ভাসান - করুণাপ্রসাদ দত্ত
একটি অসাধারণ কবিতা...
ভাসান/©করুণাপ্রসাদ দত্ত
বয়ে চলা নিরন্তর এই দেহ
প্রাণহীন ,মৃত
এ দেহ নিজেরই কাঁধে নিয়ে
যাত্রা শুরু অন্ধকারে
আবহমান কাল
নিস্তার নেই নিস্তার নেই
না থাকুক নিস্তার ,তবু নৌকায় ভেসেছি
অকুল স্রোতে নিস্তারেরই খোঁজে
জড়িয়ে ধরে এই দেহ প্রাণহীন, মৃত
এই দেহ তবু সংগে নিয়ে
নৌকায় চলি ভেসে
আশ্চর্য নৌকা এক
নদীর জলের রঙ,সমুদ্র- জলের রঙ
জানিনা জানিনা
শুধু ভেসে চলি নিরন্তর
মুহূর্তে মুহূর্তে পাল্টায় রঙ
নদীর জলের সমুদ্র জলের
নৌকার ও
অর্থ যায় বদলে বদলে
বদলে বদলে সদা
এই দেহে মৃত্যু
এই দেহে মৃতদেহ বহন
অন্তিম যাত্রায় রোজ
চারপাশে ভেসে যায় বন বাড়ি গাছপালা
সাজানো রয়েছে সব
চারপাশে সাজানো রয়েছে শব
হেঁটে যাচ্ছে অজস্র মানব
হেঁটে যাচ্ছে থেমে যাচ্ছে হেঁটে যাচ্ছে
ওঃ, এ এক আশ্চর্য খেলা, হাঁটা আর থামা
মাথায় বিশাল পাথর
বালির উপর
হেঁটে যাচ্ছে সারবন্দি শবযাত্রী
এ পাথরে পিরামিড হবে
একটি দেহ গন্ধ দ্রব্য তৈলে মাখা
মহান ফারাও এর মৃতদেহ থাকবে সেখানে
এবং আশ্চর্য দেখ, ওরা আহার ও বহন করে
রাজকীয় আহার
থরে থরে সাজানো ও হয়
বেঁচে উঠে একদিন খাবেন ক্ষুধার্ত ফারাও
এই দেহ বেঁচে উঠবে একদিন
যাত্রাপথে দেখা যায় বালির উপর
পর পর কত পিরামিড
এখনও আছে শুয়ে কোন এক মহান নৃপতি
নামহীন নামযুক্ত
বাঁচার আগ্রহে সাময়িক স্তব্ধ হয়ে আছে
স্তব্ধ হয়ে থাকি, বয়ে চলি
মৃত দেহ বয়ে চলি
বাঁচার তীব্র বাসনায়
নিরন্তর মৃত্যু বয়ে চলা
হাজার বছর ধরে কত গাছ বেঁচে থাকে
বড়শীর দৃষ্টি থেকে সরে গেছে যে চতুর মাছ
সে-ও বেঁচে আছে
বেঁচে আছে চরাচরে চরাচর
প্রবহমান মৃত্যুস্রোতে ফাঁক বুঝে
কদাচিৎ বেঁচে থাকে চতুর জীবন
কদাচিৎ বেঁচে আছে ?
কিন্তু দেখ, চলেছি লাল রক্তাক্ত জিহ্বার দিকে
নগ্ন নারী
পায়ের তলায় চেপে রেখেছে মংগলকে সুন্দরকে
রক্তাক্ত জিহ্বা লকলক করছে
নদী সমুদ্র চরাচরের উপর দিয়ে
প্রসারিত হচ্ছে সর্বদিকে
ঢাক বাজায় আদিবাসীরা
দ্রিম দ্রিম দ্রাম দ্রাম ধ্রিম ধ্রিম ধ্রাম ধ্রাম
বেজে চলেছে বেজে চলেছে
শৃগালের ছদ্মবেশে আদিম মানুষ
লাফাচ্ছে নাচছে লাফাচ্ছে নাচছে
তাদের শরীর থেকে ঝরে পড়ছে আগ্নেয় লাভা
শৃগালের পুচ্ছে রয়েছে এক অদ্ভুত পালক
পালকটি নড়ে উঠলেই
শুরু হয়ে যায় গুম গুম ধ্বনি
আর ঐ ধ্বনিতে চারপাশের মানুষ ছিটকে পড়ে মাটিতে
পাহাড়ের চূড়া থেকে গনগনে লাভা আসে বেরিয়ে
গর্ভবতী নারী ভয়ে
অকালে প্রসব করে কিম্ভূত সন্তান
আর এক প্রসারিত জিভ আরো প্রসারিত
রক্তাক্ত জিহ্বা চেটে নেয় পৃথিবীর রক্ত রস
আর দেখ অলৌকিক টানে
ভেসে চলি তারই দিকে
পালাও পালাও
জলে জল ছলছল চিত্কার
নৌকা চলে নৌকা চলে
নৌকায় ভেসে পলায়ন
ঐ তো দিগন্ত, দিগন্তে মিশেছে এ জলধারা
দিগন্তে এর শেষ
দিগন্তে পৌঁছই চোখ বন্ধ করে
অন্ধ চোখ খুলে দেখি
দিগন্তেই এই জলের শুরু
পালাব কোথায় ?
।।
চলো, পুনরায় চলো,
পালানোর দিন শেষ
এই দেহ নিয়ে চলো
চলো, চলো
সূর্যের নীচে দিয়ে চলো
সূর্যস্নাত হয়ে
চলো চলো
সূর্যের অমোঘ রশ্মি একে যতটুকু দেবে প্রাণ
সেটুকু বহন করে চলো
চলো চলো
নৌকা চলে নিত্য পালটায় নৌকার রঙ
এ দেহ ও অলীক উল্লাসে প্রত্যহ পাল্টায়
এই দেহ ভাবে বেঁচে আছে সে
কোন রক্তাক্ত জিহ্বা নেই তার আশেপাশে
।।
জন্ম থেকে এই দেহ এভাবেই বড় হয়ে যায়
জন্ম থেকে জন্ম থেকে
শৈশব কৈশোর যৌবন পার করে
ক্রমে বৃদ্ধ হয়ে যায়
ইতিহাস পড়ে : ফারাও ও নিমি রাজার কাহিনি
বিজ্ঞান ও পড়ে : গ্যালিলিও ও বশিষ্ঠের কথা
পড়ে না রক্তাক্ত জিহ্বার কথা
পড়ে না ছদ্মবেশী শৃগালের নাচের কথা
ঢাক বাজে চতুর্দিকে দেহ ক্রমে বৃদ্ধ হয়ে যায়
আহা
।।
এই দেহ ভোগে দীর্ণ, এ দেহ নিষ্প্রাণ
তবু একে রমনীয় মনে হয়
নারীর অলৌকিক শরীরে খোঁজে সুখ
কে যেন বলেছে কবে অথবা শুনেছি
ঐ সুখ কোন সুখ নয়, নিরন্তর সুখ চেয়ে চেয়ে
হঠাৎ কখন অসুখ এসে যায়
সুখ নেই সুখ নেই
এই দেহ মৃতদেহ একে শুধু নিত্য বহন
এই দেহে দেহ রাখা এ দেহে রমন
সুখ নেই সুখ নেই
এই তো এখন ভেসে চলি
সামনে এক নারী তার অলৌকিক দেহে রাখি
এইদেহ সম্ভোগ করার নামে
নবদ্বারে শুধু ঘুরপাক, যেন রাজা পুরন্জ্ঞন
কালব্যাধি সৈন্য নিয়ে ঢুকে পড়ে
ব্যাধি সৈন্য আক্রমণে দীর্ণ
পুর আর রন্জিত থাকেনা
ক্রমে এক বৃদ্ধ দেহ হয়ে
নিজেই নিজের কাঁধে
।।
একে আমি নিয়ে যাই কোথায়
যেখানেই যাই সংগে সংগে যাবে
তবু নিয়ে যেতে হবে
হায়
কে যেন ডাকে দূরে কে যেন ডাকে
কে যেন বাজায় শঙ্খ
বিশাল গম্ভীর ধ্বনি
কার ঘরে বাজে শঙ্খ
কোথায়
শঙ্খের ধ্বনিতে কী কোন আদেশ রয়েছে
সস্নেহ আদেশ
শুভ সময় শুরু হলো চলো
এরকম ডাক শোনা যায় ?
কিন্তু এ মরদেহ যে কাঁধে
যাকে আমি বুঝি
বুঝেছি ভ্রমণে ভ্রমণে -- এই আশ্চর্য যাত্রায়
জেনেছি নৌকাকে ,
জেনেছি নৌকার রঙ
জেনেছি রক্তের গভীরে নাচ
নগ্ন নারীর পায়ের উন্মাদ ছন্দ
ধমনীতে বয়ে যাওয়া আদিম মানুষের নাচ
জেনেছি জেনেছি
জেনেছি এই দেহ মরদেহ নিত্য বহন
একে যদি ফল দিই, পূর্ণ ফল
তবে পাবে প্রাণ
একে তাই দেব সূর্য
একে দেব জল শস্য প্রাণ
দেব রঙ
এর রক্ত থেকে মুছে দেব কালো সন্ত্রাস
একে তাই দেব এক নারী, বেহুলার মতো নারী
লক্ষ্মীন্দরকে বীজ রূপে ধারণ করবে দেহে
।।
একে ভাসিয়ে দেব জলে
জলে ভেসে যাক
শুধু থাক পূর্ণ ফল হাতে নিয়ে এ জীবন চরাচরে
চরাচরে বাজে শঙ্খ, শঙ্খে বাজে শুভ
ডেকে বলি হে আমার দেহ
শঙ্খ ধ্বনি সাথে নিয়ে ভেসে যাও
অনন্ত সাগরে
না
অনন্ত জীবনে ।।
(প্রকাশিত ১৯৯৯)
Comments