স্বর্গ

/এক/

আকাশটা বেশ কালো করে এসেছে । ঘন সরের মতো জমাটি ঠান্ডা একটা বাতাস বয়ে গেল গা বেয়ে । আধবোজা ঢুলুঢুলু চোখে মুখ তুলে চাইলাম চালাঘরের দরমার ফাঁক দিয়ে । দূরে কোথাও বৃষ্টি পড়ছে হয়তো । বেলা বারোটা বেজে গেছে সেই কখন । দুই চোখের পাতা লেগে এসেছিলো নিজেরই অজান্তে, ক্লান্তির অনভ্যাসে । মেঘের কড়কড়ানিতে আমেজটা একেবারেই চটকে গেলো এবার । নাহ্, আর বসে থাকা ঠিক হবে না । তিনদিন ধরে শরীরে কোনও সাড় পাচ্ছিনা । কিছু খেতেও পারছিনা । তাও এখন ছুটতে হবে কালিন্দীর পাড়ে সজিনাহাটের চরে । ওখানে হাড় বজ্জাত অমানুষ কালুধোপা এখন কাপড়ের গাঁঠ তৈরী করে সাজিয়ে রাখছে আমার আসার অপেক্ষায় । দেরি হলে তো মার খাবই আর খাওয়াও বন্ধ । কারণ ওই আমার সবেধন নীলমণি একমাত্র মনিব ।

/দুই/

আমার কিন্তু কাজে মন নেই একটুও । আর কি করেই বা থাকা সম্ভব ! ওই বেআক্কেল বুদ্ধুটার তো কোনও হদিসই নেই । কতগুলো দিন হয়ে গেল । কোথায় যেন উবে গেল হতভাগা গাধাটা । ও থাকলে সব কাজ যেন নিমেষে হয়ে যেত । কি যে ম্যাজিক জানতো ব্যাটা ! যে কোনও বোঝা, তা সে যতই ভারী হোক্ না কেন; তাকে অবলীলায় নিজের পিঠে চাপিয়ে মাইলের পর মাইল সে ছুটে চলে যেতে পারত পঙ্খীরাজের মতো । আর এখন কোনও কাজেই তিলমাত্র মন লাগছেনা আমার । তাই ফাঁক পেলেই এখন চরে চরে বনে বাদাড়ে ঘুরে ফিরছি । কাশের বন, বাংলা ভাটা, কলাই-পাট-শশার ক্ষেত, ভগবানদাসের আমবাগান টপকে এলাকার ইঞ্চি ইঞ্চিতে ঐ গাধাটার গায়ের সুবাস খুঁজে ফিরছি ।

/তিন/

আদতে আমি কিন্তু সত্যি সত্যিই একটা আস্ত নিরেট গাধি । নাহ্, গালি নয় । সত্যিই জন্মসূত্রে আমি একটি গাধি বিশেষ । জন্মের দিন কয়েক পরেই বিক্রি হয়ে গিয়েছিলাম কালুধোপার কাছে । কালু আমাকে নগদ পাঁচ হাজারে নিয়েছিল । অত ছোটবেলার কথা খুব বেশি মনে নেই । শুধু চোখে আটকেছিল মায়ের ভেজা চোখের তাকিয়ে থাকার করুণ দৃশ্য । আর সেদিনও ছিল শ্রাবণের ভরা বাদল । রাতভর বৃষ্টিতে ভেসে গেছিল সারা কালিন্দী । কোথাও কোথাও জেগে থাকা চরগুলো ছিল সেই কেনাবেচার একমাত্র সাক্ষী । মায়ের ভেজা চোখ, ভাইবোনদের অবাক ভাব আর খৈনিটেপা মিশকালো কালুধোপার একমুখ হাসি মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছিল সেই মেঘভাঙা রাতে ।

/চার/

এখানে আসা অবধি আজ পর্যন্ত কালুধোপা আর ওর দ্বিতীয় পক্ষ আমাকে বিশ্রাম দেয়নি একটা দিনও । মাল টানা আর গাল খাওয়া; কখনো সখনো মার - এই হলো জীবন । তবে এতকিছুর পরেও মনে শান্তি ছিল মনে । কারণ একটা বন্ধু ছিল আমার; প্রকৃত সমব্যথী । আমার হতভাগা বুদ্ধুরাম । গাধা হলেও নির্বোধ ছিল না সে । কালুধোপা ওকে নিজের ছেলের মতোই ভালোবাসত । ওই ছিল আমার একমাত্র খেলার সাথী । মার খেয়ে মন খারাপ হলেই ও ছুটে আসত আমার এই চালাঘরে । এসেই নাক মাথা ঘষত গায়ে । পায়ের খুর মাটিতেে ঘষে নিজের অস্তিত্ব জানান দিত । বোঝাত; ও পাশেই আছে । আমি জানতাম ঐ বুদ্ধুটাও আমার মতোই আশ্রিত । আমিও অপেক্ষায় গুনতাম প্রহর । আর এখন আমি সময় গুনতেও যেন ভুলে গেছি । এখন আর আমি কারও অপেক্ষায় কান খাড়া করে থাকিনা । লেজও প্রয়োজন ছাড়া নাড়াই না । আমি জানি, সবকিছু আমার আয়ত্তে নেই । আর উপরওয়ালাও সবার সব প্রার্থনা মিনতি কানে তোলেন না । তাই কারো দয়া করুণার পাত্রী হতে চাইনা আমি ।

/পাঁচ/

জানিস বুদ্ধু, তোকে খুব্ মনে পড়ছে আমার । জানিনা কেউ বা কারা তোকে কিনে নিয়ে গেলো কিনা । জানিনা তোকে হাইওয়ের উপর কোনও গাড়ি পিষে দিলো কিনা । জানিনা তুই কোথায় হারিয়ে গেলি আমায় ফেলে রেখে । তোর কি একটুও মনে পড়েনা রে এই হতচ্ছাড়ি গাধি টার কথা ! তোর কি মনে পড়েনা সজিনার চরে একসাথে নরম রসালো বুনোঘাসের ফাঁকে আমাদের লুকোচুরি খেলা, শরতের বিকেলে মেঘলা হাওয়ায় কাশবনে ছুটে ছুটে বেড়ানো ! কাপড়ের গাঁটের ভার বয়ে চলা হয়তো সহজ কিন্তু জীবনের ভার ! অবহেলার ভার ? এই মালবাহী জীবনের ভার আর টানতে ভালো লাগছে না আমার । এবার আমিও তোর পথেই চলবো । অনির্দিষ্ট অজানার পথে অনিশ্চিত দিগন্তে পা বাড়াবো । হয়তো বা কোনও এক মাহেন্দ্রক্ষণে দেখা পাবো তোর বা তোর ছায়া এসে মিলিত হবে একদিন আমার দেহাতীত অনুভূতির সাথে । জানিনা, সেই মুহূর্তে আমার ইন্দ্রিয়গুলো তোকে চিনতে পারবে কিনা । কারন বয়স আমার থেমে নেই । অনুভব ও অনুভূতিরা ধুয়ে মুছে এখন সব কালিন্দীর জলে ভেসে গেছে । তারা এখন হয়তো বা মিশে গেছে আমার মা ভাইবোনের চোখের জলের সাথে একই দিকচক্রবালে মেঘের আড়ালে । হয়তো তারা এখন রামধনু সেজে ফুটে উঠেছে তোর মনে, তোর জগতে অপর কোনও গাধির মুখের ঘাসের আগায় ।

/ছয়/

সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে ধীরপায়ে হাঁটতে হাঁটতে যখন কালুর কাছে গিয়ে হাজিরা দিলাম, নিজেকে মনে হচ্ছিল যেন ঠিক কাঠগড়ায় দাঁড়ানো আসামী । দেরী করার অপরাধে বিস্তর কুকথা ও গালমন্দ খেতে হল । আর পিঠেও বেশ কয়েক ঘা জুটল । আমি তো পেটেও খাইনি । দিন কয়েক না খাওয়ার জন্য দুর্বল শরীরে মার সহ্য হলো না । মাথা ঘুরে বসেই পড়লাম । কিন্তু সেটা কালুর পক্ষে অসহনীয় ছিল । অনেক গুলো কাজ নিয়ে ওর দিনভর ব্যস্ততা । এটাও ঐ কাজেরই একটা অংশ । অতএব ও টেনে তুলল আমায় । চাপিয়ে দিলো ইয়া মস্ত একটা কাপড়ের বোঝা । আমার পা গুলো থরথর করে কাঁপছিল । দুর্বলতার আতিশয্যে আবার ধরিত্রী গ্রহণ করলাম । আবার ঘা কয়েক পড়লে না উঠে পারলাম না । উপায়হীন অবলার কে আছে আর এই দুনিয়ায় !

/সাত/

আকাশ জুড়ে মেঘেরা একজোট হয়েছে আজ । সবার মুখেই কমবেশি বাঁকা ভ্রুকুটি । ঠিক এমনই এক মেঘলা দিনে শেষবারের মতো দেখেছিলাম আমার বুদ্ধুকে । গুমোট আকাশ । ঝড় আসন্ন প্রায় । অথচ এক ফোঁটা হাওয়া বইছে না । আমার পা টলছে । ফেনা উঠছে মুখ দিয়ে । দুর্বল শরীর আর পিঠের দুর্বিষহ ভার আবার ফেলে দিলো আমায় । এবার একেবারে মুখ থুবড়ে রাস্তায় । আর সাথে সাথে চারপাশ জুড়ে নামল জমাট অন্ধকার । ছুটে আসছিল মালবোঝাই একটা বড়সড়ো ট্রাক । ড্রাইভার হয়তো শেষ চেষ্টা করেছিলো । কিন্তু শেষ রক্ষা হলো না । ওর ডানদিকের সামনের একটা চাকা উঠে এলো আমার উপর । আহ্ .... অবশেষে কি মুক্তি এলো তবে !

/আট/

চোখ মেলে চাইলাম । দেখি হতভাগা বুদ্ধু তাকিয়ে রয়েছে । মিটিমিটি হাসছে । আমি খুব সহজেই উঠে দাঁড়ালাম । আর কোনও ক্লান্তিবোধ নেই, নেই কোনও যন্ত্রণা ও । সব যেন কোথায় উবে গেছে । আকাশ টা নীল । চারপাশে কচি ঘাস । সবুজ রঙে রঙিন গোটা এলাকা । চারপাশে কোনও ঘর নেই । নেই কালুধোপার মতো অমানুষ । পাশ দিয়ে বইছে নাম না জানা নদী । কাঁচের মতোন টলটলে জলে আকাশের ছায়া পড়েছে । এ আমি কোথায় এলাম রে বুদ্ধু ! বুদ্ধু এগিয়ে এলো । আমার গা ঘেঁষে দাঁড়ালো । ওর চোখের উজ্জ্বল মণিতে ভেসে উঠলো একটা ছোট্ট শব্দ - স্বর্গ ...

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি