জ্ঞানযোগ

জ্ঞানযোগ
© শ্রীমৎভাগবদ্গীতা

[ যদা যদা হি ধর্মস্য গ্লানির্ভবতি ভারত ৷
অভ্যুত্থানমধর্মস্য তদাত্মানং সৃজাম্যহম্ ।। ]

অর্থ:  হে ভারত, যখনই ধর্মের অধঃপতন হয় এবং অধর্মের অভ্যূত্থান হয় তখনই আমি নিজেকে প্রকাশ করে অবতীর্ণ হয় ।

[ পরিত্রাণায় সাধুনাং বিনাশায় চ দুষ্কৃতাম্ ৷
ধর্মসংস্থাপনার্থায় সম্ভাবামি যুগে যুগে ৷৷ ]

অর্থ:  সাধুদের পরিত্রাণ করার জন্য এবং দুস্কৃতকারীদের বিনাশ করার জন্য এবং ধর্ম সংস্থাপনের জন্য আমি যুগে যুগে অবতীর্ণ হই ।

যিনি আমার এই প্রকার দিব্য জন্ম এবং কর্ম যথাযথ ভাবে জানেন তাকে আর দেহত্যাগ করার পর পুনরায় জন্ম গ্রহণ করতে হয় না । তিনি আমার নিত্যধাম লাভ করেন । আসক্তি, ভয়, ক্রোধ থেকে মুক্ত হয়ে সম্পূর্ণরুপে আমাতে মগ্ন হয়ে, একান্তভাবে আমার আশ্রিত হয়ে, পূর্বে বহু ব্যক্তি আমার জ্ঞান লাভ করে পবিত্র হয়েছে এবং সেই ভাবে সকলেই আমার প্রীতি লাভ করেছে । যে যেভাবে আমার প্রতি আত্মসমর্পণ করে, প্রপত্তি স্বীকার করে, আমি তাকে সেইভাবেই পুরষ্কৃত করি ।

এই জগতে মানুষ সকাম কর্মের সিদ্ধি কামনা করে এবং তাই তারা বিভিন্ন দেবদেবীর উপাসনা করে । সকাম কর্মের ফল অতি শীঘ্রই লাভ হয় ।

[ চাতুর্বর্ণ্যং ময়া সৃষ্টং গুণ কর্ম বিভাগশঃ ৷। ]

প্রকৃতির তিনটি গুণ এবং কর্ম অনুসারে আমি মনুষ্য সমাজে চারটি বর্ণবিভাগ সৃষ্টি করেছি ।

কোন কর্ম আমাকে প্রভাবিত করতে পারে না এবং আমিও কোন কর্মফলের আকাঙ্খা করি না । আমার এই তত্ত্ব যে জানে সে কখনো সকাম কর্মের বন্ধনে আবদ্ধ হয় না । প্রাচীনকালে সমস্ত পুরুষেরা এই তত্ত্ব অবগত হয়ে সকাম কর্ম পরিত্যাগ করে মুক্তি লাভ করেছেন ।

কাকে কর্ম, কাকে অকর্ম বলে তা স্থির করতে বিবেকবান ব্যক্তিরাও মোহিত হন । কর্মের নিগুঢ় তত্ত্ব হৃদয়ঙ্গম করা অত্যন্ত কঠিন । তাই কর্ম, বিকর্ম এবং অকর্ম সম্বন্ধে যথাযথ ভাবে জানা কর্তব্য । যিনি কর্মে অকর্ম দর্শন করেন এবং অকর্মে কর্ম দর্শন করেন, তিনিই মানুষের মধ্যে বুদ্ধিমান । সব রকম কর্মে লিপ্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি চিন্ময় স্তরে অধিষ্ঠিত । যার সমস্ত প্রচেষ্টা কাম এবং সংকল্প রহিত তিনি পূর্ণজ্ঞানে অধিষ্ঠিত । জ্ঞানীগন বলেন, যে তার সমস্ত কর্মের প্রতিক্রিয়া পরিশুদ্ধ জ্ঞান-অগ্নি দ্বারা দগ্ধ হয়েছে । কর্মফলের আসক্তি সম্পূর্ণরুপে ত্যাগ করে সর্বদা তৃপ্ত এবং কোন রকম আশ্রয়ের অপেক্ষা যিনি করেন না, সব রকম কর্মে যুক্ত থাকা সত্ত্বেও তিনি কর্মফলের আশায় কোনও কিছুই করেন না । এই প্রকার জ্ঞানীব্যক্তি তার মন এবং বুদ্ধিকে সর্বতভাবে সংযত করে কার্য করেন । তিনি ফলের আশা পরিত্যাগ করে এবং প্রবৃত্তি পরিত্যাগ করে কেবল জীবন ধারণের জন্য কর্ম করেন । এই ভাবে কর্ম করার ফলে কোন রকম পাপ তাকে স্পর্শ করতে পারে না । যিনি অনায়াসে যা লাভ করেন তাতেই সন্তুষ্ট থাকেন, যিনি সুখ-দুঃখ, রাগ ইত্যাদি দ্বন্ধের বশীভূত হন না এবং যিনি কার্যের সাফল্য এবং অসাফল্যে অবিচলিত থাকেন তিনি কর্ম সম্পাদন করলেও কর্মফলের দ্বারা কখনো আবদ্ধ হন না । মন এবং ইন্দ্রিয় সংযমের মাধ্যমে যারা আত্মজ্ঞান লাভের প্রয়াসী তারা তাদের ইন্দ্রিয় সমস্ত কার্যকলাপ এবং প্রাণবায়ুর দ্বারা প্রদীপ্ত আত্মা সংযমরুপ অগ্নিতে আহুতী দেন ।

দ্রব্যময় যজ্ঞ থেকে জ্ঞানময় যজ্ঞ শ্রেয় । সমস্ত কর্মই চিন্ময় জ্ঞানে পরিসমাপ্তি লাভ করে ।

তত্ত্বজ্ঞান লাভ করে তুমি আর মোহগ্রস্ত হবে না, যখন জানবে সমস্থ জীবই আমার বিভিন্ন অংশ এবং তারা সকলেই আমাতে অবস্থিত এবং তারা সকলেই আমার । তুমি যদি পাপীদের চেয়েও পাপীষ্ট বলে গণ্য হয়ে থাক, তা হলে এই জ্ঞানরুপ তরণীতে আরোহণ করে তুমি দুঃখ সমুদ্র পার হতে পারবে ।

প্রবলরুপে প্রজ্জলিত অগ্নি যেমন কাষ্ঠকে ভস্ম করে, হে অর্জুন তেমনি জ্ঞান-অগ্নি সমস্ত কর্মকে দগ্ধ করে ফেলে । এই জ্ঞান সমস্ত যোগের ফলশ্রুতি এবং ভক্তিচর্চার মাধ্যমে যিনি এই জ্ঞান আয়ত্ত করেন, তিনি কালক্রমে আত্মার পরমশক্তি লাভ করেন ।

মূর্খ এবং শাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধাহীন ব্যক্তি কখনও ভগবদ-উক্তি লাভ করতে পারে না, ইহলোকে সুখভোগ করতে পারে না এবং পরলোকেও সুখভোগ করতে পারে না ।

যিনি নিষ্কাম কর্মযোগের দ্বারা কর্মত্যাগ করেন, জ্ঞানের দ্বারা সংশয় নাশ করেন এবং আত্মার চিন্ময় স্বরূপ অবগত হন, তাকে কোন কর্ম আবদ্ধ করতে পারে না । হে ভারত, তোমার হৃদয়ে যে অজ্ঞান প্রসূত সংশয়ের উদয় হয়েছে তা জ্ঞানরুপ খড়গের দ্বারা ছিন্ন কর । যোগাশ্রয় করে যুদ্ধ করার জন্য উঠে দাঁড়াও ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি