ঢাকে ঢোলে ঢাকা

ঢাক-ঢোলের সঙ্গে ঢাকার পরিচয় খুব পুরনো। অনেকে বলেন ঢাক বা ঢোলের শব্দের ওপর ভিত্তি করেই ঢাকার নামকরণ হয়েছে। গল্পটি এমন— সেই ১৬০৮ সালের কথা বুড়িগঙ্গায় নৌকা ভাসিয়ে এক বিরাট নৌ-বহরসহ নদী ভ্রমণে বের হলেন সুবাদার ইসলাম খান। উদ্দেশ্য, বাংলার রাজধানী নির্ধারণ করা। বিশাল এলাকা ঘুরে এক জঙ্গলাকীর্ণ জায়গায় বিশাল নৌ-বহর নোঙর করলেন সম্রাট জাহাঙ্গীরের সুযোগ্য সুবাদার আলাউদ্দিন ইসলাম খান। নদীর পার, বিশাল খালি জায়গা, পাইক পেয়াদারা বললেন হুজুর এ তো শুধু জঙ্গল। —জঙ্গল কোনো সমস্যা নয় সাফ হয়ে যাবে। সবদিক বিবেচনা করে ইসলাম খান জঙ্গলাকীর্ণ জায়গাটাই রাজত্বের রাজধানী করার সিদ্ধান্ত নিলেন। তখনও এ জনপদে পূজা হতো। সুবাদার নদীর পাড়ে পূজারত ঢুলিদের ডেকে বাদ্য বাজাতে বললেন, আর চারদিকে পাঠালেন রাজসৈন্য। যতদূর পর্যন্ত ঢাকের বাদ্য শোনা যায়, ততখানি যেতে হবে রাজ সৈনিকদের। যে পর্যন্ত গিয়ে বাদ্য শোনা শেষ, সেখানেই নিশান পুঁতে দিতে হবে। আর এভাবেই নির্ধারিত হয়েছিল মুঘল রাজধানীর সীমারেখা। ইসলাম খান যেখানে নৌকা ভিড়িয়েছিলেন, তার নামানুসারে সেই জায়গার নাম হলো ইসলামপুর। আর ঢাকের শব্দে নির্ধারিত শহরের নাম হলো ঢাকা। তবে তারও আগে ঢাকার জনবসতি শুরু হওয়ার আগে থেকেই ভাওয়াল কিংবা বিক্রমপুরের জমিদাররা ঢাকের শব্দে এ জঙ্গলাকীর্ণ জনপদে শিকার করতে বের হতেন।
সামাজিক ঢাকায় ঢোলের ব্যবহারের প্রমাণ পাওয়া যায়। মোগলপূর্ব যুগে আদিবাসী ঢাকাইয়ারা পুঁথি ও কিচ্ছা পাঠ, বিয়ের গান, মুর্শিদী, কীর্তন, বন্দনা সঙ্গীত, শোক ও বিচ্ছেদের গান, ধর্মীয়-সামাজিক উত্সবে পালাগান ও জারিগান পরিবেশনের মাধ্যমে তাদের সংস্কৃতি চর্চা অব্যাহত রাখত। এসব অনুষ্ঠানে ঢোল বা ঢোলজাতীয় বাদ্যযন্ত্র বাজানো হতো। নগর সভ্যতার হাওয়ার দোলায় এর সঙ্গে সংযুক্ত হলো— যাত্রাপালা, বাইজি ও হিজড়াদের নৃত্যগীত, ছাদ পিটানি গান এবং থিয়েটার, বিভিন্ন মেলা , জন্মাষ্টমীর মিছিল, লেটোগান ও কিচ্ছা, বাংলা থিয়েটার, হোলির গান, শাস্ত্রীয় সঙ্গীত, চৈত্রসংক্রান্তি, বিয়ের গান, কাসিদা, কাওয়ালি ইত্যাদি। মীজানুর রহমানের ‘ঢাকা পুরান’-এ বারবনিতাদের কথা উল্লেখ আছে, যারা ঢোলক নিয়ে মহল্লায় ঘুরে ঘুরে মানুষকে বিনোদিত করত।
‘কমার্শিয়াল হিস্টরি অব ঢাকা’ থেকে কিন্তু জানা যায়, উনিশ শতকের মধ্যভাগ থেকে বিশ শতকের মাঝামাঝি পর্যন্ত ঢাকার প্রতি মহল্লায় চোখে পড়ত একাধিক বৈঠকখানা। কর্মব্যস্ত সাধারণ মানুষ দিন শেষে এসব বৈঠকখানায় একত্র হয়ে তাস, পঁচিশি, সাতরঞ্চ (দাবা), গাঞ্জেফা ও চৌসার নামে খেলায় অংশগ্রহণ করত। বৈঠকখানাগুলোয় ঢোল, তবলা, মাজেরা, সেতার, তাম্বুরা, বাঁশি, বেহালা ও হারমোনিয়াম নিয়ে সঙ্গীত চর্চাকারীরা সমবেত হয়ে সঙ্গীতচর্চা করত।
আবার ১৮৩৮ সালে আদমশুমারিতে প্রাপ্ত ঢাকা শহরের পেশাজীবীদের তালিকা থেকেও ঢাকি কিংবা ঢুলি পেশার প্রমাণ পাওয়া যায়। ‘ডোম বা মৃতদেহ বহনকারী, দোমানী বা মুসলমান মহিলা বাদ্যকার, ঢাকী বা ডুলী ঢোল প্রস্তুতকারক’।
তবে এখনো ঢাকায় ঢুলি ও ঢোল প্রস্তুতকারীরা আছেন। ভারতীয় উপমহাদেশে প্রাচীনকাল থেকেই বাদ্যযন্ত্রের বহুমুখী ব্যবহার ছিল। যেমন শঙ্খধারী বিষ্ণু, ডমরুধারী শিব, মুরলী বা বাঁশীধারী কৃষ্ণ, বীণাধারী বাদ্যযন্ত্রের কৃষ্ণকে মুরলীধর আর সরস্বতীকে বীণাপাণি নামে ডাকা হয়। ডমরু ঢোলের আরেকটা সংস্করণ। নানা সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র অনস্বীকার্য। যুদ্ধ শুরু হবে ডমরুর বাদ্যে, যুদ্ধ শেষ হবে ঢাকের বাদ্যে। বিয়ে, জন্ম, মৃত্যু সর্বত্র বাদ্য আর বাদ্য। এত প্রয়োজনীয় যন্ত্র তৈরিতে তো বিশেষ মুন্সিয়ানা ও অভিজ্ঞতাসম্পন্ন কারিগর দরকার। তাই ঢাকার জন্মলগ্নেই ঢাকায় গড়ে ওঠে এমন একটি সম্প্রদায়, বাদ্যযন্ত্র বানানোই যাদের কাজ। শাঁখারীবাজার যেহেতু ঢাকার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অনেকটাই বহন করে। প্রথম থেকেই এখানে গড়ে ওঠে তত, শুষির, ঘন ও আনদ্ধ এই চার প্রকারেরই বাদ্যযন্ত্র বানানোর কারিগন শ্রেণী। একসময়কার শাঁখারীবাজারের বাদ্যযন্ত্র শুধু নবাবদের হেরেমেই শোভা পেত না, বহির্বিশ্বেও রফতানি হতো। সাপুরের তুবরি, বাজিকরের ডুগডুগিসহ ঢোলের অন্যান্য সংস্করণও তাদের হাতে তৈরি হতো। শাঁখারীবাজারের ১৩৬ বাদ্যভাণ্ডার নামের দোকানে, পানমুখে ভুরি ঝুলিয়ে বসে আছেন মধ্য বয়সী অমূল্য চন্দ্র দাস। তার চারদিকে সাজানো খমক, দোতারা, সানাই, তুরি, বেনু, করতাল, মন্দিরা, ঘণ্টা, ঝাঁঝর, কাঁসর, মৃদঙ্গ, জয়ঢাক, ঢাক, ঢোল, খঞ্জরি, সারিন্দা, তুবরি বা বীন, তানপুরা, এসরাজ, সরোদ, একতারা, সেতার, বাঁশি, তবলা-বায়া, ঢোলক, খোল, হারমোনিয়াম, বেহালা।
অমূল্যের বাবা ভাণু চন্দ্র দাস ছিলেন নামকরা বাদ্যযন্ত্রের কারিগর। বাবার কাছ থেকে হাতে ধরে শিখেছেন কীভাবে ঢোলের ছিল ধরে টেনে ঢোলের বাদ্য পরিবর্তন করা যায়, কীভাবে ঢোল থেকে ঢোলক হয়ে যায়, এমন হাজারো টিপস। অমূল্যদের চৌদ্দ পুরুষের কাজ বাদ্যযন্ত্র তৈরি। ছোটবেলা থেকে দেখে এসেছেন কাঠের গুড়ি শুকানো, সেই কাঠের গুড়ি কেটে দোতারা, তবলা-বায়ার অবয়ব দেয়া। এর মধ্যখানে বড় হতে হতে মনেই আসেনি কখনো এর বাইরে কোনো পেশা আছে। কাঠ, নাইলন, পিতল, রিড, চামড়া নিয়েই কাটে সকাল বিকাল রাত্রি। দিনমান চলে বাদ্যযন্ত্রের শুশ্রূষা করে। তবলা-বায়া আর ঢোল বানাতে কাঁচা চামড়ায় লবণ ছিটিয়ে সাতদিনের মতো ভিজিয়ে রাখতে হয়। চামড়া থেকে চুল উঠে গেলে পরিষ্কার করে বাঁশের খুঁটি দিয়ে টান টান করে রোদে শুকানো হয়। বিশেষ করে ছাগল ও পাঠার চামড়া দিয়েই ঢোল, একতারা-দোতারা, তবলা-বায়া বানানো হয়।
জীবন ঢুলির কথা সবার জানা, যে কিনা শুধু ঢোল বাজিয়ে জীবন ধারণ করেন। যেদিন ঢোল বাজানোর ডাক পড়ে না, সেদিন চুলায় হাঁড়ি চড়ে না। এখন জীবন ঢুলিরা হাঁড়ি চুলায় চড়াতে অফিসে কাজ করেন। কিন্তু একসময় ঢোল বাজিয়ে আর কিছু করার সময় পেত না জীবন ঢুলি। সকালে ঘুম থেকে উঠে জমিদারবাড়ির মন্দিরে, তার পরে অসীম বাবুর ছেলের মাথায় পানি দেয়া অনুষ্ঠান, দুপুরে বাবুদের মন্দিরে পুষ্পদান, বিকালে জঙ্গলবাড়িতে আসর আর রাতে কবিগানের আসরে গায়েনের সঙ্গত দেয়া। জারি, সারি আর সভা গানে তো ঢোল একটি মূল্যবান অনুষঙ্গ। একসময় রাজবাহিনীর সামনে থাকত ব্যান্ড বাদক দল। এখনো এর প্রচলন আছে। তবে প্রাচীনকাল থেকেই সামাজিক অনুষ্ঠানে হিজড়ারা ঢোল নিয়ে হাজির হতো। আবার কেউ কেউ ব্যান্ড দল ভাড়া করত।
ইংরেজ শাসনামলে উচ্চপদস্থ ইংরেজ কর্মকর্তাদের আগমন ও সংবর্ধনাসহ ঢাকার নবাবদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাদক দল ছিল অনস্বীকার্য। আশরাফ-উজ-জামান খান ঐতিহাসিক ঢাকা মহানগরীর সামাজিক অনুষ্ঠান-উত্সব এবং অবসর বিনোদন ব্যবস্থা প্রবন্ধে লিখেছেন— ‘অষ্টাদশ শতাব্দীর শেষ ভাগে ঢাকায় আর্মেনিয়ান গির্জার উদ্বোধনের সময়ে আর্মেনিয়ানরা ব্যান্ড মিছিল করে। চকবাজারের নহবত্খানা স্থাপিত হয়েছিল বড় এবং ছোট কাটরার সৈন্যদের ছাউনি ছুঁয়েই। উত্সবের দিন ফৌজ দল রঙ-বেরঙের পোশাকে সেজে ব্যান্ড বাজাত এবং নহবত্খানায়। পরবর্তীকালে ঢাকায় যে পেশাদারি ব্যান্ড পার্টি গড়ে ওঠে তা মনে হয় ঐ সৈন্যদের সাজসজ্জাকেও অনুকরণ করে। কারণ এখনো ঢাকার পেশাদারি বাজিয়ে দল নানা রকমের ফৌজি পোশাক পরে। ১৮৮৬ কি ’৮৭ সালের দিকে ঢাকার নর্থব্রুক হল পাঠাগার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কমিশনার ও অতিথিদের অভ্যর্থনার জন্য আনা হয় নবাব আবদুল গণির ব্যান্ড দলকে। সদরঘাটের কাছে করোনেশন পার্ক একসময় একটি মঞ্চ ছিল। এখানে প্রতি শনিবার সেনাবাহিনীর বাদক দল ব্যান্ড বাজাত।
একসময় ঢাকার মুসলমানি, নাক ফোরানী, বিয়ে ও অন্যান্য সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কার্যাবলির অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল ব্যান্ড দল। ছেলে পরীক্ষায় পাস করেছে— ডাক বাদক দল, মহল্লার দল পাশের মহল্লার সঙ্গে খেলায় জিতেছে— ডাক ব্যান্ড দল, নতুন ঘরে উঠতেও বাদক দল বা ব্যান্ড পার্টির ডাক পড়ত। ঢাকার নবাবি শাসনামলে ব্যান্ড পার্টি বিভিন্ন সামাজিক, ধর্মীয় উত্সব এবং সভা-শোভাযাত্রায় সুশিক্ষিত-সুসজ্জিত বাদকদের উপস্থিতি ছিল লক্ষণীয়। ঢাকার বেগম বাজারে ছিল কিছু ব্যান্ড বাদক দলের আখড়া। নির্দিষ্ট অর্থের বিনিময়ে এরা বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে সবাইকে আনন্দ দিত। আলু বাজারেও ছিল প্রাচীন ব্যান্ড দলের আবাস। নাজির হোসেন তার ‘কিংবদন্তির ঢাকা’য় বলেছেন, ‘সম্রাট আওরঙ্গজেবের শেষ আমলে জাফর খাঁর পৌত্র আল্লাইয়ার খাঁ লালবাগ দুর্গে অবস্থান করতেন। আল্লাইয়ার খাঁনের প্রতিষ্ঠিত বাজারটির নাম পরবর্তীতে বিকৃত হয়ে আল্লুর বাজার নামে পরিচিত হয়। বাদশাহ জাহাঙ্গীরের শাসনামলে এখানে বাদক দলের আগমন ঘটে। ...আল্লুর বাজারের বাদক দলই ঢাকার আদী বাদক দল। এদের প্রথম আগমনকারী তথা পূর্বপুরুষের নাম যতদূর জানা যায় রহমত খাঁ বাজাওয়ালা।’
ব্রিটিশ শাসনামলে ঢাকায় এক দল লোক বিশেষ ধরনের বেশকিছু বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে মানুষকে বিনোদন দিত। তারা পরিচিত ছিল ব্যান্ড বাদক নামে। ঢাকায় ধর্মীয়, সামাজিক, রাষ্ট্রীয়সহ এহেন কোনো অনুষ্ঠান হতো না, যেখানে ব্যান্ড বাদক উপস্থিত থাকত না। অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণই ছিল ব্যান্ড বাজনা। জন্মাষ্টমীর মিছিল ছাড়াও ঈদ মিছিল, মহররমের মিছিল, পূজা, বিয়েতে ব্যান্ড দল শহরের রাস্তায় বিচিত্র সব কারিশমা প্রদর্শন করত। বিয়ে বা মেহেদি অনুষ্ঠান নয়তো রাজনৈতিক সভা, সমাবেশ, খেলাধুলাসহ যে কোনো গণজমায়েতে ব্যান্ড পার্টির একটা আলাদা মূল্য ছিল। একসময় গরুর লড়াই, কবিগান, মল্লযুদ্ধ অনুষ্ঠান শুরু হওয়ার আগে ব্যান্ড পার্টির লোকজন প্রচলিত নানা সুরে গান করে আসর মাতিয়ে রাখত। এখন অবশ্য সব জায়গাতেই কম বেশি ব্যান্ড দল পাওয়া যায়। একসময় আল্লুর বাজার বা আলু বাজারেই ছিল বেশি বাদক দল। আমরা আধুনিক ব্যান্ড বলতে যা বোঝাই তা নয়। লাল বা হলুদ এমন কড়া রঙের পোশাক পরা এক দল লোক নানা বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে আনন্দ করত। সেগুলো ছিল শুধুই বাদ্যযন্ত্রের বাদ্য। এখনো কোথাও বাদক দলের প্রচলন থাকলেও আগের মতো তেমন ব্যাপক নয়। বাদক দলের জায়গা দখল করেছে আধুনিক ব্যান্ড গ্রুপ। যারা বাদ্যের সঙ্গে গানও পরিবেশন করে থাকে।
আলু বাজারে গেলে এখনো চোখে পড়বে কিছু ব্যান্ডের দোকান। একটি ড্রাম কিংবা কর্নেট নিয়ে পোশাক পরিহিত এক বাদকের ছবিসংবলিত সাইনবোর্ডে। নামগুলোও বেশ বাহারি— আনন্দ ব্যান্ড পার্টি, নিউ গীতালি ব্যান্ড, গাউছিয়া, দ্য লায়ন, ভাণ্ডারী, নিউ স্টার, আল মদিনা, বাংলাদেশ ব্যান্ড পার্টি, লিলি ব্যান্ড পার্টি, শাপলা প্রভৃতি। এই সময়ে এসে ঢাকার বিখ্যাত ঢোল বাদকদের নাম করলে দশরথ ঢুলির নাম আসে সবার আগে

বাংলাদেশে লোকবাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার বহু প্রাচীন। খিস্টীয় পঞ্চম শতকে বিখ্যাত চৈনিক পর্যটক ফা-হিয়েন প্রাচীন বাদ্যযন্ত্র দেখে এ দেশকে সঙ্গীত ও নৃত্যের দেশ বলে আখ্যায়িত করেন। খ্রিস্টীয় অষ্টম শতকে নির্মিত পাহাড়পুর-ময়নামতীর প্রস্তরফলক ও পোড়ামাটির চিত্রে নৃত্য ও বাদ্যরত মনুষ্যমূর্তি পাওয়া গেছে।

এতে কাঁসর, করতাল, ঢাক, বীণা, মৃদঙ্গ, বাঁশি, মৃৎভান্ডার প্রভৃতি বাদ্যযন্ত্রের চিত্র দেখা যায়। ঢাক, ডম্ফ, ডমরু প্রভৃতি আনদ্ধ এবং শিঙ্গা, বাঁশি, তুবড়ি প্রতৃতি শুষির যন্ত্রকে দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর অবদান বলে মনে করা হয়। নবম-একাদশ শতকে রচিত বাংলা সাহিত্যের আদি নিদর্শন চর্যাপদে গীত-নট-নৃত্য-বাদ্যের বর্ণনা পাওয়া যায়। চর্যার তিনটি পদে মোট সাতটি বাদ্যযন্ত্রের নাম আছে।

এগুলো হলো- বীণা, পটহ, মাদল, করÐ, কসালা, দুন্দুভি ও ডম্বরু। আনুমানিক ত্রয়োদশ শতকে রচিত ধর্মপূজার গ্রন্থ শূন্যপুরাণে বিয়াল্লিশ প্রকার যন্ত্রের উল্লেখ আছে। যেমন- ঢাক, ঢোল, কাড়া, মৃদঙ্গ, মন্দিরা, ডম্বরু, দুন্দুভি, বরঙ্গ, ভোর, ধীরকালি, শঙ্খ, শিঙ্গা, ঘণ্টা, জয়ঢাক, দামামা, খমক ইত্যাদি। মধ্যযুগে বিভিন্ন মঙ্গলকাব্য (খ্রি ১৩শ-১৮শ শতক) গীতাকারে পরিবেশিত হতো। ওইসব কাব্য ও চৈতন্যজীবনী গ্রন্থে চার শ্রেণির ৬৬টি বাদ্যযন্ত্রের উল্লেখ আছে। চৌদ্দ শতকের বৈষ্ণবকাব্য শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে মুরলী বা মোহনবাঁশি ছাড়াও করতাল ও মৃদঙ্গের কথা আছে। শেষের দুটিকে কৃষ্ণের নাচের তালবাদ্য বলা হয়েছে।

ষোলো শতকে চৈতন্যদেবের প্রবর্তনায় কীর্তন জনপ্রিয় হয়ে ওঠে, যার প্রধান বাদ্যযন্ত্র ছিল খোল, করতাল ও মন্দিরা। মধ্যযুগে ভারতীয় সঙ্গীতকলায় মুসলমানদের অবদান অনেক। সুফি সাধকদের সাধন-ভজনে বাদ্যযন্ত্রের ব্যবহার ছিল। রাজসভায়ও বিনোদনমূলক নৃত্য-গীত-বাদ্যের ব্যবস্থা ছিল। তাতে অনেক বাদ্যযন্ত্র ব্যবহৃত হতো। মুসলমান রচিত কাব্য, বিশেষত রাগতালনামায় এর বর্ণনা আছে।

ডফ, শানাই ও নহবত জাতীয় যন্ত্র মুসলমানদেরই আবিষ্কার। ইংরেজদের আগমনের পরে এদেশে পাশ্চাত্য সঙ্গীত ও বাদ্যযন্ত্রের ব্যাপক প্রভাব পড়ে। হারমোনিয়াম, বেহালা, গিটার, ফ্লুট, বিউগল, বেঞ্জু ইত্যাদি পাশ্চাত্যের বাদ্যযন্ত্র। শহর-গ্রাম সর্বত্র হারমোনিয়াম এখন একটি সাধারণ বাদ্যযন্ত্র এবং এ দিয়েই সঙ্গীতশিক্ষার হাতেখড়ি হয়।

লোকবাদ্যযন্ত্রের উপকরণ নিতান্তই সাধারণ ও এর গঠন-প্রণালীও সহজ-সরল। লাউয়ের খোল, বেল বা নারিকেলের মালা, বাঁশ, কাঠ, নল, পাতা, মাটি, লোহা, পিতল, সুতা, তার, শিং, শঙ্খ প্রভৃতি দেশজ উপাদান দিয়ে বাদ্যযন্ত্র নির্মিত হয়। সুতা, ঘোড়ার লেজের লোম, ধাতব তার দিয়ে একতারা, দোতারা, বেনা জাতীয় ততযন্ত্র; বাঁশ ও নল দিয়ে বাঁশি ও তুবড়ি জাতীয় শুষিরযন্ত্র; কাঁসা, পিতল প্রভৃতি ধাতব পদার্থ দিয়ে খঞ্জনি, ঘণ্টা জাতীয় ঘনযন্ত্র এবং গরু, ছাগল ও সাপের চামড়া দিয়ে ঢাক, ঢোল, মাদল জাতীয় আনদ্ধযন্ত্র নির্মিত হয়। কোনো কোনো বাদ্যযন্ত্রে প্রাকৃতিক উপাদান প্রায় অবিকৃত থাকে। যেমন শঙ্খ ও শিঙ্গা।

তালপাতা দিয়ে পাতবাঁশি তৈরি হয়। মাটির সাধারণ হাঁড়ি বা ছোট কলসিও তালবাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কোনো কোনো বাদ্যযন্ত্র তৈরি করতে প্রয়োজন হয় বিশেষ ধরনের চামড়া। এসব চামড়া প্রক্রিয়াজাত করা হয় আমহাটি গ্রামে।
নাটোর শহর থেকে প্রায় এক কিলোমিটার দূরে আমহাটি গ্রাম। এ গ্রামটি ডুগি, তবলা, একতারা, ঢোলের গ্রাম হিসেবেই পরিচিত। রাস্তার পাশ কিংবা বাড়ির সামনের খালি জায়গায় ছোট ছোট কাঠি দিয়ে আটকানো রয়েছে সাদাটে ঘিয়ে রঙের বিভিন্ন আকৃতির চামড়া। কোথাওবা শিলপাটায় হরীতকী পিষতে দেখা যায়। ডুগি, তবলা, একতারা, ঢোলের সরিষা খেতের পাশের খালি জায়গায় গোলপাতা-খড়চালা ঘরগুলোর বারান্দায় ঝুলছে নানা আকারের চামড়া।

ঢোল, ডুগি, তবলার চামড়া তৈরি করেন এ গ্রামের সবাই। এটাই তাদের পেশা। কয়েক পুরুষ ধরে এ পেশা এখন পরিণত হয়েছে নেশায়। অন্য কোনো কাজের কথা ভাবতে পারেন না তারা। ঢোলের জন্য বিশেষভাবে পরিশোধন করা চামড়া তৈরি করতে রোদের বিকল্প নেই। তাই রোদ না থাকলে তাদের হাত-পা গুটিয়ে বসে থাকতে হয় অনেককেই। বাড়ির সামনে খালি জায়গায় টান টান করে শুকাতে দেওয়া হয়েছে চামড়া। এটা মোটামুটি শেষ ধাপের কাজ। এগুলো পাঠা বা খাসির চামড়া। প্রতিটি চামড়ার চারপাশে ছিদ্র করে টান টান করে তাতে কাঠি দিয়ে মাটিতে পোতা রয়েছে। এ গ্রামের প্রবীণ চামড়ার কারিগর কমল চন্দ্র দাস। মোটামুটি সচ্ছল পরিবার। পাকা বাড়ি। সামনে সবজি বাগান। বাইরের উঠানজুড়ে চামড়া শুকাতে দেওয়া হয়েছে।

তার ছেলে অমল চন্দ্র দাসও এ কাজ করেন। নাটোর স্টেশন আড়ত থেকে চামড়া কিনতে হয়। পাড়ার সবাই এখান থেকে চামড়া কেনেন। পাঁঠা ও খাসির চামড়াই বেশি। তবে গরু-মহিষের চামড়াও আছে। ভেড়ার খুব কম। এসব চামড়া লবণ দিয়ে কাঁচা অবস্থায় ৫-৬ মাস রাখা যায়। তাই কেনার পর চামড়া থেকে মাংস ও লোম ছাড়িয়ে লবণ দিয়ে স্ত‚প করে রাখা হয়। রোদ হলে এগুলো টান টান করে শুকানোর জন্য বিছিয়ে রাখা হয়। ঢোল, খোল, তবলা, ডুগি, দোতারা ইত্যাদি বাদ্যযন্ত্র বানাতে এসব চামড়া ব্যবহার করা হয়।

গরু, মহিষের চামড়া ঢোল-তবলার বেল্ট হিসেবে ব্যবহার করা হয়। খোল তৈরিতে কিছু গরুর চামড়া লাগে। আর রং করতে ব্যবহার হয় হরীতকীর রস। পুরো প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ওই যে দেখে এলেন, ওটা প্রথমে লবণ মাখানো সাদা চামড়াগুলোর লোম নরম করার জন্য ভাঁজ করে পাথর চুন দিয়ে পানিতে ৫-৭ দিন বড় মাটির চাড়িতে ভিজিয়ে রাখা হয়। ৭ দিন পর চামড়ায় লেগে থাকা মাংস ছাড়ানোর পর ছুরি দিয়ে ঘষে ঘষে চামড়া থেকে লোম তোলা হয়। লোম তোলার পর রোদের জন্য অপেক্ষা করতে হয়। এর পর রোদ এলেই শুরু হয় চ‚ড়ান্ত প্রক্রিয়ার কাজ। তখন রোদ এলে চামড়াগুলো টান টান করে সাইজ করে খোটা মারা হয়। কড়া রোদ হলে একদিনেও অনেক সময় শুকিয়ে যায়। আবার ৩ থেকে ৫ দিনও লাগে। শুকানোর পর শিরিষ কাগজ দিয়ে ঘষে একটু উল্টেপাল্টে বিক্রির উপযোগী করা হয়। এর পর হরীতকীর রস বানাতে হয়।

চামড়া শুকানোর কাজ করেন পরিবারের ছেলে সদস্যরা। মেয়েরা মাঝে-মধ্যে রঙের জন্য হরীতকীর রস বানিয়ে দেয়। কমল চন্দ্র দাস এ কাজ করছেন প্রায় ৪৫ বছর ধরে। তার ছেলেও এখন কাজ করে। তার পূর্বপুরুষরাও এ কাজই করতেন। আগের তুলনায় চাহিদা খুব কমেনি। তবে সে তুলনায় বাড়েনি দাম।

প্রক্রিয়াজাতকরণের পর চামড়া বিক্রি হয় ইঞ্চি হিসেবে। ২২ ইঞ্চি থেকে শুরু হয় মাপ। একটি ২২ ইঞ্চির চামড়া (গোলাকৃতির) বিক্রি হয় ১০০ টাকা। এছাড়া ৩৪ কিংবা তার চেয়ে বড় চামড়া বিক্রি হয় মানভেদে ২০০ থেকে সাড়ে ৩০০ টাকায়। ১০০ টাকা বিক্রি করতে পারলে লাভ হয় ২০-২৫ টাকা। মাসে ২০০ বা তার কিছু বেশি চামড়া প্রস্তুত করলে সবই বিক্রি হয়ে যায়। দেশের প্রায় সব জেলায়ই যায় এসব চামড়া। সবচেয়ে বেশি যায় ঢাকা ও কুষ্টিয়া।

লালনের আখড়ার অধিকাংশ দোতারা, ঢোল, ডুগি, তবলার চামড়া যায় আমহাটি থেকেই। পাইকার কিংবা এখানকার কারিগরদের কাছে এসেও অনেকে চামড়া কেনেন। ভালো বাদ্যের জন্য এ পাড়ার চামড়ার চাহিদা বেশি। এসব চামড়া কেনার পর ঢোল-তবলার কারিগররা বাদ্যযন্ত্র তৈরি করেন।

এখানকার লালবাজারে গণেশ সুরভাÐারে কারিগর পলাশ কুমার তবলা তৈরির কাজ করেন। কাজ করতে করতেই কথা বললেন। চামড়ার ভালো-মন্দ নির্ভর করে ওপরের দানার উপর। মানে হাত বোলালে যে খস খস বাধে সেটা। দানা ভালো হলে বুঝতে হবে চামড়া ভালো। তবলা, ঢোল ও একতারা-দোতারার জন্য পাঁঠার চামড়া ভালো। ডুগি তৈরিতে ব্যবহার হয় ভেড়ার চামড়া। আর খোলের জন্য লাগে গরুর চামড়া।

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি