নোট বাতিলের কিস্যা

নোট বাতিল: প্রসঙ্গ কালো টাকা ও জাল টাকা _
_ সুজন ভট্টাচার্য _

নোট বাতিলের ঘটনা ভারতবর্ষে আগেও ঘটেছে। এমনকি স্বাধীনতার ঠিক আগে ১৯৪৬ সালেও ১০০০ ও ৫০০০ টাকার নোট বাতিল হয়েছিল। ১৯৭৮ সালে বাতিল হয় ১০০০, ৫০০০ ও ১০,০০০ টাকার নোট। তখন আদৌ বাজারে কোনো শোরগোল হয় নি। তাহলে মোদির নোট বাতিল নিয়ে এত হল্লা হচ্ছে কেন? নেহাতই রাজনৈতিক প্রতিশোধ? নাকি জনগণের একটা বড় অংশের হাতেও কালো টাকা চলে এসেছে বলেই এত চিৎকার? উল্টোদিকে অনেকেই উল্লসিত হয়ে দাবী করছেন জাল টাকা ও কালো টাকা এবার খতম হয়ে গেল। এমনকি আগস্ট মাসে খবরের কাগজে প্রকাশিত একটি আয়কর হানার ছবিকে সাম্প্রতিক ঘটনা বলে কালো টাকার রমরমা শেষ হয়ে যাবার দাবীও কেউ কেউ করছেন। তাহলে আসুন, একটু তলিয়ে দেখা যাক।

প্রশ্ন ১/ /
পাঁচশো ও হাজার টাকার নোট তো বড়লোকদের হাতে থাকার কথা। তাতে তো গরীবদের কিছু যায় আসে না। যারা নিজেদের "গরীবপ্রেমী" বলে দাবী করেন, তাহলে তারা এত বিচলিত হচ্ছেন কেন?

উত্তর//
এটা ঘটনা যে ভারতের সাম্প্রতিক মুদ্রাব্যবস্থায় ৫০০ ও ১০০০ টাকা হল সর্বোচ্চ মুদ্রা।১৯৮৬ সালকে ভিত্তিবর্ষ ধরলে আজ Consumer Price Index হোলো ৮৬৭। অর্থাৎ ১৯৮৬ সালের ১০০০ টাকায় যে পরিমাণ দ্রব্য বা সেবা কেনা যেত, আজকে সমপরিমান দ্রব্য বা সেবা কিনতে লাগে ৮৬৭০ টাকা। সেই হিসাবে ১৯৮৬ সালে যে ১০০০ টাকার নোট ছাড়া হয়েছিল, আজকের বাজারে তার প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা ১১২ টাকার কিছু বেশি। আর ৫০০ টাকার প্রকৃত দাম ৫৬-৫৭ টাকা। তথ্যগুলো ভারত সরকারেরই দেওয়া। একটু মিলিয়ে নিতে পারেন।
যেহেতু টাকার দাম ১৯৮৬ সালের ভিত্তিতে প্রায় দশ ভাগের একভাগ হয়ে গেছে, তাই এরপর থেকে রিজার্ভ ব্যাঙ্কও খুচরো নোটের যোগান ক্রমশ কমিয়ে দিতে শুরু করে। সরকারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী ২০১৬ সালের ৮ই নভেম্বর বাজারজাত নোটের ৮৬% ৫০০ আর ১০০০ এর। এই অবস্থায় খুচরো কেনাকাটাতেও ৫০০ টাকার নোট সবথেকে বেশিই চলতো। একটা উদাহরণ ধরা যাক। ১৯৮৬ সালে চায়ের দোকানে এককাপ চায়ের দাম ছিল ২৫-৩০ পয়সা। এখন ৪-৫ টাকা। সেইসময়ে এককাপ চা খেয়ে এক টাকার নোট নিতে দোকানদার আপত্তি করতো। এখন দশ টাকার নোট নিতে আপত্তি করে না। এটাই বাজারের বাস্তবতা। যেহেতু খুচরোর যোগান কমেছে, সবাইকেই এইভাবে মানিয়ে নিতে হয়েছে।
ছোট বা প্রান্তিক ব্যবসাদারের হাতে এভাবেই পাঁচশোর নোট চলে এসেছে। কারখানা বা ব্যক্তিগত শ্রমিকের মজুরি দেবার ক্ষেত্রেও ৫০০র নোট সবথেকে বেশি ব্যবহৃত হয়। গৃহ পরিচারিকারাও তার ব্যতিক্রম নয়। এরপর এল একশো দিনের কাজ। বেশ কিছুদিন ধরেই একশো দিনের কাজের মজুরি শ্রমিকদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে চলে যায়। ব্যাঙ্ক থেকে যখন তারা টাকা তোলেন, চলন অনুযায়ী বেশিটাই ৫০০র নোটে দেওয়া হয়। আর এইভাবেই চরম প্রান্তিক মানুষের কাছেও ৫০০ টাকার নোট পৌঁছে গেছে অনেকদিন ধরেই। কাজেই ৫০০ টাকার নোট অন্তত বড়লোকের নোট নয়। এ টি এমগুলোতেও ৫০০র নোট থাকে সবথেকে বেশি। ভুক্তভোগীমাত্রেই এটা জানেন।

প্রশ্ন ২//
কালো টাকার বাজার কি একদম শেষ হয়ে গেল না?

উত্তর//
না। একদম শেষ হয়ে গেল না। কালো টাকার দুটো উৎস থাকে। একটা হোলো লুকিয়ে রাখা ব্যবসা বা পরিষেবা, আর দ্বিতীয়টা হোলো ঘুষ, কমিশন বা কাট মানি। মাথায় রাখতে হবে, ব্যবসা সূত্রে প্রাপ্ত কালো টাকা কিন্তু ব্যবসাতেই বিনিয়োগ হয়। এবং খুব আইন বাঁচানো পদ্ধতিতেই। আবার ব্যবসা সূত্র যে কালো টাকা উপার্জিত হয়, সেটাও বাজারে ছড়িয়ে যায় নানা হাতে। একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। আমরা সবাই জানি, প্রোমোটিং একটি আদ্যন্ত কালো টাকা নির্ভর ব্যবসা। প্রোমোটার যে কালো টাকা বিনিয়োগ করলো, সেটা কোথায় গেল? খানিকটা গেল কাঁচামালের দাম মেটাতে, আর একটা অংশ গেল শ্রমিকদের মজুরি দিতে। হ্যাঁ, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি পদাধিকারীদেরও খানিকটা দেওয়া হোলো। তবে মূল খরচের তুলনায় সে খুবই সামান্য অংশ। তাহলে প্রোমোটারের কালো টাকা এমনকি জনমজুরের কাছেও পৌঁছে গেল। একটু ভাবলেই বিষয়টা বোঝা যাবে। তাহলে এইসব ব্যবসায়ীর কালো টাকায় কি হাত দেওয়া যাবে?
যে সমস্ত ব্যবসায়ীর প্রচুর কালো টাকা আছে, তাদের একটা সাধারণ কর্মপদ্ধতি হোলো অজস্র ভুতুড়ে কোম্পানি খুলে ফেলা। এইসব ভুতুড়ে কোম্পানির ডিরেক্টর বানিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির কাজের লোক, দারোয়ান বা মূল কোম্পানির কর্মচারীদের। তারা যৎসামান্য কিছু বাড়তি পায় আর তাদের বকলমায় কোম্পানির কালো টাকা সাদা হয়ে যায়। এই চক্কর বহু বছরের। অদ্যাবধি আয়কর দপ্তর এইসব ভুতুড়ে কোম্পানির প্রায়-ভিখিরি ডিরেক্টরদের আর্থিক যোগ্যতা নিয়ে কোনো তদন্ত চালিয়েছে কিনা সন্দেহ আছে।বিনোদন ব্যবসা ছাড়াও জুট মিলগুলো এভাবেই চলে। যখন কিছু গড়বড় হয়, এইসব নামকাওয়াস্তে ডিরেক্টররাই শাস্তি পায়; নাটের গুরুরা আড়ালেই থেকে যায়। তাছাড়া বাস্তুঘুঘুদের কালো টাকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেনামদার সম্পত্তি বা সোনাতে বদলে যায়।
এইবারে ঘুষ, কমিশন বা কাট মানির প্রশ্ন। কমিশন বা কাট মানি ।  মাথায় রাখতে হবে, ব্যবসা সূত্রে প্রাপ্ত কালো টাকা কিন্তু ব্যবসাতেই বিনিয়োগ হয়। এবং খুব আইন বাঁচানো পদ্ধতিতেই। আবার ব্যবসা সূত্র যে কালো টাকা উপার্জিত হয়, সেটাও বাজারে ছড়িয়ে যায় নানা হাতে। একটা উদাহরণ নেওয়া যাক। আমরা সবাই জানি, প্রোমোটিং একটি আদ্যন্ত কালো টাকা নির্ভর ব্যবসা। প্রোমোটার যে কালো টাকা বিনিয়োগ করলো, সেটা কোথায় গেল? খানিকটা গেল কাঁচামালের দাম মেটাতে, আর একটা অংশ গেল শ্রমিকদের মজুরি দিতে। হ্যাঁ, বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা ও সরকারি পদাধিকারীদেরও খানিকটা দেওয়া হোলো। তবে মূল খরচের তুলনায় সে খুবই সামান্য অংশ। তাহলে প্রোমোটারের কালো টাকা এমনকি জনমজুরের কাছেও পৌঁছে গেল। একটু ভাবলেই বিষয়টা বোঝা যাবে। তাহলে এইসব ব্যবসায়ীর কালো টাকায় কি হাত দেওয়া যাবে?
যে সমস্ত ব্যবসায়ীর প্রচুর কালো টাকা আছে, তাদের একটা সাধারণ কর্মপদ্ধতি হোলো অজস্র ভুতুড়ে কোম্পানি খুলে ফেলা। এইসব ভুতুড়ে কোম্পানির ডিরেক্টর বানিয়ে দেওয়া হয় বাড়ির কাজের লোক, দারোয়ান বা মূল কোম্পানির কর্মচারীদের। তারা যৎসামান্য কিছু বাড়তি পায় আর তাদের বকলমায় কোম্পানির কালো টাকা সাদা হয়ে যায়। এই চক্কর বহু বছরের। অদ্যাবধি আয়কর দপ্তর এইসব ভুতুড়ে কোম্পানির প্রায়-ভিখিরি ডিরেক্টরদের আর্থিক যোগ্যতা নিয়ে কোনো তদন্ত চালিয়েছে কিনা সন্দেহ আছে।বিনোদন ব্যবসা ছাড়াও জুট মিলগুলো এভাবেই চলে। যখন কিছু গড়বড় হয়, এইসব নামকাওয়াস্তে ডিরেক্টররাই শাস্তি পায়; নাটের গুরুরা আড়ালেই থেকে যায়। তাছাড়া বাস্তুঘুঘুদের কালো টাকা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই বেনামদার সম্পত্তি বা সোনাতে বদলে যায়।
এইবারে ঘুষ, কমিশন বা কাট মানির প্রশ্ন। কমিশন বা কাট মানির সুযোগ আছে কেবল রাজনৈতিক পদাধিকারীদেরই। কারণ একমাত্র তারাই পারেন কোনো আর্থিক বা বাণিজ্যিক নীতি প্রয়োগ করতে, সরকারি কেনাকাটা কার কাছ থেকে হবে সেই সিদ্ধান্ত নিতে। সেইসূত্রেই এরা কমিশন বা কাট মানি পেতে পারেন। এদের সুবিধে হোলো সরকারি কোনো সিদ্ধান্ত এরা আগাম জেনে যান এবং সেই মতো ব্যবস্থা নিয়ে ফেলেন। ফলে এরা বিপদে পড়বেন, এমনটা ভাবা দিবাস্বপ্ন। শোনা যাচ্ছে কেন্দ্রে ক্ষমতাসীন দলের পশ্চিমবঙ্গ শাখার অ্যাকাউন্টেই ৮ তারিখ ৫০০/১০০০এর নোটে দেড় কোটি টাকা জমা পড়েছে। যে রাজ্যে তারা ক্ষমতার ধারেকাছে নেই, সেখানেই যদি এটা সত্যি হয়, তাহলে যেখানে মৌরসিপাট্টা বিছিয়ে বসে আছে, সেখানে কী হতে পারে, সহজেই অনুমাণ করা যায়। কফিন কেলেঙ্কারি, ওয়েস্টল্যান্ড কেলেঙ্কারি, কোল বার্থ কেস তো প্রকাশ্যে এসেছে। সম্প্রতি ব্যাঙ্কের অনুৎপাদক সম্পদ মুছে ফেলার নামে যে ১,১৪,০০০ কোটি সরকারি প্রাপ্য বিলিয়ে দেওয়া হোলো, তার ৯৯% গেল বৃহৎ সংস্থাগুলোর ভোগে। এটা কি এমনি এমনি হয়েছিল? ছাপ্পান্ন ইঞ্চির বুকের ছাতির বুকপকেটে কি গোলাপের একটা পাপড়িও ঢোকে নি?
কিন্তু এই জাতীয় লোকেদের কথায় ওঠবোস করে, এমন মানুষের সংখ্যাও অনেক। তাদের জীবন চলে এইসব নেতাদের অনুগ্রহের ভিত্তিতেই। এইসব অনুগৃহীত লোকেদের ব্যবহার করে এরা সহজেই জমানো কালো টাকা সাদা করে নিতে পারবে। যে সব সরকারি কর্মচারী প্রচুর ঘুষ ইতিমধ্যেই খেয়ে রেখেছেন, তাদের অবশ্যই সমস্যা হবে। যেহেতু তাদের উপার্জন বেতনের সূত্রেই, তাই সেখানে কারচুপি করার সুযোগ তাদের নেই। এইজন্য তারা জমিবাড়িতে বিনিয়োগ করতে পারে না। তাদের কালো টাকা হয় বিলাসব্যসনে নষ্ট হয়, অথবা বাড়িতে নোটের মাধ্যমে জমানো থাকে। এরা অবশ্যই মরবে এবং এদের দু:খে সম্ভবত পৃথিবীর একটি পিপড়েও কাঁদবে না। পেশাজীবী, যেমন ডাক্তার, উকিল, এঞ্জিনিয়ার, চার্টার্ড অ্যাকাউন্টেন্ট ইত্যাদিদেরও একাংশ এই ধাক্কা সামলাতে পারবে না। সব মিলিয়ে কালো টাকার যে অর্থনীতি, তার প্রত্যক্ষ ব্যবসার অংশে কোনো ছাপ পড়বে না। কমিশন বা কাট মানিও প্রায় সবটাই পার পেয়ে যাবে। আটকে যাবে সরকারী কর্মচারীর ঘুষের টাকা। দেশের মোট কালো টাকার দশ শতাংশও যদি সেটা হয়, তাই বা কম কিসের? কিন্তু দশ শতাংশকে একশো বলে চালানোর চেষ্টাটাও নেহাতই চালিয়াতি মাত্র।

প্রশ্ন ৩//
জাল টাকার উৎপাত তো বন্ধ হবে?

উত্তর//
হবে। এবং একমাত্র এটাই হোলো সবথেকে প্রত্যক্ষ লাভ। কিন্তু সেটাও সম্ভবত সাময়িক। ভারত সরকারের বক্তব্য অনুযায়ী পাকিস্তানের পেশোয়ারের টাকশালে শুধু ভারতীয় জাল টাকাই ছাপানো হয়। যদি তাই হয়, তাহলে সেটা ভারতীয় অর্থনীতিকে পঙ্গু করার জন্য পাকিস্তানের সরকারি উদ্যোগ। তারা কি চুপ করে বসে থাকবে? কিছুদিন পরেই তারা আবার জাল নোট ঢোকাবে। ভারত সরকার বলছেন বটে নতুন নোট জাল করা প্রায় অসম্ভব। প্রায় আর একদম অসম্ভব, দুটো আলাদা বাস্তবতা। বর্তমানের জাল আর আসল টাকার ফারাক বোঝা প্রায় অসম্ভব হয়ে গিয়েছিল। ভবিষ্যতেও যে তাই হবে না, তার কোনো গ্যারান্টি নেই। হ্যাঁ, কিছুদিনের স্বস্তি মিলবে। সেটাও নেহাৎ কম কিছু না।

এইবারে আমার কয়েকটা প্রশ্নের কথা বলি।

প্রশ্ন ১//

কিছুদিন আগেই এন ডি টিভি প্রমাণ দেখিয়ে দাবী করেছিল যে রিজার্ভ ব্যাঙ্ক ৩০,০০০ কোটি টাকার ৫০০
আর ১০০০ টাকার নোট বাজারে ছেড়েছিল, ভুলক্রমে যাতে সিকিউরিটি থ্রেড ছিল না। সেই প্রচারকে খণ্ডন করে ভারত সরকার বা রিজার্ভ ব্যাঙ্ক জোরেসোরে কিছুই বলে নি। কেন? তাহলে কি ঘটনাটা সত্যি? সেই কারণেই কি সরকার যাবতীয় ৫০০/১০০০এর নোট বাতিল করে দিল? সরকার এই প্রশ্নে এখনো নীরব কেন? কেন সজোরে অস্বীকার করছে না? যদি আদ্যন্ত উদ্দেশ্যপ্রণোদিত মিথ্যা প্রচার হয়, তাহলে তো সরকার একটা বিবৃতি দিলেই ব্যাপারটা মিটে যেত। বরং সরকারের এই নীরবতা তো উলটে সন্দেহটাকে প্রবল করে দিচ্ছে।

প্রশ্ন ২//

যে কোনো নোট ছাপাতে খরচ আছে। যত উচ্চমূল্যের নোট হবে, তার আনুপাতিক খরচ ততো কম। ধরা যাক ১০০ টাকার নোট ছাপাতে খরচ হয় ৬০ টাকা। সেক্ষেত্রে আনুপাতিক খরচ ৬০%। আবার ৫০০ টাকার ক্ষেত্রে যদি সেই খরচ ১০০ টাকাও হয়, তাহলে সেই অনুপাত ২০%। যারা নোট জাল করে, তাদেরও খরচ আছে। এবং আসল নোটের খুব কাছাকাছি কিছু একটা ছাপানোর খরচও আসল নোটের মতোই। সেক্ষেত্রে জাল নোটের কারবারিরা উচ্চমূল্যের নোটই ছাপাতে চাইবে, যেহেতু তাতে লাভ বেশি। সাধারণত কমদামের নোট জাল হয় না, কারণ তার দামের থেকে খরচ বেশি। সরকার যদি জাল নোট ঠ্যাকাতেই চাইতো, তাহলে ১০০০এর নোট তুলে একবারে ২০০০ চালু করলো কেন? এতে তো জাল নোটের কারবারীদের আরো সুবিধে হয়ে যাবে। আর কালো টাকা যারা জমায় তাদেরও তো সুবিধা হয়ে গেল। সমমূল্যের কালো টাকা জমাতে এবার অর্ধেক জায়গা লাগবে। তাহলে কি জাল বা কালো টাকা ঠ্যাকানোর আদৌ কোনো উদ্দেশ্য ছিল? দোহাই সেন্সর চিপের গালগল্প কেউ শোনাতে আসবেন না।

প্রশ্ন ৩//

নোটের অভাবে সবথেকে সুবিধে কাদের হোলো? অবশ্যই মোবাইল ওয়ালেট কোম্পানিগুলোর। ইতিমধ্যেই তাফের ব্যবসা ৫ গুণ বেড়ে গেছে। এবং তারা কৃতজ্ঞচিত্তে প্রধানমন্ত্রীর ছবি দিয়ে বিজ্ঞাপন দিচ্ছে। ক্রেডিট বা ডেবিট কার্ড তো আছেই, আছে নেট ব্যাঙ্কিংও। কিন্তু বাজারের কতটুকুতে তাদের প্রভাব আছে? এমনিতেই ভারতে অসংগঠিত উৎপাদন ও বিপণন মোট বাণিজ্যের অন্ততপক্ষে ৫০% নিয়ন্ত্রণ করে। জনসংখ্যার অন্তত ৭০% এর ভরসাতেই বেঁচে আছেন। ফুটপাথের ব্যবসাদার, বাজারের সবজিওয়ালা বা ধোপা-নাপিতের পক্ষে মোবাইল ওয়ালেট বা কার্ডে দাম নেওয়া সম্ভবই নয়। তাদের ক্রেতাদেরও অবস্থা তদ্রুপ। তাদের পক্ষেও কার্ড নিয়ে বাজারে যাওয়া সম্ভব নয়। মজা হোলো বৃহৎ সংস্থাগুলোও কিন্তু এইসব না-মানুষ খদ্দেরদের ধরার জন্যই ১ টাকার টুথপেস্ট, ২ টাকার শ্যাম্পু বা ৫ টাকার কোল্ড ক্রিম বাজারে নিয়ে এল।
তাতেও সন্তুষ্ট না হয়ে এরা সরাসরি খুচরো ব্যবসায়ে চলে এসেছে অনেকদিনই। সেইসব ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে কার্ডে কেনা যায়। কিন্তু তাতেও অসংগঠিত বাজারকে আটকানো যাচ্ছে না। পণ্য পরিষেবা কর অর্থাৎ GST নিয়ে এরাই সবথেকে উৎসাহী। নতুন করব্যবস্থায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক ব্যবসায়ীর হাল কী হবে কেউ জানে না। কিন্তু সেই প্রস্তাবিত GSTর সাফল্য এবং তার হাত ধরে বৃহৎ ব্যবসায়ী গোষ্ঠীর মুনাফা বাড়ানোর অন্যতম প্রকৌশল যে নগদ ছাড়া লেনদেন, সেটাও সরকার অনেক আগেই ঘোষণা করেছেন। ইতিমধ্যেই খুচরো নোটের অভাবে অসংগঠিত ব্যবসা সবথেকে বেশি মার খেয়েছে। তাহলে কি সরকারের আরেকটা উদ্দেশ্য ছিল বাজারে নোটের অভাব তৈরি করে অসংগঠিত ব্যবসাকে ময়দান থেকে সরিয়ে দেওয়া? শুরুতেই ২০০০ টাকার নোটের আমদানি যে সেই সন্দেহকেই জোরদার করছে।

প্রশ্ন ৪//

কেউ কেউ বলছেন একটা মহৎ কাজের জন্য সবাইকেই কিছু দাম দিতে হবে। দু-তিনদিন আলুভাতে খেয়ে একটু আত্মত্যাগ করতে তো হবেই। খুবই ছেঁদো একটা যুক্তি। ধরা যাক, আমার খুব বদহজম হচ্ছে। তাহলে আমি কয়েকদিন মাছমাংস না খেয়েই থাকবো। তার জন্য যে বাড়তি খরচটা হোতো, সেটা কিন্তু আমার পকেটেই থেকে যাবে। এক্ষেত্রেও তাই। কাজেই এটা আত্মত্যাগ নয়, পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নেওয়া।

প্রশ্ন ৫//

ক্যাশলেস মার্কেটের সওয়াল সরকার করছেন। অনেকে ঘাড় নাড়িয়ে বলছেন তাতে অসুবিধে কী? আমেরিকা- ইউরোপে তো তাইই আছে। ঠিক কথা। কিন্তু আমেরিকাতে সর্বোচ্চ নোটের মূল্য হোলো ১০০ ডলার। কেউ বলতেই পারেন, আরিব্বাস! সে তো প্রায় ৭,০০০ টাকা। আজ্ঞে না। টাকার সাপেক্ষে তাই হলেও আমেরিকার অভ্যন্তরিন বাজারে তার দাম ১০০ই। পাশাপাশি ২০০১ সালে ইউরোপিয়ান ফিনান্স কমিশন (সংযুক্ত ইউরোপের অর্থ দপ্তর) তার রিপোর্টে বলেছিল, গোটা ইউরোপে যে ব্যবসাটি সবথেকে দ্রুত বাড়ছে, তা হোলো জাল ইনভয়েস ছাপানোর ব্যবসা। কাজেই ক্যাশলেস মার্কেট মানেই যে কালো টাকা থাকবে না, এমনটা নয়। বরং কালো টাকাকে যদি প্রতিহত করতেই হয়, তাহলে আমেরিকার ধাঁচে সর্বোচ্চ মুদ্রা করা হোক একশো টাকার। অনেক বেশি নোট বহন করতে হবে বলে যাদের সামর্থ্য আছে, তারা কার্ডের দিকে এমনিতেই ঝুঁকবেন। আবার যাদের সামর্থ্য কম, তারাও স্বচ্ছন্দে ১০০ টাকার নোটেই বাজার করবেন। জাল নোটের সম্ভাবনা প্রায় শূণ্য হয়ে যাবে, কেন না পড়তায় পোষাবে না। সবথেকে বড় কথা, যাদের ঘুষ বা অসৎ উপার্জন আছে, তাদেরও কালো টাকা জমিয়ে রাখতে অন্তত ৫গুণ বেশি জায়গা লাগবে। আবার বিলাসবিনোদনে কালো টাকা ব্যবহার করতে গেলেও অনেক বেশি পরিমাণে নোট বহন করতে হবে, যা লুকিয়ে রাখা সম্ভব হবে না। একমাত্র এভাবেই সমস্ত সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কেউ বলতেই পারেন সর্বোচ্চ ১০০ টাকার নোট হলে যে পরিমাণে নোট বাজারে যোগান দিতে হবে, তার খরচ তো সাংঘাতিক। নিশ্চয়ই। কিন্তু যুগান্তকারী কিছু করতে গেলে কিছু আত্মত্যাগ তো করতেই হবে। সরকার বৃহৎ বাণিজ্য সংস্থাগুলোকে ১,১৪,০০০ কোটি টাকার খেলাপি ব্যাঙ্ক ঋণ মকুব করে যে ছাড় দিয়েছে, সেটা আদায় করে নিলেই এই খরচটা উঠে আসবে। সুইস ব্যাঙ্কের টাকা আদায় করে তখন না হয় গরিবদের বদলে এইসব সংস্থাকে দিলেই চলবে। আচ্ছে দিন আমরা তো চাই। সরকার চান কি?

Comments

Popular posts from this blog

মহায়ণ

মরণ vs যৌনতা

আনা কড়া গন্ডা ক্রান্তি