মানুষ মানুষের জন্যে

মানুষ মানুষের জন্যে - রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
-------------------------------
কৃতজ্ঞতা - শমীন্দ্র ভৌমিক ও অর্ক ভাদুড়ী র ফেসবুক পোস্ট
-------------------------------
ঘুম থেকে উঠে বাসি মুখে বিছানায় শুয়ে শুয়েই ট্যাব অন্ করলো অর্ক । নেট অন করতেই ফেসবুকের নোটিফিকেশন চলে এলো । ওর নজরে এলো তার একজন পরিচিত ভার্চুয়াল বন্ধু বিখ্যাত কবি শমীন্দ্র ভৌমিকের লেখা একটা অসাধারণ ছড়া পোস্ট করেছেন ।

শমীন্দ্র (রাজুদাদা) ভৌমিককে অর্ক ব্যক্তিগত ভাবেই চেনে । ওদের বাড়ির কাছেই দাদার বাড়ি । শমীন্দ্রদা বিশ্বভারতীতে কর্মরত । উনি অসাধারণ মানের চিত্রকর এবং ছড়াকার । মানুষ হিসেবেও অসাধারণ গুণ সম্পন্ন । ওনার ভাই দ্বিজেন্দ্র ভৌমিক (দ্বিজু দাদা) ও বেশ উচ্চমানের চিত্রকর এবং সাহিত্যিক । আগে 'সমান্তরাল' এবং এখন 'স্বরান্তর' নামের একটি সাহিত্যপত্রিকার সম্পাদনা করেন এই দ্বিজু দাদা ।

শমীন্দ্র ভৌমিকের ছড়াটি ছিলো ঠিক এই রকম -

"ভারতবর্ষ"
--------

এখানে তিনটে ওখানে তিনটে
সেখানে তিনটে ঘেউ

এই তল্লাটে তারা ছাড়া আর
মনিষ্যি নেই কেউ।

হরে রে রে রে রে চিৎকার শুনে
সবাই পগারপার।

কেবল একটা হাবাগোবা ছেলে
নাম ভুলে গেছে তার।

তার দু চোখের দৃষ্টি কেমন
স্বপ্নের মতো নীল।

আমির খানের মুখের সঙ্গে
একটু রয়েছে মিল।

সবাই ধরল, মারল বলল
বল জয় সিয়ারাম।

ছেলেটা বলল, রবীন্দ্রনাথ
নজরুল ইসলাম।

আরো একদল বলল, বল তো
আল্লাহ আকবর,

ছেলেটা বলল, ডিরোজিও আর
অতীশ দীপঙ্কর।

সবাই ধরল মারল বলল
কোনখানে তোর ঘর?

ছেলেটা বলল: ভারতবর্ষ
সবরমতীর চর।

এমন অসাধারণ যুগোপযোগি ছড়া অনেকদিন ধরেই চোখে পড়েনি অর্কর । ও জানেও না যে কয়জনাই বা পড়েছেন এমন সুন্দর পবিত্র একটা ছড়া এই সময়ের পটভূমিকায় । সুতরাং ছড়াটিকে অর্ক তার হোয়াটস্ অ্যাপের পরিচিত সব নম্বরেই ফরোয়ার্ড করে দিলো । গোটা দুনিয়া জুড়ে ধর্মের নামে উগ্র মৌলবাদী জেহাদীদের হানাহানি বিভেদের রক্তপাতের জমানায় পড়ুক সকলে এমন একটা বিষাদ সুন্দর লেখা ।

গুটিকয়েক প্রতি উত্তর এলো । কেউ কেউ লাইক চিহ্ন পাঠিয়ে দিলেন । আর বাদ বাকীরা নিরুত্তরই রয়ে গেলেন । কেউ কেউ আবার লেখা না পড়েই বিনিময়ে এইটা গুড মর্ণিং মার্কা পিকচার মেসেজ ফরোয়ার্ড মেরে দিলেন ।

অর্ক আজকাল খুব বিরক্ত বোধ করে এই সব পাবলিকের মাথামোটা গিরির জন্যে । সে একটা ছবি পাঠালো । কিংবা ভিডিও ফরোয়ার্ড করে দিলো বা একটা স্বরচিত কিংবা কপি পেস্ট করা লেখা শেয়ার করলো । প্রতি উত্তরে সে কী আশা করতে পারে ? লিখিত মেসেজের উত্তরে লিখিত মেসেজটাই এক্ষেত্রে কাম্য । কেউ খুব ভালো ছবি বা ভিডিও পাঠালেও সে লিখেই তার জবাব দেয় । অনেক সময় ছবির বদলে পাল্টা ছবি দিয়েও রিপ্লাই করে ।

তবে আজকাল ওর আর এইসব ভালো লাগে না । অন্যদের লেখা হোক বা নিজের কষ্টকরে টাইপ করা লেখা, তা পড়তে চান না অনেকেই । আবার অর্ক এই লেখাপড়া ব্যাপারটাকেই বেশী গুরুত্ব দেয় । সুতরাং ও ঠিক করেছে এই সব ছবি আর ভিডিও পাঠানো পাবলিকগুলোর কোন রিপ্লাই আর দেবে না এর পর থেকে । সোজা বাংলায় যেটাকে বলে ইগনোর করা । কারণ হোয়াটস্ অ্যাপ্ ব্যাপারটা অনেকের কাছেই আজকাল ছবি আর ভিডিও বিনময়ের আখড়া হয়ে উঠেছে । ওর আর এখন এই সব ছেলেমানুষিপনা ভালো লাগেনা একদম । যারা লিখিত মেসেজের উত্তরে ছবি আর ভিডিও ফরোয়ার্ড মেরে প্রতি উত্তর দেয়, একটু কষ্ট করে দুটো শব্দ লিখে টাইপ করে পাঠানোর প্রবণতা নেই যাদের, তাদের জন্যে আর লেখা পাঠিয়ে সময়ের অপচয় করবে না ও ।

যাই হোক্, একজন খুব পরিচিত দাদার একটা আলপটকা মন্তব্য এসে ঢুকলো ওর ট্যাবে ঐ ছড়ার উত্তরে । তিনি লিখেছেন - " এ রকম সেকু অনেক দেখেছি। সস্তাদরে আজকাল কিনতে পাওয়া যায়। "

মতামত পড়তেই মাথাটা চট্ করে ঘুরে গেলো অর্কর । সে রীতিমত অবাক হলো ঐ দাদাটির ভাবনা চিন্তার সীমাবদ্ধতা দেখে । উনি কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে কর্মরত উদ্যানপালন বিদ্যায় ডক্টরেট উপাধি প্রাপ্ত একজন প্রফেসর । অথচ নোটবই আর ক্লাসনোট গুলে মুখস্থ করে পাশ করা উচ্চ ডিগ্রীধারী এই সব চাড্ডি মৌলবাদীরাই দেশটাকে একেবারে শেষ করে দেবে মনে হচ্ছে ।

এরা মোটা মোটা ভারী ভারী বই পড়েছে বটে । কিন্তু আত্মস্থ করতে পারেনি তার একটা বর্ণও । এই দাদাটি বোধ হয় এটা জানেন না যে শিল্প সাহিত্য বোধ আর সৃজনশীলতার ধারণাগুলো বই পড়ে, কোর্স করে, ডিগ্রী কিনে হয় না । এর জন্যে চাই একটা পরিশ্রুত এবং পরিশীলিত সংবেদনশীল মননশীল আত্মা ।

এরা যাদবপুর প্রেসিডেন্সী জেএনইউ এর ছাত্রছাত্রীদের গালিগালাজ করে । অথচ ওদের এক্সেলেন্সির একপা ছিঁটে ফোঁটাও এনাদের রুচিবোধে নেই । নয়ত এত সুন্দর একটা লেখার এমন অসুন্দর কুরুচিকর মন্তব্য এই দাদাটি করতেন না । সেও পাল্টা জবাবে লিখলো - "শমীন্দ্র ভৌমিকের ছড়া লেখা বা ওনার আঁকার পরিচিতি সম্পর্কে তোমার ধারণা খুব সম্ভবতঃ স্বচ্ছ নয় দাদা । ওনার এই ছড়াটা আবৃত্তির আকারে মানুষের মুখে মুখে ফেরে । আমি ওনাকে ব্যক্তিগত ভাবে চিনি ও জানি । উনি একজন উচ্চস্তরের সৃজনশীল প্রতিভা । তুমি কি পারবে দাদা ওনার মতো বা ওনার চেয়েও ভালো ছবি আঁকতে আর কবিতা লিখতে ? দশখানা লাইব্রেরী ঘেঁটে হাজার খানা বই পড়ে পান্ডিত্যপূর্ণ প্রবন্ধ লেখা আর সৃজনশীলতা বোধ হয় সমপর্যায়ের নয় । উনি সেক্যু মাকু যাই হোন না কেন, ওনার এই লেখার সমগুণ মান সম্পন্ন একটা লেখা তোমার কলম থেকেও আমি পেতে চাই । তুমিও পাল্টা জবাবে এই মানের একখানা লেখা লিখে জবাব দাও তো দেখি।"

ডক্টরেট ডিগ্রীর ওজনধারী কূপমন্ডুক ধর্মান্ধ দাদাটি তখন আবার প্রতি উত্তরে লিখে পাঠালেন - " আমার যোগ্যতা নেই বলে এখন সেকু-মাকু কবির কবিতাকে সমালোচনা করতে পারবো না? কবি তখনই আছেন যখন তার বার্তা আমার হৃদয় স্পর্শ করে। এখন আমার বানভাসি সেকুলার মন থাকলে বড্ড ক্ষতি হয়ে যাবে। কারণ আগামী দিনে তারা আর জন্মাতেই পারবেন না। প্রবন্ধ আমি এখন সেটাই লিখবো যেটা মানুষের ভাষা - দশখানা লাইব্রেরি থেকেই শুধু টুকবো না, মুসলিম সাম্প্রদায়িক আক্রমণে দীর্ণ হিন্দুর মুখের কথা আমার নিজের কথা বলে চালিয়ে দেবো। কোনো কপি রাইটের ধার ধারবো না। "

ঔদ্ধত্য এবং ধৃষ্টতা যে শুধুমাত্র মানবাধিকারই লঙ্ঘন করে তাই নয়, তা মানুষের সুকোমল বৃত্তি গুলোকেও নির্বিচারে ধ্বংস করে । অর্কর মাথাটা ঘুরে গেলো এক ঝটকায় । এ সব কি বলছেন তার পন্ডিত দাদাটি । এত লেখাপড়া করেও শেষমেষ হলোটা কি দাদার ? তবে কি লেখাপড়া বেশী করলেই এই রকমের ধর্মান্ধ মৌলবাদী চিন্তাভাবনার জন্ম হবে কিংবা নির্বিচারে ধর্মান্তরকরণ ও হত্যার জন্যে জেহাদী টেরোরিস্ট তৈরী হবে !

সে আবার নিজের আবেগকে সংযত রেখে পাল্টা লিখলো - " সৃজনশীলতার সৃষ্টি যদি কারো অপছন্দের হয়, তবে তার জবাবী উত্তর টা কি সৃজনশীল ভাবে দেওয়াটা কাম্য নয় ? "

পি এইচ ডি ডক্টরেট ডিগ্রীধারী দাদা এর উত্তরে লিখলেন - " না। তা কাম্য নয়। তার কারণ সৃজনশীল হওয়ার জন্য আমাদের মতো এত কম সংখ্যক জাতিধর্ম সচেতন হিন্দুদের এ ভাবে সাহিত্যচর্চা করে সময় নষ্ট করলে চলবে না। "

অর্ক আবার লিখে পাঠালো - " তবে কি তরবারি কে ঠেকাতে তরবারিই চাই ? আর কলম কে ঠেকাতে কলম ? গদ্যের বিরুদ্ধে গদ্য আর পদ্যের বিরুদ্ধে পদ্য ? প্রতিবাদী গল্প কবিতা নাটক দিয়েই কি মানুষের জেহাদী ভাবনার কলমকে থামাতে হবে ? "

ঐ দাদা আবার লিখলেন - " নিশ্চয়ই চাই। নিরানব্বই শতাংশ কবি সাহিত্যিকেরাই মুসলিম মৌলবাদীদের কাছে বিক্রি হয়ে গেছে। তাদের সৃষ্টির বিরুদ্ধে কথার লালিত্যে এক শতাংশ কি করবে?  তারা জনগণের ভাষায় বরং কথা বলুক। সময় এলে আমার মুখ থেকেও ফুলঝুরি বেরোতে পারে, আমার এখন সে সময় বাড়ন্ত। বরং যারা ওদের বিরুদ্ধে একটা কথারও উত্তর দেবে, তাদের লেখা ড্যামডেমি বাজিয়ে, ছদ্ম-সেকুলার, বন থেকে বনান্তরে প্রচার করে দেবো। আমি এখন অন্তরে-বাহিরে সেকুলার হতে পারবো না, সরি। কবির কোনো বার্তা যদি পাঠকের হৃদয় নাই ছোঁয়, তবে সে কবি জন্মগ্রহণই করেন নি, লেখা তো দূরের কথা। 'সাহিত্যিক সত্যি' বলে একটা কথা আছে, সে রকম 'সাহিত্যিক মিথ্যা' বলেও থাকার কথা, এবং তা আছেই। "

অর্ক আর ভেবে পাচ্ছিলো না কি বলবে এমন দিকভষ্ট অমানবিক মানুষকে । রামকৃষ্ণ মিশনে লেখাপড়া করে উদারচেতা মনোভাবাপন্ন মানুষের নির্মানের বদলে এমন প্রতিহিংসা মনোভাবসম্পন্ন মানুষের জন্ম কেমন করে সম্ভব ? বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাধিপ্রাপ্ত ডিগ্রী অর্জন সত্যিই বোধহয় বেকার হয়ে গেলো দাদাটার । এমন কথার পর আর কিছুই বলবার নেই তার । কীই বা আর বলবে সে ? ওনার তো বেশ রীতিমতন মগজ ধোলাই হয়ে গেছে ।

এটা ঠিকই যে সবাই সমান মানের আর ভাবনার হয় না । থিসিস যেমন আছে, তেমনি গড়ে উঠছে তার অনুসারীরা । আবার বিপরীতে গড়ে উঠেছে অ্যান্টিথিসিস্ এবং তার অনুগামীরা । আর যেমন যেমন ভাবনা, তেমন তেমন কর্মকান্ড । যে ধর্মান্ধ উন্মাদ তরবারির আঘাতে অন্যধর্মের মানুষের ধড় থেকে মাথা নামিয়ে পূণ্যলাভ, স্বর্গসুখ ভোগ করতে চায়, সে আসলে বোধহীন পশু বিশেষ ।

কিছু বছর আগেই অর্ক পড়েছিলো তসলিমা নাসরিনের - 'লজ্জা' । উগ্র ও ধর্মান্ধ হিন্দু করসেবকদের বাবরি মসজিদ ভাঙার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের সাম্প্রদায়িক মৌলবাদী ইসলামিক মহলের একটা অশুভ শক্তি কেমন করে একজোট হয়ে একতরফা আক্রমণ এবং অত্যাচার করেছিলো সংখ্যালঘু বাঙালী হিন্দুদের উপর - ভেঙে পুড়িয়ে দিয়েছিলো তাদের বাড়িঘর, মন্দির । ভয় দেখিয়ে, মারধর আর খুন খারাপি লুঠপাট করে দখল করেছিলো হিন্দুদের আজন্ম রক্ষিত সম্পত্তি, শ্লোগান দিয়েছিলো - "একটা দুইটা হিন্দু ধরো, সকাল বিকাল নাস্তা করো" বলে । তুলে নিয়ে গিয়েছিলো বাড়ির মহিলা আর শিশুকন্যাদের । ধর্ষণ করে খুন করেছিলো তাদের । ভাসিয়ে দিয়েছিলো তাদের দেহগুলো খালে বিলে নদীর জলে । চারপাশের পাড়া আর বাড়ির চেনা লোকগুলিও হয়ে উঠেছিলো চরম অচেনা ।

এক নিশ্বাসে গোগ্রাসে পড়ে ফেলেছিলো অর্ক তাদেরই মতো নির্যাতিত একটি পরিবারের তিলে তিলে নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার আখ্যান, যারা মানবতাবাদী নাস্তিক ছিলো । কম্যিউনিজমে বিশ্বাসী আদর্শ মানুষ ছিলো সেই পরিবারের পুরুষেরা । শেষ পর্যন্ত ভারী করুণ পরিণতি হয়েছিলো তাদের । পালিয়ে আসতে হয়েছিলো তাদের জন্মভিটে বাংলাদেশের মায়া কাটিয়ে ।

এটা তো ঠিকই যে একাত্তর সালের পর থেকে এখনো পর্যন্ত এ পারে আসা উদ্বাস্তুরা ভারত সরকারের কাছে নূন্যতম সুবিধাটুকুও পায়নি । অনেকটা "উড়ে এসে জুড়ে বসা" গোছের মতো করে তাদের ঠাঁই হয়েছে খালের পাড়ে, রেল লাইনের দুই ধারে আর বড়ো বড়ো রাস্তার উপর । বস্তি আর কলোনি গোছের আস্তানা গেড়ে বসে আছে তারা এতগুলো বছর ধরে । কি করেছে সরকার তাদের জন্য শুধুমাত্র রেশন কার্ড আর ভোটার কার্ড নামের পরিচয়পত্র বানিয়ে দেওয়া ছাড়া । তাদের বেসিক চাহিদাগুলিও ঠিকমতো ভাবে মেটাতে চরম ভাবে ব্যর্থ হয়েছে রাজনৈতিক দলগুলি দ্বারা পরিচালিত সরকার । সরকার বদলেছে । প্রতিশ্রুতিরা পরিবর্ধিত এবং পরিমার্জিত সংস্করণে পুনরায় স্থান পেয়েছে নির্বাচনী ইস্তেহারগুলিতে । অথচ মানুষ সেই রকম ভাবেই রয়ে গেছে একই তিমিরে । মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখা হয়েছে অজ্ঞানতার অন্ধকারে ।

নতুন সরকারও নয় নয় করে নয়টা বছর পার করে ফেললো । ভোটের রাজনীতি আরও ঘোঁটের রাজনীতিতে পর্যবসিত হলো । মানুষের পরিচয় হয়ে গেলো এপিক নম্বর দিয়ে । আসলে যত নষ্টের গোড়া হলো এই নেতা মন্ত্রীরা । এদের তৈরী সরকারের ভাবনা চিন্তাগুলোই প্রতিফলিত হয়ে প্রশাসনের কর্মকান্ডে । আইন আদালতেও এদের মুরুব্বী মাতব্বরেরা নিজেদের সুবিধা অনুসারী স্বার্থ কায়েমের জন্য তৎপর হয়ে থাকে সব সময় ।

এটা ঠিকই যে দেশটাকে ধর্মের নাম দিয়ে খন্ড বিখন্ড করা হয়েছিল । আর তার কান্ডারী ছিলো নেহেরু আর জিন্নার শয়তানী ষড়যন্ত্র । এই দুই জনের নিজেদের অন্তর্কলহ এবং স্বার্থসিদ্ধির শিকার হলো আম জনসাধারণ । যারা জমিদার ভূস্বামী শ্রেণীর প্রতিভূ ছিলো, তাদের কিন্তু কোনও লোকসান হলো না । তারা তাদের জন্মভূমি স্বদেশ ত্যাগ করে চলে গেলেও অর্থ আর ধর্ম কৌলিন্যের জোরে নতুন দেশের মাটির ভিতরেও শিকড় গেঁড়ে বসে পড়লো ।

আর এরই ঠিক বিপরীতে চরম ক্ষতিগ্রস্ত হলো মধ্যবিত্ত আর নিম্নবিত্ত শ্রেণী, যাদের আর্থিক আনুকূল্য ছিলো না আবার সব কিছু নতুন করে আরম্ভ করবার । অনেক পরিবার শেষ হয়ে গিয়েছিলো এই অভাবের তাড়নায়, ধর্মীয় হুজুগেপানার রোষানলে ।

এই দেশটাও ক্রমশঃ পাকিস্তান আর বাংলাদেশের মতো উগ্র মৌলবাদী জেহাদী বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গীগোষ্ঠীর হাতে ধীরে ধীরেই চলে যাচ্ছে তোষণের রাজনীতির জন্য । বিগত দুই বছরের ভিতর পর পর একাধিক ইতস্ততঃ বিক্ষিপ্ত কিছু ঘটনা ঘটে গেলো এই পশ্চিমবাংলার মাটির উপর । হয়ে গেলো হামলা, মারপিট, লুঠপাট, অগ্নিসংযোগ - পুলিশ প্রশাসন ও সংবাদমাধ্যম হাজার চেষ্টা করেও "সবকিছু ঠিকঠাক আছে" - বলে বিষয়গুলোকে ধামাচাপা দিতে পারেনি । এই নিয়ে বিস্তর উথাল পাথাল করে দুই একজন তাদের আখের গোছালো । আর ক্ষতি হলো বাদবাকি আপামর সাধারণ মানুষের ।

অর্ক বেশ কিছুক্ষণ চুপচাপ ভাবলো, কি উত্তর দেওয়া যেতে পারে ঐ ধর্মান্ধ উগ্র প্রফেসর দাদাটিকে । শেষমেষ ফেসবুক থেকে অর্ক ভাদুড়ীর একটা অসাধারণ সত্যি ঘটনা ও শেয়ার করে দিলো -

[[ অর্ক ভাদুড়ীর ফেসবুক পোস্ট থেকে
-----------------------------
খিদিরপুর মুন্সীগঞ্জ রেড লাইট এরিয়া হিসাবেই পরিচিত।

সেখানকার ফাইভ স্টার ক্লাবের দুর্গাপুজো কমিটির সম্পাদক শেখ জাহাঙ্গীর দেবীপক্ষের সূচনা থেকে নিরামিষ খাচ্ছেন।

জানালেন, প্রতিবছরের মতো এ বারও পুরোহিতের সঙ্গে দুর্গাপ্রতিমার সামনে বসতে হবে তাঁকে!

দুপুরবেলা ঘুম থেকে উঠে এসে আলসে গলায় জাহাঙ্গীর বললেন, ‘‘সারা বছর সব রকম খাবার খাই তো, তাই এই ক’দিন একটু শুদ্ধ থাকছি। আগে আমার মামা সাহিদ আলি পুরোহিতের সঙ্গে বসতেন। এখন আমি বসি। বুঝতেই পারছেন, বড় দায়িত্ব।’’

ওই পাড়াতেই দেখা হয়ে গেল কোহিনূর বেগম, আয়েশা বিবি, সাবিনা বেগমের সঙ্গে।

জাহাঙ্গীরের বন্ধু বিকাশ রায়ের স্ত্রী পূজার সঙ্গে সিঁদুর খেলবেন তাঁরা। প্রসাদের ফল কাটা থেকে শুরু করে বরণ— অন্য বছরগুলির মতো এ বারও সব কিছুই করবেন একসঙ্গে। ঠিক যেমন জাহাঙ্গীর, সালাউদ্দিন, আল আমিনদের সঙ্গে প্রতি বছর নিয়ম করে ঈদের সময় রোজা রাখেন বিকাশ।

পুজো কমিটির সহ-সম্পাদক মহম্মদ সালাউদ্দিন লেবারের কাজ করেন। অসম্ভব ঝকঝকে আর স্মার্ট। হাসিখুশি। সালাউদ্দিন বলছিলেন, ‘‘এই যে প্রতিমা দেখছেন, এর ঠিক সামনেই আমরা মহরমের দিন তাজিয়া সাজাই। লাঠিখেলা হয়, ঢোল বাজাই, মিছিল বেরোয়। এই বছর দুর্গাপুজো আর মহরম একসঙ্গে হওয়ায় অনেকে অনেক কথা বলছেন। আমাদের কিন্তু সুবিধাই হয়েছে।’’ কেন? হাসতে হাসতে সালাউদ্দিন বুঝিয়ে দেন, ‘‘আমাদের এটা তো গরীবপাড়া, লোকের হাতে টাকাপয়সা তেমন থাকে না। উৎসব-অনুষ্ঠানের জন্য চাঁদা ওঠে কম। এবার সবমিলিয়ে দেড় লক্ষ টাকা উঠেছে। ওই টাকা দুই ভাগে ভাগ করে পুজো আর মহরম পালন করছি। একসঙ্গে হওয়ায় খরচ কমেছে।’’

পুজোটা ঠিক কতদিনের পুরনো, নির্দিষ্টভাবে বলতে পারলেন না প্রায় কেউই। জাহাঙ্গীর জানালেন, আশি বছর তো হবেই! তাঁর ঠাকুরদার আমল থেকে শুরু হয়েছে। এলাকায় মুসলিম জনসংখ্যা অনেক বেশি হওয়ায় প্রথম থেকেই প্রধান উদ্যোক্তা তাঁরাই। পাশাপাশি হিন্দুরাও আছেন।

মুসলিম হয়ে এ ভাবে আচার-অনুষ্ঠান মেনে পুজো করেন! সমস্যা হয় না?

জাহাঙ্গীর বললেন, ‘‘মাঝেমাঝে বাইরে থেকে সমস্যা তৈরির চেষ্টা যে হয়নি, তা নয়। তবে আমরা পাত্তা দিইনি কখনও। এই এলাকায় ও সব কোনওদিন ঢুকতে পারবে না।’’ এরপরই তাঁর সংযোজন, ‘‘দাদা, আপনারা বিষয়টাকে ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে দেখছেন, আমরা তা দেখি না। পুজো, মহরম, ঈদ— সবগুলোই তো উৎসব। আমরা গরীব মানুষ, উৎসবে একসঙ্গে আনন্দ করি।’’

বিকাশ রায় পুজো এবং মহরমের কোষাধ্যক্ষ। তাঁর কাছে রোজা রাখার কারণ জানতে চাইলে বললেন, ‘‘আমি শুনেছি, এতে শরীর সুস্থ থাকে। তাছাড়া বন্ধুরা সবাই রাখে, তাই আমিও রাখি। ভাললাগে। ভাসানে নাচতাম, মহরমের দিন আগে লাঠি খেলতাম, এখন বয়স বেড়েছে তো, তাই শুধু ঢোল বাজাই।’’

সালাউদ্দিন, জাহাঙ্গীর, বিকাশ, আসিফ, আল আমিন, নূরজাহানরা গরীব মানুষ। কেউ সিপিএম করেন, কেউ তৃণমূল। মহরমের দিন রাস্তার উপরে একসঙ্গে পাত পড়বে সবার। শরবত আর ভেজ বিরিয়ানি তৈরি হবে।

সালাউদ্দিন, বিকাশরা জানালেন, উৎসবের সময় যৌনপল্লীতে বাইরে থেকে অনেক মানুষ আসেন। মাংসজাতীয় কিছু রান্না হলে যদি তাঁদের খেতে সমস্যা হয়, তাই ভেজ বিরিয়ানির আয়োজন। নেমতন্ন করলেন আমাকে আর সুমনদাকে। দেখলাম, একচিলতে ক্লাবঘরে দুর্গা মন্ডপ সাজানোর সরঞ্জামের পাশেই রয়েছে তাজিয়া সাজানোর জিনিসপত্র।

দাঙ্গার কথা শুনেছেন নিশ্চয়? পারবেন এভাবে একসঙ্গে থাকতে? কিছুটা যেন বিরক্তই হলেন জাহাঙ্গীর। বললেন, ‘‘আপনাকে বলছি তো বারবার, এমনটাই থাকব আমরা। এটা গরীবপাড়া। আমাদের কাছে ধর্মীয় পরিচয় গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তার চেয়েও বেশি জরুরি বন্ধুত্ব। আপনি হিন্দু-মুসলমান করছেন কেন! এই বিকাশ দাঁড়িয়ে আছে, ও আমার ছোটবেলার বন্ধু। আমার কিছু হলে ও রক্ত দেবে না! ওর কিছু হলে সালাউদ্দিন আসবে না! এমনটা হয় না কি কখনও! আমরা সব একসঙ্গেই করব। এই মহল্লায় বিভেদ ঢুকবে না, সোজা কথা!’’

আমরা শিখেছিলাম, মানুষের কাছে যেতে হবে। কারণ, মানুষই শিক্ষক। আমরা শিখেছিলাম, বাধ্য ছাত্রের মতো নতজানু হয়ে বসতে হবে মানুষের কাছে। শিখতে হবে। যেমন কৃষক পাঠ নেন প্রকৃতির কাছে। আমরা শিখেছিলাম, মানুষ, কেবলমাত্র মানুষই পারে তোমাকে স্নান দিতে। মানুষ, একমাত্র মানুষই পারে সব ক্লেদ মুছিয়ে দিতে আদরে আদরে।

শিখেছিলাম, বাজপাখির ডানার নীচে তোমায় জন্য কোল পেতে রেখেছে মানুষ। ]]

ও জানে না, এর পরের উত্তরে আবার কি লিখে পাঠাবে ঐ দাদাটি । তবে ও জানে, এইভাবেই মিলেমিশে ভালোবেসে ওদের সকলকে বাঁচতে হবে । কারণ এখনো অর্ক ঐ একটাই সার সত্যিতে সত্যিই বিশ্বাস করে - "মানুষ মানুষের জন্যে" |||

( সমাপ্ত )

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি