপমান, আক্রোশ, ঘৃণা— সবকিছু,
হাসিমুখে এগিয়ে নাও দরোজায়
এবং আমন্ত্রণ জানাও গৃহের ভেতরে।

যেই আসুক না ক্যানো— কৃতজ্ঞ হও,
কারণ এক উপদেষ্টা হিসেবে ঘরে
প্রত্যেককেই পাঠানো হয়েছে অর্ন্তলোক থেকে।

আমি কি বলিনি তোমায়!

আমি কি বলিনি তোমায়—
ছেড়ে যেও না আমায় কখনো,
একমাত্র বন্ধু তো কেবল আমিই—
আমিই চিরবসন্ত জীবনের…

শত-সহস্র বছরও যদি আমাকে ঢেলে
দূরে থাকো তুমি ক্রুদ্ধ রিদয়ে,
তবুও ফিরবে তুমি, ফিরে আসতেই হবে তোমায়—
ক্যানোনা আমিই তোমার গন্তব্য, আমিই তোমার শেষ…

আমি কি বলিনি তোমায়—
মোহে পরো না রঙিন পৃথিবীর,
যেহেতু আমিই সবার সেরা— চিত্রশিল্পী সর্বশ্রেষ্ঠ!

আমি কি বলিনি তোমায়—
তুমি মাছ— যেও না কখনো ঐ শুষ্কভূমিতে
যেহেতু সবচেয়ে গভীর— আমিই সমুদ্র— তোমার জন্য যথেষ্ট!

আমি কি বলিনি তোমায়—
ঝালে আটকে পোরো না পাখিদের মতো
কেনোনা আমিই তোমার ডানা— আলোর শক্তি সঞ্চালক…

আমি কি বলিনি তোমায়—
ওদেরকে ব্যর্থ করো তোমাকে বরফে পরিণত করতে,
যেহেতু, আমিই আলোর শিখা, তোমার যথেষ্ঠতম উষ্ণতা

আমি কি বলিনি তোমায়—
ওরা দূষিত করবে তোমাকে এবং বাধ্য করবে ভুলে যেতে,
আর জেনো— আমিই বসন্ত সর্বগুণের…

আমি কি বলিনি তোমায়—
প্রশ্ন করো না আমার প্রক্রিয়া নিয়ে
কারণ, সবকিছুই নির্দেশিত এবং আমিই এর স্রষ্টা…

আমি কি বলিনি তোমায়—
তোমার রিদয় তোমাকে গৃহে ফিরিয়ে নেবে
কারন সে জানে, আমিই তার প্রভু!

কেবলমাত্রই নিঃশ্বাস

না খ্রিস্টান, ইহুদী— না মুসলিম
না হিন্দু, বৌদ্ধ, সূফী— অথবা জেন

কোন ধর্ম কিংবা সাংস্কৃতিক রীতি থেকে নয়

আমি আসিনি প্রাচ্য থেকে, আসিনি পাশ্চাত্য থেকে
আসিনি সমুদ্রের অভ্যন্তর কিংবা মাটির উপর থেকে

না আমি প্রাকৃতিক, না অলৌকিক—
কোন উপাদানেই তৈরি না,
আমি অস্তিত্বশীল সত্তা নই—
না এই পৃথিবীর, না এর পরের
প্রেরিত হয়নি আদম এবং হাওয়া
অথবা অন্য কোন উৎপত্তি ইতিহাস থেকে

আমার অবস্থান— অবস্থানহীন, আমার গমনপথ— পথচিহ্নহীন
না দেহে না আত্মায়

আমি সংযুক্ত আমার প্রিয়তমের সাথে, যেখানে দেখেছি দুইটি পৃথিবী
একটি হিসেবে, যা ইঙ্গিত দেয় এবং জানায়—

প্রথম, শেষ, ভেতর, বাহির—
এই নিঃশ্বাসটুকুর আশ্রয়ে কেবল মানুষ।

গল্প এবং জল

একটা গল্প হলো পানির মতো, যা তুমি
উত্তপ্ত করো গোসলের জন্য।

এটা ধারণ করে তোমার ত্বক ও আগুণের মধ্যবর্তী সংবাদ,
সাক্ষাত ঘটায় উভয়ের এবং পরিষ্কার করে দেহকে।

কেবল অল্প সংখ্যকই পারে বিশ্রাম নিতে আগুণে—
ইব্রাহিম কিংবা স্যালমান্ডারের মতো
যেক্ষেত্রে আমাদের  প্রয়োজন কোন মধ্যস্ততাকারীর।

স¤পূর্নতার অনুভ’তি আসে—
কিন্তু তা সচরাচর আনতে প্রয়োজন অর্থের…

যদিও বা সৌন্দর্য আমাদের ঘিরে আছে
কিন্তু তা জানতে আমদের  যেতে হয় বাগানে

দেহ নিজেই একটা আবরক
এবং তা তোমার অস্তিত্বের ভেতরে প্রজ্বলিত আলোর
সামান্যই প্রকাশ করে বাইরে।

পানি, গল্প, দেহ, আমাদের করা সমস্তকিছু
এক একটি ভিন্ন ভিন্ন মাধ্যম
যা অজ্ঞাতকে গোপন করে আবার করে প্রকাশ।

অধ্যয়ন করো এসব
এবং উপভোগ করো একে যা একটি রহস্য নিয়ে মুছে যায়
কখনো আমরা তা জানি, অতপর, একটু পরেই তা জানি না।

লহুতে মিশে আছে নৃত্য—১

আমাদের মধ্যে একটি গোপন আবর্তন
আবর্তিত করায় মহাবিশ্বকে,
শির অনবহিত পায়ের
পা অনবহিত শিরের;
কেউই তত্ত্বাবধায়ক নয় কারো—

কেবল তারা ঘুরেই চলে শুধু…

যখন আমি মারা যাই

যখন আমি মারা যাই
যখন আমাকে কফিনে আটকে নাও,
কখনোই মনে করো না তুমি—
এই পৃথিবী থেকে হারিয়ে যাচ্ছি আমি

চোখের জল ফেলো না কোন
কোরো না আর্তনাদ কিংবা অনুভব দুঃখ—
আমি পতিত হচ্ছি না কোন দানবের নরকে

যখন আমার লাশ বহিত হয়
আমার চলে যাওয়ায় অশ্র“ ফেলো না
আমি ছেড়ে যাচ্ছি না,
আমি পৌঁছে যাচ্ছি— শাশ্বত ভালোবাসায়

আমাকে যখন কবরে ছেড়ে যাও
বিদায় বোলো না তুমি
কবর তো কেবল একটি পর্দা, যার পেছনে অনন্ত স্বর্গোদ্যান

আমাকে তো দেখবে শুধু কবরে নামাতে
এখন দ্যাখো উঠে আসতে
কিভাবে শেষ হতে পারে ওখানে
যখন সূর্য অস্তমিত হয় অথবা চাঁদ ডুবে যায়

এটা দেখে মনে হয় শেষ
যা অনেকটা সূর্যাস্তের মতো
কিন্তু বাস্তবে, এটা কেবলই নিুগামী হওয়া
তোমাকে যখন কবরে আটকে দেয়া হয়
এটা সেই মুহুর্ত, যখন তোমার আত্মার চির স্বাধীন
তুমি কি দেখেছো কখনো—
পৃথিবীতে বপিত হয়েছে একটা বীজ
যেটা জেগে ওঠেনি নতুন এক জীবন নিয়ে,
ক্যানো তুমি একটা মানুষ নামের বীজের উঠে আসাতে সন্দেহ করবে!

তুমি কি দেখেছো কখনো
ক’পে নোয়ানো কোন বালতি
ফিেের এসেছে খালি,
ক্যানো একটা আত্মার জন্য বিলাপ করো
যদি তা ফিরে আসতে পারে আবার
যেভাবে ইউসুফ ফিরে এসেছে ক’প থেকে!

যখন শেষবারের মতো তুমি
তোমার মুখ বন্ধ করো,
তোমার শব্দ এবং আত্মা
এমন এক জগতে যুক্ত হবে—
যেখানে নেই কোন সময়,  যার নেই কোন ঠিকানা

পাথর হয়ে মরি

আমি পাথর হয়ে মরি আবার গাছ হয়ে জন্মাই
গাছ হয়ে মরি আবার পশু হয়ে জাগি,
পশু হয়ে মরি আবার মানুষ হয়ে জন্মাই
তাহলে ভয় কীসের? কীবা হারাবার আছে মৃত্যুতে?

পাখির গান

আমার কামনার আগুনে
পাখির গান আনে শান্তি।
আমি তাদের মতোই আত্মহারা,
কিন্তু আমার বলার কিছুই নেই।
হে চিরন্তন আত্মা, আমার মধ্য দিয়ে
তুমি কিছু গান শিখে নাও।

দৃশ্যের পেছনে

এটি কি তোমার মুখমণ্ডল
যে বাগানকে সাজায়?
এটি কি তোমার সুঘ্রাণ
যে বাগানকে পাগল করে?
এটি কী তোমার প্রাণ
যে এই ছোট ঝরনাকে
করেছে নদী অথবা শরাব?
শত সহস্র জন তোমাকে খুঁজে বেড়ায়
আর মরে যায় এই বাগানে
অথচ তুমি লুকিয়ে আছ দৃশ্যের পেছনে।
কিন্তু এই ব্যথা তাদের নেই
যারা আসে আশিক  হয়ে।
তখন তোমাকে পাওয়া যায় সহজে
তুমি থাকো এই বাতাসে
আর শরাবের নদীতে।

গোধুলি সন্ধ্যায়

গোধুলি সন্ধ্যায় চাঁদ ওঠে আকাশে,
একসময় পৃথিবীতে নামে আর আমার দিকে চায়।
চিল যেমন পাখির বাচ্চা শিকার করে দ্রুত উড়ে
তেমনি এই চাঁদ আমাকে চুরি করে আকাশে ধায়।
আমি আমার দিকে তাকাই, আমাকে আর খুজেঁ না পাই!
আমার শরীর এক মিহি প্রাণ হয়ে মিশে  যায়  চাঁদে।
নয়টি গোলক হারিয়ে যায় অই সোনালি চাঁদে
আমার আমি হারিয়ে যাই এই মায়াবী সমুদ্রে।

মুহূর্তের সুখ

আমি আর তুমি বসে আছি বারান্দায়
দেখতে দুই, আসলে এক, তুমি আর আমি।
আমরা পান করি জীবনের জল এখানে
বাগানের সুন্দর নিয়ে বসে আছি দুজনে
তুমি আর আমি।
আর পাখিরা গাইছে
নক্ষত্রমণ্ডলী আমাদেরকে দেখছে
আজ আমরা তাদের দেখাব
এক পাতলা বাঁকা চাঁদ হতে কেমন লাগে!
তুমি আর আমি আমিশূণ্য, বসে আছি এক হয়ে
উদাসীন অলস বিচারের কাছে, আমি আর তুমি।
স্বর্গের টিয়া মিছরি কামর দিচ্ছে
যখন আমরা হেসে উঠছি, তুমি আর আমি।

যে আমাকে  পৃথিবীতে  পাঠালো

সারাদিন আমি এটি নিয়ে ভাবি, রাতে এটি ঠোঁটে আওরাই
আমি কোথা থেকে এসেছি আর আমাকে কী করতে হবে?
আমার কোনো ধারণাই নেই।
এ আমি নিশ্চিত- আমার আত্মা অন্য কোথাও  থেকে
আর আমি ওখানেই শেষ হতে চাই।

এই পাগলামি শরু অন্য কোনো সরাইখানায়
আমি যখন ফিরে আসি এই জায়গায়
আমি তখন তুমুল প্রশান্ত। এর মধ্যেই
আমি যেন অন্য মহাদেশের কোনো পাখি
এই পাখির দেশে বসে আছি।
আসছে সে দিন যেদিন আমি উড়াল দেবো
কিন্তু আমার কানে এটি কে? এখন যে আমার কণ্ঠ শুনে!
কে সে যে কথা বলছে আমরাই মুখে?
কে আমার চোখ দিয়ে দেখছে? আত্মা কী?
আমি প্রশ্ন না করে থামতে পারি না।
যদি আমি এক ফোঁটা জবাব পরীক্ষা করে দেখতে পেতাম
তাহলে আমি এই কারাগার মুক্ত করে দিতাম পাগলদেরকে।
আমি নিজে নিজে এখানে আসিনি আর আমি সেভাবে বাঁচতেও পারবো না।
যে আমাকে এখানে এনেছে তাকে আমাকে নিয়ে যেতে হবে বাড়ি।
এই কবিতা। আমি কখনো জানিনা আমি কী বলতে চাই
আমি এটি পরিকল্পনাও করি না
আমি যখন এর বলার বাইরে থাকি
তখন খুব চুপ হয়ে পড়ি আর কোনো কথাও বলি না।


আসো, আসো তুমি যেই হউনা কেন
মুসাফির, নামাজি,  সন্যাসী
কিছুই ব্যাপার না।
আমাদের এই ক্যারাভান নিরাশার নয়,
আসো যদিও তোমার প্রতিজ্ঞা ভঙ্গ হয়েছে হাজারবার
আসো, আবারো, আসো আসো।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি