সাংখ্যযোগ

সাংখ্যযোগ
© শ্রীমদ্ভাগবতগীতা

যারা যথার্থই পন্ডিত তারা কখনোই জীবিত বা মৃত কারোর জন্য শোক করেন না ।

দেহী যে ভাবে কৌমার যৌবন এবং জরার মাধ্যমে দেহের রুপ পরিবর্তন করে চলে, মৃত্যুকালে ঐ দেহী এক দেহ থেকে অন্য কোন দেহে দেহন্তারীত হয় । স্থিত প্রজ্ঞ পন্ডিতেরা কখনো এই পরিবর্তনে মূহ্যমান হয় না ।

ইন্দ্রিয়ের সঙ্গে বিষয়ের বা বস্তুর সংযোগের ফলে যে অনিত্য সুখ ও দুঃখের অনুভব হয় সেগুলি যেন শীত এবং গ্রীষ্ম ঋতুর গমনা-গমনের মত । আমাদের সেই ইন্দ্রিয় অনুভূতির দ্বারা প্রভাবিত না হয়ে সেগুলি সহ্য করার চেষ্টা করতে হবে । যে জ্ঞানী ব্যক্তি সুখ-দুঃখ, শীত-উষ্ণ আদি দ্বন্ধে বিচলিত হন না তিনি অমৃত তত্ত্বের প্রকৃত অধিকারী হন ।

অনিত্য জড়বস্তুর স্থায়িত্ব নেই এবং নিত্যবস্তুর আত্মার কখনও বিনাশ হয় না । সমস্ত শরীরে পরিব্যাপ্ত রয়েছে যে অক্ষয় আত্মা, যেনে রেখ তাকে কেউ বিনাশ করতে সক্ষম নয় । সমস্ত শরীর অনিত্য কিন্তু শরীরী আত্মা অবিনাশী । যিনি জীবসত্তাকে হন্তা বলে মনে করেন কিংবা যিনি একে নিহত বলে ভাবেন তারা উভয়েই আত্মার প্রকৃত স্বরুপ জানেন না । কারণ আত্মা কাউকে হত্যা করে না বা কারোর দ্বারা নিহত হয় না । আত্মার কখনো জন্ম হয় না বা মৃত্যু হয় না । অথবা  পুণঃ পুণঃ তার উৎপত্তি বা বৃদ্ধি হয় না, তিনি জন্ম রহিত শাশ্বত, নিত্য এবং নবীন । শরীর  নষ্ট হলেও আত্মা কখনো বিনষ্ট হয় না । যিনি এই আত্মাকে অবিনাশী, নিত্য, শাশ্বত, জন্ম-রহিত ও অক্ষয় বলে জানেন তিনি কি প্রকারে কারো হত্যা করেন বা কারো হত্যা করান ? অবিনাশীর বিনাশ অসম্ভব ।

মানুষ যেমন জীর্ণ বস্ত্র পরিত্যাগ করে নূতন বস্ত্র পরিধান করে দেহীও তেমনই জীর্ণ শরীর ত্যাগ করে নতুন দেহ ধারণ করে । আত্মাকে অস্ত্রের দ্বারা কাটা যায় না, আগুনে পোড়ান যায় না, জলে ভেজানো যায় না অথবা হাওয়ায় শুকানোও যায় না । এই আত্মা অচ্ছেদ্য, অদাহ্য, অক্লেদ্য । তিনি চিরস্থায়ী, সর্বব্যাপ্ত, অপরিবর্তনীয়, অচল এবং সনাতন ।

যে দেহীর, যার জন্ম হয়েছে, তার মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী এবং যার মৃত্যু হয়েছে, তার জন্মও অবশ্যম্ভাবী ।

কীর্তিহীনতা, অসম্মান, যে কোন মর্যাদাবান লোকের পক্ষে মৃত্যু অপেক্ষাও অত্যন্ত ক্ষতিকর, এই অমর্যাদা মর্মান্তিক । যুদ্ধে নিহত হলে জীব স্বর্গলাভ করবে আর জয়ী হলে রাজ্যসুখ ভোগ করবে । অতএব বন্ধু, যুদ্ধের জন্য দৃঢ় সংকল্প হয়ে উত্থিত হও ।

সুখ-দুঃখ, লাভ-ক্ষতি , জয়-পরাজয়কে সমান জ্ঞান করে যুদ্ধ করলে কাউকে আর পাপভোগী হতে হবে না ।

বিবেক বর্জিত লোকেরাই বেদের পুস্পিত বাক্যে আসক্ত হয়ে স্বর্গ সুখভোগ, উচ্চকুলে জন্ম, ক্ষমতা লাভ ইত্যাদি সকাম কর্মকেই জীবনের চরম উদ্দেশ্য বলে মনে করে । ইন্দ্রিয় সুখভোগ এবং ঐশ্বর্যের প্রতি আকৃষ্ট হয়ে তারা বলে যে তার উর্ধ্বে আর কেউ নাই ।

যারা ভোগ ঐশ্বর্য্য সুখে আসক্ত সেই সমস্ত বিবেক বর্জিত ব্যক্তিদের বুদ্ধি সমাধি, বা ভগবানের একনিষ্ঠতা লাভ হয় না ।

ক্ষুদ্র জলাশয়ে যে সমস্ত কার্য সাধিত হয় সেগুলি যেমন বৃহৎ জলাশয় থেকে আপনা হতেই সাধিত হয়ে যায়, তেমনই ভগবানের উপসনার মাধ্যমে যিনি পরমব্রহ্মের জ্ঞান লাভ করে সব কিছুর উদ্দেশ্য উপলব্ধি করেছেন তার কাছে সমস্ত বেদের উদ্দেশ্য সাধিত হয়েছে ।

স্বধর্ম বিহিত কর্মে তোমার আমার অধিকার আছে কিন্তু কোন কর্মফলে তোমার আমার কোনো অধিকার নাই । তাই কখনো নিজেকে কর্মফলের হেতু মনে করো না এবং কখনো স্বধর্মেও আচরন থেকে বিরত হয়ো না । ফলভোগের কামনা পরিত্যাগ করে ভক্তি যোগস্থ্য হয়ে স্বধর্ম বিহিত কর্মাচরণ কর । যারা কর্মের ফল ভোগ করতে চায় তারা কৃপণ । যিনি ভগবত্ ভক্তির অনুশীলন করেন তিনি এই জীবনেই পাপ-পুণ্য উভয় থেকে মুক্ত হন । সুতরাং, তুমি নিস্কাম কর্মযোগের অনুশীলন কর সেটাই হল সর্বাঙ্গীণ কর্মকৌশল ।

মনিষীগণ ভগবানের সেবায় যুক্ত হয়ে ভগবানের শ্বরণাগত হন । কর্মজাত ফল ত্যাগ করে জন্মমৃত্যুর বন্ধন থেকে মুক্ত হন । এইভাবে তারা সমস্ত দুঃখ দুর্দশা থেকে মুক্ত হন । এইভাবে পরমেশ্বর ভগবানের উপর অর্পিত নিষ্কাম কর্ম অভ্যাস করতে করতে তোমার বুদ্ধি মোহরুপ গভীর অরণ্যকে সম্পূর্নরুপে অতিক্রম করবে, তখন তুমি যা কিছু শুনেছ সেই সবের প্রতি সম্পূর্ণরুপে নিরপেক্ষ হয়ে বিশুদ্ধ ভক্তি সাধনে প্রবৃত্ত হবে । তোমার বুদ্ধি যখন বেদের ভাষার দ্বারা আর বিচলিত হবে না তখন তুমি দিব্যজ্ঞান লাভ করে ভক্তিযোগে অধিষ্ঠিত হবে ।

******************

প্রশ্ন — স্থিতপ্রজ্ঞ এবং অচলাবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষের লক্ষণ কী ? তিনি কিভাবে কথা বলেন, কিভাবে অবস্থান করেন এবং কিভাবেই বা তিনি আচরণ করেন ?

উত্তর — মানুষ যখন মানসিক জল্পনা কল্পনা থেকে উদ্ভূত সমস্ত মনোগত কাম পরিত্যাগ করে এবং তার মন যখন আত্মাতেই পুর্ণ পরিতৃপ্তি লাভ করে তখনই তাকে স্থিতপ্রজ্ঞ বলা হয় । ত্রিতাপ দুঃখ উপস্থিত হলেও যার মন উদ্বিগ্ন হয় না, সুখ উপস্থিত হলেও যার স্পৃহা হয়না এবং যিনি অনুরাগ, ভয় ও ক্রোধ থেকে মুক্ত তিনিই স্থিতধী, অর্থাৎ স্থিতপ্রজ্ঞ । জড়জগতে যিনি সমস্থ জড়বিষয়ে আসক্তি রহিত, যিনি প্রিয় বস্তু লাভে আনন্দিত হন না এবং অপ্রিয় বিষয় উপস্থিত হলে দুঃখিত হন না তার চেতনা পুর্ণজ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে । যে ব্যক্তি তার ইন্দ্রিয়গুলিকে ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে প্রত্যাহার করে নিতে পারেন তার চেতনা চিন্ময় জ্ঞানে প্রতিষ্ঠিত । দেহবিশিষ্ট জীব ইন্দ্রিয় সুখভোগ থেকে নিবৃত হতে পারে কিন্তু তবুও ইন্দ্রিয় সুখভোগের আসক্তি থেকে যায় । কিন্তু উচ্চতর স্বাদ আস্বাদন করার ফলে সে বিষয়-তৃষ্ণা থেকে তিনি চিরতরে নিবৃত্ত হন । ইন্দ্রিয়সমুহ এত বলবান এবং ক্ষোভকারী যে তারা অতি যত্নশীল বিবেকসম্পন্ন পুরুষের মনকেও বলপূর্বক হরণ করে, বিচলিত করে দেয় । যিনি উত্তমভাবে ভক্তিপরায়ণ হয়ে তার ইন্দ্রিয়গুলিকে সম্পূর্নরুপে বশীভূত করেছেন তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ।

ইন্দ্রিয় বিষয় চিন্তা করতে করতে মানুষের আসক্তি জন্মায়, আসক্তি থেকে কামনার উদয় হয় এবং কামনা থেকে ক্রোধ উৎপন্ন হয় । ক্রোধ থেকে সম্মোহ, সম্মোহ থেকে স্মৃতি বিভ্রম, স্মৃতি বিভ্রম থেকে বুদ্ধিনাশ হওয়ার ফলে সর্বনাশ হয় এবং মানুষ পুনরায় জড়জগতের অন্ধকূপে পতিত হয় ।

সংযতচিত্ত মানুষ প্রিয়বস্তুতে স্বাভাবিক আসক্তি ও অপ্রিয় বস্তুতে স্বাভাবিক বিদ্বেষ থেকে মুক্ত হয়ে তার বশীভূত ইন্দ্রিয় দ্বারা ভগবদ্ উক্তির অনুশীলন করে ভগবানের কৃপা লাভ করেন । চিন্ময় চেতনায় অধিষ্ঠিত হওয়ার ফলে তখন তার জড়জগতের ত্রিতাপ দুঃখ থাকে না, এইভাবে প্রসন্নতা লাভ করার ফলে বুদ্ধি স্থির হয় ।

পরমার্থ চিন্তাশুন্য ব্যক্তির বিষয় তৃষ্ণার বিরতি নেই । এই রকম বিষয়-তৃষ্ণাক্লিষ্ট ব্যক্তির প্রকৃত সুখ কোথায় ?

প্রতিকূল বায়ু নৌকাকে যেমন অস্থির করে তেমনই সদা বিচরণকারী যেকোন একটি মাত্র ইন্দ্রিয়ের আকর্ষণেও মন অসংযত ব্যক্তির প্রজ্ঞাকে হরণ করতে পারে ।

সুতরাং, যার ইন্দ্রিয়গুলি ইন্দ্রিয়ের বিষয় থেকে সর্বপ্রকার নিবৃত্ত হয়েছে তিনিই স্থিতপ্রজ্ঞ ।

বিষয়কামী ব্যক্তি কখনও শান্তি লাভ করে না। জলরাশি যেমন সদা পরিপূর্ণ সমুদ্রে প্রবেশ করেও তাকে ক্ষোভিত করতে পারে না, কামসমূহও তেমন স্থিতপ্রজ্ঞ ব্যক্তিতে প্রবিষ্ট হয়েও তাকে বিক্ষুব্ধ করতে পারেনা অতএব তিনিই শান্তি লাভ করেন । যে ব্যক্তি সমস্ত কামনা বাসনা পরিত্যাগ করে জড়বিষয়ের প্রতি নিঃস্পৃহ হয়ে নিরহঙ্কার এবং মমত্ত্ব বোধ রহিত হয়ে বিচরণ করেন তিনিই প্রকৃত শান্তি লাভ করেন । যিনি এই স্থিতি লাভ করেন তিনি মোহ প্রাপ্ত হন না । জীবনের অন্তিম সময় তিনি এই জড়জগতের বন্ধন মুক্ত হয়ে ব্রহ্মানন্দ লাভ করেন ।

ত্রি তাপ দুঃখ ___

জড় জগতে জীব তিন রকমের দুঃখের অধীন । আধ্যাত্মিক, আধিভৌতিক ও আধিদৈবিক দুঃখ । এদেরকেই সম্মিলিত ভাবে ত্রিতাপ দুঃখ বলে অভিহিত করা হয় ।

আধ্যাত্মিক দুঃখ হচ্ছে দেহ ও মন জাত দুঃখ । যে জড় দেহটি ধারণ করে আমরা রয়েছি সেই দেহটি নানা ব্যধি ব্যাথা বেদনার আকর । যার ফলে আমরা দুঃখ পাই । তারপর মনজাত দুঃখ যেমন দৈহিক সম্বন্ধে সম্বন্ধিত আত্মীয় স্বজনের বিচ্ছদ, মৃত্যুর কারণে দুঃখ । প্রিয় বস্তু হারানো দুঃখ ।অপ্রিয় বস্তুর সংযোগ ও দুঃখ । আধিভৌতিক দুঃখ হচ্ছে অন্য জীবের দ্বারা প্রাপ্ত দুঃখ । যেমন, বিষাক্ত পোকামাকড় জীব জন্তুর দংশন, চোর ডাকাতের উৎপাত, প্রতারকের ক্রিয়াকলাপ ইত্যাদি আমাদের দুঃখ প্রদান করে । আধিদৈবিক দুঃখ হচ্ছে দেবতাদের দ্বারা সংঘটিত যে দুঃখ । ভুকম্প, ঝড়, প্রবল বৃষ্টি, বন্যা, প্রচন্ড গরম, কনকনে ঠান্ডা, অগ্নিকান্ড ইত্যাদিজনিত দুঃখ । প্রত্যেকেই কমবেশী এই সমস্ত দুঃখে মর্মাহত হয় ।

(সমাপ্ত)

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি