কথা শহরের কথক ঠাকুর - দুই
কথা শহরের কথক ঠাকুর - রাজেন্দ্র
+++++++++++++++++++++++++
(দুই)
যে সময়ের কথা এখন লিখতে চলেছি, সেই সময়ে আমাদের বাড়ির চারপাশের প্রকৃতির বুকের আবরণ, এখনকার মতো সিমেন্ট কংক্রিট আর পিচের মোড়কে এমন করে ঢাকা ছিলো না । চারপাশে হরেক রকমের রকমারি গাছগাছালি আর পুকুর ছিলো । সেখানে আকাশের বুকে চরে বেড়ানো মেঘ আর তারা মাখানো চাঁদের, নিটোল সুন্দর ছায়া পড়তো । এত রকমের গাড়ির শব্দ আর ধোঁয়ার দুষণজনিত উৎপাতও ছিলো না । ছিলো না এয়ার কন্ডিশনের দৌরাত্ম্যও । জীবনের গতিময়তাও ছিলো অনেকটাই শামুকের মতো শ্লথ প্রকৃতির । আমাদের ঠাকুরদাদার আমলের তৈরী বাড়িতে আমরা জয়েন্ট ফ্যামিলি হিসেবেই সবাই মিলেমিশে থাকতাম, যার সুখ কখন যে কালের গর্ভে হারিয়ে গেলো, না জানি কিসের অভিশাপ লেগে । বাড়ির সামনেই ছিলো টলটলে জলের একটা বিশালকায় দীঘি, যেখানে গোটা এলাকার অধিকাংশ মহিলারাই দলে দলে এসে স্নান, বাসন মাজা, কাপড় কাচা সেরে যেত । আমাদের বাড়ির চৌহদ্দির ভিতরেও একটা বড়সড় আকারের পুকুর ছিল । পুকুরের জলে কিলবিল করত হরেক রকমের ছোট বড় মাঝারি মাপের মাছ, কাঁকড়া আর শামুক । চারপাশ ঘিরে ছিল অসংখ্য গাছ আর গাছের ডালে চুপ করে বসে থাকতো মাছরাঙা পাখি । অনেক সময়েই দেখতাম বক আর সারসদের নেমে আসতে । কি সুন্দর করে ব্যালেন্স রেখে ওই পিছল সিঁড়ির উপরে চুপচাপ দাঁড়িয়ে থেকে ধ্যানমগ্ন হয়ে থাকতো তারা । আর খাবার জুটে গেলেই হুশ । যেই ইঁটের সুরকির পথ ধরে পুকুর এর বাঁধানো পাড়ে আমাদের যেতে হতো, সেখানে একজোড়া বিশাল আকৃতির বেলগাছ ছিলো । কাকু জেঠুরা ওখানে আমাকে একলা যেতে নিষেধ করতেন । ঠাকুরমা বলতেন সেখানে নাকি এক ব্রহ্মদৈত্য আছে । সে নাকি আসলে ব্রাহ্মণের আত্মা । তাকে নাকি একবার ভাগ্যক্রমে আমার ঠাকুরদাদা দেখেও ফেলেছিলেন । যদিও কখনো কারো কোনো অনিষ্টই করেনি সে । সন্ধ্যার সময় বেজে ওঠা পুজোর ঘণ্টা আর শাঁখের আওয়াজে আমি সেই প্রেতের কান্নার ধ্বনি শুনতে পেতাম । অনেক অনেক বছর ধরে অনেক কষ্ট বুকে চেপে নিয়ে সে বসে আছে ওই বেলগাছ এর ডালে । জানিনা, এখনও সে ওইভাবেই ঠায় অপেক্ষা করে আছে কিনা তার বহু কাঙ্খিত মুক্তির । গোটা বাড়িতেই সকাল সকাল গোবর জল ছড়ানো হতো । প্রায় ঝুঁকে পড়া, অর্ধেকখানি বেঁকে যাওয়া ঠাকুরমা, ঝাঁটা হাতে করে গোটা বাড়িটাই টো টো করে ঘুরে বেড়াতেন চরকির মতো । বাড়ির উঠোনের তুলসী মঞ্চে রোজ নিয়ম করে ধুপ ধুনো আর চরকা কাটা সুতোর কাপড়ে তেল ঢেলে মাটির প্রদীপ জ্বালানো হতো । বাড়ির গোয়ালে বেশ কয়েকটা গরু ছিলো আমাদের । ওদের পিছনে অনেক খাটুনি যেত ঠাকুরমার । চরম শক্তসমর্থ অথচ কৃপণ ঠাকুরদাদা, শুধুমাত্র বাজার করা ছাড়া আর কোনো কিছুতেই মাথা লাগাতে চাইতেন না । গরুর দুধ দোয়ানোর জন্যে রোজ সকালে একজন গোয়ালাকে আসতে দেখতাম । সে খুব কায়দা করে গরুগুলোর পায়ে দড়ির ফাঁস লাগিয়ে দিয়ে বালতি ধরে অনেকটা করে দুধ দুইয়ে নিত । বেচারা বাছুর গুলো ওদের মায়ের দুধ বলতে প্রায় কিছুই খেতে পেত না । আর আমিও সুযোগ পেলেই ইচ্ছে করে বাছুর গুলোর দড়ি খুলে দিতাম , যাতে বেচারী গুলো একটু ওদের মায়ের দুধ খেতে পায় ।
(চলবে)
Comments