রামকথা এবং তারপর - এক

রামকথা এবং তারপর _ @ রাজেন্দ্র
🖋✒🖋✒🖋✒🖋✒🖋✒

শুরু করলাম আমার তৃতীয় কাব্যগ্রন্থের প্রস্তুতি পর্ব । এবারের বিষয়বস্তুতে থাকছে রামায়ণ । রামায়ণের নানা চরিত্র, তাদের পারস্পরিক আচার আচরণ, ব্যবহার ও বিশ্বাস নিয়ে আমার এই নবতম কাজ করতে চলেছি ।

🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯

হিন্দুদের আদি বা সর্বপ্রথম মহাকাব্য রামায়ণের লেখা আরম্ভ হয়েছে আদিকবি মহর্ষি বাল্মিকীর হাত ধরেই । অথচ তিনিই ছিলেন দস্যু রত্নাকর । দেবর্ষি নারদ তাঁকে সংক্ষেপে রাম কাহিনী বিবৃত করেন । সেই সময় রামচন্দ্র অযোধ্যার সিংহাসনে অধিষ্ঠিত ।

দেব ঋষি নারদের প্রস্থানের পর বাল্মিকী তাঁর শিষ্য ভরদ্বাজকে নিয়ে তমসা নদীর বুকে  স্নান করতে যান । সেখানে দেখেন মৈথুনরত ক্রৌঞ্চ/বক এর ব্যাধ কর্তৃক হত্যা আর অনুভব করেন ক্রৌঞ্চীর কান্না । ব্যাথিত কবির মনে জন্ম নেয় প্রবল গাঢ় শোক । সেই শোক থেকেই উৎপন্ন হয়েছিলো পৃথিবীর প্রথম ছন্দবদ্ধ শ্লোক _ "মা নিষাদ প্রতিষ্ঠাং ......"

আমার এই রচনার অংশে, এই প্রসঙ্গে আমি চারটি দিক দেখাতে চেষ্টা করেছি । আমার লেখার প্রথম পর্বটির মূলসূত্র বাল্মিকী রামায়ণ । বাকি তিনটি পর্ব ( দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ ) আমারই কল্পনায় স্বরচিত । তাই আপনাদের সকলকে বিনীত অনুরোধ রইলো আমার রচনাগুলি পড়বার জন্য এবং সমালোচনা ও বিশ্লেষণ মূলক মন্তব্য রাখবার জন্য _ কারণ আমি মূল বাল্মিকী রামায়ণের বিষয়গত ভাবকে অক্ষুণ্ণ রেখেই বর্তমানের প্রাসঙ্গিকতার আঙ্গিকে কিছু অতিরিক্ত ভাবনার সংযোজন করতে চাই । তাই আপনাদের সুচিন্তিত মতামত বিশেষ ভাবে কাম্য এবং কাঙ্খিত ।

@ রাজেন্দ্র

🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉🔯🕉

এক ।।

মা নিষাদ ( পর্ব এক - বাল্মিকীর শোক )
***********************************

বিনা যন্ত্র মন্ত্রেই
জলের গভীরতা মাপা যায়

শ্যাওলা আর চকমকি পাথর
পাশাপাশি দেখা যায়

ঘষা কাঁচের মতো
সময় গলে যায়

বয়ে চলে ভাগ্যবতী তমসা

ভাগীরথী কোল ছেড়ে
গোধুলির আধো আলো দূরে

শুধুমাত্র বল্কলই সম্বল করে

আনন্দে আচ্ছন্ন
একাকী নীরব অবগাহন
ভেঙে হয় খানখান্

বিঁধে যায় আর্তি আর আর্তনাদ
তীরের মত ছুটে এসে

আছো কে কোথায়

বাঁচাও আমায়

নাহ্
কেই বা আসবে আর
এই অবেলায়

ঘর ফেলে তার
ছেড়ে সব দরকার

গেলো উড়ে তরতাজা প্রাণ
ব্যাধ শরে ভূপতিত সঙ্গী

এখন শুধুই শোনে
বুকভাঙা উপচে পড়া
তমসার ঘন জঙ্গল

ধুয়ে গেলো কিছুটা
জমাট রক্তের দাগ

আর _
ভেসে যায় বাল্মিকী মন
চোখের জলে টলোমল

© রা জে ন্দ্র / 18 । 03 । 2017
10:41 A.M.

দুই ।।

মা নিষাদ ( পর্ব দুই - ব্যাধের শিকার )
********************************

শোনা গেছে _

রাম রাজ্যে নাকি
মরতো না কেউ
অনাহারে বেঘোরে

সবাই পেত
হরেক রকম খাবার
রাশি রাশি পেট পুরে

তবুও কেন যে ভীমার মা'টা
ওলাওঠায় মরেছে সেই কবেই

বাপ্ টাও হারিয়েছে কালের দোষে
অনাবশ্যক ঘরে ফেরার পথ

তারও তো আর
চাল চুলো টিকির দেখা নেই

দুই দিন তিন রাত গেলো
নেই ঘরে চাল তেল নুন

শুধু পেটের ভিতর জ্বলছে
ভোলানাথের প্রলয় আগুন

বাবার একটা পুরানো ধনুক
ঝুলছিল মাটির দেওয়ালে

আর সাথে তার গোটা পাঁচেক তীর

খিদের জ্বালায় কিছুই ভালো লাগেনা
মন জুড়ে শুধু খাই খাই অস্থির

অবশেষে
সব পাপের ভয় শিকেয় ভুলে

তুলে নিলো ভীমা
পুরানো ধনুক তীর

এবারে মন তার
বরফের মতোন একেবারে স্থির

শিকারে যাবে সে

যেতেই হবে তাকে

যাহোক একটা কিছু যে
ধরে আনতেই হবে তাকে

নইলে কি খাওয়াবে সে
পাঁচ বছরের ছোট্ট বোন টা'কে

পা টিপে টিপে
এগিয়ে চলে ভীমা
ধীরপায়ে বনের গভীরে

হঠাৎই কান গেলো তার
গাছের উপরে

বসে আছে দুটি বক
খেলছে আনন্দ সুখে

তুলে দেয় ধরে আনা মাছ
ভালোবেসে এ ওর মুখে

মুহূর্তকাল থামল ভীমা
চুপ করে কী যেন ভাবল একবার

নিমেষে ধনুকে জুড়ে তীর
কাঁপা হাতে ছেড়ে দিলো আর

রইলো সে চোখ বুঁজে
পাপবোধ ভয়ে

উপর থেকে ছিটকে পড়ে বক
সাদা সফেন দেহময়
লাল রক্তমাখা

নেমে আসে আরেকটি বক পাশে
মাথা তার প্রেমিক বুকে রাখা

তমসার জলে বাঁধলো সারা মন

ঋষি স্নান সেরে
উঠে এসে দেখেন সব

বিহ্বলে ভেজা
শোক সন্তপ্ত আগুন নয়ন

ঋষি অভিশাপ
সে মাথা পেতে নিলো

আর নত হয়ে শিকার উঠিয়ে
ধীরপায়ে ঘরে ফিরে গেলো

এখন শুধু সেই একমাত্র জানে
আর জানেন জানকীনাথ শ্রীরাম

আড়াই দিন পর আজ
বোনটা তার খেতে পাবে পেট ভরে

বেঁচে থাক
ঋষি বাল্মিকীর রামায়ণ নাম

© রা জে ন্দ্র / 18 । 03 । 2017
12.54 P.M.

তিন ।।

মা নিষাদ ( পর্ব তিন - ক্রৌঞ্চ কথা )
*******************************

আলো ভেজা ডানার আঁচলে
মুছে দিলো ঠোঁট ভোরের শ্যামা
আর তোমার আমার সীমানার
আকাশী কাঁটাতার

আমার অকারণ মন খারাপ
গুলে দিলো সর্ষে ভাঙা রং
ভালোবেসে মুছে দিলো
হরিণীর চোখের ধার

তবুও কখনো
সীমানারা হয়নি অসীম

তোমার সাথে উড়তে ভাসতে
আর জড়াজড়ি করে
ভালোবাসতে শিখেছিলাম

আকাশের কালো মেঘ চিরে
সবুজ ধানের শিষ ছুঁয়ে ছুঁয়ে

কতবার ঐ দীঘিটার পাড়
ঘেঁষে ঘেঁষে ছোট মাঝারি
মাছ গেঁড়ি কাঁকড়া ধরতাম

কতবার কতরকম ভাবে
খোলা আকাশ জুড়ে
সাঁতার কেটেছি আমরা

এপাড় ছেড়ে অনেক দূরে
ওপারে অবহেলায়

আর এখন দেখ
কেমন করে তীরটা এসে
বিঁধেছে আমার বুকে

ফুটো করেছে পাঁজর
ছুটে চলা রুধিরের কান্নায়

জানি
এবার যে চলে যেতে হবে

ব্যাধের তীরে প্রাণটা যে এবার
ফেলে যেতে হবে তোমার কোলে

না গো সখী
এমন করে ফেলোনা তুমি
একলা আর্তনাদের জল

কত মাছ উঠেছে ভেসে আজ
তমসার সমস্ত জল কাঁপছে টলোমল

ঐ দেখো
বিষ্ণুদূত আসছেন দেখো
নিতে আমায়
নারায়ণী বৈকুন্ঠধামে

আমার দুঃখে শোকেই যে
শ্লোক লিখবেন মহাকবি বাল্মিকী
রাম সীতার চরণ অমৃতনামে

© রা জে ন্দ্র / 20 । 03 । 2017
09:53 A.M.

চার ।।

মা নিষাদ ( পর্ব চার - অসহায় ক্রৌঞ্চী )
**********************************

থাকতাম মিলে মিশে আমরা
ছোট ছোট তিন ভাই বোন

সেই অনেক বছর আগে
মায়ের একলা সাজানো বাসায়

মুখের গোড়ায় খাবার এনে
খাইয়ে দিত মা আমাদের
সময় মতোন

কোনও এক পড়ন্ত বিকেলে
বড় ভাই এর ঠেলায়
একদিন পড়লাম গিয়ে
ঢালাই রাজপথের উপর

তখনো ভারী ছিলো
আমার কচি ডানা দুটো বিস্তর

পারিনি উড়ে বাঁচতে

শুধু ভেঙেছিল একটা পা

ঘাড়েও খুব লেগেছিলো চোট

মুখ বেয়ে উঠেছিল ফেনা

আর ব্যাথায় অবসন্ন
গোটা ঠোঁট

তবুও বেঁচে গেলাম

মরণ যে তখনও ক্ষমাশীল

আরও একটু বড় হলে
শিকার নিতাম ছিনিয়ে

একদিন তো মিলনরত
দুটো মাছের একটিকে
উঠিয়ে নিলাম
অভিজ্ঞতার চেরা ঠোঁটে

সেদিন তার অপর সঙ্গীটি
ফেলেছিল অগুনতি চোখের জল
জলের ভিতরে স্থির পলকহীন চোখে

আর দিয়েছিল হয়তো বা
প্রাণভরে অভিশাপ
একদিন নাকি
আমারও এমনটাই হবে

সেদিন খুব হেসেছিলাম
প্রথমবারের মতো
বড়ো শিকারের আনন্দে

আর আজ
ফলে গেল যে কেমন করে
সেই না দেখা চোখের জলের শাপ

জানি
মৈথুনরত মাছ ধরে সেদিন
ধার করেছিলাম
অনেক যন্ত্রণা অগুণতি পাপ

আজ ক্রৌঞ্চ আমারও সাথেও
চেয়েছিলো প্রাণসুখে মিলতে

অভিশাপ এলো অজগর সেজে

আর গ্রাস করলো তাকে
অনভিজ্ঞ ব্যাধের হাতকাঁপা তীর

সুখের সময় ধরে গিলতে

আহা সখা আমার

বুঝতে পারিনি সেদিন
মীনের যন্ত্রণা

ওর চোখের জল দেখতে পাইনি
অগভীর জলের স্রোতে

বুঝলাম
মৈথুন বিরহী মৃতপ্রায়
রক্তমাখা দেখে তোমায়

লেগে গেছে আমার জীবনে
কান্নার সেই জল

এখন আর কেমন করেই বা
চাইবো ক্ষমা আমি
তার কাছে

জানি
এখনো হয়তো কোনও একখানে
চুপচাপ নীরবে সে
একাকী বেঁচে আছে

মহাকবির শোকের চেয়েও
আমার যে আরও বেশী শোক

তবে এখন
শুধু এই টুকুই জানি

ব্যাধের খাবার হয়ে
এবার মিলিয়ে যাবে তুমিও

তবুও বারবার চাইবো মনে মনে
ওদের সবার ভালো হোক্

© রা জে ন্দ্র / 20 । 03 । 2017
10:14 P.M.

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি