কথা শহরের কথক ঠাকুর - তিন

(তিন)

এ হেন বিশালকায় বাড়ির অতিকায় পরিবারের লোকসংখ্যা বড়ো একটা কম ছিলো না । পরিবারের ক্ষমতার রাশ কেন্দ্রীভূত ছিলো নিয়মিতভাবে মুগুর ভাঁজা, রাশভারী, পান থেকে চুন খসা বদমেজাজী, গম্ভীর, স্বল্পবাক, ব্রিটিশ আমলের ম্যাজিস্ট্রেট, দোর্দন্ডপ্রতাপ ঠাকুরদাদার হাতেই । আর ঠাকুরমা ছিলেন একেবারেই শান্তশিষ্ট, নিরীহ গোবেচারা টাইপ । সব সময়েই ঠাকুরদার ভয়ে তিনি তটস্থ হয়ে থাকতেন । যদিও তিনি ছিলেন দেশভাগ পূর্ববর্তী ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গ্র্যাজুয়েট এবং ঠাকুরমার কাছেই আমার পিসি, জেঠু, বাবা, কাকাদের লেখাপড়া ও অঙ্ক কষার সাথে বাদবাকি সমস্ত কিছুর শিক্ষা । এমন দমবন্ধকর বাড়ির পরিবেশ ও শাসন দেখে দেখেই আমার প্রাথমিক পর্যায়ের বড়ো হয়ে ওঠা । তবে আমার ঐ সময়কার একমাত্র বন্ধু ছিল আমার ঠাকুরমা । ঠাকুরমার সাথেই আমি ঘুরে ঘুরে বেড়াতাম । কখনো পুকুর পাড়, কখনো গোয়ালঘর, কখনো আম বা নারকেল বাগান, কখনো বা বাঁশবাগান । ওনার  কাছেই আমার শিক্ষার প্রাথমিক ভাবে সূত্রপাত । রামায়ণ, মহাভারত, পুরানের গল্প ছাড়াও রূপকথার গল্প শোনাতে ঠাকুরমার জুড়ি মেলা ভার ছিল । সেই সময় থেকেই আমার কল্পনার ডানা মেলার শুরু । শুরু নানা রকমের গল্পের বই পড়বার আগ্রহ । মনে আছে, মাত্র আট বছর বয়সেই, ইস্কুলের বই ছাড়াও আমার পড়া হয়ে গিয়েছিল ঠাকুরমার ঝুলি, উপেন্দ্রকিশোর আর সুকুমার রায় রচনাসমগ্র । আর এর সাথে বাংলায় অনুদিত বিস্তর কমিকসের বই । আমরা যেই ঘরে থাকতাম, তার পাশের ঘরটা ছিলো মেজ জেঠুমনির । সেখানে তাকে সুন্দর করে সাজানো গোছানো হরেক রকমের বই নজরে আসত, যার ভিতরে একটা বই এর নাম আমার এখনো মনে আছে - "অ্যান ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য সী" । আমার বাবা শুধুমাত্র নিজের অ্যাকাডেমিক লেখাপড়া ছাড়াও ধর্মীয় ও জ্যোতিষবিদ্যা বিষয়ক বই নিয়ে রীতিমতন চর্চা করতেন । সেটা তিনি এখনো করেন তার রোজকার দৈনন্দিন রুটিন জীবনে । আর এই বই পড়বার ইচ্ছেটা আমার মনেও বাসা বেঁধেছিলো এই সব সূত্র ধরেই । আমার বাবার এক ভাই ( ন' কাকু ) খুব সুন্দর ছবি আঁকতেন । ওনার থেকেই আমার ছবি আঁকার আগ্রহের হাতেখড়ি । জেঠুমনি আর কাকুরা নাটকচর্চার পাশাপাশি খুব ভালো খেলাধূলোও করতেন । সেই সবকিছুই পরবর্তীতে অল্পবিস্তরভাবে আমার মজ্জায় তথা নাড়ীতে সঞ্চারিত হয় ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি