উত্তর দিনাজপুরে _ একটু ভিন্নতার স্বাদে
25.11.2016 / শুক্রবার / 11:23 PM
****************************************
উত্তর দিনাজপুর জেলার করণদীঘি ব্লকের হাড়ভাঙা গ্রামে রাত এখন সাড়ে এগারটা বাজে প্রায় । বসে আছি রাসখোয়া আর শিলিগুড়ির কানেক্টার বাইপাসের উপর বাঁশের দরমা সাঁটা চায়ের গুমটির ছাউনি তে ।
চারপাশ জুড়ে ঘন কুয়াশার সর জমাট বেঁধে চাদরের মত পাতা । মাঝে মাঝে দুই একটা দূরপাল্লার গাড়ির আসা যাওয়া ছাড়া জনমনুষ্যহীন এই তেপান্তরে সময় যেন থমকে দাঁড়িয়ে পড়েছে ।
পাশে বসে আছে আমার ভাই আব্দুল । এখানে আজ সন্ধ্যা নাগাদ এসে পৌঁছেছি । থাকছি আব্দুলের জামাইদাদা হুমায়ুন দাদার বাড়িতে । সম্পূর্ণ মাটির এই বাড়ির দেওয়াল আনুমানিক আড়াই থেকে তিন ফুটের মতো চওড়া ।
সপ্তাহ শেষে কলকাতায় বাবা মা বোন বউ ছেলের কাছে বাড়িতে না গিয়ে কিংবা আমার সার্ভিসের ব্যাচমেট ভাই বন্ধুদের কাছে রামপুরহাটে বসে আড্ডা না মেরে আচমকা এখানে এইভাবে আসাটা মনে হয় একটা অসাধারণ সূক্ষ্ম মোচড় ।
হাতে না ছিলো একটাও বড়ো নোট । আর ছোট নোটও শেষ হয়ে আসছিলো ক্রমশঃ । সর্বসাকুল্যে কুড়িয়ে কাচিয়ে পকেটে পড়ে ছিল মাত্র শ'তিনেক টাকা ।
শেষমেষ আগের দিন একটু দেরী করে রাতের দিকে এটিএম এ গিয়ে ভাগ্যক্রমে একটা দু'হাজারের নোট তুলে বরাত খুলে গেল । সেটাকে একটা মুদীখানা থেকে একশো'র নোটে ভাঙিয়ে নিয়ে হাতে যেন চাঁদ পেলাম ।
বাড়ির তুলকালাম ঝামেলা আর অশান্তি এড়িয়ে যাব বলে, ভাবলাম, এমন একটা কিছু করি, যাতে এই দ্রুতগতির বুলেট ট্রেন মার্কা গতিশীল জীবনটা যেন একটুখানি বিরাম পায় । রামপুরহাট হোক বা কলকাতার বাড়ি, সেই তো একঘেয়ে কংক্রীটের জীবন শৈলী ।
তার চেয়ে বরং যাইনা একটু রং রুটে । গত রাতে শুয়েছিলাম পাঁচ পাঁচখানা সিনেমা ট্যাবে ডাউনলোড করে । শুতে শুতে ভোর চারটে বেজে গেছিলো ।
আমি আবার রিলায়েন্স জিও'র একখানা ফোর জি'র সিমকার্ড নিয়েছি কিছু দিন হলো । রোজ চার জিবি করে ডাউনলোড করার পরেও আনলিমিটেড টুজি মোবাইল ইন্টারনেট পরিষেবা আর কোনও মোবাইল ফোন অপারেটর ওয়ালারা দিচ্ছে না । সুতরাং আমার মতো সিনেমা পাগল লোক কি এমন সোনার সুযোগ হাতছাড়া করবে ! কখনোই করবে না ।
ঘুম ভেঙে উঠে দেখি কলকাতা যাওয়ার সকালের তিনখানা ট্রেনই মিস্ করে গেছি । এরপর আছে কাঞ্চনজঙ্ঘা আর আর তার এক ঘন্টা পরে হলদিবাড়ি সুপারফাস্ট । ট্যাবে সময় দেখাচ্ছে বেলা দশ'টা ।
আব্দুলকে বললাম উত্তর দিনাজপুরে যাব । থাক্ পড়ে বন্ধু বান্ধব ভাই বোন বউ বাচ্চা মা বাবারা তাদের মতো যে যার ইগো আর ক্যাচাল নিয়ে । আমি বরং দুটো বেলা মাটির ঘরে থাকবো খাবো ঘুমাবো । বসবো মাদুর পেতে নিকোনো মাটির দাওয়ায় সবুজের চারপাশে । ভোরে পাখিদের কিচিরমিচির শুনবো আর রাত বিরেতে শিয়ালের হুক্কা হুয়া । সাঁওতালদের গ্রামে যাব । জমিয়ে আড্ডা দেব । হাঁড়িয়া খাব ওদের সাথে একসাথে বসে । দেদার ছবি তুলবো ।
যেমন ভাবা, তেমন কাজ । ফটাফট স্নান খাওয়া সেরে রেডি হয়ে গেলাম । উইমেনস্ কলেজের মুখ থেকে টোটো ধরে দুইজনে মিলে চলে এলাম রথবাড়ি মোড়ে ।
একটু কিছুক্ষণ দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই চলে এল স্টেট ট্রান্সপোর্টের বাস । বসবার সীটও হয়ে গেল । বাসটা রায়গঞ্জ অবদি যাবে । সেখান অবদি গিয়ে তারপর আবার বাস পাল্টাতে হবে ।
বাস বেশিক্ষণ দাঁড়ালো না মালদায় । ইতিমধ্যে আমি সীট পেয়ে কানে হেডফোন গুঁজে দেখতে শুরু করলাম বাংলা সিনেমা - বেডরুম । সময় যে কি ভাবে কাটছে টেরই পেলাম না । গত কিছুদিন যাবৎ বয়ে চলা সব সাইক্লোন আপাততঃ শান্ত । আর কোনও ঢেউয়ের উথালি পাথালি নেই মনের গভীরে ।
মাঝখানে বাসটা গাজোল এ মিনিট কুড়ি দাঁড়িয়েছিলো । আমি প্রকৃতির ছোট ডাক সেরে নিয়ে এক কাপ চা সহযোগে সিগারেট ধরালাম । আবার বাস ছেড়ে দিলো ।
রায়গঞ্জের স্টেট বাস টার্মিনাস এ নেমে আবার টোটো ধরে নিলাম । এবারে গন্তব্যস্থল হলো প্রাইভেট বাস টার্মিনাস । ওখানে একটা বাস আগের থেকেই যেন আমাদের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে ছিলো ।
এবারে আমাদের গন্তব্যস্থল রসাখোয়া । এই বাসের হতভাগা ড্রাইভারটা এমন ঝোলান ঝোলালো আমাদের যে এক ঘন্টার পথ লাগিয়ে দিলো দেঢ় ঘন্টারও কিছু বেশী সময় ।
আব্দুলকে বলে দিলাম হুমায়ুন দাদকে ফোন করে একটু আগেই ডেকে নিতে । হুমায়ুন দাও আমাদের দোমোহনায় নামতে বলে দিলো । আমরাও দাদার কথা মাফিক যথারীতি দোমোহনা নেমে একটু দাঁড়ালাম ।
এতক্ষণ আমরা আসছিলাম চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়ক ধরে । এখানে দোমোহনা তে এসে রাস্তা দুই ভাগ হলো । একটা চললো শিলিগুড়ির পথে । আরেকটা রাস্তা রসাখোয়া ।
আমরা নেমে মিনিট পাঁচেক দাঁড়াতে না দাঁড়াতেই হুমায়ুন দা গাড়ি নিয়ে হাজির বুলেরো গাড়ি নিয়ে । আমরা আবার একপ্রস্থ চা আর সিগারেট খেলাম । গাড়ি ছুটতে লাগলো হাড়ভাঙার দিকে ।
শেষপর্যন্ত আমরা যখন নামলাম গাড়ি থেকে তখন প্রায় রাত পৌনে আটটা । চারপাশে নিকষ কালো অন্ধকার । নিকটবর্তী ল্যাম্পপোষ্টের বাল্ব কাটা । আকাশ ভরা অর্বুদ কোটি টিমটিমে নক্ষত্র আর তার অপরূপ মনোরম শোভা । মেঘের ছিঁটেফোঁটা অবদি নেই গোটা আকাশের কোথাও ।
আমাদের জন্যে যে ঘরটা রাখা ছিলো, সেটা সম্পূর্ণভাবেই মাটির । কোনও ইঁটের বংশমাত্রও নেই । মাথার উপর বাঁশপাতা টালির চালা । ঘরে জলচৌকি পাতা । বেশ গোছানো ছিমছাম্ ঘর ।
আমরা হাত পা মুখ ঘরের বাইরে বাগানের কলতলায় গিয়ে ধুয়ে নিলাম । এদিকটায় আলো নেই । মোবাইল টর্চ বা এমার্জেন্সি আলোই একমাত্র ভরসা । এসে প্যান্ট জামা ছেড়ে নিজেকে অবাক করেই লুঙ্গি পরলাম ।
আমি এর আগে কোনওদিনও লুঙ্গি পরিনি । ঘরে বা বাজার হাটে গেলে বারমুডা পড়তেই চিরকাল অভ্যস্ত । এবার একটা ট্রাই নিলাম । ভাবলাম শহুরেপনা আর সমস্তরকম ভাব ও ভাবনার থেকে দুটো দিন একেবারে আলাদা রকমভাবে কাটাবো ।
হুমায়ুনদা বাড়িতে তিন ভাইয়ের ভিতরে দ্বিতীয় । আব্দুল ওনার ছোটো মাসির ছেলে । আব্দুলের মেজ দিদির সাথে হুমায়ুন দার নিকাহ হয়েছে ।
আমরা ঘরে একটু জিরিয়ে নিয়ে গেলাম নিকটবর্তী এক চায়ের দোকানে । দোকান চালান হুমায়ুন দাদাদের একজন সম্বন্ধী চাচা । দোকানটা ঘর থেকে মাত্র মিনিট তিনেকের পায়ে চলা পথ । আমরা মোবাইল টর্চের সাহায্য নিলাম ।
দোকানে বসতে না বসতেই জমে উঠলো আড্ডার ঠেক । আমি এখানকার স্থানীয় বিড়ির স্বাদ নিলাম অসাধারণ দুধ চা সহযোগে । এটা সেটা কথার ফাঁকে এখানেও দেখলাম নরেন্দ্র মোদীজি বিরাট হিট । সকলেই একবাক্যে বলছে যা করেছেন বেশ করেছেন । বসে আড্ডার ফাঁকে ফাঁকে আরও দুই কাপ করে চা খেয়ে ফেললাম ।
দুধ চা আমি সচরাচর একটুও খেতে পছন্দ করিনা । তবে এই দুধ চায়ের দুধে নাকি জল দেন না চাচা । আর বড়ো ডেকচির ফুটন্ত দুধে উনি ফেলে দেন এলাচ । বেশ কড়া গোছের এমন চা শেষ কবে খেয়েছিলাম, মনে এলো না ।
প্রায় সোয়া নয়টা নাগাদ ঘর থেকে ডাক পড়ে গেলো । আমরা গিয়ে বসে গেলাম মাটির মেঝেতে পাতা চাটাই এর উপর । মেনুকার্ডে ছিলো দাদাদের জমির মোটা চালের ভাত, ডিমের ঝাল, বেগুন ভাজা, ডালসব্জী সহ মাটির উনুনে হাতে বানানো মোটা গরম গরম রুটি । স্বাদে গন্ধে মন প্রাণ যেন আনন্দে ভরপুর হয়ে গেলো । সব রান্না করেছিল আব্দুলের দিদি আর মাসি । আমি ওনাদের নিকোনো মাটির মেঝেতে বসে পরম তৃপ্তির সাথে একে একে সব খেলাম ।
তারপর আবার বের হলাম হাঁটতে । চারপাশে শুধুই অন্ধকার । ঝিঁঝিরা ডেকেই চলেছে একটানা । মোবাইল টর্চের ভরসায় গ্রামের প্রধান পাকা সড়ক দিয়ে হাঁটা শুরু করে দিলাম ।
এখন মুখে আছে শুধু একটা মিষ্টি পান আর তার সাথে একহাতে জ্বলন্ত সিগারেটের ঈষৎ উষ্ণতায় মনের সব হারানোর গ্লানি কোথায় যেন মিলিয়ে গেলো । ট্যাবে বাজতে লাগলো রূপম ইসলামের গান - "ফুটেছে হাস্নুহানা" ।
এই আতিথেয়তা, এই আপ্যায়ণ, এত ভালোবাসা - এ যেন অমূল্য সম্পদ । কি যেন একটা অদ্ভুত আবেশ ঘিরে ধরে আছে আমাকে আষ্টেপৃষ্ঠে । স্বপ্নের মত সবকিছু বলে মনে হচ্ছে আমার শহুরে স্বত্ত্বায় ।
আগামী কাল ভোরে নিজে হাতে হুমায়ুন দাদার বুলেরো গাড়িটা নিয়ে চালিয়ে যাব রায়গঞ্জের কুলিক অভয়ারণ্য । দেখব দেশ বিদেশের পাখিদের সমাবেশ । যাব ভারত বাংলাদেশের বর্ডার এলাকা কাদেরগঞ্জে । যাব আদিবাসি পাড়া, পানিহা ক্ষেমপুর । খাব তালের মিষ্টি রস আর ভাতের তাড়ি ।
বন্ধুরা, লিখে আর ঠিক বোঝাতে পারছি না আনন্দ আর উত্তেজনার পারদমাত্রা ।
সকলকে আপাততঃ শুভরাত্রি ।
________________________________
26.11.2016 / শনিবার / 10:15 AM
**********************************
এখন আমরা রওনা দিলাম রায়গঞ্জের দিকে, গন্তব্যস্থল কুলিক পাখিরালয় । সকালে ঘুম ভেঙে উঠেও লেপের তলায় শুয়েছিলাম অনেকক্ষণ । তারপর উঠে বাড়ির পিছন দিকের বাগানে গেলাম ।
বাগানে হরেক রকমের গাছ গাছালি । অনতিদূরেই একটা হ্যান্ডপাম্প । এর জলেই নাওয়া খাওয়া সবকিছু । ওখান খেকে আরও কিছুটা এগোলে টয়লেট করবার জন্য আলাদা করে ঘর করা । অবশ্য এই ঘর কিন্তু বালি ইঁট সিমেন্ট দিয়ে তোলা ।
আমায় বিশাল বড় বালতির এক বালতি জল, মগ, গামছা আর সাবান দিয়ে গেল আব্দুল আর হুমায়ুন দার ছেলে সৈয়দ । আব্দুল নিয়ে এলো বাবলা গাছের ডাল । আমি প্রথমে সেটা দিয়ে ও পরে আবার ব্রাশ পেস্ট দিয়ে ভালো করে মুখ ধুলাম । টয়লেট সেরে হ্যান্ডপাম্পের টাটকা ঈষৎউষ্ণ জলে ভালো করে স্নান করে একেবারে ফ্রেশ হয়ে নিলাম ।
এর আগে জীবনে কখনো লুঙ্গি পরিনি । অনেকটা অনভ্যাস আর কিছুটা ভয়ে । এবারের ঝটিকা সফরে সেটাও কেটে গেল । এখানে আসার পর থেকে ব্যাগ থেকে আর বারমুডা বের করিনি । একটানা লুঙ্গি পরেই সময় কাটাচ্ছি ঘরে থাকার সময়টুকু । এমনকি গত রাতে তো লুঙ্গি পরেই চাচার দোকান থেকে ঘুরে এলাম ।
গত রাতে চায়ের দোকানে আমার পাশে আব্দুলের একজন রিস্তেদার দাদু এসে বসেছিলেন । শুনলাম ওনার বয়স নাকি বাহাত্তর । কিন্তু আশ্চর্যজনক ভাবে ওনার মাথার একটিও চুল পাকেনি । এখনো নাকি উনি মাঠে গিয়ে কোদাল চালান, লাঙল ধরেন, জমি জমা চাষ আবাদ দেখেন । এবং নাতিদের সাথে রোজ বিকেলে অতি অবশ্যই ফুটবল খেলেন । লম্বা কালো ছিপছিপে সহজ সরল এই মানুষটিকে দেখে আমি তো একেবারে থ ।
আমি একটু একা একা হাঁটতে বেরোলাম । জোট করে বাঁধা খড়ের গাদা, পাকা আর বীজ ধানের গোলা, ছুটে বেড়ানো মুরগী আর তাদের ছানা পোনারা, দাদাদের পোষা কুরবানীর খাসি, কলতলার বাগানের বিশালকায় ল্যাংড়া আমের গাছ, মাটির দেওয়ালের গায়ে ঝুলে থাকা ইসলামিক ক্যালেন্ডার, একটু দূরের মাইক থেকে ভেসে আসা আজান - এইসব চেতন আর অচেতন জগতের সাথে একটু একাত্মবোধ হতে ।
এখানে সব বাড়ি ঘরই হয় সম্পূর্ণভাবে মাটির তৈরী নয়তো বাঁশের দরমা দিয়ে বাঁধা । রাস্তার ধার দিয়ে অনেকটা অর্ধবৃত্তাকার আকারে এক একটা পরিবার বাড়ি ঘর করেছে । চারদিকে চারখানা মাটির বা দরমার ঘরের মাঝখানে অনেকটা ফাঁকা মাটির উঠোন । সম্পূর্ণভাবে নিকোনো এবং ঝকঝকে । ইঁট বালি সিমেন্টের কোনও ব্যাপারই নেই ।
যেই বাড়িতে আমি আর আব্দুল রাত কাটালাম সেটা সম্পূর্ণটাই একতলা মাটির । ঘরের ছাদ বলতে গোটা বা আধাচেরা বাঁশের ফালি জড়ো করে বাঁধা । তার উপরে টালির চাল ।
আমার কিন্তু বেশ দারুণ লাগছিলো । সিমেন্টের মেঝে হলে খালি পায়ে হাঁটতে খারাপ লাগতো এই ঠান্ডায় । কিন্তু মাটির মেঝেতে এ যেন অন্যরকম একটা অদ্ভুত ভালোলাগার অনুভূতি ।
আমরা টিফিন করলাম ঘরে তৈরী মুড়ি বিস্কুট চানাচুর সেদ্ধ ডিম আর চা সহযোগে । বাড়ির চারপাশ দেখে দেখে ছবি নিলাম গোটা কয়েক । মাটির তৈরী ধানের গোলা, দরমার তৈরী ঘরে রাখা বীজধান, ভিজে ধান শুকানোর জাল । চোখের সামনে নানা রকম কল্পনা আসতে লাগলো সিনেমা দেখার মতো ।
আমাদের সাথে কুলিক গেলেন হুমায়ুন দার দুই ভাই আর ওনার ছেলে মেয়ে । বন্ধুদের আবার একটু মনে করিয়ে দিয়ে বলি, ওনাদের তিন ভাইয়ের ভিতর হুমায়ুন দা দ্বিতীয় সন্তান এবং বিবাহিত । সংসারের সব দায় দায়িত্ব ওনারই । বড়ো ভাই প্রায় বছর চল্লিশের কোঠায় । জমি জমার দেখাশোনা করেন । আর টুকটাক এদিক সেদিক ঘর গেরস্থালির কাজকর্ম দেখেন । এখনও বিয়ে সাদি করেন নি । আর ছোট ভাইটি স্কুলে পড়ে । হুমায়ুন দাদারা হলেন আব্দুলের নিজের মাসতুতো দাদা । আব্দুলে মেজ দিদির সাথে হুমায়ুন দার বিয়ে হয়েছে । তাই সেই অর্থে তিনি জামাই-দাদা ।
বাড়ি থেকে বেরিয়ে রসাখোয়া আর বোতলবাড়ি হয়ে চৌত্রিশ নম্বর জাতীয় সড়কপথে আমরা প্রায় এক ঘন্টার ভিতরেই কুলিক এসে নামলাম । এটা রায়গঞ্জ শহরে প্রবেশের একটু আগেই । হালকা শীতের রোদ্দুর অতটা গায়ে লাগলো না । কুলিকে ঢোকার একটু আগের থেকেই একটা অদ্ভুত উগ্র গন্ধ নাকে এসে ঝাপটা মেরেছিল । সেটা ওখানকার মুখ্য প্রবেশদ্বারে এসে আরও খানিকটা বেড়ে গেল । মাথার উপর সবকটা গাছেই কোনও না কোনও পাখি তার পরিবার পরিজন নিয়ে বসে শীতের রোদ পোহাচ্ছে । আমরা জন প্রতি চল্লিশ টাকা করে টিকিট কেটে ঢুকে পড়লাম ভিতরে ।
ভিতরে ঢুকেই বাঁদিকে দেখলাম একটা বেশ বড়োসড়ো ওয়াচ টাওয়ার গোছের লম্বাটে ধরণের বাড়ি । ওটার ভিতরে গিয়ে দেখলাম অসংখ্য পাখির আলোকচিত্র । সিঁড়ি বেয়ে উঠে গেলাম পরের তলায় । সেখানেও সব ওয়াইল্ড লাইফের হাল হকিকত ছবি তুলে দেওয়াল জুড়ে সাঁটানো ।
আমরা একেবারে ছাদে উঠে গেলাম । এখানে মাথার উপর ছাউনি করা । এখান থেকে দাঁড়িয়ে চারপাশে যেন শুধুই ইতস্ততঃ ভাবে সবুজের ঢেউ খেলানো গাছের পাহাড় । আর তার মাথা গুলোতে সপরিবারে বসে রয়েছে বিহঙ্গকুল ।
আমরা নেমে এসে রাস্তা ধরে এগোলাম বনের গভীরে । পথে পেলাম ঢালাই করা সাঁকো আর তার নীচ দিয়ে এঁকেবেঁকে চলা প্রায় শুকিয়ে আসা নদীর জলের শাখা । জলের উপর কোথাও বা সবুজ শ্যাওলা জমাট বাঁধছে, কোথাও বা জমে গেছে ঘন সবুজ খয়েরি হলদেটে রঙিন সর । আর বাকি সর্বত্র হরেক রকমের গাছ গাছালি ।
চারপাশ থেকে অনেক রকম পাখির কিচিরমিচির শুনতে পাচ্ছি । শব্দভেদী বানের মতো অনুসন্ধিৎস্নু চোখ খুঁজে ফিরছে নতুন কিছু দেখার আশায় । হঠাৎই চোখ গেলো উপরের দিকে ।
গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে আকাশ তো দেখা যাচ্ছেই, আর তার সাথে দেখা যাচ্ছে স্বমহিমায় উল্টো মুখে ঝুলে থাকা বিরাট বড়োসড়ো গোছের ধেড়ে বাদুড় । একটা দুটো চারটে নয় । একেবারে শ'য়ে শ'য়ে ।
আর একটা জিনিস নজরে এলো যে এক একটা এলাকায় শুধু এক জাতের পাখিরাই দল বেঁধে সপরিবারে বিরাজমান । অর্থাৎ এখানেও এলাকা ভিত্তিক সীমানা বিভাজনের একটা ব্যাপার রয়েছে ।
বনের পথ আর পথের ধারে গজিয়ে ওঠা গাছগুলোর পাতাগুলো সব সাদা সাদা । ঠিক মনে হচ্ছে যেন চুনকাম করা । ওগুলো যে পাখিরালয়ের পাখিদের বিষ্ঠা তা বুঝতে আমার একটুও কষ্ট হয়নি ।
আমরা পুরো বনভূমি টাই চক্কর মেরে নিলাম । কিছুমাত্র কণাও ছাড়লাম না । দেখলাম এখানে জায়গায় জায়গায় পাঁচিল ভাঙা । আর সেই ভাঙা পাঁচিলের সুযোগ নিয়ে অভয়ারণ্যে প্রবেশ করছে স্থানীয় এলাকার মানুষ, যাদের অধিকাংশই শিশু এবং মহিলা ।
এদের ভিতর প্রাপ্তবয়স্কদের সাথে একটা করে বস্তা । উদ্দেশ্য একেবারেই পরিস্কার । বনভূমিতে পরে থাকা শুকিয়ে যাওয়া পাতা আর মরা ডালপালা সংগ্রহ । কিছুটা নিজের ঘরের জ্বালানি আর অবশিষ্ট টুকু বিক্রি করে সংসার চালানো ।
বনরক্ষীরা বা অভয়ারণ্যের কর্মীরা এসব দেখেও হয়তো দেখেন না । চোখের পাতা বন্ধ করে হাতটা পেতে রাখেন । টুকটাক দশ বিশটা টাকা জনপিছু উপরি রোজগার হয়েই যায় ।
হায়রে হতভাগ্য প্রশাসন । লোকদেখানো এই কড়াকড়ির আর কি মূল্য রইলো । জনপ্রতি চল্লিশ টাকা করে প্রবেশের জন্য টিকিট কেটে ভিতরে ঢোকা আর চারপাশের বিশাল উঁচু করে ঘেরা পাঁচিল দেখে মনে হচ্ছে যেন একটা সূঁচও বোধহয় গলতে পারবে না । অথচ পিছনের ভাঙা পাঁচিল দিয়ে অতিকায় হাতির মতো গোটা এলাকাবাসীরাই গলে চলে যাচ্ছে আমাদের মতো ঘুরতে আসা নবাগতদের চোখে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে ।
আমার চোখে পড়লো বিশেষ এক জাতীয় পোকা । লালচে লম্বাটে গন্ধী পোকা গোছের । মাটিতে পড়ে থাকা শুকনো পাতা, মরা ডাল বা গাছের গুঁড়ির গায়ে । চোখ দুটো যেন কালো সরষের দানা । আমি আমার ট্যাবে তুলে নিলাম ওদের এক মানিকজোড় কে ।
গোটা কুলিক অভয়ারণ্যে নানারকম পাখির ডাক আর তাদের তীব্র কটু উগ্র গন্ধ, তাদের চিৎকার চেঁচামেচি, সপরিবারে সুখে গাছের মাথায় বসে নিরুপদ্রব নির্ঝঞ্ঝাট জীবন কাটানো, শুকনো পাতা আর মৃত শাখা প্রশাখা ছড়ানো বনভূমির মাটির মেঝে, মাঝে মাঝে দুই একটা আধমরা হেজে মজে যাওয়া, প্রায় শুকিয়ে আসা, সর আর শ্যাওলা পরে যাওয়া নালা, মাথার উপরে পাতার ফাঁক দিয়ে খুঁজে পাওয়া খোলা আকাশে উড়ে বেড়ানো পাখিদের দেখে মনটা ভীষণ ভাবে আনন্দে ভরে গেলো ।
এরপর আমরা চললাম রায়গঞ্জ শহরের দিকে । বেলা অনেকটা হয়ে গেছিলো । বাড়িতে রান্নাবান্নার আয়োজন বেশ ভালোই করা হয়েছিল । কিন্তু হুমায়ুনদার বড়দা বললেন বাইরে হোটেলে দুপুরের মধ্যাহ্ণহোজ সারবেন । কারণ ওনারা বা আমরা তো রোজই বাড়ির রান্না খাই ।
আমাদের গাড়িটা রায়গঞ্জের রেল স্টেশন সংলগ্ন খোলা জায়গাতে পার্ক করে দেওয়া হলো । আমরা বেরিয়ে বামদিকের রাস্তা ধরে অনতিদূরেই একটা ভাতের হোটেলে ঢুকে পড়লাম । খাসির মাংস দিয়ে ভাত খেয়ে পেট একটু শান্ত হলো । মুখে মৌরী ফেলে এদিক ওদিক দোকান ঘুরতে লাগলাম । তেমন বড়োসড়ো শপিংমল গোছের দোকানপাট চোখে পড়লো না । আর শহর হিসেবে তো রায়গঞ্জ খুব একটা বড়োসড়োও নয় । দিনটা ভালোই কেটে গেল ।
ফেরার পথে আমিই ড্রাইভ করতে লাগলাম হুমায়ুনদার এই বুলেরো গাড়িটা । লং ড্রাইভিং করাটা আমার কাছে খুব বড়োসড়ো একটা প্যাশনের মতোন ব্যাপার আমার কাছে । খালি মনে হয় মনের মতো কাউকে পেলে বেরিয়ে পড়ি তাকে নিয়ে পাশে বসিয়ে ।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে পৌনে চারটে বেজে গেলো । একটু বিছানায় গড়াগড়ি করে হুমায়ুন দার সাথে আমি আর আব্দুল আবার গেলাম ক্ষেমপুরের পানিহা আদিবাসী পাড়ায় জোসেফ মুর্মু দার বাড়ি । এবারেও ড্রাইভিং সীটে আমি বসলাম । সম্পূর্ণ মাটির রাস্তায় ধূলো উড়িয়ে যাওয়া আসা করাটা কোনও উন্নয়নশীল দেশের লক্ষণ নয় । কিন্তু এই দেশের প্রান্তিক জনজাতি এখনও বহুস্থলে প্রতিবাদ করতে শেখেনি । এরা সহজ সরল অনাড়ম্বর মাটির সন্তান, ওরাই এই ভারতভূমির আদিমতম জনগোষ্ঠী । সেই আর্য যুগ থেকেই এরা ব্রাত্য । রামায়ণ মহাভারতে এদের অনার্য রাক্ষস ইতর নরখাদক জনগোষ্ঠী হিসেবেই ধরা হয়েছে । কখনো মানুষ হিসেবে এদেরকে আলাদা করে বিশেষ মর্যাদা দেওয়াই হয়নি ।
ভাবতে অবাক লাগে যাকে আমরা রামায়ণ রচয়িতা মহামুনি বাল্মীকী বলে জানি, আসলে তিনি ছিলেন মহাপাপী দস্যু রত্নাকর । অর্থাৎ কিনা শুদ্র । পথিকের ধন সম্পদ লুন্ঠন করে তাকে হত্যা করতেন যেই রত্নাকর দস্যু, সেই তিনিই কিন্তু হিন্দুদের মর্যাদা পুরুষোত্তম শ্রী রামচন্দ্রের জীবনীকার । রামচন্দ্র এখানে ক্ষত্রিয় । আর তার শত্রু হলেন কিনা রাবণ, যিনি ব্রাহ্মণ । একই ভাবে মহাভারত রচয়িতা কৃষ্ণদ্বৈপায়ণ বেদব্যাস মেছুনি সত্যবতীর সন্তান । অর্থাৎ কিনা মাতৃকুল অনুসারে জেলে । তাঁর হাত দিয়ে রচিত হয়েছে কিনা আঠারো হাজার শ্লোক সমন্বিত বিশালকায় মহাভারত । সেখানে আবার হিন্দুদের ভগবান শ্রীকৃষ্ণ হলেন গোয়ালাদের ঘরে প্রতিপালিত ।
সুতরাং এটা ভাবাই যায় যে ভারতবর্ষে যাঁরা ব্রাহ্মণ্যবাদ কে শাপ শাপান্ত করেন, গাল দেন, তারা হয়তো এটাই ভুলে গেছেন যে এই দেশে ব্রাহ্মণদের ভিতর এমন কেউ নেই, যাকে আমরা হিন্দুধর্মাবলম্বীরা ভগবান বা ঈশ্বর জ্ঞানে পূজা করি ।
নানান কথা ভাবতে ভাবতে আমরা এসে থামলাম জোসেফ মুর্মু দার বাড়িতে, মালি বস্তির একটু ভিতরে । কিন্তু এই বস্তি আর শহরের দেখা বস্তি কিন্তু মোটেই এক নয় । শহরের মতো নোংরা আবর্জনা দুর্গন্ধ কিন্তু একটুও নেই এখানে । বস্তি কালচার বলতে আমরা শহুরে আপাতঃ সভ্য বাবু সাহেবরা যেটা মনে মনে ধারণা করে নিতে অভ্যস্ত, তাদের বিনীতভাবে আবেদন এবং অনুরোধ রইলো, এমন পরিবেশে এসে একটু সময় কাটানোর ।
রাস্তা মাটির, ঘর বাড়িও । বাঁশের দরমার বেড়া আর টালির চাল ছাড়াও এখানকার বিশেষত্ব হলো নানা রকম রঙ বেরঙের মাটির দেওয়াল । আর কোথাও কোথাও খুব সুন্দর করে নকশা আঁকা । আর সবকিছু ঝকঝকে ছিমছাম্ । মাটির মেঝে একেবারে নিকোনো । একটা কাগজের টুকরো কিংবা প্লাস্টিক ও নেই কোথাও পড়ে ।
জোসেফ দা আমাদের কে বেঞ্চি আর চেয়ার এনে আমাদের বসতে দিলেন । বিনা জল ছাড়া খাঁটি দুধের অসাধারণ চা এলো । তার সাথে দুই রকমের বিস্কুট । আমরা একসাথে বসে অনেক গল্প করলাম । জোসেফ দা এবং তাঁর পরিবারের সকলের সাথে একসাথে বসে ছবি তুললাম । তারপর জোসেফদা কেও তুলে নিলাম আমাদের সাথে গাড়িতে ।
এতক্ষণ আমি ড্রাইভিং সীটে ছিলাম । এবার গাড়ির স্টীয়ারিং ধরলেন হুমায়ুন দা । পাশের সীটে জোসেফ দা । আমি আর আব্দুল মাঝের সীটে । এদিকে দিনের আলো ক্রমশঃ ফিকে হয়ে আসছিলো । আকাশে লালচে রঙের সূর্য বাঁশ গাছের পাতার ফাঁক দিয়ে হালকা করে উঁকি মারছিলো । পাখিদেরও কিচিরমিচির বাড়ছিলো ক্রমশঃ ।
জোসেফ দার নির্দেশ মতো হুমায়ুন দার গাড়ি চলছিলো । আমি জানলা দিয়ে এপাশ ওপাশ দেখতে দেখতে হঠাৎ গাড়িটা থামাতে বললাম । নেমে হেঁটে পিছন দিকে চলে এলাম খানিকটা । আমাদের গাড়িটার ডানপাশ দিয়ে একটা স্থানীয় জলাভূমি দেখে মনটা ফুরফুরে হয়ে গেল । মাটির রাস্তার উপর গুঁড়ো ইঁটের মোরাম পাতা । আমি রাস্তার ঢাল বেয়ে নীচের দিকে নেমে গেলাম । প্রায় শুকিয়ে আসা জলাভূমিটা কচুরিপানায় ভরে গেছে । কোথাও কোথাও ফুটে আছে শাপলা । আর নাম না জানা অনেক জলজ গোছা গোছা ফুল । জলাভূমিটা আকার আয়তনে বিশাল । খাসজমি নয়, রায়তী । মালিক প্রতি বছর লীজ দেন । বেশ পয়সাওয়ালা । নিজের মাছের আড়ত । সব আধিকারিক কে হাতের মুঠিতে নাকি ভরা । আমি প্রমাদ গুনলাম । এখানে মধ্যবিত্ত সুলভ মানসিকতা একটা দুর্লভ ডাকটিকিটের মতো ব্যাপার ।
আমি পর পর গোটা চার পাঁচ ছবি তুলে নিলাম । আবার ঢাল বেয়ে রাস্তার উপরে চড়বার সময় ডান আর বাম দুই পাশেই দেখলাম শ্রীবিষ্ণুর তৃতীয় অবতারেরা একসাথে কাদা পাঁকে ঘোঁৎ ঘোঁৎ করে মনের আনন্দে গড়াগড়ি খাচ্ছে । যথারীতি এই ছবিও তুললাম ।
রাস্তায় উঠে গাড়ির দিকে এগোতেই দেখি একটা বছর সাতেকের ছোট্ট ছেলে । এক হাতে তার বাঁশের বাখারির ধনুক । আরেক হাতে গোটা দুয়েক তীর । পরনে রঙচটা নীলচে স্যান্ডো গেঞ্জি আর একটা চাড্ডি গোছের নেংটি জড়ানো । আমার সাথে একটা ব্যাগ ছিলো । তার থেকে দুটো চকলেট টফি বের করে ওকে দিলাম । ইতিমধ্যে আরও কিছু পোলাপান এসে হাজির । ওদের হাতেও দুটো করে চকলেট তুলে দিয়ে গাড়িতে উঠে পড়লাম । ওদের মুখ জুড়ে ছড়িয়ে থাকা অসাধারণ একগাল হাসি আমার মন ভরিয়ে দিলো ।
এখন ফিরছি ক্ষেমপুর পানিহা আদিবাসী পাড়া থেকে । খুব আনন্দে কাটলো দিনভর । বিকেল থেকে সন্ধ্যে চরে বেড়ালাম হুমায়ুন দাদা আর আব্দুল ভাইয়ের সাথে । গেলাম ক্ষেমপুরের মালি বস্তিতে জোসেফ মুর্মু দাদার বাড়ির খোলা আঙিনায় বসে আড্ডা দিতে । ছবি তুললাম সবার সাথে বসে । খেলাম ভাত থেকে ওনাদের ঘরে তৈরী ভেরি স্পেশাল স্থানীয় তাড়ি, যেটা ওদের ভাষায় 'হান্ডি' । তার সাথে চাট এ খেলাম নতুন তোলা চালের বিশেষ প্রিপারেশন 'ডুম্বু' । গোল গোল রসোগোল্লার মতো, তবে শুকনো শক্ত মিষ্টি মিষ্টি । প্রথমে তো আমি তা দেখে রসগোল্লাই ভেবে বসেছিলাম । এর সাথে ছিল লোকাল দেশি বিড়ি । ওদের সদাহাস্যময় সরল সাদামাটা জীবনে নিজের জীবনকে যেন নতুন করে ফিরে পেলাম । কয়েকটা ঘন্টা যেন হু হু করে কেটে গেল । তারপর জোসেফ দার সাথে চরতে বেরোলাম আদিবাসী পাড়ায় । নিকোনো ঝকঝকে তকতকে গোবর লেপা মাটির উঠোন, মাটির তৈরী রঙিন বাড়িঘর । দেখলাম আদুল গায়ে খালি পায়ে তীর ধনুক হাতে ছোট্ট এক শিশু খেলায় মত্ত তারই এক সমবয়সীর সাথে । এদিকে সেদিকে মাটির পায়েচলা রাস্তার ধারে কোথাও ছাগল কোথাও গরু মহিষ কোথাও বা ভগবান বিষ্ণুর তৃতীয় অবতার কে বেঁধে রাখা । কিছু কিছু ঘর একটা আঙুরের থোকার মতো । তারপর শুরু হচ্ছে চাষের জমি । আবার কিছুটা পথ গিয়ে লোকালয় । এখানে চাষ হয় ধান গম ভুট্টা পাট আদা সরিষা ফুলকপি বাঁধাকপি । অনেকে লোকাল জলাভূমিতে মাছ ধরতেও যায় । ফেরার পথে নিজের ঘরের জন্যেও মাছ নিয়ে আসে । জোসেফ দা বলছিলেন দলবেঁধে শিকার করতে বেরিয়ে এরা নাকি মেঠো ইদুঁর পেলেও সহজে ছেড়ে দেয় না । সরল সাদামাটা সিধা সহজ জীবনে এরা ভীষণ রকম ভাবে একত্রিত সমবেত ।
Comments