ব্যোম্ 1

ব্যোম্ ভাইদের সাথে @ রাজেন্দ্র ভট্টাচার্য্য
-------------------------------
e mail id: rajendra.bhattacharya@gmail.com
------------------------------
দূরাভাষঃ ৯৮৩০২০২১৭৫
-------------------
(গোড়ার কথা)
-----------
গত কয়েক সপ্তাহ ধরে মালদা তথা সমগ্র পশ্চিমবঙ্গের অধিকাংশ উত্তরাঞ্চল ব্যাপী এবং বিহার ও ঝাড়খন্ড জুড়ে ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়েছে সাধারণ মানুষ ।

ভেসে গেছে মানুষ, গবাদি পশু, ফসল । ভেঙে পড়েছে মাটির ঘর, বেড়া । ডুবে গেছে রাস্তাঘাট, বাগান । উপচে পড়েছে নদী নালা আর পুকুরের জল ।

মানুষ গামছা ফেলে ঘরে বসে মাছ ধরতে পারলেও ছেড়ে দিচ্ছে । কারণ রান্না করবার সামগ্রী বা জ্বালানির হা-হুতাশ সমস্ত বানভাসি এলাকা জুড়ে ।

প্রশাসন থেকে নামানো হয়েছে স্পীড বোট । সরবরাহ করা চলছে ত্রিপল, শুকনো চিঁড়ে আর গুড় । সাথে ও.আর.এস. এর প্যাকেটও । তাও সেই পরিষেবা পর্যাপ্ত নয় ।

বহু জায়গাতেই মানুষ আধপেটা খেয়ে জীবনসংগ্রামে টিঁকে থাকতে চাইছে । চলছে জলবন্দী মানুষদের উদ্ধারের কাজ । ত্রাণ সংগ্রহ করা হচ্ছে বিভিন্ন এলাকা থেকে ।

মালদা রেল স্টেশনের পর থেকে উত্তরবঙ্গের আরও উত্তরের দিকে রেল সংযোগ এখনো বিচ্ছিন্ন । জায়গায় জায়গায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা ভেঙে পড়েছে ব্রীজ । জাতীয় সড়কও এখনো অনেক জায়গাতেই জলমগ্ন ।

এই কঠিন সময়ের ভিতর দিয়েই সেটেলমেন্ট অফিসের আর বাদবাকী যাবতীয় কাজকর্ম চলছে । এরই মধ্যে আচমকা আমার এক পরিচিত একজন কর্মচারী সেদিন কথাপ্রসঙ্গে সুলতানগঞ্জের প্রসঙ্গ তুলে এনেছিলেন ।

সেখান থেকে তার কোনও একজন সম্বন্ধী নাকি এখানে এসে উঠেছেন দিনকয়েক এর জন্যে । এখানে আমার অফিসে এসেও তিনি নাকি ঘুরে গেছিলেন আমার কোনও এক স্টাফের কাছ থেকে জমির কোনও একটা বিশেষ কাজ নিয়ে ।

আমার ব্লকের পাশ দিয়েই বয়ে গেছে সুবিশাল গঙ্গা এবং তার কিছু শাখানদী । পড়ন্ত বিকেলে সূর্য ডোবার সময় গঙ্গার পাড়ে গিয়ে দাঁড়ালে বা জাহাজঘাটের গা ঘেঁষে বানানো চায়ের গুমটিতে গিয়ে বসলে, অপরপ্রান্তের একটানা সুবিশাল রাজমহলের পাহাড়শ্রেণীকে মাথা তুলে বুক উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায় ।

ঐ পাশটা হলো ঝাড়খন্ড । খনিজ সমৃদ্ধ ঐ রাজমহল অঞ্চল থেকে প্রতিদিন নিয়মিত ভাবে পাথর বোঝাই লরি বা ট্রাক আসে ভেসেল বোঝাই হয়ে ।

এই পাড়ে আমাদের লোকজন আর পুলিশ মামারা অপেক্ষা করে থাকে পারমিট চেকিং এর জন্যে । আমার দপ্তর কুচো বা গুঁড়ো পাথরের উপর কর আদায় করে না । তবে ট্রাক ওভারলোডিং হলে ঐ অতিরিক্ত বড়ো পাথরের জন্য রয়্যালটি বাবদ জরিমানা বা ফাইন আদায় করে ।

সম্ভবতঃ আমার অফিসে আগত ঐ ব্যক্তিটি হয়তো লরির মালিক কিংবা খুচরো পাথরের ব্যবসায়ী । হয়তো আমার কর্মচারীরা ওনার ড্রাইভারের থেকে রয়্যালটি বাবদ জরিমানা আদায় করতে না পেরে ওনার গাড়িটাকে চালক আর খালাসি সহ ধরে থানায় ভরে দিয়েছে ।

ওনার মুখে "সুলতানগঞ্জ" নামটা শুনেই আমার চোখের সামনে ভেসে উঠলো বিহার-ঝাড়খন্ডের ঐ গঙ্গা তীরবর্তী একটা সুবিশাল সমুদ্রের মত প্রান্তর । যার কোনও আদি বা অন্ত নেই । আছে শুধু গেরুয়া পড়ে কাঁধে জলের বাঁক ঝুলিয়ে হেঁটে চলা কোটি কোটি মানুষের সারিবদ্ধ আসা যাওয়া ।

আর আজ নাকি সেই এলাকাটাও সম্পূর্ণরকম ভাবে বন্যা কবলিত । অথচ সপ্তাহ খানেক আগেই আমি ঐ এলাকায় ঘুরে এলাম । রাত্রিবাস করলাম আর বাদ বাকি তীর্থযাত্রীদের সাথে ওদের মতন করেই । পোষাকে পরিধানে খাওয়ায় থাকায় ঐ জীবন একেবারেই আলাদা । এখনকার সময়ের সাথে ওকে একবারেই মেলাতে পারবো না ।

মনটা তাই একটু নরম হয়ে গেলো আমার । লোকটিকে ডেকে এলাকা সম্পর্কে একটু খোঁজ খবর নিলাম । আর ওনার সব পেপার্স এর ঝামেলা মিটিয়ে ওনাকে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ছেড়ে দিলাম ।

এরপর বসে পড়লাম সেই ডায়েরী নিয়ে । আমার দেওঘর ঘুরে আসার বিস্তারিত বিবরণ ওতে লিপিবদ্ধ করে রেখেছিলাম । সেটা আমি সকলের সাথে শেয়ার করতে চাই । আমার মনে হয় আপনারাও এই ডায়েরীটা পড়ুন । আর একটা অন্যরকম জীবনের স্বাদ গ্রহণ করুণ ।

এক
----
( ৬ই আগস্ট, ২০১৭, রবিবার )
-----------------------
আজ ৬ই আগস্ট, ২০১৭, রবিবার । ভোর সাড়ে পাঁচটায় বিছানা ছেড়েছি । উঠে মুখ হাত ধুয়ে শেভিং করে স্নান সেরে ব্যাগটা গুছিয়ে নিয়েছি । সকাল সাতটার ভিতর গাড়ি ঢুকবে টাউনে । গন্তব্য আপাততঃ দেওঘরের বাবাধাম ।

এই সপ্তাহে আর বাড়িতে যেতে পারিনি । গতকাল ৫ই আগস্ট, শনিবার মালদা জেলার ভূমি রাজস্ব দপ্তরের সাথে ব্লক স্তরের ভূমি রাজস্ব অফিসের সম্প্রীতির ফুটবল ম্যাচ ছিলো দুপুর তিন'টে থেকে । আমার ব্লক থেকে আমি ছিলাম ।

আমাদের ছিলো ইতালির নীল জার্সি । আর ওনাদের ছিলো জার্মানির সাদা জার্সি । শুরু হলো ঐ ভয়ানক গরমে মাথা ধরানো গা জ্বালানো ভরা দুপুরে আমাদের ফুটবল খেলা ।

আমাদের দল তিন গোল দিলো । ওরা একটাও গোল শোধ করতে পারলো না । হেরে গেলো ওরা । আমরা জিতে গেলাম । পাক্কা সতেরো বছর পরে আবার ফুটবলে পা দিলাম । খেললাম ডিফেন্স পজিশনে ।

কাল বুঝলাম বয়সটা আগের চেয়ে কতখানি বেড়ে গেছে আর পাশাপাশি কমে গেছে দমটাও অনেকখানি (নেশাভাঙ না কমালে হয়তো আরও কমে যাবে আগামী দিনে) ।

তবে সবকিছু মিলিয়ে জয় হলো সেই খেলারই । আর আমাদের মতো দিনভর ব্লক অফিসে হাড়ভাঙা খাটনি খাটা মানসিকতার ।

তবে হার হলো একজনের । আমাদের নীল'দার বাড়াবাড়ি রকমের নাক উঁচু অহংকারের । প্রসঙ্গক্রমে বলে রাখি এই খেলাধূলোর ব্যাপারটা নিয়ে নীলদা খুবই উৎসাহী ছিলেন গোড়া থেকেই । ঊর্দ্ধতন কর্তৃপক্ষের কাছে এই জাতীয় খেলাধূলার সুপারিশ বা প্রস্তাবনাও ছিলো এই দাদাটির ।

যাই হোক, শেষমেষ দল তৈরী হলো । আর আমি ছিলাম আমার ব্লক অফিস থেকে সবেধন নীলমনি একমাত্র প্রতিনিধি ।

গতকালকের আগের দিন, অর্থাৎ শুক্রবার বিকেলে যখন গেছিলাম জেলার হেড অফিসে, নীলদা তখন আরও জনা তিনেক সহকর্মীর সাথে ফুটবল নিয়ে গা ঘামাচ্ছিলেন । আর আমাদের ব্লকের টিম নিয়ে খুবই হেলাফেলা করছিলেন ।

গতকাল খেলা শুরুর আগে মাঠেও সেই ব্যাপারটা আমার নজরে পড়েছিল । নিজেকে আদ্যন্ত হিরো ভাবা এবং বাকি সব বিনা প্র্যাকটিসে ম্যাচ খেলতে আসা খেলোয়াড়দের উনি তৃণসম জ্ঞান করছিলেন । সোজা বাংলায় বিরাট হাবভাব নিয়ে এদিক সেদিক করে ঘুরে বেড়াচ্ছিলেন ।

আমি ডিফেন্সের রাইট উইং এ ছিলাম । চেহারাটা আমার বেশ গাঁট্টাগোট্টা গোছের । আমার একটাই লক্ষ্য ছিলো । যে কোনও উপায়ে সুযোগমতো প্রতিপক্ষের পা থেকে বলটা কেড়ে নেওয়া ।

কারণ আমি খুব ভালোমতনই এটা জানতাম যে এই দশ'টা - ছ'টা চাকুরীজীবনে ফুটবল খেলাটা ঘরে বা মাঠের গ্যালারীতে বসে দেখার লোক প্রায় সব বাঙালীই । কিন্তু পায়ে বল নাচিয়ে, পাশ কাটিয়ে ডজ আর ড্রিবলিং করে বল নিয়ে ছুটে গোল করার মতো মারাদোনা বা মেসি এখানে কেউ নেই ।

স্ট্র্যাটেজিটা ব্যাপক রকমের কাজে লাগলো । আমরা প্রতিপক্ষের বল ধরা অবদি অপেক্ষা করতে লাগলাম । কিন্তু জানতাম ওরা কেউ বল রিসিভ করে মেসি মারাদোনার মতো পায়ের সাথে আঠার মতো বলকে আটকে রাখতে পারবে না । সুতরাং ওদের বল রিসিভ করার পরবর্তী চার পাঁচ সেকেন্ডের ভিতর বল ক্লিয়ার করে আমাদের মাঝমাঠের প্লেয়ারদের দিকে বলটা পাস করে দিচ্ছিলাম ।

তাতেই যা কাজ হওয়ার হলো । ওরা আমাদের এলাকায় গোটা ম্যাচ জুড়ে মাত্র বার তিনেক ঢোকার সুযোগ পেলো । আর বাকি সময়ের পুরোটাই আমাদের ছেলেরা উপরে উঠে খেলে গেল । ওদেরকে চাপে টেনশনে রেখে তিনখানা গোলও দিয়ে দিলো ।

আরও গোটা দশ বারোটা গোল দেওয়া যেত । কিন্তু সবাই প্রায় বয়স্ক । প্রচন্ড দাবদাহে ক্লান্ত, ঘর্মাক্ত কলেবর । আর পায়ের লক্ষ্যও বিনা প্র্যাকটিসে নড়বড়ে ।

আর নীলদা একাধিকবার পায়ে বল পেয়েও কিছুই করতে পারলেন না । শুধু ছুটে বেড়ালেন গোটা মাঠ জুড়ে । কখনো বল নিয়ে, কখনো বলের পিছনে ।

মনে পড়ে গেলো সেই লঙ্কার রাবণ রাজার কথা । অহংকার পতনের কারণ । নীলদার টিম তিন গোল হজম করলো মুখ বুঁজে । এক বাক্যে গো হারান হারলো ।

এই প্রসঙ্গে একটা হোয়াটস্ অ্যাপের জোকস্ এখানে শেয়ার না করে পারলাম না -

খবর আছে যে ব্রাজিলের বিখ্যাত স্ট্রাইকার নেইমারের দাম উঠেছে ১৭৭৩ কোটি টাকা। আর একটা মানুষের দেহে প্রায় যে কয়টি অঙ্গ প্রত্যঙ্গ থাকে, যার সংখ্যা হলো উনআশি (৭৯) । সেই হিসাবে নেইমারের এক একটা অন্ডকোষের দাম ২১কোটি টাকা 😵😵😵😵😳😳 !!!!! ভাবা যায় !!!!!

আচ্ছা - আমাদের এই অতি অহংকারী, নাক উঁচু, ধরাকে সরা জ্ঞান করা, আত্মঅভিমানী ঘন্টাকর্ণ স্ট্রাইকার নীল দাদার এক একটি অন্ডকোষের বাজার মূল্য কত হতে পারে ???

এটা পড়ে আমায় যে যাই ভাবুন না কেন, আমার প্রশ্ন টা নিয়ে কিন্তু অবশ্যই ভাবনা চিন্তা করবার মতো রসদ আছে সকলের কাছে । কারণ অত্তো ভারী দ্বিখন্ডিত অন্ডকোষের ওজন নিয়ে গোটা মাঠে ছোটাছুটি করা এবং শেষ অবদি গোল না পাওয়াটা কি কম চাট্টিখানি কথা বলুন !!!

দুই ।।
---
একটু আগেই একটা ফোন এসেছিলো । আমায় এবার তৈরী হতে হবে । আর একটু পরেই বেরিয়ে যাবো দেওঘরের পথে বাবাধামের দিকে । সুতরাং এখন আপাততঃ একটা বিরতি নিচ্ছি । পরে আবার সুযোগ সুবিধে বুঝে লিখতে বসবো ।

সকলে ভালো থাকুন । আরামে আয়েসে আনন্দে কাটুক ছুটির দিন । সকলকে সুপ্রভাত ।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি