ভবঘুরের সফরনামা _ দার্জিলিং

ভবঘুরের সফরনামা _ দার্জিলিং
------------------------------------------------
__________________________
29.09.2016 (বৃহস্পতিবার)
------------------------------------------

ঘুমটা ভেঙে গেল । মোবাইলে অ্যালার্ম দেওয়াই ছিল । সেটা ওর নিজের মতোন করে সাড়াও দিয়েছিল যথাসময়ে রাত আড়াইটে নাগাদ । কিন্তু আমার ক্লান্ত শ্রান্ত দেহখানা কিছুই টের পেলো না । আর যখন ঘুম ভাঙলো, তখন রাত তিনটে বেজে পাঁচ ।

ভোর চারটে পঁচিশের দার্জিলিং মেইলে আমাদের নিউ জলপাইগুড়ি যাওয়ার কথা । আমাদের বলতে আমি আর আমার ভাই আব্দুল । সেখান থেকে গন্তব্য হিমালয়ের অনির্দিষ্ট পথে ।

না না ... তেমন আহামরি কিছু না ভাবাই ভালো । আজ বৃহস্পতিবার । আগামীকাল শুক্রবার, মহালয়া । শনি রবি মিলিয়ে হাতে একটানা তিনদিন ছুটি । সাধারণতঃ এমনি সময় হলে ছুটি মানেই ভোর চারটে তিরিশের মালদা - হাওড়া ইন্টারসিটি এক্সপ্রেস চেপে ঘরের ছেলে ঘরে ফিরে যাওয়া ।

কিন্তু জানিনা কেন, নানা কারণে আমার বাড়ি ফিরে যাওয়ার যেন কোনও ইচ্ছেই করছিলো না গত পরশু থেকে । অফিসে কোনও পেন্ডিং কেসও নেই । অর্থাৎ চাপমুক্ত অনেকটাই । এমন অবস্থায় মাঝে মাঝেই দুই-এক পশলা মুখ ঝামটা বৃষ্টি খেপে খেপে মনে করাতে লাগলো কালিদাসের রামগিরি শিখরমালা । তার সাথে হঠাৎ করে মনের ভিতর ঘুরতে লাগলো শক্তি দাদাভাই এর সেই বিখ্যাত লাইনখানা - "এখানে গাভীর মতো মেঘ চরে" ।

অফিস আর পরিবারের মুখগুলো সব একে একে কেমন করে যেন একটা দমকা হাওয়ায় ভেসে মিলিয়ে গেল ভাবনার পাঁচিল টপকে অসীমের দিগন্তে ।

তা রামগিরি পর্বতমালা আর এখানে কোথায় পাবো ! তবে বিকল্প তো আছে অবশ্যই । মাত্র ঘন্টা খানেকের সীমানা পার করলেই দিগন্ত আর দিকচক্রবাল ঘিরে বিরাজমান হিমালয়ের মনোরম শোভা । আর মেঘের চলন বলন দেখতে এই নিঝুমপুরীর ঘুমের দেশে দিনের ঔজ্বল্য বা রাতের স্নিগ্ধতার মাত্রাই আলাদা ।

ব্যস্, ভাবনা যেমন, কাজও তেমন । একবেলায় সব গুছিয়ে ফেললাম । ডিনার সেরে বিছানায় যাওয়ার কথা রাত ন'টার ভিতর । কিন্তু সব প্রয়োজনীয় জিনিস গুছিয়ে শুতে শুতে বাজলো দশ'টা । তার উপর রাতে রান্নাবান্নাও কিছুই হলো না । রান্নার মাসি ডুব দিয়ে দিলো দুম্ করে । আমাদেরও আর রান্না করে খেয়ে বাসন মেজে তুলে রাখার মেজাজ ছিলো না । অতঃপর দোকান থেকে আনালাম মাখন দিয়ে ভেজানো রুমালী আর তন্দুরী রুটি, সাথে ভালো করে কষানো ডিম তরকা ।

অত ভোরে উঠে খুব সহজে প্রকৃতির আহ্বান আসে না । তাই অনেকটা জল খেয়ে কোমর হেলিয়ে দুলিয়ে নিম্নচাপকে আপ্যায়ণ করতে হলো কিছুটা মূল্যবান সময়ের অপব্যয় করে । একে দেরী করে ঘুম ভাঙলো । মুখে ব্রাশ গুঁজে কিছুক্ষণ চুপচাপ থম্ মেরে বিছানায় গিয়ে বসে রইলাম । অনেক সাধ্য সাধনা করে পেট হাল্কা করে স্নানটাও সেরে নিলাম এক নিঃশ্বাসে ।

বেরোলাম তিনটে বেজে পঞ্চাশ এ । বাড়ি থেকে স্টেশন আন্দাজমতো প্রায় দুই কিলোমিটার হবে । নির্জন ফাঁকা অন্ধকার রাস্তায় একটু দূরে দূরেই ভেপার আলো জ্বালানো ল্যাম্পপোস্ট, যার অধিকাংশই আবার খারাপ হয়ে অবহেলায় দাঁড়িয়ে আছে ।

আমরা গলি বেয়ে বড়ো রাস্তা ধরে এগোলাম স্টেট বাস টার্মিনাসের দিকে । এখান থেকে কলকাতা আর শিলিগুড়ি গামী সরকারী বাসগুলো আসা যাওয়া করে ।

একটু এগোনোর পরেই দেখলাম গোটাকয় কুকুর এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে আধাবোঁজা অবস্থায় শুয়ে বসে টাইমপাস করছে । একজন আবার আমাদের দিকে ঘাড় তুলে একটা পেনসিল হিল সমান উচ্চতার হাই তুলে আবার নিজের পায়ের ফাঁকে মুখটা গুঁজে দিলো । বুঝলাম এরা আমাদের ঠিক তেমনটা করে ভাবেনি যতটা করে ভেবে এরা বস্তাওয়ালা বা কাগজ প্লাস্টিক কুড়ানি দেখলেই পিছনে ধাওয়া দেয় ।

আরো কিছুটা এগোনোর সাথে সাথেই দেখি এক টোটোওয়ালা খুব দ্রুত তার বাহন নিয়ে বড় রাস্তা টপকে যাচ্ছে । আমি আমার খানদানী বাজখাঁই হেঁড়ে গলাটা একটু ঝেড়ে নিলাম, - ঐ টোটো ।

টোটো একটু ব্রেক কষে চার পা সামনে এগিয়ে স্থির হলো । আমরা উঠে বসলাম । টোটোওয়ালা বেশ স্মার্ট ছেলে । আমাদের হাবভাবেই বুঝে নিল যে আমরা স্টেশন যাবো ট্রেন ধরতে । কারণ এই ভোর রাতে আর তো কোথাও যাওয়ার উপায় নেই পিঠে টুরিস্ট ব্যাগ বওয়া দুটো মানুষের ।

আমরা যা যা ভাবছিলাম, তার কিছুই হলোনা । টোটোর ভাড়া মিটিয়ে রেলের টিকিট কাউন্টারে এসে হাল্কা ভীড় পেলাম । মনে মনে ভেবেছিলাম এতো ভোর ভোর কে আর আসবে ! তার উপর আজ বৃহস্পতিবার । পরিপূর্ণ কর্মদিবস । কিন্তু সব ভাবনার মুখে ছাই ঢেলে দিল বুমেরাং কপাল । ডিজিটাল টাইম টেবিল বোর্ড আর মুখ ঝুলিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা টিকিট পর্যবেক্ষক জানান দিল আমাদের কাঙ্খিত বাহনটি দুই নম্বর প্ল্যাটফর্মে দাঁড়িয়ে আছে ।

আমরা অতি উৎসাহের সাথে নতুন ওভারব্রীজ দিয়ে দুই নম্বরে নামলাম । আব্দুল ইঞ্জিনের সামনের দিকের জেনারেল কামরায় ওঠার কথা বললো । আমিও সায় মিলিয়ে সামনের দিকে গেলাম । কিন্তু সামনের দিকে একটাও জেনারেল বগি পেলাম না । একটা কামরা ছিল বটে, তবে তার অর্ধেকটা ছিল ডিস্এবেলড্ দের জন্য আর বাকি অর্ধেকটা ছিল রেলরক্ষী বাহিনীর জন্য সংরক্ষিত ।

আমরা আরপিএফ এর এক কনস্টেবল কে ধরলাম একটু বসার জায়গা করে দেওয়ার জন্য । সে বিনয়ের অবতার হয়ে জানালে পিছনের দিকে দুখানা জেনারেল কামরা আছে । ওদিকে গেলে আমরা বসার সীট পেয়ে যাব । আর এখানে সীট পেতে গেলে খরচ করতে হবে ।

আমরা অগত্যা পিছনের দিকে আবার হেঁটে গেলাম বেশ খানিকটা । একটু খুঁজতেই বসার জায়গা জোগাড় হয়ে গেলো । এরপর তো আর আমাদের কিছু করবার নেই । এখন শুধুই ট্রেন ছাড়বার অপেক্ষা ।

বসেই রয়েছি দুই জন । গাড়ি আধ ঘন্টা লেট করে ছাড়লো । আমরা নিউ জলপাইগুড়ি স্টেশন এসে নামলাম সাড়ে নয়টায় । সুপারফাস্ট দার্জিলিং মেইলের এহেন মালগাড়ির থেকেও খারাপ পারফরমেন্সে বেশ মুষড়ে পড়লাম আমরা দুইজন ।

এরপর হয়রানির আরও বাকী ছিল । স্টেশন থেকে বেরিয়েই সামনে সারি বেঁধে দাড়ানো গাড়ির লম্বা লাইন । পাল পাল দালাল আর ড্রাইভারে ছয়লাপ গোটা চত্বর । কেউ বলছে গ্যাংটক, কেউ ডাকছে দার্জিলিং । আমরা দুইজন শেয়ারে যাব ঠিক করেই এসেছি । রিসার্ভ গাড়িতে গেলে খরচ প্রায় পনের গুণ মতো ।

এক দালালের খপ্পরে পড়ে গেলাম । সে বললে জন প্রতি দু'শো টাকা পড়বে । আমরা রাজী হয়ে গেলাম । সে আমাদের খানিকটা পথ তার সাথে টেনে নিয়ে গিয়ে একটা কালো স্করপিও গাড়িতে বসিয়ে দিলো আমাদের ।

গাড়িতে আমরাই দুজন । আর কেউ নেই । দালালটাকেই প্রথমে ড্রাইভার ভেবে নিয়েছিলাম আমি । ঐ হতভাগা বললো বেশিক্ষণ নাকি এখানে বসে অপেক্ষা করতে হবে না আমাদের । ওর নাকি আরো জনা আটেক প্যাসেঞ্জার ধরা হয়ে গেছে । তারা পাশেই কোথাও একটা টিফিন করতে গেছে । একটু সময় পরেই চলে আসবে ওরা । আর ওরা এসে গেলেই নাকি গাড়িটা ছেড়ে দেওয়া হবে ।

আমি বরাবরই একটু সহজ বিশ্বাসী আবেগপ্রবণ । তাই খুব সহজেই বারবার ঠকে যাই । আমার মত সাধাসিধে কে ঠকিয়ে ঠাকুর করাটা এমন কিছু হাতিঘোড়া ব্যাপার নয় । আমরা বসে আছি তো আছিই । প্রায় মিনিট কুড়ি পরে আরো দুজন প্যাসেঞ্জার এসে আমাদের গাড়িতে উঠল । একটি মেয়ে আর তার বাবা ।

শিলিগুড়িতে রোদের তেজ ভয়ঙ্কর । আমরা ট্রেন থেকে নামার পর থেকেই সেটা হাড়েহাড়ে টের পেয়ে গেছি । আর তার উপর যে গাড়িটায় এসে ঢুকে বসলাম, তার ভিতরটা যেন একটা ফায়ার প্লেস । আমরা প্রায় তেলেভাজা জাতীয় হয়ে যাচ্ছিলাম ভিতরে বসে বসে ।

আমাদের তো খিদেটাও বেশ জাঁকিয়ে পাচ্ছিলো । অত ভোরে জল ছাড়া আর কিছু মুখে দেওয়ার সুযোগ ছিলো না । ট্রেনে আসতে আসতে কিষাণগঞ্জে আমরা চা আর গুড্ ডে বিস্কুট খেয়েছিলাম অল্প করে । এবার আব্দুল গিয়ে আনারস কাটিয়ে নিয়ে এলো শালপাতায় ভরে ।

এই ফলটা ছাড়া আমি প্রায় সব ফলই খেয়ে ফেলতে পারি ভালোবেসে । এটা খেলেই আমার জিভে চুলকুনি শুরু হয়ে যায় । আর আব্দুল বেচারি সেটা কি করে জানবে ! সুতরাং অতি বিতৃষ্ণার সাথে আমি কয়েক টুকরো নিজের জন্যে রেখে বাকিটা আব্দুলের শালপাতায় উপুড় করে দিলাম ।

ইতিমধ্যে আরো জনা চারেক যাত্রী এসে হাজির । এখন আমরা আটজন হয়ে গেছি । হতভাগা ড্রাইভারের কোনও খবরই নেই । সবমিলিয়ে প্রায় এক ঘন্টারও বেশি সময় ঐ দমবন্ধ করা ভ্যাপসা পচা গরমে ঐ গাড়ির ভিতর বসে বেকড্ হতে লাগলাম আমরা । দরদর করে ঘামছি । কেউ বলবেনা দেখে যে আমরা অত ভোরে স্নান সেরেই বের হয়েছি ।

সবার প্রথমে আমিই মুখটা খুললাম । কতক্ষণ আর এ হেন হয়রানি ভোগ করতে হবে তা নিয়ে দুই এক লাইন বলতে না বলতেই আরেক যাত্রী আমার সুরে সুর মেলালো । সে জানালো যে এখানে নাকি ভাড়াও বেশী নিচ্ছে । আমরা যদি মহানন্দা ব্রীজের মুখ থেকে শেয়ারে গাড়ি ভাড়া করি, তবে নাকি জনপ্রতি একশো তিরিশ টাকা পড়বে । এইসব সুর বেড়ে সমবেত সঙ্গীত হতে খুব বেশী মুহূর্ত লাগলো না । আমরা আর কালবিলম্ব না করে ওই গাড়ি থেকে যে যার মালপত্র নামিয়ে নিয়ে একসাথে হাঁটা শুরু করলাম অটো স্ট্যান্ডের দিকে ।

এখানে পদে পদে দালালেরা অপেক্ষা করে থাকে দেশি বা বিলিতি মোরগ জবাই করবার জন্য । গাড়ি ছেড়ে চলে যাওয়ার সময়েও সেটাই ঘটল । আমরা আর এতে কোনও গুরুত্ব দেওয়ারই প্রয়োজন অনুভব করলাম না । এসেছি বেড়াতে, আনন্দ করতে । ঝগড়া বিবাদ করে মন খারাপ কেন করবো ।

অটোস্ট্যান্ডে এসে আমরা আটজন মিলে একটা বড়োসড়ো অটোয় উঠে পড়লাম । শিলিগুড়ির প্রচন্ড গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা সকলের । উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার হলো এই স্থান । আর ট্র্যাফিক জটও একেবারে শিবঠাকুরের জটার মতো বিনুনী পাকানো । অবশেষে আমরা দার্জিলিং মোড় অবদি চলে এলাম ।

এখানে এসেও আবার এক প্রস্থ অপেক্ষা করতে হলো । অবশেষে ভাঙলো শর্বরীর প্রতীক্ষা । শেয়ারে ভাড়া করা বুলেরোর নেপালী ড্রাইভার গাড়ির ইঞ্জিনে স্টার্ট দিলো । কিছুটা পথ যাওয়ার পরেই একটা পেট্রোল পাম্পে ঢুকে পড়লো আবার । এখানেও বেশ কিছুটা অপেক্ষার পড় গাড়ি এবার পুরোদমে দৌড় লাগালো ।

বেশ কিছুটা পথ চলল শুধুই শহুরে কংক্রিটের জঙ্গল । তারপর এলো সেনাবাহিনী অধ্যুষিত এলাকা । আরো বেশ কিছুটা চলার পর শুরু হলো চা বাগান । সবুজ রঙের ঘনত্বের তারতম্য পথের দুইপাশ জুড়ে । কখনো মসৃণ ঝকঝকে রাস্তা দিয়ে কখনো বা খোলা জানলা দিয়ে মন যেন উড়ান দিল কল্পনার ডানায় ভর করে ।

চা বাগানের মনোরম শোভা কাটতে না কাটতেই এসে পড়লো অতিকায় সব শালের সীমাহীন জঙ্গল । সেই নিবিড় বনভূমির মাটিতে সূর্যের আলো প্রবেশেও যেন কত অসুবিধা । আস্তে আস্তে শালগাছ কমতে লাগলো আর দুইপাশ জুড়ে বাড়তে থাকলো অন্যান্য নাম না জানা লম্বা লম্বা গাছ । ভূমির উচ্চতাও যে ক্রমশঃ বাড়ছে তা বুঝতে পারছিলাম মাথা আর দেহের সামনে পিছনে আসা যাওয়ায় । পাহাড়ে চড়তে লাগল গাড়িটা । একটু করে সিধা যাই তারপর আবার ডাঁয়ে বাঁয়ে কাত হয়ে যাওয়া ।

এই গাড়িটাতেও ড্রাইভার সহ এগারো জন বসতে পারে । আমি আর আব্দুল মাঝের সীটে বসেছিলাম । আব্দুল গাড়ির বাঁদিকের উইন্ডো সীটে বসেছিল । আর ওর পাশেই আমি । আমার ডানদিকে দুটি মেয়ে বসেছিলো । আর পিছনের সীটে ওদের দুজনের বাবারা । সামনের সীটে ড্রাইভারের বামদিকে বসেছিল আরও দুইজন মহিলা ।

গাড়ি চলতে চলতেই আমার কাছে অফিসের কাজের সংক্রান্ত পরপর তিনখানা কল এলো । আমি কথা বলতে বলতে বারবার কল ড্রপ করছিল নেটওয়ার্কের অভাবে । আমাদের পিছনের সীটে যারা বসেছিলেন, তাদের একজন আমি কোন দপ্তরে কর্মরত জানতে চাইলেন কথা বলার পরে জানা গেল উনিও আমার দপ্তরে করণিক ছিলেন এবং সারাজীবনটাই নিজের জেলায় চাকরি করে এসেছেন । ওনার বাড়ি বালুরঘাটে । মেয়েকে নিয়ে চলেছেন দার্জিলিং, স্নাতকোত্তরে ভর্তি করবার জন্য । পাশে রয়েছে মেয়েটির বান্ধবী । সেও ভর্তি হবে । বিষয় জানা গেল জুওলজি ।

আমি ভদ্রলোকের সাথে একথা সেকথা বলতে বলতে হঠাৎ করে আমার পাশের মেয়েটি তার পাশে জানলার ধারে বসে থাকা বান্ধবীকে জিজ্ঞাসা করলো অ্যান্টিরেগিং ফর্ম নিয়ে । আমি ব্যাপারটা নিয়ে ওদের কাছে জানতে চাইলে ওরা জানালো যে আজকাল ঐ ফর্মে ছাত্রছাত্রীদের একটা লিখিতভাবে হলফনামা জমা দিতে হয় যাতে তারা প্রতিশ্রুতি দেয় কোনভাবেই কোনও জুনিয়রকে পীড়ন না করবার ।

আমি বললাম আমাদের স্নাতক অবস্থায় বিধানচন্দ্র কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের উত্তরবঙ্গের পুন্ডীবাড়ি ক্যাম্পাসে আমাদের সাথে হওয়া মানসিক নির্যাতনের কথা । সেখানে আমি উদ্যানবিদ্যা নিয়ে সাম্মানিক স্নাতক স্তরে ভর্তি হয়েছিলাম । তখন টানা দুই তিন মাস ধরে সিনিয়ারদের অধিকাংশই আমাদের স্বাভাবিক জীবন যাপন দুর্বিষহ করে তুলেছিল । আমি এবং আমার মতন আরো কিছু ছাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ের পরবর্তী কাউন্সেলিং এ মূল ক্যাম্পাস নদীয়া জেলার মোহনপুরে স্থানান্তরিত হওয়ার সুযোগ পাই এবং হাঁফ ছেড়ে বাঁচি ।

তখন ছাত্র সংসদে ছিল সি.পি.এম সমর্থিত এস.এফ.আই. সংগঠনের নেতা দাদাদের ব্যাপক রমরমা । এরা মুখেই বড়ো বড়ো বাঘ সিংহ ভালুক গন্ডার শিকার করে ফেলত । অথচ নিজেদের স্বার্থসিদ্ধির জন্যে যে কোনও রকমের জঘন্য কাজকেই প্রচ্ছন্নভাবে মদত দিত । উত্তরবঙ্গের পুন্ডীবাড়ি ক্যাম্পাসটি ছিল এদের মূল ঘাঁটি ।

এই নেতাগুলি আপ্রাণ চেষ্টা করত আমাদের কচি মাথাগুলো কে চিবিয়ে খাওয়ার । আমরা কেউ কেউ যুক্তির প্যাঁচ কষতে গেলেই চরম হেনস্থার শিকার হয়ে যেতাম । এইসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে চারপাশের পাহাড় জঙ্গলের পথের বাঁকের ঝরণার শোভা দেখতে দেখতে মেঘের রাজ্য ঘুমে ঢুকে পড়লো আমাদের গাড়ি ।

ঘুম একটা অতি মনোরম নিঝুমপুরী বলেই মনে হত আমার । অনেক বছর আগে একবার মা বাবা বোনের সাথে ছোটবেলায় এই দিকে এসেছিলাম । সেবার আমরা দার্জিলিং আর মিরিক ঘুরে গেছিলাম । এখানেই আছে পৃথিবীর উচ্চতম রেল স্টেশন । এখানে গোটা এলাকাটাই কেমন যেন ধোঁয়া ধোঁয়া । খোলা জানলা দিয়ে এক ঝলক ঠান্ডা কনকনে হাওয়া ছুটে এল ।

ঘন্টা খানেক আগেও আমরা দরদরিয়ে ঘামছিলাম । উচ্চতা বাড়ার সাথে সাথে এ হেন পরিবর্তনে মনে যেন শীতল ফুরফুরে বাতাস বয়ে গেল । এখন বুঝলাম কেন কালিদাস থেকে হালফিলের শ্রীজাত, সকলেই প্রায় জীবনের কোনও না কোনও সময় মেঘ নিয়ে কিছু না কিছু শব্দ খরচ করে গেছে । পারলে এখনো যাবে ।

বারবার চোখের সামনে ভাসছিল কঙ্কনা সেনশর্মা, অপর্ণা সেন আর মিঠুন চক্রবর্তী অভিনীত তিতলী সিনেমার সেই সব দৃশ্য আর মনে পড়ছিল ঋতুপর্ণ ঘোষের কথায় শ্রীকান্ত আচার্যের গাওয়া সেই অসাধারণ গান খানা - মেঘ পিওনের ব্যাগের ভিতর মন খারাপের দিস্তা ।

ঘুমের ঘোর কেটে গেল আর কিছুক্ষণের মধ্যেই । প্রবেশ করলো গাড়িটা দার্জিলিং শহরে । ভেবেছিলাম এখানে এসে একটু মনটা ভালো লাগবে । কিন্তু আবার খেই হারিয়ে যেতে লাগলাম ইঁট কংক্রিট পাথরের শহরে । রাস্তার দুইপাশ জুড়ে গায়ে গায়ে জড়ো করা বাড়ির ভীড় । আর রাস্তার হালও খুব একটা প্রশংসনীয় নয় । এলাকার কোথাও কোথাও চাপা একটা বিকট গন্ধ । নোংরা স্যাঁতসেঁতে আধা অন্ধকার ঘিঞ্জি সরু গলি ।

তবে একটা অভ্যেস দেখলাম প্রায় সব বাড়িতেই সমানভাবে চালু । বারান্দায় পাঁচিলে ছোট ছোট ফুলের টব বা পলিপ্যাকে মাটিভর্তি করা ফুলের চারা । আর ফুলগুলিও ঠান্ডাজনিত কারণে বেশ সতেজ ঝরঝরে । পাহাড়িদের মন যে ফুলের মতই কোমল রঙিন মনোরম তার কারণ বোধহয় অনেকটা এটাই ।

অবশ্য এরা সকলেই ভারি কষ্টসহিষ্ণু ও পরিশ্রমী । ছেলেদের সাথে মেয়েরাও সমানভাবে পাল্লা দিচ্ছে যে কোন ব্যবসায় । আবার কোথাও মহিলারাই বেশি সক্রিয় জীবিকার প্রশ্নে । হিলকার্ট রোড ধরে আসার পথে বেশ কিছু জায়গায় মহিলাদের দেখেছিলাম পিঠে বিশাল বড় একটা থলে বা ঝুড়ি । আর তা মোটা কাপড়ের ফিতে দিয়ে মাথার সাথে সেট করা । মাথা ঘাড় মেরুদন্ড পিঠ আর কোমরের এমন পরিশ্রমী ব্যবহার দেখলে স্তম্ভিত হতেই হয় আমার মতন শহুরে বাবুদের ।

অধিকাংশ মানুষই এখানে পর্যটন জীবিকার সাথে সরাসরি বা পরোক্ষভাবে জড়িত ও আর্থ সামাজিক ভাবে পিছিয়ে পড়া । তবে শহরের ছেলেমেয়েরা এমনকি অনেক বয়স্করাও দেখলাম প্রায় পশ্চিমী আদব কায়দায় কমবেশী রপ্ত পোশাক পরিচ্ছদে ও হাবে ভাবে ।

আমরা দুইজন গাড়ি থেকে টাউনের মাটিতে পা রাখলাম । শহরের কোনও দিক থেকেই আজ কাঞ্চনজঙ্ঘা দেখা যায়নি । এমনকি এমনটাও শুনলাম কয়েকদিন ধরেই নাকি এমনটাই অবস্থা আকাশের । মেঘ বৃষ্টি আর ধোঁয়া ধোঁয়া ভাবে আচ্ছন্ন গোটা শহরটাই । মুডটা একটু ডাউন হয়ে গেল । মনটাকে আশ্বাস দিলাম, সবুর কর্ ব্যাটা ।

গাড়ি থেকে নামার সাথে সাথেই আবার মুখোমুখি হয়ে গেলাম আরেকজন দালালের । সে আমাদের গাড়ির পাশেই এসে দাঁড়িয়েছিল । আব্দুল আর আমি নামার সাথে সাথেই সে এগিয়ে এসে আমাদের পাকড়াও করে নিল । ওর চেনা জানা নানা হোটেল এর গল্প করতে লাগলো ।

আমি একদৃষ্টে লোকটির দিকে চেয়ে রইলাম । লোকটি মাঝারি উচ্চতার, একেবারে কুচকুচে কালো পোড়াটে গায়ের রঙ, মাথায় তেল চপচপে ঠাসা চুল আর ঐ রকম মেঘলা কুয়াশা ভরা দিনেও চোখের উপর একটা কালো কাচের সানগ্লাস । ওর পরনে ছিল হাতে বানানো টেরিকটের ফুলপ্যান্ট আর গায়ের উপর চাপানো ছিল চামড়ার একটা জ্যাকেট আর সেটাও কালো রঙেরই । লোকটার লম্বাটে চৌকো গোছের মুখের অবয়ব । চামড়াটাও সামান্য কুঁচকানো । আমরা ওকে আমাদের বাজেটের কথা শুনিয়ে দিলাম । ও আর কিছু না বলে ইশারায় নিয়ে চলল আমাদের । আমরা দুজন ওর পিছু নিলাম ।

আমাদের দুজনেরই পিঠে ঝোলানো ব্যাগ । আমার টা অনেকটাই ছোট । ওটার ভিতর রাখা ছিল কিছু শুকনো খাবার আর টাকা পয়সা সহ এ.টি.এম. কার্ড । লোকটা আমাদের হিলকার্ট রোডের ডানদিকে একটা খাড়া সিঁড়িপথে কিছুটা উপরে নিয়ে গেলো আমাদের ।

আমরা প্রথম যেই হোটেল এ গিয়ে উঠলাম, সেটার ব্যাবস্থাপনা মোটামুটি ভালো । কিন্তু রুমভাড়া বলল আড়াই হাজার, থাকা ও খাওয়া সহ । আমাদের সেটা একেবারেই মনঃপূত হলোনা । আমরা খাব নিজের মর্জিমতো । আর সেটা বাইরে বের হয়ে । হোটেলে বসে খেলে তো ঘরেই থাকছি বলে মনে হবে । সেটা আমরা একটুও চাইছিলাম না । আমরা এসেছি ঘুরতে । ঘরে বসে খাবার খেতে নয় । হোটেল নেওয়ার কারণ হাল্কা গরম জলে স্নান করে রাতে কম্বলের নীচে ভালো করে একটা সলিড ঘুম দেওয়া আর দৈনন্দিন নিত্যকর্মগুলো ঠিকঠাক করে সম্পন্ন করা । কারণ পাবলিক টয়লেট আমার ঠিক চলে না ।

আমি সরাসরি না বলে দিয়ে লোকটাকে অন্য হোটেল দেখাতে বললাম । এরপর সে আমাদের নিয়ে গেল বিগ বাজারের দিকে । বিগ বাজার এর ঠিক একটু আগেই জয় কমপ্লেক্স । একটি বড়োসড়ো শপিং মল গোছের । আমরা ওর সংলগ্ন গলির ভিতর ঢুকে পড়লাম দালালটিকে লক্ষ্য করে । দার্জিলিং শহরটা সত্যিই বেশ জমজমাট । চারদিকে রাস্তার দুইপাশ জুড়ে শুধুই দোকান আর দোকান ।

আর পনের পা চলার পরেই আবার একটা হোটেলে ঢুকলাম । নাম শেরিং ড্যানজোংপা । রিসেপশনে ঢুকে যে ছেলেটির সাথে আলাপ হলো, সে বাঙালী । মালদার চাঁচলের দিকটায় বাড়ি । ও আমাদের যে ঘর দেখালো, তা আমাদের হিসেবে ভালোই মনে হলো । পরিচ্ছন্ন অ্যাটাচ বাথরুম ওয়ালা কার্পেট পাতা ছোট ছোট ডবল বেডরুম ঘর । বেশ ছিমছাম্ । আমরা দরাদরি করে দিনপ্রতি সাড়ে ছয়শো টাকায় রফা করে নিলাম ।

ছেলেটা সব দেখিয়ে দিয়ে গেল আমাদের । জল গরম করা ছিলো না । আব্দুল গরম জলের কল না খুলে সরাসরি ঠান্ডা জলে স্নান করতে গিয়ে হাড় অবদি কেঁপে গেল । এরপর আমি হাল্কা গরম জলে স্নান সেরে ফ্রেশ হয়ে নিলাম । আমাদের বেশ খিদে পাচ্ছিল । এখানে আসার পথে সোনাদার পরে আমাদের গাড়িটা একবার হল্ট দিয়েছিল । তখন আমরা ভেজ মোমো খেয়েছিলাম । চারপাশ জুড়ে শুধু পাহাড় আর বিশাল বিশাল গাছের সারি । এমন পরিবেশে পাহাড়ি রাস্তার বাঁকে ছোট ছোট গুমটির মত ধাবা থাকে । এমনই একটা ছোটোখাটো দোকানে আমরা মিনিট কুড়ি ছিলাম । সেই সময়ের খাওয়া মোমো তো এখন কোথায় পৌঁছে গেছে ।

আব্দুলকে সাথে নিয়ে নেমে গেলাম হোটেল ছেড়ে খানিকটা নীচে বাজারের ভীড়ে । এদিক ওদিক ঘুরতে ঘুরতে আমরা এসে থামলাম বাস স্ট্যান্ডের দিকটায় । একটু হাল্কা হাল্কা শীত শীত ভাব ছিল চারপাশে । এখানকার লোকালদের গায়েও হাল্কা গরম পোষাক । এমন পরিবেশে গরম গরম এগ চাওমিন আর ডিমসেদ্ধ ভাজা খেতে বেশ লাগলো ।

আসার পথে আব্দুল বলছিল টয়ট্রেন চড়বে । আমরা এবার স্টেশনের দিকে জোরে জোরে পা চালালাম টয়ট্রেন চলার সময় জানতে । ইউনেস্কোর ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের স্বীকৃতি পাওয়া দার্জিলিং হিমালয়ান রেলওয়ের সান্নিধ্য আমিও মনে মনে চেয়েছিলাম । খাওয়ার স্টল থেকে প্রায় মিনিট বারো পায়ে হেঁটে চলার পরে চোখে পড়লো দার্জিলিং রেল স্টেশন ।

মিটারগেজ লাইনের উপর খেলনা গাড়ির মতো সাজানো, ছোটো ছোটো কাঁচের জানলা ও চেয়ারকার গোছের গদিওয়ালা সীট বসানো টয়ট্রেন দেখে মনটা ভরে গেল । ইঞ্জিনগুলো সব লাল আর নীল রঙ করা । শুনেছিলাম এখান থেকে নাকি কাঞ্চনজঙ্ঘার দৃশ্য অসাধারণ । কিন্তু এখানে আসা অবধি এখনো পর্যন্ত শুধুই ধোঁয়া আর মেঘাচ্ছন্ন আকাশ ছাড়া আর কিছু চোখে পড়েনি । আর পেয়েছি ঝিরিঝিরি বৃষ্টির সাথে হাল্কা হিমেল হাওয়া ।

প্রথমেই আমরা প্ল্যাটফর্মের টিকিটঘরে গেলাম টয়ট্রেনের টাইমটেবিল জানতে । কাউন্টার বন্ধ হয়ে গিয়েছিল । আমরা আশেপাশের লোকাল ছেলেদের সাথে কথা বলে সময়গুলো জেনে নিলাম । এরপর আমরা আরো কিছুক্ষণ ওখানে ছিলাম । বেশ কিছু ছবি তুলে নিলাম চটপট । তারপর আমরা এগোলাম ঘুমের দিকে ।

হিলকার্ট রোডের মিটারগেজ লাইনের উপর দাঁড়িয়ে রইলাম । পরপর কয়েকটা গাড়ি দাঁড়ালো না । শেষমেষ একটা গাড়িতে পেলাম একেবারে পিছনের সীট । পাহাড়ি পথের আঁকে বাঁকে পিছনের সীটে বসে থাকা বেশ দূরহ ব্যাপার । মাথাটা কমবেশী ঘুরেই যায় কোনও না কোনোও সময় ।

আমরা সমতলে যতই সহজ হয়ে চলি না কেন, পাহাড়ে চলাফেরার গতি অনেকটাই আলাদা । এখানে একটু অসতর্ক হলেই জীবন নিয়ে টানাপোড়েন । আর বর্ষার সময় যেখানে সেখানে আচমকা একটা ধ্বস নামার অর্থ হল জনজীবনে আচমকা একটা ছেদ, অর্থাৎ যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া ।

এখানে আমার একটা ব্যাপার নজরে এলো । পাহাড়ি রাস্তার উপর কোথাও কোনও স্ট্রীটল্যাম্প নেই, যেমনটা আমরা সমতলে দেখতে পাই । এটা নিয়ে ড্রাইভারকে জিজ্ঞাসাও করেছিলাম । উত্তরে জানলাম আলোর জন্যে ওদের চোখ নাকি ধাঁধিয়ে যায় । সামনের দিক থেকে আসা গাড়ির আলো বোঝা যায় না । আর দুর্ঘটনা ঘটার সম্ভাবনা নাকি একশো শতাংশ বেড়ে যায় ।

আমরা ঘুম স্টেশনে এসে নামলাম । সূর্যিমামা তো অনেকক্ষণ আগেই টুপ্ করে ডুব মেরে দিয়েছে । আলো একেবারেই কম । মোবাইলে কিছু ছবি তুললাম বটে, তবে সেগুলো সব কালো কালো এলো । আমরা বুঝলাম পাহাড়ের অন্ধকারে একমাত্র ম্যাল ছাড়া আমাদের আর কোথাও যাওয়ার জায়গা নেই । অতএব পুনরায় আমরা শহর অভিমুখী গাড়ি ধরে নিলাম ।

গাড়িটা আমাদের আবার দার্জিলিং রেল স্টেশনে নামিয়ে দিয়ে শহরে না ঢুকে অন্যপথে ঘুরে গেল । আমরা হাঁটতে থাকলাম । কিছুটা যাওয়ার পর একটা লিকার শপ চোখে পড়লো । আমি মনে মনে স্থির করলাম সন্ধে আর রাত কেমন করে কাটাবো ।

দোকানের সামনে খুব একটা ভিড় নেই আমাদের সমতলের মতো । কারণ একটাই । এখানে চায়ের ঝুপড়ির থেকে মদের দোকান সংখ্যায় অনেক বেশী । এখানকার বাচ্চা বুড়োরা প্রায় সকলেই কমবেশী মদ খায় । আর সেটা আবহাওয়া জনিত কারণে ।

আমি দুটো বীয়ারের ক্যান আর একটা ছোট রেড ওয়াইন নিয়ে নিলাম । আমার ব্যাগটায় কিছু শুকনো ছোলা আর বাদাম রাখা ছিলো । পাশের একটা দোকান থেকে একটু টকঝাল চানাচুর ও নিয়ে নিলাম । আব্দুলের সাথে শুকনো চিঁড়ে আর মুড়িও আছে । আমি আরও এক কিলো আপেল সাথে নিয়ে নিলাম । এবার গন্তব্যস্থল আমাদের হোটেল ।

মিনিট দশেকের ভিতর আমরা হোটেল এসে ঢুকলাম । হাতের সব সরঞ্জাম নামিয়ে আবার বের হলাম ম্যালের পথে । বিগ বাজারের সামনে অবদি গিয়ে দেখি রাস্তার ধারে এক জায়গায় বেশ ভিড় । সামনে গিয়ে দেখি শিক কাবাবের লাইন । আব্দুল জানতে চাইল কতক্ষণ দাঁড়াতে হবে । উত্তর এলো কমপক্ষে আধ ঘন্টা বা তারও বেশী । শুনে আমার পা যেন আরও ভারী মনে হলো ।

এখান থেকে ম্যাল যেতে আমাদের আরো মিনিট পনেরো লাগবে । যাওয়া আসা আর ম্যালে বসা নিয়ে মোটামুটি সাড়ে আটটা । আব্দুল কোনওদিন ড্রিঙ্ক করেনি । ও চাইছিলো আমি যেন একেবারে রাতের খাবার খেয়ে হোটেলের রুমে গিয়ে ঢুকি । তারপরে ড্রিঙ্ক করি । আমি ওকে জানালাম রাতের খাবার খেয়ে অত রাতে মদ খেলে আমার সমস্যা হতে পারে । সকালে ঘুম নাও ভাঙতে পারে । সুতরাং আমার বরং রুমে ফিরে গিয়ে ছোলা বাদাম সহযোগে বসে পড়াই ভালো । ড্রিঙ্ক শেষ করে না হয় খাবার খেয়ে শুয়ে পড়া যাবে । আব্দুল বরং এখানে অপেক্ষা করে শিক কাবাব নিয়ে ঘরে ফিরে আসুক । আমরা বরং আগামীকাল ম্যাল ঘুরে যাব ।

আমি রুমে ফিরে এসে বীয়ারের ক্যান খুলে বসে পড়লাম । বাইরে বেশ ভালোই একটা ঠান্ডা ঠান্ডা ভাব । জীবনে এর আগে কখনো এমন করে পরিবার ছাড়া ঘুরতে বের হইনি । ছোটোবেলায় মা বাবা বোনের সাথে ঘুরতে যেতাম । কেন্দ্রীয় সরকারী চাকরি সূত্রে বাবা প্রতি চার বছর অন্তর অন্তরই এল.টি.সি. পেতেন ।

তখন বাবার চাকরির সুবাদে দক্ষিণ, পশ্চিম আর উত্তর-পূর্ব ভারতের কিছু কিছু জায়গা ঘুরতে পেরেছিলাম । দার্জিলিং এও সেই সূত্রেই প্রথমবার এসেছিলাম খুব ছোটবেলায় । তারপর আবার আসা গ্র্যাজুয়েশন এর ফাইনাল সেমেস্টারে কালিম্পং হর্টিকালচারাল রিসার্চ সেন্টার এ আসার সুবাদে ।

এর আগের বার গুলোতে ভালো করে ঘোরার সুযোগ ছিলো না । এবার তো আর অন্যের ভাবনার ইচ্ছাধীন নই । এবার ইচ্ছে আছে টাইগার হিল গিয়ে সানরাইস দেখার আর তার সাথে উপরিপাওনার মতো কাঞ্চনজঙ্ঘার উপর সূর্যের প্রথম আলো পড়ার অসাধারণ অভিনব দৃশ্য । তবে আকাশের যা অবস্থা যাচ্ছে, তাতে বিগত শেষ দশদিন যাবৎ কারো ভাগ্যেই টাইগার হিলের মনোরম সূর্যোদয় উপভোগ করবার মতন সৌভাগ্য ঘটেনি । জানিনা কি অপেক্ষা করে আছে আমাদের কপালে ।

সাত পাঁচ ভাবতে ভাবতেই আব্দুল এসে দরজা ঠেলে ঘরে ঢুকে পড়লো । একটা হাতে প্যাকেট করা শিক কাবাব সহ অন্যান্য খাবার আর অন্যহাতে কেনা জলের দুই লিটারের একটা বোতল । ওর আসার ভিতরেই আমার কিংফিশারের একটা ক্যান শেষ । ওকে বললাম কালকের দিনের প্রোগ্রামটা নিয়ে ভাবনা চিন্তা করতে । ও বললো কথা হয়ে গেছে । কাল আমরা ভোর চারটেয় উঠে নীচের বাসস্ট্যান্ডে চলে গেলেই নাকি ওখান থেকে অনেক গাড়ি পেয়ে যাবো । আমি দার্জিলিং এর সাইট সীন দেখবার কথাও তুললাম । ও বললো সেটাও নাকি ট্যাক্সিস্ট্যান্ডে গিয়েই রফা করা যাবে ।

আমরা খাওয়ার দিকে মনোনিবেশ করলাম । আমার দ্বিতীয় বীয়ারের ক্যানটাও ততক্ষণে প্রায় শেষের পথে । একটু জলদি জলদি খাচ্ছি মনে হয়, কারণ হাল্কা মতন ধরেছে এতক্ষণে । এবার একটা সিগারেট ধরানো যাক্ ।

শিক কাবাব টা এক কথায় অসাধারণ করেছিল । আব্দুল বলছিল চিকেন আর রেড মীট নাকি ভালোই চলে এখানে । চিকেন্ মাটন্ বীফ্ পর্ক সবকিছুই এখানে সহজলভ্য, যদিও দামটা বেশ  বেশী । সবকিছুই তো এখানে সমতল থেকে টেনে আনার ব্যাপার । তাই জীবনধারণের খরচ এখানে আর পাঁচটা পাহাড়ি শহরের মতোনই ।

আর এখানে তো জনসংখ্যাও মিশ্র । হিন্দু বৌদ্ধ খ্রীষ্টানরাই সংখ্যায় বেশী । আগে এদিকে বাঙালীরাও ছিল সংখ্যায় ভালোই । এখন পাহাড়ে বাঙালী পর্যটক সংখ্যায় বেড়েছে ঠিকই কিন্তু বাঙালী অধিবাসী সংখ্যায় অনেকটাই কমে গেছে । তবে মাড়োয়ারী আর বিহারীরাও এখানে সংখ্যায় খুব একটা কম নেই । আর গোর্খারা এখানে সংখ্যায় সবচেয়ে বেশী । এরপরেই আছে লেপচা আর ভুটিয়ারা । একমাত্র মুসলিমরা এখানে সংখ্যায় সবচেয়ে কম ।

আমরা খাওয়া দাওয়া সেরে কম্বলের নীচে দেহ এলিয়ে দিলাম । সারা দিনের জার্নির ক্লান্তি আর পেটে পড়া অ্যালকোহলের যুগলবন্দীতে চোখের ভারী হওয়া পাতা আর খুলে রাখা অসম্ভব হয়ে পড়লো । বিড়বিড় করতে করতে ঘুম এসে গেল ।

________________________
30.09.2016. (শুক্রবার)
---------------------------------------

আব্দুলের মোবাইল অ্যালার্মটা পরপর বেশ কয়েকবার বাজলো বলে মনে হলো । আমি শুনেও যেন কিছুই শুনতে পেলাম না । আরো ভালো করে কম্বল মুড়ি দিয়ে ভিতরে সেঁধিয়ে গেলাম । শেষমেষ যখন প্রায় ধাক্কা খেয়ে আড়মোড়া ভেঙে উঠলাম বিছানা ছেড়ে, তখন পাঁচটা বেজে কুড়ি ।

আব্দুলের বাথরুমের কাজকর্ম সব সারা হয়ে গেছিলো । ও একেবারে ফ্রেশ হয়ে নিয়েই আমায় ডেকে তুলে দিলো । আমার বিছানা ছেড়ে কিছুতেই নীচে নামতে মন করছিলো না । তবুও নেমে চটিটা পায়ে গলিয়ে বাথরুমে গেলাম মুখে ব্রাশ গুঁজে ।

কলের জল কনকনে ঠান্ডা । আমি বললাম জলটা গরম না করালে বাথরুম করাও কষ্টকর । ইতিমধ্যে রুমের বেলটা বেজে উঠলো । অর্থাৎ রুম সার্ভিস গরম গরম চা নিয়ে হাজির । আমি চটজলদি ফ্রেশ হয়ে নিলাম । প্রায় ঠান্ডা চা টা খেতে খেতেই একটা প্রোগ্রাম সেট করা হলো । এখানে চা দেওয়ার সাথে সাথেই খেয়ে নিতে হয় । একটু দেরী করলেই ওটা কোল্ড টী হয়ে যায় ।

আমরা ঠিক করলাম সবার প্রথমে বাস আর ট্যাক্সি স্ট্যান্ডেই যাব । ওখানে কথাবার্তা আর জিজ্ঞাসাবাদ করেই সিদ্ধান্ত যা নেওয়ার নেব । আগের থেকে সাত পাঁচ ভাবতে যাব না । ঘর লক করে দুজনে নেমে এলাম ।

আমার আবার চা খেতে ইচ্ছে করছিল । সাথে সিগারেট । নীচে নেমে একজন বৃদ্ধার গুমটির সামনে গিয়ে দাঁড়ালাম । আমি সচরাচর দুধ চা খুব একটা খাই না । আর খেলেও খুব কড়া লিকার দিয়ে খেতে পছন্দ করি । কারণ দুধের একটা বিশেষ গন্ধ আছে, যেটা আমার খুব অস্বস্তিকর মনে হয় । আর দুধ চায়ে একটা সরের মতো পড়ে যায় । যেটা মুখে আটকে গেলে আমার একদম ভালো লাগে না ।

চারপাশের দোকানপাট সবকটাই প্রায় বন্ধ । আমি চা শেষ করে এখানকার লোকাল সিগারেট শিখর টানতে টানতে আব্দুলের সাথে বাসস্ট্যান্ডের দিকে গেলাম । ফাঁকা চত্বরে একটামাত্র বাস দাঁড়িয়ে । কথা বলে জানলাম টুরিস্ট বাস । হোটেলের মাধ্যমে বুকিং করতে হয় । বাসের মায়া ছেড়ে আমরা এবার ট্যাক্সি স্ট্যান্ডের দিকে গেলাম ।

আমাদের দিকে জনা কয়েক দালাল গোছের লোক আর ড্রাইভার এগিয়ে এলো । ওরাই বলতে লাগলো কোথায় কোথায় ওরা যাবে আর ভাড়া কত নেবে । আমরা শেয়ারে যাবার তাল করেছিলাম । কিন্তু এখানে এসে নিজেদের সম্পূর্ণরকম একলা পেলাম । সুতরাং গাড়ি রিসার্ভ করে নেওয়া ছাড়া আমাদের কাছে দ্বিতীয় আর কোনও পথও খোলা ছিলোনা ।

ওরাই জানালো টাইগার হিলের সানরাইস দেখতে হলে ভোর চারটে নাগাদ বের হতে হয় । নয়তো এই সময় অতটা পথ গিয়ে কোনও ফায়দা নেই । আর কাঞ্চনজঙ্ঘাতেও সূর্যোদয়ের আলো পড়ে একটা অসাধারণ ভিউ নাকি তৈরী হয় । তবে এই দেখাগুলো সব নাকি বিরাট কপালের ব্যাপার । কারণ আজকেও যারা গিয়েছিল ভাড়া গুনে, সকলেই শূন্য হাতে ফিরে এসেছে । আর এই না দেখার ব্যাপারটা বিগত দশ-এগারো দিন ধরে একই রকম ভাবে ঘটে চলেছে ।

আমরা একটু মুষড়েই পড়েছিলাম, গোদা বাংলায় যাকে বলে হতাশ হওয়া । শেষমেষ চোদ্দোশো টাকায় একটি ছেলের সাথে রফা করা গেল । কথা হলো সে ঐ টাকায় আমাদের জাপানি মন্দির, পিস্ প্যাগোডা, রক গার্ডেন, ওয়াটার ফলস্, টিবেটিয়ান রিফিউজি ক্যাম্প ও হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস সেন্টার, লেবং টি এস্টেট, রোপওয়ে, হিমালয়ান জুলজিক্যাল গার্ডেন আর মাউন্টেনিয়ারিং ইনস্টিটিউট দেখিয়ে দেবে । আমরা রওনা দিয়ে দিলাম আর সময়ের অপচয় না করে ।

সবার প্রথমে আমরা গেলাম জাপানি টেম্পল আর পিস্ প্যাগোডার পথে । রাতভর একটানা ঝিরঝিরি বৃষ্টি আর মেঘলা আকাশ চারপাশের পরিবেশে একটা অন্য মাত্রা এনে দিয়েছিলো । আমাদের গাড়ি একটু নীচেই ছেড়ে দিলো আমাদের । এবার আমাদের বাকি পথটা পায়ে হেঁটেই ওঠানামা করতে হবে ।

আমরা গাড়ি থেকে নেমে খাড়া পথে উঠতে শুরু করলাম । সম্ভবত আমরাই ছিলাম ওখানে সেদিনের সর্বপ্রথম টুরিস্ট । পিচঢাকা ভিজে রাস্তার বামদিকে খাড়া পাহাড়ি দেওয়াল আর অপরদিকে গভীর খাদ । দেওয়ালের গায়ে লেগে আছে ফার্ণ । কোথাও বা পাথরের গায়ে ছোপ ছোপ ছত্রাক আর শ্যাওলা জমাট বেঁধে আছে । আর ডানদিকের খাদের গা বেয়ে সোজা আকাশের মাথা ছুঁয়ে উঠে গেছে বিশাল উঁচু পাইন আর রডোডেনড্রন । আর খাদের ওপারে গাছের ফাঁক দিয়ে উঁকি মারছে সুবিশাল ঢেউ খেলানো নীলাভ সবুজ হিমালয় যার খাঁজে খাঁজে জমাট বেঁধে আছে নানা ঘনত্বের মেঘ ।

আমরা এখন অনেকটাই উপরে রয়েছি । কারণ নীচের দিকে অনেক বাড়ি দেখা যাচ্ছে বিন্দুর মতোন । ধপধপে সাদা পিস প্যাগোডা আর জাপানি মন্দির দেখে মনের সব অশান্তি যেন মুহূর্তের ভিতর কোথায় গায়েব হয়ে গেলো । প্যাগোডার দেহে দেখলাম অসামান্য শিল্প সুষমা । স্মিতহাস্যে তথাগত গোটা উপত্যকা জুড়ে বিলিয়ে দিচ্ছেন অপরিসীম অনাবিল নির্মল আনন্দ ।

আমি সামনের দিকচক্রবালের দিকে চেয়ে রইলাম । দেবতাত্মা হিমালয় যুগ যুগ ধরে কত অগুনতি মনীষীর সাধনক্ষেত্র । কত হাজার তীর্থক্ষেত্র সারা হিমালয় জুড়ে । দূরের ঘন গাঢ় নীল পাহাড়গুলো হাতছানি দিয়ে ক্রমাগত ডাকছে আমায়, বলছে আরও কাছে যেতে । অপার সৌন্দর্য্য ছেয়ে আছে চারপাশ জুড়ে । শুধু চোখ কান নাক ত্বক শিরা উপশিরা দিয়ে তার নিগূঢ় অনুভব, যা শুধু শব্দ খরচ করে বোঝানো যায় না ।

আমি আর আব্দুল প্রাণ ভরে নিঃশ্বাস নিলাম, ছবি তুললাম । তারপর ধীরপায়ে নেমে গেলাম নীচের গাড়ি পার্কিং এর জায়গায় । অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা ঘিরে ধরছিলো আমাদের দুই জনকে ।মনে হচ্ছিল যেন অনন্তকাল ধরে এই পরম নীরবতা বজায় থাকবে । এই স্তব্ধতা ছিন্ন হয়ে গেল কাস্টমার কেয়ার থেকে আসা অযাচিত একটি ফোনে । ততক্ষণে আমাদের গাড়ি ছুটতে শুরু করেছে রক গার্ডেন আর ওয়াটার ফলসের দিকে ।

রক গার্ডেন যাওয়ার পথটা খুবই খারাপ । দার্জিলিং শহর ছাড়ার পর থেকে আমরা প্রকৃতির অসাধারণ রূপ মাধুরীতে আবার বিহ্বল হয়ে গেলাম । রাস্তা কোথাও খাড়া কোথাও খুব সরু । পথের বাঁক কোথাও কোথাও বেশ তীক্ষ্ণ ।

আব্দুলের ভিতর একটা চাপা উত্তেজনা লক্ষ্য করছিলাম । আমরা সমতলের লোকজন এমন করে গাড়ি চেপে পাহাড়ের আঁকে বাঁকে দোল খেতে খেতে ঘুরতে অভ্যস্ত নই একেবারেই । অনেকের আবার গাড়ির তেলের গন্ধ বা গাড়ির দুলুনি সহ্য হয় না । অস্বস্তিতে অনেকেরই পেটের খাবার মুখে উঠে আসে, মাথা ঘোরায় । দুর্বল বোধ করে ।

আমাদের তেমন কিছু দুর্ঘটনা এখনো ঘটেনি এ পর্যন্ত । একের পর এক পাহাড় পেরিয়ে চড়াই উৎরাই ডিঙিয়ে অবশেষে আমাদের গাড়ি রক গার্ডেন পৌঁছে গেলো । আমি আর আব্দুল অবাক হয়ে দেখতে লাগলাম ঝরণার জলের লাফিয়ে লাফিয়ে এলোচুলে নীচের দিকে ক্রমাগতঃ নেমে আসা ।

দুজনে মিলে কিছু অসাধারণ ভ্যিউ মোবাইলে বন্দী করে ফেললাম চড়াই বেয়ে ঘোরানো সিঁড়িপথে চড়তে চড়তে । কোথা থেকে যে এই জল নেমে আসছে জানি না । হয়তো এটা কোনও হিমবাহের বরফ গলা জলের একটা অংশমাত্র ।

সিড়ি ভেঙে উপরে চড়তে চড়তে কোমরটা যেন বার বার ধরে ধরে যাচ্ছিল । আর সেটা যেন সকলের কম বেশী হতেই হবে, এমনটা ধরে নিয়েই একটু উপরে উপরেই বেঞ্চি পাতা । কাঠের পাটাতনের গাঢ় সবুজ রঙ আর পাহাড়ের গায়ের ঘন সবুজ রঙ যেন মিলে মিশে একাকার । নীচ থেকে তাকিয়ে সেটা বোঝারও উপায় নেই ।

উপরে যতখানি ওঠা সম্ভব, ঠিক ততখানিই উঠে গেলাম আমরা সময় নিয়ে নিয়ে । আমার এমনিতে তেমন কোনও সমস্যাই হচ্ছিলো না একমাত্র মাঝে মাঝে একটু কোমর ধরে নেওয়া ছাড়া । সেটাও যেন সম্পূর্ণ উপরে উঠে যাওয়ার আনন্দে কোথায় যেন বেমালুম গায়েব হয়ে গেলো ।

আমি আর আব্দুল চুপচাপ ওই মাথায় কিছুক্ষণ বসে রইলাম । চারপাশে শুধু নানা রকম পাখি আর বুনো ঝিঁঝিপোকার ডাক । আর কলকল করে বয়ে চলা ঝরণার জলের অবিরাম নিরলস শব্দ । দূরের আকাশের রঙ আর মেঘেরা বার বার নিজেদের অবস্থান বদল করছিল । ঝলমলে রোদ কখনো কখনো উঁকি মেরে আবার গায়েব হয়ে যাচ্ছিল মেঘের আড়ালে ।

আবার আমরা নীচে নামতে লাগলাম । নামার সময় ঢালু পথে দেহ যেন খুব স্বাভাবিক ভাবেই স্বতঃপ্রণোদিত হয়ে ক্রমাগত নীচের দিকে ঝুঁকে পড়ছিলো । চলার গতি নিয়ন্ত্রণ করতে রীতিমত সমস্যা হচ্ছিলো আমাদের । তার উপর ঝরণার জলের ছিটে আর রাতভর ঝিরিঝিরি বৃষ্টিতে ভিজে গোটা পথটাই যেন বেশ পিচ্ছিল বলে মনে হচ্ছিলো ।

ওঠার সময় আবেগ আর আনন্দে এতকিছু লক্ষ্যই করিনি । আর এখন সবকিছু খুঁটিনাটি গুলোও নজরে পড়ছে । পাথরগুলো সব মোটামুটিভাবে কালোই । তবে কোথাও কোথাও রঙের তারতম্যে বেশ অন্যরকম লাগছিল । চারপাশে অসংখ্য গাছপালা । ফার্ণ আর নাম না জানা বুনো ফুলের ছড়াছড়ি । আমি একটা ফুলের একটু কাছে এগিয়ে গেলাম । খুব জোরে দমভরে বাতাস টানলাম । একটা হাল্কা হিমেল হাওয়ার সাথে ভেসে এল কিছু নাম না জানা জংলী ঘ্রাণ ।

মনের ভিতরে অদ্ভুত সব অনুভুতিরা যেন দলবেঁধে কিলবিল করছিলো । নিচে গাড়িতে বসে থাকা ড্রাইভারটি একবার কল করেছিলো । আমরা আর দেরী করলাম না । শুধু নীচে নেমে একটা জলের বোতল আর নোনতা বিস্কুট কিনে  আবার গাড়িতে উঠে বসলাম ।

আমাদের ড্রাইভারটির নাম হৃদয় । ছেলেটি বেশ চনমনে প্রকৃতির, প্রাণবন্ত । কথাবার্তা বেশ নরম সহজ সাবলীল এবং ঝরঝরে । আমরা বিস্কুট খাওয়ার সাথে সাথে ওকেও খাওয়ালাম । ও আবার আমাদের পুরানো পথেই ফেরত আনলো । এরপরে গাড়ি ছুটলো লেবং টি এস্টেটের পথ ধরে ।

এবার আমাদের গন্তব্য টিবেটিয়ান রিফিউজি ক্যাম্প ও হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস সেন্টার । এই দিকের পথটা বেশ খাড়া । মাঝে মাঝে মেঘেরা এসে ভীড় করছিলো গাড়ির চারপাশে । আবার কখনো কখনো মেঘের আড়াল থেকে রোদের তেজে অবাক হয়ে দেখছিলাম প্রকৃতির অসাধারণ লুকোচুরি খেলা । মাঝে মাঝেই হাল্কা ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ফোঁটা নেমে আসছিল উইন্ডস্ক্রীনের উপর ।

রিফিউজি ক্যাম্প পৌঁছাবার একটু আগেই আমি হৃদয়কে বললাম গাড়িটা একটু থামানোর কথা । আব্দুলও খেয়াল করেনি ব্যাপারটা । নেমেই পরপর ছবি তুলে নিলাম গোটা কয়েক ।

বড়ো বড়ো লোমওয়ালা ছোটো ছোটো ভুটিয়া কুকুরছানা । এমনিতেই ওরা আকারে ছোটোখাটো । এগুলো যেন আরও ছোট । একটাকে মালিকের হাতে তুলিয়ে স্ন্যাপ নিলাম । ওদের কে ধন্যবাদ জানিয়ে আবার উঠে পড়লাম গাড়িতে ।

টিবেটিয়ান রিফিউজি ক্যাম্পে সবার আগে গেলাম মনাস্টারী তে । শান্ত নির্জন নিরালায় মুহূর্তের ভিতর মেঘ ঘনিয়ে এলো । চারপাশ জুড়ে শুধুই ধোঁয়া এবং ধোঁয়া । ছবিগুলো ভালো করে তোলাই হলো না ।

মনাস্টারীর ভিতরে একজন বৃদ্ধা তিব্বতী মহিলাকে দেখলাম ওনাদের নিজস্ব সংস্কৃতির পোষাকে । বিশালকায় সোনালী পাতে মোড়া ধর্মচক্রকে তিনি বয়সের উপেক্ষা করে অনায়াসে ঘুরিয়ে চলেছেন । নিজেও ঐ চাকাকে প্রদক্ষিণ করছেন আর ক্রমাগত বিড় বিড় করছেন অর্ধোন্মীলিত চোখে ।

এমন স্বর্গীয় মুহূর্তকে আবার মোবাইল ক্যামেরায় বন্দী করতে দেরী করলাম না । সিঁড়ি বেয়ে আমরা নেমে এলাম টিবেটিয়ান হ্যান্ডিক্র্যাফ্টস্ সেন্টার ও চিত্র প্রদর্শনীশালায় । দেখলাম চীনাদের অত্যাচার আর দাপটের তথ্যচিত্র । ওঁদের ধর্মগুরু দলাই লামার ছবি আর কথাগুলো যেন আমায় বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যাচ্ছিল ওনাদের হারিয়ে যাওয়া আর হেরে যাওয়ার ইতিহাস ফ্রেমে । চারপাশের নিস্তব্ধ পরিবেশে আমরাই ছিলাম সেই মুহূর্তের একমাত্র পর্যটক ।

আমরা গিয়ে দাঁড়ালাম খাদের কিনারায় । তাকালাম নীচের দিকে । নীচের দিকে জায়গায় জায়গায় পাহাড়ের ভাঁজে ভাঁজে পেঁজা তুলোর মতোন জমাট বেঁধে রয়েছে সারি সারি মেঘ । আর তার ফাঁক দিয়ে দিয়ে মাঝে মাঝে বিচ্ছিন্নভাবে দেখা যাচ্ছে গাড়ি চলা কালো পিচ ঢাকা রাস্তা ।

চারপাশে আরও যেন মেঘেরা ঘনিয়ে এলো । আমরা গাড়িতে উঠে বসে পড়লাম । হৃদয় এবার ছুটলো লেবং টি এস্টেটের পথে । জানলার কাঁচ আমরা তুলে দিলাম । কানে মাফলার দিলাম । বেশ জমাটি হাওয়া দিচ্ছিলো । কিছুক্ষণ পরে পরেই দুই কান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে । সেই অভিজ্ঞতা ভাষায় ব্যক্ত করা যায়না । কেবল এইটুকুই বলতে পারি যে শুকনো গলায় ঢোক গিললে কানের পর্দা কেমন যেন পট্ পট্ করছিলো ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি