কথা শহরের কথক ঠাকুর - এক

কথা শহরের কথক ঠাকুর - রাজেন্দ্র

++++++++++++++++++++++++

(এক)

এই মুহূর্তে মনে পড়ে যাচ্ছে এমন একটা আলোছায়া মাখা আবছা অবয়ব, যার সন্ধানে কেটে গেছে আমার জীবনের প্রায় অর্ধেক বছর । এখানে অর্ধেক বছর কেন বললাম, তা নিয়ে অবশ্য তর্ক বিতর্কের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে । কারণ কে কত বছর পরমায়ু ধারণ করে এই ধরাধামে অবতীর্ণ হয়েছেন, তা কারোর পক্ষেই গননা করে বলা সহজসাধ্য নয় । সে যাই হোক, ছোটবেলা থেকে কৈশোর এবং কৈশোর থেকে এযাবৎকাল, এই বিস্তীর্ণ সময়রেখাটুকু অতিক্রম করে এলে, বাদবাকী যা কিছু অবশিষ্ট স্বরূপ পড়ে থাকে, তার সবটাই এই অবয়ব কেন্দ্রিক সেন্ট্রিপেটাল ঘোর । এখানে আমি সেন্ট্রিপেটাল বলতে ধরে নিয়েছি সেই অবস্থা, যা আমাকে আমার কেন্দ্রের দিকে আকর্ষণ করে । তবে সেই কেন্দ্রাতিগ আকর্ষণের তীব্রতা যে কতখানি, তার হিসেব আমি এই পরিসরে করতে চাইনা । তবে নিশ্চিতভাবে এইটুকুই বলতে পারি যে, এই ঘোর এর ছায়া লেগে আছে আমার ছবি আঁকায়, আমার শব্দচয়নে, আমার ভাবনায়, আমার বর্ণমালায়, কিংবা আমার ব্যবহৃত ক্রিয়াপদ - অব্যয় - বিভক্তি ও সমাসের অলিখিত ভাঁজে, এক ক্লান্তিহীন সুরের অনবদ্য মূর্চ্ছনায় ।

ভোরের পাখির ডাকে ঘুম ভাঙার পর থেকে, রাতের বিছানায়, বালিশের এক কোণে মুখ গুঁজে, সব ক্লান্তিকে ছুঁড়ে ফেলা পর্যন্ত সময়রেখা জুড়ে, শুধুই এই খুঁজে চলার অধ্যায় । বসন্তের পরে আবার বসন্ত কেটে গেছে । প্রতি বছর নিয়ম করে ফুটে চলা কৃষ্ণচূড়া, পলাশ, কদম, রজনীগন্ধা, হাস্নুহানা, যুঁই চামেলীর দল ও একে একে সময় শেষে ঝরে মিশে গেছে । হারিয়ে গেছে বকুল শিউলি কাশেরাও একে একে । হারিয়ে গেছে বাঁশবাগানের শিয়ালছানার বাসা, নক্সীকাঁথার মাঠ, বুঁজে গেছে পুকুর ডোবা খানা খন্দ । হলুদ হয়ে শুকিয়ে জ্বলে যাওয়া ঘাসের এক একটা বিপ্রতীপ কোণ ফেটে বের হয়ে এসেছে আরো এক একটা নতুন সবুজ মাথা । পাড়ার অতীতের বাঘ সিংহ দাদারাও এখন বৌদিদের তাড়নায় বদলে গেছে, মৌনীবাবার মতো নীরবে মেনে নিয়েছে তারা দৈনন্দিন জীবন লাঞ্ছনার তাড়না । এমনকি জামার বুকপকেটের এককোণে কোনও একসময়ের লেগে যাওয়া কালির দাগও হাল্কা হয়ে প্রায় মুছে গেছে বারবার ওয়াশিং মেশিনে ঘুরে । তবুও যেন ঘোর কাটেনি আমার । আর এখনো যেন সেই "ঘোর" কেই অবলম্বন করে ছুটে চলেছি আশ্রয়হীন ভবঘুরের মতো । বুকের খাঁচার ভিতরে চুপচাপ বসে থাকা অচেনা পাখিটা কিন্তু একের পর একটা মুহূর্তকে হারিয়ে চলেছে । তবুও কিন্তু উৎসাহে ভাঁটা পড়েনি ওর । পরম আগ্রহ নিয়ে সব উপেক্ষাকে তুচ্ছ করে ও বসে রয়েছে একঘেয়ে একটানা ক্লান্তিকর কাগুজে আইনের সামাজিক মূল্যবোধ মগজে ভরে । সেখানে কেঁচোর বাচ্চাদের মতো কিলবিল করে চলেছে অসংখ্য লৌকিক আর সামাজিক দায়বদ্ধতা, যা আইনী সীমাবদ্ধতা ভেঙে সীমাহীন অভিসারে পথ হারাতে, এখনো আকন্ঠ সুরাপানের মতোই ভয় পায় । একদিন এই সবকিছুরই ইহলৌকিক ও পারলৌকিক ক্রিয়ার পরিসমাপ্তি ঘটে যাবে । কিন্তু ততদিন কি আর পরমের অপেক্ষা ধরে চুপ করে বসে থাকা যায় ? না যায়না । পরমকে প্রাপ্তি একটা চরমতম মানসিক অবস্থা, যার ব্যাখ্যা এখানে আমি করতে বসিনি । এখানে আমি আমার মতো করে কিছু বলতে চাই, যা আমার আমিত্বের একান্ত ব্যাক্তিগত ভাব অনুভূতি, যার সবটুকু হয়তো সবসময়, শব্দের পরিসরে সঠিকভাবে বোঝানো, সম্ভব নাও হতে পারে । তখন কিন্তু আপনাদের অনুভবের পালা ।

যাই হোক, এবার আমি শুরু করছি । আপনারা পড়তে থাকুন । জানতে থাকুন এই কথকের উন্মুক্ত কথামালা । সম্ভব হলে পাশে থাকুন ।

(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি