কবিতা নিয়ে
কবিতা রক্তের ভিতর থেকে আসে।। বই থেকে নয়।। তাহলে সাহিত্যের সব অধ্যাপকই বড় কবি হয়ে যেতেন ।। আমাদের মধ্যে খুব কম মানুষই আছেন যাঁরা চর্যাপদ থেকে আরম্ভ করে মঙ্গলকাব্য শ্রীকৃষ্ণ কীর্তন মাইকেল বঙ্কিমচন্দ্র শরত্চন্দ্র কালিদাস মুকুন্দরাম বিদ্যাসাগর রবীন্দ্রনাথ নজরুল জীবনানন্দ বুদ্ধদেব বসু শক্তি সুনীল জয় ।ওদিকে শেক্সপিয়র থেকে আরম্ভ করে শেলি কিটস বাইরন মিলটন কাফকা কামু রাঁবো এলিয়ট এজরা পাউন্ড সেফেরিস এবং হাল আমলের বাংলা তথা আমেরিকা ইউরোপ এসিয়া ও অস্ট্রেলিয়া ল্যাটিন আমেরিকার কবিদের লেখা কম বেশি পড়েন নি। কিন্তু এই বিশাল পড়াশোনা নিয়ে কতজন ভালো লিখতে পারছেন ।। কেউ লিখেছেন কাঠ কাঠ কেউ লিখছেন হ্যটফ্যাট কেউ এখনও শব্দের ভাঁজ এবং কবিতার শিরা চিনতে হিমশিম ।।
পড়া বিদ্যা 10 % কাজে লাগে কবিতার ক্ষেত্রে । পড়াটা জরুরি না হলে কবি আবদ্ধ হয়ে পড়েন ।। কিন্তু কবিতা induced হয় অন্য রসায়নে।। আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক হল এই আকাশ মাটি গাছ প্রকৃতি মানুষ এরা। এদের মধ্যেই লুকিয়ে আছে কবিতার রসায়ন ।।
কোনও স্বঘোষিত নামী সংস্থার কর্ণধার হলেই বড় কবি হওয়া যায় না কি।। আগে তো 2000 কবিতা লিখুন ।। বিনয় মজুমদার 12000 কবিতা লিখে বলেছিলেন যে -আমি কবিতা লিখি এবং বুঝেছি আমি কবিতা লিখতে জানি না । । যখন একটি কবিতা আসে হৃদয়ের কম্পন থেকে, যখন শব্দের ক্ষরণ শুরু হয় unexplained রসায়নের দ্বারা তখন সেই ব্রাহ্ম মুহূর্তে কবিকে ঠেলে দেয় একটি nothingness বা অজ্ঞানতার দিকে যখন পূর্ব জ্ঞান খুব বেশি কাজে আসে না । আর শব্দ আসতে থাকে, তৈরি হয় কাঠামো ।। রবার্ট ব্রাউনিং প্রথমে বলতেন - আমি যা লিখি তা আমি জানি আর ঈশ্বর জানেন । পরে বললেন আমি যা লিখি তা আমি জানি না, ঈশ্বর জানেন ।। এই তো কবিতা ।। কবিতা ফতোয়া মানে না । জ্ঞানের আস্ফালন বোঝে না । সে বোঝে মানুষ প্রকৃতি আর নানান জটিল থেকে জটিলতর উন্মেষ প্রকাশ জারিত হওয়া এবং দেখা দেখা দেখা ।।
পিকাসোর জীবনী আমরা কি জানি ?
তাই কে কী বলছেন সেটা খুব বেশি ব্যাপার নয় । ব্যাপার হল আপনি কী বুঝছেন, কতটা বুঝলেন । শব্দের বিন্যাস ও বুনন দেখলে বোঝা যায় কবি কতটা গভীরে আছেন ।। ফাঁকি খুব সহজে ধরা যায় । এর জন্য চোখ অনুভূতি ষষ্ঠ ইন্দ্রিয় দরকার আর দরকার কবিতার সাথে কোলাকুলি । শব্দের মধ্যে ঈশ্বর বিরাজ করেন ।। তাই শব্দ ব্রহ্ম, ছেলে খেলার বিষয় নয় ।
.. কবিতা কী-কেন-কখন-কেমন ইত্যাদি-প্রভৃতি নিয়ে হাজার কথা বলা হয়ে গেছে আরো হাজার কথা বলা হবে... কিন্তু তাতেও কি সেই অধরা মাধুরীকে মুঠোর মধ্যে পাওয়া যাবে... নৈব নৈব চ...
আমার প্রশ্ন কবিতার সংজ্ঞাকে কিছু কখনোই চিহ্ন-প্রকরণ দিয়ে কয়েকটি বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ করে ফেলা যায় কি... নাকি তাকে নিয়ে কোনো জ্ঞানগর্ভ তত্ত্ব খাড়া করা যায়... ব্রহ্মবাদীরা যেমন ব্রহ্মের স্বরূপ নির্ণয় করতে হিমসিম খেয়েছেন... কিন্তু তাকে কোনো সংজ্ঞার বশীভূত করতে পারেননি... কবিতাও তাই... তাকে সংজ্ঞা দিয়ে চিবিয়ে চিবিয়ে এঁটো করা যায় না... শুধু কিছু ছিবড়ে শব্দ বেরিয়ে আসে...
সুতরাং বন্ধুগণ কবিতা লিখতে চান লিখুন... মনের সুখ-দুঃখ-আনন্দ-ক্ষোভ-হতাশ যা কিছু আছে সব দিয়েই লিখুন... তবে চাপ নেবেন না... বড়ো কথা বড়ো ভাবের সোনার হরিণের পিছনে ছুটবেন না... ছোটো করে ভাবুন ...সহজ করে ভাবুন... যা মনে আসছে লিখে ফেলুন... নিজেই বিচার করে দেখুন আপনার সেই প্রকাশ প্রথাগত ভাবের মধ্যেই আটকে রইল ... না কিছু নতুনের বার্তা নিয়ে হাজির হল...
তবে হ্যাঁ... পড়াশোনা অবশ্যই চাই... দেবী কী ছিলেন ... দেবী কী হইয়াছেন... সেটা না বুঝলে দেবী কী হইবেন সেটা ভাবা একটু অসম্ভবই বটে...
তাই দরজা-জানলা খোলা রাখুন... মুক্ত বাতাসে বুক ভরে নিঃশ্বাস নিন... তারপর চেষ্টা করে দেখুন শব্দ ও ভাবের খেলায় কতটা মেতে ওঠা যায়...
দলাদলি ... কাদা ছোড়াছুড়ি ... এসব নিয়ে যত কম বলা যায় ততই ভালো...
এই সভ্যতা ও সমাজ গোটাটাই একতা ধাপ্পাবাজির উপর দঁড়িয়ে আছে... কারণ তা প্রতিষ্ঠানবাজদের কব্জায় ... কিন্তু আমরা নিহিলিজিমের পক্ষে নই ... আমরা জানি প্রতিষ্ঠানবাদিতার পাশাপাশি একটা প্রতিষ্ঠানবিরোধিতার স্রোতও ছিল আছে থাকবে...এই দুইয়ের সঙ্ঘর্ষেই নতুন সংলাপের জন্ম হয়... যা আমাদের ভাবনা-চিন্তাকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে চলে...
Comments