ভূতনীর চরে - রাজেন্দ্র
------------------
(পূর্ববর্তী লেখার পরের অংশ)

Continued ....

আমাদের পক্ষে আর বাইক এগিয়ে নিয়ে চলা সম্ভব ছিলো না । নদীর পাড়ের নরম ভেজা বালি আর পলিমাটির উপরে বাইকের চাকা বসে বসে আটকে যাচ্ছিলো বার বার । বাইক মাঝে মধ্যেই টাল খাচ্ছিলো । শেষে বাইক দুটোকে আমরা একটা জায়গায় থামিয়ে পায়ে পায়ে তৈরী হওয়া পথে হাঁটতে লাগলাম ।

ভাবনা চিন্তা করেই আমি জুতো পরে আসিনি । এখানে নরম মাটিতে দেহের ভারী ওজনের চাপে পা ভিতরে ঢুকে যায় । হাওয়াই চটি পরে এলে প্রয়োজনে খালি পায়ে চলাফেরা করাই সুবিধাজনক ।

বাইক দুটো পেছনে ফেলে আমরা নদীর পাড় ধরে বেশ কিছুটা হেঁটে এগিয়ে গেলাম । বেশ কয়েকটা নৌকো পর পর গায়ে গায়ে লাগানো ছিলো । নৌকাগুলো একে অন্যের সাথে কিংবা আলাদা আলাদা করে বাঁশের লগির সাথে নাইলনের দড়ি দিয়ে টেনে বাঁধা ছিলো ।

কিছুটা এগিয়ে চলার পরে দেখি জনা আটেক নারী পুরুষ চরের উপরে একমনে বীজধান লাগিয়ে চলেছে । ওদের কাছে এগিয়ে গিয়ে একটা নৌকা চাইলাম আমরা । ওরা বললো মাঝিদের কাউকে এখন এখানে পাওয়া যাবে না । এ সময়ে ওরা নাকি বাজারের দিকে চলে যায় । একমাত্র খুব ভোরের দিকে এলেই নাকি ওদের এখানে পাওয়া যেতে পারে ।

আমরা খানিকটা হতাশ হলাম । মাঝি না পেলে নৌকায় চেপে ওদিকের চরগুলো তো যাবো কেমন করে । যে কয়খানা নৌকা এপারের চরের সাথে লাগানো আছে, তাদের কয়েকটা আবার মোটর চালিত । বাদ বাকীগুলোকে বৈঠা আর লগির সাহায্যে ঠেলে নিয়ে চলতে হবে ।

রাণা আর আব্দুল নৌকো গুলোতে একে একে উঠে পড়লো । মোটর চালিত নৌকোগুলোর একটাতেও হাতল নেই । তার মানে মাঝিরা জেনে শুনেই মোটর চালাবার হাতলগুলো কে সাথে নিয়ে চলে গেছে নৌকা চুরি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কায় ।

যদিও আমরা কেউ চোর ছিনতাইবাজ নই, নিপাট শহুরে ভদ্দরলোক । আর বিনা পারিশ্রমিকে বা ফোকটে অন্যের মাথায় হাত বুলিয়ে কিংবা ঘাড় ভেঙে কাঁঠাল খেয়ে তৃপ্তি পাওয়ার প্রবৃত্তিও আমাদের নেই । আমরা মোটর চালিত নৌকার তেলের দাম এবং চালকের পারিশ্রমিক অবশ্যই দিয়ে দিতাম ।

কিন্তু জেলে মাঝিরাই যদি না থাকে, তবে কাকে আর কী দেব ? আর এই সব জায়গায় জেলেরাই মাঝি আর মাঝিরাই জেলে । সবাই সব কাজ জানে । জানতে হয় । আমরা ঐ ভাবে অবহেলায় একলা পড়ে থাকা অবিন্যস্ত নৌকাগুলোর থেকেই একটাকে বাছাই করে নিলাম ।

আমাদের নৌকাতে মোটর লাগানো ছিলো না । তবে দুইখানা বাঁশের লগি পড়ে ছিলো, যাদের দিয়ে ঠেলা মারতে হতো জলের নীচের দিকে । জলের নীচের নরম পলির গভীরে বাঁশের ঠেলা পড়লে নৌকো খুব সহজেই তরতর করে এগিয়ে যাবে ।

আমার কিছু এলোমেলো লাইন মাথায় এসে উঁকি মেরে গেলো ___

"ভাঙা চর ছুঁয়ে বয়ে যাওয়া স্রোতেরা
আমার আপন ছিলো না কেউ

তবুও ওরা মন ভিজিয়ে দিয়েছিলো বার বার

মুছিয়ে দিয়েছিলো চোখের কোণের
একলা অসহায় নুন সাদা দাগ

আমিও ঘোলাটে জলের বুকে ভেলা চাপিয়ে
নিরুদ্দেশের পথে ভাসতে চেয়েছি ওদের সাথে"

(চলবে)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি