ভূতনীর চরে (দুই)
আমার কিন্তু বিরাট শখ ঐ এলাকায় যাওয়ার । এলাকার কুখ্যাত হিংস্র ডাকাত লোকজনকে নিয়ে একটু কালচার করবার অদম্য ইচ্ছে বুকে চেপেই এই এতদূরে ছুটে আসা ।
মেলা তো সকলেই দেখতে আসছে । কিন্তু এমন হিংস্র "ঠিয়াপার্টি" দের নিয়ে আজ অবদি কেউ কোথাও একটা শব্দও কালি খরচ করে লেখেনি বলেই আমার ধারণা । এই কাজটা করতে গিয়ে যদি জীবনহানির আশঙ্কাও হয়ে যায়, তবে বেঁচে ফিরে আসতে পারলে সেটা নিয়েও আরো একটা গল্প লেখা হয়ে যাবে ।
এদিকে আনারুল আর বন্ধুটির কোনও পাত্তাই নেই । বাবাজীদের ফোন লাগানো হলো । আনারুল জানালো যে সে আজ যেতে পারবে না । ওদের পাড়ায় কে একজন নাকি গুরুতর রকমের অসুস্থ্য হয়ে পড়েছে । তাকে নাকি বাইকে চাপিয়ে স্থানীয় প্রাথমিক চিকিৎসাকেন্দ্রে নিয়ে যেতে হবে ।
আমরা যা বোঝার বুঝে গেলাম । কেউ গুরুতর রকমের অসুস্থ্য হলে তাকে তো সেই ফুলহার নদী পার করে মানিকচক ব্লক অফিস এলাকার হাসপাতালেই নিয়ে যেতে হবে । তাকে প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রে নিয়ে গিয়ে কি যে লাভ হবে, তা আমার বোধগম্য হলো না ।
বুঝলাম, ব্যাটা ঢপ দিচ্ছে । আসল ব্যাপারটা হলো ঐ গদাইয়ের চর । গতকাল ওকে বেশ ভালো রকমের নেশায় ধরেছিলো । তখন নেশার ঘোরে আমাদের সাথে 'হ্যাঁ' তে 'হ্যাঁ' মিলিয়েছিলো । আজ সকালে ঘুম ভেঙে উঠে যখন হুঁশ ফিরে এসেছে, তারপরেই এইভাবে চালাকির আশ্রয় নিয়ে ওরা দুজনেই ব্যাপারটা থেকে মুখ ফিরিয়ে নিতে চাইছে । আর এটাই খুব স্বাভাবিক ব্যাপার ।
ওরা স্থানীয় বাসিন্দা । খুব ভালোমতন এলাকা চেনা লোক । অথচ গদাইয়ের চর নাম শুনলেই এদের সবকিছু শুকিয়ে যায় । যেখানে পুলিশ যেতে রীতিমতন আতঙ্কিত বোধ করে, সেখানে এরা তো সত্যিই নস্যি । আর ওদের কাছে এখন আর আতিপাতি সস্তা মানের মোবাইল নেই । ওরা ব্যবসাদার মানুষ । লাখ লাখ টাকার কারবারী ।
আনারুলের গলায় মোটা মোটা ভারী দু'খানা সোনার চেন, প্রায় সব আঙুলেই সোনার আঙটি পরা । হাতের মোবাইল সেট টাও হাজার তিরিশের নীচে নয় । ওরা যদি আমাদেরকে ধরে ফেলে, তবে টাকা পয়সা সোনাদানা মোবাইল আর বাইক গুলো তো কেড়ে নেবেই, আর তার সাথে সাথে আমাদেরকেও কেটে চরের ভিতরেই পুঁতে দিতে পারে ।
আর আরো একটা ব্যাপার হলো বিপজ্জনক ভাবে নদী পার হওয়া । ওদিকের বৃষ্টিজনিত কারণে জলস্ফীত গঙ্গার অবস্থা খুবই ভয়ঙ্করী । কিছু দিন আগেই চর থেকে ঘাস কেটে ফেরার পথে মাঝগঙ্গায় নৌকাডুবিতে তিনজন নিখোঁজ হয়েছে ।
ভূতনীর তিলকটোলা ও নন্দীটোলার পাঁচজন ঘাস কাটতে গদাইয়ের চরের পাশের একটি চরে গিয়েছিলো । সেই চর থেকে ঘাস কেটে ফেরার সময় মাঝগঙ্গায় হটাৎ ঝড় উঠলে নৌকাটি ডুবে যায় । আর আজকাল তো কথায় কথায় নিম্নচাপ জনিত ঝড়বৃষ্টি লেগেই আছে ।
এর পাশাপাশি আরো একটা চরম অস্তিত্বকালীন সমস্যা হলো গঙ্গার ভাঙন । ভূতনীর হীরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকার বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে চলছে গঙ্গার বিষাক্ত ছোবল । এলাকার পাড় ভাঙার খেলায় মেতে উঠেছিলো গঙ্গা বিগত অনেক মাস ধরেই । সেই খেলাই এখন চরমে এসে উঠেছে ।
এলাকাবাসীরা সকলেই কম বেশী রীতিমতন আতঙ্কিত । স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবিকা কৃষিকাজের ওপরই নির্ভর । তাই খুবই আশঙ্কাজনক অবস্থায় রয়েছে ওরা । এই নদী ভাঙন রোধ করা সম্ভব না হলে ওদেরকে ভেসেই যেতে হবে।
আর নদী তো বর্তমানে হীরানন্দপুর বাঁধকেও ছুঁয়ে ফেলেছে । বস্তায় বস্তায় বালি ভরে জমা করে ফেলে ভাঙন বন্ধ করার কাজ চলেছে রাতভর । সেচ দপ্তরের উদ্যমে ও লোকাল মানুষের অনেক পরিশ্রমের শেষে এখন অবস্থা খানিকটা নিয়ন্ত্রণে রয়েছে । আর বন্যার জল অনেকটা নেমে আসায়, জলস্ফীতি কিছুটা হ্রাস পাওয়ায় এখন আর গঙ্গার সেই দুই মাস আগের রাক্ষুসে রূপটাও নেই ।
এতকিছু ভাবনা চিন্তা করলে দেখা যাবে আনারুল ও তার বন্ধু সত্যিই ঠিকই সিদ্ধান্ত নিয়েছে । কারণ যাওয়ার ইচ্ছে আমাদের উপরে হলেও সেখান থেকে অক্ষত অবস্থায় ফেরা ব্যাপারটা কিন্তু সত্যিই বোধহয় আমাদের হাতে নেই । এমনকি যাঁরা ঐ এলাকার ভোটার, তারাও কেউ ঐ চত্বরে বাড়িঘর বানিয়ে বসবাস করতে চান না । তাঁদের প্রায় নিরানব্বই শতাংশ মানুষই রাজমহলের দিকে বাড়িঘর করে থাকেন । ভোটের দিন তারা সকাল সকাল রাজমহল থেকে এপারে এসে ভোট দিয়ে আবার সকাল সকাল স্বস্থানে প্রস্থান করেন । আর বাদ বাকি এক শতাংশেরা চরের উপর চাষবাস করার খাতিরে খানিকটা বাধ্যতামূলক ভাবেই ঐ চরের উপর অস্থায়ীভাবে বাঁশ পাটকাঠি আর খড় মাটি দিয়ে ঘর বানিয়ে নেন ।
সুতরাং সবদিক চিন্তা ভাবনা করে আনারুলদের এই ভাবে অজুহাত দিয়ে ঘটনার অবশ্যম্ভাবীতা থেকে পাশ কাটানোটাই আমার নজরে সঠিক বলে মনে হলো । সবাই চায় তার জীবনের নিশ্চয়তা । বেঁচে থাকলে সে আরো অনেক কিছুই দেখতে পারবে, উপভোগ করতে পারবে । কিন্তু গদাইয়ের চরে "ঠিয়াপার্টি" ডাকাত দলের হাতে পড়ে গেলে প্রাণগুলো বেঘোরে দেওয়া ছাড়া আর কিছু করবার থাকবে না ।
কি করবো ভেবে পেলাম না । আনারুলরা যেতে চাইছে না । আমারও মন খানিকটা খারাপ হয়ে গেলো । কিছুক্ষণ আগেই বি.এল.আর.ও. দাদাকে ফোন করে বললাম গদাইয়ের চরে যাওয়ার কথা । এলাকাটা বিশেষ সুবিধের নয় বলে ভূতনীর থানার ও.সি. কেও একবার জানিয়ে রাখতে বললাম । যদি সাড়ে তিনটে বা চারটের ভিতর মানিকচকের অফিসে পৌঁছতে না পারি, তবে যেন পুলিশ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেয় - এমনটাই ফাইনাল কথা হলো । আর তারপর কিনা এমন করে যাওয়ার প্রোগ্রামটা ভেস্তে গেলো ।
রাণা বললো ভাবনা চিন্তা করবার কিছুই নেই । এখানে নাকি এমন অনেক জায়গা আছে, যেখানে গেলে আর ফিরে আসার মন করবে না । ওর বোন আমাদের জন্যে কলাই এর রুটির সাথে বেগুন পোড়া আর রসুনের আচার বানিয়ে দিচ্ছে । ওদের এখানে দুই রকমের জ্বালানি আছে । শহরের মতো রান্নার গ্যাসও আছে । আবার গোবর মাটি লেপা নিকোনো পরিপাটি উনুন ও আছে । মুলতঃ কুড়িয়ে আনা শুকনো মরা ডাল পাতাই এই সব মাটির উনুনের প্রধান জ্বালানি ।
আবহাওয়াটা মেঘলা ছিলো । আর চারপাশটা ছিলো কুয়াশায় আচ্ছন্ন । হাল্কা হাল্কা হাওয়া বইছিলো । একটু শীত শীত ভাব করছিলো । আমরা আর বিলম্ব না করে চটজলদি তৈরী হয়ে নিলাম । টিফিনে কলাই এর রুটি, বেগুন ভর্তা আর রসুনের নোনতা চাটনি তৈরী । দুটো বাইক রাখা ছিলো । একটায় আব্দুল চেপে বসলো, ওর পিছনে বসে গেলো রাণার ভাগ্নে । আর একটায় রাণা আর আমি ।
রাণার বাইকের একটা সমস্যা আছে । প্রথমতঃ মডেলটা অনেক পুরানো হওয়ায় ওতে সুইচ টিপে বাইক স্টার্ট করবার সুযোগ নেই । আর দ্বিতীয়তঃ ওকে অনেকবার কিক স্টার্ট দিতে হয় । সেই অনেকবার এর সংখ্যার কোন সঠিক হিসেব আমার জানা নেই ।
অবশেষে আমাদের বাইক দুটো অন্য একটা পথের দিকে রওনা দিলো । আমি আর আব্দুল এই পথ চিনি না । রাণা কিছুটা চেনে । আর বাদ বাকী অজানা পথের ভরসা রাণার স্কুলে পড়া ভাগ্নেটি । লুটিহারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পাশ দিয়ে বের হলাম আমরা । এবারে আর রিং বাঁধে চড়বার কোন ব্যাপারই ছিলো না । কারণ আমরা চলেছিলাম গঙ্গার বন্যাপ্রবণ এলাকার পথে রাজমহলের দিকে ।
আমার মাথায় কান ঢাকা টুপি, চোখে চশমা, আর পরণে পাতলা উইন্ডচিটার । তার ভিতরে ঘন গাঢ় নীল রঙের উপর সাদা রঙের প্রলেপ দেওয়া আড়াআড়ি ডোরাকাটা কলারওয়ালা টি শার্ট আর জিনসের প্যান্ট ভেদ করে যেন ছোট ছোট সূঁচের খোঁচা মারতে লাগলো চলমান বাইকের পাশ দিয়ে কেটে যাওয়া কুয়াশা মাখা ভেজা জোলো হাওয়া ।
এর তার বাড়ির বেড়ার পাশ দিয়ে, মোষের খাটাল, ধানের গোলা, পুরানো বাংলা ইঁট ভাটা পেরিয়ে আমরা এসে পড়লাম বিস্তীর্ণ কলাই, মুগ আর 'কল্লা' র ক্ষেতে । এখানে 'কল্লা' আসলে হলো 'করলা' ।
[ বাংলা ব্যাকরণের যে নিয়ম ধরে ব্যঞ্জনবর্ণের কোন একটি বর্গের অন্তর্গত পাশাপাশি দুটি ব্যঞ্জনধ্বনির ('র্' আর 'ল্') ভিতর, পরবর্তী ব্যঞ্জনধ্বনি 'ল্' এর প্রভাবে পূর্ববর্তী ব্যঞ্জনধ্বনি 'র্' পরিবর্তিত হয়ে 'ল্' এ পরিণত হয় (যাকে ব্যাকরণের ভাষায় 'সমীভবন' বলা হয়), এখানেও সেই একই নিয়মে 'করলা' হয়ে গেছে 'কল্লা' ]
গঙ্গার পলিমাটিতে ভরপুর ভূতনীর চরে জন্মানো মুগ আর কলাই এর স্বাদজনিত সুনাম ভারতবিখ্যাত । এই সব এলাকায় সব মাটির পথই পায়ে পায়ে চলে তৈরী হয়েছে । আমাদের বাইক দুটো সেই রকমেরই পথ ধরে এগিয়ে চললো । মাটির পথ বলতে একজনের হেঁটে চলে যাওয়ার মতো পথ । তা পাশাপাশি দুইজনের চলার মত যথেষ্ট চওড়া নয় ।
বাইকে চলার সময়ে বাইকের দুইপাশে ঝুলিয়ে রাখা পায়ের আঙুলে বার বার চারাগাছগুলোর পাতাগুলো যেন সুড়সুড়ি দিতে লাগল । চারপাশের ঘন কুয়াশার স্তর এতক্ষণ জমাট বাঁধা পর্দার আকার ধরে ছিলো । একটু একটু করে সেই কুয়াশা পাতলা হতে লাগলো । হাল্কা হাল্কা ভোরের প্রথম রোদেলা আলোর আভাস পেলাম ।
একটু আগে পর্যন্ত গোটা আকাশটাই কুয়াশা আর মেঘে আচ্ছন্ন হয়েছিলো । চশমার কাঁচ দুটো বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছিলো । এবার যেন হাল্কা হাল্কা করে রোদ উঠেছে । গোটা ভূতনীর চরের উপর ছড়িয়ে পড়েছে সেই সোনালী হাল্কা হলুদ রঙের ফুল ফোটানো দিবাকরের আলো ।
আর কুয়াশা মাখা ঘন জমাট সরের মতো অস্পষ্ট চাদর আলতো আলতো করে ক্রমশঃ সরে যাচ্ছে । ধীরে ধীরে ঘুম ভেঙে জেগে উঠছে ভূতনী । রাতভর তার সাথে এক বিছানায় সোহাগ করেছে গঙ্গার শরীরি বিভঙ্গ আর রাতের জোনাকীরা । তার সারা শরীর জুড়ে এখনো সেই ঘুম ঘুম আদরের চিহ্ন । তার গোটা শরীর জুড়ে কুয়াশা মাখা । যেন ঘামে ভেজা শরীরে আড়মোড়া ভেঙে হাই তুলছে সে গঙ্গার উপর পেতে রাখা অনন্ত বিছানায় । তার রাতভর আমোদ বিলাসের স্বাক্ষী আকাশের তারা আর মেঘের আড়াল থেকে উঁকি মেরে শিহরিত হয়ে ওঠা চাঁদ এখন পশ্চিমের দেশে বিশ্রাম নিতে গেছে ।
সূর্যের ঝলমলে সোনালী আলো এসে উপচে পড়ছে শিশির আর কুয়াশায় ভেজা মুগ আর কলাই এর পাতায় পাতায় । চরের সর্বত্র বিন্দু বিন্দু ঘামের মত জমাট বেঁধে আছে শিশির । আর শিশিরের উপর ঠিকরে পড়া সূর্যের আলোয় ধাঁধিয়ে যাচ্ছে চোখের দৃষ্টি ।
আমাদের বাইক দুটো এসে থামলো গঙ্গার ধারে । এপাশের গঙ্গা একেবারেই শীর্ণকটি ক্ষীণতনু । এপার থেকে একশো ফুট দূরেই জেগে উঠেছে একটা বিশাল চর । এ পাড়ের মত ঐ চরের পাড়ও সমানতালে ভাঙা । এখানকার জল একেবারেই ঢেউহীন, শান্ত । জলের উপর দিয়ে মৃদুমন্দ উত্তুরে শীতল বাতাস বয়ে চলেছে ।
এপাড়ে নোঙর করা রয়েছে গোটা তিনেক ছোট ছোট মোটর বিহীন নৌকো । সেগুলো খুব সম্ভবতঃ জেলেদের । বাঁশের লগি বা লগা পুঁতে রাখা হয়েছে জল সংলগ্ন চরের নরম কাদায় । তার সাথে দড়ির ফাঁসে বাধা পড়ে আছে একলা নিঃসঙ্গ নৌকোগুলি ।
চরের চারপাশে রয়েছে বিস্তীর্ণ সবুজ ঘাস । ঘাসের উপর কোথাও কোথাও জঙলা গাছের ঝোপ ঝাড় । সেখানে আবার থোকা থোকা হয়ে ফুটে আছে গোলাপী সাদা হলুদ নীলচে ফুল । চারপাশে ছোট বড়ো নানা মাপের রঙবেরঙের প্রজাপতি পতপত করে উড়ছে ।
ওদিকে পশ্চিমদিক আদ্যন্ত মেঘে আর কুয়াশায় মাখামাখি । আলাদা করে আকাশ আর পাহাড় দেখাই যাচ্ছেনা । তবে চরের ওপারের গঙ্গার জলও পরিস্কার দেখা যাচ্ছে । সেই জলের রঙ আর আকাশের ঘোলাটে রঙ মিলেমিশে গেছে দূরের দিকচক্রবালে ।
আমরা ভুল পথে চলে এসেছিলাম । যাওয়ার কথা ছিলো দক্ষিণ-পশ্চিম কোণ বরাবর । আর চলে এসেছিলাম একেবারে অনেকটা পশ্চিমে । আবার বাইক ঘোরাতে হলো । এবার ঠিক হলো গঙ্গার পাড় ধরেই বাইক চালানো হবে ।
এদিকে আসার একটু আগেই একটা মাত্র ঘর লক্ষ্য করেছিলাম । এই বিশাল পরিধি জুড়ে মাত্র একখানা অস্থায়ী ঘর । অস্থায়ী বলার কারণ ঘরের দেওয়াল পাটকাঠি মাটি ঘাস আর অল্প কিছু পাতলা বাঁশের ফালি দিয়ে বানানো । ঘরে ভিতরে আর সামনের এক চিলতে মাটির মেঝের গোবর জলে নিকোনো । ঘরের সামনে বাঁশের ফালি দিয়ে বানানো বেঞ্চি । তার উপরে কুমড়ো আর শশার লতান গাছ উঠে একটা দারুণ ছায়া তৈরী করেছে ।
আমরা ঐ ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম । ঘরের সামনে একজন মাঝবয়সী জরাজীর্ণ বৃদ্ধা আর তার দুই ছেলে মেয়েকেও দেখতে পেলাম । ছেলেটা ঐ বাঁশের বেঞ্চের উপর বসে লেখাপড়া করছিলো । মেয়েটা একমনে শাক পাতা কাটছিলো সামনে বেঁধে রাখা গরু দুটোকে খেতে দেবে বলে ।
ওদের মা আমাদের দেখে সামনে এগিয়ে এলো । রাণা দেখলাম ওনাদের সাথে ওদের স্থানীয় দেশীয় ভাষায় কথা বলতে লাগলো । ভাষার ভিতর বাংলা হিন্দী মেশানো । মনে হচ্ছিলো যেন শব্দেরা একে অন্যকে ঠেলাঠেলি করে যুদ্ধ করতে লেগেছে । আমাকে বেঞ্চিতে বসতে দিলো ঐ বৃদ্ধা ।
কথা প্রসঙ্গে জানা গেলো ওর মেয়েটার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে । মেয়েটাকে দেখে বছর পনেরোর বেশী বলে মনেই হলোনা আমার । কথায় কথায় আরো জানা গেলো, যে ঐ মেয়ের হবু বর জন মজুরী খাটে এদিকে ওদিকে । তার উপর আবার একটা খুনের কেসে রায়প্রাপ্ত আসামী । সে নাকি এই মেয়েকে বিয়ে করবে বলে এই বৃদ্ধাকে শাসিয়ে গেছে । পাকা কথা নিয়ে গেছে । আরও হাজার পঁচিশেক নিয়ে গেছে বিয়ের প্রস্তুতির খরচা বাবদ । যৌতুকে সে নাকি আরও হাজার তিরিশেক টাকা আর একটা বাইকও চেয়েছে ।
আমরা শুনে অবাক হয়ে গেলাম । আমার তো মুখ রীতিমতন ঝুলে গেলো । এক খুনের সাজাপ্রাপ্ত পালিয়ে বেড়ানো আসামীর এত চাহিদা কেমন করে হয় এই বিয়ের বাজারে ! রাণা আমার পরিচয় করিয়ে দিলো ঐ বৃদ্ধার সাথে ।
আমি সাবধান করে দিলাম ওনাকে । বললাম মেয়ের গলায় পাথর বেঁধে পাশের গঙ্গার জলে ডুবিয়ে মেরে ফেলুন । কিন্তু মেয়েটিকে ঐ ইতরের সাথে বিয়ে দিয়ে ওর জীবনখানা এমন করে বরবাদ করে দেবেন না । বরং পারলে ওকে লেখাপড়া করান । সাহায্য করবার জন্যে সরকার আছে । ব্লকের অনেক রকমের হাজার খানা প্রকল্প আছে । সেখানে কিছু না কিছু একটা সংস্থান করে দেওয়া যাবে ।
(চলবে)
Comments