কর্মযোগ

কর্মযোগ
© শ্রীমৎভাগবদ্গীতা

দুই প্রকার মানুষ আধ্যাত্ম্যচেতনা উপলব্ধি করতে চেষ্টা করেন । কিছু লোক দার্শনিক জ্ঞানের আলোচনার মাধ্যমে নিজেকে জানতে চান এবং অন্যেরা আবার তা ভক্তির মাধ্যমে জানতে চান ।

কেবল কর্ম অনুষ্ঠান না করার মাধ্যমে কর্ম বন্ধন থেকে মুক্ত হওয়া যায় না আবার কর্মত্যাগের মাধ্যমেও কেবল সিদ্ধিলাভ করা যায় না ।

সকলেই অসহায়ভাবে মায়াজাত গুণসমূহের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে কর্ম করতে বাধ্য হয় । তাই কর্ম না করে কেউই ক্ষণকাল থাকতে পারেন না ।

যিনি মনের দ্বারা ইন্দ্রিয়গুলিকে সংযত করে অনাসক্তভাবে কর্ম অনুষ্ঠান করেন তিনিই শ্রেষ্ঠ । কর্ম না করে কেউ দেহযাত্রা নির্বাহ করতে পারে না । আসক্তি যুক্ত কর্ম জীবকে জড় জগতের বন্ধনে আবদ্ধ করে ।

যেমন ভগবানের ভক্তরা সমস্ত পাপ থেকে মুক্ত হন কারণ তারা ভগবানকে নিবেদন করে অন্ন গ্রহণ করেন। যারা কেবল স্বার্থপর হয়ে নিজেদের ইন্দ্রিয় তৃপ্তির জন্য অন্নপাক করে তারা কেবল পাপ ভোজন করে ।

যে ব্যক্তি আত্মাতে প্রীত, আত্মাতেই তৃপ্ত, আত্মাতেই সন্তুষ্ট তার কোন কর্তব্য নেই । আত্মানন্দ অনুভবকারী ব্যক্তির ইহজগতে ধর্ম অনুষ্ঠানের কোন প্রয়োজন নেই এবং কর্ম না করারও কোন কারণ নেই । তাকে অন্য কোন প্রাণীর উপর নির্ভর করতেও হয় না ।

অতএব কর্মফলের প্রতি অনাসক্ত হয়েই কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করতে হবে, অনাসক্ত হয়ে কর্ম করার ফলেই পরম ভক্তি লাভ করা যায় ।

শ্রেষ্ঠ ব্যক্তিরা যে ভাবে আচরণ করেন সাধারন মানুষেরাও তার অনুকরণ করেন । তিনি যা প্রমাণ বলে স্বীকার করেন অন্য লোকে তারই অনুকরণ করে ।

অজ্ঞানীরা যেমন কর্মফলের প্রতি আসক্ত হয়ে তাদের কর্তব্য কর্ম করে তেমনি জ্ঞানীরা অনাসক্ত হয়ে প্রকৃত পথে মানুষকে পরিচালিত করার জন্য কর্ম করেন । মোহাচ্ছন্ন জীব প্রকৃত অহঙ্কারবশত জড় প্রকৃতির গুণ দ্বারা ক্রিয়মাণ সমস্ত কার্যকে স্বীয় কার্য বলে মনে করে এবং আমিই কর্মের কর্তা - এই রকম ভেবে অভিমান করে ।

হে অর্জুন, তোমার সমস্ত কর্ম আমাকে সমর্পণ করে আধ্যাত্ম্য চেতনা সম্পন্ন হয়ে মমতাশুন্য, নিষ্কাম ও শোকশুন্য হয়ে যুদ্ধ কর । আমার নির্দেশ অনুসারে শ্রদ্ধাবান হয়ে যিনি তার কর্তব্যকর্ম অনুষ্ঠান করেন, তিনি কর্মবন্ধন থেকে মুক্ত হন ।

সমস্ত জীবই ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য বস্তুতে আসক্তি অথবা বিরক্তি অনুভব করে, কিন্তু এইভাবে ইন্দ্রিয় এবং ইন্দ্রিয়ের বিষয়ের বশীভূত হওয়া উচিত নয়, কারন তা পরমার্থিক প্রগতির পথে প্রতিবন্ধক ।

[ "স্বধর্মে নিধনং শ্রেয়ঃ পরধর্মো ভয়াবহঃ" ]

অর্থ:  স্বধর্মের অনুষ্ঠান দোষযুক্ত হলেও উত্তমরুপে অনুষ্ঠিত পরধর্ম থেকে উৎকৃষ্ট । স্বধর্ম সাধনে যদি মৃত্যু হয় তাও মঙ্গলজনক কিংবা অন্যের ধর্মের অনুষ্ঠান করা বিপদজনক ।

[ মানুষ কার দ্বারা চালিত হয়ে অনিচ্ছা সত্ত্বেও কেন বলপূর্বক নিয়োজিত হয়েই পাপাচারণে প্রবৃত্ত হয় ? ]

রজোগুণ থেকে উৎপন্ন "কাম" মানুষকে এই পাপে প্রবৃত্ত করে এবং এই কামই ক্রোধে পরিণত হয় । কাম হল সর্বগ্রাসী এবং পাপাত্মক; কামকেই জীবনের প্রধান শত্রু বলে জানবে । অগ্নি যেমন ধূম্রদ্বারা আবৃত থাকে এবং দর্পণ যেমন ময়লার দ্বারা আবৃত থাকে অথবা গর্ভ যেমন জরায়ু দ্বারা আবৃত থাকে তেমনই জীবসত্ত্বা বিভিন্ন মাত্রায় এই কামের দ্বারা আবৃত থাকে । কামরুপী চিরশত্রু দ্বারা মানুষের শুদ্ধ চেতনা আবৃত । এই কাম দুর্বারিত অগ্নির মত চির অতৃপ্ত । ইন্দ্রিয়সমূহ, মন এবং বুদ্ধি এই কামের আশ্রয়স্থল, যার মাধ্যমে কাম জীবের প্রকৃতজ্ঞানকে আচ্ছন্ন করে তাকে বিভ্রান্ত করে ।

তাই প্রথমে ইন্দ্রিয়গুলিকে নিয়ন্ত্রিত করার মাধ্যমে জ্ঞান-বিজ্ঞান নাশক পাপের প্রতীকরুপ কামকে বিনাশ করতে হবে ।

জড়পদার্থের থেকে ইন্দ্রিয়গুলি শ্রেয়, ইন্দ্রিয়ের থেকে মন শ্রেয়, মন থেকে বুদ্ধি শ্রেয় এবং তিনি (আত্মা) সেই বুদ্ধি থেকেও শ্রেয় । তাই নিজেকে জড় ইন্দ্রিয়, মন এবং বুদ্ধির অতীত জেনে চিন্তাশক্তির দ্বারা নিকৃষ্ট বৃত্তিকে সংযত করে কামরুপ দুর্জয় শত্রুকে জয় করতে হবে ।

( কর্ম যোগ সমাপ্ত )

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি