কবিতার ভক্ত হয়, ভগবান হয় না
"কবিতার ভক্ত হয়
ভগবান হয় না
আর
ভগবানই যদি না থাকে
তবে ধর্মগ্রন্থ কিসের"
@ রাজেন্দ্র
ক্লাসিফিকেশন্ বিষয়টা বড়ো অদ্ভুত প্রকৃতির । কাউকে যেন ট্যাগ্ করা ।
কবিতা চর্চার সাথে এর সম্পর্ক সরলরৈখিক । আশ্চর্যের বিষয় _ আমরা কবিতাপ্রেমীরা এখনো কিন্তু ক্লাসিকাল বা সেকেলে কবিদের কবিতা পড়ি ।
সেখান থেকেই অনেকে চুরি করি ভাব আর ভাবনা । এরপর শুরু করি শব্দ নিয়ে কুস্তি, যুযুৎসুর প্যাঁচ । অভিধান খুলে শব্দচয়ন করি । পরপর জুড়ে কোলাজ করি । কবিতা বলে চালাতে চাই । চলেও যায় ।
কবিতা বিশেষজ্ঞরা বলেন এটাই নাকি আপডেটেড কবিতার চর্চা ।
কবিতায় মান নেই । নেই অভিমান । নেই প্রেম । তবে হ্যাঁ । কায়া অবশ্যই আছে । আছে ছায়া ও ।
তবে সেই ছায়াটা অবশ্যই কবিতার কায়ার চেয়েও অনেক বড়ো ।
আর আমরা সকলে উদভ্রান্তের মতোই সেই ছায়াদের অনুসরণ করে কবিতা লেখার চর্চা করি _ আপডেটেড কবিতার চর্চা ।
আধুনিক কবিতা কি ? উত্তর আধুনিকতাই বা কী ? এই নিয়ে বিস্তর কথোপকথন গবেষণা এখনো অব্যাহত । তা সে চলুক । নিয়মে চলুক কিংবা অনিয়মে ।
তাই বলে কি কবির স্বতঃস্ফূর্ততাও থাকবে না ? থাকবে না কোনও রকমের আবেগ ? ভালোবাসা _ রাগ _ ক্ষোভ _ অভিমান _ হিংসা _ প্রতিহিংসা _ প্রকৃতি প্রেম _ নৈস্বর্গ শোভা _ এ সব কিছু যদি বাদ দিয়ে লিখতে বসি _
শব্দের শব ব্যবচ্ছেদ ছাড়া তবে আর কি করবো আমরা ? সেটা কি আদৌ কবিতা হবে ? কাটবে কি দাগ পাঠকের মনে ?
তবে কি রোবট সুলভ অনুভূতিহীন মানুষই একমাত্র পারে অনুভূতিহীন শব্দসমষ্টিকে আপডেটেড্ কবিতা বলে ট্যাগ্ করতে ?
আর এখন তো স্বঘোষিত বড়ো কবিদের লেজুর জাতের ফলোয়ার চাই ।
কারণ যাই প্রসবিত হোক্ না কেন _ লেজুরের দল শব্দের খেজুর খেতে খেতে _ বাহ্ ; খুব সুন্দর ; দারুণ ; অসাধারণ _ প্রভৃতি অব্যয়ের ধারায় স্নান করিয়ে দেবেন আপডেটেড কবিটিকে ।
আর সেই স্নানে স্নিগ্ধ কবি আবার বসে পড়বেন তার পরবর্তী প্রসবের সম্ভাবনা নিয়ে । এর সাথে সাথে তিনিও পাল্লা দিয়ে তার ছায়ার অনুগামী অনুরাগী ভক্তবৃন্দ নির্মানে নেমে পড়বেন ।
এটাই আজকালকার কবিদের ট্রেন্ড । এটাই বাজারে চলছে । একে অপরকে খুশী করবার তোষামোদী পালাগান । এমন জলসা আর কতদিন চলবে জানি না ।
তবে ভাব পাগল ; প্রেমে ছাগল কবিতা লেখকরা কি করবেন ?
কবিতার গুরুমশাইদের ক্লাসরুমের বাইরে নীল ডাউন হয়ে কান ধরে বসে থাকবেন ।
আর পাঠককুল গড়তে অঙ্গীকারবদ্ধ আপডেটেড কবিরা নিজেরাই নিজেদের কবিতার পাঠক হবেন । পরস্পর পরস্পরের শব্দজব্দে হাততালি দেবেন ।
কেউ কেউ বেশি আহ্লাদে সেই শব্দঘন্টের বই করবেন । একে অন্যের দু-পাঁচ খানা বই নেবেন । অধিকাংশই অবশ্য কিনবেন না । বন্ধুত্বের দাক্ষিণ্য দেখিয়ে বই চেয়ে নেবেন ।
এমনটাই চলছে । আর এমনটাই চলতে থাকবে । আর সবাই লিখতে থাকবে একই রকম । একই ছকে । একই প্যাটার্নে । কবিতার মা বাবা বোন ভাই দাদা দিদি মাসি পিসি কাকু জেঠু _ সব মিলে মিশে একাকার হয়ে যাবে ।
বিগত কিছু বছর ধরে লক্ষ্য করে চলেছি কবি নির্মানের পালা পদ্ধতি । সেটি ঠিক কি রকম ?
এক । ধরুণ আপনি ছড়া জাতীয় লেখা লেখেন । কেউ কেউ আবার গদ্যেই লেখেন । কেউ কেউ আবার গদ্যে পদ্যে মিলিয়ে খিচুড়ি পাকান ।
দুই । লেখার সাথে সাথে সেই সব কাট-আনকাট লেখাগুলি ফেসবুকে দিলেন । পরিচিতেরা যারা কস্মিনকালেও ইস্কুলের টেক্সট বাদে আর কোন কবিতা পড়েন নি, তাদের অধিকাংশই চমকিত হলো । বাব্বা - আপনি কবিতা লেখেন !!! বিরাট ব্যাপার । আপনার উৎসাহ উদ্দীপনা বাড়তে থাকলো ।
তিন । এরপর আপনি বহুগুণ উৎসাহে লিখে পোস্ট করবার সাথে সাথে আপনার পরিচিত কিছু মানুষকে ট্যাগাতেও শুরু করে দিলেন । ভাবখানা এমন, কেউ যদি আপনার টাইমলাইন পোস্ট মিস করে গেলেও আপনার লেখা পড়বার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবে না ।
চার । এরপর টুকটাক পাড়াতুতো কিংবা ফেসবুকতুতো দাদা দিদি ভাই বোন কাকু জেঠু বন্ধুদের পত্রপত্রিকায় বা অনলাইন ব্লগজিনে আপনার লেখা ছাপা হতে থাকলো । আপনি আরো আহ্লাদে আটখানা হলেন । আপনার লেজ ও ডানা দুটোরই সমানতালে শ্রীবৃদ্ধি হতে থাকলো ।
পাঁচ । এরপর আপনি বিভিন্ন ফেবুর কবিতা গ্রুপে আপনার লেখা দিতে থাকলেন । ঐ গ্রুপের অ্যাডমিন সম্পাদকেরা আপনার মত সদস্যদের ভিতর বিষয়ভিত্তিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করতে লাগলেন ।
ছয় । তারপর একদিন ঐ গ্রুপের সদস্যদের থেকে বাছাই করা কিছু কবিতার সংকলন বই হিসেবে প্রকাশিত হলো । এবার আপনি একজন প্রতিষ্ঠিত কবি । গ্রুপের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে আপনি আমন্ত্রিত হলেন । সেখানে স্বরচিত কবিতা পাঠ করলেন । একটু আধটু পার্টি সহ সেল্ফি তুলে ফেসবুকে সবাইকে ট্যাগ করে জানিয়েও দিলেন ।
আমি আগেও বলেছি । এখনো বলছি - আজকাল এইভাবেই বাজারী নিয়মে বই এর ব্যাবসার প্রয়োজনে কবিরা নির্মিত হচ্ছেন । এটার ভালো বা মন্দ প্রভাব আছে কি নেই তা বলতে পারবো না । তবে সত্যিকারের কবিতা চর্চার জন্যে এই ধরণের ব্যাপারগুলো অত্যন্ত ক্ষতিকারক ।
আপনি পড়ুন । অতীত থেকে বর্তমান পর্যন্ত । সেরাতম দের লেখা পড়ুন । নিজেকে ঋদ্ধ করুন । আমি নিশ্চিতভাবে বলতে পারি, আপনার ভিতরে পরিবর্তন আসবেই আসবে ।
আপনি আর তখন আত্মপ্রচারের জন্যে, নিজেকে জাহির করার জন্যে, অপরের লেখাকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার জন্যে ফেসবুকে অবাঞ্ছিত পোস্ট করবেন না ।
এমনকি এখনকার স্বঘোষিত কবি গুরুদের, কবিতার গডম্যানদের খপ্পরে বা চক্করেও পড়বেন না ।
আপনি থাকবেন নিজের মত । চলবেন নিজের তালে । বাঁচবেন নিজের ছন্দে ।
আপনার লেখা কেউ পড়লো কি পড়লো না, লাইক দিলো কি দিলো না, ছাপা হলো কি হলো না, কবিতা পাঠে কেউ ডাকলো কি ডাকলো না, বছরে একটাও বই হলো কি হলো না - এ সব নিয়ে আর মাথাব্যাথা করবেন না ।
আপনারে চারপাশের সব ভালো মন্দগুলো আপনার ভিতরে মিশে একাকার হয়ে যাবে । ভাবনার ঘোরে শব্দের জাদুতে আপনি আচ্ছন্ন হয়ে থাকবেন ।
যা মন চায় লিখবেন । ছন্দ অন্ত্যেমিল বা আর সব কবিতা লেখার ব্যাকরণের সব নিয়মগুলো ভো কাট্টা হয়ে যাবে আপনার মগজের থেকে ।
আপনি আর স্টিফেন হকিং এর চলে যাওয়ার কারণে দুঃখপ্রকাশ করবেন না ।
বরং আরো একজন মিস্টার হকিং আপনার ভিতরে নতুন করে আবার জন্ম নেবে - নাস্তিক্যবাদের শূন্যতা মেখে একরাশ প্রশ্ন আর জিজ্ঞাসার ডালি নিয়ে সমস্ত প্রথাগত ভাবনার বিরুদ্ধে আপনি আবার নতুন করে বাঁচতে শিখবেন । আপনি কবি হয়ে উঠবেন ।
- রাজেন্দ্র
Comments