ভূতনীর চরে (এক)

চাকরীসূত্রে মালদায় আসার পর তিন তিনটে বছর কেমন করে যেন হু হু করে গড়িয়ে চলে গেলো । এখানে আসার পর থেকে একের পর এক ঘটে চলা ঘটনার ঘনঘটায় কিছু কিছু স্মৃতি এখনো কিন্তু টাটকা ফুলের মতোই ঝরঝরে সতেজ । ছোটখাটো কিছু কিছু অভিজ্ঞতা বন্ধুদের সাথে ভাগ করে নিয়েছি এর আগেই । এখনো এখানে থাকবো আরো কিছু দিন । জানিনা, আর কী কী ঘটনার সাক্ষী হতে হবে আমাকে আগামী কয়েকটা দিন ।

তবে এবার আমি সকলের সাথে যেই অভিজ্ঞতার ঝুলি ভাগ করে নিতে চলেছি, তা কিন্তু বেশ অভিনব । আমরা যারা শহর বা মফস্বলের মানুষ, তারা এমনটা বোধহয় স্বপ্নেও কখনো ভাবতে পারবো না ।

আচ্ছা, এমন কোনও জায়গা কি জানা আছে আপনার, বা দেখা আছে, যেখানে এখনো মানুষ ধুতি পড়ে, খালি গায়ে, খালি পায়ে মাটির পথে হেঁটে চলে ? সেখানে না আছে একটাও পাকা রাস্তা, না আছে সেই রাস্তার উপর বিদ্যুৎ সংযোগ । যেখানে সূর্যদেব শুয়ে পড়ার সাথে সাথে গোটা জনজীবনটাই প্রায় শুয়ে পড়ে, আর জেগে থাকে শুধু আকাশ ভরা চিকচিক করে জ্বলতে থাকা অগুনতি তারা । যেখানে সাইকেল, বাইক, ট্র্যাক্টর আর গোটা কয়েক ট্রেকার ছাড়া আর কোনও যোগাযোগের মাধ্যমই নেই । সমগ্র এলাকাটাই কিন্তু গঙ্গার উপর জেগে ওঠা একটা সুবিশাল চর, যার ভিতরে জাঁকিয়ে বসে আছে তিন তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েত ।

এখানে না আছে ভালো দোকানপাট, না আছে বাজারহাট । মানুষের এখানে মূল জীবিকা কৃষিকাজ । আর জমিহীনেরা এখানে হয় জনমজুর, নয়তো বিড়ি বাঁধা মহিলা আর শিশু শ্রমিক । আর আছে কিছু ট্র্যাক্টর ও ট্রেকার চালক । এছাড়া রয়েছে হাজার খানেক মাছমারা ছোটখাটো জেলে আর ভাগচাষীর দল । আর তেমন কিছুই নেই এখানে । বিনোদন আমোদ প্রমোদের কোনরকমের ব্যবস্থাও নেই এখানে । অথচ কিন্তু উন্নয়নের সুযোগ রয়েছে বিস্তর । এক কথায় বলা চলে "ভার্জিন ল্যান্ড" ভূতনীর চর ।

এ হেন ভূতনীর চরে আমি শতাধিক বার আসা যাওয়া করেছি । কখনো পাট্টা অ্যানালমেন্ট কেসের তদন্ত করতে, কখনো রুটিনমাফিক ওখানকার রেভিনিউ ইন্সপেক্টার এর অফিস পরিদর্শন করতে । কখনো গেছি বাংলা ইঁটভাটা পরিদর্শন করে জরিমানা সহ রয়্যালটি সংগ্রহ করতে ।

আর নিজের জমি দ্প্তরের কাজে প্রতিবারই আমি মোটামুটি চলাফেরা করা করা যায় গোছের ভদ্র সভ্য টাইপের গাড়ি নিয়েই ওখানে আসা যাওয়া করেছি এতদিন যাবৎ ।

তবে ব্যতিক্রম ছিলো শুধুমাত্র গত বিধানসভা নির্বাচনের সময়কাল । ঐ সময় আমি ওখানে ছিলাম সেক্টর ম্যাজিস্ট্রেট । সেখানে আমার জন্যে একটা ভাঙাচোরা, আধমরা, ছারপোকা ভর্তি সীটের ছিবড়ে ওঠা জীপ গোছের ট্রেকার দিয়েছিলো মানিকচকের বিডিও অফিস ।

রাজ্য সিভিল সার্ভিস ক্যাডারে ব্লক অফিসের জয়েন্ট বিডিও আর আমার পে-স্কেল যেখানে সমান সমান, সেখানে আমার অধিকারকে বঞ্চিত করে কেমন করে পদাধিকারে আমার থেকেও অনেক আতিপাতি ছোটখাটো গোছের ব্লকের স্টাফেরা বিডিও অফিসকে ম্যানেজ করে ভালো ভালো জাতের গাড়ি বাগিয়ে নিয়েছিলো, তা ভেবে আমি বেশ অবাকই হয়েছিলাম ।

বিডিও অফিসের এই রকমের নিন্দনীয় জঘন্য দ্বিচারিতামূলক মানসিকতার কারণে আমি বেশ ভালো রকমেরই আঘাত পেয়েছিলাম আমি মনে মনে ।

মে মাসের সেই প্রচন্ড দাবদাহ গরমে কেমন করে যে আমাকে সমস্ত বুথগুলোর তদারকি করে দেখতে হতো সুবিশাল এলাকা ঘুরে ঘুরে, ধূলো বালি আর ছারপোকার অসহ্য কামড় খেয়ে, গলা আর ঠোঁট শুকিয়ে, তা ভাবলে এখনো আমার মন প্রচন্ড রাগে চিড়বিড় করে ।

কিছু খচ্চর লোক আম জনগনের খরচে এবং তাদেরই দেওয়া ভোটে ক্ষমতা লাভ করে আবার সেই জনসাধারণকেই সুযোগ সুবিধামতো ঘাড় ভেঙে শোষণ করবে বলে এই সাংবিধানিক প্রহসন বছরের পর বছর ধরে হতে থাকবে ।

সে যাই হোক, আগামী দিনের ভাবী পর্যটকদের উদ্দেশ্যে বলি - মালদা শহর থেকে বত্রিশ কিলোমিটার দূরে মানিকচকের ব্লক অফিস । সেখান থেকে স্টেট হাইওয়ে ধরে আরও পাঁচ কিলোমিটার গেলে পড়বে মথুরাপুরের শঙ্করটোলা ঘাট । সেখান দিয়েই বয়ে চলেছে গঙ্গার একটা শাখানদী ফুলহার । আহা, কি অপরূপ রূপে রসময়ী আকর্ষণ তার । সূর্যাস্তের সোনা গলা জলের ঢেউয়ে মন ভেসে চলে বহুদূর অজানা পথের খোঁজে । সেই নদী পার হলে শুরু হয় ভূতনীর চর ।

দিনের বেলা বহু কাজে বহুবার ওখানে যেতে হলেও, একবারই সেখানে বাধ্যতামূলকভাবে রাত্রিযাপন করেছিলাম । আর সেটা ঐ বিধানসভা নির্বাচনের আগের দিন রাতে । সেবার রাত কাটিয়েছিলাম উত্তর চন্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের অফিসে । ইচ্ছা একটুও ছিলো না ঐ পরিবেশে রাত কাটানোর । কিন্তু উপায়ও ছিলো না তখন ।

এলাকার নেতা দাদা প্রধানেরা সকলেই কর্মসূত্রে আমার পূর্ব পরিচিত হলেও ইলেকশনের সময় প্রোটোকল জনিত কারণে তাদের আতিথ্য গ্রহণ করাও আমার পক্ষে সম্ভবপর ছিলো না একেবারেই ।

তবে এবারের ব্যাপারটা ছিলো একেবারেই অন্যরকম । লোকমুখে শুনলাম ভূতনীর উত্তর চন্ডীপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকায় একশো বছরেরও বেশী পুরানো আমলের একটি রাসের মেলা চলে টানা একটা মাস ধরে । আর সেই মেলায় যাওয়ার জন্যে অনেকের কাছ থেকেই অনেক অনুরোধ পেলাম ।

আমি ভেবে দেখলাম এমন কোট আনকোট আনএডিটেড আনকাট 'ভার্জিন' মাটির চরে ইঁটের দেওয়াল তোলা চারদেওয়ালের টালির চালের ঘরে রাত্রিযাপন করাটা আমাদের মত শহুরে মফস্বলী অহংকারীদের কাছে একটা বিরাট বড়ো অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার ব্যাপার ।

আর এমন বাড়িতে আমি এর আগেও রাত কাটিয়েছি উত্তর দিনাজপুড়ের করণদিঘী ব্লকের আদিবাসী সাঁওতাল পাড়ার নিকটবর্তী হাড়ভাঙা গ্রামে । সেই বারেও কিছু অভিনব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলাম । একটা গোটা সন্ধ্যা কাটিয়ে এসেছিলাম সুন্দর পরিপাটি করে সাজানো গোছানো ঝকঝকে তকতকে নিকোনো মাটির বাড়ির ভিতরে, খ্রীষ্টধর্মাবলম্বী আদিবাসী জোসেফ দাদার পরিবারের সাথে । ওদের পাশে ওদের সাথে বসে খেয়েছিলাম ভাত পচানো হান্ডি বা হাঁড়িয়া, যার আলোচনা অন্য কোনও একটা পরিসরে আবার করবো ।

যাই হোক, ভূতনীর চরের প্রত্যন্ত গভীর এলাকায় হাল্কা শীতের রাতে এমন শতাধিক বছরের পুরানো রাসের মেলার ভীড়ে সময় কাটানো আর কুয়াশা মাখা ভোরে উঠে জেলেদের সাথে মাছ ধরায় অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতায় ভরপুর হওয়ার চরম বাসনা জেগে উঠলো মনের ভিতর ।

যেমন ভাবা, তেমন কাজ । সটান ফোন লাগালাম অফিসের পাশেই নারায়ণপুরের এক ভাইকে । নাম আব্দুল । ওকে জানালাম আমার সাথে এমন করে আকস্মিক ভাবে চলার সঙ্গী হওয়ার জন্যে । এর আগেও আমরা দু'জনে একসাথে রায়গঞ্জে ঘুরে এসেছি । ঘুরে এসেছি দার্জিলিং । আর রাজমহলে তো গেছিই । এ সবের আগে আমার সাথে বিডিও অফিসের দেওয়া ঐ ভাঙাচোরা গাড়িতে চাপিয়ে ওকে ভূতনীর চরেও নিয়ে গেছি নির্বাচনের আগে এলাকা পরিদর্শনের সময় ।

বুধবার অফিসের কাজ সেরে সাড়ে পাঁচটার পরে আমরা দুইজনে বের হলাম । গন্তব্যস্থল থেকে বাইকে চেপে আমাকে নিতে এসেছিলো একজন । ঐ বাইকেই আরোহীসহ আমরা বাকী দুইজনে চেপে বসলাম ।

চালকের ডাক নাম রাণা । আমার পূর্ব-পরিচিত । ওর নিজের বাড়ি ধূলিয়ানে । আর ভূতনীতে ওর বোনের শ্বশুরবাড়ি । হতভাগী বোনটি বিগত বারো বছর ধরে তিন ছেলে মেয়ে আর অসুস্থ্য বৃদ্ধ শ্বশুরমশাইকে নিয়ে চরম দারিদ্র্যের সাথে লড়াই করে বৈধব্যজীবন যাপন করছে ভূতনীর শ্বশুর বাড়ির ভিটে মাটিতে ।

ধূলিয়ান থেকে ইলিশ তুলে ফারাক্কা রেল স্টেশনে এসে রাতের গৌড় এক্সপ্রেসের কামরায় এক ব্যাগ মাছ দিয়ে গিয়েছিলো আমাকে এই বাইক চালক শ্রীমান রাণা । আজকেও ওকে দেখলাম বেশ সহজ অথচ সতর্ক ভাবেই বাইক চালাচ্ছে । আর মাঝে মাঝেই টুকটাক এটা সেটা রকমারী গল্পও চলছে ।

মানিকচক থেকে মথুরাপুরের মাঝামাঝি পথে একটা পেট্রল পাম্প থেকে বাইকে তেল ভরে নিয়ে আবার রওনা দিলাম আমরা তিনজন । সোজা চলে এলাম মথুরাপুর এর শঙ্করটোলা ঘাটের মুখে ।

এখানে ভটভটি বা ভুটভুটি মোটর চালিত নৌকোগুলো জোড়ায় জোড়ায় বাঁধা থাকে । আর ওদের উপরে বিছানো থাকে বিশালকায় বাঁশের মজবুত মাদুর । ফেরীঘাট কিন্তু মোটেই বাঁধানো নয় । অর্থাৎ ভাঙনের মুখে মুহূর্তের ভিতর সবকিছু খসে নদীগর্ভে চলে যেতে পারে যে কোন সময় ।

ঐ কাঁচামাটির ফেরীঘাটের ডাঙা অংশ আর নৌকার সাথে সংযোগ রক্ষা করে বিশাল বিশাল কাঠনির্মিত মোটা আর মজবুত ভারী একজোড়া চওড়া পাটাতন । সেই পাটাতনের ভরসায় নৌকোতে উঠে পড়ে সাইকেল, বাইক, আর প্রায় যে কোন চার চাকার গাড়ি, এমনকি মাটি বালি পাথর বয়ে নিয়ে চলা বিশাল চাকার পাওয়ার টিলার ট্র্যাক্টর এমনকি ছোটখাটো চেহারার লরিও ।

আমরাও ভুটভুটিতে চেপে গেলাম । এখানে বয়স্ক কেউ কেউ শুকনো কাদামাখা বাঁশের মাদুরের উপর একটা ধার দেখে বসে পড়তে চান । মালদার মূল ভূখন্ড থেকে ভূতনীর চরে আসার এক এবং একমাত্র সংযোগস্থল হলো এই সব মেশিনচালিত নৌকো ।

আমরা যখন পূর্বদিকের শঙ্করটোলা ঘাটের পাড়ে নৌকায় চাপার অপেক্ষায় ছিলাম, তখন পশ্চিমের সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে ঝাড়খন্ডের ধার ঘেঁষে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে থাকা আধোঘুম ক্লান্ত পাহাড়ের মাথা আর হেলে থাকা একরোখা ঘাড়ের উপর ।

হাল্কা হাল্কা মৃদুমন্দ বাতাস বয়ে চলেছে চারপাশ জুড়ে । ফুলহার নদীর জলে খেলছে ঢেউ । আর ঢেউএর তালে তালে নাচতে নাচতে ভেসে চলেছে শ্যাওলার দল, প্লাস্টিক এবং আর কত রকমের এদিক সেদিক ছুঁড়ে ফেলা আবর্জনা সামগ্রী ।

আর লাল টকটকে সূর্যের গলে পড়া আলোর ফোঁটা মিশে যাচ্ছে ফুলহারের ঢেউ ওঠা জলের খোলা পিঠ জুড়ে । মনে হচ্ছে যেন পুরো নদীটা জুড়েই বয়ে চলেছে সোনার জলধারা । মা গঙ্গার অযোনিসম্ভূতা এক অসামান্যা রূপবতী নারী তার শরীরি বিভঙ্গে আপন তালে আপনিই মাতোয়ারা । কাউকে কেয়ার নয়, কারো পরোয়া নয় । ইচ্ছে মতন সে পাড় ভাঙছে, চর জাগিয়ে তুলছে । ভূমিরূপের সৃষ্টি স্থিতি লয় নিয়েই তার এই ছেলেখেলা চলছে সেই কত বছর ধরে, কত পুরুষ ধরে । কতজন তার আগ্রাসনে হয়েছে নিঃস্ব, সর্বস্বান্ত । আবার কত শত প্রাণকে সে তার আপন বুকে সযত্নে ধারণ করে আছে ।

আস্তে আস্তে আলো আরও কমে এলো । আমরা এপাড়ে চলে এলাম । ভূতনীর চরে । আমাদের ভাসমান বাহনটা এসে ক্যাঁচকুচ শব্দ করে ধাক্কা খেয়ে ঘষটে গেলো নদীর ভাঙা পাড় সংলগ্ন নোঙর গেঁথে আটকে রাখা নৌকোর পেটে । সবাই আমরা কম বেশী একবার দুলে উঠলাম । হুড়মুড় করে নামতে লাগলো সকলে পালে পালে । আমরাও ভীড় কম দেখে নেমে পড়লাম ।

এখানকার ভাঙা মাটির পাড় থেকে আরও দেড় কিলোমিটার উপরে চড়ে রিং বাঁধের উপর উঠবো আমরা । এই সমগ্র ভূতনীর চরকে গঙ্গার প্লাবন আর ধ্বংস থেকে বাঁচানোর লক্ষ্যে লালমাটির মোরাম আর পাথর ফেলে গড়ে তোলা হয়েছে সুবিশাল রিং বাঁধ । এই বাঁধটা কিন্তু কংক্রীটের ঢালাই করা নয় । রোদে জলে বৃষ্টিতে ধুয়ে মুছে এই বাঁধটাও বেশ ক্ষয়িষ্ণু । তার উপর রয়েছে ট্রাক্টর চলার অসহ্য উৎপাত । গোটা বাঁধের উপর দিয়ে দিনভর চলছে ঐ ভারী চাকার পাওয়ার টিলার । ফলে জায়গায় জায়গায় তৈরী হয়ে গেছে বিরাট বিরাট খাবলা খাবলা এবড়ো খেবড়ো বিভীষিকাময় গর্ত ।

রাতের অন্ধকারে বাইকে চেপে তিনজন যে কেমন করে ঐ পথ ধরে যাব, সেটাই ভাবছিলাম । রাণা বাইকে স্টার্ট দিলো । আমি মাঝখানে আর আব্দুল আমার পিছনে । বাইকের আলো জ্বলে উঠলো । চারপাশ জুড়ে গাঢ় ঘন নিকষ কালো গভীর অন্ধকার আস্তে আস্তে সরে যাচ্ছিলো । চরের উপর বালি আর পলিমাটি মিলে মিশে একাকার । আমাদের আগে নামা ট্র্যাক্টর আর বাইক গুলো কিছু হাত সামনে এগিয়ে ছিলো । আমরা আরও একটু পরে যাওয়া স্থির করলাম । কারণ সামনের গাড়ি গুলোর পিছন পিছন গেলেই টন টন পলিমাটির পাউডার উড়বে চারপাশ জুড়ে । মনে হবে যেন ধূলোর ঝড় ।

আসলে এই গোটা চরটাই এমন । একটা গাড়ি চলে গেলেই ওর চারপাশ জুড়ে মিনিট খানেক ধূলোয় আচ্ছন্ন হয়ে থাকে । আর সেই ধূলো ঠিক যেন পাউডার । সারা দেহের লোমকূপে আর মাথার চুলের গোড়ায় চিপকে বসে যায় । গা হাত পা মাথা চুলকায় । নাকে মুখে ধূলোর পাউডার ভরে যায় । চুলের উপর সাদা ধূলোর আস্তরণ জমে যায় । এই কারণে আমি ভূতনী থেকে ফেরার পথে প্রতিবার স্নান করি ।

এখান থেকে বাঁধের রাস্তা পর্যন্ত দেড় কিমি এই পথ কয়েক মানুষ জলে ডুবে থাকে বর্ষার সময় । গোটা এলাকা বানভাসি হয়ে থাকে । শুধুমাত্র ঐ রিং বাঁধের কল্যানে বেঁচে যায় ভূতনীর গরীব মানুষ । আর বর্ষার শেষে নদীর জল নেমে গেলে আবার এই পায়ে চলা গাড়ির চাকায় ক্লিষ্ট পথ নিজের থেকেই তৈরী হয়ে যায় । জমাট বেঁধে থাকা পলিমাটি বালির পলেস্তারা ভাঙতে ভাঙতে, চাকা আর পায়ের চাপে পিষতে পিষতে শেষমেষ ধূলোর পাউডারে পরিণত হয় ।

আমি এই ভয়ানক ধূলোর থেকে অনেক প্রোটেকশন নিয়েও কোনওবার রক্ষা পাইনি । জানি, এবারও পাওয়ার কোন সম্ভাবনাই নেই । তবুও উইন্ডচিটার জ্যাকেট, চশমা সহ নাকের উপর রুমাল আর মাথায় টুপি চড়ালাম । যতটা বাঁচা যায় আর কী ! গরমকাল হলে তো পরোয়াই ছিলো না । ঘরে ঢুকে সব জামাপ্যান্ট ঝেড়ে ধূলো ফেলে দিতাম । আর স্নান সেরে ঝরঝরে হয়ে যেতাম । এখন সেটা সম্ভব নয় । আসার পথে বেশ খানিকটা শীত শীত ভাব লাগছিলো ।

আমাদের বাইক সবার শেষে শেষে ধীর গতিতে চলতে শুরু করলো । ভাঙতে লাগলো পলি জমাট বেঁধে তৈরী হওয়া চড়াই উৎরাই । বন্ধুর এবড়ো খেবড়ো পায়ে চলা পথে ট্রাক্টরের দৌলতে তৈরী হওয়া বিশালকায় গাড্ডাগুলো একে একে পার হয়ে তিনজন মিলে একটা বাইকে চেপে বিভীষিকাময় রিং বাঁধের দিকে এগিয়ে চললাম । খালি ভয় করছিলো - এই বুঝি অন্ধকারে কিছু একটা হয়ে গেলো ।

এতকাল দিনের বেলা করে অফিসের কাজের প্রয়োজনে এখানে এসেছি । আর ফিরে গেছি বিকেলের আগে আগেই । এলাকা গুলোর বেশ বদনাম । রাস্তাগুলোও খুব ভয়াবহ । যখন তখন একটা দুর্ঘটনা ঘটে যেতেই পারে ।

গত বিধানসভা নির্বাচনের সময় এখানে একজন নির্মান সহায়কের বুলেরো গাড়ি পুরো উল্টে ডিগবাজি খেয়ে গিয়েছিলো রিংবাঁধের রাস্তার উপর । সোজা পাল্টি খেতে খেতে গড়িয়ে গিয়ে পড়েছিলো একটু দূরের কলাই এর ক্ষেতের ভিতর । ড্রাইভার আর সেক্টর ম্যাজিস্ট্রেটের অবস্থা বেশ গুরুতর হয়ে গেছিলো ।

আর এই এলাকা এতটাই অনুন্নত, যে ভালো ডাক্তার বা ওষুধের দোকান, কোনটাই একেবারে নিকটবর্তী নয় । সবটাই ফুলহার নদী অতিক্রম করে মথুরাপুর বা মানিকচক ব্লক অফিস অঞ্চলের দিকে । আর রাজমহল থেকে আসা অবাঙালী হিন্দিভাষী খোট্টা খুনী ডাকাতদের কথা তো না হয় বাদই দিলাম ।

আমাদের তিনজনের মিলিত ওজনে আর পথের গাড্ডায় ধূলোর পাউডারে নিমজ্জিত বাইকের চাকা টালমাটাল হয়ে গড়গড়িয়ে চলতে লাগলো । চারপাশ জুড়ে সবকিছু ব্ল্যাক্ আউট । অন্ধকারের আস্তরণ ছিঁড়ে রাণার বাইক চলতে লাগলো । প্রায় মিনিট দশেক এভাবে চলার পরে আমরা রিং বাঁধের মাথায় চড়লাম ।

এবার আমাদের বাইক বাঁধের উপর দিয়ে ঐ ভাঙাচোরা মোরামের কাঁকর ওঠা ট্রাক্টর চলা রাস্তা দিয়ে গতি সামান্য বাড়িয়ে দিয়ে চলতে লাগলো । এই সব পথ দিয়ে আর নীচ দিয়ে চলে যাওয়া মাটির রাস্তা দিয়ে ট্রাক্টরের পাশাপাশি মোষের টানা গাড়িও অনেক চলাফেরা করে । ফলে বাঁধের উপর মোরাম ফেলে বানানো রাস্তার হাল একেবারেই জঘন্য গোছের ।

প্রশাসন এই সব এলাকায় খুব একটা নজর কখনোই দেয়নি । স্বাধীনতার পর থেকে নেতা মন্ত্রীরাও এখানকার আধপেটা আধামরা লোকেদের নিয়ে কখনো কিছু ভাবেনি । না বানিয়েছে ভালো রাস্তাঘাট । না দিয়েছে বৈদ্যুতিক বাতি ।

হাতে গোনা কয়েকটা প্রাইমারি বিদ্যালয় আছে এখানে তিনটে গ্রাম পঞ্চায়েত জুড়ে । আর আছে উত্তর চন্ডীপুর উচ্চ বিদ্যালয় । স্বাস্থ্য ব্যবস্থার হাল অত্যন্ত বেহাল । রাতবিরেতে কিছু একটা হলে তাকে ঘরের বিছানায় ফেলে কষ্ট পেয়ে মরতে দেখা ছাড়া আর কোন উপায় জানা নেই এলাকার অর্ধশিক্ষিত অশিক্ষিত কুসংস্কারাচ্ছন্ন মানুষদের । এরা আমাদের মতন মূল স্রোতের সবকিছু পাওয়া শহুরে সাজুগুজুদের থেকে এখনো কমপক্ষে একশ' বছর পিছিয়ে ।

বাঁধের উপর দিয়ে চলমান বাইকের উপর বসে থাকাটা খুব কষ্টসাপেক্ষ বলে মনে হচ্ছিলো আমার । ভীষণ রকম ভাবে কোমর আর নীচের অংশ ধরে গিয়েছিলো । বরাবরই আমার জিনসের প্যান্ট পড়ে থাকা আর চলাফেরা করবার অভ্যাস । আজ অবদি কখনো ফরম্যাল্ পোষাকে আমি অফিস বা মিটিং করিনি । এমনকি জেলার হর্তা কর্তা বিধাতা জেলাশাসকের ডাকা মিটিং এও নয় ।

এ হেন টাইট জিন্সের প্যান্ট আর অন্তর্বাসের চাপে পড়ে যাওয়া আমার অন্ডকোষ আর পায়ের কুঁচকিতে যেন ঝিঁঝিপোকা ভর করে বসলো । দুইদিক থেকে লাগা চাপে আর প্রবল ঝাঁকুনিতে প্রাণ ওষ্ঠাগত হয়ে গেল তাদের । অবশেষে একটা আধমরা আধো আলো অন্ধকার মাখা শুকদেবটোলা বাজারের উপর এসে থামলো আমাদের সবেধন নীলমনি বাইকখানা ।

নেমেই প্রথমে কোমরখানা বার কয়েক টুইস্ট ড্যান্স করালাম । তারপর একটু ওঠবোস । পাশ দিয়ে ঘড়ঘড় শব্দ করে একটা ট্র্যাক্টর চলে গেল একরাশ লালরঙা ধূলো উড়িয়ে । আমরা বাঁধের ধারের ঢাল বেয়ে খুব সন্তর্পণে পা টিপে টিপে নীচের প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়া হাটের কাছে উপস্থিত হলাম ।

এলাকা প্রায় ফাঁকা । মোবাইলে এখন সবেমাত্র পৌনে সাতটা বাজে । এর মধ্যেই প্রায় সবকিছু বন্ধ । অথচ এই সময় মথুরাপুর বা মানিকচকেও সব দোকানপাট বাজার হাট খোলা । আর জমজমাট মালদা শহরের কথা না হয় বাদই দিলাম । সেখানে এখনো শিশু উদ্যান পার্ক খোলা । আর মহানন্দার উপর বসানো সোলার ল্যাম্পবাতির কোলে জোড়ায় জোড়ায় চুপচাপ বসে প্রেম করে চলেছে স্কুল কলেজের পড়ুয়ারা । বড়ো আর অতি বয়স্করাও থেমে নেই । তারাও এইসময় নদীর পাড়ে বেঞ্চে বসে আড্ডা দিচ্ছেন বা সান্ধ্যভ্রমণে বের হয়েছেন অনেকেই ।

আমরা একজন তেলেভাজা ওয়ালার কাছে গেলাম । বিনা তেলে ভেজা ছোলা নুন কাঁচালঙ্কা আর পেঁয়াজ সহ লোকাল চালের মুড়ি খেলাম । এই চালের মুড়ির স্বাদ একবার খেলেই জিভে লেগে যাবে । মোটা কড়কড়ে নোনতা ইউরিয়ামুক্ত অসাধারণ মুড়ি । সাথে দুটো করে প্রায় ঠান্ডা পেঁয়াজিও খেয়ে ফেললাম খিদের চোটে । অফিসে কাজের ফাঁকে দুপুরে রোজ আড়াইশো গ্রাম টকদই, একটা শাঁসওয়ালা ডাব আর একটা টাটকা মিষ্টি খাওয়ার অভ্যেস আমার । মাঝে মাঝে অন্যান্য ফলও খাই । তাও সেটা খেয়েছিলাম আড়াইটে নাগাদ । তারপর থেকে এতক্ষণ অবধি আর কিছু মুখে ওঠেনি । আর যে পরিমাণ ঝাঁকানির চোটে নাকানি চোবানি খেয়ে লাফাতে লাফাতে এতদূর চলে এলাম, তাতে খিদে না পাওয়াটাই খুব অস্বাভাবিক ।

প্রাথমিক টিফিন সেরে আমরা আবার বাইকে চড়ে বসলাম । রাস্তা ক্রমশঃ খারাপ থেকে খারাপতর হতে লাগলো । এখানকার মানুষজন যে কেমনতর কে জানে ! এত অভাব, এত রকমের দীর্ঘকালীন নাগরিক সুবিধা না পাওয়াগত সমস্যা নিয়ে এদের কারও কোনও মাথাব্যাথাই নেই । সবাই যেন এতেই খুব সুখী এবং সন্তুষ্ট । কোথাও যেন কারো কোনও অভিযোগ নেই ।

সত্যিই তো ! যদি অভিযোগের উপর অভিযোগের বারুদ জমে উঠতো সত্তর বছর ধরে, তবে কি রাজনৈতিক দলগুলো চুপ করে হাত গুটিয়ে বসে থাকতে পারতো । না কংগ্রেস, না বামফ্রন্ট - কেউ কিচ্ছুটি এখানে করেনি এতকাল ধরে । আর মিডিয়া গোষ্ঠীও এই সব প্রান্তিক এলাকায় আসেনা । তাদেরও কোনও মাথাব্যথা নেই । অথচ কলকাতা শহরের কোথাও একটু বৃষ্টি হয়ে জল দাঁড়িয়ে পড়লেই তাদের হৈ চৈ চিল চিৎকার শুরু । সত্যিই আজব এই ভারতবর্ষ । তেলা মাথায় তেল দিয়েই দেশটা দিব্যি চলে যাচ্ছে ।

শুকদেবটোলার হাট ছেড়ে আরো মিনিট কুড়ি চলার পর বাইকটা বাঁধের বাইরের দিকের ঢালু পথ বেয়ে ধীরগতিতে নামতে শুরু করলো । রাস্তার অবস্থা বেদম খারাপ এবং জায়গায় জায়গায় প্রায় ভেঙে পড়া অবস্থায় হাফ ঝুলন্ত ।

এই সব রুটে যদি ছোট চাকার গাড়ি আসতো, তবে তা আর ফেরীঘাট অতিক্রম করে রিং বাঁধের উপর বানানো মোরামের পথ অবদি টেনে আসতেই পারতো না । একবার আমিই চরম ফাঁসা ফেঁসে গিয়েছিলাম বছর দেড়েক আগে ।

সেই বার আমার সাথে ছিলো দপ্তর থেকে পাওয়া একটা সাদা অ্যাম্বাস্যাডার গাড়ি । এখানে একটু বলে রাখি, আমাদের ব্লকের ভূমি রাজস্ব দপ্তরের অফিসটি বিগত দুই বছর ধরে বছরের শেষ তিন মাস বা নব্বই দিনের জন্যে গাড়ি পাচ্ছে । উদ্দেশ্য রাজস্ব আদায়ের জন্যে গাড়ির মাথায় মাইক বেঁধে জনমানসে প্রচার ও সচেতনতা বৃদ্ধি । পাশাপাশি বেআইনীভাবে মাটি কেটে ব্যবসা করা বাংলা ইঁটভাঁটার মালিক এবং সড়কপথে চলা মাটি বালি ও পাথর বহনকারী গাড়িকে আটক করে বা আচমকা ধড়পাকড় করে বিনা অনুমতিতে বালি পাথর মাটি বহন করবার জন্যে উপযুক্ত জরিমানা বাবদ রয়্যালটি আদায় করা ।

আমাদের পাওয়া ঐ অ্যাম্বাস্যাডর গাড়িটা বেশ মজবুত হলেও তার পিছনের চাকা দুটো চরের ভিতরে প্রাকৃতিক নিয়মে তৈরী হওয়া পাউডার টাইপের ধূলো মাটির ভিতরে ফেঁসে বসে গিয়েছিল । চাকাগুলোর চারভাগের তিনভাগ ধূলোর পাউডারে ঢেকে ছিলো । অভিজ্ঞ ড্রাইভার অনেক চেষ্টা চরিত্র করেও ঐ গাড়ির চাকা তুলতে পারলো না ।

শেষ পর্যন্ত আমরা সকলেই নেমে পড়ে হাত লাগালাম । জোর কদমে ঠেলাঠিলি করে ঐ শীতের বিকেলেও ঘর্মাক্ত কলেবর হলাম । তবুও ঐ অ্যাম্বাস্যাডরটিকে সামনের দিকে এক ইঞ্চিও ওঠানো গেলো না । অবশেষে জনা দশেক জন মজুরকে পেলাম ।

ওরা মাঠ থেকে হাঁটাপথে বাড়ি ফিরছিল । আমাদের মত শহুরে বাবু আর সাহেবদের দেখে না জানি কেন ওদের মনে ঈষৎ দয়ার উদ্রেক হলো । তারপর একটু দূরের বাঁশঝাড় থেকে বাঁশ কেটে আনলো ওদের ভিতর থেকে জনা দুই লোক । অনেক চাড় দিয়ে, প্রচুর ঠেলা আর গুঁতো মেরে ঘন্টাখানেক কাটিয়ে অবশেষে উদ্ধার করা গেলো ঐ চাকা দুটি'কে ।

ঐ দিনের বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে পর্যন্ত আটক হয়ে থাকার সেই তিক্ত অভিজ্ঞতার শিক্ষাটা মগজে গেঁথে ছিলো আমার এতদিন । আজ তা সময় সুযোগ করে বের হয়ে এলো ।

আমরা যেই দিকের ঢালে নামলাম, সেই দিকটা হলো নদী অভিমুখী । অর্থাৎ বন্যা হলে এই সব এলাকা গুলো সম্পূর্ণভাবে বানভাসি হয়ে যায় । শুধু দুই এক টুকরো জমি এখানে সেখানে ইতস্ততঃ ভাবে মুখ উঁচিয়ে জেগে থাকে ।

আমাদের গন্তব্যস্থলও ছিলো ঐ রকমেরই একটা আপাতঃ উঁচু জায়গা । যেখানে রাসের মেলা চলছে, তার থেকে বাইকপথে মিনিট পনের দূরে অবস্থিত লুটিহারা প্রাথমিক বিদ্যালয় অঞ্চল সংলগ্ন গ্রাম অঞ্চল ।

সত্যি কথা বলতে এই সব এলাকার প্রায় সবটুকুই পায়ে পায়ে চলে তৈরী । আর এর উপর দিয়ে চলা মোষ আর ট্রাক্টর টানা গাড়ির চাকা গিয়ে পথের সৌন্দর্য্যকে আগাপাশতলা ধর্ষণ করেছে বছরের পর বছর । এ নিয়ে কারো কোন আপত্তি বা অনুযোগও নেই । সবাই সবকিছু শান্তভাবে নীরব ভবিতব্য বলে মেনে নিয়েছে ।

এই পথে যেতে যেতে রীতিমতন ভয় করছিলো আমার । আব্দুল বা রাণার মনের কথা বলতে পারবো না বটে, তবে আমার কিন্তু বেশ আতঙ্ক হচ্ছিলো । আর সেটা হওয়াই খুব স্বাভাবিক ছিলো আমার মত শহুরে মানুষের পক্ষে ।

এ নিয়ে হাসাহাসি বা ব্যঙ্গ বিদ্রূপের কোন কারণ আমি দেখিনা । যদি আমার মত শহরে বড়ো হয়ে ওঠা কেউ এই পথে আসেন আগামী দিনে, তখন তিনি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে মনে মনে প্রশ্ন ছুঁড়ে দেখতে পারেন, কেমন লেগেছিলো তাঁর নিজস্ব অনুভূতি ।

আরও মিনিট পনের একইভাবে লাফিয়ে লাফিয়ে চললো আমাদের বাইকখানা । আর মাঝে মাঝেই নামতে হলো আমাদেরকে বাইক থেকে । রাস্তার অবস্থা সেখানে এতটাই খারাপ, যে সেখানে একজনের বেশী অতিরিক্ত কাউকে বহন করাই অসম্ভব ব্যাপার ।

আরও খানিকটা চলার পরে একটা এমন সরু মাটির পথ এলো, যার দুই পাশেই কচুরিপানায় ভরাপুর ডোবা আর খানাখন্দ । এদিকে ওদিকে অন্ধকার চিরে কখনো ভেসে আসছে ঝিঁঝিপোকার ডাক । কখনো ব্যাঙেরা দলবেঁধে মকমক করছে । কখনো 'ম্যা ম্যা' করে পাশের বাড়ির উঠোন থেকে ডেকে উঠছে ছাগলছানা ।

চালক রাণা এরপর নিজেই বাইক থেকে নেমে ঐ সংকীর্ণ পথ ধরে ধীর সন্তর্পণে পা চালালো । ঐখানকার মাটি এমন পিচ্ছিল আর নরম, যে সামান্য অতিরিক্ত চাপ পড়লেই ঐ মাটি খসে কচুরিপানা ভরা ডোবায় চালকসহ বাইক গড়িয়ে নেমে যাবে ।

আমরা তিনজনেই পায়ে হেঁটে ডোবা পার হলাম । তারপর আরো একবার আমাদের দুই জনকেই নামতে হয়েছিলো । সেখানে আসলে কোন রাস্তাই ছিলো না চলার । আর যেটা ছিলো, তা হলো পাশাপাশি প্রায় একে অন্যের গায়ে গায়ে লাগানো দুই ভাইয়ের বাড়ির মাঝখান দিয়ে একখানা অতীব সরু পায়ে চলা পথ । সাইকেল আর বাইক ছাড়া আর কিছুই গলতে পারবে না ঐ ফাঁক দিয়ে ।

এখানে রাণা একাই বাইক চালিয়ে ঐ সরু ফাঁকা অংশ দিয়ে গলে গেলো । আমি আর আব্দুলও হেঁটে চললাম পিছনে । সবার নজর পায়ে চলা পথের দিকে । সাপখোপের ভয়ও ছিলো । পেছনের বাঁশবন থেকে বিচ্ছিন্ন ভাবে শিয়ালের ডাক ভেসে ভেসে আসছিলো । আর পাড়ার কুকুরগুলোও বিচ্ছিরি ভাবে চিৎকার করছিলো ।

আমার খালি মনে হতে লাগলো যদি গলিটার উল্টোপথ ধরে কেউ সাইকেল বা বাইক চালিয়ে এখানে এইপথে আচমকা চলে আসে, তখন আমরা কি করবো ? তখন হয় আমাদেরকে পিছনের দিকে ব্যাকফুটে হটতে হবে নয়তো বিপরীত দিক থেকে পরে আসা সাইকেল বা বাইক আরোহীকে খানিকটা পথ ফেরৎ চলে যেতে হবে । এই ভাবে পাশাপাশি কোন সাইকেল বা বাইক চলা এখানে অসম্ভব ব্যাপার ।

যাই হোক, শেষ পর্যন্ত আমরা সাড়ে সাতটার ভিতরে রাণার বোনের শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে গেলাম । ওনাদের সামগ্রিক ভাবে দেখে একবারের জন্যেও খুব একটা অবস্থাপন্ন বলে মনে হলো না । অথচ একটা সময়ে নাকি ওর বোনের শ্বশুরমশাইদের দুই'শো বিঘার উপরে সম্পত্তি ছিলো । যার ভিতর অনেকটাই সরকার বাহাদুর ভেস্টিং করে খাস সম্পত্তি হিসেবে পাট্টা বিলি করে দিয়েছে । আর বাদ বাকি সম্পত্তির নব্বই শতাংশই এখন নদীগর্ভে । কোথাও বা সিকস্তি, কোথাও বা পয়োস্তি হয়ে রয়েছে ।

শ্বশুর মশাইয়ের বুকে পেসমেকার বসানো । কিছুদিন আগেই বেঙ্গালুরু থেকে ডাক্তার দেখিয়ে উনি মোটামুটি ভালোভাবে ফিরে এসেছেন । রাণার বোনের স্বামী ভাদ্রের প্রচন্ড গরমে মাঠের কাজ সেরে বাড়ি ফেরার পথে সান স্ট্রোকে মারা যান বারো বছর আগে দুই মেয়ে আর এক ছেলেকে ফেলে রেখে । তখন ছেলেটাই সব চাইতে ছোট ছিলো, মাত্র আট মাস ।

বোনের শ্বাশুড়ি ঠাকরুণও তার পরে পরেই চলে যান ছেলে হারানোর শোক বুকে জমিয়ে । শ্বশুর মশাইয়েরও বুকে ব্যথা শুরু হয় একাকীত্ব আর টেনশনে টেনশনে । একবার একটা মাইনর হার্ট অ্যাটাকও হয়ে যায় ওনার । তারপর নিরুপায় হয়ে ডাক্তারী পরামর্শে বুকে পেসমেকার বসাতে বাধ্য হন তিনি অবশিষ্ট জমি জমা থেকে কিছু জমি বন্ধক রেখে অনেকগুলো টাকা খরচ করে ।

এখন তাদের জমি জমাও খুব সামান্যই পড়ে আছে । ওর থেকেই বর্গা বা ভাগচাষ বাবদ যা ভাগ আসে সারা বছরে টুক টাক । আর কোনও রোজগারের পথ জানা নেই ওদের কাছে । এই দিকের গ্রামগুলোতে কোনও বাড়িতেই কাজের লোক রাখার প্রচলন নেই । এটা শহর হলে তবুও কিছু টুকটাক কাজকর্ম হয়তো জুটেই যেত ওদের ।

আর রাণাও টুকটাক বোনকে একটু আধটু সাহায্য করে সুযোগ সুবিধা মতো । বড় মেয়েটা রাণাদের বাড়িতেই ধূলিয়ানে থেকে কলেজে লেখাপড়া করছে । আর তারপরের মেয়েটা এখান থেকেই মাধ্যমিক দিলো এই বছরে । আর ছোট ছেলেটাও এখানে থেকেই লোকাল ইস্কুলে লেখাপড়া করছে ।

নিদারুণ অভাবী পরিবার এরা । অথচ এনারা অতিথিপরায়ণতায় কতখানি আন্তরিক । দেখলেই মন ভরে যায় । এক কালের দোর্দন্ডপ্রতাপ জমিদার কালের বিচারে এখন ভূমিহীন সর্বহারা ।

আমরা ওদের পড়ে থাকা অতিরিক্ত একটা দুই ঘর বিশিষ্ট বাড়ির একটা ঘরে সেই রাতের জন্যে ঠাঁই পেলাম । রাতের বেলা চারপাশের অন্ধকারেও বোঝা গেল অসংখ্য গাছ গাছালি দিয়ে এলাকাটা পুরোপুরি বেষ্টিত । আম, কাঁঠাল, সজনে, বাতাবী, বাঁশ ও আরও হরেক রকমের গাছে গাছে চারপাশ ঢাকা । সামান্য একটু দূর থেকেই আবার শিয়ালের ডাক ভেসে এলো । আমার কিন্তু বেশ অন্যরকমের একটা অনুভূতি হচ্ছিলো তখন ।

ঘরের ভেতরের দেওয়ালে শুধু ইঁটের গাঁথুনি । মাথার উপর বাঁশের জালে টালির চাল পাতা । ঘরে জানলা বলে কিছু নেই । আছে ইঁটের জাল কাটা ঘুলঘুলি । তার পাশে পেরেক ঠুকে চটের বস্তা ঝোলানো ।

এখানে শহরের মত ঘর সংলগ্ন অ্যাটাচ্ বাথরুমের ব্যাপার নেই । ঘর থেকে কুড়ি ফুট দূরে আলাদা করে পাকা টয়লেট বানানো । সেখানে অবশ্য আমাদের শহর বা মফস্বলের মত সরাসরি কলের জলের ব্যবস্থা নেই । টয়লেট ল্যাট্রিন করবার আগে হ্যান্ডপাম্প এর হাতল চেপে জল তুলে বালতি আর গারু জলে ভর্তি করে সাথে নিয়ে গিয়ে বসতে হয় ।

চারপাশের নিঝুম অন্ধকার উপেক্ষা করে আমি বাথরুম চেপে উসখুস উসখুস করছিলাম । রাণা জানতে চাইলে আমি ওকে বিস্তারিত বলতেই ও মোবাইল টর্চ জ্বালালো । আমি ওর মোবাইল টর্চ নিয়ে ওদের টয়লেটে গেলাম । সাপখোপের ভয় একটু আধটু করছিলো ।

বাথরুম সেরে ঘরে এসেই দেখি টিফিন হাজির । বিস্কুট, চানাচুর, খেজুর, আপেল আর আদা-লেবু চা । সমস্ত আয়োজনই রাণার করা । ধুলিয়ান থেকে বাইক চালিয়ে ভূতনী এসেছে । ওর এক ভাই আরো একটা বাইকে নিয়ে এসেছে ওর মা কে । সবাই মিলে মিশে বেশ আনন্দমুখর হয়ে উঠলাম আমরা ।

ঠিক হলো রাতের খাওয়া সেরেই আমরা রাসের মেলায় যাবো । রাতের খাওয়ার আগে আমরা বসে গল্প জুড়ে দিলাম । রাণার আরো এক সম্বন্ধী ভাই আনারুল হক এসেছিলো মুম্বাই থেকে । ওখানে ওর ফল পরিবহনের ব্যবসা । ওর প্যাকিং করা ফল আরবের দেশগুলোতেও যায় । ওর একটাই শখ - বারে নর্তকীর সাথে সুরাপানে সময় কাটানো । যা রোজগার করে, তার অধিকাংশই চলে যায় ওর নর্তকী বান্ধবীদের পিছনে । ওর দুটো বাড়ি এখানে । একটায় মা বাবা ভাইয়েরা থাকে । আর একটায় বউ সহ তিন ছেলে মেয়ে । মুম্বাইতেও জমি জমা কিনে রেখেছে । রেস্টুরেন্ট বার কাম হোটেল তৈরী করবার বাসনায় ।

আমাদের গল্প করতে করতে রাত দশ'টা বেজে গেলো । রাতের খাবার চলে এলো । পোলাউ, ভাত, কলাই আর দেশী মুগ মেশানো ডাল, চার পাঁচ রকমের ভাজা, ফুলকপির সব্জী, দেশী মোরগের ঝাল ঝাল করে কষানো ঝোল, নলেন গুড়ের মিষ্টি আর অসাধারণ মানের ঘোষেদের থেকে আনা খাঁটি দুধের ঘরেপাতা টকদই ।

আমি কোন পদই ছাড়তে পারলাম না । তবে কোন পদই আর চেয়েও নিলাম না । ডিনারের আগে আনারুল আমি আর রাণার আরেক ভাই বসে বসে একটু হুইস্কি সেবন করেছিলাম । তাই খুব একটা খিদে ছিলো না । তবে এতটা কঠিন ঝাঁকুনিমার্কা পথের ক্লান্তি একেবারেই উবে গিয়েছিলো ঐ নেশার সৌজন্যে ।

সাধারণ লোকজন মদ খাওয়া ব্যাপারটাকে মোটেই ভালো নজরে নিতে চায় না । অথচ ওটার চেয়ে অনেক বেশী ক্ষতিকারক বিড়ি বা সিগারেটের ধোঁয়া টানলে কেউ কিন্তু আপত্তি করে না তেমন বলিষ্ঠভাবে । অথচ দুটোই বেশ খোলাখুলিভাবে বিক্রি হয় । সরকারও বেশ মোটা রাজস্ব আদায় করে নেয় বিক্রেতা ও ব্যবসায়ীদের থেকে ।

বিড়ি বা সিগারেটের ক্ষতিকারক দিক নিয়েও সরকার বাধ্যতামূলক ভাবে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণের বিজ্ঞাপন দেয় । কিন্তু জনগনের নজরে যত দোষ নন্দ ঘোষ হলো মদ্যপান করা, বিড়ি সিগারেট বা তামাকজাত দ্রব্য সেবন করা নিয়ে কারো কোন মাথাব্যথা নেই একেবারেই ।

কিন্তু আমার একান্ত ব্যক্তিগত মতে নিয়মিতভাবে এক বা দুই পেগ ভালো মানের মদ্যপান স্বাস্থ্যের পক্ষে অবশ্যই মঙ্গলজনক । গোটা দিনের চাপ তাপ টেনশন ধুয়ে মুছে মন আর মেজাজটাও বেশ হালকা ফুরফুরে হয়ে যায়, যা রাতে শান্তিতে ঘুমানোর জন্যে আজকাল খুবই জরুরী, অন্ততঃ আমাদের মত ঘাটের মড়া গোছের যাচ্ছেতাই পাবলিক সার্ভিস দপ্তরে ।

ডিনার শেষ করে কলতলায় গিয়ে হ্যান্ডপাম্পের হাতলে চাপ দিয়ে জল বের করে হাত মুখ পা ভালো করে ধুয়ে নিলাম । চোখে মুখে ঘাড়ে ভালো ভাবে জল দিলাম । তারপর আনারুলের মোবাইল টর্চ নিয়ে অনতিদূরের বাঁশবাগানের ঢালে গিয়ে নেমে পড়লাম বাথরুম করতে ।

বাঁশপাতার ফাঁক দিয়ে গলে পিছলে গড়িয়ে পড়লো নরম তুলতুলে চাঁদের আলো । এমন মায়াবী জোছনা রাত মোহিনী রূপ ধরে ছাতিমের সুবাস মেখে ছড়িয়ে পড়লো আমার চারপাশ জুড়ে । দেহ মনে আবিষ্ট হয়ে গেলাম ।

মনে চলে এলো চার লাইন _

চলো না
একটু হাঁটি পাশাপাশি

জোনাকি চাঁদের আলোয়
গায়ে গায়ে মিশে

আঙুলের সাথে
হোক্ না আঙুলে হাসাহাসি

গা ধোয়া মেঘ জলে
একটু ভালোবেসে

বাথরুম করা হয়ে গেল বটে, কিন্তু ওখান থেকে চলে আসতে আর মন করলো না । সামনেই আশেপাশে কোথাও হুলো দুটো বিড়াল হঠাৎই চরম ঝগড়া বাধিয়ে দিলো । আমার ঘোরও কেটে গেল মুহূর্তের ভিতর । একটা হাল্কা হিমেল শীত শীত ভাব এসে জড়িয়ে ধরলো আমাকে ।

ঘরে ফিরে এসে বারমুডা ছেড়ে জিনসের প্যান্ট, উইন্ডচিটার আর কানঢাকা টুপি পরে নিলাম । তিনটে বাইকে আমরা পাঁচজন বসে পড়লাম । আমি বসলাম রাণার বাইকে । আব্দুল একাই একটা বাইক নিয়ে নিলো । আরকেটা বাইকে আনারুল আর রাণার আরেক জন বন্ধু বসে পড়লো ।

আমরা যেই পথ ধরে লুটিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয় সংলগ্ন এই বাড়িতে এসেছিলাম, আবার সেই একই পথে বাইকে চেপে এগিয়ে গেলাম রিং বাঁধের রাস্তার দিকে । এবার আর নেশার ঘোরে পথের ঝাঁকানির কষ্ট বা উল্টে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা একবারের জন্যেও মনে জায়গা পেলো না । পেটে থাকা অ্যালকোহলের জন্যে শীত শীত বোধটাও তেমন করে জাঁকিয়ে বসলো না ।

মিনিট কুড়ির ভিতরেই আমরা রাসের মেলায় পৌঁছে গেলাম । মেলা প্রাঙ্গন বিশাল বড়ো । গ্রামীন পরিবেশে রাত এগারোটায় মেলার আকর্ষণে এত মানুষের সমাগম আমাকে বিস্মিত করলো । পুরুষের থেকেও মহিলাদের ভীড় তুলনামূলকভাবে অনেক বেশী বলেই মনে হলো । দেখলাম ইলেকট্রিক চালিত বিরাটকায় নাগরদোলা অনবরত ঘুরেই চলেছে বিরামহীন ভাবে ।

এটা আমাদের শহুরে এলাকা হলে এই সময়ে মেলা উপলক্ষ্যে এমন উপচে পড়া ভীড় কল্পনাই করা যায় না । আর নাগরদোলাও জন প্রতি তিরিশ বা চল্লিশ টাকার বিনিময়ে দশ বারো চক্কর লাগিয়ে নামিয়ে দেয় । আর এখানে নাগরদোলাটা আমার চোখের সামনেই অন্ততঃ কুড়ি পাক ঘুরে নিলো । এখনো সে ঘুরেই চলেছে । সত্যিই অদ্ভুত লাগছে এমন পরিবেশে ।

আমরা চারপাশ জুড়ে ঘুরে বেড়াতে লাগলাম এদিক সেদিক । কোথাও সংসারের নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, কোথাও বা মহিলাদের প্রসাধন সামগ্রীর সম্ভার, কোথাও আবার শিশু আর একটু বড়ো বাচ্চাদের খেলার সামগ্রী, আবার কোথাও কোথাও লটারী বা জুয়া খেলার ভীড় । হরেক রকমের রকমারি খাবার স্টলও চোখে পড়লো । ফুচকা, ভেলপুরী, জিলিপি, তেলেভাজা, রোল, চাউমিন এবং আরো কত কিছু নিয়ে বসে আছে কত মানুষ ।

আমরা একটা পানের স্টলের সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । দেখলাম বেনারসী মিষ্টি পাতার বড়ো বড়ো পানপাতা । পেট তো ভর্তিই ছিলো আমার । শুধু যেন ঐ পানটুকু খাওয়াই বাকী ছিলো আমার । একটা মিষ্টি পান মুখে নিয়ে এগিয়ে গেলাম ভিতরের মঞ্চের দিকে, যেখানে নাচ গান আর যাত্রাপালা হয় । পানটা অতীব নরম রসালো আর অসম্ভব রকমের সুস্বাদু । মুখে পড়তেই চোয়াল আর দাঁতের চাপে কোথায় যেন মিশে মিলিয়ে গেলো ।

আমরা জানতাম রাত এগারোটার পরে এখানে কলকাতা থেকে আনা নাচের দলের অনুষ্ঠান আছে । কিন্তু এখানকার নতুন হওয়া ভূতনী থানার বড়বাবু একটু যেন বেশীমাত্রায় সচেতন এবং কড়া ধাতের মানুষ । তিনি এর আগে মালদার যেই থানা এলাকায় বড়োবাবু ছিলেন, সেখানে এই নাচ দেখা নিয়ে তুলকালাম পর্যায়ের মারামারি এবং খুনোখুনি পর্যন্ত হয়ে গিয়েছিলো । বড়বাবু তাই এই এলাকার পরিবেশগত গুরুত্ব নিয়ে অতিমাত্রায় সচেতন । তিনি কোন রকম ঝামেলা বা অশান্তিকে এখানে একেবারেই উৎসাহ দিতে চান না । তাই কলকাতা থেকে নাচ গানের দল এখানে এসে পড়লেও তাদের কাউকেই মঞ্চের উপর নামানো সম্ভব হয়নি এখনো পর্যন্ত ।

দর্শকদের অনেকেই লেখলাম মুখভার করে হাঁড়িমুখো হয়ে বসে বা দাঁড়িয়ে । এ ব্যাপারে এলাকার ছেলেদের থেকে মেয়েদের উৎসাহ উদ্দীপনা কম কিছু নয় ।

কলকাতা থেকে আসা এই সব নাচ গান আর যাত্রাপালা দেখার জন্যে কাতারে কাতারে মানুষের জমায়েত হয় এখানে । একশো সাত বছরের পুরানো এই রাসের মেলার ঐতিহ্য হলো এই নাচ গান আর যাত্রাপালা ।

লোকজনকে দেখলাম বেশ ক্ষিপ্ত এবং উত্তেজিত । এলাকার লোকজনের সাথে থানার বড়বাবু আর তাঁর সাঙ্গোপাঙ্গদের দফায় দফায় বেশ কয়েকপ্রস্থ বাক্-বিতন্ডাও হয়ে গিয়েছে এই নাচের দলের অনুষ্ঠান করতে অনুমতি না দেওয়ার প্রশ্নে । বড়বাবু তাঁর সিদ্ধান্তে অনড় অটল । আর মেলার কর্মকর্তারাও নাছোড়বান্দা ।

এদিকে আকাশ এখন পুরোপুরি মেঘলা । দক্ষিণবঙ্গের নিম্নচাপের লেজ মালদা রাজমহল গাঙ্গেয় সংলগ্ন অববাহিকা এলাকাতেও চলে এসেছে । তার প্রমাণ পেলাম কপালে চশমায় আর নাকের উপরে ফোঁটা কয়েক জলের বিন্দু পড়ায় ।

প্রথমে ভেবেছিলাম মাথার উপরে গাছের ডালের পাতায় কুয়াশা জমাট বেঁধে টুপটুপ করে নেমে আসছে জলের কণা । তারপর মুখ তুলে চেয়ে দেখি সেই বাঁশঝাড়ের পাতা আর ডালের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারা মায়াবী চাঁদটা কোথায় যেন গায়েব হয়ে গেছে এই ঘন্টা খানেকের ভিতরেই ।

আমরা আর কাল বিলম্ব করলাম না । ডিনারের আগে ড্রিঙ্কস চলাকালীন আমাদের কথা হয়েছিলো যে সকলে মিলে ভোর পাঁচটা নাগাদ উঠে পড়ে ছয়টার ভিতর গদাইয়ের চরের দিকে রওনা দিয়ে দেবো । আর এখান থেকে গদাই এর চর বাইকে চেপে প্রায় আড়াই ঘন্টা । হাল্কা করে ঘুরে ফিরে আবার আমরা দুপুর দেড়টার ভিতর ফিরে আসবো বলে মনস্থির করেছিলাম ।

কারণ আমায় যেন তেন প্রকারেণ অফিসে ফিরে যেতেই হবে । ওদিকে অফিস থেকে বিগত কিছু দিন ধরে রোজ গড়ে তিন হাজারেরও বেশী মানুষের জমির পর্চার কাগজ উঠছে । আর আমাদেরও অন্য সব কাজ শিকেয় তুলে শুধু পর্চাতেই সই করে যেতে হচ্ছে সন্ধ্যে সাতটা পর্যন্ত । সমস্ত স্টাফদের ঐ কাজে লাগাতে হচ্ছে ।

সরকার তো কৃষি জমির খাজনা এই বছরের জন্যে মকুব করেই দিয়েছে । আর তার উপর রাজনৈতিক মঞ্চ থেকে ঘোষণা করা হয়েছে যে আমার কর্মস্থল মানিকচক ব্লকের অন্তর্গত একচল্লিশ খানা বন্যা কবলিত মৌজায় জমির শতক পিছু রায়তকে টাকা দেওয়া হবে । আর এর জন্যে দিন তারিখ নির্দিষ্ট করে সময়সীমাও বেঁধে দেওয়া হয়েছে ।

এদিকে আমাদের অফিসেও বিপত্তির অন্ত নেই । জেরক্স মেশিনের কালি আর কাগজ বাড়ন্ত হয়ে যাচ্ছে । এমন করে একটানা ঐ মেশিন চলার অভ্যাস ছিলোনা এতকাল । যেখানে দিনে একশো খানার বেশী পর্চা ওঠে না কখনো, সেখানে রোজ তিন হাজারের বেশী পর্চা বের করতে হচ্ছে । মেশিন বেশ কয়েকবার প্রচন্ড গরম হয়ে গিয়ে বিরাট সমস্যা তৈরী হয়েছে ।

পাবলিক বিনা পরিশ্রমে ফোকটে টাকা পাবে । আর তাতে বাধা এলে বা দেরী হলে ক্ষেপে গিয়ে ঝামেলা পাকিয়ে দিচ্ছে অফিস চত্বরে । স্টাফদের সাথে চিৎকার চেঁচামেচি লেগেই আছে সর্বক্ষণ ।

স্টাফেরাও এর থেকে সুযোগ নিচ্ছে । এই সুযোগে তারাও দেদার পয়সা কামিয়ে নিচ্ছে । কেউ কেউ পয়সা নিয়ে পরের দিকে জমা দেওয়া পর্চার আবেদন আগে বের করে দিচ্ছে ।

গতকাল এই ইস্যু নিয়ে আমার কাছে অভিযোগ এসেছিলো । আমি বি.এল.আর.ও. দাদাকে বিশদে ব্যাপারটা বলেওছিলাম । পাবলিকের একাংশও দাদার রুমে ঢুকে চিৎকার চেঁচামেচি করেছিলো । শেষ পর্যন্ত আমি ঐ বিষয়ে হস্তক্ষেপ করে ঝামেলা মেটাই ।

যাকে নিয়ে মূল অভিযোগ অনুযোগ, তাকে ঐ পর্চা তোলার সেকশন থেকে হঠিয়ে দিই । আজকের বিকেল পর্যন্ত আর কোন ঝামেলা নতুন করে শুরু হয়নি ।

বাইকে চেপে আবার আমরা লুটিয়ারা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কাছে আমাদের অতিথি নিবাসে ফিরে এলাম । রাত বারোটা বেজে গেছে সেই কখন । আবার ভোর পাঁচটায় উঠে যাবার কথা ।

রাণা আর আব্দুলের পাল্লায় পড়ে আমি বারমুডা ছেড়ে লুঙ্গি পড়ে নিলাম । আমি জানতাম যে লুঙ্গি ব্যাপারটা বেশ আরামপ্রদ । কিন্তু সামলাতে না পেরে খুলে যাওয়ার ভয়ে আজ পর্যন্ত কখনো তেমন করে পড়ার চেষ্টা করিনি । দুই একবার পড়েছিলাম বটে । তবে ভিতরে অন্তর্বাস পরেই পড়তে হয়েছিলো ।

আজ একেবারে বিনা অন্তর্বাসেই সটান পড়ে ফেললাম নীল সাদা চেক চেক ডোরাকাটা লুঙ্গিখানা । বাড়িতে ঠাকুরদা বাবা কাকু জেঠু আর মামাদের কে লুঙ্গি পড়তে দেখেছি এতকাল । তাই চোখে দেখে অভ্যস্ত মনে খুব সহজেই লুঙ্গি ব্যাপারটাকে আপন করে নিলাম ।

রাত হয়ে গিয়েছিলো । আমরা মশারি টাঙিয়ে শুয়ে পড়লাম । রাণা একটা মোটাসোটা সুগন্ধী লেপ দিয়ে গেলো আমাদের দুই জনার জন্যে । আমাদের ঘরে একখানা চৌকি পাতা ছিলো । তার উপরেই আমি আর আব্দুল শুয়ে পড়লাম ।

আমার আবার শিয়াল আর সাপখোপ নিয়ে খুব ভয় । আব্দুল জানালো ভয়ের কিছুই নেই । এখানে ওরা আসবে না । আর আমিও ভেবে দেখলাম যে, ঘুমিয়ে পড়লে আমার যা নাক ডাকার বহর, তাতে গোটা পাড়ার আশপাশ দিয়ে যে কোন প্রাণী আসা যাওয়া করতেও অন্ততঃ বার কয়েক ভাববে ।

কিন্তু নাহ্ । আমিই ভুল ছিলাম । আমার ধারণাটাই সম্পূর্ণ ভুল ছিলো । আমি ভাবতাম একমাত্র মশক বাহিনী ছাড়া আমার মতোন নাক ডাকা ডাকাবুকো ড্রামস্টিকের নাসিকাগর্জনে পিঁপড়ে আরশোলা ছুঁচো টিকটিকি ইঁদুর বাদুড় চামচিকে ছিঁচকে বিড়াল সবাই চমকে উঠে যে যার পথে পালিয়ে যাবার পথ খুঁজে হন্য হবে । কিন্তু আমার এস্টিমেশনে একটু হাল্কা গড়বড় হয়ে গিয়েছিলো ।

আর সেটা টের পেলাম বিছানায় সুড়ুৎ করে আমার গোলগাল হৃষ্টপুষ্ট নধর দেহখানা গলিয়ে দেওয়ার পর । ঘরের সবেধন নীলমনি একমাত্র বাল্বখানা নিয়ম মাফিক নিভে গেলো । তারপর আপাদমস্তক মুড়েই চুপচাপ শুয়ে আছি । কিন্তু বহু কাঙ্খিত ঘুমটা যেন আর কিছুতেই আসতে চাইছে না । উসখুস খুসখুস করছি । একবার এপাশ থেকে ওপাশ করছি । আবার পাল্টি খেয়ে ওপাশ থেকে এপাশ । এইভাবেই আরও বেশ খানিকটা সময় কেটে গেলো ।

একবার ভাবলাম নতুন জায়গা । তাই বুঝি ঘুম আসতে দেরী হচ্ছে । তবুও জোর করে চোখ বুঁজে রইলাম । এবার মনে হল আমার বাম হাত টা একটু আধটু চুলকাচ্ছে । তারপর ডান পায়ের থাই । তারপর দেখি ঘাড় আর পিঠেও কুটকুট করছে । আমি ভাবলাম লাল পিঁপড়ে টিপড়ে কিছু একটা হবে কিংবা চারপাশের জঙ্গল থেকে উঠে আসা কোন বিটকেল পোকা ।

আব্দুল আমার পাশেই খালি গায়ে শুয়ে ছিল আমার লেপের অর্ধেকটা নিয়ে । বেচারা বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছিলো । ওকে ঠেলা মেরে তুলে দিলাম । মোবাইলের টর্চ টা জ্বালতে অনুরোধ করলাম । আব্দুল মোবাইলের জোরদার ফটফটে সাদা আলো বিছানার উপর মেলে ধরলো । কিন্তু কিছুই দেখতে পেলাম না আমরা । তাজ্জব ব্যাপারই বটে ।

তবুও আমার সন্দেহ দূর হলো না । হাত পা রীতিমতন চুলকাচ্ছিলো আমার । ভালো করে লেপ তোষক বালিশ পর্যবেক্ষণ করতে করতে দুই চারখানা ভ্যাম্পায়ার সুলভ দেঁতো ছারপোকার বাচ্চাকে দেখতে পেলাম । মাথার ব্রহ্মতালু অবদি গরম হয়ে গেলো আমার ।

শালারা অন্ধকারের সুযোগ নিয়ে নির্বিকারে আমার রক্ত চুষে ফাঁক করে দিচ্ছে । মোবাইলের আলো গায়ে হাতে পায়ে ফেলে দেখলাম লাল লাল ছোপ ছোপ হয়ে গেছে সর্বাঙ্গে । আর চুলকানির জায়গাগুলো সব ফুলে ফেঁপে উঁচু উঁচু শক্ত ঢিবির মতো হয়ে গেছে ।

আমি তড়াক করে বিছানা থেকে নামলাম । হতচ্ছাড়া লেপটাকে একটা কোণে পড়ে থাকা চেয়ারের উপরে ছুঁড়ে ফেলে দিলাম । ঘরের আলো জ্বালিয়ে হালো করে বিছানার চাদর আর বালিশ ঝাড়লাম । আবার তো শুয়ে পড়বো ঠিকই । কিন্তু এই চিড়বিড়ানি জ্বালাপড়ার কি হবে !

সাথে সাথে মাথায় বিদ্যুৎ ঝলকের মত একটা আইডিয়া চলে এলো । ঘরের টেবিলে রাখা হুইস্কির বোতলে হাফ লিটারের মত লিকার তখনো পড়ে ছিলো । সেখান থেকে দুই তিন ছিপি হুইস্কি ভালো করে হাতে পায়ে ঘাড়ে লোশনের মত করে মেখে ফুলে ওঠা জায়গাগুলো ভিজিয়ে নিলাম । প্রথমবার যখন দেহে হুইস্কি মাখতে লাগলাম, চিড়বিড় করে চামড়ায় জ্বলুনি শুরু হলো । গোটা ঘরটাই অ্যালকোহলের গন্ধে ম ম করতে লাগলো ।

এবার যেন আমি একটু স্বস্তি পেলাম শরীরে । আবার মশারীর ভিতরে ঢুকে পড়লাম । ধীরে ধীরে চোখের পাতা দুটো ভারী হয়ে একে অন্যের সাথে জুড়ে গেলো । ঘুলঘুলির ভিতর দিয়ে গলে আসা জোনাকিরা ঘরের মশারির চারপাশে পাক খেয়ে খেয়ে উড়তে লাগলো । কেউ কেউ এসে বসে পড়লো মশারীর জালের উপর ।

একটু দূর থেকে ভেসে আসতে লাগলো বাচ্চার কান্নার মতো শব্দ । তার সাথে মিশে যেতে লাগলো ঝিঁঝি আর ছাগলের ডাক । আমি যেন বাতাসে ভাসতে ভাসতে উড়তে উড়তে সাঁতার কেটে চললাম জ্যোৎস্না আলোকিত রাজমহলের তিনপাহাড়ের কোলে লুকিয়ে থাকা ঘুমপরীদের গুহায় । পার হলাম ভূতনীর বিশাল চর । পার হলাম গঙ্গার নীল সবুজ জল । তারপর আর কিছু মনে নেই ।

----------
বৃহস্পতিবার
----------
আব্দুলের মোবাইলে দেওয়া অ্যালার্ম ঠিক ভোর পাঁচটায় বেজে উঠলো । গতকাল আমাদের ঘুম আসতে আসতে রাত পৌনে দুটো বেজে গিয়েছিলো । আমার চোখ বেশ জ্বালা জ্বালা করছিলো । আরো খানিকটা ঘুম দিলে ভালোই হত ।

আব্দুলকে সে কথা জানিয়ে আবার চাদর মুড়ি দিয়ে যথাস্থানে শুয়ে পড়লাম । শোবার আগে আরো একবার হুইস্কির বোতল খুলে দুই ছিপি অ্যালকোহল দুই হাতে পায়ে ভালো করে মেখে নিলাম । ছারপোকা আক্রান্ত জায়গাগুলো রীতিমতন জ্বালা করছিলো । একটু পর থেকে ধীরে ধীরে জ্বলুনি কমে এলো ।

আজ বৃহস্পতিবার । ষোলই অক্টোবর, ২০১৭ সাল । বি.এল.আর.ও দাদা আজ অফিসে আসবে না বলে আমাকে আগেভাগেই জানিয়ে দিয়েছে । কোন একটা কোর্ট কেস সংক্রান্ত ব্যাপার নিয়ে জেলার ভূমি দপ্তরের ল্য সেলের ও.সি. র সাথে কথা বলবে । আর আমিও তো দিনের প্রথম দফায় অফিস করে উঠতে পারবো না ।

আজ আমাদের সকাল ছয়টার ভিতর গদাইয়ের চরের পথে রওনা হওয়ার কথা । অথচ এমন চোখ জ্বালা করছে, দুই চোখ জুড়ে ঘন কুয়াশার মতো ঘুম জড়িয়ে আছে, যে আরো ঘন্টা খানেক না শুয়ে নিলেই নয় ।

অবশেষে গড়িমসি করতে করতে উঠেই পড়লাম চৌকি ছেড়ে । রাতে লুঙ্গি পরে শুয়েছিলাম । সেটার গিঁট আলগা হয়ে গিয়েছিলো । আমার তো আর রোজকারের অভ্যেস নেই । বিছানা থেকে নেমে লুঙ্গির খুঁট কষে বাঁধলাম । তারপর ঘর থেকে বের হয়ে সোজা চলে গেলাম কলতলায় ।

হ্যান্ডপাম্পে চাপ দিয়ে পাশে রাখা খালি লোহার বালতি জলে ভরে নিলাম । একহাতে ঐ বালতি তুলে নিলাম । আরেক হাতে প্লাস্টিকের গাড়ু (এটাকে কেউ কেউ 'বদনা' ও বলে থাকেন) আর লিক্যুইড সাবান নিয়ে চললাম ল্যাট্রিনের পথে ।

সবটাই কাঁচা মাটির পথ । গতকাল রাতের দিকে বৃষ্টি হয়েছিলো । বেশ পা হড়কে যাওয়ার মত পিছল বেহাল অবস্থা হয়ে আছে চারপাশ জুড়ে । আমি পা টিপে টিপে টয়লেটে গিয়ে বসলাম । টয়লেট টা বেশ চাপা আর ছোট ।

চারপাশ জুড়ে প্রচুর মশা ভন্ ভন্ পন্ পন্ করছিলো । মাঝে মাঝে মনে হচ্ছিল শাঁখ আর সানাই এর মিলিত মহড়া করছে ওরা দল বেঁধে । ওখানে ওদের জ্বালায় ঠিকঠাক বসাই যাচ্ছিলো না । আর ঐ ভাবে বসে লুঙ্গি সামলানো আমার কম্মোও ছিলো না । ওরাও মনের সুখে আমার নধর পুরুষ্টু দেহে হুল ফুটিয়ে দারুন মস্তি নিচ্ছিলো, যেমনটা সাধারণতঃ করে থাকেন অধিকাংশ বাড়ির গিন্নী বান্নিরা ।

তবুও ঐ ভাবে ডেঁয়ো পিঁপড়ের মতো পশ্চাৎদ্দেশ উপর দিকে উত্তোলন করে মিনিট পাঁচ-সাতেক বসে থাকার চূড়ান্ত মানসিক ধৈর্য্য পরীক্ষায় আমিই শেষ পর্যন্ত বিজয়ীর হাসিটা হাসলাম । ভাবখানা এমন যেন অসংখ্য গুলির আঘাতে জর্জরিত হলেও আমি কার্গিলের চূড়া অবদি দখল করে চূড়ান্ত বিজয় লাভ করতে সম্ভব হয়েছি ।

ঠান্ডা পড়ে গেলে খাঁটি সরষের তেল গায়ে মেখে চান করার মজাই আলাদা । তাই পেটটা মোটামুটি খালি করে রাণাকে ডেকে অল্প খানিকটা ঘানির খাঁটি সরষের তেল চাইলাম । কোথাও একবার পড়েছিলাম দেহের আটখানা অংশ বা পয়েন্টে তেল লাগিয়ে স্নান করলে, জল যতই ঠান্ডা বরফ হোক না কেন, শরীরে কোন রকম ভাবেই আর ঠান্ডা লাগার কোন অবকাশ থাকে না । আমিও এই হাল্কা শীতের সকালে এই ফান্ডা অ্যাপ্লাই করে দিলাম । মাথা, হাত ও পায়ের তালু, নাভিমন্ডল আর দুটো স্তনবৃন্তের ডগায় ভালো করে তেল মালিশ করে বসিয়ে নিলাম ।

আবার লুঙ্গি পরা অবস্থায় কলতলায় গিয়ে হাতলে চাপ দিলাম । মাটির নীচ থেকে আপেক্ষিক ঈষদুষ্ণ জল বের হতে লাগলো । গোটা ভূতনীর চর এলাকাটাই আর্সেনিক দূষণের আক্রমণ থেকে মুক্ত । জলও একেবারে স্বচ্ছ কাঁচের মতো টলটলে ও স্বাদু । এই জলেই সবাই সবকিছু করে আসছে দীর্ঘ সময় ধরে । এখানে কারো কোনও রকমের পেটের অসুখজনিত সমস্যাও নেই ।

আমি বেশ সময় নিয়ে আরামের সাথে সাবান মেখে স্নান সারলাম । এমন জল তো আর শহরে ফিরে গেলে পাওয়ার সম্ভাবনা নেই । সেখানে তো কল খুললেই কখনো ঘোলাটে হলদেটে জল, কখনো বা কলের ভিতর থেকে জং পড়া লোহাচুর ঝুর ঝুর করে জলের সাথে ছিটকে বের হয় ।

শহরের জলে কিছু দিন ছাড়া ছাড়াই পেটের গোলমাল হয় । আর কিনে খাওয়া জলে তো প্রয়োজনের অতিরিক্ত ক্লোরিন দেওয়া থাকে । তা খেতে খেতে আমার মাথার তিনভাগ চুল আমাকে টা টা বাই বাই করে কোথায় যেন নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে । আর ওদের ফিরে আসার কোনও ক্ষীণতম সম্ভাবনাও নেই ।

লুঙ্গি পড়া অবস্থায় নাভির নীচের দিকের অংশগুলোতে কেমন করে সাবান মাখবো, ভেবে পাচ্ছিলাম না । এখানে অনেকগুলো চোখের সামনে লুঙ্গি উঁচু করে নিম্নাঙ্গে সাবান ঘষা বেশ অসুবিধাজনক । টার দেওয়াল ঘেরা বাথরুমে হলে তো একেবারে নাঙ্গাবাবা হয়েই স্নানটা সারতাম । কিন্তু সেটা এখানে কিছুতেই সম্ভবপর ছিলোনা ।

আর আমার ঐ পরিমান আলগা অস্বস্তির সাথে স্নান করা ব্যাপারটা বেশ তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করছিলো রাণার বাড়ির মহিলারা । আমি আড়চোখে ওদের দৃষ্টির দিকেও নজর রাখছিলাম । আমার বেশ লজ্জা লজ্জা করলেও ওরা সকলেই কিন্তু এমন করেই খোলা কলতলায় স্নান করতে অভ্যস্ত । ওরা হাসছিলো মুখ টিপে টিপে আমার মত শহুরে বাবুর কান্ডকারখানা দেখে ।

আমি দাঁত মাজার কাজটা টয়লেটে যাওয়ার আগেই শেষ করে রেখেছিলাম । এরই ফাঁকে ধোঁয়া ওঠা গরমা গরম আদা লেবু চা চলে এসেছিলো আমাদের ঘরে । স্নানটা সেরে ঘরে গিয়ে চুল আঁচড়ে মনটা কে চায়ের ধোঁয়ার আমেজ উপভোগ করবার জন্যে তৈরী করে নিলাম । বেশ আয়েস করে সশব্দে চায়ের কাপে চুমুক দিতে লাগলাম ।

দরজার সামনে মাটির নিকোনো উঠোনে একটা বিড়াল এসে চুপটি করে বসলো । আমি ওর দিকে একটা ব্রিটানিয়ার বিস্কুট ছুঁড়ে মারলাম । হতভাগাটা বিস্কুটের দিকে পাত্তাই দিলো না । খুব সম্ভবতঃ ব্যাটার নজর ছিলো খানিকটা দূর দিয়ে টুক টুক করে দৌড়ে চলা দেশী মুরগীর ছানাগুলোর দিকে । সাথে ওদের মা আর বাবারাও ছিলো বোধ হয় । তাই আর হুলো বাবাজীর সাহসে কুলিয়ে উঠছিলো না কিছু করবার ।

মুরগীর ছানা গুলো একেবারেই ছোট ছোট । হাতের মুঠোর ভিতর চলে আসবে । অথচ কি দুরন্ত দুর্বার গতি ওদের । মাঝে মাঝে সেকেন্ড খানেক থামছে । মাটির উঠান বা চারপাশের জঙ্গল থেকে কি যেন একটা টেনে তুলে নিচ্ছে । আর ঠোঁট টা তুলে একটা ঝাঁকুনি মেরে গলার গভীরে জিনিসটা চালান করে দিচ্ছে ।  এগুলো খুব সম্ভবতঃ পোকা মাকড় বা ধান গমের টুকরো বা অন্য কিছুও হতে পারে ।

এখানে বাচ্চা খাসি আর বড়ো খাসিও দেখলাম । দেখলাম পোষা পায়রা । এখানে ধানের গোলার ভিতরে নাকি অনেক সময় সাপ ঢুকে বসে থাকে । আবার অনেক সময় হাঁস মুরগী আর পায়রার লোভেও চলে আসে ওরা পেটের টানে । ওদের ডিমও নাকি সাপেদের ভারী প্রিয় ।

এখানে মোষ আর গরুর পাশাপাশি ছাগলের দুধটাও চলে । এই তিন তৃণভোজীর ভিতরে ছাগল হলো সর্ব অর্থেই সর্বভুক । একবার এক ছাগলীকে আমি ফেলে দেওয়া দেশী বা পোলট্রি মুরগীর হাড়গোড়ও চিবিয়ে খেয়ে ফেলতে দেখেছিলাম । এখানকার ছোট ছোট ছেলে মেয়েরা এদেরকে চরের নিরিবিলি এলাকায় চরাতে নিয়ে যায় গোটা দিনের জন্যে । আমি সকাল থেকেই কম বেশী এদের সকলের সাথে পরিচিত হয়ে গেলাম ।

এদিকের অধিকাংশ লোকজনকেই লক্ষ্য করেছি আমাদের মতো টুথপেস্ট ব্যবহার করে না । নিম বাবলা বা এই জাতীয় গাছের ডাল অথবা মাটির উনুনের কাঠপোড়া ছাই এনাদের দাঁতনের মূল উপাদান । আব্দুল যেমন নিমের দাঁতন করে । এই নিম বাবলার দাঁতন আমাদের দাঁত ও মাড়ির ক্ষেত্রে যে কতখানি উপকারী, তা এদের দাঁতের গড়ন আর সুন্দর মাড়ির অবস্থা দেখে সহজেই অনুমান করা যায় ।

আর এলাকার লোকজনের ঘুম ভাঙে বাড়িতে সাধারণতঃ পোষা মোরগের ডাকে । এখানে কম বা বেশী সব বাড়িতেই দেখলাম ছাগল খাসি হাঁস মুরগী । আর কোথাও কোথাও খাটালে মোষ । টুকটাক কিছু গরুও আছে । তবে মহিষের সংখ্যাটা তুলনামূলক ভাবে অনেক বেশী ।

চাষবাস আর গাড়ি টানার কাজে মোষের বহুল ব্যবহার এখানে । আর মোষগুলোও খুব ত্যাঁদড় মার্কা গোছের । বাইকে পথ চলার সময়ে কেউ যদি ওর পিছনে হর্ন মারে, তাকে একটুও পাত্তা না দিয়ে ও আপনমনে চলতেই থাকবে । মোষ চালকের লাঠির খোঁচা না খেলে ওদের ডাইনে বাঁয়ে চলার কোন হেলদোল থাকে না । এককথায় ওরা চূড়ান্ত রকমের নির্বিকার রসকষহীন ঢিলেঢালা মার্কা জীব ।

আমাদের তো এখান থেকে গদাই এর চরে যাওয়ার কথা ছিলো আনারুল ও তার বন্ধুর সাথে । ওকে সেই হিসেব মতন সময়ও বলে দেওয়া ছিলো । অথচ ওর কোন পাত্তাই নেই । ভোর পাঁচটায় আমাদের বিছানা থেকে ওঠার কথা । সেটা আর হয়নি ।

আর এখন প্রায় পৌনে আটটা বেজে গেছে । এরপর আর কখন যাবো কখন ফিরবো । সবকিছু ঠিকঠাক হলে যেতে আসতেই পাঁচ ঘন্টার পথ । সেই হীরানন্দপুর গ্রাম পঞ্চায়েতের বাঁধ এলাকা পার করে আবার নদী পার হতে হবে রাজমহলের দিকের । তারপরে সেই কুখ্যাত গদাইয়ের চর এলাকা ।

এখানে বলে রাখি, গদাইয়ের চর এলাকাটা আসলে নামেই পশ্চিমবঙ্গ অঞ্চলভুক্ত । ওখানে বারোশো মতন ভোটার । একমাত্র এই এলাকাতেই কোন স্থায়ী নির্বাচনী বুথ নেই । ভোটকর্মীরাও ভোটের আগের দিন ওখানে রাত্রিবাস করতে পারে না । ওরা দিনের দিন যায় এবং ঐ দিনেই বিকেল চারটের ভিতর ওখান থেকে ফিরে আসার জন্যে প্রস্তুত হয় ।

গোটা এলাকাটাই প্রায় ফাঁকা ও একেবারেই জনমানবহীন এবং কুখ্যাত ডাকাতদল "ঠিয়াপার্টি" র জন্যে বেশ নাম ডাক ওয়ালা । ঐ চত্বরে কোনও বাঙালীই নেই । সবটাই অবাঙ্গালী খোট্টাভাষী আর পেশায় খুনী ছিনতাইবাজ ডাকাত । না না । ওদের রক্তের ভিতর চুরি করবার মতো ছিঁচকে অভ্যেস নেই । ওরা খুন ছিনতাই ডাকাতি লুঠপাটে বিশ্বাসী । আর সব কটা মদ্দা ব্যাটাছেলের পিঠে বা কোমরে একটা করে বন্দুক ঝোলা বা গোঁজা অবস্থায় থাকে । সাথে তলোয়ার ও রাখে ।

ওদের নাকি মানুষকে কেটে টুকরো টুকরো করে খুন করেই আনন্দ । বন্দুকটা রাখে পুলিশ আর নিজেদের শত্রুদের থেকে আত্মরক্ষার জন্যে । যদিও পুলিশ মরে গেলেও ভয়ের চোটে ঐ সব এলাকায় পা দেয় না যদি না প্রশাসনিক চাপ বা কাজ থাকে । ওখানে একটা নামমাত্র পুলিশ ফাঁড়ি আছে । সেখানে রাতের বেলায় কেউ থাকার সাহস দেখায় না । ঐ এলাকার লোকজন এককথায় বলতে গেলে "চলমান বিভীষিকা", ভূত প্রেত রাক্ষস দত্যি দানোর চেয়েও ভয়ঙ্কর ।

(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি