প্রিয় কবিতারা - এক

আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী
- কৃষ্ণদুলাল চট্টোপাধ্যায়

আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
বছর বছর আমি দিন গুনেছি
লিজের গতর ছ্যাঁচে কালি করেছি
তবুও প্যাটের খ্যুলা জুবাতে লারেছি
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
ফতাকাটা কেন তুরা উড়াই চলিস?
বড়ো বড়ো বুলি গেলা কেনেই বলিস?
লাল লিল কানিটাকে পাড়ে আনে দে
জাড়ে ধুঁকা ছে'লাটাকে জামা করে দি
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
তুদের বুলির চোটে দিয়ে যাই ভোট
মদ মারে ভাঙে ফেলি লিজেদের জোট
ঢঁকরা হাঁপর হঁয়ে দিন কাটাছি
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
আমার ক্যুড়ার চালে নাই কেনে খড়?
আমার দিয়্যাল ফ্যাটে হঁয়েছে হাঁড়র
ব'লে দে কুথায় আমি মুড় গুঁজে রাখি
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
আমার ছেলার প্যাটে নাই কেন 'ক'?
উদমা এঁড়ার পারা ঘুরে ডঁ ডঁ।
এমন স্বাধীন তবে কেনে হঁয়েছি?
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
আমার বৌয়ের গায়ে কেনে নাই কানি?
টুগদু টেনার লাগে কেনে টানাটানি।
তবে কি ভূতের বেগার খাঁটে ম'রেছি
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
ন্যাংটা ছেলার পাল আঁত খলা হঁয়ে
ডহর ডাঙার মাঝে কাঁদে শুঁয়ে শুঁয়ে
ডাট পুরু ছিলাগুলা অকালে খ্যাঁয়েছি
আমাকে বুঝাই দে স্বাধীনতা কী?
------
মৌ চোর
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

মধু সংগ্রহ করতে মশাল হাতে
চার-পাঁচ জনের একটি দল সুন্দরবনে ঢুকছে।
ওদের মুখের দুদিকে দুটো বাঘের মুখোশ,
বাঘ দূর থেকে দেখে
বুঝতে পারে না ওরা সামনের দিকে হাঁটছে
না, পিছনের দিকে।

মশালের আঁচ লাগিয়ে মৌচাক খালি করে দেয় ওরা,
বহুদিনের যত্নে একটু একটু করে গড়া ভাণ্ড
রসে টসটস করে,
তখন ওটা ভেঙে বস্তাবন্দি করে নিয়ে যায়।
এই মৌচোরদের চিনতে পারে না বাঘেরা বা মৌমাছিরা।

যেদিন মুখোশের রহস্য বুঝতে পারবে ওরা
সেদিন আর ঠকবে না---
সেদিন সবুজ রঙের মৌমাছিরা মধু খাবে
আর চতুর মানুষকে খাবে কালো-হলুদ বাঘ।
-----
গ্লোবাল ওয়ার্মিং
- শুভ দাশগুপ্ত

গোড়ায় ঈশ্বর এক ছিলেন।
তাতে তাঁর ভাল লাগল না। তিনি নিজেকে ভেঙে
দুই করে নিলেন। পুরুষ ও প্রকৃতি।
কৃষ্ণ ও রাধা। দুভাগ হয়ে একে অন্যের প্রতি
অমোঘ টানে লীলায় মেতে উঠলেন।
তখন থেকে ঈশ্বর সৃষ্টিময় রঙীন বর্ণময় হলেন।
এতে তাঁর মন কিছুদিন পর আক্ষেপে ভরে উঠলো।
তখন তিনি বহু দীর্ঘ সাধনায়
মানুষকে মানুষ বানাতে উঠে পড়ে লাগলেন।
মানুষের মনে প্রেম হলেন, মানুষের বিপন্নতায় ওষধি হলেন।
শোকে সান্ত্বনা হলেন। সুখে শিহরণ হলেন।

মানুষ এত খোঁজ রাখত না। রাখেও না।
সেভাবে-ঈশ্বর ফিশ্বর কেউ না। ওসব যত বুজরুকি।
ঠাকুর দেবতা, পীর পয়গম্বর। ওসব যত বানানো গপ্পো।
মানুষ তার নিজের দরকার মত পৃথিবী সাজালো।
যুদ্ধ, হিংসা, ঘৃণা, ঈর্ষা, পরশ্রীকাতরতা লোভ এইসব দিয়ে
মানুষ ঘর সাজালো।
মানুষ একে অন্যকে মেরে, দাবিয়ে খুশি হল।
মানুষ একে অন্যকে ধ্বংস করে আনন্দ পেল।
ঈশ্বর দুবেলা ভাবেনঃ সূর্যটা যদি নিভিয়ে দিই, কেমন হয়?
বাতাস যদি এখুনি ফিরিয়ে নিই, কেমন হয়।
আকাশ যদি চিরতরে অন্ধকারে ঢেকে দিই, কেমন হয়?
ভাবেন। কিন্তু এসব আর করে ওঠা হয়না।
ঈশ্বর বড় দুঃখ পান।

ওড়রঙ্গজেবের হাতে বন্দী  বৃদ্ধ শাহাজাহানের মত তিনি
কেবল হাহুতাশ করেন। তাঁর দীর্ঘশ্বাসে পৃথিবীতে ক্রমেই তাপ বাড়ে।
আমরা যাকে শিক্ষিত ভাষায় বলি
গ্লোবাল ওয়ামিং।।
---------
তর্জনী
- নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী

তর্জনী দেখিয়ে কেন কথা বলো...কখনো বলবে না...
কাকে...তুমি ভয় দেখাও কাকে...
আমি অনায়াসে সব ভেঙে ফেলতে পারি...
মুহূর্তে তছনছ করে দিতে পারি সবকিছু...

বাঁ পায়ের নির্দয় আঘাতে আমি সব
মুছে ফেলতে পারি...
তর্জনী দেখিয়ে কেন কথা বলো...কখনো বলবে না...

ভীষণ চমকিয়ে দিয়ে দশটার এক্সপ্রেস চলে গেল।
পরক্ষণে পৃথিবী নীরব।
তারের উপরে বাজে হাওয়ার শাণিত ভাষা, আর
মিলায় চাকার শব্দ...তর্জনী দেখিয়ে কেন...
                                            তর্জনী দেখিয়ে কেন
যেন-বা হুড়মুড় শব্দে স্বপ্নের বাড়িটা
ভেঙে পড়তে গিয়ে টাল সামলে নিয়ে এখন আবার
অতল নয়নজলে জেগে রয়।।
---------
স্বীকারোক্তি
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

তোমার দিকে যথেষ্ট মন দেওয়া হয়নি---
এতদিন পর এই কথা ভেবে
কাল খুব কান্না পেল আমার
কেউ কোথাও নেই, খানিকটা কেঁদেও নিলাম।

আসলে আমি খুব দুর্বল আর ভিতু
তাই বাঘের চামড়া পরে ঘুরে বেড়াই
গর্জন করি।
তুমি যদি একটু বিশ্বাস করতে আমায়
তুমি যদি উপহাস না করতে কথায় কথায়
আমি ঠিক
বাঘের ছাল ফেলে তোমার দিকে ছুটে আসতাম।
--------
অশোককানন
- আবদুল মান্নান সৈয়দ

জ্যোৎস্না ভূতের মতো দাঁড়িয়ে আছে দরোজায়, সব দরোজায়, আমার চারিদিকে যতগুলি দরোজা আছে সময়ের নীলিমার পাতালের; জ্বলছে গাছসকল সবুজ মশাল; বাস একটি নক্ষত্র, পুলিশ একটি নক্ষত্র, দোকান একটি নক্ষত্র; আর সমস্তের উপর বরফ পড়ছে। ---এরকম দৃশ্যে আহত হয়ে আমি শুয়ে আছি পথের উপর, আমার পাপের দুচোখ চাঁদ ও সূর্যের মতো অন্ধ হয়ে গেল, আর যে-আমার জন্ম হলো তোমাদের করতলে মনোজ সে অশোক সে : জ্যোৎস্না তার ভূত কিন্তু একটি গানের উপর, দরোজা তার কাছে পুলিশ কিন্তু একটি জন্মের উপর, মৃত্যু তার কাছে দোজখ কিন্তু একটি ফুলের উপর।।
-------
চাঁদে- পাওয়া
- আবদুল মান্নান সৈয়দ


হে চাঁদ, তুমি কি ঈশ্বরের ঘড়ি? একটি দুঃখিত পাথর? হার্দ্য হাঁসের রুপালি ডিম? কি মধু-রঙের চামড়া তোমার, যার দীপঙ্কর বিলোড়নে পালটে যেতে পারে আমার দেহ-মন?


হে সোনার চাঁদ, সূর্যকে কোনোদিন ক্ষীণ, ক্ষীণ ছুঁয়ে যেতে পেরেছ? নাকি, খুশিতে একশো টুকরো হয়ে যাও সরোবরে কি নদীতে? একমাত্র তোমার জন্য গিলোটিন তৈরি হয়নি বুঝি? নাকি তুমি সোনার প্রস্তরপাত্র, ধাতুর প্রবালপুরী?


হাতে বানানো রুটির মতো চ্যাপ্টা, রোগা, পাতলা চাঁদ; রেডিয়াম দেয়া চাঁদ; হলুদ সূর্যমুখী, একমাত্র সূর্যমুখী আমার, একমাত্র তুমিই কি অসূর্যস্পশ্যা? কিশোরীর নতুন স্তন নাকি তুমি, অতল থেকে ফোয়ারার মতো উঠে এসেছ, সব সোনালি শিকড়গুলি উপড়ে ফেলে ? ফসফরাসের কুয়ো, মেয়েমানুষের উজ্জ্বল লাল বিদ্যুৎ-ঝরা কুয়ো? যেন বেলুন, বেলুন তুমি; কিন্তু অদৃশ্য শিশুটি সুতো ধরে লুকিয়ে আছে কোথায়? নাকি তুমি হৃদপিণ্ড আমার?


একদিন রাত্রিবেলা স্বপ্নে দেখেছিলাম; নিষ্ঠুর ড্রামের মতো প্রচণ্ড বেজে চলেছে চাঁদ- অবিশ্বাস্য সব হিরের পাহাড়ে প্রতিধ্বনি তুলে, ধনীদের অনির্বচনীয় পুঁজি চোখ তুলে তাকায়- যখন ভীষণ উল্লাসে নাচছে চাঁদ ধাতুর নেপচুনের মতো ফাঁপা সব অহঙ্কারের বুকের উপর ?


চাঁদ, তুমি কি একটা অথই পাড়াগাঁর মেয়ে : দুঃখে-শোকে কুঁজো হয়ে যাওনি, করুন তবু লাবণ্যময়ী, যাকে ভালোবেসে বেঁচে যাবো আমরা সব স্রস্ত ও কামপাণ্ডুর যুবার দল?


হে চাঁদ, তুমি তো হাসতে জানো, জানো করুন মুখে আড়চোখে তাকাতে- জিজ্ঞাসার মতো মোটে নয়, বেদনার মতো, সোনার বেদনার মতো, সূক্ষ্ম সুখের বিরাট বেদনার মতো, - তুমি নিশ্চয় পাড়াগাঁর মেয়ে, যে-পাড়াগাঁয়ে আমি স্বপ্নে ছাড়া কোনোদিন যাইনি!
--------
মমতার চিঠি
মূলঃ হেম বড়ুয়া
অনুবাদঃ রমানাথ ভট্টাচার্য

If you are coming down through the narrows of the river Kiang
Please let me know beforehand,
And I will come out to meet you
            As far as Cho-fu sa.
                                    Ezra Paound

প্রিয়তম,
একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে নিলাম। আজ অনেক দিন পর তোমাকে
চিঠি লিখছি। বাইরের দমকা হাওয়া মোমবাতি নিবিয়ে দিতে
চাইছে। ...যাক গে, জানালাটা বন্ধ করে দিই। ...
সাত বছর আগের কথা তোমার মনে
পড়ে? আমরা যে নতুন জীবন
শুরু করেছিলাম। ...সেই অজানা নেশা আমাকে খুব করে
পেয়ে বসেছিল।
সেদিন ছিল কার্তিকের কুয়াশা ছড়ানো কোমল সকাল।
উঠোন আবৃত ছিল ঝরে-পড়া শেফালি ফুলে। আর সন্ধে বেলা,
তোমাদের বাড়িতে প্রথম আসার দিনে, আকাশের
মেঘের মোহনা থেকে হলদে রঙের চাঁদ নৌকা হ’য়ে আমাকে যে
ডেকেছিল তারার দেশে। ...
আমার পরনে লাল শাড়ি দেখে তুমি
কেন অমন এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছিলে?
আমার কীরকম লেগেছিল, জানো? তুমি যেন কোন দূর
বিদেশের স্বপ্নাতুর আলোর মানুষ। আর আমি? আমি যেন
ঝরে-পড়া এক শেফালি ফুল।
সেদিন মনের সাগরে ভেঙে-পড়া ঢেউ আর
জেগে ওঠা ঢেউ অসংখ্য কম্পন তুলেছিল। তোমার বুঝি
ওসব কথা মনে নেই?
বাবা যে চিঠিতে লিখেছিলেনঃ “মা, তুই নতুন
বাড়িতে হেসে খেলে থাকিস।”
ওসব সাত বছর আগের কথা। আমার যে সব কিছুই
পুরানের গল্প মনে হয়। ... জৈষ্ঠ মাসে বাবার
বাৎসরিক হয়ে গেল। বাবুল এখন বড় হয়েছে।
ওর উপর পাটীতে ডালিমদানার মতো ছোট ছোট
দাঁত উঠেছে। ও আমাকে ছেড়ে একটুও
থাকতে পারে না। ( এক এক সময় ওমন রাগ হয়,
তুমি না নেই, তাই।)

ও আমার সাদা থানপরা বেশ এরকম বিস্মিত হয়ে
দেখে কেন? জন্ম থেকেই এই বেশ ওর
পরিচিত, --সে জন্যই কি? শোনো , বাবুল এখন বড়
হয়েছে? ( আরেকটু বড় হলে ইস্কুলে
দেবো। ও ইস্কুলে চলে গেলে
আমার বুকটা খাঁ খাঁ করবে, প্রিয়!)
আর কি লিখবো। বিশেষ কিছু বলার নেই। প্রতিশ্রুতি দাও,
তুমি যেদিন ফিরে আসবে, আমাকে আগে থেকেই জানিয়ে দেবে।
আমি ভোগদৈ নদী-দিয়ে ভেসে গিয়ে লুইতের বুক থেকে তোমাকে
ডাকবো,--তুমি যেদিন
ফিরে আসবে। আমাকে আগের থেকে জানাতে ভুলো না।
ভালোবাসা নিও। ইতি
           তোমার মমতা

পুনঃ এবার মাঘ বিহুর ‘মেজি’র আগুন খুব
লাল হয়ে জ্বলেছিল। ...আমাদের বুড়িমার নতুন ছাগলী
দুটি বাচ্চা দিয়েছে। একটি নিখুঁত সাদা।
অন্যটি চিতল।
--------
কিসের লাইগে গরব করিস
- মোহিনীমোহন গঙ্গোপাধ্যায়

লাজ নাই তুর্ লিবাহুড়া ইবার থাইকে সামল্যে চলিস
আঁনধার রাইতে খিড়কি খুইলে কার সঙে তুই কথা বলিস?
মু পুড়ো নাই ঝলক দিছে আঙরা হল্য শরীর খানা
অমন মরদ কাজ কি হামার নাই জুটে যার টুকচা টেনা!

বেওরা খাইটে বাগাল মুনিশ পাছ্যে লগদ হাতে হাতে
তুর কি মুরাদ তুই হামাকে পুইষতে লারিস পেটের ভাতে।
ভাইবে ভাইবে সুয়াং গেল ঘুম আসে নাই রাতের বেলা
লাচনি লাঁচাই করিস কুথায় হুচুক ট্যাঁড়ে গাজন মেলা।
গপন পিরিত সব জান্যেছি সব শুইনেছি লকের ঠেনে
মদ গিলে তুই মাতাল ইখন হামার পাশে আসিস কেনে?

লাচনি লাচাই ঝুমুর গাঁয়্যে করগা যাঁয়্যে ওাড় মাতালি
কিসের লাইগে গরব করিস? জীবন ভইরে তুই সাঁতালি।
লষ্ট পুরুষ ই সমাজের তুর থাইকে তেই রই সতরে
কইরব্য লড়াই বাঁইচব যদিন খাইটে খাব গা-গতরে।
---------
যুদ্ধক্ষেত্রে জাইগ্যা থাকুম
(দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পঞ্চাশ বছর পূর্তি উপলক্ষে)
- জয়ন্তী চট্টোপাধ্যায়

মহাজনেরা কইছে, যুদ্ধ শ্যাষ হইছে।
পঞ্চাশ বছর ধইরা পৃথিবী সুখে আছে,
মানুষ শান্তিতে আছে, যুদ্ধ নাই।
হিটলার নামের দানবটা নাকি খতম হইছে,
ওই খুনি লোকটার আরজন্ম হইব না
কোনো মানষের দ্যাশে।

হ্যাঁগো ওসমানের মা, বিশ্বযুদ্ধ দ্যাখছো তুমি?
বোমার আগুন দ্যাখছো?
দ্যাহো নাই আম্মাজান।
তহোন তোমরা নিতান্তই শিশু।
পঞ্চাশ বছর আগে দ্যাশ পুড়ছে,
পৃথিবী পুড়ছে, মানুষ পুড়ছেরে...

যুদ্ধ কি আজো শ্যাষ হইছে ওসমানের মা?
পাঁচ বছর যুদ্ধ কইরা সৈন্যরা মইরা গ্যাছে,
পঙ্গু হইছে,  পাগল হইছে কতো
আর আমরা সারাজীবন যুদ্ধ কইরতে কইরতে
চুল পাকাইলাম, শরীর বাঁকাইলাম,
তবু যুদ্ধ শ্যাষ হইলো না।
শিশুরা আইজকাল যুদ্ধক্ষেত্রে জন্মায়রে!
জন্মেই যুদ্ধ-ভাতের লাইগ্যা, কাপড়ে লাইগ্যা,
মাথায় একখান্ ছাউনির লাইগ্যা।
বিশ্বযুদ্ধ যাদের মারছে তাদের তো
একেবারে মারছেলে!
সত্য-মিথ্যার যুদ্ধে, আলো-আঁধারীর যুদ্ধে
তিল তিল কইরা মরেনাই তো কেউ।

আমাগো যুদ্ধ শ্যাষ হইবার পারে নারে!
সারা পৃথিবীর খবর আমাগো জানা নাই বটে
তবু জন্মভূমির খবরডা তো রাহি...
জাতির লড়াই, খ্যাতির লড়াই
বড়ো চোরাপথে আসে রে,
লোক ঠকাবার লড়াই আরো ভয়ংকর।

আমাগো সর্বনাশের এখন শব্দ নাই ওসমানের মা!
নিঃশব্দে শিশুপাচার, নিঃশব্দে নারীপাচার,
চুপিচুপি পণ দেওয়া, বধূহত্যার খেলা;
মাঝে মাঝে রক্তারক্তি এ-জাতে ও-জাতে।
মাটির সঙ্গে যুদ্ধ করে চাষী, হাইরা পথ রায়,
যন্তরের সঙ্গে যুদ্ধ করে শ্রমিক, ছাঁটাই চলে,
লাশ গায়েব হইয়া যায়রে...

কোলের সন্তান বেইচ্যা বুকের দুধের সঙ্গে
যুদ্ধ করে মা।
গলায় গামছা দিয়া ভিক্ মাঙে
কইন্যার বাপ্।
বেকার পোলার দল নাম লেখার ডাকাতির দলে,
জাইনা-শুইন্যা নাম লেখায় ডাকাতির দলে,
জাইনা-শুইন্যা বিষ খায়। গতর বেইচ্যা খায়
নিষিদ্ধ পৃথিবীর জায়া- জননীরা।
ডাইনী ছাপ্পা মাইরা এ দ্যাশের মানষেরা
আজো করে খুন। দুথ খায় গনেশ ঠাউর।
বইন্যে খরা তো আছেই। আর আছে সরকারী ধাপ্পা বেজায়...
প্রাণ যায়, প্রচারের ঘায়;
খানেখারাপের বেটা মোটাসোটা ভোটবাবু যতো
জীবনে বিষায়ে দ্যায়; যুদ্ধ আরো তরান্বিত করে।
প্রতিদিন যুদ্ধক্ষেত্র আমাগো জীবন।

যুদ্ধ আজো শ্যাষ হয় নাই ওসমানের মা -
কুঁড়ের সঙ্গে ঝড়ের যুদ্ধ; হাসির সঙ্গে কান্নার;
বিশ্বাসের সম্তে অবিশ্বাসের যুদ্ধ ;
স্বপ্নের সঙ্গে দুঃস্বপ্নের;
আর যুদ্ধ ভালোবাসার সঙ্গে ভাল না বাসার,
তবে সগগোলের চাইতে বড় যুদ্ধক্ষেত্র আমাগো মন...
নিজের সঙ্গে নিজের যুদ্ধ
বড়ো কষ্টের ওসমানের মা!
বুকের মাঝখানডায় ক্ষতবিক্ষত হইয়া যায়, রক্ত ঝরে,
কেউ জানবারও পায় না।

আমাগো যুদ্ধ চলে রাতদিন... দিনরাত...
যুদ্ধক্ষেত্রে জন্ম হইছে, যুদ্ধক্ষেত্রে জাইগ্যা আছি
যুদ্ধক্ষেত্রে জাইগ্যা থাকুম, জাইগ্যা থাকুমরে...
--------
যখন রাত্তির নাইমা আসে সুবর্ণনগরে - ১৫
- শামীম রেজা

যখন রাত্তির নাইমা আসে জংলাপাখির ঝরা পালকের লোমকূপে, রুক্ষ বনের খেয়ালী একটা বৃক্ষ হাঁইটা যায় দূর চন্দ্রালোকে, সেখানে স্নান শ্যাষে বৃক্ষ আর জংলাপাখি ঘর বান্দে, ফেরে না ক্ষয়িত বনের রুদ্ধ আঁধারে। চিরতার মতো স্বাদ যে রাতের, যেখানে চিৎ হয়া পুইড়া যাচ্ছে রাতের উনুন নিরীহ পানির আগুনে, সেখানে পাখি ও বৃক্ষের নম্রসোঁদা দীর্ঘশ্বাস ঘুইরা ঘুইরা পাক খায় রাত্তির দেয়ালে; রাতের আন্দারমুখে স্বর্গবাড়ির রক্ষক হাড়ঝিরঝির প্রাণে কাঁদে, এসব দেইখা বৃক্ষ আর পক্ষিকুল চইলা যেতে থাকে, কাঁচপোকার আবেশে ঘুমন্ত বন ঘুমায় গভীর ঘুমে, এই ফাঁকে বনের পাশের চন্দনা নদীটাও নিলামে উঠলে অভিজাত তালিকার চন্দনকাঠ নদীটার সঙ্গে চইলা যায়, শাল-সেগুন আর ফলমূলেরা আগেই গিয়াছে একে-একে, ঈশ্বরে বিশ্বাস নাই তবু বাতাসকে ঈশ্বরের ভ্রাতা ভেবে, এই ঈশ্বরীকেও ধার করে বাঁচতে হবে জাইনা, বনের দোচোয়ানি ঘোরে, অর্ধমৃত প্রাণিকুল বাদে অন্যরা সবাই চইলা যেতে থাকে অনিচ্ছায়, তৃতীয় আসমানের খোঁজে; আর আমি ঘুমহীন প্রাণী, উৎকণ্ঠার স্নানে পীড়িত হয়া বইসা আছি, পক্ষাঘাতগ্রস্ত বালিকার দৃশ্যহীন চাহনীর মাঝে।

১৯ অগ্রহায়ণ ১৪১১
০৩ ডিসেম্বর ২০০৪
------
এক করতল ছাড়া
- শক্তিপদ ব্রহ্মচারী

এক করতল ছাড়া আর কোনো ভিক্ষাপাত্র নেই
দুহাত উপুড় করে যা দেবে সমস্ত শুষে খাব
কাটা তরমুজের ফালি, বাম জঙ্ঘা, ব্যাঙের আধুলি
তোমার সমস্ত দান রাতভর বৃষ্টির মতন
যা দেবে, যখন দেবে, যতখানি সম্ভাব্য মাটির
রুক্ষতাকে ছেনেছুনে তাতে কিছু করুণা মেশাব।

চন্দন-সুবাস-লিপ্ত অন্ধকারে একাকী দাঁড়িয়ে
কার প্রতীক্ষায় আছি, গৈরিক পথের প্রান্তে কার
বাজে নূপুরের ধ্বনি, চিবুকে লাস্যের ঢেউ জাগে
একাকী দাঁড়িয়ে অন্ধ, এই ক্ষিপ্ত জ্যোৎস্নার প্লাবনে।

এই করতল ছাড়া যা-চাও সমস্ত দিতে পারি
আকাশ-উপুড় করা কাঙাল স্নেহের মতো ধন
সব, সব দিতে পারি, যা চেয়েছ তারও চেয়ে বেশি
দানের অধিক দান, বিনীত রাত্রির জপমালা
দূরের নদীর দিকে যেতে যেতে যদি কেউ ডাকে
শব্দ পাহারায় রেখে ঘাড় ভেঙে রক্ত শুষে খাব।
-------
মাধবী এসেই বলে: ‘যাই’

-- রফিক আজাদ

খণ্ডিত ব্রিজের মতো নত মুখে তোমার প্রতিই
নীরবে দাঁড়িয়ে আছি: আমার অন্ধতা ছাড়া আর
কিছুই পারি নি দিতে ভীষণ তোমার প্রয়োজনে;
উপেক্ষা করো না তবু, রানী—তোমার অনুপস্থিতি
করুণ বেদনাময়—বড় বেশি মারাত্মক বাজে
বুকের ভিতরে কী যে ক্রন্দনের মত্ত কলরোলে।

দালি-র দুঃস্বপ্নে তুমি, আর্তো-র উন্মাদ মনোভূমে,
সবুজ মৎস্যের মতো অবচেতনের অবতলে
রঙিন শ্যাওলা-ঝাড়ে সুজাতার মতো সরলতা।

মুহূর্তের নীলিমায় তরুণ ধ্যানীর মনে হয়
তুমি হও ছলাকলাহীন, রূপশালী ধান-ভানা
জীবনানন্দের মনোবাঙলার এক শাদাসিধে
নেহাৎ রূপসী। তবু কেন প্রাণপাত পরিশ্রমে
তোমাকে যায় না পাওয়া?—তুমি নেই মস্তিষ্কে, হৃদয়ে।

কখনো জ্যুরিখে তুমি, কিয়োটোতে, বাম-তীরে,
গ্রীনিচ পল্লীতে কিংবা রোমে পড়ে থাকো; কখনোবা
যোগ দাও পোর্ট-সৈয়দের নোংরা বেলাল্লাপনায়।

তোমার স্বভাব নয় স্থিরতায়—অস্থির, অধীর
তুমি আছ অনুভবে, তুমি আছ শিশুর স্বভাবে।

ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে পরিশ্রমে গড়ে-ওঠা রম্য-
অট্টালিকা, স্বভাবের ডালপালা—বিশ্ব-চরাচর।
যেনবা কোথাও গর্জে ওঠে ভয়াবহ অগ্নিগিরি
সোনালি লাভার স্রোতে ভরে দিল গ্রাম ও নগর।
যেন গর্ভগৃহ থেকে নেমে ডিনামাইটের মতো
অসম্ভব তোলপাড় তুলে দিল একটি শৈশব।

অবিশ্বাস্য উষ্ণতায়, চাপে দ্রুত গলে যেতে থাকে
ঘড়ির ডায়াল আর তোমার নিটোল অবয়ব।

তুমি সেই লোকশ্রুত পুরাতন অবাস্তব পাখি,
সোনালি নিবিড় ডানা ঝাপটালে ঝরে পড়ে যার
চতুর্দিকে আনন্দ, টাকার থলি, ভীষণ সৌরভ!

রোমশ বালুকা-বেলা খেলা করে রৌদ্রদগ্ধ তটে
অস্তিত্বের দূরতম দ্বীপে এই দুঃসহ নির্জনে
কেবল তোমার জন্যে বসে আছি উন্মুখ আগ্রহে—

সুন্দর সাম্পানে চড়ে মাধবী এসেই বলে—‘যাই’।
-------
নক্ষত্র
- মণিশংকর বিশ্বাস

যাকে এতক্ষণ গুপ্ত-ঘাতক মনে হ'য়েছিল
কাহিনির শেষে বোঝা যায় সে আসলে
ভালো মানুষের পো

অল্প অল্প বৃষ্টি হচ্ছে, সরলাবালা বালিকা বিদ্যালয়ের মতো।

ভিজে আকাশের নীচে খুব আস্তে
ফুটে উঠছে এক দু:খী রাজপুত্র, একা, অবুঝ...
--------
শেফালী
- মণিশংকর বিশ্বাস

নক্ষত্র জাহাজে এসেছিলে, নীল...গম্ভীর...উপত্যকার
যে সব ফুলের কথা লিখি
                তারা সব কুয়াশার সন্তান, মৃত।
এখন তোমার মুখ ঝাপসা কান্নার মতো...
তবু ভাল লাগে সব---ফেরিঘাট---
সুখী বাঁধাকপি বোঝাই ট্রাক---মিনারের নীচে পায়রার ঝাঁক---

তোমাকে যে অবিস্মরণীয় করেছে, সে এই মন।
--------
~আমার মেয়েরা~
~শঙ্খ ঘোষ

লিখে যাই জলের অক্ষরে
আমার মেয়েরা আজও অবশ ভিক্ষার হাতে পড়ে আছে সব ঘরে ঘরে।
--------
নির্বাসন
- অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

আমি যত গ্রাম দেখি
মনে হয়
মায়ের শৈশব।
আমি যত গ্রামে যত মুক্তক পাহাড়শ্রেণী দেখি
মনে হয়
প্রিয়ার শৈশব।
পাহাড়ের হৃদয়ে যতো নীলচে হলুদ ঝর্ণা দেখি
মনে হয়
দেশগাঁয়ে ছিল কিন্তু ছেড়ে আসা প্রতিটি মানুষ।
ঝর্ণার পাশেই নদী, নদীর শিয়রে
বাঁশের সাঁকোর অভিমান
যেই দেখি, মনে হয়
নোয়াখালী, শীর্ণ সেতু, আর সে-নাছোড় ভগবান
-------
নব্বই দশক
- মণিশংকর বিশ্বাস

যেন হাওয়া এসে নিজ হাতে ছড়ায় শুকনো পাতা
আর ছিঁড়ে ফেলে মেঘের প্রাসাদ, খেলার নিয়ম ।
‘আমার পরাণ কান্দে তোর লাগি’ — এই মতো ফুটে আছে
অজস্র শিমুল; আমি এই নিচু বনগ্রামে ঢুকে পড়ে
দু’হাতে সরাই মহুয়ার ফুল, আর এইভাবে খোলা জানলার ’পরে
দেখা যায় সোনায় সোনায় মোড়া আকাশী গম্বুজ;
একটি সরল অংক—যার একদিকে জ্বলে ওঠে থোকা থোকা অচিন্ত্য পলাশ
আর অন্যদিকে হলুদ পাতার স্তূপে রোগা এক ভুঁইসাপ ।
তার বাউলে চলন ডাক দেয় আরো দূর কোনো অরণ্যের দিকে
যেন বলে, ‘মন ছুটি দাও, ছুটি দাও এইবার...’
সমস্ত গ্রীষ্মের ছুটি জুড়ে কাপাসবালক ওড়ে, না বুঝেই
ওড়ে বহুদূর, সবার অলক্ষ্যে
অথচ তোমার স্কুল আজো খোলা
যেইখানে কৃষ্ণচূড়ার নখে ছিঁড়ে যায় নীলিমার নীল
আর বয়ে যায় বেলা

যেন বয়ে যায় বেলা ...
--------
দুশ্চিন্তা
- জয়দেব বসু

আমি কি তরুণ কবি? রোহিতাশ্ব, মতামত দাও। উদাসীন হাসো কেন? একথা শুনেছি বটে, তুমি কোনো কবিফবি পাত্তা দাও না। শিল্পে তোমার হায়, দিলচসপি নেই। কী আর করার আছে, সকলে পাঠক নয়, কেউ কেউ আরো বেশি --- কবিতাবিরোধী। তবু এই অভিধার মীমাংসা আশু প্রয়োজন। তরুণ কবিরা শুনি অনেকেই অতিবিপ্লবী। কেউ কেউ দাড়ি রাখে। কেউ যায় খালাসিটোলায়। বাকি সব করে রব এখানে সেখানে। তবু তারা নিয়মিত জ্যান্ত কবিতা লিখে থাকে। রোহিতাশ্ব, লাল ঘোড়া, আমাদের অতিবামে অ্যালার্জি রয়েছে। অন্য সব রোগভোগও সম্প্রতি কাটিয়ে উঠেছি। এবং কবিতা, দেখো, লিখতে পারি না। আমার ব্যাপার তবে বাদ দাও। এসো, ঐ কবিদের ছুঁয়ে দেখি অনুভূতি দেশ। এখানেও সমস্যা ঘনাল। কে কবি কবে কে মরে? যে জন ডিভোর্স দেয় শবদে-শবদে সেও কেন কবি নয়? যদি সেই দম্পতি হয়ে থাকে পুরাতন---সরস্বতীহীন?

রাত ১১.৫০ মিনিট
২৫/৫/৮৮
-------
মৃত্যু
- হাবীবুল্লাহ সিরাজী

মৃত্যু শুয়ে আছে পাশে। হেই মৃত্যু, চিনি না তোমাকে

যে গভীর বিশ্রামের মধ্যে খেলিতেছি মায়া-মৃত্যু
আমি সেই চিহ্ন খুঁজি, তার কোনো শরীর মেলে না
তবে কি আমার মৃত্যু আমারই দৈর্ঘ্য-প্রস্থ মিলে
সমান সমান ছায়া? অস্তিত্বের হ্রস্ব অলংকার
হে সংসার! রুদ্ধদ্বার মৃত্যুময় নগ্ন অভিসার

বিনাশের সহোদর বঞ্চনার কড়িকাঠে দড়
সান্ত্বনা যে হ্রদে লুপ্ত সেই বুঝি স্নানে মজিয়াছে
গুপ্তলীলা ভেদ-ভোগ যতো মানি ততো শোকসভা
মৃত্যুর মালিক যদি মৃতদের বিপক্ষে দাঁড়ায়
কোনো বস্তু কোনো প্রাণ পুনর্বার ভ্রমে না ভুবন

মৃত্যুর সম্মুখে শোয়া এই আমি ঠিক তাকে চিনি
------
ভালোবাসা
- দেবব্রত  সিংহ

'লাল শালুকের ফুল ফোটে আঁধার রাতে
যার সঙ্গে যার মনের মেল সে মরিলে কি টুটে
বঁধু এত রাত কীসে
ও বঁধু এত রাত কীসে।'

শারুল পরবের রাতে
ফুল ফুটেছে ডুংরিতে বাঘমুণ্ডীর ডুংরিতে
ই শারুল পরবের রাতে
কী যে হল্য দেখা হতে
তোর সঙ্গে লো
কী যে হল্য দেখা হতে,
ভালোই ছিলম
আমি বাগাল ছেল্যা
ছিলম ভালোই
শুদু অ্যাক মেঘ থমথম বাদলবেলায়
যখেন ফুটল কদম কদমতলায়
তখেন বাজানছিলম বাঁশি
মোষের পিঠে পাহাড়কোলে জোড়ের ধারে বাজানছিলম বাঁশি।

তাবাদে কার কথাতে কী যে হলি
রাগ করে তুই পালাই গেলি
শুদু রাগ করে লয়
গরব দেখাই পালাইগেলি,
বললি, তোর সঙ্গে আর কথা লয়
তোর সঙ্গে আর দেখা লয়
তুই অ্যাকটা বাগাল ছেল্যা
পাহাড়কোলে নদীর ধারে
কাড়ার পিঠে মোষের পিঠে ঘুরে বুলিস
বাঁশি ফুঁকিস,
তোর কী আছে
তোর কী আছে মুরাদ?
আমি-
আমি আর কী বলি
আমি ত জানি আছে
ভালবাসার মুরাদ আছে
সে তো দেখেনদারি জিনিস লয়
তবু তুই নাই শুনলি
বললি, দেখা আছে
বাগাল ছেল্যার মুরাদ কত দেখা আছে,
আমি বললম
তোর অত কীসের কথা বঠে
অত কীসের কথা
তুই যাবি যদি চল্যে যা
যিখানে যাবি চল্যে যা
ই পাহাড় ছাড়্যে লদী ছাড়ে
আমোদ রাঙামাটির গাঁ ছাড়্যে
যিখানে যাবি চল্যে যা।

তাবাদে দিন গড়াতে মাস গড়াতে
ঘুরতে ঘুরতে শারুল পরব,
বেশ ত ছিলি
তবু থাকতে কেনে নাই পারলি
অমন ঘরকন্না ফেল্যে দিয়ে
অমন মরদ সতীন ছাড়্যে দিয়ে
কীসের টানে চল্যে আলি
ই শারুল পরবের রাতে
ই মাদল বাজানো জ্যোস্টা রাতে
ই বাঘমুন্ডীর ডুংরিতে
তুই কীসের টানে চল্যে আলি
কুঁড়চি ফুলের মালা গাঁথে
তুই কার লাগে লো ঘুরে আলি
তুই আবার ক্যানে ঘুরে আলি।
------
হেরে গিয়ে খুশি
- অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত

এই সিন্ধুমরালের সঙ্গে আর
পেরে-ওঠা সম্ভব হবে না
হাল ছেড়ে বসে থাকি, পাখি তবু
আমার ভুবনখানি কুরে-কুরে খায়

এবং আমার পরমায়ু

আমি হেরে ভূত জেনে তান্ত্রিক আনন্দে একাকার
বিদ্ধ করে জলের জরায়ু!
-------
স্বাতীতারা
- জীবনানন্দ দাশ

স্বাতীতারা, কবে তোমায় দেখেছিলাম কলকাতাতে আমি
দশ-পনেরো বছর আগে;---সময় তখন তোমার চুলে কালো
মেঘের মতন লুকিয়ে থেকে বিদ্যুৎ জ্বালাল,
তোমার নিশিত নারীমুখের;---জানোতো অন্তর্যামী।
তোমার মুখ : চারিদিকে অন্ধকারে জলের কোলাহল।
কোথাও কোনো বেলাভূমের নিয়ন্তা নেই---গভীর বাতাসে
তবুও সব রণক্লান্ত অবসন্ন নাবিক ফিরে আসে।
তারা যুবা, তারা মৃত; মৃত্যু অনেক পরিশ্রমের ফল।
সময় কোথাও নিবারিত হয় না, তবু, তোমার মুখের পথে
আজও তাকে থামিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছো, নারি---
হয়তো ভোরে আমরা সবাই মানুষ ছিলাম, তারই
নিদর্শনের সূর্যবলয় আজকের এই অন্ধ জগতে।
চারিদিকে অলীক সাগর---জ্যাসন ওডিসিয়ুস ফিনিশিয়
সার্থবাহের অধীর আলো---ধর্মাশোকের নিজের তো নয়, আপতিত কাল
আমরা আজও বহন করে, সকল কঠিন সমুদ্রে প্রবাল
লুটে তোমার চোখের বিষাদ ভর্ৎসনা...প্রেম নিভিয়ে দিলাম প্রিয়।

আনন্দবাজার পত্রিকা। শারদীয় ১৩৫৬
------
মন ভাঙার খবর
- বেণু দত্তরায়

ইস্কুলে যখন পড়ি
তার পক্ষেই ছিল
আদ্দিকালের
ইদ্রাকপুর কোর্টের মস্ত বাড়িটা
যেন ভৌতিক জাহাজ

কেউ বলতেন, ওই দুর্গটার
চুড়োয় দাঁড়িয়ে
চাঁদ রায় প্রতাপ রায় নাকি
কার্ভালোর নৌযুদ্ধ দেখতেন
কেউ বলতেন, যাঃ কেমন করে হবে
ওটা জাহাঙ্গীরের তৈরি
তার তলায়-তলায়
সুড়ং গেছে ঢাকায়

আমাদের বালককালের কথা -
(সত্যিই কি একটা বালককাল ছিল?)
দেশভাগের পর শুনেছি
এখন ওখানে এস্-ডু সাহেবের
দরবার
মস্ত সিঁড়ি ভেঙে উঠতে হয়

ইন্দ্রাকপুর কোর্টের কথা
মনে থাকবার নয়
কিন্তু দেশভাগের আগে-আগে
বন্ধু জয়নালের বোন শাহানা
ওই দুর্গের পাথুরে দেয়ালের
ধার থেকে
কয়েকটা সূর্যমুখী ফুলের গোছা ছিঁড়ে
আমাকে উপহার দিয়েছিল

কী যে পাগলাটে মেয়েটি ছিল
সেই বয়সে শাড়ি ধরেছিল
হাত-ভরা নানারঙের চুড়ি
আর কাঁচের টিপ থাকত কপালে
দাদার বন্ধু আমাকে
শুধু-শুধুই সে তুই বলত -

তোদের হিঁদুদের তো আবার
এ-ফুল পুজোয় লাগে না
তোকে দিলাম পুজো করতে নয়
পড়ার টেবিলে রেখে দিবি

ও-বাংলা থেকে
সাততাড়াতাড়ি চলে আসতে গিয়ে
শাহানার কথা মনেই হয়নি

সূর্যমুখী ফুল দেখলে
এখনো বুকের মধ্যে ব্যথা হয়

দেশ তো কতই ভাঙে -
মন-ভাঙাভাঙির
খবর কেউ রাখে?
---------
রক্তকরবী
- জয়দেব বসু

তোমার কথা শুনেছি কতবার
কত যে লোক বলে তোমার নাম,
আমি ছিলাম নির্বাপিত দেশে
আমি কি আর তোমায় চিনতাম!

পুরাণে বলে, লোককথায় বলে---
আসবে তুমি, কখনো, কোনোদিন
মুছিয়ে দেবে গেরস্থালি চোখ,
অনামিকায় ফোটাবে আশ্বিন।

পেরিয়ে গেছি মেঝেনদের দেশ,
পেরিয়ে গেছি কুষ্ঠে খশা গ্রাম,
জানো কি তুমি, অনেকে এখানেও
ফিসফিসিয়ে বলে তোমার নাম!

পেরিয়ে গেছি দস্যুদের তাঁবু,
পেরিয়ে গেছি ভগ্ন বন্দর
সেখানে রোজ বালিতে দোহা লেখে
বিলাপরত দু'জন অন্ধ।

তাদের থেকে তোমার নাম করে
টুকে নিয়েছি লুপ্ত প্রার্থনা,
না-হলে ঐ হতভাগ্যদের
মনোবিকার কখনো সারত না।

পেরিয়ে গেছি নিশানরাঙা পথ,
কোথায় আছো, কীভাবে আছো তুমি?
পায়ের নিচে দগ্ধ ধানখেত
পায়ের নিচে শীতল মালভূমি।

চেরাগ হাতে নানান দেশে যারা
ঘুরে বেড়ায়, সাত-সুলুক রাখে,
তারা বলেছে, 'আমরা কেউ নই,
সেই মেয়েরা চিনতে পারে তাঁকে।'

যাদের হাত ফ্যাকাশে হয় ক্ষারে,
যাদের হাত চুলোতে স্যাঁকা হয়,
যাদের খুব কথা বলার সাধ
কথা বলতে যাদের আরো ভয়...

তাদের সাথে যখন দেখা হল
তখন ভীতু দৃষ্টি অনুসারে
মানচিত্রে পথ বসিয়ে আমি
একছুট্টে, তেরো-নদীর পারে---

মস্ত এক পাঁচিল পার হয়ে
পরের পর দরজা ঠেলে-ঠেলে
খুঁজে পেলাম---তোমাকে, নন্দিনী,
নিখোঁজ এই পাগলিদের সেলে।

রাত ১২.২১ মিনিট
২০/৮/৯৪
--------
নিসর্গ
- তারাপদ রায়

শ্রীমতি নিসর্গসুন্দরী দেবীর সঙ্গে শেষবার দেখা হলো
রাণাঘাট শহর পেরিয়ে চূর্ণী-নদীর উত্তর পারে।

তখন বিকেল বেলা
একটু একটু বৃষ্টি হচ্ছে, পশ্চিমে কালো মেঘের ফাঁক দিয়ে
সার্চলাইটের মতো দেখা যাচ্ছে লম্বা-লম্বি রোদের রেখা।
একটা রামধনু পূর্ণবৃত্ত হবে কি অর্ধবৃত্ত হবে
এ বিষয়ে ঠাণ্ডা মাথায় মনস্থির করার জন্যে
তিন মিনিট সময় নিলো,
একটু পরে ম্যাজিক

দমকা হাওয়ায় মেঘের তাঁবু ছড়িয়ে ছিটকিয়ে পড়লো
কিন্তু তার নীচে বিশ্রামরত রামধনুর রা পর্যন্ত পাওয়া গেল না।

তখন ধানখেতের মধ্য থেকে জোর বৃষ্টি
সারা শরীর ভেজা, মাথার চুল দিয়ে জল পড়ছে।

আলের ওপর দিয়ে সোজাসুজি হেঁটে
ন্যাশনাল হাইওয়েতে উঠে এলেন স্বয়ং নিসর্গসুন্দরী দেবী।

অনেক দিন পরে দেখা, তবু চিনতে পারলাম,
হাত তুলে নমস্কার করলাম,
শ্রীমতী নিসর্গসুন্দরী মৃদু হেসে বললেন,
'এ বছর আর রামধনু হবে না, আবার সামনের বছর,'
বলে হাসতে হাসতে বৃষ্টিতে মিলিয়ে গেলেন।
--------
তোমার কাছেই
______________সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়

সকাল নয়, তবু আমার
প্রথম দেখার ছটফটানি
দুপুর নয়, তবু আমার
দুপুরবেলার প্রিয় তামাশা
ছিল না নদী, তবুও নদী
পেরিয়ে আসি তোমার কাছে
তুমি ছিলে না তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা!
শিরীষ গাছে রোদ লেগেছে
শিরীষ কোথায়, মরুভূমি!
বিকেল নয়, তবু আমার
বিকেলবেলর ক্ষুৎপিপাসা
চিঠির খামে গন্ধ বকুল
তৃষ্ণা ছোটে বিদেশ পানে
তুমি ছিলে না তবুও যেন
তোমার কাছেই বেড়াতে আসা!
---------
ব্যাধি
- মিতুল দত্ত

ধর্মের ষাঁড়ের মতো খেপে উঠলে
যত বলি, এসব বুজরুকি দিয়ে ভাত মাখো,
অর্থহীন খোঁপা বাঁধো, খুলে রাখো মাংসাসী স্বভাব
সামনেরও পেছন আছে, পেছনেরও সামনে আছে চোখ
অস্বীকার করবে বলে কী যে খোঁজো নিজেই জানো না
পালকের নিচে যাকে পাখি ভাবো, সে তোমার মায়া
মায়া এক ব্যাধি, তাকে ঠোঙা ভেবে ফাটিয়ে ফেলেছি
গতকাল, নাকি গতজন্মে আজ মনেই পড়ে না
ছেনালি শিখিয়ে গেছে সত্যবতী নাকি সত্যভামা
রথের চাকার মতো কিছু একটা ঘুরে যায় নাব্যতার দিকে
কারা বলে তুমিই মহান আর গণতন্ত্র বলে কিছু নেই
তোমাকে খেপিয়ে দিয়ে হাল্লাবোল করে ওরা কারা
--------
অনুগ্রহ দেখালে বড় বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠো তুমি
- সুহিতা সুলতানা

ক্রমশ ঢেকে যাচ্ছে স্মৃতির আকাশ, চিমনির ধোঁয়ার সাথে মিশে যাচ্ছে পথের দৃশ্যাবলী!
এই পথ কি কখনো আমাদের ছিল? দূরত্বের ওপারে ভেঙে ভেঙে পড়ে সম্পর্কের অমল
বিন্যাস। যখন আমার কোনো কিছুই ভালো লাগছিল না ঠিক তখন তোমার টেলিফোন
শোনাতে শুরু করলে হৃদরোগের গল্প! আশ্চর্য চৈত্রর রাতের অভিসার দূতাবাসের প্রশস্ত পথ
ধরে তোমাকে আবার ফিরিয়ে নিয়ে এলো নিদ্রাহীন নগরীর উদাসীন উপত্যকায়, বুনো
হাওয়ায় ভাসে ক্যানভাসের অভিসম্পাত! অনুগ্রহ দেখালে বড় বেশি স্বেচ্ছাচারী হয়ে ওঠো
তুমি! স্বদেশের উঠোনে তোমার ছায়ার পাশে অদ্ভুত নীরবতা শুয়ে থাকে, তোমার অপেক্ষার
ওপর দুলে ওঠে স্বপ্ন, শৈশব! চেয়ে দেখি জীবনের পক্ষে অলক্ষুণে ঘোলা চোখ ধুলোর
অনুনয় আর অরুপের রক্ষক হয়ে অর্ধচাঁদের ভঙ্গিমায় নগ্নতা হনন করে নিঃশব্দে!
---------
জ্যোৎস্নায় কারা রাইফেল কাঁধে
- নবারুণ ভট্টাচার্য

চন্দ্রালোকেতে  লাফ দিল কোন তিমি
কারা বসে বসে লোভী আঁকিবুঁকি কাটছে
অন্তর্বাস খুলে ফেলে কোন মিমি
জ্যোৎস্নায় কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে

হাইরাইজের ছায়ায় হলুদ চারা
ওপরেতে কারা মুনাফা হিসেব আঁটছে
এখনই  howona না প্রেমেতে আত্মহারা
অরণ্যে কারা রাইফেল নিয়ে হাঁটছে

কীসের কবি সে যে না লেখে দাবানল
ভিকিরিবাচ্চা ফাঁকা পাতাগুলো চাটছে
তেষ্টায় হাত তুলে আছে টিপকল
মাঝরাতে কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে

সাহিত্য বলে লেখা হয় যত ভাট
মিডিয়াবনিক মগজের গায়ে সাঁটছে
চেতনার ঘুড়ি কেটে গিয়ে খায় লাট
তখন ও কারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে

শব্দতে বুঝি প্রাণ পায় কবিতারা
কবি কি তাহলে শব্দই শুধু ঘাঁটছে
ভীতু চোখে দেখা উনুন কেবলই চিতা
বলো কারা রাতে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে

মাঝরাতে কারা কিনে নিলো আই- ফোন
বলো তো ক্ষুধার রাত্রি কেমন কাটছে
হয় লড়ে যাবে, নয় তো সমর্পণ
কারা ভয় ভুলে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে

ছন্দতে নয়, ক্ষমতা দখল চেয়ে
স্বপ্নের কুঁড়ি মাইনের মতো ফাটছে
প্রশ্নবোধক সাতটি তারারা চেয়ে
কারা এত রাতে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে

ওরা কারা যারা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
তারা সারারাত রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
পায়ে ব্যাথা নিয়ে রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
জ্যোৎস্নায়ে ওরা রাইফেল কাঁধে হাঁটছে
---------
শপথ
- সরোজ দত্ত

রাজনীতি বুঝি না আমি,
বুঝি না তোমাদের সমাজ বিপ্লবের জটিল তত্ত্ব কথা।
ঐতিহাসিক পরম লগ্নের প্রতীক্ষায় দিন-গোনার
ধৈর্য্য আমার নেই।
তোমাদের কুটিল যুক্তির সূক্ষাস্ত্র অঙ্কুশের
হাজার আঘাতেও বিচলিত হবে না আমার
বিবেকরূপিনী গজেন্দ্রানী।

আমি পুরুষ,
আজ এই আমার একমাত্র পরিচয়।
আমি দেখেছি আমার প্রেয়সীর
বিষন্ন বিদ্রোহের রক্তাক্ত পরিণতি
বস্তিতে, বন্দরে, ক্ষেতে, খামারে,
শহরের রাজপথে।

দেখেছি আমার ব্যথিত রুদ্রাণীর ললাটে
অপমান যন্ত্রণার রুষ্ট নক্ষত্রের জ্বালা।
তাই, তত্ত্বের আকাশে তর্কের শরজাল
রচনা করো তোমরা, আমাকে মুক্তি দাও।

সময় নেই আমার,---
অভিমানিনী যাজ্ঞসেনীর বেণী বাঁধতে হবে আমাকে
দুঃশাসনের রক্তমাখা হাতে।
------
ইশ্বরের প্রতি
- শরৎকুমার মুখোপাধ্যায়

তোমার সম্পর্কে ওরা কত কথা বলে।
ক্রমবর্ধমান এই বিশ্ব তুমি রচনা করেছ,
নাকি এই বিশ্বের মানুষ
তোমাকে করেছে সৃষ্টি?
তুমি কোন দলে?
ধনী---যারা প্রাপ্যের অধিক নিয়ে
ছিটেফোঁটা ছুঁড়ে দেয় দরিদ্র্যের দিকে, আর তোমাকেও দেয়?
নাকি দরিদ্র---যে আশা করে তুমি সব ওলট-পালট
করে দিতে পার? কিন্তু কখনও কর না।
যুদ্ধের সময় তুমি বিজেতার পক্ষে ব'সে থাক।

নিটশে বলেছেন, তুমি মৃত।
প্যাসকেল বলেন, তুমি আছ কিনা অনিশ্চিত, তবে
অবিশ্বাস করে ঠকা বিশ্বাস করার চেয়ে শ্রেয় নয়।

এ সব গভীর তত্ত্ব বড় শক্ত বোঝা, আমি দেখি
পেছনে অরণ্য আর সামনে মরুভূমি
মাঝখানে মানুষ, জনপদ।
গরুর গাড়ি করে গোমাংস চলেছে প্রতিদিন।
-------
নিমন্ত্রণ
- মণিশংকর বিশ্বাস

কোন নিরাশার বুকে তুমি ব'সে আছো সম্রাজ্ঞীর মতো, শান্ত, স্থির---
যেন শিকারে বিঁধেছে তীর
আর নিজে থেমে গেছো ব্যথা পেয়ে।

পৈতের মতন পথ সরু, আড়াআড়ি
চলে গেছে মাঠের ভিতর।
দূরে শালের জঙ্গল, শ্মশানের মতো কালো...
আমি সব কালো ফেলে রেখে চলে যাই কখনো-বা
                                          তোমাকে দেখতে।
তোমার শরীর---গোলাপের আরক্ত সংসার---
ফলের মতন নগ্ন সকল কামনা---
আমাকে ডাকেনি কেউ
তবু আসি
নিজেকে দেখবো বলে, এইসব দেখি---
রূপ, অরূপরতন জল, কুটুমবাড়ির আলো, শুদ্রফুল
ঝিলের লাগোয়া নিরতিশয় অশ্বত্থ, মানতের থান...

অন্ধকারে যাকে আরো স্পষ্ট দেখি
তার নাম অন্ধকার।
-------
নরকে এক মুহূর্ত
- আজীজুল হক

আমি দশ পায়ে দিগ্বিদিক দৌড়াচ্ছি আর বলছি আমি খোঁড়া
একশোবার চেঁচিয়ে বলছি আমি বোবা
          কথা বলবো কী করে?
মগজটাকে চটপট একটা গাছের কোটরে লুকিয়ে রেখে
চোখ দুটোকে একটা নিরীহ ঝোপের মধ্যে ফেলে রেখে
পূর্ব-পশ্চিম-উত্তর-দক্ষিণ চক্রাকারে তাকাচ্ছি
আমাকে সম্পূর্ণ সুস্থ ভেবে এক লক্ষ বর্বরতা
আমার খুলির মধ্যে হৈ-হৈ গান জুড়ে দিচ্ছে;
        নরকে চলো নরকে চলো
        যে-কোনো মুহূর্তে তা নিভে যেতে পারে
        নরকে চলো নরকে চলো
        তা নিভে গেলে কী উপায় হবে
        নরকে চলো নরকে চলো
        প্রভুরা আমাদর কথা দিয়েছেন
        এবং ওখানেই অপেক্ষা করেছেন
        নরকে চলো নরকে চলো
        ফূর্তির জন্য আমরা তাকে নিভতে দেবো না
        দ্রুত চলো আরো দ্রুত
        তা নিভে গেলে কী উপায় হবে

কিন্তু তারা মোটেই চলছে না যেন নরকেই এসে গেছে
কেবল চেঁচাচ্ছে, মেয়েমানুষের লাশ অন্তত একটা পাওয়া গেছে
দিনগুলো রাত্রি এবং রাতগুলো দিনের পেটের মধ্যে
          নাড়ীভুঁড়ির মধ্যে সেঁধিয়ে গিয়ে
অবলীলাক্রমে সকাল সন্ধ্যা হয়ে বেরিয়ে আসছে
কয়েকজন দেবদূত সোনায় বাঁধানো দাঁতে হলদে হলদে হেসে
খুব সস্তায় ভূমিকম্পের অভিনয় শেখাচ্ছে
একজন জমকালো পোশাকপরা সূর্য লাল নীল হলদে সবুজ
অর্কট মর্কট কর্কট কী সব খেলা দেখাচ্ছে
যেন সে ভারী একজন উমদা খেলোয়াড়
এক্ষুণি তাকে একটা থাপ্পড় মারতে  পারি, কিন্তু না
দুহাত জুড়েই হঠাৎ একটা কাজ:

   হে ঈশ্বর তোমার ক্ষমতাকে কে অস্বীকার করে?
   কিন্তু আমরা তোমাকে অন্যমনস্ক হতে দেবো না
   দশ লক্ষ কাটা হাত তোমার দিকে উৎক্ষিপ্ত
   দশ লক্ষ উপড়ানো চোখকে তুমি ফাঁকি দিতে পারো না
  গ্রন্থ দ্বারা তুমি অঙ্গীকারাবদ্ধ
  ঘড়ির কাঁটা আমাদের মস্তিষ্কে বিদ্ধ না হওয়া পর্যন্ত
বিচ্ছিন্ন হৃদযন্ত্র দিয়ে আমরা সময় মাপছি
  নরকের লোভ দেখিয়ে অবিশ্বাসীদেরকে এখানে
                                             আটকে রাখছি
  যতোক্ষণ না তোমার সময় হয় হে ঈশ্বর
  তোমাতেই অনন্ত
  এবং তোমাতেই মুহূর্ত
দেখ দেখ
প্রবীণ জ্ঞানগুলো কেমন উদোম ন্যাংটা হয়ে গেল
চিন্তাগুলো কেঁচোর মতো খুলির ঝাঁজরা দিয়ে
    কিলবিল ক'রে বেরিয়ে আসছে
উচ্চারণগুলো ভীমরুলের মতো জিহ্বাকে রক্তাক্ত করছে
প্রেম পুঁজ হয়ে গলছে
বনবিড়ালটা নিজের ঘিলু নিজেই বের করে খাচ্ছে
নাঃ ঈশ্বরকে ওরা সময় দেবে না
লাশটা তবে কার?
লাশগুলো তবে কাদের?
স্মৃতিগুলোর সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার
তারা সব সীমান্তে
ভয়গুলোর সঙ্গে একবার দেখা করা দরকার
তারা সব সীমান্তে

সমস্ত অস্তিত্ব জুড়ে সীমান্ত খোলা হয়েছে
জ্ঞান যুদ্ধরত
বোধ যুদ্ধরত
ইচ্ছা যুদ্ধরত
প্রেম যুদ্ধরত
না, এখন আমি পালাতে পারছি না
না স্পর্শ থেকে না শব্দ থেকে না দৃশ্য থেকে;
    একটি কবিতা একজন কবির হৃৎপিণ্ড চিবিয়ে খাচ্ছে
    রক্ত
    একটি গান একজন গায়কের গলা টিপে ধরছে
    রক্ত
    একটি স্বপ্ন একজন প্রেমিকের চোখ উপড়ে নিচ্ছে
    রক্ত
রক্ত রক্ত রক্ত
উন্মোচিত জরায়ুতে কি এতো রক্ত থাকে?
কিন্তু ওই সুতীক্ষ্ণ কান্না আমি সহ্য করতে পারবো না
এক্ষুণি আমার ঝিমিয়ে পড়া উচিত
কান্নাটা তরঙ্গিত হবার আগেই
      আমার ঝিমিয়ে পড়া উচিত
ঝিমিয়ে পড়া উচিত।
--------
আশা
- জয়দেব বসু

তুমি জানো, রোহিতাশ্ব, বহুদিন কান্না আসে না। তাহলে কি বড় হচ্ছি? সেই যে বছর তুমি এলে, শেষবার কান্না পেয়েছিল। কেউ এল অন্তত।  দেশময় হুলস্থূল সে বছরে, মন্ত্রীরা চোর প্রমাণিত। সে সময়ে তুমি এলে; তোমার কেশর ঘন, তামাবর্ণ, তীব্রগন্ধী দেহ। তুমি জান, রোহিতাশ্ব, তারপর থেকে শুধু ছিন্ন দিন, ছন্ন রাত্রি। একমাত্র বন্ধু তুমি লাল ঘোড়া ---প্রিয়াসন্নিধান। কষ্ট খুব কামড়ায়, মাঝে মাঝে। তিক্ত রসে ভরে যায় জিভ। রোহিতাশ্ব, প্রিয় সখা, এই গান, নির্জনতা, আসন্ন শরতে এই দেশজোড়া খরা-বন্যা, এসবের মধ্যে দিয়ে কোথায় চলেছি? ক্যুয়ো ভার্দিস, ঘোড়া বন্ধু? এত রক্ত, উপবাস, অস্ত্রের যবনিকা ভেদ করে যেখানে পৌঁছব, সেথায় কে কান্না ফিরে দেবে? বস্তুত, আজ ঐ মেয়েটিকে দেখে চোখময় বাষ্প ঘনাল। তবু বাষ্প, বহুদিন পর। রোহিতাশ্ব, সেই মেয়েটি কি কান্না ফিরে দেবে?

দুপুর ১২.৪৭ মিনিট
২১/৯/৮৭
----------
মেয়েদের প্রতি
- জয়দেব বসু

চিনি চিনি বলে বটে তোমায় চেনা যায় না শ্যামা
চণ্ডী তুমি, দুর্গা, কালী, ছিন্নমস্তা, তিলোত্তমা
এই দেখি পিঞ্জরে বাসা, এই দেখি হা-হা শূন্যে
অনন্ত পাপ ওষ্ঠে মেখেছ, তবু সাঁতরাও পুণ্যে

চিনি চিনি বলি বটে তোমায় চিনতে পারি না মা
লায়লা তুমি, দেবী ম্যাকবেথ, বেহুলা ও বদউজ্জামাল
আমি পাগল কেঁদে ভাসাই, আগুন ঝরাই আক্রোশে
তুমি থাকো নির্বিকল্প, নিঃস্বরূপা, নির্বিশেষ
আজন্ম অধীনা ওগো, নৈরাত্ময় নাচো
মরতে মরতে বাঁচাও আবার মারতে মারতে বাঁচো

সকাল ০৭.৪৭ মিনিট
৩/৪/৮৭
----------
বিধাতার ব্যর্থতা
- শুভ দাশগুপ্ত

বাপের জন্ম গান শেখেননি, তাতে কী?
আপনার SMS এর জোরেই নির্বাচিত হবে শ্রেষ্ঠ গায়ক।
সাতকূলে কখনও দেশ নিয়ে ভাবেনও নি, দেশের জন্য কিস্যু করেনও নি।
তবু আপনার ভোটেই দেশনেতা নির্বাচিত হবেন।

জীবনে মাঠে নামেন নি। তবু
ট্রেনে বাসে, চায়ের দোকানের সবজান্তা আড্ডায় আপনিই রায় দেবেন
শচীন আদৌ ভাল ব্যাটসম্যান কিনা
সৌরভ আদৌ ক্রিকেটটা বোঝে কিনা।

পথে আর পথ নেই। ফুটপাথ হকারে ছয়লাপ।
কেন এত হকার? কারা এদের বসালো? কাদের দয়ায় এরা
সরকারী জায়গা দখল করলো? এসব নিয়ে
আপনি চিল্লে গলা ফাটিয়ে ফেলছেন, আবার
অফিস ফেরৎ সেই আপনিই হকারদের কাছ থেকে
ব্যাগ ভর্তি করে কিনে নিয়ে যাচ্ছেন-কমলালেবু, গানের নকল সি.ডি. বাচ্চার খেলনা, আমলকির প্যাকেট।

ভাই' এর সঙ্গে বনিবনা নেই, মা বাপকে বাদ দিয়ে আলাদা সংসার পেতে
হমতুম' এর সংসারে একপিস বাচ্চা নিয়ে
'সুখ' খুঁজছেন-আর সুযোগ পেলেই সর্বসমক্ষে বলছেন
"ওঃ ছোটবেলাটা যা দারুণ ছিল, একান্নবর্তী বৃহৎ পরিবার। কত আনন্দ!"

পাহাড়ে বেড়াতে গিয়ে পাহাড় না দেখে
লাউ এর দর করছেন। দু কিলোমিটার হেঁটে কেবলে গিয়ে
ঘোঁড়ায় চাপছেন। ফিরে এসে গুল ঝাড়ছেন:
ওঃ পথ যা খারাপ না। শালা দম বন্ধ হয়ে আসে।
তবু বুঝলি, হেঁটে মেরে দিলাম এগারো কিলোমিটার।

পাড়ার ছেলেরা পুজোর চাঁদা বাড়াতে বললে চটে যাচ্ছেন।
গজগজ করছেন। আবার সন্ধ্যেবেলা বৌ বাচ্চা শালা শালী সহ
ভিড় জমাচ্ছেন প্যান্ডেলে।
লজ্জাও হয় না। তাই না?
লজ্জা তো নারীর ভূষণ। আপনি তো পুরুষ।
লজ্জা পাবেন কেন!
চালিয়ে যান। চালিয়ে যান।

বিধাতা বাঁদর থেকে মানুষ হবার ব্যবস্থা রেখেছিলেন।
আপনি উল্টো পথে হাঁটলে
বিধাতার বাপের সাধ্যি কি
আপনাকে বাঁচায়?
-------

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি