অসুখ
অসুখ – নির্মাল্য সেনগুপ্ত
১)
“একটা বিশাল উঁচু পাহাড় থেকে পড়ে যাওয়ার সময়ে কেমন লাগবে তোমার? ঠাণ্ডা হাওয়ার চাপ এসে বুকে লাগছে, অভিকর্ষের ফলে মুখের চামড়া টেনে পিছনে চলে আসছে, ঠিকরে বেড়িয়ে আসছে চোখের মণি, নিশ্বাস নেওয়া অসম্ভব, শুধু অপেক্ষা কখন নীচে পৌঁছবে। কখন শেষ হয়ে যাবে এই সমস্ত বিরক্তিকর সমস্যা। নাকি মনে মনে ভাববে একটা ডাল হাতের সামনে পেলে ভাল হত। বা আবার যদি কেউ ধরে তুলে দিত পাহাড়চূড়োয়, বলত “এইবার হয়নি ঠিক করে৷ আবার চেষ্টা কর। “
“তুমি কী ভাবতে?”
রেশমি এখন সম্পূর্ণ উলঙ্গ। ওর বুকের কাছে জানলার ফাঁক দিয়ে একটা গ্লাস রডের শেপের রোদ্দুর এসে পড়েছে যার মধ্যে ধুলোর ব্রাউনীয় সূত্র মেনে পাগলের মত ওঠা নামা দেখা যাচ্ছে। রেশমির পায়ের কাছের নরম, প্রায় কাপড়ের মত হয়ে যাওয়া বালিশের কোণা থেকে জর্জরিত কিছু তুলো উঁকি মেরে রয়েছে। চারিদিকে অসম্ভব নোংরা। বিছানার চাদর, বালিশের উইয়ার, খাটের ছদরি, সবেতেই প্রায় পুরু ধুলোর আস্তরণ। আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল৷
রেশমি পাশের বিড়ির প্যাকেট থেকে একটা বিড়ি বের করে জ্বালাতে জ্বালাতে বলল, “আমি? আমি কী ভাবতাম?” তারপর খিলখিল করে হেসে ফেলে বলল, “আমি তো তাই জন্যই কোনওদিন পাহাড়ে যাইনি। যদি পড়ে যাই? যদি ফিরে আসতে ইচ্ছে করে?”
আমি আর কিছু না বলে উঠে পড়লাম। আমার জিন্সটা সোফার পিছনে লুকোনোর বৃথা চেষ্টা করছে। সেটাকে পাকড়াও করে এনে আমি ফিট বাবু হয়ে গেলাম নিমেষে। তারপর “চলি এখন।“ বলে বেরিয়ে পড়লাম ওর বাড়ি থেকে৷
“ভুল হচ্ছে, ভীষণ ভুল হচ্ছে। এটা কোনও সম্পর্ক হতেই পারে না। “
এই কথাগুলো গত তিনমাসে আমি নিজেকে বহুবার বলেছি। বহুবার বুঝিয়েছি রেশমির সঙ্গে থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। রেশমির পরিবারের সবাই মানসিকভাবে অসুস্থ। রেশমির বাবার একটা মুদি দোকান, সেটা একেবারেই চলে না। তার কারণ ভদ্রলোকের অকথ্য ব্যবহার। রেশমির মা বদ্ধ উন্মাদ। তিনি বাড়ির পিছনে বসে থাকেন সারাদিন। কোনও অজ্ঞাত মানুষকে উদ্দেশ্য করে গালাগালি করেন। সারাটাদিন তাঁর এভাবেই কাটে। সন্ধে হলে রেশমির বাবা তাঁকে জোর করে টানতে টানতে ঘরে নিয়ে যায়। রেশমির ভাই এরও মানসিক সমস্যা। সে পাড়ায় চেঁচিয়ে গান গাইতে গাইতে দৌঁড়ে বেড়ায়। মেয়েদের দেখলে ছুঁতে চায়, বুকে হাত দেওয়ার চেষ্টা করে, অশ্লীল গান করতে করতে শিস দেয়। প্রথম প্রথম মার খেত খুব। আজকাল মার খায় না৷ খোরাক করে পাড়ার লোকে। বাস্তব জগতে বিনোদনের খুব অভাব। মানুষ মজা খোঁজে সবেতেই। তা যতই নিষ্ঠুর হোক না কেন৷ নিষ্ঠুর বিষয় বরং আরও বেশি আনন্দ দেয়।
আমরা সবাই ছোটবেলার থেকেই জানি রেশমির পরিবারের কথা। ওর ভাইএর নাম কার্তিক পাগলা। আমাদের বয়সীই হবে। ক্লাস টেন অবধি আমার সাথেই পড়ত। এরপর একটা পাগলকে পড়িয়ে পয়সা নষ্ট করতে চাননি ওর বাবা। তাই ছাড়িয়ে দেন। কার্তিকও ভীষণ উৎসাহ পেয়ে নিজের সঙ্গীতচর্চায় মন দেয়। প্রথমে ব্রজদের ফেলে দেওয়া হারমোনিয়ামটা কুড়িয়ে আনে মাঠের পিছন থেকে। তাতে মাত্র ন'খানা রিড৷ বাকিসব অদৃশ্য হয়েছে। ফলে হারমোনিয়ামটাকে অবিকল ফোকলা ঠাকুমাদের মত দেখায়। বেলো’র সমস্ত কাপড় উইপোকায় কাটা, তাই সেটা থেকে আওয়াজ তেমন বেরোয় না। কার্তিক গলার জোরে এই অভাব পূর্ণ করার চেষ্টা করে। রোজ সকালে ছাদে উঠে তার রেওয়াজ করা চাইই চাই। এরপর সে শ্রোতা খুঁজতে পাড়ায় বেরোয়। বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার যৌন ইচ্ছা বাড়ে। সে নারীদের শরীরের দিকে হাত বাড়ায়।
স্কুলে থাকতে আমি বহুদিন কার্তিককে আগলে রেখেছিলাম। বাকি পড়ুয়ারা কার্তিককে উত্যক্ত করতে ভালবাসত। মাঝরাস্তায় তার প্যান্ট খুলে দিত, ঘাড়ে বিছুটি পাতা ঘষে দিত, তাকে ধাক্কা মেরে ফেলে, তার চটি কেড়ে ফেলে দিত ড্রেনে। কার্তিক কাঁদত না, উলটে প্রচণ্ড জোরে, “তুম যব মিলোগি মুঝসে, এ খোয়াইশ হেয় কে তুমসে, প্যায়ার হো যায়…” গাইতে শুরু করত। সবাই হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়ত তা দেখে। আমি এইসবে অংশ না নিলেও কার্তিকের রক্ষাকর্তা হওয়ার ইচ্ছে হয়নি আগে। হল, যেদিন ওকে আনতে ওর বাবার পরিবর্তে ওর দিদি এল স্কুলে।
রেশমীর পরণের পোশাক চিরকালই ছিল ময়লা। সংসারে মায়ের অভাব কেউ পূরণ করতে পারে না আমাদের দেশে। তাই রেশমীদের বাড়ি, পোশাক, খাওয়ার বাসন সবই ভীষণভাবে অপরিষ্কার। বাড়ির উঠোনে অশ্বত্থ, বট ইত্যাদি গাছের শিকড় দেওয়াল ফুঁড়ে ঢুকে গাঁথনি আলগা করে ফেলেছে। প্রচুর ঝোপঝাড়, বর্ষাকালে প্রায়ই সাপের আনাগোনা দেখা যায়। আমরা প্রথমে ওদের উঠোনে ক্রিকেট খেলতাম। ওই প্রাণিটি চোখে পড়ার পর তা বন্ধ হয়ে যায়।
মানসিক অবস্থা যাই হোক, রেশমিদের পরিবারের সকলকেই তত্থাকথিতভাবে ভাল দেখতে। কার্তিকের নামকরণের কারণও তাই। বলাই বাহুল্য রেশমিও অসম্ভব সুন্দরী। আমি প্রেমে পড়ে গেলাম। আমার থেকে প্রায় তিন বছরের বড় হবে, কিন্তু তাতে কী? সবাই জানে, প্রেমের কোনও বয়স হয় না। সেইদিন থেকে আমি কার্তিককে আগলে রাখা শুরু করলাম। তাকে বাড়ি অবধি পৌঁছে দেওয়া, তাকে টিফিন খাওয়ানো, হোমটাস্ক করে দেওয়া, সব।
এরপর কার্তিক স্কুল ছাড়ল, আমি কলেজে গেলাম। কিন্তু কোনও মেয়েকেই মনে ধরল না আমার। মাঝে মাঝেই দমকা হাওয়ার মত রেশমি আমার চোখের সামনে চলে আসে, কখনও পার্কে, কখনও ফোনের রিচার্জের দোকানে, আমি ভাবি কবে বলব, কবে জানাব ভালবাসি।
তারপর একদিন সুযোগ পেলাম। রিচার্জের দোকানের নম্বর টুকে রাখার খাতা দেখে মনে মনে মুখস্থ করে নিলাম ওর ফোন নম্বরটা। বাড়ি গিয়েই মেসেজে লিখলাম, “তুমি আমাকে চেন, আমি তোমাকে ভালবাসি। তোমার কী অন্য কেউ আছে?”
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই উত্তর এল, “না নেই। কেউ ছিল না, থাকবেও না।” আমি এত কাব্যিক ভাষা বুঝি না। আমি লেগে থাকলাম। সপ্তাহ খানেক পর রেশমি দেখা করল আমার সঙ্গে। আমাকে ‘হ্যাঁ’ বলে দিল। রেশমি জানে আমি ওর ভাই এর বন্ধু এবং ওর থেকে বয়সে ছোট। কোনওদিন সে এই নিয়ে কথা তোলেনি।
এর সপ্তাহ দুয়েক পর আমি বুঝলাম, রেশমিরও মানসিক অবস্থা মোটেই ভাল নয়।
২)
সেদিন সকালে গেলাম রেশমির বাড়ি। ভাবলাম একবার ওর বাবার সঙ্গে দেখা করে আসি। ও বাদে এই পরিবারে একমাত্র ওর বাবার সঙ্গেই কথোপকথন সম্ভব।
বিক্রমকাকু দোকানে ভ্রু কুঞ্চিত করে বসেছিলেন। বিক্রি খুবই কম, ফলে দোকানের অধিকাংশ জিনিসেই ধুলো, কেরোসিনের গন্ধ আর প্রচুর আরশোলা এবং নেংটি ইদুরে ভর্তি।
আমি নমস্কার করে বললাম, “কেমন আছেন কাকু?”
বিক্রমকাকু গম্ভীরমুখে কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে রইলেন, তারপর বললেন, “কী মনে হয় তোমার?”
আমি থতমত খেয়ে গেলাম। এর কী উত্তর দেব? বিক্রমকাকু রাগী মুখে তাকিয়ে আছেন আমার দিকে।
আমি কথা ঘোরানোর চেষ্টা করে বললাম, “যা শীত পড়েছে, একটা সোয়েটারে মানছে না। সস্তায় কোথায় উইন্ডচিটার পেতে পারি জানেন?”
“আমি ওসব বিক্রী করি না। আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?”
আমি আবার চুপ করে গেলাম। ভাবছি এবার কেটে পড়াই ভাল।
বিক্রমকাকু বলতে থাকলেন, “শীত, হুঁ শীত। আমার আবার শীত কী বর্ষা, হাঁটুতে ব্যথা, কানে শুনতে পারি না রাতের দিকে, গলা খুসখুস সবসময়, আর যাই কর, কোনওদিন বিয়ে কোর না, বুঝলে? সর্বনাশ হয়ে যাবে, সর্বনাশ। একা নিজেকে চালাতে পারছি না বলে বাড়ির লোক বিয়ে দিল, এখন চার জনকে সামলাতে হচ্ছে। আর বুঝেছ ছোকরা, তুমি এদিকে ঘুরঘুর কম কর। চারজনে আমার এই দশা, পাঁচজন আমি পারব না। ওই মেয়ের আমার সব শেষ করে দেবে, সব শেষ করে দেবে। যাও যাও সরে পড় এখান থেকে, আমার কিচ্ছু ভাল লাগছে না, যাও…”
আমি মাথা নীচু করে এগোলাম রেশমির ঘরের দিকে। এই সম্পর্ক থেকে বেরোতে হবে আমাকে।
ঘরে ঢুকতেই রেশমি আমার উপর ঝাঁপিয়ে পরে আমার জামা খোলার চেষ্টা করতে শুরু করল। সম্পর্কের শুরুর দিকে যখন আমি আদর করার বিভিন্ন ফন্দীফিকির খুঁজতাম, তখন রেশমি ছুঁতে দিত না, লজ্জা পেত। কিছুই পারত না ভাল করে। কিন্তু যেই সে শরীরের স্বাদ পেয়ে গেল, এখন প্রত্যেকদিনই ভীষণ উত্তেজিত হয়ে থাকে। একবারে হয় না তার, অনেকবার চাই। কোনও কথা নেই, শুধু যৌনতা। এছাড়া রেশমি কী বলে, আমি তার মাথামুণ্ডু বুঝি না, তবু আমার ভাল লাগে ওকে, দেখতে ভাল লাগে, ওকে আদর করতে ভাল লাগে, দিনে একবার ওর গায়ের গন্ধ না পেলে আমার মনে হয় যেন খাবার পাইনি। কিন্তু এমন পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক করা যায় না। তিন বছর আগে আমার যা বুদ্ধি ছিল, এখন আর তা নেই। এখন আমি বড় হয়েছি, চাকরি করছি, সমাজে একটা ‘ভদ্রলোক’ এর তকমা লেগেছে গায়ে। আমার বাবা বিখ্যাত ডাক্তার, আমি কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ার, বাড়িতে মায়ের বড়লোক বান্ধবীরা আসে, কিটি পার্টি হয়, দামী মদের ছরাছড়ি, আমিও ভাগ পাই তাতে। এমন পরিবার রেশমীকে মেনে নেবে না। পাগল নিয়ে ঘর করা যায় না। রেশমির অর্ধেক কথার কোনও মানে নেই, মাঝে মাঝে তাকে একা একা কথা বলতেও দেখেছি আমি। সে দুঃখের কথায় হাসে, ঘাড় বেঁকিয়ে তাকিয়ে থাকে ফ্যালফ্যাল করে কখনও, সুন্দর বলে আরও ভয়ানক লাগে। সুন্দর চিরকালই খুব বিভৎস হয়।
সুজয় আমাকে বলেছিল, বিশ্বাস না ভাঙলে সম্পর্ক ভাঙে না। যতদিন বিশ্বাস রয়েছে, ততদিন সম্পর্ক থেকেই যাবে। আমি ঠিক করলাম, রেশমির বিশ্বাস ভাঙতে হবে। ও আমাকে সন্দেহ করেনি কোনওদিনই, অন্য মেয়ের সঙ্গে কথা বলতে বারণ করেনি, রাতে ফোন না ধরলে রেগে যায়নি হঠাৎ করে। কিন্তু মেয়ে’ই তো, কিছু একটা করে ফেললে নিশ্চয়ই ওই আমাকে ছেড়ে দেবে। আমি জানি, এই কাজটা কিভাবে করতে হবে। কালই ব্যবস্থা করতে হবে তার।
রেশমী আমার প্যান্টের বোতাম খোলার চেষ্টা করে চলেছিল অনেকক্ষণ ধরে। আমি ভাবলেশহীন মুখে তাকে সাহায্য করতে করতে ফন্দী করছিলাম।
৩)
বিদিশাদির বিয়ে হয়েছিল বছর দশেক আগে, বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়ে। বিয়ের কিছুদিন পরেই জানতে পারে তার বর চূড়ান্ত মদ্যপ। প্রত্যেক রাতেই সে মদ খেয়ে বাড়ি ফিরে, ঘুমিয়ে পড়ে। বিদিশাদি প্রথম প্রথম চেঁচিয়েছে, কেঁদেছে, মারধোর করেছে স্বামীকে, কিন্তু স্বভাব কিছুতেই বদলাতে পারেনি। বছরখানেক যাওয়ার পর বিদিশাদির যৌন-আকাঙ্খা তীব্র হতে শুরু করে। প্রুরুষকে পাশে নিয়ে শুয়ে কিছু করতে না পারলে তো হবেই। এরপরই বিদিশাদি তার শিকারকর্ম শুরু করে দেয়। পাড়ার বিভিন্ন চল্লিশোর্ধ পুরুষেরা, যারা মিড লাইফ ক্রাইসিসে ভোগে, তাদের নিজের জালে ফেলতে শুরু করে সে। এর ফলে অনেকেরই সংসার ভেঙে যায়, যাদের ভাঙে না, তারা অকথ্য গালিগালাজ, শাপশাপান্ত শুরু করে তাকে, বিদিশাদির সেইসব দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই। সে অসম্ভব মুখরা এবং ঝগড়ুটে, তার মুখ সবাই জানে এবং ভয়ও পায়। তাই বেশি বাড়াবাড়ি করতে পারে না। এছাড়া এলাকার কাউন্সেলরের সঙ্গেও তার দহরম মহরম ভালই, ফলে আরোই কেউ ঘাটানোর সাহস পায় না। তাই বিদিশাদি এখন ভাল আছে। নিজেও সে মাঝেমধ্যে মদ খায় আজকাল। কখনও তার স্বামীর সঙ্গেই। সে নিঃসন্তান যদিও। তার আমার উপর বহুদিনের নজর, বহুবার আমাকে সে বিভিন্ন ইঙ্গিত দিয়েছে, আমি ভয়ে কাষ্ঠহাসি হেসে পালিয়ে এসেছি। রেশমীকে জানিয়েছিলাম সে কথা, পাত্তাই দেয়নি। আমাকে মৌমাছির জননপ্রক্রিয়ার কথা শোনাতেই সে তখন ব্যস্ত ছিল।
এবার আমার সময় এসে গেছে বিদিশাদিকে ব্যবহার করার, এতে দুজনেই উপকৃত হব। আমি যা চাই তা পেয়ে যাব, বিদিশাদি নিজের খিদে মিটিয়ে নেবে।
সেদিন সন্ধেবেলা ফেরার পথে বিদিশাদির বাড়ির সামনে দেখা হল। আমার বুক কাঁপছিল, নিষিদ্ধতার মধ্যে এক অদ্ভুত মাদকতা আছে, যা একই সঙ্গে ভয় এবং সুখ একসঙ্গে দেয়। সে সুখ আরও চরম হয়। সমস্ত অনুচিত কাজেই এই সুখ থাকে বলে আমি মনে করি যা পরে জীবনের কাঁটা হয়ে দাঁড়ায়। আমি সুখের থেকে স্বস্তিতে বেশি বিশ্বাসী। তাই ও পথ মাড়াইনি কখনওই।
আজ বিদিশাদিকে দেখে আমি নিজেই এগিয়ে গেলাম।
“কেমন আছ?”
“আরে সুমিত, কত বড় হয়ে গেছিস তুই। বাহ দেখি দেখি, মাসকুলার তো হাতগুলো। জিম টিম করছিস নাকি আজকাল?”
আমি ঢোক গিললাম। বিদিশাদি আঙ্গুল দিয়ে আমার পুরোবাহু টিপে টিপে দেখছে। তার আঙুল ইঙ্গিতে ভরপুর, তার চেয়েও বেশি তার চোখ…
আমি বললাম, “তুমি অনেকদিন বলছিলে তোমার কম্পিউটারটা সারিয়ে দিতে, রোজ ভুলে যাই, তাই আজ ভাবলাম…”
বিদিশাদি আমার দিকে তাকিয়ে ইষৎ ভ্রু কাঁপিয়ে বলল, “সে তো কবেই আমি লোক দিয়ে সারিয়ে নিয়েছি…”
“ওহ…” আমি দাঁড়িয়ে মাথা চুলকালাম।
বিদিশাদি এবার আমাকে অবাক করে কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল, “জিনিস সাড়াবার সখ হয়েছে খোকার? সাড়াবি?”
আমার ইচ্ছে করছিল দৌড়ে পালিয়ে যাই। কিন্তু না, আমাকে করতেই হবে কাজটা। আমি মাথা নাড়ালাম।
“চল, উপরে চল, চা খাবি?”
আমার এখন না বলার কিছু নেই। আমি পা টিপে টিপে পিছু নিলাম বিদিশাদির।
প্রথম ঘরে ঢুকেই অবাক হয়ে গেলাম। বিদিশাদির স্বামী অঘোরে ঘুমোচ্ছে সোফায় শুয়ে। তার মুখের ঠিক নীচেই বমির আস্তরণ, যদিও ঘরে রুম ফ্রেশনার থাকায় তার গন্ধ আসছে না। ভাল পয়সা করে ফেলেছে বিদিশাদি। আমি পাশ কাটিয়ে অন্য ঘরে গেলাম।
বিদিশাদি আমাকে অপেক্ষা করতে বলে চা বানাতে বেরিয়ে গেল। আমি এদিক ওদিক তাকাচ্ছি। আধুনিকতায় ভরপুর এই ঘরটা, শীততাপ নিয়ন্ত্রিত যন্ত্র লাগানো, শোকেসে সুন্দর সুন্দর শো পিস, দেওয়ালে সেট করা চৌত্রিশ ইঞ্চির প্লাজমা টিভি, আমার শীত করছিল। আমি জড়োসড়ো হয়ে বসলাম।
কিছুক্ষণ পর বিদিশাদি এল। হাতে শৌখিন টি সেট এবং টি পট। আমার দিকে তাকিয়েই কাপে চা ঢালল। এগিয়ে দিল তারপর।
আমার ভয় লাগছিল। কিছু মেশানো নেই তো চায়ে? অল্প অল্প করে চুমুক মারল। অত্যন্ত সুস্বাদু চা, কিন্তু পুরোটা খাব না।
বিদিশাদি এবার এগিয়ে এল আমার দিকে। ওর গায়ের পারফিউমের গন্ধ আমি স্পষ্ট বুঝতে পারছি। আমার চোখের সামনে ফুটে উঠছে রেশমীর মুখ, এখন যেন ওর সমস্ত কথা আমার শুনতে ইচ্ছে করছে, ওর চোখের দিকে তাকিয়ে থাকতে ইচ্ছে করছে আমার, এই অচেনা গন্ধ আমার ভাল লাগছে না। এই ঝাঁ চকচকে, পরিষ্কার, আভিজাত্যে আমি অভ্যস্ত নয়। ফিরে যেতে ইচ্ছে করছে আমার নোংরা, ধুলোয় ঢাকা ঘরে, যেখানে প্রচুর অসংলগ্ন কথার মাঝে আমার আমার ভালবাসা খুঁজে পাব।
বিদিশাদি আমাকে জড়িয়ে ধরল। তারপর কানের কাছ ঠোঁট নিয়ে এল। ওর নিশ্বাস আমার গালে ধাক্কা দিচ্ছে বারবার। বিদিশাদি ফিসফিস করে বলল, “তুই খুব বুদ্ধিমান ছেলে সুমিত, ইন্টেলিজেন্ট। আমার তোর মত একটা সন্তান চাই। দিবি?”
আমি ছিটকে সরে গেলাম খাট থেকে। বললাম, “ক্ষমা কোর বিদিশাদি, আমি পারব না। আমার দ্বারা হবে না।
আমি দৌড়ে বেরিয়ে গেলাম ঘর থেকে। বেরনোর আগে দেখেছি, বিদিশাদির মুখে বিষ্ময় বা ক্রোধ নেই, অল্প, স্মিত হাসি, যেন সে জানতই এমন হবে, শুধু পরীক্ষা করছিল।
৪)
রাত প্রায় দশটা। বাড়ি ফেরার আগে আমাকে করতে হবেই কাজটা। নইলে সব ধ্বংস হয়ে যাবে। এভাবে চলতে পারে না। আমার একটা সভ্রান্ত পরিবার রয়েছে। যা করার আমাকে আজই করতে হবে।
রেশমির বাড়ি যখন পৌঁছলাম, বিক্রম কাকু তখনও দোকান থেকে ফেরেনি, কার্তিক আমাকে দেখেই জোরে জোরে “রূপ তেরা মস্তানা, প্যায়ার মেরা দ্বিয়ানা, ভুল কই…” গাইতে শুরু করে দিল। রেশমি আমাকে দেখে অবাক হল। তারপর কার্তিককে দাবড়ে দিয়ে আমাকে নিয়ে এল পাশের ঘরে।
“এখন এলে?”
“কিছু বলার ছিল তোমাকে।”
“রেশমি আমার কানের লতিতে আলতো করে কামড় দিল। তারপর আমার বুকের মধ্যে মুখ গুঁজে নাক ঘষতে শুরু করল।
“প্লিজ, আমার কথা শোনো, একবার, শুধু একবার আমার কথাও শুনে দ্যাখো…”
রেশমি আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “কী হয়েছে, বল…”
আমার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছিল। শেষ সব, শেষ। কিন্তু কিছু করার ছিল না আমার। আমার পক্ষে কোনওদিনও সম্ভব নয় রেশমীকে ছেড়ে দেওয়া। ও আমার প্রাণ, আমার ছোটবেলার প্রেম, আমি কোনওদিন ওকে ছাড়া অন্য কোনও মেয়ের কথা ভাবিনি। ভবিষ্যতেও ভাবতে পারব না। কিন্তু কিছু করার নেই। উপায় নেই কোনও।
“আমি একটা ভুল করে ফেলেছি।”
“কী? বরফ খেয়ে ফেলেছ? সেদিন আমিও খেয়েছিলাম দুপুরবেলায়। গলায় আটকে গেছিল। ভাবলাম মরে যাব এবার, কিন্তু মরলাম না। গলে গেল বরফটা…”
“শোনো আমার কথা।”
“আচ্ছা বল…”
“আমি… আমি বিদিশাদির সঙ্গে শুয়েছি…”
“শুয়েছ? তোমার বাড়ি এসেছিল? ওর বাড়ি বিছানা নেই?”
“উফফ, বোঝার চেষ্টা কর। আমি আর বিদিশাদি… যেভাবে আমি আর তুমি…”
রেশমী এবার বুঝতে পারল। আমার ছেড়ে সে সরে দাঁড়াল। আমি তাকিয়ে রইলাম ওর চোখের দিকে। ওই ঘেন্নাটা আমার দেখার দরকার। যে ঘেন্না আমাকে ওর থেকে দূরে সরিয়ে দিতে বাধ্য করবে। কিন্তু আমি দেখতে পারছিলাম না। ওর চোখে শুধুই জিজ্ঞাস্য। কিছু বলার ইচ্ছা।
“বিদিশাদির সঙ্গে করলে?”
আমি মাথা নাড়লাম।
“কেমন লাগল?”
“ভাল…” আমি অষ্ফুটে বললাম…
“কার সাথে বেশি ভাল লাগে? আমি না ও?”
এর উত্তর কী দেব! আমি বললাম, “তুমি…”
“সেটা বলেছ ওকে?”
“হ্যাঁ, বলেছি…”
রেশমি আবার এগিয়ে এসে আমাকে জড়িয়ে ধরল। আমার বুকের ভিতর মুখ গুঁজে ফিসফিস করে বলল, “আমিও বাবাকে তাই বলি…”
Comments