প্রিয় কবিতারা - দুই
পা-মোছা রুমাল
- তারাপদ রায়
বড়বাবু,
আমি কি আপনার পায়ের কাছে একটু বসতে পারি,
বড়বাবু,
আমি কি আপনার জুতোজোড়া খুলে দিতে পারি।
বড়বাবু,
আমি কি আপনার মোজাজোড়া খুলে দিতে পারি,
বড়বাবু,
আমি কি আপনার পায়ে একটু তেল মাখাতে পারি,
বড়বাবু,
আমি কি আপনার পা দুটো রুমাল দিয়ে মুছতে পারি,
বড়বাবু,
আমি কি আপনার পা-মোছা রুমালটা নিতে পারি?
------
বাসা ভাঙার গান
----- বুদ্ধদেব বসু
.
শোনো, দেহ কি প্রেমের বাসা,
বলো, দেহ কি প্রেমের ভাষা?
দেহ ঝ’রে যায় কপট হাওয়ায়,
তবু থাকে ভালোবাসা?
.
তবু থাকে ভালোবাসা।
যে বাতাসে প্রাণ ফুল হ’য়ে ফোটে
পাতা ঝরা গান শুনি তারই ঠোঁটে,
তবু কিছু থাকে আশা?
.
আছে, তবু আছে আশা,
আমার সে-নীড় দিয়েছি নিখিলে
রেখেছি রাতের মায়াবী টেবিলে
হীরক চোখের ভাষা।
.
সেই তো আমার বাসা।
যা ছিলো হাওয়ায়, দিয়েছি হাওয়ায়,
রেখেছি হীরক চোখের মায়ায়
সকল-শেষের আশা।
.
এই বুঝি ভালোবাসা।
আহা যৌবন অন্ধ অধীর,
তাও যদি হলো অন্ধ বধির,
কোথায় প্রেমের বাসা?
.
সে-বাসা আমার ভাষা।
একা-রাত জাগে মায়াবী টেবিলে
হীরক আলোয় লিখি তিলে-তিলে
যে ভাষা প্রেমের বাসা।
.
আর লিখি এই আশা----
যা-কিছু ছিলো, তা আছে সব আছে,
যা-কিছু হবে, তা হবে তারই ছাঁচে,
হাওয়ার হারানো হীরক-চোখেই
সকল শেষের বাসা।
.
বলো, কোথায় প্রেমের বাসা?
শোনো, কোথায় প্রেমের আশা।
হীরক-মায়ায় এক হ’য়ে যায়
ভালোবাসা আর ভাষা।
-------
মানবজমিন
- প্রণবেন্দু দাশগুপ্ত
দ্যাখো মানুষের দুঃখ, দ্যাখো তার সুখ, দ্যাখো খেলা---
কিভাবে টুকরো হ'য়ে ভেঙে গিয়ে
সে নিজেকে আস্তভাবে রেখে দেয় সকলের কাছে---
পুজোআর্চা সেরে নিয়ে, শ্যালিকার সঙ্গে কিছু খুনসুটি করে,
তারপর, লন্ড্রি থেকে জামা নিয়ে আসে।
তার নির্জনতা তুমি বুঝে নাও।
সে কিছু ব'লতে চায়---ব'লে উঠতে পারে না---তবুও
গলার সমস্ত শিরা মুচড়িয়ে কথা ব'লে ওঠে।
জনতা কখনও হিংস্র হ'য়ে পড়ে।
জনতা কখনও খুব শান্ত হয়ে যায়।
হো হো করে হেসে ওঠে রাস্তার মোড়ের ছেলেগুলো।
লেডি ব্রেবোর্নের মেয়ে বাসে চড়ে মহিষীর মতো।
দ্যাখো মানুষের দুঃখ, দ্যাখো মানুষের সুখ,
দ্যাখো তার বুকের ওপরে
রক্তচন্দনের মতো অকথ্য জ্যোৎস্না ঝ'রে পড়ে।।
-----
আমার সমুদ্র দেখা, আমার পাহাড় দেখা
- মহাদেব সাহা---
ধূলোমাটির মানুষ
আমার কোনোদিন সমুদ্রদর্শন হয়নি, পাহাড় দেখাও না
কেন যে সমুদ্র বা পাহাড় আমাকে এমন বিমুখ করেছে
সমুদ্র আমাকে দর্শন দেননি কখনো
পাহাড় আমাকে সান্নিধ্য,
বাল্টিকের তীরে দাঁড়িয়ে আমি যেমন ধু-ধু জলরাশি ছাড়া
কোনো সমুদ্রই দেখতে পাইনি আর
তেমনি ময়নামতির পাহাড়েও প্রস্তরীভুত নিস্তব্ধতা,
এই আমার পাহাড় কিংবা সমুদ্রদর্শন!
হয়তো সমুদ্র দেখতে গিয়েই আমার তখনই
মনে পড়ে যায় একটি নিঃসঙ্গ চড়ুই কিংবা কাকের করুণ মৃত্যু
কিংবা মাতিসের কোনো নীল চোখের দিকে তাকিয়েই মনে হয়
সমুদ্র
কখনো কপালকুণ্ডলার আখ্যান জুড়েই উচ্ছল হয়ে ওঠে
নীলফেনিল তরঙ্গমালা!
কিন্তু আমি তো সমুদ্রই দেখতে চেয়েছিলাম তবুও সমুদ্রের কাছে গিয়ে
আমার কখনো সমুদ্র দেখা হয়নি
যেমন পাহাড়ের কাছে গিয়ে দেখা হয়নি কোনো নিবিড় পাহাড়কে,
আমি সেখানে উচ্চতা ছাড়া পাহাড় বলতে কিছুই দেখিনি!
এই সমুদ্র আমাকে চিরদিন বিমুখ করেছে
সমুদ্রের গায়ে হাত রেখে তাই তাকে
কেমন আছে বলে কুশল প্রশ্ন করতে পারিনি কখনো,
যতোবারই তাকিয়েছি ততোবারই মনে হয়েছে ব্যর্থতা
এক অর্থে এই ব্যর্থতার নামই সমুদ্র কিংবা পাহাড়;
পাহাড় আর সমুদ্রের মধ্যে ঈশ্বর জানেন কোথায় যেন কি
মিল আছে
হযতো তাই পাহাড়কে কখনো আমার মনে হয়েছে তরঙ্গময়
সমুদ্রকে শিলাশোভিত;
আমি হয়তো সমুদ্রের মধ্যে আরো কোনো পৃথক সমুদ্র সন্ধান
করেছিলাম কি না কে জানে
পাহাড় কিংবা আকাশের দিকে তাকিয়েও ঠিক তেমনি
অন্য কোনো স্বপ্ন-কোনো আভাস
তাই এখন কেবল মনে পড়ছে বাল্টিক কিংবা আরব সাগরের কূলে
আমি একটিও ঝিনুক কিংবা শঙ্খ কুড়াইনি কখনো
ক্যামেরায় সমুদ্রের ছবি তোলার দুঃসাহস করবো কীভাবে
সমুদ্রের কাছ থেকে আমি উপহার পেয়েছিলাম সামান্য যা টাকাকড়ি
তার নাম ব্যর্থতা;
চিরকাল পাহাড় ও সমুদ্রদর্শন করতে গিয়ে
আমার লাভের মধ্যে এই কিছু পবিত্র বিষাদ অর্জন!
তাই সমুদ্র দেখতে গিয়ে আমার সমুদ্রদর্শন হয়নি
পাহাড় দেখতে গিয়ে পাহাড় দেখা,
না দেখেছি পাহাড় না দেখেছি সমুদ্র
অথচ কী যে দেখতে দেখতে কী যে দেখতে দেখতে
আমার কতোবার দুপুর গড়িয়ে সন্ধ্যা নেমেছে
হয়তো আমি কিছুই দেখিনি সেই না-দেখাটাই ছিলো আমার
সমুদ্রদর্শন, আমার পাহাড়-প্রবেশ।
সমুদ্রের নীল জলরাশির দিকে তাকিয়ে কখন মনে পড়েছে
আমার মায়ের অশ্রুভেজা দুটি চোখ
সমুদ্রকে তার সেই সিক্ত ও সজল চোখের চেয়ে বিস্তৃত মনে
হয়নি আমার,
যে চোখ এতো অশ্রু ও মমতা ধারণ করে আছে তার দিকে তাকিয়েই
আমি বলেছি এই তো সমুদ্র!
হতে পারে সমুদ্রকে এভাবেই আমি ভিন্ন ও পৃথক রূপে দেখে
ভীত ও শিহরিত হয়েছিলাম।
আবার আকাশের দিকে তাকাতে তাকাতেই আমার কখন যে
বাংলাদেশের একজন ক্ষুধার্ত কিশোরীর মলিন ছেঁড়া শাড়ির কথা
মনে পড়ে যায়, বলতে পারবো না
আকাশের চেয়ে তার দারিদ্র্যকেই বেশি বড়ো মনে হয় আমার
আমি কি করবো, সমুদ্র দর্শনের ঠিক একাগ্রতাই হয়তো আমার নেই
কিংবা আকাশ কি পাহাড় দেখার সঠিক মনোযোগ,
তাই সমুদ্র দেখতে দেখতে আমার মধ্যে জেগে ওঠে সামান্য একটি
চড়ুইয়ের মৃত্যুদৃশ্য
আকাশ দেখতে দেখতে আমার মনে হয় আমি বুঝি
সারা বাংলাদেশ জুড়ে কেবল বাসন্তীর ছেঁড়া শাড়ি টানানো দেখছি,
পাহাড় দেখতে গিয়ে কতোবার যে আমি এমনি আহত হয়ে
ফিরে এসেছি
সকলে সুদৃশ্য পাহাড় দেখলেও আমি সেসবের কিছুই দেখিনি।
তাই এসব অভিজ্ঞতার কথা বর্ণনা করতে বললে
তখনই কেবল চোখের সামনে পাহাড় ও অকূল সমুদ্র
ভেসে ওঠে
চোখের জলই আমার মনে হয় সমুদ্র
অটল মৌনতাই আমার কাছে পাহাড়;
কিন্তু সমুদ্রের সেই পৃথক সুন্দর রূপ আমি স্পষ্ট দেখতে পারিনি কখনো
তাই সমুদ্রের দিকে তাকিয়ে বারবার আমি দেখেছি জলের দম্ভ
অনেকটা মরুভূমির মতোই শূন্য ও ধূসর সে, এখানেই তো
বালিরও উদ্ভব
পরক্ষনেই সমুদ্রে জাহাজগুলোকে ভাসতে দেখে
আমার মনে হয়েছে অনন্তের মধ্যে সাঁতার কাটছে তোমার রাজহাঁস,
মাছগুলো এই সমুদ্রের রহস্যের মতোই লাল ও উদাসীন
সূর্যাস্ত আর গোধূলিও যেন এই সুমদ্রের মধ্যেই শুয়ে আছে!
কখনো এই সমুদ্রের মধ্যেই আমি দেখেছি জ্বলজ্বল করছে
অসংখ্য তারা, চাঁদ ভাসছে সমুদ্রে
হঠাৎ সমুদ্রের মধ্যে এই নীলাকাশ দেখে
আমি কেমন বিহ্বল ও অনুতপ্ত হয়ে পড়ি;
আর আমার সমুদ্র দেখা হয় না, সমুদ্রের কলতান
আমার কাছে মনে হতে থাকে তোমার ব্যাকুল আহ্বান যেন,
তাই কেউ যখন পাহাড়ের উচ্চতা মাপতে যায়
আমি তখন মৌনতা বিষয়ে ভাবতে থাকি।
আমি হয়তো সমুদ্রে ঠিক সমুদ্র দেখতে পাই না
পাহাড়ে ঠিক পাহাড়,
হয়তো সমুদ্রের চেয়েও কিছু বেশি পাহাড়ের চেয়েও কিছু অধিক
আমি সেই সমুদ্র ও পাহাড়কেই হয়তো নাম দিতে চাই কবির তন্ময়তা।
------
গতর খাটাই, ভাত পাই
- অশোক মণ্ডল চট্টোপাধ্যায়
গাঁ-টকে জিবগাড়ির ধুমাতে বেইশ বমকাঁই দিলক ব
সকাল হইত্যে না হইত্যে, চাঁ-ট খাইত্যে না খাইত্যেই
শব্দতে কানগুলাইন ছ্যাঁদা ক্যুইরে দিছে হ্যা, দিয়ালগুলাইনঅ
ছরপাঁই দিলকে হ্যা-
হাত লেখেছো, কাইস্তা-হাতুড়ি লেখেছ্যে, পদ্মফুল
আরহ কি সোব লেখেছ্যে ব, মুখখু সুখখু মানুইষ আমরা
অত সকলের দিশা নাই খ।
হুপাড়ার বাবুদিকে শুধ্যালম, বাবু এত গাড়ি আইসছ্যে কেনে হে?
মুদের দিয়ালগুলাইন লেখ্যে লেখ্যে ছরপাঁই দিলেক ক্যানে?
বাবুদের বড়োনুনা বইলল্যাক : জানিস্ নাই, ভট হবেক!
আমি বইললম্: অ....
জাল হ্যা, বাবুদের বড়োনুনা টাহুনে থাকে। ঢেইর শিক্ষিত-ম্যাঘের সমান।
ইটার মতন মটা মটা বই পড়্যেছ্যে ত্যাবেই তা জানছ্যে হ্যা-
ভট হবেক!
বাবু বইলেছ্যে : হাত মানে কংগ্যারেস, কাইস্তা মানে সিপিএম
আর পদ্ম মানে বিজেপি,
ভটে জিতলে গরম্যান হবেক, আমাদিকে লিরিপ দিবেক।
কিন্তুক এ্যানেকবারেই ত ভট দিলম ব। সোমবারেই ত বইল্যেছিলক
গাঁয়ে সড়প হবেক, ইসকুল হবেক, টিউকল হবেক, হাঁসপাতাল হবেক
গরম্যান মুদের খ্যাত্ দিবেক, চাষ ক্যুইরত্যে গরু দিবেক
বিচ দিবেক-সার দিবেক
কিন্তুক লিরিপের গমটা বাদে কুছুই দিলেক নাই হ্যা!
যেই গরম্যান হক, কেউ কুছু দিবেক নাই
উয়াদের অ কুনু দষ নাই, উয়াদের খিদাট বেশি বটেক।
আমরা গাঁয়ের একধারে থাকি ব
উয়াদের পারা মটা মটা বই পড়হা বাবুলক লইখ।
উয়াদের লালরঙের ফতোকা আছে, সবুজ-হলুদ ফতোকাও আছে
পয়সার-পদ্মর ছাব আছে,
মুদের আছে পাহাড়
কাঠ নামাই, লরা নামাই, বিচে খাই-সুখেই আছি।
আমরা বন্দোমাতরম জানি নাই, জয়হিন্দ জানি নাই
ইনক্যালাব জানি নাই-
ভটের খবের রাখি নাই
আমরা জানি পাহাড়
গতর খাটাই, ভাত পাই।
-----
প্রবাসের শেষে
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
যমুনা, আমার হাত ধরো। স্বর্গে যাবো।
এসো, মুখে রাখো মুখ, চোখে চোখ, শরীরে শরীর
নবীনা পাতার মতো শুদ্ধরূপ, এসো
স্বর্গ খুব দূরে নয়, উত্তর সমুদ্র থেকে যেরকম বসন্ত প্রবাসে
উড়ে আসে কলস্বর, বাহু থেকে শীতের উত্তাপ
যে রকম অপর বুকের কাছে ঋণী হয়, যমুনা, আমার হাত ধরো,
স্বর্গে যাবো।
আমার প্রবাস আজ শেষ হলো, এরকম মধুর বিচ্ছেদ
মানুষ জানেনি আর। যমুনা আমার সঙ্গী-সহস্র রুমাল
স্বর্গের উদ্দেশ্যে ওড়ে; যমুনা তোমায় আমি নক্ষত্রের অতি প্রতিবেশী
করে রাখি, আসলে কি স্বাতী নক্ষত্রের সেই প্রবাদ মাখানো অশ্রু
তুমি নও?
তুমি নও ফেলে আসা লেবুর পাতার ঘ্রাণে জ্যোৎস্নাময় রাত?
তুমি নও ক্ষীণ ধূপ? তুমি কেউ নও
তুমিই বিস্মৃতি, তুমি শব্দময়ী, বর্ণ-নারী, স্তন ও জঙ্ঘায় নারী তুমি,
ভ্রমণে শয়নে তুমি সকল গ্রন্থের যুক্ত প্রণয় পিপাসা
চোখের বিশ্বাসে নারী, স্বেদে চুলে, নোখের ধুলোয়
প্রত্যেক অণুতে নারী, নারীর ভিতরে নারী, শূণ্যতায় সহাস্য সুন্দরী,
তুমিই গায়ত্রী ভাঙা মণীষার উপহাস, তুমি যৌবনের
প্রত্যেক কবির নীরা, দুনিয়ার সব দাপাদাপি ক্রুদ্ধ লোভ
ভুল ও ঘুমের মধ্যে তোমার মাধুরী ছুঁয়ে নদীর তরঙ্গ
পাপীকে চুম্বন করো তুমি, তাই দ্বার খোলে স্বর্গের প্রহরী।
তুমি এ রকম? তুমি কেউ নও
তুমি শুধু আমার যমুনা।
হাত ধরো, স্বরবৃত্ত পদক্ষেপে নাচ হোক, লজ্জিত জীবন
অন্তরীক্ষে বর্ণনাকে দৃশ্য করে, এসো হাত ধরো।
পৃথিবীতে বড় বেশী দুঃখ আমি পেয়ে গেছি, অবিশ্বাসে
আমি খুনী, আমি পাতাল শহরে জালিয়াত, আমি অরণ্যের
পলাতক, মাংসের দোকানে ঋণী, উৎসব ভাঙার ছদ্মবেশী
গুপ্তচর!
তবুও দ্বিধায় আমি ভুলিনি স্বর্গের পথ, যে রকম প্রাক্তন স্বদেশ।
তুমি তো জানো না কিছু, না প্রেম, না নিচু স্বর্গ, না জানাই ভালো
তুমিই কিশোরী নদী, বিস্মৃতির স্রোত, বিকালের পুরস্কার……
আয় খুকী, স্বর্গের বাগানে আজ ছুটোছুটি করি।
--------
অবেলায়
- সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়
আমার নিঃসঙ্গ জাগা ভাঙে না কোথাও ঘুমঘোর
অতিরিক্ত অবিশ্বাস মানুষের পাশাপাশি হাঁটে
মানুষ না প্রতিবিম্ব? অবিশ্বাস না মায়ার শোক?
আমার নিঃসঙ্গ জাগা অবেলায় অস্থির ললাটে
গম্ভীর ধ্বনির মধ্যে ভেসে রয়, অফুরন্ত অলীকের পাশাপাশি হাঁটে।
------
সাক্ষাৎকার ---কালীকৃষ্ণ গুহ
(অশোক দত্তচৌধুরী-কে)
অনেকদিন পর আমাদের দেখা হলো।
'কবিতা লিখে কিছুই হয়নি আমাদের' এইকথা বলে তুমি
কুঁজো হয়ে হেঁটে যেতে লাগলে।
'কবিতা লিখে কিছুই হয়নি আমাদের' এইকথা বলে আমি
পাশাপাশি কুঁজো হয়ে হেঁটে যেতে লাগলুম।
চারদিক তখন চৈত্রমাস সূচিত হয়েছে ---অন্য কোন ভাষা নেই---
স্মৃতিহীনতার মতো চৈত্রমাস।
-----
যা আমরা হতে পারি
- শুভ দাশগুপ্ত
আমেরিকার মনে হল
ইরাকে কোন শাসন নেই। মানুষের ভারি কষ্ট।
তাই তারা ইরাকে ঢুকে পড়ল। বোমা ফেললো। ঘরবাড়ি ধ্বংস করলো।
এবং ইরাকে শাসন ফিরে এল। মানুষের আর কষ্ট রইল না।
আমরা সবাই টিভিতে দেখলাম
ইরাকিরা আনন্দে নাচছে। গান গাইছে।
আমরাও শান্তি পেলাম।
কাশ্মীরে উগ্রপন্থীরা মনে করলো
ভারতবর্ষে মুসলমানদের কোনো সুখ নেই। কেবল কষ্ট। তাই
তারা গুলি বন্দুক নিয়ে কাশ্মীর উত্তাল করে দিল।
নিরীহ লোকজন বিস্ফোরনে, গুলিতে, বোমায় নেহাৎ মরে গেল।
অনেক পরিবার ভেসে গেল। এবং
ভারতবর্ষে মুসলমানদের এতদিনকার সব দুঃখকষ্ট মুছে গেল। সব
মুসলমান খুশিতে আনন্দে হৈ হৈ করে উঠলো।
আমরা টিভিতে দেখলাম। ডাল লেকে শিকারা ভাসছে। নীল আকাশে
কাশ্মীর কি কলির সাদা মেঘ।
আমরা শান্তি পেলাম।
টাটাদের মনে হল-সিঙ্গুরের মানুষের বড় কষ্ট। তারা খেতে পায়না আহা!
টাটারা ভাবল একটা কারখানা করলে এদের জীবনে সুখ আসবে।
কারখানার জন্য টাটারা উঠে পড়ে লাগলো।
অবুঝ সিঙ্গুরবাসীরা ঝামেলা লাগালো। পুলিশ লাঠি চালালো।
তারপর কারখানা হল। মস্ত কারখানা।
সব চাষীরা মুটে মজুর হয়ে গেল। চাষবাস ভুলে তারা গাড়ি বানাতে লাগলো।
সিঙ্গুরে আনন্দের বান ডাকলো।
আমরা টিভিতে দেখলাম-সিঙ্গুরের সব লোক গান গাইছে। তাদের অনেকে
আবার গাড়িও কিনে ফেলেছে।
আমরা কেউই আমেরিকা বা উগ্রপন্থী বা টাটা নই।
তাই আমাদের কখনও কিছু মনে হয়না।
হলেও তেমনটা করার কোন চেষ্টা আমরা করিনা।
আমাদের মুরোদ নেই।
অন্যেরা চাইলে আমরা শুধু চাষী থেকে মুটে মজুর কিংবা
জ্যান্ত মানুষ থেকে
থেঁৎলে যাওয়া লাশ হতে পারি। হয়েও থাকি। হচ্ছিও।
-----
মৃণালের পত্র
- দেবব্রত সিংহ
'শ্রীচরণ কমলেষু,
আজ পর্যন্ত তোমাকে চিঠি লিখিনি। চিরদিন কাছেই পড়ে আছি-মুখের কথা অনেক শুনেছ, আমিও শুনেছি। চিঠি লেখবার মতো ফাঁকটুকু পাওয়া যায়নি।
আমি তোমাদের মেজো বউ। আজ এই 'গঙ্গারপাড়ে দাঁড়িয়ে' জানতে পেরেছি জগৎ এবং জগদীশ্বরের সঙ্গে আমার অন্য সম্বন্ধও আছে। তাই আজ সাহস করে এই চিঠিখানি লিখছি, এ তোমাদের মেজো বউয়ের চিঠি নয়'।
সেই ছুটুবেলাতে আমাদে পাহাড়কোলের জোড়ে
লদী পেরাতে যাইয়ে
এক আষাঢ় মাসের হড়কা বানে
আমি আর আমার ভাই
ভাস্যে গেছলম বানের তোড়ে
ভাইটি গেল ডুবে আমি উঠলম বাঁচে
পাড়ার লোকে বললেক
বিটিছেল্যার জীবন
যদি বেটাছেল্যা হতক
তাহলে কি বাঁচতক।
আমার মরণ নাই
সেই কথাটাই আজ তুমাকে লতুন করে বলতে চাই
বেশিদিনের কথা লয়
আমাদে বাঘমুণ্ডির পাহাড়ী পথে জিবগাড়ি ছুটাই
লাল ধুলা উড়াই
যিদিন আল্যে তুমরা
পাহাড়কোলে জোড়ের ধারে চড়ুভাতি করতে আল্যে
সিদিনটা মনে আছে তুমার
দিনটা ছিল খরবার
মাসটা ছিল মধুমাস
টাঁড়ে টাঁড়ে ডাঙা ডহরে
পলাশবনে আগুন লাগা মধুমাস।
আমার মরণ নাই
তুমি বলেছিলে তুমার সঙ্গে দেখা হবেক বলে
মরণ নাই আমার
তুমি রাজপুত্তুর
কত লেখাপড়া জানা মানুষ তুমি
বি এ, এম এ পাশ
হাই ইসকুলের মাস্টার
আমি
আমি আর কে
কাঠকুড়ানি
রাঙামাটির গাঁয়ে ঘরের ইসকুলছুট কাঠকুড়ানি
কী সুন্দর গায়ের রং তুমার
একবারি চাঁপা ফুলের পারা
আমি
আমি একবারি কালো
আঁকড় ফলের পারা মিশমিশে কালো
তবে সবাই বলে কালো হলে হবে কী
আমার গড়ন খুউব ভালো
টানা টানা চোখ বাঁশির মতন নাক
ছিপছিপে চেহারা
বাঘমুণ্ডির হাটের হলুদরাঙা শাড়ি পরে দাঁড়ালে
খোঁপায় লাল পলাশের ফুল গুঁজলে
আমাকে নকি দেখায় দারুণ
একবারি মনভুলানি
একবারি মনকাড়ানি।
বাপ আমার বাবু ঘরে মুনিষখাটা খেতমজুর
এমনিতে তার সব ভালো
শুধু দোষের মধ্যে দোষ
সে একজনা নেশাভাঙ করা মানুষ
দিন ফুরালে সনঝা হল্যেই
তাকে হাতছানি দেয় মহুয়াতলার মদ ভাঁটি
ঘরদুয়ার, ছেল্যাপেলা, লেখাপড়া
বাপের কনদিকে লজর নাই
তখন বহুত ছুটুবেলা
তখন থাকেই দেখতম
বাপ আমাকে বিদায় করলেই বাঁচে
একদম হাঁফ ছাড়ে বাঁচে
মা কিন্তুক তা লয়
মা বলতক আত ছুটুতে বিহা কীসের
আর পাঁচটা বিটিছেলা যেরম যাচ্ছে ইসকুলে
তেমনি যাক
দুপাতা লেখাপড়া করে আসুক
সেই করে টানেটুনে কোনোমতনে গাঁয়ের ইসকুলে ওই নাইন টুকুন
ইয়ার মাঝে বলা নাই কওয়া নাই
বাপ একদিন হুট করে লাগাই দিলেক বিহা
তখন কী আর জানথম অত
পুরুল্যার খোট্টা পাড়ার জানকি যাদবের কাছে
আগাম টাকা লিইছে বাপ
আমি দাঁড়াইছিলম রুখে
সেই রুখে দাঁড়ানর জোরে
বিহার দিনে থানায় যাইয়ে আমি ভাঙে দিইছিলম সব
কাগজআওলা টিভিআওলারা কুথায় থাকে কেজানে
তারা আমাকে লিয়ে একঘড়িকে দুনিয়া দিলেক খবর করে
সে খবর ত দেখেছিলে তুমি
মিছা নাই বলব এতসব জানে শুনে
তুমি আমাকে বিহা করেছিলে বলে
গাঁয়ের লোকে দেবতা বলেছিল তুমাকে
মনে আছে আমার সব মনে আছে।
সেই ফাগুন দিনের দিন ফুরনো বেলায়
যিদিন তুমার সঙ্গে গেলম তুমাদে ঘরে
সিদিন ঘোমটা মাথায় আমাকে দেখে
ভূত দেখেছিল তুমার মা
তার মু গেছল শুকাই
তুমার বউদিদি মানে আমার বড়ো জা
সেও দেখলাম তাই
তুমার ইসকুলের মাস্টাররা পাড়ার বন্ধুরা
তারা বাহবা দিইছিল খুব
তবে সে কিন্তুক ভালো লাগে নাই আমার
সে ঠিক বাহবা লয়
তার ভিতরে কতকটা ছিল কৌতুক কতকটা করুণা।
তুমি বলেছিলে লতুন করে আবার আমাকে লেখাপড়া শিখাবে
তুমি বলেছিলে লতুন করে আবার আমাকে ভরতি করে দিবে ইসকুলে
কাজের চাপে সে আর তুমার হল্য কই
কত ব্যস্ত মানুষ তুমি
ইসকুল, পার্টি, ক্লাব, বস্তিবাসী, গরিব দুখী
প্রতিবন্ধী, রক্তদান জীবনদান,
তুমার কত কাজ।
একেক দিন কাজের টানে তুমি বাইরে কাটাতে রাত
একেক দিন কাজের টানে ঘরের কথা মনে পড়ত না তুমার
এমনি করে দেখতে দেখতে
ঘরের চাইয়ে বাইরে থাকার সময় গেল বাড়ে
একদিক তুমার মা বললেক,
'ও তো ঘর সংসারের মানুষই না
বিয়ে টিয়ে কেনে যে গেল করতে',
একদিন তুমার বউদিদি বললেক,
'ও তো বাঁধনছাড়া লাগামছাড়া মানুষ
বাউন্ডুলে মানুষ
ওকে এসব মানায় না
বিয়ে টিয়ে একবারি মানায় না'
কথা শুনে কষ্ট হত খুব
দুঃখও
সেই দুঃখে একলা ঘরে দু চোখ দিয়ে জল গড়াত আমার
তখন মনে পড়ত দিদিমার কথা
দিদিমা বলত, 'গরিব ঘরের বিটিছেলার আবার দুখ কীসের
আমাদে দুখ ও যা সুখও তা
আর হেই দ্যাখ আমার একটা কথা শুনে রাখ
যার রং কালো
তার মব ভালো'
কিন্তু মন ভালো হলে হবেকটা কী
সে মনের খবর লিবার লোক কুথায়।
বড়লোকদের হুজুগের কোনো কমতি নাই
কতরকমের হুজুগ,
গরিবঘরের বিহা ভাঙে যাওয়া
কালো মেইয়াকে উদ্ধার করাও যে একটা হুজুগ
সে আমি জানব কীরম করে,
দেখলম হজুগটা একটুন কাটতে না কাটতেই
তুমি পড়লে আমার গায়ের রং লিয়ে,
কালো রং ফরসা করার যত রকমের নামি দামি রকমারি ক্রিম
সব একের পর এক আনতে লাগলে তুমি
তার সঙ্গে আবার পালা করে শুনাতে লাগলে খবর
কাগজের সব মনখারাপ করা খবর
'গায়ের রং কালো বলে বউকে খুন করল বর'।
'গায়ের রং কালো বলে বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় গলায় দড়ি দিল মেয়ে'
এমনি সব আরও কত খারাপ খবর
তবে তুমি আবার সান্ত্বনাও দিতে
তুমি বলতে,
'কেন যে কাগজগুলো ছাপে এসব খবর',
আমি বলতম, চাই নাই ইসব খবর শুনতে নাই চাই।
তুমি বলতে,
'দেখো খারাপ খবরও জানা দরকার তুমার
নাইলে দেশটা যাচ্ছে কোনদিকে সে তুমি পারবে না বুঝতে',
আমি বলেছিলম, এমন দেশকে বুঝে আমার কাজ নাই।
এভাবেই চলে যাচ্ছিল দিন
দিনের পর দিন।
তারপর একদিন জষ্টিমাসের বেলা পড়তি অবেলায়
তুমি বললে, হাওয়া খেতে যাব
চলো হাওয়া খেতে যাব গঙ্গার পাড়ে
কথা শুনে তুমার মুখের দিকে আমি রইলাম চাইয়ে
তাই দেখে তুমি বললে 'না না মিথ্যে নয় সত্যি বলছি'।
সেই কতদিন আগে লতুন বউ হইয়ে আসার পরে
শাশুড়ি আর জায়ের সঙ্গে একদিন
পূজা দিয়ে আইছিলম গঙ্গার ঘাটে সিদ্ধেশ্বরী মন্দিরে
ইপারে তুমাদে পুরোনো শহর
ভাঙা মন্দির চানের ঘাট কাঁসর ঘন্টা
উপারে সবুজ খেত সরষে ফুল আঁখের বাদা ইঁট ভাটা
তালসুপারি, মাটির বাড়ি, ডিঙি নৌকা, খায়াঘাট, হইচই মানুষজন
তুমার হাত ধরে কতদিন পরে আবার সেই গঙ্গার পাড়ে
দিন ফুরনো অবেলাতে আউলিবাউলি হাওয়ার তোড়ে
আমার চুড়িদারের ওড়না যাচ্ছিল উড়ে
তুমি চাইছিলে নিরিবিলি
আরও নিরিবিলি
সে বহুতদূরে পোড়া মন্দিরের ভাঙন ধরা ঘাটের ধারে
আমার কেমন দম আসছিল আটকে
তুমার তখন বাঁধ ভাঙেছে ভালোবাসার
বউয়ের গলা জড়াই চুমু খাইয়ে আদর করার ধুমে
তুমার তখন 'রা' সরে নাই মুখে।
আমি কাঠকুড়ানি
রাঙামাটির গাঁ গেরামের ইসকুল ছুট কাঠকুড়ানি
আমি কী আর বুঝতে পারি
তুমার অমন আদর করার মানে কি আর বুঝতে পারি
আমার জায়গায় থাকত যদি অন্য কেউ
সেও কি পারত বুঝতে
ভালোবাসার মানুষ জড়িয়ে ধরে আদর করার ফাঁকে
একঘড়িকে লদীর জলে ফেলতে পারে ঠেলে
বলো না এটা বুঝবে কীরকম করে।
কত কী যে বুঝার আছে এই দুনিয়ায়
এই যে তুমি বি এ এম এ পাশ দিয়ে
মাস্টার হইছিলে হাই ইসকুলে
তুমিও কি পারেছিলে বুঝতে
যাকে অমন করে ঠেলে ফেললে ভরা গঙ্গার জলে
সে দিব্যি সাঁতার কাটে উথালপাতাল ঢেউয়ের তালে
পার হইয়ে যাবে লদী
অত বড় লদী
পারঅ নাই বুঝতে
একদম পারঅ নাই
তাই তখুনি পাড় ছাড়ে পালাইছিলে দৌড়ে
কী অদ্ভুত মানুষ তুমি
তুমাকে একদিন বসাইছিলাম দেবতার আসনে
বলঅ আজ কুথায় বসাব তুমায়।
দ্যাখঅ মানুষে মানুষে কী তফাত দ্যাখঅ
তুমি কত কাছের মানুষ হইয়ে কত সহজে
আমাকে ঠেলে ফেলে দিলে লদীর জলে
আরেকজন কত দূরের মানুষ হইয়ে লদীতে ঝাঁপ দিয়ে
সাঁতার কাটে দু হাত দিলে বাড়ায়ে
মানুষটা দেহাতি মানুষ
নাম শিউচরণ
পেশায় ইট ভাটার বদলি মজদুর
না তুমার মতন পড়াশুনা করা মাস্টার লয়
লেখাপড়ায় সে বিলকুল আনপড়।
তুমি ভাবছ নালিশ করব তুমার নামে
না নালিশ আমি করব না
কী হবেক নালিশ করে
আমাদে এই পোড়া দেশটার সবই ত তুমাদে দখলে
নেতা, মন্ত্রী, থানা, পুলিশ,কোর্ট, কাছারি সব
সিখেনে গাঁ গেরামের গরিব ঘরের মেইয়াদের
কতটুকুনি আর জায়গা আছে বলঅ
তবে আখনো মানুষের পাশে দাঁড়ায় মানুষ
আখনো মানুষের জন্যে জীবন দেয় মানুষ
সেই মানুষকে সাক্ষী রাখে এক বড়মানুষের বহুতকালের কথা
আজ আবার লতুন করে বলি তুমাকে
শুনঅ,
'সংসারের মাঝখানে মেয়েমানুষের পরিচয়টা যে কী তা আমি পেয়েছি। আর আমার দরকার নেই।
.... তোমরা যে আপন ইচ্ছামত আপন দস্তুর দিয়ে জীবনটাকে চিরকাল পায়ের তলায় চেপে রেখে
দেবে, তোমাদের পা এত লম্বা নয়।
ইতি
মৃণাল
তোমাদের চরণতলাশ্রয়ছিন্ন
এ যুগের মৃণাল।
-----
কাঁটা
শুভ দাশগুপ্ত
ফুটো এক পাত্র হাতে ঘুরেছি দরজায় দরজায়।
কাতর স্বরে বলেছিঃ
কিছু খেতে দাও। আমাকে, আমার বিধবা মা'কে।
বাবা নেই। কে খাওয়াবে!
সব দরজাই সশব্দে বন্ধ হয়ে গেছে।
কোনদিন কলের জল, কোনদিন সামান্য মুড়ি।
কখনও সখনও
কারো বাড়তি ভাত রুটি।
তবু। মরে যাইনি। তবু বড় হতে হয়েছে।
বড় হবার পর
আর একটা খিদে ভীষণ জ্বালিয়ে মারতো।
ভালবাসার খিদে। কিন্তু
তারজন্য ভিক্ষাপাত্র হাতে ঘুরিনি।
শুধু মনে মনে ভীষণ এক আশা নিয়ে
পথে বিপথে ঘুরেছি। কেউ কি ভালবাসবে না?
সব দরজাই খুলে বন্ধ হয়ে গেছে।
রূপ নেই। অর্থ নেই। কেন ভালবাসবে কেউ!
জীবন রহস্যময়। একসময় উঠে দাঁড়ালাম।
কাঁটা মুছে ফুলের গন্ধে গিয়ে পৌঁছলাম।
পেটের খিদে মিটলো।
মন তখনও চঞ্চল-ভালবাসার জন্য।
চেষ্টাও করলাম। কিন্তু অভাগার কপাল।
হলনা।
যখন আরো ফুরিয়ে এল।
গোধুলিতে পাখিরা বাসায় ফিরতে লাগলো।
তখন
ভালবাসা এল।
দৌড়ে ছুটে গেলাম প্রবল বেগে
কাছে গিয়ে বুঝলাম-ফুল আছে
তবে-হাজার হাজার কাঁটার ওধারে।
হাত বাড়ালাম।
কাঁটায় রক্ত ঝরলো অনেক। অনেক।
রক্ত আজও ঝরছে গোধুলিতে।
মরা কাকের মত একদিন শুয়ে থাকব পথে।
কেউ তাকাবে না। কেউ না।
যাবার আগে বলে যাব-
একবার রক্তমাখা হাতে ফুলকে ছুঁতে চেয়েছিলাম।
পেয়েওছিলাম। আর হলনা।
আর হলনা।
------
একটি পুরোনো চাঁদ
- শক্তিপদ ব্রহ্মচারী
একটি কবোষ্ণ দিন ভেঙে পড়ল পশ্চিম দুয়ারে
এই যে 'পশ্চিম' লিখি সে কি কোনো ইঙ্গিতবাহিত
এবং 'কবোষ্ণ' তা-ও বাংলায় কে-বা মনে রাখে
অভ্যাসের মুদ্রাদোষ? দ্বিরালাপে চিহ্নায়ক খোঁজা?
যদি ধান-চাল দাও, পরদেশে ভিক্ষাবৃত্তি নিয়ে
কেন যেতে হবে বলো, আড়ালে সতর্ক করে রাখি
হে মধূসুদন আর জ্বালিয়ো না, মনে রেখো একুশ শতক
তোমাদের দিনকাল ঠাকুরের চিতার আগুনে
ধিকি ধিকি জ্বলে পুড়ে একমুঠো ছাই পড়ে আছে।
যত গূঢ় কথা বল আমি তত কর্তব্যবিমূঢ়
চোখের পিঁচুটি খুঁটে অশ্রুর আবাল্য উৎস খুঁজি
তোমার পায়ের কাছে হাত রাখি উবু হয়ে সংসার সাজাই
উপরে তাকাই, দেখি একটি পুরোনো চাঁদ হাতছানি দিয়ে
যেন ডাকে।
-------
কিছুটা ফিরিয়ে নাও আজ
- শক্তিপদ ব্রহ্মচারী
অ্যাতো ভালোবাসা তুমি দিয়েছিলে
কিছুটা ফিরিয়ে নাও আজ
আমি যেন পণ্যহীন রিক্ত এক বিষণ্ণ জাহাজ
বাণিজ্য-বলয় ছেড়ে অবসন্ন অপরাহ্ণে ভাবি
কোথায় হারিয়ে গেছে সিন্দুকের চাবি
পোর্টম্যান্টে পোকা কাটা শীতের বৈভব
কিছুই চাই না আজ,
ফিরিয়ে নাও সব।
হাতে রাখো হাত
অ্যাতো ভালোবাসা কেন, নক্ষত্রখচিত দীর্ঘ রাত!
-------
যাপিত জীবন --- সালেহ মুজাহিদ
ওরা তো ভোগ আকাঙ্খায় করে ব্যয় তোমাতে
তুমি যখন গৃহপালিত পশু,
ধরো একটি ছাগশিশু
তোমাকে আদর করে পালে
তাজা করে প্রচুর কাঁঠাল পাতায়
আর দামি ইনজেকশন প্রয়োগে।
তারপর কেটে কুটে মশলা মাখিয়ে
রান্না করে, পরিবেশন করে
করে ভোজের আয়োজন।
তারপর ধরো তুমি নারী,
সুন্দরী কিন্তু অসহায় এক
তোমাকে সাজায় ওরা বেশুমার
মুখে প্রসাধনের প্রলেপ
ঠোঁটে রঙ, রাঙিয়ে তোলে আরও রঙিন করে
প্রস্তুত করে ভোগে, রাতের অভিসারে।
তারপর ওরা তোমায় ত্যাগ করে
বন্ধন খুলে বেরিয়ে যায়।
ছুড়ে ফেলে অবহেলায়।
কিছু মানুষ ভোগ করে অবিরাম
এক ভোজ শেষ না হতে নিষ্ক্রান্ত হয়
ছুটে যায় অন্য এক ভোজে।
যে কিনা কোনো ভোজই পেল না একজীবনে
আর কষ্ট পেল শরীরে, উদরে
যার জীবনে শুধু নাই আর নাই
সে তোমা হতে রইল শত ক্রোশ দূরে
তার পেটে পীড়াও নেই,
নেই শরীর যন্ত্রণাও
ক্ষুধা সামলাতে সামলাতে
কখন যে হয়ে উঠল প্রবাদপ্রতীম পাথর
সেই পাথরে জল ঘষলেও বেরোয় আগুন।
কিন্তু সেই আগুনে তুমি তো পোড়ো না
হও না কোনো ভোজের আয়োজন।
------
বসন্ত উৎসব
-------- জয় গোস্বামী
********************
কাকে তুলে দিতে গেছি ভোরবেলার ট্রেনে?
দোলের পরের দিন। গাছে গাছে তখনও আবির।
ওই তো প্রথম রোদ নেমে এল তার মুখে, কপালে --
ট্রেন আসতে দেরী আছে। আরও দেরী, আরও দেরী হোক!
.
চোখ তো মুখের দিকে তাকাতে পারছে না
ঘুরেফিরে শুধু দেখছে শ্যামলী হাতের পাতা তার,
রুমাল পাকাচ্ছে মুঠো, করতলে এখনো কালকের
রঙছাপ - স্নান যাকে স্বেচ্ছায় অধৌত রেখে গেছে
.
ট্রেন এসে পড়ল, ওই তো উঠে যাচ্ছে, হাতে- কাঁধে ব্যাগ--
একবার ঘোরালো দৃষ্টি -- কী ছিল সে- তাকানোর রঙ?
কেন সে ঠিকানা দেয়নি? কেন বলেছিল
'কিছুই বোঝেন না আপনি ! জানেনই না রঙ দেওয়ার একটাও নিয়ম!'
.
সেদিন বুঝিনি আর আজকেও বুঝি না।
আজ তো ফাল্গুন শেষ। হেমন্তও ফুরোলো এখন।
কী বলতে চেয়েছিল? আঠাশ বছর আগে? তার
সেই কথা হয়ত জানত বসন্তের শান্তিনিকেতন।
------
বার্তা
- শক্তিপদ ব্রহ্মচারী
সাবলীলকে রেখেছি দুই হাতে
মুঠোর ভিতর ধরে--
কৃত্রিমতা আর শানাবে কত
বাইরে এবং ঘরে।
হয়তো ঘোড়ার ডিম
যা সাবলীল তাহাই কৃত্রিম
যাক তো সে-সব কথা
খবর বলো ঘরের পরের এবং অন্যথা...
ভুল ছন্দের পদ্য-প্রণয়িনী
তোমায় আমি চিনি
এবং তোমায় ভালোবাসছি বলে
রাখছি ঢেকে গ্রামীণতায়
নাগরিক পল্বলে
তোমায় আমি চিনি
সে-ও তো ঠিক মিথ্যে এবং বটে
আকাশ জুড়ে বার্তাটুকু রটে।
---------
জামশেদপুরে বর্ষা
- কমল চক্রবর্তী
কতকাল পরে ফের সবাই বসেছে মুখোমুখি
প্লেটে প্লেটে গরম খিচুড়ি চালানি মাছের পেট
এমন নিজস্ব দিন, আহা দীর্ঘ হোক
এমন দিনেই শুধু বন্ধুর জুতোর কাঁটা দাঁতে করে তুলে ফেলা যায়
কাঁধে হাত বলা যায় সীতানাথ, তোমার বিয়ের দিন ট্রেন স্ট্রাইক হলে
মুখেতে লাগাম এঁটে নিয়ে যাবো ছাদনাতলায়।
আমাদের সবই কম, ভালোবাসা, বেড়াতে যাবার দিন
বয়স বাড়ার আগে শরীরের আঠা
সাইকেলে চাইবাসা ট্যুর, বিনা টিকিটে দূর কটক কোনার্ক
বৌদ্ধযুগের ভাঙ্গা মূর্তির মতো
শুধু প্রয়োজনে, শুধু প্রয়োজনে ছুঁয়ে দেখে বয়সের সীমা
সুশোভন আজ বৃষ্টি হোক
স্ন্যাগ পাহাড়ে আজ একটাও ট্রলি আসবে না
হুটারের শব্দ হলে, নতজানু চেয়ে নেবো একটা রাত্রির
বৃষ্টি হোক শহরে ভাসিয়ে
আমরা সবাই আজ বৃষ্টি মাথায় করে মদ খাবো
পুরনো সাইকেল নিয়ে বহুদূর চাইবাসা বেড়াতে বেরোব।
Comments